Home পদ্মপ্রিয়া পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৩

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৩

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৩
ঈশিতা রহমান সানজিদা

চল্লিশের বেশী বয়স কাকলির, নিয়মিত পান খেয়ে জিহ্বা, ঠোঁট লাল করে ফেলেছে। দাঁত গুলো দেখতে খুবই বিশ্রী, কেমন কালো কালো হয়ে গেছে। অথচ তাকে বেশিরভাগই হাসতে দেখা যায়। কাজকর্ম সব নোংরা নোংরা। রাস্তার পাশে কালো করে লোকটা পান বিক্রি করে। তার থেকে গোটা কয়েক পান কিনে নিয়ে পলিথিনে মুড়িয়ে কোমরে গুঁজে নিলো। পরনে হলুদ রঙের কামিজ। চুলগুলো লাল, প্রতি সপ্তাহেই মেহেদী পাতা বেঁটে চুলে লাগায়। একটা পান মুখে নিয়ে পলিথিন ফের কোমড়ে গুঁজে নিলো। রাস্তার ওপাশে আট তলা বিল্ডিং। পাঁচ তলা পর্যন্ত কমপ্লিট হয়েছে বাকিটা ফাঁকা। এদিক ওদিক তাকিয়ে রাস্তা পার হয়ে এলো, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে চেঁচিয়ে উঠলো,’এইরকম কাম মানুষ করে, এই পাঁচ তালা উঠতে যাইয়া কোমড় যাবে। টাকা কামানো যে কত কষ্ট।’

পাঁচ তলায় একটি মাত্র রুম ব্যবহার যোগ্য। সেটিতে কাকলি থাকে। এক রুম আর ডাইনিং স্পেস। ভেতরে কোন আসবাবপত্র নেই। শুধু বেডরুমে সস্তা খাট পাতানো, একটা ফ্যান লাগানো। সুইচ অন করলেই খটখট আওয়াজ করে। চাবি দিয়ে বেডরুমের দরজা খুলতেই অন্ধকারে তলিয়ে গেল কাকলি। বেশিক্ষণ অন্ধকার থাকলো না, সুইচ টিপতেই আলোতে ভরে গেল রুম।
খাটের উপর কাঙ্খিত ব্যাক্তিটি নেই। সে ফ্লোরে এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। হাঁটুতে মুখ গুঁজে আছে বিধায় চেহারা দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটির পরনে বেবি পিঙ্ক কালারের গাউন। মাথায় ওড়না পেঁচানো। এতক্ষণ ফ্যান বন্ধ থাকায় ঘেমে চুপচুপে হয়ে গেছে। কাকলি ফ্যানের সুইচ অন করতেই খটখট শব্দে পাখাটি ঘুরতে লাগলো। কাকলি চড়া গলায় বলে উঠলো,’কিরে মাইয়া! দেমাগ এখনও কমে নাই? খাওন তো তেমনই আছে।’
নূর মাথা তুলে তাকায়। হাত দুটো শক্ত করে দড়ি দিয়ে বাঁধা এবং পায়ে শেকল বাঁধা। লম্বা সেই শেকল, চলাফেরায় যাতে সমস্যা না হয় সেজন্য। দূর্বল ভাবে মাথা তোলে নূর। কাকলিকে দেখে সে, শান্ত চোখে দেখে। তারপর বলে,’আমার খুদা নেই।’
‘তাইলে কেমনে হয়? তুই মরলেও ঝামেলা, তাই বাচাইয়া রাখছি। আমার যে কত ঝামেলা!!’ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে কাকলি। নূর বলে ওঠে,’এই দুনিয়ার শান্তি সবকিছু নয়, ইহকালের শান্তিতে কি লাভ আপনার? পরকালকে ভয় করুন, পুলসিরাতের চিন্তা করুন। তাহলে পাপ থেকে দূরে থাকতে পারবেন।’
‘এই মাইয়া, বয়ান কমাইয়া দে। আমার কবর আমিই বুঝমু। আমাগো কাম শেষ না হওয়া পর্যন্ত তুই এখানেই থাকবি।’

