Home প্রণয়ের ঘোর রাত প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৫

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৫

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৫
আরাফাত আদনান সামি

পাশ থেকে রোহিত দুষ্টু স্বরে বলল,
“কৌশিক ব্রো, চলে আসো। অনেক দেখে ফেলছ, এত দেখো না, পরে নিজেরি নজর লেগে যাবে দেখো।”
রোহিতের এমন কথায় মায়া লজ্জা পেয়ে গেল। এদিকে রোহিতের কথা শুনে কৌশিক হালকা রাগভরে তেড়ে গেল,
“তবে রে….”
কৌশিক’কে তেড়ে আসতে দেখে রোহিত সঙ্গে সঙ্গে উল্টো দিকে ঘুরে দৌড় দিল।

তাদের এমন কান্ড দেখে মায়া মুচকি হাসল অতঃপর ব্যস্ত হয়ে গেল নিজের কাজে।
প্রায় দশ মিনিট পর…
তখন সকাল ঠিক ৯টা ১৫। টেবিলে থাকার কথা ছিল শুধু কৌশিক আর রোহিতের, কিন্তু সেটি আর হলো না। কারণ, আজ মায়া একা হাতে রান্না সব করছে এই খবর মাহিমা চৌধুরীর নিজের মুখে বলে সবাইকে রুম থেকে ডেকে এনে টেবিলে বসিয়েছেন। মাহিমার কথা শুনে রুবিনা পাটোয়ারী প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। মায়া? একা হাতে রান্না? নিজের মেয়েকে ঘরে হাজারবার ডাকলেও রাগে চোখ লাল করে ওঠে, কথা শুনিয়েও যার দিয়ে কাজ করানো যায় না, সেই মেয়ে নাকি পাটোয়ারী ছেড়ে আজ চৌধুরী বাড়ির সব সদস্যের জন্য বারো পদের রান্না করেছে! অবিশ্বাস ভরা চোখ নিয়ে তিনি নিচে নেমে এলেন। নিচে এসে যা দেখলেন তাতে আরও হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। টেবিলজুড়ে থালা-বাসন সাজানো,আর তার মধ্যে রাখা সুগন্ধে ভরপুর খাবার আর একসাইটে তার মেয়ে মায়া দাড়িয়ে। চৌধুরী বাড়ির সবাই তখন টেবিলে বসে গেছে। তাদের সাথে বসে আছেন রুবিনা পাটোয়ারীও। কিন্তু তার মুখে কোনো কথা নেই শুধু বিস্ময়ে বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে আছেন নিজের মেয়ের দিকে। মায়ার চোখে যখন সেই বিস্ময় ধরা পড়ল, তখন ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠল। ধীরে ধীরে মায়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে কানের কাছে ঝুঁকে মৃদু স্বরে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“কী হলো আম্মু? এমন করে কী দেখছো, শুনি?”
রুবিনা পাটোয়ারী ভ্রু কুঁচকে মায়ার দিকে তাকালেন।
“এই সব কিছু তুই রান্না করেছিস?”
মায়া ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি টেনে বলল,
“কোনো সন্দেহ আছে নাকি?”
মায়ের মুখে অবিশ্বাসের ছাপ এখনো রয়ে গেছে। তিনি আড়ালে মায়ার কান হালকা চিমটি কেটে নিজের দিকে টেনে নিলেন।
“কই, আমাদের তো কখনো এত খাবার, এত খাবার কি বলি একটা সামান্য ডিম ভাজিও ঠিকমতো ভেজে খাওয়াস নি। আর আজ এখানে বারো পদের রান্না!”
মায়া হালকা চোখ টিপে জবাব দিল,
“তাহলে আজ মন ভরে খেয়ে নাও আর চেকে নেও আম্মু,নিজের মেয়ের হাতের স্বাদে ভরা সুস্বাদু খাবার।”
রুবিনা পাটোয়ারী আবারও কানে টান দিলেন, এবার একটু বেশি জোরে।

“তবে রে..!”
“উফ্ আম্মু, কী করছো! লাগছে তো!”
মা–মেয়ের এমন খুনসুটির মাঝেই হঠাৎ রোহিত ধৈর্য হারিয়ে বলে উঠল,
“আর কত অপেক্ষা করবো, ভা…”
রোহিতের কথা শেষ হওয়ার আগেই কৌশিকের তীক্ষ্ণ রাগান্বিত দৃষ্টি ছুঁড়ে এল তার দিকে। চোখে সেই দৃষ্টি পড়তেই রোহিত হকচকিয়ে গলা পরিষ্কার করে বলল,
“আই মীন, মায়া।”
মায়া তখন সব খাবার একে একে টেবিলে সাজিয়ে রোহিতের দিকে তাকিয়ে হালকা ভ্রু তুলে বলল,
“এই তো ভাইয়া, দিচ্ছি।”

