Home পদ্মপ্রিয়া পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৯

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৯

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৯
ঈশিতা রহমান সানজিদা

সময় রাত ৩.৪৫। ভোরের আলো ফুটতে এখনও ঢের বাকি। বারান্দায় বসে আছে নূর, হাওয়া দিচ্ছে খুব। মাথায় ওড়না টানা, গায়ে শাল জড়ানো। দু’হাতে নিজেকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে চেয়ারে। পরনে কুর্তি। সৈকতের দিকে এক মনে তাকিয়ে আছে। এখনও কিছু মানুষ ঘোরাফেরা করছে। ছুটোছুটি করছে, দূর থেকে দেখা যাচ্ছে সব। একটু পরপর সমুদ্রের গর্জন ভেসে আসছে। আজমাঈন এলো কিছুক্ষণ পর। ওর পদধ্বনিতে কেঁপে উঠলো নূর। ঘাড় ফেরানোর চেষ্টা করেও পারলো না। উল্টে আজমাঈন ওকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করলো। কেমন জড়সড় হয়ে বসে আছে। সে চেয়ার টেনে বসলো, মুখোমুখি হতেই চোখ নামায় নূর। আজমাঈন গালে হাত রাখে। ঠান্ডা হাত, শরীর কেঁপে উঠলো নূরের। তবে নূরের ভেজা শরীরটা অবলোকন করতে পারলো। মেজাজ তখনই চড়ে গেল। শক্ত গলায় বললো,’শরীর ভিজে আছে আর তুমি এই বাতাসে বসে আছো! তোমার এই খামখেয়ালিপনা মোটেও পছন্দ নয়।’

ধমকেও টললো না নূর। বললো,’ভালো লাগছে বসে থাকতে।’
নাছোড়বান্দা আজমাঈন টেনে ধরলো নূরের হাত। উঠতে উঠতে বললো,’এরপর জ্বর বাঁধালে টাইফয়েড হয়ে যাবে। তখন হসপিটালে ভর্তি থাকতে হবে। নিজেকে নিয়ে একটু ভাবো।’
রুমে গিয়ে লাগেজ থেকে গাউন বের করলো আজমাঈন। এগিয়ে দিয়ে বললো,’নিজ থেকে পড়বে নাকি আমি হেল্প করব।’
চট করে গাউনটা হাতে নিয়ে চলে গেল নূর। আজমাঈন ঠোঁট টিপে হেসে হেয়ার ড্রায়ার বের করে নিজের চুল শুকাতে লাগলো। আজ ঠান্ডা লাগছে। এসি সেই কখন অফ করে‌ দিয়েছে। এই বাতাস রুমটা শীতল করে দিয়েছে। বারান্দার দরজা বন্ধ করে দিলো সে।
ড্রেস চেঞ্জ করে তোয়ালে দিয়ে ফের চুলগুলো মুছে নিল নূর। এই লম্বা চুলগুলো কেটে ফেললে বেশ হতো। এত যত্ন করতে আর ভালো লাগছে না নূরের। তোয়ালে ফেলে সে বের হয়। হেয়ার ড্রায়ার নিয়ে চুলগুলো শুকানোর চেষ্টা করে। এতো ভারি মেশিনটা, রাগে ঠাস করে ফেললো। আজমাঈন ফোন নিয়ে বসেছিল। শব্দে চোখ তুলে তাকায়। বলে,’এদিকে আসো, আপাতত এটুকুই থাক।’
গাউনটা বেশ লম্বা, মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। টেনে তুলে ধরে এগোয় নূর। আজমাঈন বসার জায়গায় করে দিতেই বসে পড়ে। আজমাঈন বলে,’আমি তো জানতাম তুমি রাগ করতে জানো। জিনিসটা তোমার সাথে যায় না। এতো রাগ কিসের?’

