পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৪
ঈশিতা রহমান সানজিদা
অন্ধকার পেরিয়ে যখন আলো আসে, তখন সেই আলো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও এতটুকু অন্ধকার এর অস্তিত্ব রাখে না। ঠিক এমনটাই ঘটেছে নূরের জীবনে। সে আশা ছেড়ে দিয়ে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো। আপনজনদের কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাকে বাঁচিয়ে রাখার অনুপ্রেরণা যোগাল। কাকলি ওষুধ নিয়ে মাত্রই ফিরলো। নূরকে ধরে ওষুধ খাওয়ালো। নূর মৃদু হেসে বললো,’আমাকে শুধু শুধু এতগুলো দিন আটকে রাখলে তোমরা। কি লাভ হল বলো?’
‘সেটা তোর,,’ কথা আটকে গেছে কাকলির। নূর ফের হাসে। বালিশে মাথা রেখে বার কয়েক চোখের পলক ফেলে। জোরে জোরে শ্বাস ফেলে বলে,’একটা কথা বলব? তুমি কিছুক্ষণের মধ্যেই এখান থেকে পালিয়ে যাও। আমি চাইনা তোমার কোন ক্ষতি হোক। আর পারলে ভালোর পথে ফিরে এসো।’
‘কি?’
‘তোমার ফোন।’ হাত বাড়িয়ে ফোনটা এগিয়ে দিতেই কাকলি ভয় পেয়ে গেল। শরীর দুলে উঠলো,’তুই কারে ফোন দিছোস?’
‘আমার স্বামী কে, এতক্ষণে বোধহয় কাছাকাছি চলে এসেছে। তুমি তো প্রায় ঘন্টাখানেক বাইরে কাটিয়ে এলে।’
কাকলি বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। তার কি এখন পালানো উচিত? নাকি এখনই নূরকে মেরে ফেলা উচিত? কিন্তু এই মেয়েটির সাথে খারাপ কিছু করার হুকুম মেলেনি ওর। শুধু ভয়ের বশে আটকে রেখেছে। নাহলে সেই কবেই ছাড়া পেয়ে যেতো নূর। নূর বলে উঠলো,’তুমি এখনই পালাও, তোমার নামটা কখনো আমি বলব না। যে আমার সাথে অন্যায় করেছে তাকেই শাস্তি দেব।’
আজ নূর বলেই যাচ্ছে। কম সময় নয়, পুরো পাঁচটা মাস। নূর বলে,’আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি কাউকে কিছু বলব না। তবে আমার স্বামী কে কষ্ট দিয়েছে এবং আমার পরিবার কেও। তাকে কি করে ছেড়ে দেই? প্রতিটি দিন আমি হিসেব করে রেখেছি। লোভ মানুষকে কে কতখানি অমানুষ করে দিতে পারে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ আমি। তুমি এখুনি পালাও।’
কাকলি পরিমরি করে দৌড়ে পালায়। দরজা হাট করে খোলা। নূর খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে। ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবে। মানুষ দিন দিন অমানুষে পরিণত হচ্ছে। বড় বড় শ্বাস ফেলে সে। ওষুধ খাওয়ার পরেও কষ্ট হচ্ছে খুব। জ্বরটা অনেক দিন ধরে, ডক্টর দেখানো ছাড়া শুধু ওষুধে কি কমে। চোখ জ্বলছে খুব।
রফিকুল সাহেবের কাছে ফোনকল আসতেই সে ছুটে বেরিয়ে গেল। দ্রুত ট্র্যাকিং করা হলো উক্ত নাম্বারের। লোকেশন অনুযায়ী তারা এগোতে লাগলো। শহর থেকে প্রায় ঘন্টাখানেক দূরত্ব। গ্রামটিতে ঘনবসতি থাকলেও কিছুদূর যাওয়ার পর বাড়ির সংখ্যা কমে গেল। বিল এলাকা, বেশ দূরত্ব এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ির। রফিকুল যখন তার টিম নিয়ে পৌঁছায় আজমাঈন তখনও রাস্তায়। নারায়ণগঞ্জ এসে পৌঁছায় নি। তবে মাঝপথে আজমাঈনকে ফোন করে চূড়ান্ত লোকেশন দিয়ে দেওয়া হয়। আজমাঈন ফয়েজ কে জানিয়ে দিলে সেও রওনা হয়।
পাঁচতলা বাড়িটি পুরোপুরি ঘেরাও করা হয়। বাড়িওয়ালা নেই, তিনি এখানে থাকেন না। তবে নিচ তলার একজন ব্যক্তি কে বলা হলে তিনি বলেন,’এই বাড়িতে তেমন লোকজন থাকে না। সে। স্থানীয় স্কুলে যারা চাকুরী করেন তারাই ভাড়া থাকেন। আমরা আর দুই ফ্যামিলি এখানকার স্থানীয়।’
রফিকুল সাহেব বলেন,’এখানে একজন মেয়েকে আটকে রাখা হয়েছে এই ব্যাপারে কিছু জানেন?’
