Home নূর ই মহব্বত নূর ই মহব্বত পর্ব ২১

নূর ই মহব্বত পর্ব ২১

নূর ই মহব্বত পর্ব ২১
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী

সূর্য অস্ত যাচ্ছে পশ্চিম আকাশে। লালিমায় ছেয়ে গেছে পুরো আকাশ। গাড়িতে অন্যমনষ্ক হয়ে বসে আছে নওমি। তার কোলেই ছোট্ট আদনান বিষ্ময় নিয়ে সব দেখছে আর এটা ওটা নিয়ে খেলছে। আর ড্রাইভ করতে থাকা আযলান একটু পর পর ওদের দিকে তাকাচ্ছে। নওমির কোনো যুক্তিই আযলানের সামনে টিকে নি। সে আযলানের কথা মানতে বাধ্য হয়েছে। ছেলের একটা সুন্দর জীবন আর আযলানের খাদ বিহীন ভালোবাসা এবং মায়ার টান ওকে বাধ্য করেছে মেনে নিতে। শেষমেশ ওর যুক্তিতর্কে পানি ঢেলে আযলান ওকে আধ ঘণ্টা সময় দিয়ে বেরিয়ে যায় এবং ঠিক আধ ঘণ্টা পর একটা কালো রঙের গাড়ি নিয়ে ফিরে আসে। আদনানের গাড়ির প্রতি আকর্ষণ দেখেই হয়তো ওর এই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত।
ওর ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে আযলান গলা ঝেড়ে বললো,

– ফুসকা খাবে? ফুসকা তো তোমার প্রিয়।
নওমি চমকে তাকাল। আযলান মনে রেখেছে তার কি পছন্দ? এতো ব্যস্ত মানুষ এসব মাথায় রাখে? তিন বছর আগের কত শত বিকেল ও সন্ধ্যা এই একটা খাবারের আবদারে কেটে যেত, তা নওমির মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল। আযলান তখনো ওর সব কথা মুখ ফুটে বলার আগেই বুঝে যেত। আজ এত দিন পর, এত ঝড়ের পরও আযলান ওর সেই ছোট্ট ভালো লাগাটার কথা ভুলে যায়নি! নওমি উপরে না দেখালেও ভেতরে ভালো লাগা কাজ করলো তার। সে ছোট্ট করে জবাব দিল,
– না, লাগবে না। দুপুরের খাবারটা একটু দেরিতেই খাওয়া হয়েছে, এখন খিদে নেই।
আযলান যেন জানতো কি উত্তর দিবে তাই সে পাত্তা না দিয়ে কিছু বলার আগেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। ওদের সাইডে এসে দরজা খুলে দিয়ে বললো,
– খিদে পেলেই কি ফুসকা খেতে হয় নাকি? ওটা তো মনের খোরাক। আর আদনানও তো একটু বাইরে নামতে চায়, তাই না আব্বু?
আযলান এবারও আদনানকে নিজের পক্ষে টেনে নিল। আদনান তো ঘুরতে যাবে ভেবে খুশিতে মাথা নাড়লো। আদনানকে নওমির কোল থেকে নিয়ে আযলান বললো,

