প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৮
insia isha chowdhury
ইনজেকশনটা নেওয়া সম্পূর্ণ হতেই ঋতু যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এতক্ষণ যে ভয়টা বুকের মধ্যে চেপে রেখেছিল, ইনজেকশন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেটারও অবসান হলো। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পাশ ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল, রাফি তার এই অবস্থা দেখে মিটমিট করে হাসছে। ঋতু দু’হাত কোলের ওপর রেখে রাফির দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল,
“আপনি হাসছেন কী কারণে?”
মুহূর্তেই রাফির মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল। সে গম্ভীর মুখে ঋতুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার মুখ। আমি হাসব নাকি কাঁদব, সেটা একান্তই আমার সিদ্ধান্ত। তুমি বলার কে?”
রাফির কথায় ঋতু শুধু মুখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে তাকাল। লোকটার সঙ্গে কথা বলাই মুশকিল!
এরই মধ্যে ডাক্তার এসে জানালেন, আপাতত চিন্তার তেমন কোনো কারণ নেই। চাইলে তারা হাসপাতালের বিল পরিশোধ করে এখনই বাড়ি ফিরতে পারে। কথাটা শুনে ঋতু বেড থেকে নামতে উদ্যত হতেই হঠাৎ ওর মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। চোখের সামনে মুহূর্তের জন্য সবকিছু কেমন যেন অন্ধকার হয়ে এলো। শরীরটা সামনের দিকে হেলে পড়তে নিতেই রাফি দ্রুত এগিয়ে এসে তার বাহু শক্ত করে ধরে ফেলল। রাফি তাৎক্ষণিকভাবে বলল,
“আস্তে, ধীরে নামো। এমনিতেই ঝামেলার শেষ নেই, তার ওপর এখন যদি আবার পড়ে গিয়ে নতুন কোনো ঝামেলা বাধাও, সেটা আমি চাই না।”
ঋতু কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ রাফির হাতের সাহায্যে ধীরে ধীরে নিচে নামল। কিছুক্ষণ পর রিপোর্টগুলো দেখে ডাক্তার তাদের জানালেন, ঋতুর শরীর বর্তমানে কিছুটা দুর্বল। তাই তাকে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। পাশাপাশি অতিরিক্ত স্ট্রেস নেওয়া যাবে না এবং যতটা সম্ভব চিন্তামুক্ত ও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করতে হবে।
ডাক্তারের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে দুজনই হাসপাতালের বিল কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল।
ঋতু ব্যাগ থেকে টাকা বের করে বিল পরিশোধ করতে যাবে, তার আগেই রাফি কাউন্টারে টাকা দিয়ে দিল। বিষয়টা বুঝতে পেরে ঋতু অবাক হয়ে রাফির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি আমাকে হাসপাতালে এনেছেন, তার জন্য অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু বিলটা তো আমি দিতে পারতাম। আপনাকে কে দিতে বলেছে?”
রাফি তখন ফোনে অন্য একজনকে মেসেজ পাঠাতে ব্যস্ত। ঋতুর কথার দিকে খুব একটা না তাকিয়েই স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আমার কাছে মনে হয়েছে বিলটা আমারই দেওয়া উচিত। তাই আমি দিয়েছি।”
ঋতু কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল,
“তবুও ব্যাপারটা আমার কাছে ভালো লাগল না।”
রাফি এবার ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে ঋতুর দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তোমার ভালো লাগা বা না-লাগায় আমার কী যায় আসে?”
ঋতু মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“তা ঠিক। তবে আপনি আমাকে হেল্প করেছেন, আর সে জন্য আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।”
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। হাসপাতালের ব্যস্ত করিডোর পেরিয়ে বাইরে আসতেই রাফি ঋতুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“কী বলতে চাও? তাড়াতাড়ি বলো। আমার হাতে সময় নেই।”
রাফির এমন তাড়া দেওয়া স্বভাবটা ঋতুর একদমই পছন্দ হলো না। সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এক্সকিউজ মি! আমার হাতেও সময় নেই। আপনার কী মনে হয়, আমি ফ্রি নাকি?”
