Home নূর ই মহব্বত নূর ই মহব্বত পর্ব ২৫

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৫

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৫
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী

আহিল আদনানকে নিয়ে বেরোতেই দুজন লোক সামনে এসে বললো,
– এদের কি করব? তুই সিওর তুই যা ভাবছিস সেটাই।
– আমি যদি সঠিক না হতাম তাহলে এতদূর কিভাবে আসতাম? আসল ঠিকানায়?
– কারণ কি হতে পারে?
– সেটা আমি কি করে বলবো? এদের মুখ থেকে কিছু বের করতে পারিস কি না দেখ। আমি গেলাম। ছেলের মা ওদিকে অস্থির হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।
বলতে বলতে গাড়ির দিকে চলে গেল আহিল। আদনান সেই যে বাবার কাঁধে মাথা রেখেছে আর উঠানোর নাম নেই। এতকিছুর পরও আহিল খুশিমনে রয়েছে। ছেলে তাকে আজ নিজ থেকে বাবা বলে ডেকেছে। আহিল গাড়িতে বসে আদনানকে কাঁধ থেকে তুলে গালে চুমু খেলো। তারপর পুরো শরীর চেক করল কোনো আঁচ আছে কি না। কিছু নেই দেখে স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বললো,

– অ্যাই তোকে মে’রেছে কেউ?
আদনান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে দেওয়ার মতো করে মাথা নেড়ে বললো,
– উ বুকা ডিচে
আদনান কেঁদে দিচ্ছে দেখে আহিল ওকে আদর করে বললো,
– আচ্ছা আচ্ছা কাঁদে না বাবা। চল বাসায় যাবো চকলেট দিব। কাঁদবি না হ্যাঁ?
চকলেট দিবে শুনে আদনান নাক টেনে বললো,
– আচ্চা
আহিল আবার ওর ফুলো গালে চুমু খেয়ে ওকে কোলে রেখেই গাড়ি স্টার্ট দিলো। অন্য সময় হলে আদনান গাড়ির সব ধরে ধরে দেখতো। অবাক চোখে সব কিছু পরক্ষণ করতো কিংবা আহিলকে আধো আধো বুলিতে অনেক কিছু বলতো। এই কয়দিনে আদনান সম্পর্কে ভালোই ধারণা হয়েছে আহিলের। আজকে বোধহয় ভালোই ভয় পেয়েছে তাই আহিলের বুকে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে মুখে কুলুপ এঁটে। আহিল গাড়ি চালাতে চালাতে ওর মাথায় চুমু খেয়ে বলল,
– পানি খাবে আদনান?

আদনান আহিলের কথার কোনো উত্তর দিল না। ও শুধু অলসভাবে মাথাটা হালকা দুপাশে নাড়িয়ে বোঝাল ও পানি খাবে না। মুখে রা নেই। আহিলের মন খারাপ হলো কিছুটা। ছেলেটাকে কি ভয় লাগিয়েছে? কেন যে করলো এমন! ওর চঞ্চল বাচ্চাটা শান্ত হয়ে গেছে! আহিল এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাত দিয়ে আদনানের কপালে জমে থাকা হালকা ঘামটুকু মুছে দিল। সে দ্রুত বাসায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে বাসায় ফিরে দেখে নওমি জেগে বসে আছে অস্থির হয়ে। করিডোর দিয়ে ঢুকতে দেখে আহিলের চাচা বললো,
– পেয়েছিস নাতিকে? কোথায় পেয়েছিস?
আহিল হাঁটা থামিয়ে দিলো না। হাঁটতে হাঁটতেই জবাব দিলো,