তারপর ধীর ভঙ্গিতে সে সবার প্লেটে খাবার বেড়ে দিতে লাগল। টেবিলজুড়ে শুধু চামচ-থালার শব্দ, সবাই নিজ নিজ খাবারে মগ্ন। সবাই খাচ্ছে শুধু মায়া ছাড়া। মায়া এক কোণে চেয়ারের উপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের রান্না নিয়ে সবার প্রতিক্রিয়া দেখার এক অদ্ভুত কৌতূহল যেন তার চোখে ভেসে উঠছে। এমন সময় আশরাফ চৌধুরী ভাতের শেষ গ্রাস মুখে তুলে মায়াকে ডাকলেন,

“মায়া, শুন মা।”
মায়া দ্রুত সাড়া দিল,
“জি বড় মামা? কিছু লাগবে?”
আশরাফ চৌধুরী মাথা নেড়ে মৃদু হাসলেন।
“না মা, আর কিছু লাগবে না। তোমার রান্না খেয়ে মনে হচ্ছে যেন অনেক দিন পর নিজের মায়ের হাতের রান্না খাচ্ছি। হুবহু তোমার নানির মতো স্বাদ ঠিক একই রকম। অনেকদিন পর আজ মন ভরে তৃপ্তি নিয়ে খেলাম।”
ওপাশ থেকে খাবার খেতে খেতে আসিফ চৌধুরী মুখ তুলল।
“ভাইজান, তুমি তো একদম আমার মনের কথাটাই বললে! আমাদের মায়া যে এত ভালো রান্না করতে পারে এটা আগে কখনো জানতাম না। সত্যিই মায়া, খাবারগুলো দারুণ হয়েছে।”
দুই মামার এমন প্রশংসা শুনে মায়ার ঠোঁটে নরম এক মুচকি হাসি ফুটে উঠল। ঠিক তখনই মাহিমা চৌধুরী রুবিনা পাটোয়ারীর দিকে তাকিয়ে কৌতূহলভরা স্বরে বলে উঠলেন,

“রুবিনা! তুমি তো কোনো দিন বলোনি তোমার মেয়ে এত ভালো রান্না করতে পারে?”
মাহিমার কথা শুনে রুবিনা পাটোয়ারী একটু অবাক হয়ে বললেন,
“আসলে ভাবি হয়েছেটা কী, আমিও আজই জানতে পারলাম। আমার মেয়ে যে এত ভালো রান্না করতে পারে, এটা আমারই জানা ছিল না।”
ওপাশ থেকে সায়েরা চৌধুরী খাওয়া থামিয়ে অবাক স্বরে বললেন,
“মানে?”
এক মুহূর্ত থেমে আবার বললেন,
“যাগ্গে, আমি বরং আমার খাবার শেষ করি।”
টেবিলে আবার খাবারের শব্দ ফিরে এলো। সবাই নিজের নিজের প্লেটে ডুবে আছে। মায়া এখনো এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে চেয়ারের পিঠে হাত রেখে। সবার প্রশংসায় তার চোখে চিকচিক করছে। ঠিক তখনই মাহিমা চৌধুরী মুখ তুলে বললেন,

“মায়া, তুমি কেন দাঁড়িয়ে আছো? আমাদের সাথে বসে খেয়ে নাও মা।”
মায়া মাথা নেড়ে বলল,
“না বড় মামি, আমি একটু পরে খাবো। আপনারা খান।”
মাহিমা চৌধুরী মৃদু হাসলেন।
“ঠিক আছে মা, তোমার যা ইচ্ছা।”
তারপর আর কেউ কোনো মন্তব্য করল না। টেবিলজুড়ে আবার নীরবতা নেমে এল শুধু খাওয়ার শব্দ। সবাই খাবারে ডুবে গেল। ঠিক সে সময় রুবিনা পাটোয়ারী একপাশে বসা কৌশিকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“শুনলাম তুমি নাকি তোমার আব্বুর কোম্পানিতে যোগ দিয়েছ?”
কৌশিক ভদ্রভাবে সোজা হয়ে বলল,