রাফি এবার বাঁকা চোখে ঋতুর দিকে তাকাল।
তবে রাফি কিছু বলার আগেই ঋতুর গলার স্বর কিছুটা নরম হয়ে গেল। সে হাসপাতালের পাশের একটি ক্যাফের দিকে ইশারা করে বলল,
“ওই যে পাশের ক্যাফেটা দেখছেন, ওখানে একটু আমার সঙ্গে চলুন।”
রাফি একবার ক্যাফেটার দিকে তাকিয়ে আবার ঋতুর দিকে তাকাল।
“আমার হাতে এত সময় নেই।”
ঋতু সঙ্গে সঙ্গে তার এক হাত তুলে পাঁচটি আঙুল দেখিয়ে বলল,
“মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য।”
রাফি কিছুক্ষণ ঋতুর দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার অনুরোধের ভঙ্গিটা দেখে শেষ পর্যন্ত আর না করতে পারল না। গম্ভীর মুখেই বলল,
“শুধুমাত্র পাঁচ মিনিট।”
রাফি আর ঋতু দুজন একটি টেবিল বুক করে মুখোমুখি বসে আছে। ঋতু দুটো কফি অর্ডার করেছে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর এবার কিছুটা নরম গলায় ঋতু বলল,
“কিছুদিন আগে যখন আপনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন…”
ঋতু আর কিছু বলার আগেই রাফি তার কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
“ও আচ্ছা! তুমি আমাকে সরি বলতে চাইছ?”
ঋতু ভ্রু কুঁচকে রাফির দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখুন, আপনি যখন আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, সেদিন আমি আপনার সঙ্গে যেরকম ব্যবহার করেছিলাম, তার জন্য আমি আপনাকে কখনোই সরি বলব না। কারণ, সেদিন দোষ আপনারও ছিল। যদি সরি বলিও, সেটা শুধু এই কারণে বলব যে আমি আপনার খাবারে লবণ মিশিয়ে দিয়েছিলাম। আর সেটা আমি একদমই ঠিক করিনি।”
ঠিক তখনই একজন ওয়েটার এসে তাদের টেবিলে কফি সার্ভ করে চলে গেল। রাফি কিছু বলার আগেই হঠাৎ তার কানে ভেসে এলো একটি চিরপরিচিত কণ্ঠস্বর। কণ্ঠস্বরটি শুনেই রাফি সেদিকে তাকাল। আর তাকাতেই দেখল, টিনা দাঁড়িয়ে আছে। টিনা প্রায় দৌড়ে রাফির কাছে এসে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“রাফি, তুমি এখানে এই মেয়েটার সঙ্গে কী করছ? আর এই মেয়েটা কে?”
টিনাকে দেখে এবং তার প্রশ্ন শুনে রাফির বিরক্তি যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। এমনিতেই একটা ঝামেলার মধ্যে আটকে আছে, তার ওপর আবার এই উটকো ঝামেলা এসে ঘাড়ে চেপেছে! না জানি আজ সকালে কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছিল যে, সকাল থেকেই একের পর এক ঝামেলা তার পিছু ছাড়ছে না! ঋতু চুপচাপ বসে তাদের দুজনের কথোপকথন দেখছিল। তারপর নির্বিকার ভঙ্গিতে কফির কাপে চুমুক দিল।
রাফি কোনো উত্তর না দেওয়ায় টিনা আবার বলল, “কিছু বলছ না কেন, রাফি? এই মেয়েটা কে? আর তুমি এখানে কী করছ?”
রাফি এবার সত্যিই অতিষ্ঠ হয়ে গেল। বিরক্ত চোখে টিনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ও যে-ই হোক, সেটা তোমাকে বলতে ইচ্ছা করছে না টিনা। আর তুমি কি কানা? দেখতে পাচ্ছ না আমি কী করছি? এখানে বসে কফি খাচ্ছি।”
কথাটা বলেই রাফি আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল। তারপর সোজা ক্যাফের ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। টিনা জানে, রাফির মনের অবস্থা এই মুহূর্তে একদমই ভালো নয়। তার মেজাজও ভীষণ খারাপ। তাই রাফির এমন ব্যবহারে টিনা খুব একটা অবাক হলো না। বরং তার সব রাগ গিয়ে পড়ল সামনে বসে থাকা ঋতুর ওপর। টিনা এবার ঋতুর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“আমি তোমাদের মতো মেয়েদের খুব ভালো করেই চিনি! ছেলেদের পকেটের টাকা দেখলেই তাদের গলায় ঝুলে পড়ার জন্য তোমরা যা খুশি করতে পারো।”
ঋতু কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু নির্বিকার দৃষ্টিতে তার সামনে বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল। যেন টিনার কথাগুলো তার কানে পৌঁছাচ্ছেই না। ঋতুর এমন নির্লিপ্ত আচরণে টিনার রাগ আরও বেড়ে গেল। সে এবার আরও রাগান্বিত গলায় বলল,
“তুমি যে ছেলেটার ওপর ইন্টারেস্ট নিচ্ছ, তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখো।”
টিনার মুখে এমন কথা শুনে ঋতু হঠাৎ হেসে ফেলল। নিজের হাসিটা সামলাতে বেশ খানিকটা সময় লাগল তার। তারপর কোনোমতে হাসি থামিয়ে বলল,
“কী? আমি আর ওই ছেলে… মানে রাফির ওপর ইন্টারেস্টেড? তোমার আজেবাজে কথা বলা বন্ধ হলে একটু বাস্তবে ফিরে এসো। আমাকে কি পাগলা কুকুরে কামড়েছে যে আমি রাফির প্রতি ইন্টারেস্টেড হব?”