লোকটি ভারি অবাক হলো,’আমরা এমন তো দেখিনি?’
‘দেখেন নি, নাকি দেখেও না দেখার ভান করেছেন? মেয়েটি এখন কোথায়?’
লোকটি ভয় পেয়ে জানায়,’আমি সত্যি জানি না।’
‘তাহলে সরুন, বাড়িটা চেক করব।’
দুই গাড়ি ভর্তি পুলিশ ফোর্স নিয়ে এসেছেন রফিকুল সাহেব। প্রতিটা ফ্লোর খুঁজে দেখলেন। যেসব রুম তালাবদ্ধ ছিলো সেগুলো খুঁজে দেখলো। যখন তারা পাঁচ তলায় পৌঁছায়, দেখতে পায় দরজা খোলা। একজন নারী অফিসার বলেন,’ওরা কি বুঝতে পেরে গেছে? মেয়েটাকে নিয়ে চলে গেল নাকি?’
সবার মুখটা কেমন থমথমে হয়ে গেল। এবার মেয়েটাকে না পেলে রফিকুলের চাকুরী শেষ। গত কয়েক মাস কিভাবে কাটিয়েছে সে নিজেও জানেন না। কোন প্রমাণ বিহীন কাউকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। তবুও চেষ্টা করে গেছেন। আজ নূর ফোন না দিলে হয়তো তাকে খোঁজা সম্ভব হতো না।
আজমাঈন অনেক দেরিতে পৌঁছায়, ওর আগে ফয়েজ পৌঁছে গেছে। সে দরজা রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে। কাউকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। আজমাঈন কে দেখেই সরে দাঁড়াল। আজমাঈন দেখলো ভেতরটা অন্ধকার, দ্রুত পকেট থেকে ফোন বের করে ফ্লাশ অন করলো। খাটের উপর জড়সড় হয়ে বসে আছে নূর। হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসা। মাথা তুলছে না সে, মেয়েটার ভাবগতি বোঝা যাচ্ছে না। এটা আদৌও নূর তো? পরপর কয়েকবার শুকনো ঢোক গিলে খাটের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়ায়। চৈত্রের খড়ার ন্যায় শুকিয়ে আসা গলা তুলে বলে,’রেহনুমা জান্নাত, নূর!’
বসে থাকা মানবি স্থবির হয়। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায়। নীলচে বর্ণ ধারণ করে ঠোঁটজোড়া। গাল লাল হয়ে আছে। যত্নের অভাবে মুখটা মলিন হয়ে গেছে। চোখ জ্বালা করছে, খুলে রাখা দায়। আজমাঈনের কন্ঠস্বর বুঝতে পারলেও চেহারা দেখা যাচ্ছে না। ওর দিকটা অন্ধকারে ঘেরা। কিছুক্ষণ আগে কয়েক পুলিশ ভেতরে এসেছিল। সেই থেকেই হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে ছিল নূর। পুরুষ, মহিলা কারো সামেনি যাবে না বলে মনস্থির করেছিল। ফয়েজ বলেছিল আজমাঈনের জন্য অপেক্ষা করতে। সে ব্যতীত নূরকে এখান থেকে বের করা কষ্টসাধ্য।
আজমাঈন ফোনটা খাটের উপর ফেলে নূরের মুখোমুখি বসেই হঠাৎ নূর আক্রমণাত্মক হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ঝাপটে ধরলো আজমাঈন কে। আজমাঈন যেন জীবনে শান্তি ফিরে পেলো। নূরকে শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরলো। গুমোট ভাবটা কেটে গেল, নূর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কথা বলতে পারছে না। আজমাঈন নূরকে বুক থেকে তুলে গালে হাত রাখে। বলে,’দেখা দিতে এতো সময় লাগলো, বোধহয় কত যুগ ধরে অপেক্ষা করছি।’
নূর কথা বলে না। তার শরীর উত্তপ্ত। আজমাঈন বুঝতে পারে। নূরকে কোলে তুলে নেয়, আর নূর মুখ লুকায় আজমাঈনের বুকে। সবাইকে উপেক্ষা করে পাঁচতলা থেকে নিচে নেমে আসে। আজ সাথে ড্রাইভার নিয়ে এসেছে। নূরকে নিয়ে গাড়িতে চেপে বসে বললো,’হসপিটালে নিয়ে চলো।’
এতক্ষণে নূরের বিষয়টা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। রাশেদ সাহেব চেয়েছিলেন মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে আসতে। কিন্তু আজমাঈন সাফ সাফ না করে দেয়। নূরকে সে আর কিছুতেই একা ছাড়বে না। জীবনের বাকি দিনগুলো ওকে আজমাঈন নিজের সঙ্গে রাখবে। রাশেদ সাহেব ইচ্ছে করলে তাকে আজমাঈনের বাসায় নিয়ে যাওয়া হবে। তাছাড়া এখন নূরের অবস্থা শোচনীয়। জ্বরের তীব্রতায় গায়ে হাত রাখা যাচ্ছে না। আজমাঈন বুকে চেপে ধরে রেখেছে। নূরের চোখ বন্ধ। ঘনঘন শ্বাস-প্রশ্বাস উঠানামা করছে। আজমাঈন তার এক ডক্টর বন্ধুকে ফোন করে সব জানিয়ে রেখেছে। ওরা যাওয়া মাত্রই ডক্টর দেখলেন নূরকে। জ্বর মেপে তার মাথা হ্যাং হয়ে গেল। দ্রুত সিবিসি, এক্সরে সহ কয়েকটি টেস্ট দিলেন। রিপোর্ট দেখার পর ওষুধ লিখে দিবেন। আজমাঈন সময়টা দেখে নিলো, সন্ধ্যা সাতটা বাজে। কিছু সময়ের জন্য কেবিন বুক করলো। একজন নার্স কে পাশে রেখে বের হলো। ফয়েজ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে। আজমাঈন কে দেখতেই বলে উঠলো,’এখন কি অবস্থা?’
