Home নেশাক্ত প্রহর (মিহি সিজন ২) নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২৭

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২৭

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২৭
রূপন্তী সরকার

ভোরে আলো ফুটতেই ইয়াশফার ঘুমটা ভেঙে গেল। জানালার বাইরে তাকাতেই দেখল বেশ মিষ্টি রোদ উঠেছে। ঘড়িতে তখন খুব বেশি হলে সকাল সাতটা বাজে। ইয়াশফা বিছানা ছেড়ে উঠতেই হুট করে ওর নজর গেল পাশের টেবিলের ওপর। ওখানে একটা কালো রঙের রিস্টওয়াচ রাখা। এটা তো ঋষভের ঘড়ি! কিন্তু এই ঘড়ি এখানে কীভাবে আসল? ইয়াশফা একটু চমকে উঠে চারপাশটা ভালো করে দেখল, কিন্তু কোথাও তো ঋষভ নেই! তাহলে ওর ঘড়িটা এখানে কী করছে?

ইয়াশফা টেবিলের কাছে গিয়ে ঘড়িটা হাতে নিয়ে কপালে কুঁচকে বিড়বিড় করে বলল, “এইটা তো জাওড়া বেডার ঘড়ি, এখানে কীভাবে আসল? নাকি আমিই থেকে আসার সময় ভুল করে নিজের ব্যাগে ভরে নিয়ে এসেছি?”
এসব সাত পাঁচ ভাবার মাঝেই ইয়াশফার মা ধুপধাপ পা ফেলে ওর ঘরে এসে ঢুকলেন। ইয়াশফাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই উনি কিছুটা চেচিয়ে বললেন
“এখন ঘুম ভাঙল তোর? কতো বেলা হয়েছে দেখেছিস? নাকি শহরে বিয়ে হয়েছে বলে নিজেকে খুব জমিদার ভাবছিস? এখানে এসব হবে না। আর সব বাসনকোসন গুলো কে মাজবে শুনি? তোর বাপ? তাড়াতাড়ি যা, কলপাড়ে একগাদা বাসন পড়ে আছে, সব মেজে দিয়ে আয়!”
ইয়াশফা কোনো কথা না বাড়িয়ে বাধ্য মেয়ের মতো কলপাড়ে চলে গেল বাসন মাজার জন্য।
সে কলপাড়ে পিঁড়ি পেতে বসার সাথে সাথেই কোত্থেকে যেন পিপাই আর কিসমিস উঁকিঝুঁকি মেরে এসে ওর পাশে বসে পড়ল।

ইয়াশফা থালাবাসন মাজতে মাজতে ওদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “কী রে! এত সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়েছিস তোরা? আর বাকি বিচ্ছুগুলো কই? ওদের দেখতে পাচ্ছি না কেনো?”
কিসমিস তখন ইয়াশফার কোলের কাছে এসে ওর গালে নাক ঘষতে ঘষতে ইশারা করে উঠনের দিকে কিছু একটা দেখানোর চেষ্টা করল। ইয়াশফা সেদিকে তাকাতেই দেখলো বাঘা, ম্যাও আর বাকিরা সব একদল হয়ে উঠোনের এক কোণে গোল হয়ে বসে আছে,
ইয়াশফা মুচকি হাসল।বাসন মাজা শেষ করে ইয়াশফা এক হাত দিয়েই পুরো উঠোনটা ঝাড়ু দিল, তারপর ঘরগুলোও মুছে ফেলল। এক হাত দিয়ে এত কাজ করায় মচকানো হাতের ব্যথাটা আবার একটু চাড়া দিয়ে উঠেছে, তবে কালকের চেয়ে আজকে ব্যথাটা অনেকটাই কম।সব কাজ শেষ করে ইয়াশফা ঘরে গিয়ে দেখল ওর মা একাই সকালের নাস্তা খাচ্ছেন। ইয়াশফার নিজেরও ভীষণ খিদে পেয়েছে। কালকে রাতে ওকে কেউ খাবার খাওয়ার জন্য ডাকে নি। খেতেও দেয় নি।

আর ও নিজেও যেচে কিছু খেতে চায়নি। কিন্তু এই সকালবেলা খিদের চোটে পেটের ভেতর এমন অবস্থা যে মনে হচ্ছে যে হাতের কাছে যা পাবে ও সেটাই এক নিমেষে গিলে ফেলবে।
ইয়াশফা আর সহ্য করতে না পেরে ওর মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বেশ নরম গলাতেই বলল, “মা, আমার খুব খিদে পেয়েছে। খাওয়ার মতো কিছু হবে?”
মহিলা কোনো উত্তর দিলেন না। ইয়াশফাকে যেন দেখতেই পাননি এমন একটা ভাব করে নিজের মতো করে গপগপ করে খেয়েই যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর খাওয়া শেষ করে উনি হাত মুছতে মুছতে ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকালেন। ঝাঁজালো গলায় বললেন, “তোর পেটে কি কচ্ছপ ঢুকেছে নাকি? সবসময় এমন খাই খাই করলে তো আমি তোকে গিলতে দিতে পারব না! আমি এখানে কোনো খাবারের ভাণ্ডার খুলে বসি নি।”