“হ্যাঁ ফুপি, মাত্র একদিন হলো যোগ দিয়েছি।”
রুবিনা মাথা নেড়ে জানতে চাইলেন,
“তা কেমন কাটল জীবনের প্রথম অফিস জার্নি?”
কৌশিক হালকা হাসল।
“এই তো ফুপি, আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
“ভালো হলেই ভালো।এদিক সেদিক না তাকিয়ে মন দিয়ে কাজ করো।”
কৌশিক সম্মানের সাথে বলল,
“জ্বি ফুপি, দোয়া করবেন।”
রুবিনা স্নেহমাখা কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
“হ্যাঁ, অবশ্যই।”

এরপর আর কেউ কারো সাথে কোন কথা বলল না। প্রায় পনের মিনিট পর। সবাই তখন আধো-খাওয়া অবস্থায়, আর মায়া মাঝখানে এসে বসে নিজেও খাওয়া শেষ করে ফেলেছে।ধীরে ধীরে সবাই টেবিল ছাড়ল। এখন সবাই খাওয়া দাওয়া সেরে হলরুমের সোফায় বসে গল্পে-মশগুল। এদিকে কৌশিক আর রোহিত একটু আগেই অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেছে।যাওয়ার আগে কৌশিক এত মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ার দিকে এক ঝলক তাকিয়েছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের চোখাচোখি। চোখাচোখি হতেই কৌশিক ঠোঁট সামান্য নেড়ে চোখের ইশারায় মায়ার দিকে ছুড়ে দিয়েছিল এক ফ্লাইং কিস। কৌশিক অতি নিঃশব্দে দিয়েছিল কিন্তু তার প্রভাব মায়ার বুকের ভেতর এখনো ঢেউ তুলছে। মায়া অচেতনভাবে ওই মুহূর্তে হেসেছিল, আর সেই হাসির রেশ এখনও তার চোখে-মুখে ভাসছে।ঠিক তখনই সেই ঘোরটুকু ভেঙে দিল পরিচিত এক কণ্ঠ। উপরে থেকে রুবিনা পাটোয়ারীর ডাক এল,

“মায়া… মায়া…!”
মায়া চমকে উঠে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। নিচ থেকে একটু জোরেই জবাব দিল,
“হ্যাঁ আম্মু, বলো!”
“একটু উপরে আয় তো।”
“ঠিক আছে আম্মু, আসছি।”
বলেই মায়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে নিজের মায়ের রুমে প্রবেশ করল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই রুবিনা পাটোয়ারী প্রশ্ন করে বসলেন,
“তোমার সব কিছু গুছানো আছে?”
মায়া মায়ের প্রশ্নের জবাবে ছোট্ট করে বলল,
“হ্যাঁ।”
রুবিনা পাটোয়ারী নরম স্বরে বললেন,

“আমরা এখনই বের হবো।”
মায়া বিস্মিত হয়ে বলল,
“এখনই কেন, আম্মু? বিকালের দিকে যাই না।”
রুবিনা চোখ কুঁচকে বললেন,
“না। বাড়িতে আমার কিছু কাজ আছে। আর সামনে তোমার পরীক্ষা,এই নিয়ে তোমার মাথায় একটুও চিন্তা নেই?”
“আছে আম্মু, কিন্তু…”
“কোন কিন্তু–টিন্তু নয়। ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে নিচে চলে আসো।”
মায়া বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে আম্মু।”

মায়ার মুখে কথা শেষ হতেই রুবিনা পাটোয়ারী আর কোনো কথা বাড়ালেন না। সাইড টেবিলে রাখা ছোট হ্যান্ডব্যাগটা তুলে নিয়ে সোজা রুম থেকে বেরিয়ে পড়লেন। রুম থেকে মা বের হতেই মায়া রেডি হওয়ার কাজে লেগে গেল। ফটাফট ফ্রেশ হয়ে শাড়ি খুলে থ্রি-পিস পরে নিল। তার ওপর হালকা-ঝাপসা মেকআপে মুখটাকে সাজাল। সব শেষে কালো কালারের বোরকা গায়ে চাপাল। রেডি হতে তার সময় লাগল মাত্র চার-পাঁচ মিনিট। তারপর সাইড থেকে জামাকাপড়ের ছোট ব্যাগটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। এদিকে রুবিনা পাটোয়ারী হলরুমে বসে গল্প করছিলেন মায়া আসা পর্যন্ত। যেই না মায়াকে পুরো রেডি অবস্থায় দেখে ফেললেন, সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন এবং সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তো ভাইজান, আজ আমরা আসি।”
আশরাফ চৌধুরী মুখ তুলে বললেন,
“এখনই চলে যাবি? বিকালে না হয় যাস!”
রুবিনা শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন,
“না ভাইজান, বাড়িতে আমারও কিছু কাজ আছে। আর আপনি তো জানেন, মায়ার পরীক্ষার আর মাত্র এক মাস বাকি। তাই আগামী এক-দুই মাস কোথাও যাওয়া-আসা হবে না।”
আশরাফ মাথা নেড়ে বললেন,
“ঠিক আছে, তুই যা ভালো মনে করিস।”
“তাহলে আমি আজ উঠি ভাইজান।”
এই বলে রুবিনা পাটোয়ারী আর মায়া একে একে সবাইকে সালাম ও বিদায় জানিয়ে বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেল।

