প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৮
insia isha chowdhury
নিলুফা খাতুন যাকে এতদিন অন্ধের মত বিশ্বাস করে এসেছে রাফি, যাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে করেছে। সেই মানুষটিকেই সামনে দেখে ওর ভেতরে জমে থাকা ক্রোধ এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়ে উঠল।
এতটা রাগান্বিত রাফি জীবনে কখনো হয়েছে কি না, তা তার নিজেরও জানা নেই। বুকের ভেতর তীব্র ক্ষোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল, তার মা তাকে এভাবে ঠকিয়েছে!
হঠাৎ নিলুফা খাতুনের আগমনে উপস্থিত সবার দৃষ্টি তার দিকেই ঘুরে গেল। তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার ছেলে রাফি, আর তার ঠিক বিপরীতে সূচনা। দৃশ্যটা দেখেই নিলুফার ভেতরটা বিরক্তিতে জ্বলে উঠল। তবে সেই অনুভূতির বিন্দুমাত্র প্রকাশ না করে তিনি ছেলের কাছে এসে দাঁড়ালেন। রাফি একদৃষ্টে মায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।”
ছেলের কণ্ঠের কঠোরতা শুনে নিলুফা খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও মুখে মৃদু হাসলো।
“হ্যাঁ বাবা, অবশ্যই। তোমার যা কিছু বলার, আমাকে তো বলবেই। কিন্তু তোমার দেশে ফেরার খবর শুনে তোমার বাবা খুব খুশি হয়েছে। আমার মনে হয়, আগে বাসায় চলো। সবার সঙ্গে পরে কথা বললেও হবে।”
নিলুফার কথা শেষ হতে না হতেই রোকসানা এগিয়ে এসে বললেন,
“ভাবি, তুমিও এসেছ ভালো হয়েছে। আর রাফি এত দূর জার্নি করে এসেছে, ওকে একটু বিশ্রাম নিতে দাও। বাড়ি তো পরেও যেতে পারবে। বরং তুমি ভাইকে ফোন করে এখানে আসতে বলো।”
ঔকথাটা শুনে নিলুফার ভেতরটা যেন আরও জ্বলে উঠল। মনে মনে বলল,
আমি এখানে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি, আর রোকসানা সবকিছু আরও জটিল করে তুলছে! না, যেভাবেই হোক রাফিকে এখন এখান থেকে নিয়ে যেতে হবে। পরে ও নিজেই বুঝতে পারবে, আমি যা করেছি, ওর ভালোর জন্যই করেছি…”
মনের অস্থিরতা গোপন করে তিনি রোকসানার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলেন।
“দেখো রোকসানা, আমরা আবার পরে আসব। এতে তো কোনো সমস্যা নেই। আমি শুধু চাই, এত বছর পর দেশে ফিরে আমার ছেলে আগে বাসায় যাক। ওর জন্য আমি নিজের হাতে অনেক কিছু রান্না করেছি। আগে সেগুলো খাক, তারপর না হয় অন্য সবকিছু।”
নিলুফার কথায় রাফির কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না। এই মুহূর্তে তার মাথায় ঘুরছে শুধুই একগুচ্ছ প্রশ্ন, আর সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর সে চাইছে আজই, এখনই। তবে এটাও সে বুঝতে পারছিল, এত মানুষের সামনে সেই উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়।
তাই নিজের ফুফুর দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“ফুফু, আমি আবার পরে আসব। এখন আমার মনে হয় বাসায় যাওয়াটাই উচিত।”
রাফির মুখে এমন কথা শুনে নিলুফার মনে স্বস্তির ঢেউ বয়ে গেল। রোকসানাও আর কিছু বললেন না। মৃদু হেসে বললেন,
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমারও মনে হয়, এতদিন পর যখন এসেছিস, আগে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করাই উচিত।”
নিলুফা খাতুন সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে শুধু বললেন,
“হ্যাঁ।”
কথাটা বলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই ছেলের হাত ধরতে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু রাফি একবারও তার দিকে তাকাল না। মায়ের বাড়িয়ে দেওয়া হাতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দ্রুত পায়ে সামনে হাঁটা শুরু করল। মুহূর্তের জন্য নিলুফার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তবু উপস্থিত সবার সামনে নিজের অস্বস্তি লুকিয়ে সৌজন্যমূলক একটি হাসি দিলেন তিনি। তারপর নীরবে ছেলের পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করলেন।