কথাটা শুনে ইয়াশফার মাথায় এবার তরতর করে রাগ চড়ে গেল। ও তো এই বাড়িতে আসার পর থেকে একটা দানাও মুখে তুলতে চায়নি, কালকে সারারাত না খেয়ে কাটানোর পর একটা মানুষের সকালে খিদে পাওয়াটা কি খুব অপরাধ নাকি? ইয়াশফা নিজের ভেতরের সবটুকু ক্ষোভ চেপে রাখতে না পেরে একটু চড়া সুরেই বলল,
“আমি কখন খাই খাই করি শুনি? এই বাড়িতে আসার পর থেকে তো তুমি আমাকে একটুও ঠিক করে খেতে দাও নি! তবুও তো আমি কিছু অথচ আমার শ্বশুর কালকে কতগুলো টাকা দিয়ে গেল তোমাকে। কেমন মানুষ তুমি? এতটা জঘন্য কীভাবে হতে পারো? টাকাগুলো হাতে পেয়েই সব ভুলে গেলে? আস্ত একটা লোভী মহিলা তো তুমি!”
ইয়াশফা এক নিঃশ্বাসে গটগট করে নিজের মনের সব ক্ষোভ উগরে দিল। আসলে ওর যখন সহ্যের সীমা পার হয়ে যায়, তখন আর হিতাহিত জ্ঞান থাকে না একদম তরতর করে সত্য কথাগুলো সব মুখের ওপর বলে দেয়। পরে যা হবে দেখা যাবে।

ইয়াশফার মা থালা থেকে হাত ধুয়ে বাঘের মতো তেড়ে এলেন ইয়াশফার দিকে। কোনো কথা না বলেই ঠাসস করে একটা সজোরে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন ইয়াশফার গালে। ইয়াশফার চুলের ঝুঁটি ধরে ওখানেই ঠাস ঠাস করে আরও কয়েকটা চড় মারলেন।ইয়াশফা একটুও নড়ল না, একদম পাথরের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে মারগুলো সহ্য করতে লাগল। ও খুব ভালো করেই জানত ও কথা বললে ঠিক এমনই হবে, কারণ ছোটবেলা থেকে এই বাড়িতে ওর সাথে এমনটাই হয়ে এসেছে। ইয়াশফাকে কোনো কথা বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে মহিলা মারতে মারতেই চেঁচাতে লাগলেন,

“আমার সাথে চোপা নাড়াতে আসিস না। বিয়ে দিয়ে দিছি ঝামেলা শেষ, তুই আবার আমাদের ঘাড়ে পড়ে মরতে এসেছিস কেন? এই দুনিয়ায় আর অন্য কোনো জায়গা নাই তোর মরার জন্য? আমার বাড়িতে থাকবি আবার আমার মুখে মুখে কথা বলবি? তোর শশুরকে কি আমি বলেছিলাম টাকা দিতে?”
কথাগুলো বলে ইয়াশফার চুলের মুঠি ধরে মহিলা যেই না আবার মারতে যাবেন কোত্থেকে যেন ঝড়ের গতিতে ঘরে ঢুকল ঋষভ! ও এক ঝটকায় উনার হাত শক্ত করে চেপে ধরল এরপর ইয়াশফা কে এক টানে নিজের বুকের উপর ফেললো।
ঋষভ কটমট করে তাকালো ইয়াশফার মায়ের দিকে। চোখ দিয়ে আগুন ঝড়ছে। সাহস কতো বড়ো ওর বউয়ের গায়ে হাত তুলে। ইয়াশফা ঋষভকে দেখে চমকে গেলো। ও জানতো না ঋষভ এসেছে। ঋষভ তেড়ে গিয়ে ঘরের বাসন রাখার টেবিলটা এক লাথি দিয়ে ফেলে দিলো। বাসনের শব্দে ইয়াশফার মা চোখ বন্ধ করে নিলো। ঋষভ তেড়ে এলো ইয়াশফার মায়ের দিকে
ঋষভ ইয়াশফার মায়ের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আপনার সাহস হয় কী করে ওর গায়ে হাত তোলার? এরপর থেকে কোনোদিন যদি ওর গায়ে একটা আঁচড়ও পড়ে, আমি কিন্তু আপনার কলিজা ছিঁড়ে কাঁচাই খেয়ে ফেলব বলে দিলাম!”