তবে এবার রাগটা কান্নায় পরিণত হলো। মুক্ত দানার ন্যায় চোখের পানি গড়িয়ে পড়লো। আজমাঈন তড়িঘড়ি করে আধশোয়া থেকে উঠে বসলো। নূরের গালে হাত রেখে বললো,’আমি কি খুব বেশি হার্ট করে ফেলেছি?’
নূর নিজেকে কাছে এনে আজমাঈনের বুকে শপে দেয়। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। আজমাঈনের এখন কি করা উচিত ভেবে পায়না। আবার নূরের কান্নাও মেনে নেওয়া যায়না। নূরের চুলের গভীরে হাতের আঙ্গুল ডুবিয়ে দিয়ে বলে,’বাড়ি যাবে?’
উত্তর আসে না। আজমাঈন ফের বলে,’তোমার কান্না আমার সহ্য, প্লিজ কেঁদো না।’
নূর মাথা তোলে। বলে,’আমি কিভাবে নিজের রক্তের বিরুদ্ধে কথা বলব? সে চিন্তা ভাবনা কখনোই আসেনি আমার। অনুভব, মাম্মামের চেহারা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।’

আজমাঈনের কল্পনায় ভেসে উঠলো ঘন্টা তিনেক আগের ঘটনা। ফয়েজের কল এসেছিল, তাতে দু’জনেরই ঘুম ভাঙ্গে। কেসটা কয়েকদিনের মধ্যেই কোর্টে উঠবে। ভালো একজন এ্যাডভোকেট হায়ার করছে সে। তবে এতকিছুর মাঝেও অনুভব ও সাহারার মন খারাপ। যতই হোক তাদের পিতা। ওদের মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। আজমাঈন, ফয়েজের তেমন চিন্তা না হলেও ওদের হয়। নূরের চিন্তাও যে হয়না তাও নয়। ছোটবেলা থেকে এই ভাইয়ের স্নেহ পাওয়ার জন্য ঘোরাঘুরি করত কত। অথচ সাইমন বারবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সেদিন কিডন্যাপ করার পর সাইমন যখন নূরের থেকে ওর ব্যাবসার ভাগ চাইলো। তখন নূর বলেছিল,’ছোটবেলা থেকেই তোমার একটু আদর, স্নেহ চেয়েছিলাম। মাম্মাম কে চকলেট, গিফট এনে দিতে। আমি চাইতাম আমাকেও দাও, কিন্তু তুমি কখনো আমার দিকে তাকিয়ে দেখো নি। বিশ্বাস করো, যদি একটা চকলেটও এনে দিতে তাহলে ওই চকলেটের বিনিময়ে আমি আমার সবকিছু তোমাকে দিয়ে দিতাম। কিন্তু আজ যা করলে, আর সম্ভব নয়।’

সেদিন বিস্ফোরণ ঘটেছিল, নূরের তর্কে সাইমন মাথা নিচু করে আশা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল। আজ নূর সেসব কথা মনে করতে চায়না। সেসব ভুলে যেতে চায়। কিন্তু আজমাঈন তো ভুলে থাকা ব্যক্তি নয়।
আজমাঈন নূরের হাতজোড়া শক্ত করে ধরে। হাতের পিঠে চুমু খায়। বলে,’তুমি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছ, তোমার মনটা আর পাঁচটা নারীর সাথে মিলে না। এতো দয়ালু হলে চলে না নূর। মাঝে মাঝে কঠোর হতে হয়।’
‘আমি চাই তার শাস্তি হোক, কিন্তু তার সাথে সাথে বাকিরাও শাস্তি পাবে এটা চাইনা। আমার নিজেরও খারাপ লাগছে।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার ভাইকে খুব বেশি শাস্তি দিব না। তবুও একেবারে দিব না তাও না। তবে আমার একটা শর্ত আছে।’
নূরের ভ্রু কুঁচকে এলো,’আবার কিসের শর্ত?’
‘এর আগেও বলেছি তখন অতোটা গুরুত্ব দিয়ে বলিনি। তোমার ভাই আর মায়ের সাথে কখনো কোন রকমের যোগাযোগ রাখবে না।’
নূর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে চেয়ে রয়,’এক কথা কতবার বলবেন? আর এভাবে বলার কি আছে? এমনিতেও তাদের সাথে আমার সম্পর্ক ভালো না। যোগাযোগ তো হয়ই না।’
‘তোমার মা বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল আমাকে। তোমার সাথে কথা বলতে চেয়েছে। আর হ্যাঁ তোমার সিম কার্ড চেঞ্জ করে দিয়েছি। আমি আঙ্কেল ব্যতীত আর কেউ জানবে না। তোমার ফোন ব্যবহার করার দরকার কি বলো?’
নূরের মনে হচ্ছে ছেলেটা পাগল হয়ে গেছে। আবার পাগল বলাও যাবে না, তখন আবার বেফাঁস কথাবার্তা বলে ফেলবে। মুখে বললো,’সেই তো আমার ফোন ব্যবহার করার কোন দরকার নেই। আপনিই ব্যবহার করুন।’