– নেমে এসো। তোমার চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে আমি তোমাকে কিড-ন্যাপ করে নিয়ে এসেছি! একটু ফ্রেশ বাতাস গায়ে লাগাও।
নওমি আর না করলো না। সত্যিই ফ্রেশ বাতাস দরকার। এমন পরিবেশ দরকার যেখানে সে কোনো চিন্তা দুশ্চিন্তা ছাড়ায় শ্বাস নিতে পারবে। যেখানে তার হারানোর ভয় থাকবে না। সে ও তো চাই প্রিয় মানুষগুলোর সাথে ভালো থাকতে! কিন্তু পরিস্থিতি তার সাথে এমন করে কেন?
নওমি গাড়ি থেকে নেমে একটু হেঁটে যেতেই দেখলো আযলান আদনানকে নিজের কোলের সাথে জাপ্টে ধরে এক হাত দিয়ে আগলে রেখেছে। আদনান আযলানের কাঁধে হাত রেখে বড় বড় চোখ করে চারপাশ দেখছে। আযলান হেসে ওকে কিছু বলছে আদনানও খিলখিল করে হাসছে। আযলান পেছন ফিরে ওকে হাত দিয়ে ইশারা করলো ওদিকে যেতে। দোকানের এক কোণে তুলনামূলক একটু নিরিবিলি জায়গায় ওরা বসল। আযলান দুই প্লেট স্পেশাল ফুসকার অর্ডার দিয়ে নওমির মুখোমুখি বসল।

– আমি জানি নওমি, তোমার এই হুট করে চলে আসাটার পেছনে অনেক দ্বিধা আর অস্বস্তি কাজ করছে। তুমি হয়তো ভাবছ সবকিছু বড্ড তাড়াহুড়ো করে হয়ে গেল। কিন্তু বিশ্বাস করো, আদনানের মুখের দিকে তাকিয়ে আর তোমাকে ওই পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রাখার সাহস আমার ছিল না। যা হয়েছে, তাতে আমাদের কারও হাত ছিল না। কিন্তু এখন তো আমরা একসাথে থাকার চেষ্টা করতেই পারি?
নওমি মাথা নিচু করে বসে রইলো। আযলান যা বুঝতে চাইছে তা নওমি নিজেও জানে। দোষ তো আযলানের একার ছিল না, পরিস্থিতিটাই এমন ছিল যে ওদের আলাদা হতে হয়েছিল। আযলানও তো এই তিনটে বছর কম কষ্ট পায়নি। তা ওর এই উশখুশ চাহনি আর আদনানের প্রতি নিখাদ মায়াই বলে দিচ্ছে। সে নিচু স্বরে বললো,
– আমি আপনাকে দোষ দিচ্ছি না আযলান। আমি শুধু ভাবছি, হুট করে সবকিছু আগের মতো গুছিয়ে নেওয়াটা কতটা সহজ হবে? আমাদের মাঝে যে সময়টা হারিয়ে গেছে, সেটা তো আর ফিরবে না।
– সহজ না হোক, সহজ করার চেষ্টা করতে হবে। চেষ্টা করলে তো হবেই!
– হুম।
– হারিয়ে যাওয়া সময়টা আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না নওমি, কিন্তু সামনের সময়টা তো আমরা চেষ্টা করলে নিজেদের মতো কাটাতে পারবো। আমরা দুজনেই পরিস্থিতির শিকার ছিলাম, কিন্তু এখন আর সেই পরিস্থিতি আমাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ চালাতে পারবে না। তুমি শুধু একটু ভরসা রাখো।
নওমি মাথা নাড়লো। ফুসকা এসে গেলে আদনান এর মধ্যে একটা ফুসকার দিকে হাত বাড়াতেই আযলান হেসে উঠে ওটাকে ভেঙে আদনানের মুখে ছোট একটা টুকরো তুলে দিল।