রাফি আর নিলুফা খাতুন বাড়ি থেকে চলে যেতেই ড্রয়িংরুমের উত্তপ্ত পরিবেশ ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল। একে একে সবাই নিজেদের কাজে সরে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল ড্রয়িংরুমটা প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়ল। শুধু রোকসানা খাতুন সেখানে নীরবে বসে রইলেন, তিনি কিছু একটা ভাবছেন গভীর মনোযোগে। সূচনা মায়ের সঙ্গে কথা বলার উদ্দেশ্যে সেদিকে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ তার হাতটা কেউ আলতো করে চেপে ধরল। চমকে ঘুরে তাকালো প্রণয়ের দিকে।
প্রণয়ের চোখে তখন এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য। কোনো কথা না বলে শুধু চোখের ইশারায় সূচনাকে তার সঙ্গে যেতে বলল। সূচনা কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কোনো প্রশ্ন না করেই মাথা নাড়ল। দু’জনে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। রুমে ঢুকেই প্রণয় দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে সূচনা খানিকটা অবাক হলেও কিছু বলল না। সে ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু ঠিক তখনই প্রণয় আচমকা তার হাত ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এল। এত আকস্মিক ঘটনায় সূচনা পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল। বিস্ময়ে তার চোখদুটো বড় হয়ে উঠল। ঘনঘন পলক ফেলতে ফেলতে সে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে?”
প্রণয় কয়েক মুহূর্ত ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর গম্ভীর স্বরে বলল,
“ওই ছেলের সঙ্গে তোমার কেমন সম্পর্ক?”
সূচনা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কেমন সম্পর্ক মানে? রাফি তো…”
কথাটা শেষ করার আগেই প্রণয় নিজের তর্জনী তুলে সূচনার ঠোঁটের ওপর আলতো করে রেখে দিল। সূচনার বাকিটুকু কথা ঠোঁটেই আটকে গেল। সূচনা বিস্মিত চোখে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রণয়ের আচরণ তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা লাগছে। প্রণয় ধীর স্বরে বলল,
“তুমি এত সহজে ওর নাম কেন নিচ্ছ?”
কথাটা বলেই সে সূচনাকে ছেড়ে দিল। এরপর গিয়ে বিছানার কিনারায় বসে পড়ল। এক হাত তুলে কপাল চেপে ধরল, যেন কোনো অদৃশ্য অস্থিরতা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
প্রণয়ের এই অস্বাভাবিক আচরণ দেখে সূচনাও এগিয়ে গিয়ে তার পাশে বসে পড়ল। ঠিক তখনই প্রণয় বলল,
“সূচনা, তুমি আর রাফির সঙ্গে কথা বলবে না।”
কথাটা শুনে সূচনার চোখ বিস্ময়ে গোল হয়ে গেল।
“মানে? ও তো আমার কাজিন। তাহলে কেন কথা বলব না?”
প্রণয় চোখ না তুলেই উত্তর দিল,
“আপাতত আমি মানা করছি। এজন্যই।”
সূচনা বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“উফ! আপনি যে কখন কী বলেন, আমি সত্যিই কিছু বুঝতে পারি না।”
কথাটা বলেই সে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু এক পা-ও এগোতে পারল না। প্রণয় হঠাৎ তার হাত ধরে এমনভাবে টেনে নিল যে মুহূর্তের মধ্যে সূচনা গিয়ে তার কোলের ওপর বসে পড়ল। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে পড়ে যাওয়ার ভয়ে সূচনা তড়িঘড়ি করে দু’হাত দিয়ে প্রণয়ের গলা জড়িয়ে ধরল। প্রণয়ের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে আলতো হাতে সূচনার কপালের ওপর ছড়িয়ে থাকা এলোমেলো বেবি হেয়ারগুলো সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিল। তারপর মায়াময় স্বরে বলল, “তুমি কি আমাকে বুঝতে চাও? যে আমার কথাগুলো বুঝতে পারবে?”
