Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৮০

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮০

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮০
সুমাইয়া ইসলাম নূর

মাঝরাতে হঠাৎই ইনায়ার ঘুম ভেঙে গেল।
গত কয়েক দিন ধরেই নিজের শরীরটাকে কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছে তার। ঘুম ভাঙতেই স্বভাবতই পাশে হাত বাড়িয়ে ইউভিকে খুঁজল। কিন্তু পাশে কেউ নেই।ঘুমজড়ানো চোখে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ইনায়া। তারপর ধীর পায়ে পাশের রুমের দরজায় গিয়ে উঁকি দিতেই চোখে পড়ল পরিচিত দৃশ্য।ইউভি নামাজ পড়ছে।দৃশ্যটা ইনায়ার কাছে নতুন নয়। গত পাঁচ বছর ধরে প্রতিটি রাতেই কোনো না কোনো সময় ঘুম ভেঙে গেলে সে ইউভিকে এভাবেই নামাজে দেখতে পায়। এখন আর ইনায়া কে ও ডেকে তুলতে হয় না। সময় হলেই যেন তার নিজের ভেতরের অভ্যাসটাই তাকে জাগিয়ে দেয়।

ইনায়াও আর দেরি করল না। অজু করে নামাজ পড়তে চলে গেল।নামাজ শেষে দু’হাত তুলে সে বসে আছে জায়নামাজে। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে, অথচ সেই কান্না থামানোর কোনো চেষ্টা নেই।কাঁপা কণ্ঠে সে ফিসফিস করে উঠল।আল্লাহ… তুমি তো আমাকে অনেক কিছুই দিয়েছ। আমার চাওয়ার আগেই কত নিয়ামত দিয়ে আমার জীবনটা পূর্ণ করে দিয়েছ। আমার প্রিয় মানুষটাকে দিয়েছ, একটা সুন্দর সংসার দিয়েছ, ভালোবাসা দিয়েছ… তাহলে শুধু মাতৃত্বের সুখটা কেন দিলে না, আল্লাহ? পাঁচটা বছর হয়ে গেল
কথাটা বলেই তার গলা আটকে গেল। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটা যেন আর ধরে রাখতে পারল না।
দু’হাত আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল আমি কি খুব বেশি কিছু চেয়ে ফেলেছি, আল্লাহ? আমিও তো আর দশটা নারীর মতো একবার নিজের বুকের ভেতর একটা ছোট্ট প্রাণের অস্তিত্ব অনুভব করতে চাই। আমিও চাই, কেউ আমাকে ‘মা’ বলে ডাকুক আমার পিহু আর তুবাকে মা বলে ডাকার জন্য দুইটা পুচুকু আছে শুধু আমারি কেউ নেই আমি ও চাই আমার আঙুল শক্ত করে ধরে ছোট্ট দুটো হাত আমাকে নিজের পৃথিবী বানিয়ে নিক।”
ইনায়ার চোখের পানি টুপটুপ করে জায়নামাজে পড়তে লাগল।আল্লাহ, আর কত পরীক্ষা নেবে আমাকে? আমি সত্যিই ভয় পেয়ে যাচ্ছি। খুব ভয় করে, একটু থেমে কাঁপা কণ্ঠে আবার বলল আমার সবচেয়ে বেশি ভয় হয় কোথাই জানো? যদি একদিন আমার আপন মানুষগুলোও আমাকে নিয়ে হতাশ হয়ে যায়? যদি আমার এই শূন্যতার জন্য কেউ আমাকে আর আগের মতো ভালো না বাসে? যদি আমার প্রিয় মানুষটার চোখে একদিন আমার জন্য ভালোবাসার বদলে অপূর্ণতা দেখতে পাই?”