‘আমি এখান থেকে বের হতে পারলে আপনারা ভালো থাকতে পারবেন তো?’
‘তা তো আমরা দেখতাম না। বড় স্যার দেখবে।’
‘তোমাদের বড় স্যারের দিনও ঘনিয়ে আসছে।’
নূর অন্যদিকে ঘাড় ফেরায়। কাকলি বলে,’ত্যাজ দেখাস কারে তুই? ডর দেখাস?’
নূর মৃদু হেসে বলে,’আমি মানুষ, আমাকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। আল্লাহ কে ভয় করুন, তাকে বিশ্বাস করুন।’
নাহ এই মেয়ে বেশি কথা বলে। কাকলির মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এক কোণে পানের পিক ফেলে বললো,’শোন, ভালোয় ভালোয় কামটা কইরা দিলে কি এতক্ষণ এখানে থাকা লাগতো? তোর সোয়ামির কাছেই দিয়া আসতাম।’
আজমাঈনের কথা মনে পড়তেই চমকে উঠলো নূর। ছেলেটা কি করছে? নিশ্চয়ই পাগল হয়ে গেছে। যে ছেলে পাগলের মত ভালোবাসতে পারে সেই ছেলে নূরের হারিয়ে যাওয়ার খবর শুনে পাগল হবে স্বাভাবিক। আজমাঈনের চিন্তায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে নূরের। মনটা কেমন নরম হয়ে গেল ওর। ওদের দাবি মেনে নিলেই তো ছেঁড়ে দিবে। আজমাঈন ওর জন্য কত কিছু করলো, দ্বীনের পথে নিজেকে ফিরিয়ে আনলো। আর নূর এতটুকু ত্যাগ করতে পারবে না? ইশ্ আগে মেনে নিলে এতক্ষণ ঠিক ছাড়া পেয়ে যেতো। নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হচ্ছে ওর। মাথা নাড়িয়ে বলে উঠলো,’আমি আপনাদের সব কথা মানতে রাজি আছি। দয়া করে আমাকে আমার স্বামীর কাছে যেতে দিন!’

কাকলি হাত নাড়িয়ে বলে,’গতকাল এত নাটক করলি ক্যান, হা? কত ঝামেলা করে তোরে এদিকে আনছি জানোস? তখন তো আপোষ করলি না, গরম গরম কথা কইলি। এখন কি হইলো?’
নূর বেশ দূর্বল হয়ে পড়েছে। গতকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি ওর। ভাঙা ভাঙা গলায় বললো,’আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছি, আমি ফিরব তার কাছে। আমাকে আমার কথা রাখতে হবে। সে আমার জন্য অপেক্ষা করছে যে।’
‘অহন সোয়ামির জন্য দরদ উতলাইয়া পড়ছে? যতসব!!’
নূর দেওয়ালে হেলান দিলো। রুমে বাইরের আলো বাতাস আসে না। সে চোখ বন্ধ করে ইয়াসিন সূরা পাঠ করা শুরু করলো। এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেল কাকলি। মেয়েটার কন্ঠে জাদু আছে, মন টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওর কাছে। সে দ্রুত প্রস্থান করে। নূর নিজের পাঠ শেষ করে রঙ ওঠা দেওয়ালের দিকে তাকালো। চোখের জলে বুক ভেসে গেল ওর। ফোপাতে ফোপাতে বললো,’আমি কথা রাখতে পারিনি, কিন্তু আপনি প্লিজ আমার জন্য অপেক্ষা করুন। আল্লাহ চাইলে আমি ফিরব আপনার কাছে। এখনো অনেক কথা বলা বাকি আছে যে।’
এমন এক বন্দিদশা থেকে কিভাবে নিজেকে মুক্ত করা যায় সেকথা ভাবতে লাগলো নূর। কিন্তু কাকলি যে ধাঁচের মহিলা তাতে সহজ হবে না। গতকাল নিজের পরিচয় দিয়েছে কাকলি। প্রতি দুই মাস অন্তর জেল খাটে। বড় কোন শক্তিশালী হাত আছে বিধায় সহজেই ছাড়া পেয়ে যায়। একজন মহিলা এতটা নিকৃষ্ট হতে পারে, জানা ছিল না নূরের। দানবের মতো শরীর তার, এর সাথে শক্তিতে পেরে ওঠা অসম্ভব। কিছুক্ষণ বাদে কাকলি রাগে গজরাতে গজরাতে ভেতরে এলো। দাঁত কিড়মিড় করে বললো, ‘তোর আর কোথাও যেতে হবে না, গেলে সোজা যমের দুয়ারে যাবি। তোর বাপ আর সোয়ামি মিলে পুলিশের লাইন লাগিয়েছে। এখন তো তোরে ছাড়া যাইবে না।’