কথাটা শুনে সূচনা একেবারে থমকে গেল। এতক্ষণে তার কাছে সবকিছু একটু একটু করে পরিষ্কার হতে লাগল। প্রণয়ের গলায় লুকিয়ে থাকা অভিমানটা এবার স্পষ্ট অনুভব করতে পারল সে। বিষয়টা ভাবতেই সূচনার ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতি জন্ম নিল।
এই মানুষটা…যে মানুষটাকে সবাই ভীষণ স্থির, কঠোর আর আত্মনিয়ন্ত্রিত বলে জানে, সেই মানুষটাও কি তার সঙ্গে অভিমান করতে পারে? ভাবতেই সূচনার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। সে ঠোঁট উল্টে বলল,
“একজন মানুষকে বোঝার জন্য তো অনেকটা সময় একসঙ্গে কাটাতে হয়। তখন হয়তো বুঝতে পারব। এত তাড়াতাড়ি আপনাকে কীভাবে বুঝব আমি?”
কথাটা শুনে প্রণয়ের চোখে দুষ্টু ঝিলিক খেলে গেল।
সে ধীরে ধীরে নিজের কপালটা সূচনার কপালের সঙ্গে ঠেকিয়ে দিল। দু’জনের মাঝখানের দূরত্ব মুহূর্তেই হারিয়ে গেল। এরপর নাক দিয়ে আলতো করে সূচনার নাকে টোকা দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তাহলে তোমার আরও কত সময় লাগবে আমাকে বুঝতে?”
এত কাছাকাছি অবস্থানে সূচনার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। তার শ্বাসপ্রশ্বাস অগোছালো হয়ে গেল। লজ্জা আর অস্বস্তিতে প্রণয়ের কাঁধ শক্ত করে খামচে ধরল। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলে কাঁপা গলায় বলল,
“জা… জানি না তো…”
প্রণয় মুচকি হেসে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। দেখল, সূচনা ভয়ে আর লজ্জায় চোখদুটো শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছে। তাই প্রণয় মৃদু করে ঝুঁকে এসে সূচনার চোখের পাতায় ফুঁ দিল। তারপর নরম স্বরে বলল,
“আচ্ছা, তাই?”
সূচনা কোনো রকমে মাথা নাড়ল।
“হুম।”
প্রণয়ের কোলে বসে থাকতে সূচনার ভীষণ লজ্জা লাগছিল। প্রণয়ও সূচনার অস্বস্তিটা বুঝতে পারল।
তাই আর তাকে বিব্রত না করে আলতো করে নিজের কোল থেকে নামিয়ে বিছানার ওপর বসিয়ে দিল।
গাড়ি থেকে নামতেই নিলুফা খাতুন বেশ জোরে বললেন,
“রাফি, আমার কথা শোনো। বোঝার চেষ্টা করো। আমি তোমার জন্য যা কিছু করেছি, একদিন তুমি ঠিকই বুঝতে পারবে যে আমি সবকিছু তোমার ভালোর জন্যই করেছি।”
কিন্তু তার কথাগুলো রাফির কানে পৌঁছালই না।
মির্জা বাড়ি থেকে ফেরার সময় রাফি তার মায়ের গাড়িতে ওঠেনি। নিজের গাড়িতে করেই চলে এসেছিল। আর নিলুফা খাতুন ছেলের পেছন পেছন অন্য গাড়িতে করে এসেছেন। বাড়িতে ঢুকেই রাফি নিজের ভেতরের সমস্ত সংযম হারিয়ে ফেলল। ড্রয়িংরুমে রাখা একটি ফ্লাওয়ার ভাস তুলে সজোরে কাঁচের সেন্টার টেবিলের ওপর আছড়ে মারতেই বিকট শব্দে টেবিলটি চুরমার হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই চারদিকে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে পড়ল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নিলুফা খাতুন শব্দ শুনে দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়লেন। ভেতরে ঢুকেই তিনি থমকে গেলেন। রাফি যেন উন্মাদ হয়ে গেছে। ড্রয়িংরুমে থাকা একের পর এক জিনিসপত্র ভাঙচুর করছে। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ, মুখে তীব্র যন্ত্রণার ছাপ। ভাঙচুর করতে গিয়ে হাত ও মুখের কয়েক জায়গায় কাঁচের আঁচড় লেগে রক্তও বের হয়েছে।
হঠাৎ রাফি চিৎকার করে উঠল,
“আপনি আমার কোন ভালো করেছেন? এত ভালো করেছেন যে এখন আমার নিজেরই বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে না! আমার মনে হচ্ছে আমি মরে যাই! আর সঙ্গে আপনাকেও মেরে ফেলি!”