ইনায়া মুখ নিচু করে ফুঁপিয়ে উঠল।
— “আমি কাউকে হারাতে চাই না, আল্লাহ। আমি আমার সংসার হারাতে চাই না। আমি আমার মানুষটাকে হারাতে চাই না। আমি তো শুধু তার ভালোবাসার মানুষ হয়েই থাকতে চেয়েছি… তার সন্তানের মা হওয়ার স্বপ্নটাও কি তবে আমার জন্য এত বড় অপরাধ?”
কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।
— “আল্লাহ, তুমি চাইলে তো অসম্ভবও সম্ভব। তুমি চাইলে শুকনো মাটিতেও বৃষ্টি নামাতে পারো, বন্ধ দরজার পরেও পথ খুলে দিতে পারো। তাহলে আমার জন্যও একটা পথ খুলে দাও না, আল্লাহ দু’চোখ বন্ধ করে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলল আমার বুকটা যে বড় খালি লাগে, আল্লাহ। এই শূন্যতাটা তুমি ছাড়া আর কেউ বোঝে না। সবাই শুধু আমার হাসিটা দেখে, কিন্তু আমার রাতের কান্নাগুলো তো শুধু তুমিই দেখো।
শেষে দু’হাত মুখের কাছে তুলে সে অসহায় শিশুর মতো কেঁদে উঠল আল্লাহ… আমাকে মা হওয়ার সৌভাগ্য দাও। যদি আমার জন্য এতে কল্যাণ থাকে, তবে আমার এই দোয়াটা কবুল করে নিও। আর যদি আমার জন্য অন্য কোনো পরীক্ষা লেখা থাকে, তাহলে অন্তত এতটুকু শক্তি দিও—যেন তোমার সিদ্ধান্তের ওপর আমার বিশ্বাস কখনো নষ্ট না হয়।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে খুব আস্তে বলল শুধু একটা কথা মনে রেখো, আল্লাহ… আমি খুব ভীত। আমার হাতটা তুমি ছেড়ে দিও না। আমার শূন্য বুকটা তুমি তোমার রহমতে ভরে দিও।
তারপর আর মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না।ক্লান্ত হয়ে যায় নামাজের উপর শুয়ে পরলো ইনায়া।
এদিকে মোনাজাতের কথাগুলো দরজার ওপাশ থেকে শুনে যুবকটির যেন হঠাৎ সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল।দরজার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ইউভির বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। ইনায়ার প্রতিটি শব্দ যেন সরাসরি তার হৃদয়ে এসে আঘাত করছিল। এতদিন পাঁচটা বছর যে মানুষটাকে সে সবসময় হাসিখুশি দেখেছে, সেই মানুষটার বুকের ভেতর এতটা ভয় আর শূন্যতা জমে আছে—ভাবতেই তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো
সে চোখ বন্ধ করে একবার গভীর শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না।ইনায়ার কাঁদতে কাঁদতে বলা শেষ কথাটা কানে বাজতেই তার চোখের কোণ ভিজে উঠল ইউভি ধীরে ধীরে দরজার সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ইউভি ফিসফিস করে বলল “আদর…”কণ্ঠটা এতটাই ভারী ছিল যে শব্দটি দরজার ওপাশে পৌঁছাল না।তারপর চোখের পানি মুছে নিজেকে সামলে নিল
কিছুক্ষণ পর ইউভি এসে তার পাশে বসল।

তার উপস্থিতি টের পেতেই ইনায়া ধীরে ধীরে উঠে বসল। ইউভি কোনো কথা বলল না। চুপচাপ তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল।ইনায়াও কোনো প্রশ্ন করল না।আলতো হাতে স্বামীর চুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে দিতে লাগল। রাতের নিস্তব্ধতায় দু’জনের নীরবতাটুকুও যেন এক ধরনের কথোপকথন হয়ে উঠল।বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে গেল।হঠাৎ সেই নীরবতা ভেঙে ইউভি খুব শান্ত, নরম কণ্ঠে বলল আদর… বাংলাদেশে যাবে। মা-বাবাকে একটা সারপ্রাইজ দিই দুজনে। ইনায়া কৌতূহলী হয়ে তার দিকে তাকাল। মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল কখন যাবে, বর?”কখন বের হবে?”