রাত প্রায় ১ টা।
“সারাদিন কয়টা ফোন দিছি আপনাকে?”
ওপাশ থেকে কৌশিক শান্ত স্বরে বলল,
“খেয়াল করি নি। আসলে আজকে অফিসে প্রচুর কাজের চাপ ছিল তাই একটু বেশিই ব্যস্ত ছিলাম।”
মায়া ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর হয়ে বলল,
“একদম বাহানা দিবেন না বলে দিলাম।”
কৌশিক হালকা হাসল। মায়াকে রাগানোর জন্য বলল,
“আরে বাহানা দিতে যাবো কেনো? বিদেশ থেকে আজ তিনজন বড় বড় বিজনেসওম্যান মানে তিনজন মহিলা আমাদের কোম্পানির সাথে ডিল সাইন করতে এসেছিল। আর এটা নিয়েই সারাদিন ব্যস্ত ছিলাম সারাদিন।”
মায়া একটু চোখ সরু করল, স্বরে সন্দেহ মেশানো তীক্ষ্ণতা,

“ও আচ্ছা আচ্ছা বিদেশি মহিলা তাই না?”
“হ্যাঁ।”
মায়া আরও কটাক্ষ ছুঁড়ে দিল,
“তাহলে তো তারা দেখতে অনেক সুন্দর ছিল তাই না, কৌশিক ভাই?”
হঠাৎ এক প্রকার মুখ ফস্কেই কৌশিক বলে ফেলল,
“হ্যাঁ…”
শব্দটা কানে যেতেই মায়ার মধ্যে যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। চোখ কটমট, দাঁতে দাঁত চেপে রাগে ফুঁসতে থাকা স্বর,
“কীহ্…!!”

কৌশিক একটানা বলতে লাগল, যেন নিজের অপরাধবোধ ঢাকতেই সব কথা উগরে দিচ্ছে,
“আরে না না,একদম দেখতে সুন্দর ছিল না। আর আমি ওদের কিচ্ছুটি দেখি নি। তোর বিশ্বাস হচ্ছে না তো? তাহলে শুন, ওরা সবাই টপ পরে ছিল সেটাও আমি দেখি নি। ওদের ফর্সা পেট আর নাভি দেখা যাচ্ছিল সেটাও আমি দেখি নি। ওদের বুকের প্রায় অর্ধেকের বেশি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল ছিল সত্যি বলছি জান, আমি তাও কিছু দেখি নি। এককথায় বলতে গেলে আমি তাদের কিচ্ছুটি দেখি নি।”
মায়া ফোনের ওপাশে দাঁড়িয়ে কৌশিকের এখান কথা শুনে রাগে টগবগ করে উঠল। তার গাল লাল হয়ে উঠল। নিজের রাগ সামলে, দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“ও আচ্ছা কিচ্ছুটি দেখেন নি! আহা, কী নিষ্পাপ!”
কৌশিক বিন্দুমাত্র লজ্জা না পেয়ে বলল,
“হ্যাঁ।”
মায়া কটাক্ষ ছুঁড়ে দিল,
“কী নাদান!”
“হ্যাঁ হ্যাঁ।”
“কিচ্ছুটি বুঝে না!”
“একদম।”
কৌশিকের একটু আগে কী বলেছে সেটা তার খেয়ালে পড়তেই সে শুকনো একটা ঢোঁক গিলল। বিপদ। খুবই বড় বিপদ। মুহূর্তেই নিজের জিভে দাঁতে হালকা কামড় বসাল। তারপর হালকা নরম স্বরে বলল,
“আসলে মায়া… হয়েছেটা কী… আমি বলতে চাচ্ছিলাম…”
কৌশিকের কথার মাঝখানেই মায়া বলল,