সুন্দর সময় গড়াতে খুব একটা সময় লাগে না। এই তো সেদিন না বিয়ে হলো!! দেখতে দেখতে বছর গড়াতে চললো। এই সময়ের মধ্যে বদলে গেছে অনেক অনেক। বদলেছে নূর, আজমাঈনের সম্পর্ক। ওরা দুজন দুজনকে বুঝতে শিখেছে, আগের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে শিখেছে। ফজরের নামাজ শেষে নূর যখন কোরআন তেলাওয়াত করে তখন ওর কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে আজমাঈন। নূরের সুরে জাদু আছে, এতো সুন্দর করে তেলোয়াত করে। আজমাঈনের চোখে ঘুম এসে যায়। নূর কখনো ভাবেনি যে এত সুন্দর একটা সংসার হবে ওর। একদিন ওকেও সবাই ভালোবাসবে। বিষয়টা উপলব্ধি করতেই চোখ জোড়া চিকচিক করে ওঠে। মাঝে মাঝে ঘুমন্ত অবস্থায় আজমাঈনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবে, এই মানুষটার সাথে তার প্রথম সাক্ষাৎ এর কথা। তখন কি নূর ভেবেছিল যে এই মানুষটার সাথেই আল্লাহ ওকে জুড়ে দিয়েছেন? সবসময় এড়িয়ে চলা মানুষটা আজ ওর সবচেয়ে কাছের মানুষ। ভাবলেই ঠোঁটে হাসি নেমে আসে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে সবার আগে চা করে নূর। তাহমিনা একটু দেরি করেই উঠেন। ফজরের নামাজের পর আবার একচোট ঘুমিয়ে নেন। আজ অবশ্য তাড়া নেই কারো। আজকে সবাই তানাজের শ্বশুর বাড়ি যাবে সবাই। গতকালই দাওয়াত করেছেন। বাকিরা গেলেও নূরের যাওয়া হবে না। তাহমিনার ছেলে যেতে দিলে তো যাবে। এ নিয়ে কেউ কথাও বলে না।

নূর একা হাতেই সকালের নাস্তায় খিচুড়ি রান্না করে ফেলে। সাথে ইলিশ মাছ ভাজা এবং কয়েক পদের ভর্তা। খুব বেশি সময় লাগলো না। ভেবেছিল আজ একবার নারায়ণগঞ্জ যাবে, ফারিনের সাথে নতুন অর্ডার নিয়ে কিছু আলোচনা করার আছে। পরবর্তীতে মন ঘোরায়, ফাঁকা বাড়ি রেখে যাওয়া ঠিক হবে না বোধহয়। তাছাড়া কিছু প্রজেক্টের কাজ এখনও বাকি রয়েছে। তার উপর আজমাঈন আবার কিছু দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে, হোটেলের রুমের কিছু ডিজাইনে নতুনত্ব আনতে হবে। মূলত নূর নতুন করে যেসব ডিজাইন করছে সেগুলো তার পছন্দ হয়েছে। তো আর কি করার। স্বামীর কাছ কতো করতেই হবে।
দশটা নাগাদ পুরো বাসা ফাঁকা। নূর রুমে বসে কাজ করছিলো। এর মধ্যে এতবার কলিং বেল বাজলো যে কানে তালা লেগে গেলো। হোলে চোখ দিয়ে দেখলো আজমাঈন দাঁড়িয়ে। দরজা খুলে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো, ‘আপনি, এখন?’