নূর উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে এলো। কিছুটা আসতেই পায়ের শেকলে টান পড়তেই থেমে গেল। অনুনয় করে বললো,’আমি কাউকে কিছু বলব না, প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন।’
‘তোর যা ত্যাজ দেখলাম কালকে, এরপর তোরে ছাড়ার কথা আসে কেমনে? এমনেই থাক, যতদিন খুশি থাক।’
ফিরে যাওয়ার আগে বলেন,’না খাইলে দু’দিন পর এমনিই মরে যাবি। আমাগো কষ্ট করে মারা লাগব না।’
কাকলি চলে যেতেই নূর ফেলে রাখা খাবারের দিকে তাকালো। রুটি আর সবজি, সকালে খায়নি সে। এখন বুঝলো বেঁচে থাকার জন্য তাকে খেতে হবে। আজমাঈনকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখার জন্য বাঁচতে হবে। দু’হাত সামনে জড়ো করে বাঁধা, শক্ত করে বাঁধা। ওভাবেই খেতে লাগলো নূর। অনিচ্ছা সত্বেও খেতে হচ্ছে তাকে।

রাশেদ সাহেব কে হসপিটালে ভর্তি করা হয়েছে, যে মেয়েকে এতো ভালোবাসতেন। আজ সেই মেয়ে নেই, কোথায় আছে তার খোঁজ কেউ জানে না। এই শোকে আজ তিনি মৃত্যু পথযাত্রী। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার, মুখে অক্সিজেন মাস্ক দেওয়া। রেহানা পাশে বসে কাঁদছেন। মেয়ের শোক, স্বামীর শোক তাকে দূর্বল করে দিয়েছে। রাহাও মায়ের পাশে বসা। সাইমন সমান তালে দৌড়াদৌড়ি করছে‌।
ওদিকে পুলিশ তেমন খবর দিচ্ছে না। নূর যে গাড়িতে করে চলে গেছে সেটি চোরাই গাড়ি ছিল। মেইন রোডের সিসি ক্যামেরা থেকে দেখা গেলেও পরবর্তীতে গাড়িটি গ্রামের পথে গেছে। কতদূর এবং কোন গ্রামে গেছে তার হদিস মেলেনি। এক মাস অসুস্থ থাকার পর রাশেদ সাহেব কে হসপিটালে ভর্তি করা হয়েছে। এখন সাইমন পড়েছে বিপাকে। কতদিক সামলাবে সে? নিজের বিজনেসের হাল ছেড়ে দিয়েছে সেই কবে। নূরের বিজনেসে বসতে তার ভয় লাগে, পাছে পুলিশ সন্দেহ করে। তাই টুকটাক খোঁজ খবর রাখে। যেটুকু না রাখলেই নয়। এখনও পুলিশ তাকে নজরে নজরে রাখছে। কতদিন এই নজর থাকবে কে জানে।
কিন্তু আজমাঈনের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। ওর পুরো দুনিয়া পাল্টে গেছে। রোজ রফিকুল সাহেবের থেকে খবর নেয়। তার আর কিইবা করার আছে। মাথা ভনভন করে ঘোরে, এইতো দু’দিন আগে ওর হোটেলের উদ্বোধন হয়েছে কিন্তু সেখানে আজমাঈন উপস্থিত ছিলো না। আজমল শিকদার এবং ফয়েজ যা করার করেছে। নূরের জন্য তো দুনিয়া থেমে থাকবে না। যা ঘটবে তা মেনে নিতে হবে। কিন্তু আজমাঈন তা এখনও মেনে নিতে পারেনি। একটা মানুষ ওর হৃদয় জুড়ে রয়েছে, অথচ চোখের সামনে নেই। এই যন্ত্রণা কাউকে বোঝানো দায়। একা একা তাহাজ্জুদ পড়ে আজহারি করে, সে তার স্ত্রী কে ফেরত চায়। আল্লাহ চাইলে সবকিছুই করতে পারে।

