Home নূর ই মহব্বত নূর ই মহব্বত পর্ব ২৬

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৬

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৬
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী

– অ’স্ত্র!!!
নওমির উচ্চস্বরের আওয়াজে আহিল তড়িঘড়ি করে রুমের দরজা বন্ধ করে ওর দিকে এগিয়ে আসলো।
– আস্তে! কি করছো? চিল্লিয়ে সবাইকে জানাবে নাকি?
নওমি কাঁপতে কাঁপতেই চোখ বড় বড় করে বললো,
– ওটা… ওটা তো… এটা আপনার কাছে কি করে আসতে পারে?
আদনান ওদের দিকে তাকাচ্ছে। ওরা দুইজন কি বলছে তা বোঝার চেষ্টা করছে বোধহয়। আহিল একবার ওর দিকে তাকিয়ে বললো,

– তুমি আগে আদনানকে খাইয়ে দাও। ছেলেটার পেটে কিছু পড়েনি। আমি তারপর তোমাকে সব বলবো।
– না আগে বলেন। আপনি একজন ডক্টর, তাহলে আপনার কাছে কিভাবে এটা আসলো? আসলে আপনি কে? কি করেন এটা নিয়ে?
আহিল ছোট্ট করে শ্বাস ছেড়ে বললো,
– দেখে যখন নিয়েছো আমি কিছুই লুকোবো না। তুমি আদনানকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও আমি এসে সব বলছি তোমাকে। প্লিজ এখন আর কথা বারিও না। আদনানকে দেখো খুব ক্লান্ত লাগছে।
নওমি আদনানের দিকে তাকাল। আসলেই তো, বাচ্চাটার গোল গোল চোখ দুটো ঘুমে আর ক্লান্তিতে চুলে আসছে, তবুও ও মা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে সবটা বোঝার চেষ্টা করছে। আদনান কোথায় যেন বেরিয়ে গেল। নওমি নিজের ভেতরের কম্পন কমানোর চেষ্টা করে ওকে খাওয়ানোয় মনোযোগ দিল। বাটির শেষ চামচ ওকে খাইয়ে দিয়ে বললো,

– আরেকটু আনি?
আদনান মাথা নেড়ে বললো,
– কাবো না
নওমি ওর মুখ ধুয়ে দিয়ে ওকে বললো,
– তুমি শুয়ে থাকো মা চট করে আসছি হ্যাঁ?
আদনান মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝালো। পরপর বিছানায় গা এলিয়ে দিল। নওমি মলিন চোখে চেয়ে তা দেখলো। বাচ্চাটা বেশ নরম হয়ে গেছে। ও দ্রুত গিয়ে বাটি গ্লাস রান্নাঘরে রেখে আবার ফিরে এলো। আদনানের চোখ তখন ঘুমে ঢুলুঢুলু। নওমি ওকে ঠিকভাবে শুইয়ে দিয়ে ওর মাথার পাশে বসে চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আদনান গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। নওমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। এত কিছুর মধ্যেও আহিলের অস্বাভাবিক সেই সময়ের কথা মাথা থেকে যাচ্ছে না। সে আবার কোথায় গেল? এখনো আসছে না কেন? আহিলের থেকে জানতে না পারলে ওর ঘুম হবে না আজকে! একটু পর দরজা খোলার শব্দ হলো। তখন নওমির চোখ লেগে এসেছিল প্রায় কিন্তু মস্তিষ্ক তো তাড়া দিচ্ছে তাই ঘুমের মধ্যেও সে এসব ভেবে চলেছে। আহিল দরজা খুলে ভেতরে আসতেই দেখলো মা ছেলে ঘুম। নওমি এলোমেলো হয়ে আধশোয়া হয়ে ঘুমিয়ে আছে। আহিল হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে বিড়বিড় করে বললো,