ইউভি চোখ বন্ধ রেখেই ছোট্ট করে উত্তর দিল বিকেলে, আদর। ইনায়া মুচকি হেসে বলল যানো।প্রণয় কতবার যে ফোন করছে, । মিমি তুনি দেতে আদবে না ততক্ষণে আদবে। কথাটা শুনে ইউভির ঠোঁটেও হাসি ফুটল মৃদু হেসে বলল”দেখতে দেখতে বাচ্চাগুলো কতো বড় হয়ে গেল, তাই না আদর?
ইনায়া নীরবে তার কথাটা শুনল ইউভির কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল আমাদের আশ্রমের বাচ্চাগুলোও কতো বড় হয়ে গেছে, বর। বিশেষ করে মায়া… কী যে মায়াবী মেয়েটা হয়েছে! তুমি জানো না। ইউভি মৃদু হেসে বলল হুম, জানি আদর। গত মাসে গিয়েছিলাম তো। বেশ অনেকটা সময় ওদের সঙ্গেই কাটিয়েছি। কথাটা শুনে ইনায়ার মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।বাচ্চাগুলোর জন্য গিফট কিনতে যেতে হবে, বর। ইউভি মুচকি হেসে বলল জি, মিসেস চৌধুরী। সবই কিনব। কিন্তু এখন একটু আমাকে আদর করো। ইনায়া হেসে ফেলল।
ভোর হতে না হতেই একপ্রকার জোর করেই ইউভিকে বিছানায় নিয়ে শুইয়ে দিল সে। তারপর তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল রেস্ট নাও, মিস্টার। আর একটা দিন পরেই তো আবার বাংলাদেশে গেলে অফিস শুরু হয়ে যাবে । ইউভি চোখ মেলে তার প্রিয়তমা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

বাংলাদেশে ইউভির ব্যবসার সাম্রাজ্য যেমন বিস্তৃত, তেমনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের স্বপ্নকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে লন্ডনের মাটিতেও প্রতিষ্ঠিত করেছে ASU Group-এর শক্ত ভিত।
ASU কেবল আর দশটা নামকরা ব্র্যান্ডের মতো নয়। এর প্রতিটি পণ্যে রয়েছে আভিজাত্য, নিখুঁত কারুকাজ এবং এমন এক পরিশীলিত উপস্থাপনা, যেখানে বিলাসিতার ছাপ স্পষ্ট। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ধনী ও উচ্চবিত্ত মানুষের কাছে ASU-এর পণ্য হয়ে উঠেছে কাঙ্ক্ষিত এক নাম।
মূল্যও তেমনই—সাধারণ মানুষের নাগালের অনেকটাই বাইরে। বিশ্বের বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষদের কাছেই মূলত ASU-এর পণ্যের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। নামী ব্যবসায়ী, তারকা, শিল্পপতি থেকে শুরু করে অভিজাত সমাজের মানুষ—ASU-এর প্রতিটি নতুন কালেকশনের অপেক্ষায় থাকে তারা।আর সেই বিশাল সাম্রাজ্যের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি হলো ইউভি।
যে ছেলেটা একদিন নিজের পরিবার, নিজের শহর আর পরিচিত জীবন ছেড়ে হাজার মাইল দূরের লন্ডনে আসে শুধু নিজের স্বপ্নটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য, আজ সেই ইউভিই একজন সফল আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী।অসংখ্য রাতের পরিশ্রম, অসংখ্য কঠিন সিদ্ধান্ত, ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়ানোর জেদ সবকিছু মিলিয়েই আজকের শেহজাদ ইউভি চৌধুরী।

