নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৬
জান্নাতুল ফেরদৌ
প্রকৃতি নিজের সর্বোচ্চ টুকু ঢেলে দিয়েছে প্রবল বর্ষণে। গগণ কাঁপিয়ে বজ্রপাত হচ্ছে। সুনেহেরার লম্বা জামার নিচের অংশ কাদায় মাখামাখি। সবুজ ঘাসের ওপর একের পর এক পা ফেলে ছুটে চলেছে ঝড় – জল উপেক্ষা করে। পানিতে পা পড়ে পড়ে ছিটকে উঠছে পানি। গায়ের ক্ষত জায়গা গুলো পানির স্পর্শ পেয়ে দগদগে হয়ে উঠেছে। জ্বালাও করছে ভীষণ। সেসবের পরোয়া না করে সুনেহেরা ছুটে চলেছে নদীর পাড়ের দিকে। সেই লোক টা বলেছিলো মাহাদি কে এখানেই ছেড়ে গেছে। দুহাতে জামা মাটি থেকে খানিকটা উঁচু করে ধরে সে ছুটছে। ঝড়ের তোপে সামনের সব কুয়াশার মত ঝাপসা লাগছে। সন্ধ্যাও হয়ে গেছে। চারিদিকে নেমে আসছে অন্ধকার। সবুজ সমারোহ পেরিয়ে পা পৌছালো নদীর বালু তে। চারিদিকে বৃষ্টির দরুন কিচ্ছু স্পষ্ট বোঝা যায় না। তার সোনালি চুল গুচ্ছ ভিজে লেপ্টে আছে। কোথাও কোনো জন মানবের চিহ্ন নেই। সুনেহেরা দুই হাত গেল করে মুখের সামনে নিয়ে চিৎকার করে ডাকে
“মাহাদিইইইইই!”
তার চিৎকার বারি খায় চারিদিকে। ধ্বনি পাল্টা ফিরে আসে কানে। মাহাদি তো সাড়া দেয় না। ফের ডাকলো
“মাহাদি কোথায় আপনিইইই? মাহাদি? দেখুন আপনার জাহ্নবী এসেছে। মাহাদিইই?”
মাহাদির রেশ মাত্র পাওয়া যায় না। সুনেহেরা ধপ করে বসে পড়ে নদীর কিনারায়। ঢেউ এসে ধাক্কা দেয় তার গায়ে। চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো আকাশের দিকে মুখ করে।
“ও মাহাদি ফিরে আসুন। সাহাবাদ আপনাকে ডাকছে মাহাদিইই। আপনার জাহ্নবী আপনাকে ডাকছে। আপনি সেদিন বলেছিলেন যুদ্ধ শেষ হলেই আমাকে ভালোবাসি বলবেন। আপনি এভাবে হারিয়ে যাবেন নাআআআআ”
বৃষ্টির তোড় অল্প কমলো। চারিদিকে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ কানে আসছে না তার। হঠাৎ চোখ গেল অদূরেই এক জায়গা পাশাপাশি তিনটে পাথর বড় আকারে। তার ওপর সন্ধ্যার আবছা আলোয় লাল রঙের কিছু চোখে পড়ছে। একটু যেন আশার আলো পেলো সুনেহেরা। দ্রুত উঠে পড়লো। দৌড়ে সেটার কাছে গিয়ে দেখলো লাল পাথর বসানো একখানা র’ক্তলাল পোষাক। মেয়েদের পোষাক। তার ওপর রাখা ছোট্ট একটা সোনার মুকুট। দীর্ঘক্ষণ ভেজায় সাদা হয়ে যাওয়া হাত দুটো ভালো করে ছুয়ে দেখলো মুকুট খানা। পাশে একটা লাল গোলাপ রাখা। তাতে বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির কণা লেগে আছে। সাথে রাখা আরেকটা চিঠি। কাগজের ধরন টা আলাদা, বৃষ্টি তেও নষ্ট হয়নি। আর না লেখা গুলো মুছেছে। সুনেহেরা পানি ঝেড়ে চিঠি টাতে চোখ বোলায়। গাঢ় লাল কালিতে লেখা
“অস্তিত্ব চোরাবালির গহিনে তলিয়ে গেলেও,
অন্তরে আপনি চিরজীবন থাকবেন শাহজাদী”