– ঘাড় ব্যথা হয়ে যাবে যেভাবে শুয়ে আছে!
ও এগিয়ে এসে নওমিকে ধরে সোজা করে শুইয়ে দিতে গেলে ফট করে চোখ খুললো নওমি। আহিল কিছুটা অপ্রস্তুত হলো বটে! সে ওকে ছেড়ে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিকভাবেই বলল,
– এমনভাবে ঘুমাচ্ছিলে আরেকটু হলে ঢলে মেঝেতে পড়তে তাই ঠিক করে দিচ্ছিলাম।
বলতে বলতেই আহিল শার্ট খুলে অন্য শার্ট নেওয়ার জন্য আলমারি খুললো। নওমি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। আহিলের পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
– আপনি ওই টপিক এড়িয়ে যাচ্ছেন! আপনি কিন্তু বলেছেন ফিরে এসেই সব বলবেন!
আহিল না বোঝার মতো করে সুধালো,
– কোন টপিক?
এবার ক্ষেপে গেল নওমি। জ্বলে উঠে বললো,

– কি শুরু করেছেন আপনি? আদনানকে কোথায় পেয়েছেন তা তো বলেননি আবার আপনার কাছে পি’স্তল কিভাবে এসেছে সেটা বললাম আর নাটক করে যাচ্ছেন!
আহিল এবার ঘুরে দাঁড়াল। হাতের শার্ট কাঁধে ঝুলিয়ে বললো,
– নাটক করলাম কোথায়? আমি একজন সাধারণ নাগরিক আমার সুরক্ষার জন্য আমি এটা রাখতেই পারি।
নওমি অবাক হয়ে বলল,
– একজন সাধারণ নাগরিকের সুরক্ষার জন্য অ’স্ত্র?
আহিল ঠোঁট চেপে হাসছে দেখে নওমির রাগ লাগলো। মুখ কুঁচকে চলে আসতে গেলে হাত টেনে ধরলো আহিল। হেসে বললো,
– আচ্ছা আচ্ছা! বলছি তো! রাগ করতে হবে না। ঠান্ডা মাথায় গরম গরম চা খেতে খেতে বলি?
নওমি চোখ গরম করে তাকালো আহিলের একের পর এক নাটকীয় কথা শুনে। আহিল ভড়কে গিয়ে বলল,
– না থাক খালি মুখেই বলছি। এটলিস্ট বসো। বসে কথা বলি।
নওমিকে টেনে জোর করে বসিয়ে নিজেও বসল পাশে। হাসি মজা ছেড়ে ও এবার সিরিয়াস হলো। ওর চেনা ঠাট্টা তামাশার খোলসটা আস্তে আস্তে খসে পড়ে সেখানে ভর করল এক অদ্ভুত নির্লিপ্ত শান্ত ভাব। নওমি দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,

– আম্মু তো তোমাকে বলেছেই যে আমি এককালে রাজনীতি করতাম?
নওমি মাথা নাড়ল।
– যখন এডমিশন চলে তখন আমি এসব থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিলাম। লাইফে ক্যারিয়ার গড়তে হবে এই চিন্তায় হয়তো। যখন আমি মেডিকেলে চান্স পায় তখন আমি পুরোপুরি রাজনীতি থেকে দূরে। কিন্তু ওই যে রাজনীতি একটা নে’শা? ওই নে’শাটা তো র’ক্তে মিশে ছিল। পুরোপুরি কি আর মুছে ফেলা যায়? তবে মেডিকেলে ঢোকার পর রাজনীতির নোংরা মা’রপ্যাঁচে জড়ানোর ইচ্ছেটা ম রে গিয়েছিল। কিন্তু ক্রা’ইম ইনভেস্টিগেশন, হিউম্যান সাইকোলজি আর ফরেনসিকের প্রতি আমার একটা অন্যরকম মেধা আর মারাত্মক ঝোঁক ছিল।
এক নাগাড়ে কথাটা বলে একটু বিরতি নিলো সে। নওমি অপলক তাকিয়ে। তার চোখ বলছে সে পরের সত্যি জানার জন্য কৌতুহলী হয়ে আছে। আহিল আবার বললো,
– বছরখানেক ঝোঁকের বশে খুব জটিল কেসের ময়’নাত’দন্তের রিপোর্ট বা অপ’রাধীদের সাইকোলজি আমি নিখুঁতভাবে ধরার চেষ্টা করি। অন্যদের তুলনায় আমি কিছুটা এগিয়েও থাকি। এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে আমার এই স্কিলটা ক্রাইম ব্রাঞ্চের একটা স্পেশাল উইংয়ের নজরে আসে। যার কারণে সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পর ওরাই আমাকে আন্ডারকাভার হিসেবে একটা ‘স্পেশাল মেডিকেল সোর্স’ উইংয়ে হায়ার করে।
নওমি হা করে তাকিয়ে আছে। আহিল হেসে হাত দিয়ে ওর মুখ বন্ধ করে দিয়ে বললো,

