নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২৫
রূপন্তী সরকার
রিদের মুখে ওই খোঁচা মারা কথাটা শুনেও ঋষভ এবার একটুও রাগ দেখাল না।
ও প্লেট থেকে শেষ খাবারের লোকমাটুকু মুখে পুরল।
তারপর রিদের চোখের দিকে তাকিয়ে একদম শান্ত গলায় বলল, “না, রাগ করব কেন? ভালোই করেছ। আমি বেঁচে থাকতে কোনোদিনও ওই মেয়েটাকে আমার বউ বলে মানব না,”
কথাটা বলেই ঋষভ চেয়ার টেনে ধীরপায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। রিদের মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ভার হয়ে গেল। ও ভেবেছিলো এই কথা শুনলে ঋষভ হয়তো রেগেমেগে পুরো বাড়ি আবার মাথায় তুলবে, কিন্তু ছেলের এমন শান্ত ভাব দেখে ও বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো।
মিহিও পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ সব দেখল, কিন্তু কোনো কথা বলল না।
এইদিকে…
“প্লিজ জ্যোতি, তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করো না। আমি তোমাকে সত্যিই অনেক ভালোবাসি রে”
শুভ্রর কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ওপাশ থেকে ঠাস করে কলটা কেটে দিল জ্যোতি। জ্যোতি খুব ভালো করেই জানে শুভ্র এখন শুধু শুধু নাটক করছে। বাবা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে এই বিয়েটা করতেই হবে, শুভ্রর মতো একটা চরিত্রহীন ছেলের আশা করে বসে থাকলে তার জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে। শুভ্র যে কোনোদিন তাকে নিয়ে সিরিয়াস ছিল না, এটা জ্যোতি ভালো করেই জানে।
ফোনটা কেটে যাওয়ার সাথে সাথেই শুভ্র রাগের মাথায় হাতের ফোনটা সজোরে ফ্লোরে ছুঁড়ে মারল। ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে, কিচ্ছু ভালো লাগছে না। এতদিন যদিও জ্যোতিকে হালকাভাবেই নিয়েছিল,
কিন্তু আজ যখন শুনল জ্যোতির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে ও অন্য কারও হয়ে যাচ্ছে তখনই শুভ্রর মনের ভেতর এক অদ্ভুত অশান্তি শুরু হয়ে গেল। ও নিজের চুলগুলো খামচে ধরে ওখানেই মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ল।
ঠিক এমন সময় রুহি শুভ্রর ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ভেতরে উঁকি দিতেই ও দেখল শুভ্র মাটিতে বসে একমনে জানালার বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, চোখের কোণে জল।
রুহি আর দাঁড়িয়ে না থেকে গুটিগুটি পায়ে ভেতরে ঢুকে শুভ্রর পাশে ধপ করে বসে পড়ল।রুহি শুভ্রর পিঠে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,
“কী রে ভাইয়া? কী হয়েছে তোর? মুখটা বাংলার পাঁচের মত করে রেখেছিস কেন?
শুভ্র এবার রুহির দিকে একদম অসহায়ের মতো তাকাল। রুহি আলতো করে শুভ্রর গালে হাত দিল, শুভ্র আর নিজের কান্না চেপে রাখতে পারল না। ও রুহির হাত জড়িয়ে ধরে একদম বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল
রুহি শুভ্রকে একটু হাসানোর জন্য বলল,
“এই! এমন ভেড়ার মতো ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছিস কেন? বলবি তো আসল কাহিনী কী?”
শুভ্র চোখ মুছতে মুছতে একদম শুরু থেকে জ্যোতির সাথে ওর প্রেম আর আজকের এই সব ঘটনা খুলে বলল। সব শুনে রুহি শুভ্রর মাথায় ঠাস করে একটা থাপ্পড় মারল। তারপর বলল, “একদম ঠিক হয়েছে তোর সাথে। তুই একসাথে দুইটা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরে বেড়াবি, আর জ্যোতি এখন নিজের লাইফে অন্য কোথাও বিয়ে করে নিলেই দোষ, তাই না? উচিত শিক্ষা হয়েছে তোর। তোর মতো পাঠার সাথে এমনই হওয়া উচিৎ”
শুভ্র এবার রুহির হাত দুটো ধরে একদম বাচ্চাদের মতো করে বলল,
“আমি কসম খাচ্ছি আমি বাকি সব মেয়েদের ব্লক করে দেব, সব ছেড়ে দেব। আমার শুধু আমার জ্যোতিকে লাগবে। এনে দে না?”
রুহি শুভ্রর এই ছটফটানি চুপ হয়ে গেলো।ও সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করল,
“জ্যোতির বিয়েটা কবে রে?”
শুভ্র মাথা চুলকাতে চুলকাতে আমতা আমতা করে বলল, “আজকেই”
রুহি একটু ভেবে আবার জিজ্ঞেস করল, “বিয়েটা ঠিক কখন?”
শুভ্র মুখ কালো করে বললো “রাতে”
রুহি মুচকি হেসে শুভ্রর কাঁধে হাত দিয়ে বলল,
“চিন্তা করিস না। আমরা আজকে বউ চুরি করব!”
শুভ্র রুহির দিকে গোলগোল চোখে তাকিয়ে বলল,
“মানে? কী বলছিস এসব?”