আজমাঈন নিজেও ধীরে ধীরে দূর্বল হয়ে পড়েছে। আজমল শিকদার এখন আজমাঈনের সাথে রাত্রি যাপন করে। ছেলেটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে, ওকে সাহস যোগাতে হবে। কিন্তু সময়টা যখন পাঁচ মাসে গড়ায় তখন আজমাঈন আরো ভেঙে পড়ে। তবে নিয়মিত হয়েছে সে তার বিজনেসে। মন না বসলেও থাকতে হবে।
মাত্রই ফিরলো আজমাঈন। ফয়েজ এবং সাহারা এসেছে। কেবলই সন্ধ্যা নেমেছে। আজমাঈন খাটের উপর বসে জুতো খুলছে। ফয়েজ ওর কাঁধে হাত রাখতেই মলিন চোখে তাকায়। ফয়েজ মৃদু হেসে বলে,’কি অবস্থা তোর?’
আজমাঈন এক পলক তাকিয়ে জুতো খোলায় মন দেয়,’নতুন কিছুই হয়নি।’
সংক্ষিপ্ত জবাব। অথচ এর ভেতর কত হাহাকার রয়েছে ফয়েজ তা টের পেলো। সে আজমাঈনকে নূরের ব্যাপারে প্রশ্ন করতে চায়। কিন্তু মন খারাপ হবে বিধায় করতে পারে না। বাড়ির কারো মন মেজাজ ভালো নেই। আইশা সেই যে চুপচাপ হয়েছে, কারো সাথে কথা বলে না তেমন। কিছুক্ষণ থেকে ফয়েজ চলে যায় সাহারা কে নিয়ে।

তাহমিনা খাবার বাড়ছে আজমাঈনের জন্য। এই ছেলের খাওয়া দাওয়া সেই কবে থেকেই কমে যাবে গেছে। আজমল শিকদার ছাড়া কেউই ওকে ঠিকঠাক খাওয়াতে পারে না। তানাজ গুটিগুটি পায়ে এসে দাঁড়ায়। তাহমিনা বলে,’এখন আসতে গেলি কেন?’
তানাজ বিরক্ত হয়,’রুমে বসে থেকে থেকে ফুলে যাচ্ছি, এভাবে শুয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমি কিন্তু সি সেকশনে যাব না। তোমার জন্য যদি কিছু হয় তাহলে দায় তোমার।’
তাহমিনা মাথা নাড়ে। তানাজ বলে,’ভাইয়া এসেছে?’
‘এলো তো কিছুক্ষণ আগে।’
‘ভাইয়াকে এভাবে দেখতে ভালো লাগছে না আম্মু। আমার এই খুশির সময়ে সবার মুখ ভার।’
‘আল্লাহ কে ডাকা ছাড়া আমাদের আর কি করার আছে? কত কত দোয়া করছি, মেয়েটা কোথায় আছে কেমন আছে এটুকু জানতে পারলে তো ভালো হতো। আদৌও বেঁচে আছে কিনা!!’ শেষের কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে। তানাজ মা’কে থামিয়ে বলে, ‘এসব বলো না মা, ভাইয়া শুনতে পাবে।’
এমন সময় আজমাঈন এলো। সদ্য গোসল সেরে টিশার্ট গায়ে জড়িয়ে এসেছে সে। তাহমিনা থতমত খেয়ে চোখ মুছলেন। মুখটা হাসিহাসি করে বলেন, ‘আয়, খেতে বস।’