তার সাফল্য শুধু অর্থের হিসাবেই মাপা যায় না। কারণ তার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো নিজের স্বপ্নকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে দাঁড়িয়ে সে পেছনে ফিরে নির্দ্বিধায় বলতে পারে—
সে পেরেছে।পরিবার ছেড়ে দূরদেশে আসার সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না। কিন্তু আজ লন্ডনের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত ASU Group-এর বিশাল সাম্রাজ্যের দিকে তাকালে ইউভি বুঝতে পারে, সেই কঠিন সিদ্ধান্তটাই তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।আর সেই সাফল্যের মাঝেও তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান মানুষটি রয়ে গেছে তার পাশে ইনায়া।
ইনায়ার মধ্যেও এই কয়েক বছরে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সংসার সামলাতে পাশাপাশি এখন সে প্রায় সব রান্নাই শিখে ফেলেছে। সকাল হতেই ঘুম থেকে উঠে দু’জনের জন্য নাশতা তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে গেল।ইউভির জন্য তার ডায়েটের কথা মাথায় রেখে রাখল গ্রিলড চিকেন, অ্যাভোকাডো, টমেটো-শসার সালাদ, ডিম অল্প ওটস এবং এক কাপ গ্রিন টি চিনি ছাড়া। ইনায়ার জন্যও একই খাবার তৈরি করলো শুধু ডিম বাদে তার প্লেটে কিছুটা ফল আর হালকা টোস্ট নিয়ে গেল।

সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে ট্রে হাতে ইউভির কাছে গেল ইনায়া। ঘুমন্ত স্বামীর পাশে বসে আলতো করে তাকে ডাকতেই ইউভি ধীরে ধীরে চোখ মেলল।উঠো বর, নাশতা রেডি। ঘুমজড়ানো চোখে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল ইউভি। তারপর দু’জনে পাশাপাশি বসে নাশতা করতে শুরু করল। প্রতিদিনের মতোই ইউভি নিজের হাতে খাবার তুলে ইনায়াকে খাইয়ে দিতে লাগল।ইনায়া কিছুক্ষণ চুপচাপ খেয়ে হঠাৎ প্লেটের দিকে তাকিয়ে মুখটা একটু কুঁচকে ফেলল।প্লিজ বর, ডিম দিও না। সকালের দিকে ডিম দেখলেই আমার একদম ভালো লাগে না বমি আসে।
ইউভি কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ইনায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। তারপর শান্ত গলায় বলল আজ ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, আদর।”

কথাটা শুনতেই ইনায়ার হাত থেমে গেল। মুখের হাসিটুকুও মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। আর না, বর।”
কণ্ঠটা খুব নিচু হয়ে এলো এই পাঁচটা বছরে কম চেষ্টা করেছি? প্রতিবার চেকআপের পর ওই খালি হাতেই তো ফিরতে হয়। বিষয়টা আমাকে খুব কষ্ট দেয়, বর। প্লিজ… আর বলো না। আমি আর সহ্য করতে পারি না।
ইউভি তার কষ্টটা বুঝতে পারল। আর কোনো জোর করল না। নরম গলায় বলল ঠিক আছে, বউ। যেতে হবে না। তবে একটু পরে আমরা দু’জনে বের হব।”
ইনায়া এবার কৌতূহলী চোখে তাকাল।কোথায়?”
ইউভি কোনো উত্তর না দিয়ে মুচকি হাসল। তারপর খাবার শেষ করতে করতে বলল
মা বাবার বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে কিছু উপহার কিনতে হবে ইনায়ার চোখে এবার হালকা কৌতূহলের ঝিলিক ফুটে উঠল।হুম… যাব, বর।”

ইউভি খাবার খেতে খেতেই কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একটু ঝুঁকে এসে আলতো করে তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
মৃদু স্বরে বলল বড্ড ভালোবাসি, বউ।ইনায়ার ঠোঁটেও ফুটে উঠল কোমল হাসি।সে ধীরে ধীরে বলল আমিও তোমাকে বড্ড ভালোবাসি, বর। ভালোবাসার থেকেও বেশি ভালোবাসি।”