রুহি শুভ্রর কাছে এসে ওর কানে কানে ফিসফিস করে কিছু প্ল্যান বলল। প্ল্যানটা শোনার পর শুভ্রর চোখ মুখ এক সেকেন্ডে উজ্জ্বল হয়ে গেলো।
এরপর দুইজন একসাথে চিল্লিয়েবলে উঠল, “ইয়েস! এবারের মিশন বউ চুরি!”
উঠোনে ইয়াশফা চুপচাপ বসে আছে। ওর চারপাশ ঘিরে বসে আছে কিসমিস, বাঘা, পিপাই আর ম্যাও ম্যাও।
ইয়াশফার পেটের ভেতর তখন খিদেয় চোঁ চোঁ করছে, কারণ বেলা তিনটা বেজে গেছে। সকালে খেয়ে বের হয়েছিলো। গ্রামে আসার পর থেকে মা এক ফোঁটা খাবারও দেয়নি। ইয়াশফাও নিজে থেকে যেচে খেতে চায়নি। ও খুব ভালো করেই জানে, খাবার চাইলেই একগাদা কথা শুনতে হবে, যেটা ওর ভালো লাগবে না।
ঠিক এমন সময় ভেতর থেকে ইয়াশফার মা হনহন করে বেরিয়ে এলেন। ওনার হাতে একটা পুরোনো স্টিলের থালা, যাতে সামান্য একটু শুকনো ভাত আর নামমাত্র একটু ডাল দেওয়া। তিনি ইয়াশফার সামনে এসে থালাটা এক প্রকার ছুঁড়ে দিলেন। থালার ধাক্কায় কিছু ভাত ছিটকে নোংরা মাটিতে পড়ে গেল।তিনি মুখ বাঁকিয়ে বললেন,
” গিলে থালটা ভালো করে ধুয়ে রাখিস। আমি ঘুমাতে গেলাম। তোর বাপ আসলে বলিস আমি ঘুমাচ্ছি, আমাকে যেন না ডাকে!”
কথাটা বলেই তিনি ঘরে চলে গেলেন। ইয়াশফা ওনার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি হাসল। এসবে তো ও ছোটবেলা থেকেই অভ্যস্ত নতুন কিছু না। আজকে তো তাও ওর মা দয়া করে এইটুকু খেতে দিয়েছে, এর আগে যে কত দিন কত রাত না খেয়ে কাটিয়েছে, তার তো কোনো হিসেব নেই!
ইয়াশফা নিজের মচকানো হাতটা সামলে বাম হাত দিয়ে ভাতটা আস্তে আস্তে মাখল। এক লোকমা করে মেখে বাঘা, পিপাই আর কিসমিসদের মুখে তুলে দিল, আর সামান্য একটু নিজে মুখে পুরল। খাওয়া শেষ করে ও উঠোনের পাশে টিউবওয়েলের পাড়ে গিয়ে পেট ভরে অনেকটা পানি খেল, এরপর এক হাত দিয়েই প্লেটটা সুন্দর করে মেজে ঘরে রেখে এল।
কিছুক্ষণ পর ইয়াশফার বাবা বাড়ি ফিরলেন। বাবাকে দেখামাত্রই ইয়াশফা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, এক ছুটে গিয়ে উনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
উনার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। এই মেয়েটা ছাড়া উনার এই দুনিয়ায় আপন বলতে আর কেউ নেই। কতবার যে ভেবেছেন মেয়েটাকে নিজের কাছে এনে রাখবে, কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি।
তিনি ইয়াশফার কপালে একটা চুমু দিয়ে বললেন,
“কখন এসেছেন আম্মা? কিছু খেয়েছেন?”
ইয়াশফা বাবার চোখ মোছাতে মোছাতে মাথা নাড়িয়ে করেই ‘হ্যাঁ, আমার না আপনার সাথে অনেক অনেক গল্প আছে বাবা!”
এরপর বাপ বেটি উঠোনের এক কোণে বসে কতক্ষণ ধরে সুখ দুঃখের গল্প করল। গল্প শেষে ইয়াশফা নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে বাবার জন্য খাবার বেড়ে নিয়ে এল।
মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পেরেছে মেয়ে অসুস্থ অ
উনি প্লেটের সবটুকু ভাত নিজের হাতে মেখে এক লোকমা এক লোকমা করে ইয়াশফাকে খাইয়ে দিতে লাগলো।
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২৪
ঋষভ সারাদিন বাড়িতে ছিলো না। সব জায়গায় অশান্তি লাগছে। রাত বাজে ১১ টা। ঘরে এসেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। মাথা ব্যাথা করছে ওর। এরমধ্যেই রুহি, অদ্রীত আর শুভ্র হুরমুর করে ঋষভের ঘরে ঢুকলো। ঋষভ আড়চোখে ওদের দিকে তাকালো। শুভ্র এসে ঋষভের পায়ের কাছে বসে অসহায়ের মতো বললো ” ভাই চল না আমাদের সাথে”
ঋষভ ভ্রু কুঁচকে বললো “কোথায়?”
রুহি হেসে বললো “শুভ্রর বউ চুরি করতে”
ঋষভের খুব রাগ হলো ওর মন এমনিতেই খারাপ। ঋষভ মুখ ফোসকে বললো “আমার বউ আমাকে ছেড়ে চলে গেছে আর আমি অন্য কারো বউ চুরি করতে যাবো?”