আজমাঈন ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো,’দরকার আছে।’
নূর ব্যাপারটা বুঝলো না। সে আজমাঈনের পিছু পিছু ছুটলো। দরজা বন্ধ করে রুমে ফিরে এলো। আলমারি খুলে পাঞ্জাবি বের করলো। ওর কাজকর্ম দেখছে নূর। সবকিছু এলোমেলো করে ফেলছে ছেলেটা। নূর দ্বিতীয় বারের মতো প্রশ্ন করলো,’কি হয়েছে বলবেন?’
‘তেমন কিছু না, তানাজের শ্বশুর বাড়ি যেতে হবে। প্রথমে যেতে চাইছিলাম না। এখন সবাই বারবার ফোন করছে।’

‘আমাকে বললেই তো সবকিছু গুছিয়ে রাখতাম।’
আজমাঈন মৃদু হেসে বলে,’একটা মাত্র বউ, খামোখা কষ্ট দিতে ইচ্ছে করছিল না।’
এবার দ্বিতীয় বারের মতো কলিং বেল বাজলো। আজমাঈন নিজে গিয়ে দরজা খুলল। উপস্থিত ব্যক্তিদের দেখে মুখটা থমথমে হয়ে গেল। তবে ভদ্রতার খাতিরে তাদের ভেতরে আসতে দিলো। নূর রুম থেকে উঁকি দিয়ে দেখলো। আজমাঈনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বেরিয়ে এলো। গুটি গুটি পায়ে আজমাঈনের পাশে এসে দাঁড়াল। সাইমন মাথা নিচু করে আছে। মাসখানেক আগে জামিন পেয়েছে সে। কোর্টকাছারিতে কম দৌড়াতে হয়নি তার। আজমাঈনের ইচ্ছাতেই এতো দৌড়াতে হয়েছে। এখন আজমাঈনের চাওয়ায় তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। যদিও এই শাস্তি অনেক কম হয়ে গেছে। তার সাথে সাথে সন্তানেরাও অনেক সাফার করেছে। শুধুমাত্র ওদের জন্যই আজমাঈন থেমে গেছে। নাহলে এর শেষ দেখে ছাড়ত।
অনুপমা নূরের দিকে তাকালো। এখনও বসেনি ওরা। আজমাঈন বসতেও বলেনি। ওর অনুমতি ব্যতীত নূর কোন কথাও বলবে না।
অনুপমা বললো,’ভয় পেও না নূর, তোমার ভাই আর কোন ক্ষতি করবে না। সে তার ভুলের জন্য অনুতপ্ত। এই শেষবারের মতো দেখা করতে এসেছি।’

নূর চোখ তুলে আজমাঈনের দিকে তাকায়। ওই চাহনিতে কি আছে তা জানে না নূর। তবে ওর শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করলো। আজমাঈনের হাতটা শক্ত করে ধরলো। যাতে কেউ চেয়েও ছিনিয়ে নিতে না পারে। এবার আর কোন ভুল পদক্ষেপ তাদের আলাদা না করতে পারে। নূর একটিবারের জন্যও সাইমনের দিকে তাকালো না।

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৮

ক্ষমা সে করে দিয়েছে তবে তার মুখোমুখি হলে যে ক্ষত তাজা হয় তার জন্য কোন ক্ষমা নেই। গলা কাঁপলেও কথা বের হলো না নূরের মুখ দিয়ে। সে আগের ন্যায় আজমাঈনের দিকে তাকিয়ে রইল। একজোড়া চোখ কে সে আজও ভরসা করে। চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে। জানে, সবাই ওকে ছেড়ে চলে গেলেও আজমাঈন কখনো যাবে না।

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৪০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here