– যেখানে রাখা হয়েছিলো।
বলে গটগট পায়ে ভেতরে চলে গেলো। ওর এখন লক্ষ্য হলো নওমির কাছে যাওয়া। মেয়েটা পাʼগলই হয়ে যাবে এমন করতে করতে! সে দ্রুত রুমের সামনে যেতেই নওমির কান্নার শব্দ শুনতে পেলো। ওর মুখে শুধু একটাই কথা,
– আমার ছেলেটাকে এনে দিন আমি আর কিচ্ছু চাইবো না! ও আমাকে ছাড়া থাকেনি। কে নিলো ওকে!
আহিল শব্দ করেই দরজা খুললো। নওমির তবুও হেলদোল নেই। নয়না বেগম আহিলের কোলে আদনানকে দেখে বলে উঠলো,
– ওই তো আদনান! এই নওমি দেখ তোর ছেলে
নওমি তড়িৎ বেগে মাথা তুলে তাকালো। সত্যিই কী আদনান নাকি ওর সাথে প্রতারণা হচ্ছে? একটু আগেও তো স্বপ্না আদনান এসেছিলো। পরে ঘুম ভাঙতেই বুঝলো এটা স্বপ্ন। এবারও যদি এমন কিছু হয়? নওমির নড়চড়বিহীন স্তব্ধ রূপ দেখে নয়না বেগম আহিলের দিকে এগিয়ে গেলো। আহিল ইশারা করে আশ্বস্ত করে মুখে বললো,
– সব ঠিক আছে। তোমার রুমে যাও আমি সামলাচ্ছি ওকে। চিন্তা করো না।
– সেটাই ভালো বাবা।
নয়না বেগম আর আহিলের চাচি বেরিয়ে গেলে আহিল নওমির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নওমি একইভাবে তাকিয়ে আছে।

– নাও তোমার ছেলেকে এনে দিলাম।
আমি নওমির স্থির চাহনী দেখে আহিল আবার শুধালো,
– কী হলো? নিবে না? এইটা তোমার ছেলে, আদনান!
– ……
– নওমি! নওমি এটা সত্যিই আদনান! ছুঁয়ে দেখো!
আহিল এবার উঁচু কন্ঠে বলে উঠলো। নওমি যেন বাস্তবে টুপ করে পড়লো। সে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো। চোখ মুখ মুছে জিজ্ঞেস করলো,
– সত্যি আদনানকে এনেছেন? কোথায় পেয়েছেন ওকে? কোথায় ছিলো?
– এতো প্রশ্ন পরে করবে এখন নয়।
নওমি এগিয়ে এসে আদনানকে কোলে নিতে চাইলো কিন্তু আহিলের কোল থেকে আদনান মাথায় তুলছে না। বোঝায় যাচ্ছে খুব ভয় পেয়েছে বাচ্চাটা। নওমি ওর হাত টেনে বললো,
– আমার কাছে আসবে না বাবা? মায়ের কোলে আসো!
আদনান তড়িঘড়ি করে ওর হাত ছাড়িয়ে আহিলের গলা জড়িয়ে ধরলো। তা দেখে নওমি অসহায় চোখে তাকালে ওর চাহনী বুঝে আহিল ওকে আশ্বস্ত করতে বললো,

– হয়তো ভয় পেয়েছে। একটু পর ঠিক হয়ে যাবে তুমি অস্থির হয়ো না। একটু দাঁড়াও!
কিন্তু নওমির যে বুক পু’ড়ছে। ছেলেটা কোথায় ছিলো কোথা থেকে পেয়েছে কিছুই বলছে না। এদিকে আদনানকেও কোলে নিতে পারছে না। ও যে তৃষ্ণার্তের মতো ছটফট করছে ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে নেওয়ার জন্য! ছেলেটা আসছে না কেন? মা ওকে দেখে রাখে নি বলে অভিমান করেছে? নাকি বাবা খুঁজে এনেছে বলে বাবা ভালো মা ভালো না? কিন্তু তার যে শান্তি হচ্ছে না ছেলেকে পাওয়া পর্যন্ত! আহিলও বলছে শান্ত থাকতে! ওদিকে যাকে বুকে জড়িয়ে একটু শান্তি পাবে, সেই কলিজার টুকরোটাও মায়ের কোলে আসতে চাইছে না! নওমি আরেকবার ওকে আদর করে ডাকলো,
– আদনান? বাবা আসো? একটু আসো না মায়ের কোলে?
তবুও আদনান তো নওমির দিকে ফিরলই না উল্টো আহিলের গলাটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর চওড়া কাঁধে মুখ লুকিয়ে রাখল। ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে আহিলের শার্ট এমনভাবে খামচে ধরে আছে, যেন এক মুহূর্তের জন্য আলগা হলেও ও আবার হারিয়ে যাবে। বোঝাই যাচ্ছে, প্রচণ্ড আত’ঙ্কের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর বাচ্চাটা ভেতরে ভেতর মারা’ত্মক ভ’য় পেয়ে গেছে। নওমির এখন কান্না পাচ্ছে। অলরেডি চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। আহিল ওর অবস্থা বুঝতে পারছে। নওমিকে টেনে এক হাতে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললো,