ঠিক তখনই রাফি ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরে এসে দেখল, টিনা এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। দৃশ্যটা দেখেই তার বিরক্তি আবারও চরমে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই ঋতুর কণ্ঠস্বর তার কানে এলো। ঋতু টিনার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আমাকে জিজ্ঞেস করছ আমি রাফির প্রতি ইন্টারেস্টেড কি না? আমি তো একদমই ইন্টারেস্টেড নই। কিন্তু তুমি যার প্রতি ইন্টারেস্টেড, মানে রাফি… সে কি তোমার প্রতি একটুও ইন্টারেস্টেড?”
ঋতু ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে যোগ করল,
“আমার একটুও মনে হচ্ছে না যে রাফি তোমার প্রতি ইন্টারেস্টেড!”
নিজের কথা শেষ করতেই ঋতু দেখল, রাফি তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তাই ঋতু টিনার দিকে তাকিয়ে খানিকটা নরম গলায় বলল,
“টিনা, রাফি তো চলে এসেছ। তুমি বরং রাফির সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাও। তাহলে হয়তো রাফি তোমার প্রতি কিছুটা হলেও ইন্টারেস্টেড হতে পারে।”
ঋতুর কথা শুনে টিনা রাগে ফুঁসতে লাগল। কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই রাফিকে কাছে আসতে দেখে নিজের রাগটাকে মুহূর্তেই সামলে নিল। রাফির সামনে নিজের ইমেজটা ভালো রাখার জন্য দ্রুত তার কাছে গিয়ে মিষ্টি হেসে বলল,
“রাফি, চলো আমরা একসঙ্গে বাসায় যাই। আমাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখলে ফুপি অনেক খুশি হয়ে যাবে।”
এত কিছুর মাঝে ঋতু কফির বিলটা পেমেন্ট করে দিল। তারপর আর এক মুহূর্তও সেখানে না থেকে চলে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু সে কয়েক পা এগোনোর আগেই রাফি এসে তার সামনে দাঁড়াল।
“ঋতু, তোমার শরীর এমনিতেই ভীষণ খারাপ। আমার উচিত তোমাকে এখন বাড়ি পৌঁছে দেওয়া।”
রাফির কণ্ঠের আন্তরিকতা কেন জানি ঋতুর একদম সহ্য হলো না। সে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“তার কোনো দরকার নেই। আমি একাই চলে যেতে পারব।”
তাৎক্ষণিক টিনা এসে রাফির এক বাহু আঁকড়ে ধরে বলল,
“রাফি, ও তো ঠিকই বলেছে। ও একাই চলে যাবে। তুমি বরং আমাকে নিয়ে বাসায় চলো।”
টিনার এমন আচরণ দেখে ঋতু আর দাঁড়াল না। সে সেখান থেকে চলে যেতে নিলেই রাফি আবার দ্রুত তার কাছে গিয়ে নিচু গলায় বলল,
“ঋতু, দেখো, প্লিজ আমি তোমাকে ড্রপ করে দিই। টিনা অনেক বেশি বিরক্তকর। আমি আর এক মুহূর্তও এই মেয়েটার সামনে থাকতে চাইছি না।”
কথাটা বলেই রাফি কোনো রকমে ঋতুকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এল। ঋতু রাফির এমন কাণ্ডে একেবারে হতবাক। বাইরে এসে নিজের হাতটা রাফির হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,
“আশ্চর্য! ওকে আপনার বিরক্ত লাগছে তো আমি কী করব?”