– ঝাল কিন্তু? খেয়ে কান্নাকাটি করতে পারবি না।
আদনান খেতে খেতেই বাবার দিকে তাকালো। কি বলতে চাইছে এই লোক? আমাকে খেতে দিবে না হু? দেখি কেমনে না দিয়ে খায়। আদনানের চাহনি দেখে হেসে ফেললো আযলান।
– কী রে, এমন বাঘা চাউনি দিচ্ছিস কেন? বাপের ওপর রাগ?
আযলান আদনানের গোলগাল গাল দুটো আলতো করে টিপে দিয়ে আবার হেসে উঠল। এবার নওমি পাশ থেকে উত্তর করলো,
– বাঘ বলেছেন তাই বাঘা চাউনি দিচ্ছে, সিম্পল।
এহেন জবাবে আযলান ভ্রু কুঁচকে বলল,
– বাঘের ছানা বলেছি, বাঘ নয়।
– বাঘের ছানা নিশ্চয়ই হাতি হবে না?
আযলান নওমির এই চটজলদি জবাব শুনে থমকে গেল। পরক্ষণেই ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বললো,
– বাহ্! যুক্তিতে তো দেখছি এখনো আগের মতোই অপরাজেয় আছ। এক চিলতেও ধার কমেনি।
– ধার কমবে কেন? পরিস্থিতিতে পড়ে মানুষ অনেক কিছু হারায়, কিন্তু নিজের স্বভাব তো আর বদলে ফেলে না বরং প্রয়োজনে ধার বাড়িয়ে ফেলে।
কথাটা বলতে বলতে নওমির চোখ দুটো ক্ষণিকের জন্য আযলানের চোখের ওপর স্থির হলো। আযলান চাইল না পরিবেশটা আবার সিরিয়াস হোক সে মজা করে বললো,

– তাহলে বাঘের বাচ্চার মা ও নিশ্চয়ই বাঘিনী?
কথা ঘুরিয়ে ওর দিকেই টেনে নিচ্ছে আযলান। ওর দিকে তাকিয়ে দেখল মুখে দুষ্টু হাসি ঝুলছে। নওমি ফুসকার বাটি টেনে নিয়ে বললো,
– আপনার এই কথার মারপ্যাঁচ চটপট বন্ধ করুন তো! আদনানকে ফুসকা খাওয়াচ্ছেন খাওয়ান, এটা নিয়ে আবার আমার দিকে টেনে আনার কোনো মানে হয় না।
আযলান শব্দ করে হেসে উঠল। নওমির এই লজ্জামিশ্রিত রাগ আর অস্বস্তিটুকু দেখতে ওর ভীষণ ভালো লাগছিল।
– শুনলি আব্বু? তোর মা কিন্তু যুক্তিতে হেরে গেলেই রেগে যায়। তুই বড় হয়ে অন্তত বাপের মতো ঠান্ডা মাথায় কথা বলা শিখিস।
আদনান তখন মুখের ভেতরের টুকরোটা গিলে ফেলে বড় বড় চোখ করে বাবার দিকে তাকাল। ‘মা’ শব্দটা ও খুব ভালো বোঝে। ও আযলানের কোল থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে নওমির দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে আবছা স্বরে ডাকল,
– মাআআ…!
নওমি হেসে বললো,
– হুম বাবাআআ!

টেনে বলার সুর শুনে খিলখিল করে হেসে উঠল আদনান। আযলান জ্বলে উঠে বললো,
– মায়ের নাম ধরতেই মাআআ করে উঠিস কেন হু? বাবা বলতে পারিস না?
আযলানের এমন হুট করে জ্ব’লে ওঠা আর আদনানের সাথে করা এই কৃত্রিম রেষারেষি দেখে নওমি এবার নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। একটু পর আশেপাশে তাকিয়ে নওমি বললো,
– এবার বোধহয় আমাদের ফেরা উচিত?
আযলান উঠে দাঁড়িয়ে নওমির কোলে আদনানকে দিয়ে বললো,
– হু। তোমরা বসো আমি বিলটা দিয়ে এক্ষুনি আসছি।
আযলান চলে যেতেই নওমি নিজের ভাবনায় ডুব দিল। এতগুলো বছর পর সেই চিরচেনা ঘর সংসার! ভাবতেই শিউরে উঠছে সে। পারবে সব আগের মতো মানিয়ে নিতে?
আযলান যখন বিল মিটিয়ে ফিরে এল, তখন নওমি আদনানকে কোলে নিয়ে চুপচাপ রাস্তার ওপারের ব্যস্ততার দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর বিষণ্ণ চোখ আর মুখের সূক্ষ্ম ভাবান্তর দেখে আযলান ঠিকই বুঝল, মেয়েটা আবার কোনো পুরোনো গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে। সে এসে আদনানের নরম তুলতুলে গালে নিজের তর্জনী দিয়ে আলতো টোকা দিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