ইয়াশফার মা একটু চুপ হয়ে গেলো। হুট করে কি যে এই ছেলেটা চলে আসবে বুঝতে পারে নি। উনি জোর করে একটা মুচকি হাসি দিলো। এরপর আমতা আমতা করে বললেন, “বাবা কখন এসেছো তুমি? বসো বসো।”
ইয়াশফা ঋষভের দিকে তাকিয়ে বুঝলো এখন না থামাকে এই বেডা আরো ভাঙচুর শুরু করবে। যেই রাগচোটা স্বভাব। ইয়াশফা এই কয়েকদিনে ওকে ভালো ভাবে চিনেছে। ইয়াশফা আর চুপ করে থাকতে পারল না। ও এক হাত দিয়ে ঋষভের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ঋষভ আড়চোখে ইয়াশফার দিকে তাকাল, ইয়াশফা চোখ দিয়ে ইশারা করে ওকে আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করতে বলল। ইয়াশফার এই ইশারা দেখে ঋষভ নিজেকে সামলে নিল, বউ মানা করেছে এখন ঝগড়া করে লাভ নেই।
ও আর কোনো কথা না বাড়িয়ে গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে সোজা বাইরের দিকে চলে গেল।ইয়াশফা তখনও ঘরের ভেতর চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ঋষভ বাইরে চলে যেতেই ওর মা আবার বিষাক্ত চোখে তাকালেন ইয়াশফার দিকে। ইয়াশফাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তুই ইচ্ছে করে ওকে এখানে ডেকে এনেছিস, তাই না? আমাকে ওর কাছে ছোট করার জন্য? এত শেয়ানা হয়েছিস তুই?”
ইয়াশফা ওনার এই ফালতু কথার কোনো জবাব দিল না। ও গুটিগুটি পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে একবারে উঠোনে চলে আসল। কাল দূপুরে একটু খেয়েছিলো এরপর থেকে সারারাত আর আজ সকাল থেকে পেটে একটা দানা পানি পড়ে নি।

পেটের ভেতরের খিদের জ্বালাটা ও আর সহ্য করতে পারছিল না। উঠোনে হাঁটতে হাঁটতে হুট করেই ওর চোখ গেল মাটিতে পড়ে থাকা একটা আধখাওয়া শুকনো রুটির দিকে। এটা কালকে পিপাই না খেয়ে ফেলে রেখেছিল।ইয়াশফা ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে মাটির ওপর থেকে ওই শুকনো রুটিটা হাতে তুলে নিল। ও রুটিটার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ ধরে একা একাই ভাবল এই ফেলে দেওয়া নোংরা রুটিটা ও মুখে তুলবে কি না। কিন্তু খিদের পেটে তখন আর কোনো বিচার বুদ্ধি কাজ করছিল না কথাই আছে, খিদে পেলে বাঘেও ঘাস খায়! ইয়াশফা আর কিছু না ভেবে রুটিটা থেকে একটুখানি ছিঁড়ে নিজের মুখে পুরে দিল।

এরমধ্যেই উঠোনে হুরমুর করে ঢুকে পড়ল ঋষভ। ওর দুই হাত ভর্তি একগাদা খাবারের প্যাকেট! ও এসে ইয়াশফার কোলে সব খাবারগুলো রাখলো। অনেক রকমের চিপস, পাউরুটি, বিস্কুট আর কয়েকটা কাপ নুডুলস।
গ্রামের ছোট দোকানগুলোতে এই সকালবেলা খুব বেশি খাবার পাওয়া যায় না, বেশির ভাগ দোকানপাট তখনও খোলাই হয়নি। ঋষভ গ্রামের একটা ছোট মুদি দোকানে গিয়ে হাতের কাছে যা যা পেয়েছে সব একবারে তুলে নিয়ে এসেছে। দোকানের কোনো একটা খাবারও ও বাদ রাখেনি, ইয়াশফা অবাক হয়ে ঋষবের দিকে চেয়ে রইলো এই লোকটা কি ওকে রাক্ষস ভাবে নাকি? খিদে পেয়েছে এটা সত্যি তাই বলে এতো খাবার খেতে পারবে? এগুলো দিয়ে তো একটা দোকান দেওয়া যাবে। ঘর থেকে ইয়াশফার মা দৌড়ে আসলো। উনার চোখ চরক গাছ। মনে মনে বললো “বাপরে বাপ! ভালোই বশ করেছে ছেলেটাকে।”

ঋষভ ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে বললো “খাও তাড়াতাড়ি। চিপস গুলো পড়ে খেও আগে এসব খাও”
ঋষভ একটা চেয়ার টেনে ইয়াশফার সামনে বসলো। ইয়াশফা খেলো। পেট প্রায় ভরে গেছে। পিপাই বাঘা কিসমিস ম্যাও সবাইকেই দিয়েছে।

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২৬

ইয়াশফার পেট ভরলেও ঋষভের মন ভরে নি। ও আবারো গেলো দোকানে। এখন প্রায় অনেক কয়েকটা দোকান খুলেছে। ওই দোকান গুলো থেকেও যা পেয়েছে সব তুলে এনেছে। হাতে জায়গা না থাকায় গাড়িতে করেই নিয়েছে। এতো খাবার ডেখে ইয়াশফার মাথা ঘুরছে। ও ঠিক ধরেছে এই শালা একটা পাগল। ইয়াশফা ঋষভের দিকে তাকিয়ে বললো “এতো গুলো খাবার কোনদিক দিয়ে ঢুকাবো?”

নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২৮

1 COMMENT

  1. Plz api taratari porbota deu please please 🥺🥺🥺 aaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaaapiiiiiiiiiiiiiiiiiii pleeeeeeeeeeeeeeeeeeeeeaaaaaaaaassseeeeeeee

Comments are closed.