কথাগুলো বলেই মেঝেতে পড়ে থাকা একটি ধারালো কাঁচের টুকরো তুলে নিল সে। এই মুহূর্তে রাফিকে ভীষণ হিংস্র লাগছিল। নিলুফা খাতুন কিছু বলতে এগিয়ে যেতেই রাফি ক্ষোভে নিজের হাতেই কাঁচ চালিয়ে দিল। রক্ত ঝরতে শুরু করল, কিন্তু রাফি যেন সেই ব্যথাও অনুভব করছে না। তারপর দু’হাতে নিজের চুল খামচে ধরে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল,
“আআআআহ! কী করব আমি? কী করব? আমি কী দোষ করেছিলাম? কেন আমার সঙ্গে এমনটা করলেন? কী অপরাধ ছিল আমার? কেন আমার ভালোবাসাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিলেন?”
নিলুফা খাতুন হতভম্ব হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, রাফি একবারও তাকে ‘মা’ বলে ডাকছে না। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল তার। তিনি ধীরে ধীরে ছেলের দিকে এগিয়ে যেতেই রাফি বজ্রকণ্ঠে বলে উঠল,
“আমার থেকে দূরে থাকুন! আর এক কদমও কাছে আসবেন না। না হলে আমি নিজেকে শেষ করে দেব… অথবা আপনাকে!”
এত ভয়ংকর কথাতেও নিলুফা খাতুন বিচলিত হলেন না। তিনি আগে থেকেই অনুমান করেছিলেন, সত্য জানার পর রাফির প্রতিক্রিয়া কিছুটা হলেও এমনই হবে।
হঠাৎ তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।
“আমি কী করতাম বাবা? ওই মেয়েটা তো সারাক্ষণ বিয়ে বিয়ে করছিল। আমি নিজেও জানতাম না এমন হবে। হঠাৎ করেই ওর বিয়ে হয়ে গেছে।”
রাফি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার মায়ের দিকে তাকাল।
“মিথ্যা! সব মিথ্যা! হৃদয় আমাকে সব বলেছে। ওরা বিয়ের আগে আমাকে জানাতে চেয়েছিল। কিন্তু আপনিই ওদের আমাকে ফোন দিতে নিষেধ করেছিলেন!”
নিলুফা খাতুন মুখ শক্ত করে বললেন,
“ফোন দিলেও তুমি কী করতে পারতে? ওর বিয়ে তো হয়েই যেত। আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন। তাই ওর বিয়ে অন্য কারও সঙ্গে হয়েছে।”
রাফির চোখে ঘৃণা আর ক্ষোভের আগুন।
“না! আপনি আমাকে ধোঁকা দিয়েছেন। আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। আমি এসব কিছু মানব না। আপনি কি ভেবেছেন, এত সহজে সব মেনে নেব?”