– এই! এইটুকুতে কাঁদতে হয় নাকি? আদনান একটু পরই ঠিক হয়ে যাবে রে বাবা!
আহিলের কোমল কন্ঠে বলা কথা আর বুকে জড়িয়ে ধরায় নওমি আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। কেঁদে দিলো ঝরঝর করে। আহিলের শার্ট খামচে ধরে আহিলের বুক চোখের পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। আহিল কিছুটা থতমত খেলেও মুহূর্তেই বুঝতে পেরে হেসে ফেললো। এক হাতে ছেলে আরেক হাতে কান্নারত বউকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকলো সে। এতে অবশ্য খারাপ লাগলো না বরং ভালোই লাগলো যে মেয়েটার ছায়ার নাগাল পেতেও আহিলকে হাজার বার ভাবতে হতো, আজ নিয়তির কোন এক অদ্ভুত খেলায় সেই মেয়েটাই ওর বুকে আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে। এক হাতে নিজের অস্তিত্ব জুড়ে থাকা ছেলে, আর অন্য হাতে ভালোবাসার পুরো আকাশটাকে আগলে ধরে আহিলের মনে হলো পৃথিবীর সব যুদ্ধ জয় করা শেষ, এখন শুধু এই মুহূর্তটাকে স্তব্ধ করে রেখে দেওয়া যাক।
বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পরও নওমির কান্নার বেগ অবশ্য কমল না। ও অনবরত আহিলের বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে চলেছে। কতক্ষণের জমানো ভয়, আতঙ্ক যেন এই একটা নিরাপদ আশ্রয়ের ছোঁয়া পেয়ে বাঁধভাঙা বন্যার মতো গলে বেরিয়ে যাচ্ছে। আহিল পরম মমতায় নওমির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আলতো করে বলল,
– আর কত কাঁদবে? কান্না থামাও। আমি আদনানকে তোমার কোলে দিচ্ছি! ও একটু ভয় পেয়েছে তাই কে ডাকছে বুঝতে পারে নি বোধহয়।
আহিল ঘাড় ঘুরিয়ে আদনানের দিকে তাকালো। ওকে আদর করে ডাকল,

– আদনান? এই বাঘের ছানা? বাঘের ছানা এমন লুকিয়ে থাকে?
আদনান ধীরে ধীরে মাথা তুললো। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো মা আর বাবাকে। মায়ের কান্নারত মুখ দেখে কি বুঝলো কে জানে সে “মাআ” বলে হাত বাড়িয়ে দিল নওমির দিকে। নওমি আদনানের দিকে তাকাতেই মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে আদনান এবার ঠোঁট প্রসারিত করে ছোট্ট একটা হাসি দিল। নওমিও আলতো হেসে আদনানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। আহিল ওদের দিকেই তাকিয়ে ছিলো ওর ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে প্রশান্তির হাসি।
– নাও, তোমার কলিজার ভয় ভেঙেছে। এবার তোমার কোল ছাড়বে না!
নওমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। আহিলের কোল থেকে আদনানকে এক টানে নিজের কোলে নিয়ে নিলো। আদনানও এবার আর এতটুকু পিছিয়ে গেল না, ও মায়ের গলা দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ছোট ছোট পা দুটো নওমির কোমরে পেঁচিয়ে একবারে লেপ্টে রইল। নওমি বিছানায় বসে আদনানের সারা মুখে, কপালে, দুই গালে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল। ওর মনে হচ্ছিল, কত জনম পর ও যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া স্পন্দনটা ফিরে পেয়েছে। ওকে আদর করতে করতেই বিড়বিড় করল,