– কী ব্যাপার? মা-ব্যাটা মিলে কি আমার নামে কোনো চক্রান্ত করছ? চল, এবার ওঠা যাক।
আদনান গালে হাত ডলে মুখ ফুলিয়ে বললো,
– মালে মা!
আদনানের কাণ্ড দেখে আযলানের চোখ তো চড়কগাছ! সে নিজের বুকে হাত দিয়ে চরম বিস্ময় নিয়ে বলল,
– কী? আমি তোকে মারলাম কখন? একটু আদর করে গালটা টিপে দিয়েছি বলে তুই মায়ের কাছে আমার নামে এই মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছিস? এখনই এত বড় চালবাজ!
আদনান যেন বাবার ওপর খুব চটেছে।
“বওওপ” বলে ও নওমির বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল। নওমি আদনানের পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার ছলে আযলানের দিকে তাকাল। ওর চোখে আর ঠোঁটে তখন দুষ্টুমির হাসি। সে আযলানকে শুনিয়ে শুনিয়ে আদনানকে বলল,

– হু বপ, কি সাহস আমার ছেলেকে মারে!
আযলান একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালে হাত দিল। মুখে কৃত্রিম আফসোস আর হারের গ্লানি ফুটিয়ে বলল,
– বুঝতে পারছি, প্রথম দিনেই কোর্ট-কাচারি বসিয়ে আমাকে আ’সামী বানিয়ে দেওয়া হলো! দুই মা-বেটায় মিলে এই সংসারে আমার ওপর যে কী জুলুম চালাবে, তা এখন থেকেই টের পাচ্ছি। চলেন এবার বাসায় যেতে হবে।
ওরা গাড়ির দিকে চলে গেল।
এতগুলো বছর পর আবার সেই চিরচেনা ঘর-সংসার, আযলানের চেনা পরিধি সবকিছু ভাবতেই ওর বুকের ভেতরটা এখনো একটু দুরুদুরু কাঁপছে ঠিকই, কিন্তু আযলানের এই সহজ করে নেওয়ার চেষ্টা ওকে এক নতুন শক্তি দিচ্ছিল। পরিস্থিতি ওদের আলাদা করেছিল ঠিকই, কিন্তু আজ সেই পরিস্থিতিকে বুড়ো আঁগুল দেখিয়ে ওরা আবার এক হওয়ার দিকে এগিয়ে চলেছে।
খুব বেশিক্ষণ লাগলো না তারা আযলানের বাসায় হাজির হয়ে গেল। আযলানের মা তাদের অপেক্ষাতেই ছিলো। নওমিকে দেখতেই তিনি ছুটে এলেন। নওমি আর আদনানকে ফিরে আসতে দেখে চোখের পানি ছেড়ে দিলেন। আযলান ওদের থামতে বলে বললো,