পৃষ্ঠার ওপিঠে লেখা বেশ কয়েকটা লাইন
“এই মহল আমায় কোনো দিনও ছাড়বে না। এক অদৃশ্য টানে আমরা একে অপরের সাথে বাধা। যুগ যুগ ধরে আমার অস্তিত্ব ঘুরপাক খাবে গোটা সাহাবাদ জুড়ে। আজ আমি এক ছায়া, ধরা দিব না কারোর তরে। সাহাবাদ মনে রাখবে নারীদের ছলনা। সাহাবাদ মনে রাখবে অপর নারীর আত্মত্যাগ, মনে রাখবে একজন যোগ্য সম্রাজ্ঞী এই রাজ্যের হাল ধরেছিলো। ছোট্ট মুকুট খানা মামনি সাহারার। ফুল টা আমার ফুলের জন্য, পোষাক খানাও তারই। আজ বৈশাখের ১ তারিখ। আপনি আমার প্রেমে পড়েছিলেন। আমি কবে পড়েছি তা তো জানি না। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সাহাবাদ আর আপনার ভালেবাসা। আমি জানি আমার শোক আপনাকে ছুতে পারবে না। আপনি যে মহান, অপরাজেয়।
লেখা ফুরায়। সুনেহেরার পলক পড়ে না। দূরে ভাসতে দেখা যায় মাহাদির মাথার বর্ম খোলস।
সুনেহেরা নির্বিকার চেয়ে থাকে সেদিকে। মাহাদি সত্যিই ধরা দিল না। জিনিস গুলো হাতে নিয়ে পা টেনে টুনে চলল মহলের দিকে। কে জানে প্রেমিক কি এমন ইঙ্গিত দিল যে সব পাগলামি মুহূর্তেই গায়েব।
যুদ্ধ শেষ হয়েছে তাও বেশ সময় হলো। সাহাবাদের মাটিতে বিজয়ের আনন্দের চেয়ে শোকই বেশি ভারী হয়ে নেমে এসেছে। সূর্য ডুবে গেছে। পশ্চিম আকাশে রক্তিম আভাটুকুও মিলিয়ে যাচ্ছে। আহতদের সেবা করছে হেকিম রা। সৈন্যরা নিহতদের দেহ একত্র করছে। সুনেহেরা নদীর পাড় থেকে ফিরে আসলো। সারাটা পথ যেন যন্ত্রের মতো হেঁটেছে। হাতে মাহাদির রেখে যাওয়া জিনিস গুলো। ফুলটা পোষাকে মুড়িয়ে নিলো। এমন অবস্থায় ফুল হাতে ঢোকা যে বেমদনান। যুদ্ধক্ষেত্রের কাছে এসে আচমকাই তার পা থেমে গেল। কয়েকজন সৈন্য মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা দেহ। কী এক অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠলো সুনেহেরার। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সে। একজন সৈন্য কাপড়টা সরিয়ে দিল। পরমুহূর্তেই সুনেহেরা এক চিৎকার দিয়ে বসে পড়লো লা”শের সামনে।
“মিরান…মি..মিরা? এই মিরা”
কাঁপা হাতে ছুঁয়ে দিল তার মুখ। ঠান্ডা, একদম ঠান্ডা।
“উঠ…ওঠ না…এই মিরা ওঠ না। এই তুই অসময়ে কি করে যাস মিরান? এই মিরান”
তার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো।
“তুই তো বলেছিলি যুদ্ধ শেষ হলে আমাকে আবার জ্বালাবি। বলেছিলি বুড়ি হয়ে গেলেও আমার পেছনে লাগবি। এখন চুপ করে আছিস কেন? আমার বিয়েতে রান্না করবি না তুই? এই মিরা? মিরআআআ”
মিরান কোনো জবাব দিল না। সুনেহেরা হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো।
“তুই উঠ! উঠ বলছি! তুই নিজের গোটা জীবন সাহাবাদ এর জন্য উৎসর্গ করেছিস। আজ বিজয় এসেছে। তুই কি করে চলে যাস?”
দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যদেরও চোখ ভিজে উঠলো। সুনেহেরা শিশুর মতো কাঁদতে লাগল। তার কান্নার শব্দ নিস্তব্ধতায় আরও করুণ শোনাচ্ছিল।
অনেকক্ষণ পর কয়েকজন নারী সৈন্য এসে তাকে সরালো। মিরানের দেহ নিয়ে যাওয়া হলো। সুনেহেরা দাঁড়িয়ে রইলো। চোখদুটো ফুলে গেছে।
তখনই তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো আরেকটা দেহের ওপর। সাদা কাপড়ে ঢাকা। মুখটা খোলা। সুনেহেরার বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে উঠলো। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সে। আবিদের মুখটা অদ্ভুত শান্ত। মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে আছে। সুনেহেরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে বসে পড়লো পাশে। কত বছর ধরে মানুষটাকে চেনে সে? মনে করতে পারলো না।
তবে একটা জিনিস সে জানতো, যা কখনোই আবিদ কে বুঝতে দেয় নি। আবিদ তাকে ভালোবাসতো। কখনো মুখ ফুটে বলেনি। কখনো নিজের সীমা ছাড়ায়নি। কখনো তাকে অস্বস্তিতেও ফেলেনি। সুনেহেরা সব বুঝতো সব। কিন্তু সে কখনো বুঝতে দেয়নি যে সে বুঝে গেছে।
কারণ তার মনটা অনেক আগেই মাহাদির কাছে হারিয়ে বসেছিল। সেই জায়গায় আর কাউকে বসানোর কথা সে কোনোদিন ভাবেনি। আজ মৃত আবিদের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বুকের ভেতর কেমন একটা অপরাধবোধ জেগে উঠলো।
ধীরে ধীরে তার কপালের কাছে হাত রাখলো সুনেহেরা।
“আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন নায়েব মশাই। অথচ আপনার নিয়তিই এমন করুন হলো। ওই ঘাতকিনী কে আমি ছাড়বোই না। আমি নিজে শাস্তি দিব ওদের।”
বাতাসে গা কাপছে ঠান্ডায়। সুনেহেরা মাথা নিচু করে বসে রইলো। ভালোবাসা সবসময় পাওয়া যায় না। আর সব ভালোবাসার গল্পও পূর্ণতা পায় না। কিছু কিছু মানুষ সারাজীবন নীরবে ভালোবেসে যায়। কোনো দাবি ছাড়াই কোনো প্রতিদান ছাড়াই। তারপর একদিন চলে যায়। আর পেছনে ফেলে যায় শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস। একটা অপূর্ণতার বেদনা। এক জীবনের আফসোস।
মেহেরুন্নেসা আর বাইজিদ গেছে মেয়েদের আনতে। ঘোড়া এসে থামল তখন। শাখা কে সুস্থ দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সুনেহেরা। শাখা ঘোড়া থেকে নেমেই দেখলো বাবার খাটিয়া। কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে আকড়ে ধরলো খাটিয়ার লোহা। ছোট্ট হাতে বাবার মুখটা আগলে নিয়ে কাঁদতে লাগল
“ও বাবা তুই কথা বলছো না কেন বাবা? ও বাবা ওঠো নাআআ। আম্মা, আম্মা? বড় মা আম্মা কোথায়? আমার বাবা কথা বলছে না কেন?”
বাইজিদ শাখা কে কোলে নিলো। জান্নাতও কাদছে। বাচ্চাদের এখানে না রাখাই ভালো। নিয়ে গেল তাদের।
রাত অনেক গড়িয়ে গেছে। সাহাবাদ প্রাসাদের কারাগার আজ আবারও পূর্ণ। অঙ্কুরের পরাস্ত বাহিনীর কিছু অংশ আর কয়েকটা বিশ্বাস ঘাতক।
মারজান কে রাখা হয়েছে সবচেয়ে ভিতরের শেল টায়। এই নারী বছরের পর বছর ধরে এই রাজ্যের অন্ধকারের আড়ালে বিষবৃক্ষের মতো বেড়ে উঠেছিল। কারাগারের ভেতর মশালের আলো দপদপ করে জ্বলছে। পাথরের স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে সেই আলো পড়ে আরও ভয়ংকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বাইজিদ আর মেহেরুন্নেসা সেই কক্ষটার দিকে এগিয়ে এলো। সৈন্যরা দরজা খুলে দিল।
লোহার শিকের ওপারে বসে আছে মারজান।
হাত বাঁধা। চুল এলোমেলো। তবুও তার চোখের সেই অহংকার যায়নি। মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। দুনিয়ায় এত নিকৃষ্ট মানুষও আছে? এই নারীটার জন্য কত জীবন নষ্ট হয়েছে। কত পরিবার ভেঙেছে।
ওদের দেখে বলল
“আবার কি জন্যে এসেছো আমার কাছে?”