রাফি এবারও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে বলল,
“দেখো, তুমি এটা মানো আর না-ই মানো, তুমিও এখন অসুস্থ। তাই তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়াই ঠিক হবে। এটাই করা উচিত।”
ওদের পেছন পেছন টিনাও ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। রাফি ইতিমধ্যেই ঋতুকে গাড়িতে বসিয়ে ফেলেছে।
ঋতুকে এভাবে তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ায় টিনা ভীষণ চটে গেল। কিন্তু ততক্ষণে গাড়ি চলতে শুরু করেছে। গাড়ি চলার সঙ্গে সঙ্গে জানালা দিয়ে আসা তাজা বাতাস ঋতুর মুখে এসে লাগতেই তার মনটাও যেন খানিকটা ভালো হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগের ঘটনাটা মনে পড়তেই টিনার কথা ভেবে তার মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল। সে রাফির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার ওই মেয়েটার জন্য ভীষণ খারাপ লাগছে।”
টিনার নাম শুনেই রাফির মুখটা মুহূর্তেই বিরক্তিতে কুঁচকে গেল।
“কেন? ওর জন্য খারাপ লাগার কী আছে?”
ঋতু একটু ভেবে বলল,
“খারাপ লাগার অনেক কারণ আছে। তবে একটা কথা বলুন তো, ওই টিনা নামের মেয়েটার মাথায় কি কোনো সমস্যা আছে?”
রাফি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“এক্স্যাক্টলি! আমারও এটাই মনে হয় যে ওর মাথায় সমস্যা আছে।”
ঋতু এবার বেশ গম্ভীর মুখে বলল,
“তাহলে আসলেই ওর মাথায় সমস্যা আছে। ওর মাথায় সমস্যা আছে বলেই তো আপনার পেছন পেছন ঘুরে বেড়াচ্ছে!”
ঋতুর কথা শুনে রাফি কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকাল।
“মানে? তুমি কী বলতে চাইছ?”
ঋতু একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“আরে, ও আপনাকে পছন্দ করে। এইটাই কি যথেষ্ট কারণ নয় যে ওর মাথায় সমস্যা আছে?”
কথাটা শোনা মাত্রই রাফি আচমকা বেশ জোরে ব্রেক কষল। হঠাৎ গাড়ি থেমে যাওয়ায় ঋতু সামনের দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়ল। বিস্মিত চোখে রাফির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আশ্চর্য! গাড়ি থামালেন কেন?”
রাফি কোনো উত্তর দিল না। শুধু গম্ভীর মুখে বলল,
“বের হয়ে যাও আমার গাড়ি থেকে।”
ঋতু অবাক হয়ে বলল,
“মানে?”
রাফি এবার আরও কঠিন গলায় বলল,
“মানে, এখনই এই মুহূর্তে গাড়ি থেকে বের হয়ে যাও।”
ঋতু এবার রীতিমতো হতবুদ্ধি।
“আপনার মাথা ঠিক আছে? কী সব উল্টাপাল্টা কথা বলছেন?”
রাফি আর কোনো কথা না বলে নিজেই সিটবেল্ট খুলে গাড়ি থেকে নেমে গেল। তারপর ঋতুর পাশের দরজাটা খুলে তার সিটবেল্টটাও নিজ হাতে খুলে দিল। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।
“কেন, বাংলা ভাষা বোঝো না? বলেছি বের হও আমার গাড়ি থেকে। তোমার মতো একটা মেয়েকে সাহায্য করাই আমার ভুল হয়েছে!”
কথাটা বলেই রাফি ঋতুকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিল। ঋতু কিছুক্ষণ সেখানেই অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রাগে তার মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। সে তো কোনোভাবেই রাফির সঙ্গে যেতে চায়নি। বরং রাফিই টিনার হাত থেকে বাঁচার জন্য তাকে জোর করে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। আর এখন ঋতু শুধু সত্যিটা বলেছে বলেই তার এত রাগ! রাফি আবার গাড়িতে উঠে চলে যেতে উদ্যত হতেই ঋতু রাগে চিৎকার করে বলল,
“আশ্চর্য! এখন এই মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আমি বাসায় কীভাবে যাব?”
রাফি বিরক্ত মুখে আবার গাড়ি থেকে নেমে তার দিকে এগিয়ে এল।
“তোমার মাথা ঠিক আছে তো? তুমি সুস্থ আছ, তাই না? তাহলে ঠিকভাবে বাড়িতে পৌঁছে যেতেও পারবে।”
কথাটা বলেই রাফি আবার গাড়িতে উঠে বসল। ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই ঋতুর রাগ যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। সে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়েই জোরে জোরে চিৎকার করে বলল,
“অসভ্য! তোকে ভালো মনে করাটাই আমার ভুল! তোকে যখনই আমি ভালো মনে করি, তুই তখনই এমন কিছু করিস যে আমার সব ধারণা ভেঙে যায়! তোর কোনোদিনও ভালো হবে না! একটা জঙ্গল কোথাকার!