আজমাঈন বসে, চুপচাপ খায়। এখন আর বাবার সাথে ঝগড়া করে না। কথা কাটাকাটি হয়না। ছেলেকে এইভাবে দেখে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে আজমল শিকদারের। তাইতো দু’দিন পর পর বন্ধুর কাছে ছুটে যায়। পরিশেষে হতাশ হয়ে ফিরে আসে।
তবে আজ ঘটলো অন্য ঘটনা। আজমাঈন তখন রুমে শুয়ে ছিলো। ওর বড় মামা, মামি এসেছেন। তারা কিছুক্ষণ আলাপ করলেন ঠিক। কিন্তু মামী নতুন প্রসঙ্গ তোলেন। খানিকটা জড়তা নিয়েই বলেন, ‘কি ভাববেন আপা জানি না, তবে অনেক দিন তো হলো। ছেলেটা সবসময় মনমরা হয়ে থাকে। মেয়েটা কি বেঁচে আছে? আমি বলি কি, যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছে। আজমাঈন কে আবার বিয়ে দেন। দেখবেন আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।’

তাহমিনা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। এই জবাব কিভাবে দিবেন চট করে মাথায় এলো না। ছেলেটার অবস্থা যা হচ্ছে তাতে ওকে এই কথা বলার সাহস কারোর হবে না। তবে তানাজ গর্জে উঠলো, ‘আজ যা বলেছ, এই কথা দ্বিতীয়বার বলবে না। যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভাইয়া নিবে। একটা মানুষ শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি আর তুমি এসব কথা বলছো? ছিঃ ছিঃ ছিঃ!! আমার ভাইয়ার অবস্থা দেখেছ?’
‘আমি ওভাবে বলিনি, একদিন না একদিন তো ওকে আবার বিয়ে করতেই হবে তাই না।’
‘সেই একদিন আসুক, তারপর ভাবা যাবে। এত তাড়াতাড়ি আর কিছু বলবে না তুমি।’
রুমটা নিরব হয়ে গেল। তানাজ অসন্তুষ্ট মুখে উঠে চলে গেল। ওর ডেলিভারীর ডেট চলে এসেছে। এময় এতো উত্তেজিত হওয়া চলবে না। রাগে দুঃখে ওর সবকিছু তছনছ করে দিতে ইচ্ছে করলো। কাছের মানুষ গুলো একটু শান্তনা দিবে, তা না করে কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে এসছে।

সময়টা শীতের মাঝামাঝি, নূর মেঝেতে বসে রয়েছে। ইদানিং ওর জ্বর কমে না। কাকলি রাগারাগী করে মেঝেতে বসে থাকার জন্য। হাতের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়েছে। মেয়েটা বড্ড নরম, গায়ে জোর নেই। জ্বরের তীব্রতা বাড়ছে। ঠিকমতো বসতে পারে না। তাও নামাজ ছাড়েনি সে। তেলাওয়াত করে প্রতিদিন, কাকলির মতো শক্ত মনের মানুষ কে এই তেলোয়াত নরম করে দিয়েছে। সে সকালে এসে রাগারাগী করে গেছে। দুপুরে এসে দেখলো জ্বর আরও বেড়েছে। গা ছোঁয়া যাচ্ছে না। রাগি স্বরে বললো,’এই মাইয়া, কথা কইলে কানে যায় না? মরতে চাস? তোরে হাসপাতালে নিতে পারব না বড় রোগ বাধাইলে।’
‘আমার আর বেঁচে থাকার ইচ্ছা নেই, আপনি আমাকে মেরে ফেলুন। কিন্তু একটা অনুরোধ, অন্তত লাশটা আমার স্বামী কে দেখতে দিয়েন। আমার প্রতিশ্রুতি টা রাখা হবে। আমি তাকে অপেক্ষা করতে বলে এসেছি। সে এখনও আমার অপেক্ষা করছে।’
কাকলি হাসলো। পান খাওয়া লাল লাল দাঁত বের করে হেসে বললো,’বেডা মানুষ এতো দিন বইসা থাকে? দেখ, বিয়া কইরা নতুন সংসার পাতছে।’