বাইজিদ গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“আর কী কী করেছো তুমি? সবটা বলো। আজ সব জানতে চাই আমি। কোনোদিন তোমায় প্রশ্ন করিনি। কথা বলার রুচি হতো না। আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি।”
মারজান হাসলো।
“আর জেনে কি হবে? যা হওয়ার সব তো হয়ে গেছে। এখন কি চাইলেও কিছু ঠেকাতে পারবে? নাকি ফিরিয়ে আনতে পারবে? অহেতুক কথা বাড়ানোর দরকার নেই। ফিরে যাও। আমি কারাগারে আছি, মৃত্যুদণ্ড দাও, যে শাস্তি খুশি দাও। মেনে নিয়েছি। মাথা পেতে নিয়েছি।”
মেহেরুন্নেসা ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে
“তোমার মত মহিলা আমি দ্বিতীয় টা দেখিনি। এত নিকৃষ্ট তুমি?”
মারজান মাথা তুলে তাকালো। হো হো করে হেসে উঠলো
“তাহলে শোনো। মাইমুনাকে দিয়ে শুরু করছি। বাইজিদ তোমার মা মাইমুনা শেখ আমার ভাতিজি হয় সম্পর্কে। আমি মারজান শেখ, আফজাল শেখের একমাত্র বোন। সেই সুবাদে মাইমুনা আমার ভাতিজি। আমার বিয়ে হয় দূর দেশের এক বণিকের সাথে। কিন্তু ও আমাকে মোটেও ভালোবাসতো না, সবসময় খারাপ ব্যবহার করত অত্যাচার করত কষ্ট দিত আমায়। কিশোরী বয়স থেকে স্বপ্ন দেখেছি রানীর মত হয়ে থাকার। সেখানে চাকর এর যোগ্য ছিলাম না আমি এমন অবস্থায় রেখেছিল আমাকে। উল্টো তোমার দাদা আমাদের এলাকায় ভ্রমণে গিয়ে পছন্দ করে বসে মাইমুনাকে এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে ঠিক করে জমিদার গিন্নি বানিয়ে নিয়ে আসে।”
সময় বিরতি নিল মার জন ফের বলতে শুরু করল
“মাস খানিক পরেই আমাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। চারিদিকে লোকজনের অপমান আর অবমাননা। বাড়ির লোকের অবহেলা আমার আর সহ্য হচ্ছিল না তখন আমি ফাদ পেতে বসি বাকির শাহ কে ফাঁসানোর। সেই সময়টাতে আমার আলাপ হয় অংকুরের বাবা শেহরাম পাটোয়ারীর সাথে।
তার ঠোঁট কাঁপলো।
“বাকের শাহ্ ওকে ভালোবাসতো। ভীষণ ভালোবাসতো।”
মারজানের চোখে বহু বছরের জমে থাকা হিংসা রা নাড়া দিয়ে উঠলো।
“আমি যতবার ওদের দেখেছি, ততবার আমার মনে হয়েছে ওই জায়গায় আমার থাকা উচিত। তাই একদিন আমি সিদ্ধান্ত নিই মাইমুনা কেই….”
মেহেরুন্নেসার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“তুমি…?”
মারজান নির্বিকার।
“হ্যাঁ।”
“ তারপর?”