– এবার মুখে মাছি ঢুকে যাবে।
নওমির হুঁশ ফিরলে সে স্বাভাবিক হয়ে বললো,
– আপনি প্রথম উহু দ্বিতীয় বর্ষে মানে ১,২,৩…
নওমিকে গুনতে দেখে হেসে ফেললো আহিল। ওর মাথায় হালকা করে টোকা দিয়ে বললো,
– বেশি না নয় বছর।
– নয়য়য় বছর আপনি এই গোপন কথা লুকিয়ে রেখেছেন?
আহিল কাঁধ উঁচিয়ে বললো,
– নয় বছর লুকাবো কেন? আমি যখন সেখানে ছিলাম তখন লুকিয়েছি এখন আমি এইসব কিছু করি না আমি একজন সাধারণ ডক্টর।
নওমি বুঝতে না পেরে অবুঝের মতো করে তাকালে আহিল আবার বললো,
– তখন আমি খুব মাঝামাঝি বা ছোট পদেই ছিলাম তবে আন্ডারকাভার এজেন্ট হিসেবে আমার নিরাপত্তার জন্যই অফিশিয়ালি এই লাইসেন্সড পি’স্তলটা আমাকে দেওয়া হয়েছিল। পেজ তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী । কিন্তু কয়েকমাসের মাথায় আমি এসব থেকে বেরিয়ে আসি একদম সাধারণ ডক্টর হওয়ার চিন্তা নিয়েই! তবে পুরোপুরি ছাড়িনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ওই ক্রাইম ব্রাঞ্চের বড় ভাইয়েরা যখন খুব জটিল কোনো কেসে আটকে যেত, তখন অফিশিয়ালি না হলেও অনফিশিয়ালি আমার সাহায্য নিতো বা আমাকে ডাকে তখন আমি না করতে পারি না।
নওমি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

– কিন্তু আপনি মাত্র কয়েক মাসের মাথায় অমন একটা রোমাঞ্চকর কাজ থেকে হুট করে কেন বেরিয়ে আসলেন?
আহিলের মুখের সেই হালকা হাসির রেখাটা নিমেষেই মিলিয়ে গেল। আহিল অত্যন্ত ভারী গলায় বলল,
– সেকেন্ড ইয়ারে থাকার সময় একটা আন্ডারকাভার মিশনে এমন একটা দুর্ঘ’টনা ঘটেছিল নওমি, যা নেওয়ার মতো মানসিক শক্তি তখন আমার ছিল না। মেডিক্যাল সোর্স হিসেবে আমার কাজ কিন্তু সরাসরি কোনো অপ’রাধী ধরা বা মা’রামা’রি করা ছিল না। আমার কাজ ছিল শুধু পর্দার আড়ালে থেকে তথ্য জোগাড় করা আর ফরেনসিক অ্যানালাইসিস করা। একদিন হঠাৎ করেই অন্য কোনো সোর্সের ভুলের কারণে পু’লিশ বা ক্রা’ইম ব্রাঞ্চের মেইন টিম সেখানে হুট করে হানা দেয় আর অপরা’ধীরা যখন চারদিক থেকে কোণঠাসা, তখন ওখান থেকে পালাতে ওরা এলোপাতাড়ি গু লি চালাতে শুরু করে। ওই ক্র’সফা’য়ারের মাঝখানে পড়ে যায় আমারই মেডিকেল কলেজের এক ক্লাসমেট, যে ওই এলাকার একটা ফার্মেসিতে পার্ট-টাইম কাজ করত।
বলে একটা ঢোক গিললো তারপর আবার বললো,