‘তোমার স্বামীর মতো সবার স্বামী নয়।’ নূর হাঁপিয়ে গেছে কথা বলতে বলতে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে খুব। তবুও বললো,’আমার সময় বোধহয় খুব শিঘ্রই শেষ হয়ে যাবে। আমার শেষ ইচ্ছা রেখো প্লিজ।’
কাকলি ভড়কে গেল যখন দেখলো নূর ঠোঁট নেড়ে কালিমা পড়ছে বারবার। এই মেয়ের প্রতি তার মায়া জন্মে গেছে। কি সুন্দর কন্ঠস্বর তুলে কোরআন তেলাওয়াত করে। ভারি মিষ্টি লাগে। কিন্তু ওর প্রফেশন এর কাছে এত মায়া দেখালে চলবে না। সে ছুটলো ওষুধ কেনার জন্য।
কথায় আছে মানুষ মাত্রই ভুল হয়। গত সাড়ে পাঁচ মাসে আজই কাকলি ভুল করে বসলো। তার বাটন ফোনটা বিছানায় ফেলে রেখে গেল। নূর ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে ছিলো ফোনের দিকে। কাকলি চলে যাওয়ার পর পরই সেটি হাতে তুলে নিলো।

তানাজের লেবার পেইন ওঠার পর তাকে হসপিটালে নেওয়া হয়েছে। পরিবারের সবাই সেখানে উপস্থিত। আজমাঈন চুপচাপ চেয়ারে বসে আছে। তানাজের শ্বশুর বাড়ির লোকজনও উপস্থিত। তাহমিনা বসে বসে আল্লাহ কে ডাকছে। মা ও বাচ্চা যেন সুস্থ থাকে।
এমন সময় আজমাঈনের ফোন বাজলো। ও ভাবলো হয়তো তানাজের খবর নেওয়ার জন্য কেউ ফোন করেছে। ধরলো না। আবারো বাজলো তাও ধরলো না। তিনবারের বার পকেট থেকে ফোন বের করলো। আননোন নাম্বার, রিসিভ করে সালাম দিলো। কিন্তু অপরপাশে থেকে জবাব এলো না। শুধু একটা ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। আজমাঈন কয়েক মুহূর্তের জন্য জমে গেল যেন। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। শীতল কন্ঠে বললো,’নূর, আমার নূর।’
নূর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। মানুষ টা ওর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনেই চিনে ফেলেছে। এখন এই মানুষটাকে সে কি বলবে আর? আজমাঈন বললো,’কোথায় আছো তুমি নূর?’ ভেজা কন্ঠস্বর আজমাঈনের। তবে নূর এক কথায় জবাব দিলো,’আমার সময় খুব কম।’

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩২

কল কেটে গেল। আজমাঈন হসপিটালের করিডোর দিয়ে ছুটলো। পথে আজমল শিকদার টেনে ধরলো, ‘কি হয়েছে? এভাবে কোথায় যাচ্ছিস।’
এটুকুতেই হাঁপিয়ে উঠেছে আজমাঈন। বলে,’আব্বু, নূর কল করেছিল।’ আর কিছু বলতে পারে না। কথা বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে। আজমল শিকদার বলেন, ‘কখন?’
‘এইমাত্র।’
আজমল শিকদার ছেলেকে চেপে ধরেন,’কাউকে বলিস না, মেয়েটা হয়তো লুকিয়ে ফোন করেছে। আমি হাশেম কে খবর দিচ্ছি। তুই যা।’

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here