“আপনি কি জানেন, এই মুহূর্তে আমার সামনে থাকলে আমি আপনাকে কী করতাম?”
কৌশিক কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না। ঠোঁটের কোণে জোর পূর্বক একটি হাসি ধরে রেখে বলল,
“আমি জানি নিশ্চয় চুমু খেতি। হ্যান্ডসাম বয় বলে কথা।”
মায়া কটমটিয়ে বলল,
“চুমু খেতাম তাই না?”
“ঠিক বলেছি তাই না? দেখলি, আমি তোর মনের কথা কেমন করে বলে দিলাম।”
“কিন্তু আমি তো আপনার সাথে আরও বেশি কিছু করতে চেয়েছিলাম।”
কৌশিক মায়ার কথার ভেতরের অন্য অর্থ বোঝার সঙ্গে সঙ্গে অবাক হয়ে হাসল। দুষ্টু স্বরে বলল,
“সত্যি সুইটহার্ট? এই মুহূর্তে তোর কাছে থাকলে কী কী করতাম বল না সুইটহার্ট।ওই যে ওইসব কালো কালো পিরিত নাকি? হে হে, সুইটহার্ট, বল না।”

মায়া হঠাৎ রাগান্বিত স্বরে জোরে বলতে লাগল,
“হ্যাঁ, তার আগে আরেকটা সওয়াবে কাজ করে নিতাম। আমার মাথার ওপরে যে ফেনটা আছে না, সেই ফেনের সাথে আপনাকে লটকে দিতাম। তাও নিজের হাতে, খুব যত্ন করে। অসভ্য লোক কোথাকার!”
কৌশিক ফোনের ওপাশে থমকে গেল। মুহূর্ত পর ঠোঁটের কোণে কাঁপন নিয়ে বলল,
“কেন?”

মায়া এবার আর চুপ করে রইল না। এতক্ষণ জমে থাকা ক্ষোভ ফেটে বেরিয়ে এল একদম ঝড়ের মতো,
“আপনি আস্ত একটা গাধা! সাথে অসভ্য, নির্লজ্জ, বেহায়া, শয়তান, লম্পট, লুচ্চা নীর চৌধুরী!”
কৌশিক অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকালো।
“হেত চুপ! কীসব উল্টো‑পাল্টা বলছিস? আমি তোর হবু স্বামী লাগী সম্মান দে।”
মায়া বিদ্রুপে হেসে উঠল।
“আসেন, আপনারে সম্মান আমি বালতি ভরে দেই! কত বড় লুচ্চা সব কিছু দেখে আবার নিজের হবু…”
কৌশিক তাড়াতাড়ি কৌতূহলের সুরে বলল,
“কী হলো? থামলি কেন? পরের কথাটা বল।”
মায়া ধপ করে চুপ করে গেল। তারপর ঠাণ্ডা, ধীর স্বরে বলল,

“আপনার কী একটুও লজ্জা–সরম নাই?”
কৌশিক নির্লজ্জ ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“না নাই।”
মায়া দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিল,
“লুচ্চা নীর চৌধুরী।”
“ছি…ছি…ছিহ্! বেডি তোর হবু স্বামীর লাগি একটু তো সম্মান দে! না হলে…”
“কচু চিনেন? কচু দিমু।”
এ কথা বলে সে আর এক সেকেন্ডও না বাড়িয়ে রাগে সঙ্গে সঙ্গে ফোন কেটে দিল। কৌশিক বিস্মিত হয়ে ফোনটা কানে ধরে থাকল কিছুক্ষণ। তারপরই সে আবার কল দিল। মায়া রিসিভ করল না। দ্বিতীয়বার দিল তবু না। তৃতীয়বার আরও রাগ। চতুর্থবারে অবশেষে ফোনটা ধরল। ফোন ধরতেই কৌশিক তড়িঘড়ি বলল,

“কী হলো ফোন কাটলি কেন?”
মায়ার স্বর কাঁপছিল অভিমানি স্বরে বলল,
“আমি আপনার সাথে কোনো কথা বলতে চাই না। প্লিজ আর ফোন দিয়েন না।”
কৌশিক একটু থেমে শুধু বলল,
“সরি।”
মায়া চুপ কোন কথা বলল না। কৌশিক এবার নরম স্বরে আবার বলল,
“সরি সরি সরি…”
মায়া এবারও কিছু বলল না। কিন্তু ফোনের ওপাশ থেকে হালকা কান্নার গুনগুন শব্দ ভেসে আসতে লাগল কৌশিকের কানে। কৌশিক হঠাৎ থমকে গেল।