– অপ’রাধীদের ছোঁ’ড়া একটা বু’’লেট সোজা এসে ওর বুকে লাগে। আমার একদম চোখের সামনে ও ছটফট করে মাটিতে লুটিয়ে প’ড়েছিল। একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট হিসেবে যার মূল ধর্ম মানুষের জীবন বাঁচানো, অথচ সেদিন একজন সাধারণ ছাত্র হিসেবে আমার কাছে ওকে বাঁচানোর মতো পর্যাপ্ত জ্ঞান বা মেডিকেল ইকুইপমেন্ট কোনোটাই ছিল না। চারদিকে তখনো গু লির শব্দ হচ্ছে, আমার কোমরে পি স্তল গোঁজা, অথচ আমার চোখের সামনে আমারই বন্ধু র’ক্তক্ষ’রণ হয়ে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে গেল! আমি আমার এই হাত দুটো দিয়ে ওর ক্ষ’তস্থান চেপে ধরেও ওর প্রাণটা আটকে রাখতে পারিনি।
আহিল একটু থামল। ওর কণ্ঠস্বর হালকা কেঁপে উঠল পরের কথা বলতে গিয়ে,

– ওই তীব্র অসহায়ত্ব, অপরা’ধবোধ আর ট্র’মা আমি নিতে পারিনি নওমি। নিজের প্রতি এক তীব্র ঘৃণা জন্মে গিয়েছিল যে যে অ’স্ত্র মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, তা আমার কোমরে জ্বলজ্বল করছে, অথচ যে বিদ্যা দিয়ে মানুষের জীবন বাঁচানো যায়, তা তখনো আমি পুরোপুরি শিখতেই পারিনি! ওই রাতেই আমি আন্ডারকাভারের আইডি কার্ড আর পি স্ত লটা নিয়ে এসে আলমারির এই গোপন ড্রয়ারে লক করে দিই। ডিপার্টমেন্টকে জানিয়ে দিই, আমি আর পারছি না। সেই থেকে আমি কেবলই একজন সাধারণ ডাক্তার হয়ে, মানুষের জীবন বাঁচিয়ে নিজের ভেতরের সেই পুরোনো ক্ষ’ত আর অক্ষমতার প্রায়শ্চিত্ত করার চেষ্টা করে গেছি।
কথাগুলো শেষ করে আহিল হুট করে উঠে দাঁড়াল। নরমসরম রূপ উবে গিয়ে ওর চেহারায় ভর করল হিংস্র চাহনি,

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৫

– কিন্তু আজ… আজ যখন আমার কলিজার টুকরো আদনানকে কেউ এভাবে ছিনিয়ে নিয়ে গেল, তখন আমার প্রতিজ্ঞার দেয়াল এক সেকেন্ডে ভে ঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে নওমি! নিজের সন্তানের সুরক্ষার জন্য, তাকে অক্ষত তোমার কোলে ফিরিয়ে আনার জন্য আমি এমন হাজারটা প্রতিজ্ঞা এক লহমায় ভেঙে আবার সেই পুরোনো আহিল হয়ে যেতে পারি! আমার তেজ আগের মতোই আছে! শুধু আমি সেসব লুকিয়ে রাখি!

নূর ই মহব্বত পর্ব ২৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here