– আম্মু, কাঁদা বন্ধ করো। দেখছ না তোমার নাতি ঘুমাচ্ছে?
নয়না বেগম নওমিকে ছেড়ে আদনানের দিকে তাকালো। ওনার এবার মনে হচ্ছে বাড়িটা পরিপূর্ণ হয়েছে। এতদিনে এই একলা নিস্তব্ধ বাড়িতে কোলাহল ফিরবে! নওমি ভেতরে গেল। পরিবেশ পুরনো হলেও অনুভূতিগুলো যেন নতুন। সেই প্রথম দিনের মতো! যেদিন প্রথমবার আযলানের হাত ধরেই এই পরিবারে প্রবেশ করেছিল এইবারও যেন ঠিক তাই!
– নওমি তুমি আদনানকে নিয়ে রুমে আসো। ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নাও।
– হ্যাঁ সেটাই ভালো যা নওমি।
নওমি সায় জানিয়ে আযলানের পিছু পিছু গেল। ওদের একসাথে যেতে দেখে নয়না বেগম মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন “আল্লাহ্ তুমি আমার কথা শুনেছো! আমার ছেলেটার জীবনে সুখের পথ দেখাচ্ছো। আমার দুআ কবুল হচ্ছে! এইবার আর কোনো চিন্তা নেই আমার। ওরা যেন একসাথে ভালো থাকে।”
নওমি আযলানের রুমে ঢুকতেই মনে হলো পুরনো অতীতে ফিরে গেল সে! সবকিছু যেন আগের মতোই আছে, শুধু ঘরের এক কোণে একটা কাঠের সুন্দর ছোট দোলনা রাখা, যা দেখলেই বোঝা যায় আদনানের কথা মাথায় রেখেই ওটা আনা হয়েছে।
আযলান খুব সাবধানে নওমির কোল থেকে ঘুমন্ত আদনানকে নিজের চওড়া দুহাতে তুলে নিল। তারপর বিছানার নরম চাদরে আলতো করে শুইয়ে দিয়ে ওর গায়ের ওপর পাতলা একটা কম্বল টেনে দিল। ওর চুলে বিলি কেটে দিয়ে নওমিকে বললো,

– তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি পাশের রুমের ওয়াশরুমটা ব্যবহার করছি।
নওমি মৃদু মাথা নাড়ল শুধু। আযলান রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই নওমি একবার চারপাশে চোখ বুলালো। এই চেনা মানুষটাকে ভুলে থাকার কতশত ব্যর্থ চেষ্টা করেছে! কিন্তু আজ যখন সে সত্যিই এখানে ফিরে এসেছে, তখন ওর মনে হচ্ছে এই ঘরের প্রতিটা ধূলিকণাও যেন ওর চেনা। সে ধীর পায়ে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পাল্লাটা খুলতেই ও চমকে উঠল। নওমির পুরনো ব্যবহৃত অনেক থ্রি পিস এবং শাড়ি এখনো আছে এখানে! সে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলো সেসব তারপর ব্যাগ খুলে নিজের জামা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।

আযলান একটু পর ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে চুল মুছতে মুছতে রুমে ঢুকল। ওড়না দিয়ে চুল মুছতে থাকা নওমিকে দেখে ও দরজার কাছেই থমকে দাঁড়াল। সে এক দৃষ্টিতে নওমির দিকে তাকিয়ে রইল। নওমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুলগুলো আলতো করে মুছছিল। আয়নার প্রতিবিম্বেই সে খেয়াল করল, আযলান দরজার কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। ওর পরনে এখন একটা ট্রাউজার আর ধূসর রঙের টি-শার্ট। মাথা থেকে চুইয়ে পড়া পানির দু-একটা ফোঁটা ওর কলারবোনে এসে পড়ছে। আয়নার ভেতর দিয়েই দুজনের চোখাচোখি হতেই নওমি চট করে চোখ সরিয়ে নিল। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর স্পন্দন টের পেল সে। নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে চুল মুছা থামিয়ে ওড়নাটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিল। আযলান অবশ্য নিজের দৃষ্টি সরাল না। সে ধীর পায়ে ঘরের ভেতর এগিয়ে এল। আলমারির একটা পাল্লা খুলে বললো,