চৌধুরী বাড়িজুড়ে আজ যেন ছোটখাটো এক উৎসবের আমেজ তৈরী করেছে সবাই। বাড়ির প্রতিটি কোণায় ব্যস্ততা, হাসি-আনন্দ আর বাচ্চাদের ছোটাছুটিতে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো বাড়ি। আজ রাতিব চৌধুরী ও রেসমা চৌধুরীর বিবাহবার্ষিকী।
দেখতে দেখতে আয়াত, আতিকা আর রিদও অনেক বড় হয়ে গেছে। আয়াত আর আতিকা এখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে, আর রিদ খুব শিগগিরই এসএসসি পরীক্ষায় বসবে। সময় যেন চোখের পলকেই কেটে গেছে।তবে বাড়ির ছোট দুটো সদস্যর বয়স বাড়লেও দুষ্টুমি একটুও কমেনি। সারাক্ষণ দৌড়াদৌড়ি আর চিৎকার-চেঁচামেচি করে তারা পুরো বাড়িটাই মাথায় তুলে রেখেছে।
এরই মধ্যে রিমঝিম মির্জা আর রাশেদ মির্জাও এসে পৌঁছেছে। সঙ্গে তাদের ছোট্ট রাজপুত্র—রৌদ্রিক মির্জা।রৌদ্রিককে দেখামাত্রই প্রণয় ছুটে গেল তার কাছে।

— “এই ফ্লেন তুমি এতেতো প্রণয়ের চোখেমুখে উত্তেজনার ঝিলিক বয়ে গেল। রৌদ্রিকও তার কথা শুনে খুশিতে হেসে উঠল। দু’জনে গল্প করতে করতে, খেলতে খেলতে ছুটে চলে গেল বাগানের দিকে।এদিকে পিয়াসাও আজ সবার সঙ্গে কাজে ব্যস্ত। অফিসের কাজের পাশাপাশি এখন বাচ্চা সামলানো সাথে মায়েদের কাজে সাহায্য করাও যেন তার প্রতিদিনের জীবনেরই অংশ হয়ে গেছে সবাই মানা করলে ও সে সোনে না সে একটু একটু করে রান্না শিখছে।আজ লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, রোবিউল চৌধুরী, রেদোয়ান, পিয়াসা—কেউই অফিসে যায়নি। একে একে বাড়ির সব অতিথিরা এসে হাজির হয়েছে। এতদিন পর সবাই একসঙ্গে হয়েছে।
কিছুক্ষণ পর তুবা রাজ্জো আর রানীকে সঙ্গে নিয়ে এসে পৌঁছাল।তুবা নিজের স্বপ্নকে সত্যি করে সে এখন একজন সফল গাইনোকোলজি ডাক্তার। নিজের পরিশ্রম আর অধ্যবসায় দিয়ে সে প্রমাণ করে দিয়েছে ইচ্ছেটা সত্যি হলে স্বপ্নও একদিন বাস্তব হয়।পিয়াসা তুবাকে দেখামাত্রই দ্রুত তার দিকে এগিয়ে গেল।

বেচারদ তুবা মনে করল, পিয়াসা বুঝি তাকে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু না! তুবাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে পাশ কাটিয়ে সে সোজা রানীর কাছে চলে গেল এবং তার কাছ থেকে তুর্যকে কোলে তুলে নিল।তুবা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো । তুর্য ছোট্ট দু’হাত দিয়ে পিয়াসাকে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল মিমি মা, পোতা আমাতে থুদু বতা দেই”
পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে তুবার দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাল এই! তুই আমার বাবাকে বকিস কেন? তুবা পালটা উত্তর দিলো এতো বিরক্ত করে কেন। পিয়াসা রেগে বললো ও তো ছোট ও বিরক্ত করবে না তো কে করবে পেছন থেকে প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল আমি তি অনেত বল পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে বললো না বাবা তুমি ও ছোট তালে পনয় তে তুমি বকা দাও তেনো পিউ। পিয়াসা চমকে পেছনে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল তুই কী বললি?!”
প্রণয় অবশ্য ততক্ষণে নিরাপদ দূরত্বে সরে গেছে লিখন চৌধুরীর পিছু গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ।
তারপর পিয়াসা ছুটে গিয়ে লিখন চৌধুরীর কাছে নালিশের সুরে বলল দেখছো বাবা? আমাকে নাম ধরে ডাকল! কত বড় সাহস! এরপর আবার ওকে মার দিলে তোমরাই আমাকে বকবে!”লিখন চৌধুরী মুখ গম্ভীর রাখার চেষ্টা করলেও আশপাশের সবার মুখে তখন হাসি ফুটে উঠেছে। প্রণয়ও দূর থেকে দাঁত বের করে হাসছে।