– কোথায় চলে গিয়েছিলে? আমার কলিজা ছাড়া আমি থাকতে পারি? আর কোথাও যেতে দিব না মায়ের কাছ থেকে!
নওমির চোখ দিয়ে এখনো পানি গড়িয়ে পড়ছে। আদনানকে বুকে জড়িয়ে নিলো। মায়ের বুকের ওম পেয়ে আদনান আরো সেটিয়ে গেল। মায়ের কোলে মুখ গুঁজে শান্ত হয়ে পড়ে রইলো। আহিল খাটের একপাশে বসে পরম তৃপ্তি নিয়ে মা-ছেলের এই ভালোবাসার দৃশ্যটা দেখছিল। নওমির ভরসার জায়গা রক্ষা করতে পেরেছে দেখে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। ফোনে কিছু মেসেজ ঘাটাঘাটি করে উঠে দাঁড়াল। নওমিকে এখনো আদনানকে কোলে নিয়ে বসে থাকতে দেখে বলল,
– এবার ওকে একটু ফ্রেশ করিয়ে দেওয়া দরকার নওমি। ওর গায়ে বাইরের ধুলোবালি লেগে আছে। ওর পেটে বোধহয় চড়া খিদেও আছে, সারা রাস্তায় মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিল। কিচ্ছু মুখে দেয়নি। সে কখন থেকে পেটে কিছু পড়ে নি।
আহিলের কথায় নওমির হুঁশ ফিরল। ও আদনানের ধুলোমাখা জামা আর উষ্কখুষ্ক চুলের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ভরে উঠল ওর। আসলেই তো, ছেলেটার যত্ন নেওয়া দরকার এখন! নওমি ওভাবেই আদনানকে কোলে নিয়ে বিছানা থেকে নামতে চাইল, কিন্তু তীব্র শারীরিক ক্লান্তি আর সিডে’টিভের রেশ থাকার কারণে ওর পা দুটো একটু টলে উঠল। আহিল চট করে ছুটে এসে নওমির কনুই ধরে ওকে সামলে নিল। নওমির কোল থেকে আদনানকে নিজের একহাতে তুলে নিল, আর অন্য হাত দিয়ে নওমিকে ধরে বিছানায় বসিয়ে দিল।

– তুমি বোসো। আমি ওকে ফ্রেশ করিয়ে দিচ্ছি তুমি এখনো দুর্বল। তুমি একটু আম্মুকে বলো ওর জন্য দুধ আর খাবার গরম করতে।
নওমি কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ল। আহিল আদনানকে কোলে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। যেতে যেতে আদনানকে ফিসফিস করে বলল, “কী রে বাঘের ছানা, আম্মির কাছে গিয়ে তো বাবাকে ভুলেই গেলি? চকলেটটা কিন্তু আমার পকেটেই আছে!”
আদনান আহিলের গলা জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল সেই চেনা, প্রাণবন্ত হাসি।
নওমি খুব দ্রুত খাবার নিয়েও এলো। আদনানকে নিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরোতেই নওমি আদনানকে বিছানায় বসিয়ে খাওয়াতে নিলো। আহিল একটু সরে এসে দাঁড়াল। একটু খেয়াল রাখলো ওদের উপর তারপর নওমি আদনানকে খাওয়াচ্ছে দেখে ও খুব সাবধানে কোমড় থেকে পিস্ত’লটা বের করে আলমারির তাক খুলে গোপন এক ড্রয়ারে রাখতে গেল। হঠাৎ পেছন থেকে শোনা গেল নওমির কণ্ঠ,

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৪

– ওটা কি? এভাবে ওই পাশে রাখছেন কেন?
আহিল চমকে উঠতেই নওমি মুখ চেপে বলে উঠল,
– অ’স্ত্র!!

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here