– এখানে আরো একটা এক্সট্রা তোয়ালে ছিলো।
নওমি চুপ রইলো। আযলান তোয়ালে বের করে ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
– চুলগুলো ভালো করে শুকিয়ে নাও নওমি, নয়তো আবার ঠান্ডা লেগে যাবে। তোমার তো আবার একটুতেই সাইনাসের সমস্যা বাড়ে।
নওমি অবাক হলো বটে! এত কিছু মনে রেখেছে? নওমি ভেবেছিল সময়ের সাথে সাথে হয়তো অনেক কিছুই আবছা হয়ে গেছে, কিন্তু আযলানের এই সহজভাবে মনে রাখাটা ওকে ভীষণভাবে অবাক করল। নওমি নিজের বিস্ময়টুকু আড়াল করার জন্য চট করে ফ্যানের রেগুলেটরটা এক পয়েন্ট বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
– হুম, ফ্যানের বাতাসেই শুকিয়ে যাবে।
আযলান নিজের চুল মুছে তোয়ালে বারান্দায় মেলে দিয়ে এসে খাটের এক কোণে গিয়ে বসল। বিছানায় আদনান এক হাত ছড়িয়ে, এক পা বাকিয়ে মুখটা একটু হাঁ করে বেশ আরাম করে ঘুমাচ্ছে। আযলান আলতো করে ছেলের কপালে হাত রেখে ওর এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
– এভাবে কে ঘুমায়? তবে ঘুমানোর স্টাইলটা ভীষণ আদুরে!
পরক্ষণেই আবার বললো,
– উহু! কে ঘুমায় বললে হয় না!
তারপর নওমির দিকে তাকিয়ে বললো,
– জানেন ম্যাডাম, আপনার এই ছেলের ঘুমের স্টাইলটা কিন্তু হুবহু আমার মতো। আমিও নাকি ছোটবেলায় এভাবেই এক পা ওপরে তুলে হাঁ করে ঘুমাতাম! আম্মু প্রায়ই এই নিয়ে খ্যাপাতো আমাকে। র-ক্ত বলে কথা, ফাঁকি দেবে কোথায়?
নওমি হাসলো ওর কথা শুনে। আযলান যথাসম্ভব ওকে আগের মতো করতে চাইছে এটা বুঝতে পারছে তাই সে চিন্তা করলো এইবার আর কিছু নিয়ে চিন্তা করবে না সে। নিজের জন্য বাঁচবে সে। যা হবে দেখা যাবে! এই “দেখা যাবে” টা যে এতো দ্রুত ফলে যাবে তা বোধহয় বুঝতে পারে নি নওমি। আযলান উঠে দাঁড়িয়ে বললো,

– খেতে আসো আম্মু অপেক্ষা করছে বোধহয়। আদনান উঠলে ওকে তখন খাইয়ে দেওয়া যাবে।
– আসছি।
আযলান রুম থেকে বেরোতেই নওমি চুলগুলো বেঁধে ওড়না মাথায় দিয়ে আদনানের দুই পাশে দুটো বালিশ রেখে রুম থেকে বেরোনোর প্রস্তুতি নিলো। বের হওয়ার জন্য পা বাড়াতেই তার ফোন বেজে উঠলো। নওমি বিড়বিড় করে বললো,
– এই অসময়ে কে কল দিলো। তুহি নাকি?
ফোন নিয়ে আননোন নম্বর দেখে সে না বুঝেই কল রিসিভ করলো,
– আসসালামু আলাইকুম! কে বলছেন?
ওপাশ থেকে কোনো সালামের উত্তর এল না। তার বদলে ভেসে এল এক কর্কশ কণ্ঠস্বর। কোনো ভূমিকা ছাড়াই ওপাশের মানুষটা হিসহিসিয়ে খ্যাপা স্বরে বলে উঠল,

নূর ই মহব্বত পর্ব ২০

– তোকে না মানা করেছিলাম আযলানের সাথে সম্পর্ক না রাখতে? ছেলের জীবনের মায়া নেই তোর? বড্ড স্বার্থপর তো তুই!
নওমি থমকে গেল। যেটা থেকে পালাতে চাই সেটাই তার কাছে এসে হানা দেয় কেন? কেন আজ আবারও সেই বিভীষিকা ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে?

নূর ই মহব্বত পর্ব ২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here