“আরে, আরে, চিপকালি! তুই কাঁদছিস কেন?”
মায়া কাদো কাদো স্বরে বলল,
“তো কাদবো না?”
“আরে, ওটা আমি এমনই মজা করে বলছি।”
কিন্তু মায়ার কান্না আর অভিমান মিশ্রিত অবস্থা একটু কড়া স্বরে বেরিয়ে এলো,
“আর একটা মিথ্যা ডায়লগ দিলে না! এখনি সব জায়গা থেকে ব্লক করে রাখব বলে দিলাম।”
কৌশিক ঠোঁটের কোণায় দুষ্টু এক হাসির ঝলক ফুটিয়ে বলল,

“কর সুইটহার্ট, আইমিন ব্লক কর সুইটহার্ট। তোর স্লিম ফিগা,নামে মানে তোর ফোনের যেখানে মন চায়, সেখানেই ব্লক করে রাখ। ছুটানোর জন্য আমি তো আছি, না কি? এইসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কৌশিক নীর চৌধুরী কখনো ভাবে না। আর যদিও বা তুই ব্লক করে রাখিস, সব ব্লক খুলে কীভাবে ভেতরে প্রবেশ করাতে হ…আইমীন, সব ব্লক কীভাবে খুলতে হয়, তা এই কৌশিক নীর চৌধুরী ভালো করেই জানা আছে।”
মায়া কান্নার মাঝেই কৌশিকের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকাল, কিন্তু এবার আর তর্ক করার মতো শক্তি নেই। আগের মতোই শব্দহীন গুনগুন কান্না চলতেই থাকল। ফোনের ওপাশে সেই ভাঙা নিঃশ্বাসের শব্দ কৌশিকের হৃদয়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে দিল। সে বলল,

“আরে ধ্যাত! বাচ্চাদের মতো কান্না করছিস কেনো? আমি সত্যি বলছি কোন মহিলা ডিল সাইন করতে আসে নাই। আমি তো জাস্ট তোকে একটু রাগানোর জন্য বলছিলাম। তোর বিশ্বাস না হলে তুই তোর ছোট মামাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করে সব জেনে নে যা।”
মায়া কান্নায় ভেজা স্বরে বলল,
“দরকার নেই কাউকে ফোন করার।”
“এখনো রাগ করে আছিস?”

মায়ার কোনো উত্তর নেই। শুধু নিঃশ্বাসে ভাঙা কান্নার ধ্বনি। কৌশিক অসহায় গলায় আবার বলল,
“আরে ইয়ার আর কান্না করিস না সরি… সরি… সরি… সরি… আর কতবার বলবো? আর এমন মজা করবো না সরি।”
মায়া এবার একটু গভীর শ্বাস নিয়ে, চোখের পানি ওড়না দিয়ে মুছল। তারপর অভিমান জমা কণ্ঠে বলল,
“এতবার ফোন করার পর আপনি ফোন ধরেন না দেখে আমি কত ভয় পাইছিলাম আপনি তা জানেন? এরপর থেকে সবসময় ফোন সাথে রাখবেন। আর আমার ফোন আসলে সাথে সাথে রিসিভ করবেন, ওকে? না হলে আমি কিন্তু আপনার সাথে আর কক্ষণো কথা বলব না বলে দিলাম।”

“অনেক ভালোবাসিস আমায়?”
কৌশিকের এমন কথা শুনে কান্নার মাঝে মায়া লজ্জায় ধুমরে পড়ল। কিন্তু মায়া কোন উত্তর দিল না। কৌশিক আবার বলল,
“কী হলো কিছু বলছিস না কেনো? অনেক ভালোবাসিস আমায়?”
মায়া লজ্জায় এবার একটু মুখ খুলল,
“জানি না।”
“তাহলে ভালোবাসিস না?”
“জানি ন।”
কৌশিক ভ্রকুচকে বলল,

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৪

“তাহলে কী জানিস?”
“এটা জানি যে এখন থেকে আপনি সবসময় ফোন কাছে রাখবেন যাতে আমি ফোন দিলে সাথে সাথে রিসিভ করবেন ওকে।”
কৌশিক হেসে ফেলল, তার কণ্ঠে উষ্ণতার ছোঁয়া, “ওক্কে আমার চিপকালি ম্যাডাম মনে থাকবে। কিন্তু আমার উত্তর…?”

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৬