বাইজিদ প্রশ্ন করলো।
“তারপর আমি বাকের শাহ্ এর কাছে আসার পথ তৈরি করি। রাজ্য পাবো ক্ষমতা পাবো সবকিছু আমার হবে।”
তার হাসি মিলিয়ে গেল।
“অথচ পেলাম কী? কিছুই না। বাকের শাহ্ কখনো আমাকে সেই চোখে দেখেনি। তার হৃদয়ে সবসময় মাইমুনাই ছিল।”
কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠে ক্লান্তি ফুটে উঠলো।
“মৃত একজন নারীকে আমি কোনোদিন হারাতে পারিনি। বাকের সব সময় জ্বলে পুড়ে যেত শুধু ওকে মনে করে। এবার বলবে তো? আমাকে কেন বিয়ে করল? আমি তাকে এমন ভাবে ফাসিয়ে ছিলাম, আমাকে বিয়ে না করে উপায় নেই। আমি তাকে জানিয়েছিলাম তার সন্তান আমার গর্ভে। তাতে কোন কাজ হলো না পরবর্তীতে মাইমুনাকে খুনের অপরাধে তাকে এমন ভাবে জড়ালাম, আমি চাইলেই প্রমাণ করতে পারতাম সে নিজে আমায় মাইমুনা কে খুন করেছে। তারপর আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য হলো”
মেহেরুন্নেসা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো। মারজান আবার বলতে শুরু করলো।
“এরপর অঙ্কুর এলো। ওর ভেতরেও ছিল ক্ষমতার লোভ। আর আমার ছিল সাথে প্রতিশোধের আগুনও। আমরা একসাথে কাজ শুরু করলাম।
বাইজিদের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো।
“চিকিৎসকদের অপহরণ? গবেষণা, মানুষের ওপর ভয়ংকর সব পরীক্ষা। অঙ্কুর মেধা কে স্বার্থ হাসিলের কাজে লাগাতে চেয়েছিল। আর আমি ক্ষমতা চেয়েছিলাম। বলতে পারো এজন্যই আমরা সীমা ভুলে গিয়েছিলাম।”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর মারজান মাথা নিচু করলো।
“জানো মেহেরুন্নেসা… আমি সবসময় তোমাকেও ঘৃণা করি”
মেহেরুন্নেসা ভ্রু কুঁচকালো।
“কেন?”
“কারণ তুমিও সুখী ছিলে। সাধারণ ঘরের মেয়ে হয়েও তুমি সম্রাজ্ঞী হয়েছো। তাই তোমাকে দেখলেই মাইমুনার কথা মনে পড়তো।”
বাইজিদ ঘুরে দাঁড়ালো। দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে সে বললো,
“তুমি রাজ্য চেয়েছিলে। ক্ষমতা চেয়েছিলে। অন্যের সুখ কেড়ে নিতে চেয়েছিলে। শেষ পর্যন্ত তুমি কিছুই পাওনি, কারণ নসিব সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক এটা কাউকে ঠকিয়ে কিংবা জোর করে আদায় করা যায় না”
মারজান কোনো উত্তর দিল না। মেহেরুন্নেসাও আর কিছু বললো না। দুজন বেরিয়ে এলে কারাগারের দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল।
আর ভেতরে একা বসে রইলো মারজান। এক বিশাল রাজ্যের জন্য যে নারী নিজের জীবনটা অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গী হয়ে রইলো শুধু শূন্যতা।
কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পর অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বললো না। রাত তখন গভীর।
প্রাসাদের করিডোরে মশালের আলো দপদপ করে জ্বলছে। দূরে প্রহরীদের হাকডাকের শব্দ ভেসে আসছে। সকালে আবিদ আর মিরানের জানাজা।
মেহেরুন্নেসার মাথার ভেতর এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে মারজানের স্বীকারোক্তি। সবকিছু যেন একটা ভয়ংকর জালের মতো জড়িয়ে আছে।
সে ধীর কণ্ঠে বললো,
“একটা কথা এখনও বুঝলাম না।”
বাইজিদ তার দিকে তাকালো।
“কী?”
“অঙ্কুরের উত্তরের প্রাসাদ প্রয়োজন ছিল গবেষণা চালানোর জন্য ও সেটা পেয়েও গেছিল। তবুও মহলে কেন বারবার আসতো?”
বাইজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“অঙ্কুরের সঙ্গে আমার একটা চুক্তি ছিল।”
করিডোরের খোলা জানালা দিয়ে রাতের ভেজা বাতাস ঢুকছে হু হু করে।
“তখনও আমি জানতাম না ও কতটা ভয়ংকর কাজ করে। শুধু জানতাম, কিছু বিদেশি চিকিৎসক আর গবেষককে নিয়ে ও গোপনে কাজ করছে। আর সেই কাজের কথা রাজ্যের সাধারণ মানুষ জানতে পারলে ভয় পেয়ে যাবে।”
মেহেরুন্নেসা মন দিয়ে শুনতে লাগলো।
“ তাই শর্ত হয়েছিল, মাঝে মাঝে আমি গোপনে জাহাজের ব্যবস্থা করে দেব। যাতে লোকগুলোকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরিয়ে নেওয়া যায়। আর রাজ্যের মানুষের চোখে কিছু না পড়ে।”
মেহেরুন্নেসার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠলো।
“আপনু তখন জানতেনই না তারা কী করছে?”
“পুরোটা জানতাম না।”
বাইজিদ শান্ত গলায় উত্তর দিল।
“সন্দেহ ছিল। কিন্তু প্রমাণ ছিল না। আমি প্রমাণ আনার জন্য ওর ধারে কাছে ঘেষতে পারিনি। অর্ষা আর রুবায়েতকে ও বন্দী করে রেখেছিল তারপর একদিন এক সমস্যা হলো।”
“কী সমস্যা?”
“প্রবল ঝড় উঠেছিল নদীতে। আমি জাহাজের ব্যবস্থা করতে পারিনি। নির্ধারিত সময়ে তাদের মালামাল সরানো সম্ভব হয়নি। পরে জানতে পারলাম সেই মালামালের মধ্যে ছিল বিরল কিছু ওষুধ আর গবেষণার উপকরণ। সময়মতো না সরানোয় সেগুলোর অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। অঙ্কুরের বিশাল ক্ষতি হয়েছিল।”
কণ্ঠটা আরও ভারী শোনালো।
“সেই দিন ও মনে করেছিল আমি ইচ্ছে করে ওর ক্ষতি করেছি।
“তারপর?”
“তারপর ও প্রতিশোধ নিতে চাইল”
মেহেরুন্নেসা চুপ করে শুনছে। বাইজিদ দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বললো,
“এক রাতে আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে এসেছিল নিজেই। সঙ্গে ছিল না কেউই।
মেহেরুন্নেসার বুক ধক করে উঠলো।
“তারপর?”
বাইজিদ এবার সরাসরি মেহেরুন্নেসার দিকে তাকালো। চোখে ক্রোধ।
“সেদিন আমি মহলে ছিলাম না। বিদেশি বণিক দের সাথে সাক্ষাৎ এর জন্য রওনা হলাম রাতেই। ও আমাকে মারতে এসে তোমাকে দেখেছিলো।”
মেহেরুন্নেসা ভ্রু কুঁচকে ফেললো।
“আমাকে?”
“হ্যাঁ। দুদিন পর ও আমার কাছে তেমাকে চেয়ে বসে”
মেহেরুন্নেসা অস্বস্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিল।
বাইজিদ বললো,
“আমাকে হত্যা করার ইচ্ছে তখনও ছিল। কিন্তু তোমাকে পাওয়ার ইচ্ছেটা তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল। এরপর থেকেই সে তোমাকে নিয়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তোমাকে পাওয়ার জন্য। তোমাকে নিজের করার জন্য। বার বার আসতে থাকে মহলে।”
তার কণ্ঠে ঘৃণার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠলো। মেহেরুন্নেসা জড়সর হয়ে বাইজিদ এর পাশে বসে বলল
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৫
“শাহজাদা আমি একটা ভুল করে ফেলেছি। আমি…”
দৌড়ে এলো একজন প্রহরি। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল
“জাহাঁপনা, বন্দী চন্দ্রপ্রভা উন্মাদ এর মত আচরণ করছে। নিজের মাথা নিজেই ঠুকছে দেওয়ালে”