আজমাঈন মাথা নাড়ে,’আগের মতোই।’
‘অফিসার নূরের সাথে কথা বলতে চাচ্ছে, যদি ও সুস্থ থাকে বা একটু ভালো লাগলে আসতে চাচ্ছেন।’
‘দরকার নেই, হাশেম আঙ্কেল কে কল করে বলে দিয়েছি এখন যাতে ওকে কোনো ভাবেই বিরক্ত না করে। ওকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত হতে হবে।’
‘নূর কি বলতে পারবে সবকিছু? কে বা কারা ওর সাথে এসব করলো?’
আজমাঈনের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে,’আমি আমার নূরকে পেয়ে গেছি, এরপর মেইন কালপ্রিট কে খুঁজে বের করা অসম্ভব কিছু নয়। উপযুক্ত শাস্তি সে পাবেই পাবে।’
ফয়েজ চলে যেতে নিলে আজমাঈন বলে,’রিপোর্ট পেলেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। তুই বরং বাসায় চলে যা।’
‘আমি যাব না। নিচে আছি, ডক্টর কি বলে দেখি।’
তিন ঘন্টার মধ্যেই সমস্ত রিপোর্ট চলে আসে। নূরের নিউমোনিয়া হয়েছে, এজন্য গলাব্যথা, কাশি এবং নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ডক্টর ওষুধ লিখে দিলো।
নূরকে সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে। তানাজের নরমাল ডেলিভারিতে ছেলে হয়েছে। ওরাও বাসায় চলে এসেছে। বলতে গেলে বাড়ি ভর্তি মানুষ। সবাইকে উপেক্ষা করে আজমাঈন নিজের রুমে পা রাখলো। আইশা ছুটে এসেছে। সে নূরকে দেখা মাত্রই অঝোরে কাঁদছে। ওর এক হাত চেপে ধরে আছে। কিন্তু নূর হুঁশে নেই। বলতে গেলে সে বেহুঁশ প্রায়। জ্বরের তোপে চোখ খুলতে পারছে না। বাড়ির সকলে চুপচাপ এসে দেখে গেল। আজমাঈনের দিকে তাকিয়ে সকলের কথাই বন্ধ হয়ে গেছে। ইশারা ছাড়া ঠোঁট নাড়ছে না কেউ।
সবাই চলে যাওয়ার পর দরজা বন্ধ করে দিলো আজমাঈন। নূর তখনও শুয়ে আছে। আজমাঈন আস্তে করে ডাকলো। বললো,’খুব খারাপ লাগছে? চেঞ্জ করতে হবে তো।’
ক্লান্ত চোখজোড়া মেলে নূর। উঠে বসার চেষ্টা করতেই আজমাঈন ধরে ওঠায়। জড়িয়ে ধরে রাখে। নূর বলে,’আমি পারব।’
‘আমি করিয়ে দিচ্ছি, এখন যদি বলো প্রবলেম হবে তাহলে জোর করব।’
নূর আজমাঈনের কাঁধে মাথা রাখে,’আপনাকে বাঁধা দেওয়ার শক্তি নেই।’
‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব?’
‘হুম।’
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৩
‘এই কিডন্যাপিংয়ের পেছনে কারণ হাত আছে জানো?’
নূর কিছুক্ষণ চুপ থাকে। নামটা উচ্চারণ করলে ঝড় বয়ে যাবে। সম্পর্ক গুলো এলোমেলো হয়ে যাবে। কিন্তু আজ সে চুপ থাকবে না। গলা ভেঙে গেছে, ফলস্বরূপ কন্ঠস্বর বদলে গেছে। নূর ধীরে সুস্থে বলে, ‘জানি।’