পড়ন্ত বিকেল। রোদের তেজ অনেকটাই কমে এসেছে। নরম সোনালি আলোয় ভরে উঠেছে চারপাশ। বসার ঘরে পাশাপাশি বসে লুডু খেলায় মেতে উঠেছে তামজীদ আর সূচনা। অন্যদিকে রান্নাঘরে শায়লা খাতুন ও রিমা দুজন মিলে বিকেলের নাশতা তৈরিতে ব্যস্ত।
কিন্তু এসবের কিছুই যেন ঋতুর মনে ধরছে না। তার বুকের ভেতরটা কেমন অস্থিরতায় ছটফট করছে। রাফির সাথে দেখা হওয়ার পর ঘটে যাওয়া ঘটনার কথাগুলো সূচনাকে বলার জন্য ভেতর থেকে প্রচণ্ড তাগিদ অনুভব করছে সে। অথচ কাউকে কিছু বলতে গেলেই মনে হচ্ছে, যদি অন্য কেউ শুনে ফেলে? আর উল্টো যদি তাকেই বকাঝকা খেতে হয়?
এই দ্বিধা আর অস্থিরতার মাঝেই হঠাৎ বাড়ির দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল সুপ্তি। মেয়েটাকে বেশ অস্থির দেখাচ্ছে। ভেতরে ঢুকেই সে কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা গিয়ে ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিল। ঋতুর চোখ এড়াল না বিষয়টা। সুপ্তির দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। কিছু একটা বলবে, তার আগেই সুপ্তি দ্রুত নিজের ঘরের দিকে দৌড়ে চলে গেল।
ঋতু কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে ভাবল, পরে ওর সঙ্গে কথা বলে নেবে। কিছুক্ষণ পর সূচনা আর তামজিদের লুডু খেলা শেষ হলো।
খেলায় সূচনা ইচ্ছে করেই হেরে গেছে। আর নিজের চাচিমাকে হারিয়ে জয়ী হতে পেরে তামজীদের আনন্দ যেন আর ধরেই না! তার মুখের উচ্ছ্বাস দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। খেলা শেষ হতেই তামজীদ দৌড়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। সবাইকে গিয়ে আনন্দের সঙ্গে জানাতে হবে সে তার চাচিমাকে হারিয়ে দিয়েছে!
এই সুযোগটাই যেন এতক্ষণ ধরে খুঁজছিল ঋতু। তামজীদ চলে যেতেই সে ধীরে ধীরে সূচনার পাশে গিয়ে বসল। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে নিচু গলায় বলল,
“জানিস, আজকে কী হয়েছে?”
ঋতুর কণ্ঠে অস্বাভাবিক অস্থিরতা টের পেয়ে সূচনা কৌতূহলী হয়ে তার দিকে তাকাল।
“কী হয়েছে?”
ঋতু একটু ইতস্তত করে চারপাশে তাকাল। তারপর আরও নিচু গলায় বলল,
“ওই জঙ্গল…”
কথাটা শেষ করার আগেই হঠাৎ প্রণয়ের ঘর থেকে বেশ জোরালো আওয়াজ ভেসে এলো,
“সূচনা, রুমে আসো।”
প্রণয়ের কণ্ঠ শুনে সূচনার বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। তারপর বিরক্ত গলায় বলল,
“একটা মানুষ এত কম ঘুমায় কীভাবে? মাত্র তো চল্লিশ মিনিট আগে ঘুমালো, আর এত তাড়াতাড়িই ঘুম ভেঙে গেল!”
কথাটা বলে আবার ঋতুর দিকে তাকাল সে।
“তুই বল, কী হয়েছে?”
ঋতু এবারও মুখ খুলতে পারল না। তার আগেই প্রণয় উপরের করিডোরে এসে দাঁড়িয়েছে। সেখান থেকেই আবারও সূচনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি কী বললাম, তুমি শুনতে পাওনি? সূচনা, ঘরে আসো।”
প্রণয়ের কণ্ঠে এবার স্পষ্ট তাড়া। সূচনা কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। একবার প্রণয়ের দিকে, আবার ঋতুর দিকে তাকাল। ঋতু তখন মৃদু হেসে বলল,
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৭
“তুই বরং ঘরে যা, ভাইয়ার মনে হয় কিছু দরকার আছে। তোকে আমি পরে কথাগুলো বলছি।”
প্রণয়ের তাড়ার কারণে আর উপায় না দেখে সূচনা মাথা নেড়ে বলল,
“আচ্ছা, ঠিক আছে।”
কথাটা বলেই সূচনা ধীরে ধীরে প্রণয়ের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