ঠিক তখনই—
হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
এক মুহূর্তেই বাড়ির ভেতরের কোলাহল থেমে গেল। সবাই একসঙ্গে সেদিকেই তাকিয়ে রইল।গাড়ি থামার শব্দের পর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বাড়ির প্রধান দরজা দিয়ে দু’জন পরিচিত মানুষকে দেখা গেল।ইনায়া আর ইউভি।দু’জন পাশাপাশি হেঁটে চৌধুরী ভিলার ভেতরে প্রবেশ করছে। ইউভি শক্ত করে ইনায়ার হাত ধরে আছে। তাদের দেখামাত্রই পুরো বাড়ির প্রতিটা সদস্যর আনন্দের ফেটে পড়ল।বাচ্চাদের চিৎকারে মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশ মুখর হয়ে উঠল প্রনয় চিৎকার করে বললো
— “মিমি এতেতে বাবাই এতেতে! বাচ্চাদের সেই উচ্ছ্বসিত চিৎকার শুনে বাড়ির গিন্নিরাও আর বসে থাকতে পারলেন না। একে একে সবাই বাইরে বেরিয়ে এলেন। প্রণয় আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে ছুটে গেল তাদের দিকে।দৌড়াতে দৌড়াতে দুজনের কাছে পৌঁছে দু’হাত বাড়িয়ে আদুরে গলায় বলে উঠল “আমাল মিমি অমাল বাবাই।

ইনায়া প্রণয়কে কোলে তুলে নিল। তারপর তুর্যকেও নিজের কোলে নিয়ে দু’পাশে দুটো ছোট্ট প্রাণকে জড়িয়ে ধরল। একে একে দুজনের গালে চুমু খেতে খেতে চোখ বন্ধ করে তাদের নিজের বুকের সঙ্গে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।আমার দুইটা কলিজা…দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে নুসরাত চৌধুরী, সাবিহা চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে হঠাৎ মৃদুআক্ষেপের সুরে বলে উঠলেন আজ যদি আমার নূরের কোলটাও এমন করে আলোকিত করে আল্লাহ একটা বাচ্চা দিতেন! কথাটা কানে যেতেই রেসমা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক করে বললেন খবরদার, মেজো! দ্বিতীয়বার যেন এই কথাটা তোর মুখে না শুনি। আল্লাহ যেদিন চাইবেন, সেদিনই নূরের কোল আলো করে সন্তান দেবেন। সবকিছুরই তো একটা নির্দিষ্ট সময় আছে।

আর নূর যদি এসব কথা শোনে, ওর খুব কষ্ট হবে। ওর মনে এমনিতেই অনেক কষ্ট জমে আছে। আমাদের উচিত ওকে আরও ভালোবাসা দেওয়া, কোনো কথায় যেন ওর সেই কষ্টটা আবার জেগে না ওঠে। নুসরাত চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেলেন। তাঁর মুখেও অনুশোচনার ছাপ ফুটে উঠল।এদিকে ইনায়া প্রণয় আর তুর্যকে কোলে থেকে নামিয়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে রৌদ্রিককে খুঁজতে লাগল। কিছুক্ষণ পরই তার চোখে পড়ল—রৌদ্রিক ইউভির কোলে উঠে বসে আছে। ইউভি তাকে নিয়ে বেশ মনোযোগ দিয়ে গল্প করছে।
মুহূর্তেই ইনায়ার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।