নিলুফা খাতুন এবার অবাক হয়ে বললেন,
“মেনে না নেওয়ার কী আছে? সূচনা এখন একজন বিবাহিত নারী। তুমি ওকে ভুলে যাও। আমি তোমার জন্য আরও ভালো, আরও পারফেক্ট মেয়ে নিয়ে আসব।”
রাফির ঠোঁটে তিক্ত হাসি ফুটে উঠল।
“আপনার ভাষায় পারফেক্ট কাকে বলে, আমি জানি না। আর সেই পারফেক্ট মেয়েকে আপনি নিজের কাছেই রাখুন। সূচনাকে আমি আমার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসব।”
কথাটা শুনে নিলুফা খাতুনের মাথা যেন গরম হয়ে গেল। তিনি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
“তোমার মাথা ঠিক আছে? কীসব উল্টাপাল্টা কথা বলছ! ওই মেয়েকে আমি আগে থেকেই পছন্দ করি না। আর এখন তো ওর বিয়ে হয়ে গেছে। তুমি কীভাবে ভাবছ যে আমি তোমার কথা মেনে নেব?”
রাফি দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আপনার মানা আর না মানায় আমার কিছু যায় আসে না।”
কথাটা বলেই রাফি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
নিলুফা খাতুন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। বিস্ময়ে তার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। তিনি কখনো কল্পনাও করেননি, সূচনার জন্য তার ছেলে এতটা পাগল হয়ে যেতে পারে।
প্রণয়ের নীরবতা দেখে সূচনার মনে হঠাৎই কিছু একটা মনে পড়তেই ও উৎসাহভরা কণ্ঠে বলল,
“আমি না একটা জিনিস বানিয়েছি। আপনাকে দেখাতে চাই।”
প্রণয় এবার নীরবতা ভেঙে শান্ত স্বরে বলল,
“আর আমিও তোমাকে কিছু দিতে চাই।”
সূচনার আরও খুশি হয়ে বলল,
“তাই নাকি? আচ্ছা, তাহলে আগে আমি আপনাকে আমার বানানো জিনিসটা দেখাই।
কথা শেষ করেই দ্রুত ড্রয়ারের দিকে এগিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই সেখান থেকে একটি কাগজ বের করে আনল। প্রথম দেখায় সাধারণ কাগজ মনে হলেও সেটি ছিল বেশ লম্বা এক তালিকা। কাগজটি মেলে ধরতেই সেই কাগজের দৈর্ঘ্য চোখে পড়ল স্পষ্টভাবে।
সূচনার হাতে সেই অদ্ভুত লম্বা তালিকা দেখে প্রণয় ভ্রু কুঁচকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল।
“এটা কিসের লিস্ট?”
সূচনা ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ছোটবেলায় যখনই আম্মুকে বলতাম কোথাও ঘুরতে যেতে চাই, তখন উনি সবসময় বলতেন, আগে বিয়ে হোক, তারপর নিজের স্বামীর সঙ্গে যত খুশি ঘুরে বেড়াস।”
প্রণয় কিছুটা বিস্মিত হয়ে মাথা নাড়ল।
“তা ঠিক আছে, কিন্তু ঘুরতে যাওয়ার সঙ্গে এই লম্বা লিস্টের সম্পর্ক কী?”
ব্যস, এই প্রশ্নের অপেক্ষাতেই ছিল সূচনা। এক নিঃশ্বাসে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল,
“ওমা, ছোটবেলা থেকেই আমার একটা স্বপ্ন আছে। আমি পুরো পৃথিবী ঘুরে দেখতে চাই। নতুন নতুন দেশ, শহর, পাহাড়, সমুদ্র সবকিছু! এই লিস্টে আমি সেই সব জায়গার নাম লিখেছি যেখানে আমি একদিন যেতে চাই। আমি পুরো পৃথিবী ভ্রমণ করে দেখতে চাই। আর সঙ্গে কিছু পরিকল্পনাও করেছি। এইজন্য এই লিস্টটা বানানো। যেন আমাদের ভ্রমণে কোনো অসুবিধা না হয়।”
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৭
প্রণয় চোখ সরু করে সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“পুরো পৃথিবী ভ্রমণের স্বপ্ন আপাতত একটু কম দেখো। সামনে যে তোমার পরীক্ষা, সেটা মনে আছে তো? সবার আগে পড়াশোনা। বাকিটা পরে বুঝতে পেরেছ?”