এরপর একে একে বাড়ির প্রতিটি সদস্যের সঙ্গে কথা বলল সে। এতদিন পর সবাইকে একসঙ্গে কাছে পেয়ে তার চোখেমুখে যেন অন্যরকম আনন্দের ছাপ ফুটে উঠেছে একসময় ইনায়া রেসমা চৌধুরীর হাতটা আলতো করে ধরে তাকে নিয়ে এগিয়ে গেল লিখন চৌধুরীর কাছে। দুজনকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে নিজেই দুজনকে একসঙ্গে জড়িয়ে ধরে হাসিমুখে বলল হ্যাপি অ্যানিভার্সারি! দোয়া করি, তোমাদের দাম্পত্য জীবনটা এভাবেই সারাজীবন হাসি-আনন্দে ভরে থাকুক কি গিফট চাই বলো দুজনে লিখন চৌধুরীর চোখেমুখে মুহূর্তেই স্নেহের ছাপ ফুটে উঠল। তিনি ইনায়াকে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে কপালে স্নেহের চুমু দিয়ে বললেন “আমাদের সবচেয়ে বড় উপহার তো আমরা পেয়েই গেছি। নূর, তোরা দুজন এসেছিস—এটাই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।”
তার কণ্ঠে আনন্দ থাকলেও এতদিন পর প্রিয় দুটো মানুষকে সামনে পেয়ে জমে থাকা আবেগটা যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল।

অন্যদিকে ইউভি, রেদোয়ান আর রাজ্জো নিজেদের আড্ডায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তিনজনের কথাবার্তা আর হাসিতে একপাশটা জমে উঠেছে।ইনায়া এবার এগিয়ে গিয়ে রাতিব চৌধুরীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।বাবা… তোমাকে অনেক মিস করেছি।”
রাতিব চৌধুরীও মেয়েকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন কয়েকটা দিন থাকবি তো?”
ইনায়া মুচকি হেসে বাবার বুক থেকে মুখ তুলে বলল চেষ্টা করব, বাবা। ঠিক তখনই আয়াত, আতিকা আর রিদ ছুটে এসে একসঙ্গে বলে উঠল আপু, আমাদের গিফট এনেছ? তাদের উৎসুক মুখ দেখে ইনায়া হেসে ফেলল।সবাই গিফট পাবে। আগে পার্টি শেষ হোক, তারপর একে একে সবার হাতে তুলে দেব।
কথা শেষ করতেই রিটা এসে ইনায়ার লাগেজগুলো নিয়ে সযত্নে একপাশে রেখে দিল।ইনায়া এরপর পিয়াসা আর তুবার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠল। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা বলার পর হঠাৎই তার শরীরটা কেমন যেন খারাপ লাগতে শুরু করল। মাথার ভেতরটা অদ্ভুত ভারী হয়ে এলো, শরীরেও যেন হঠাৎ দুর্বলতা নেমে এল।ইনায়া কথার মাঝেই নিজেকে সামলে নিয়ে রিতার দিকে তাকাল।

রিটা.. আমি একটু উপরে যাচ্ছি। তুমি একটু আমার সঙ্গে এসো।”ইনায়া উপরে ওঠার সময় একবার পেছন ফিরে ইউভির দিকে তাকাল। দূর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, কতটা হাসিখুশি হয়ে সবার সঙ্গে গল্পে মেতে আছে মানুষটা। সেই দৃশ্য দেখে ইনায়ার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তারপর ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।রিটাও একে একে সব লাগেজ নিয়ে তার পেছন পেছন উপরে চলে এল। ইনায়ার মুখের ক্লান্তি চোখে পড়তেই সে দ্রুত এগিয়ে এল।
ইনায়া ক্লান্ত কণ্ঠে বলল রিটা কিছু মনে না করলে একটা কথা বলব? রিটা সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টি হেসে বলল বলেন না, ম্যাম। ইনায়া একটু ইতস্তত করে বলল একটু মাথাটা ম্যাসাজ করে দেবে? বড্ড ক্লান্ত লাগছে। এটা আবার মনে করার কী আছে, ম্যাম?

রিটা সঙ্গে সঙ্গে ইনায়াকে বসিয়ে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর রিটা মৃদু হেসে বলল আপনি সবসময় আমাদের নিজের বডিগার্ডের চেয়ে বেশি বন্ধু ভেবেছেন। কখনো আমাদের ওপর মালিকের মতো হুকুম করেননি। বরং নিজের মানুষ ভেবে সবসময় বুকে টেনে নিয়েছেন। আমাদের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেন, যেন আমরা আপনার পরিবারেরই একজন। সত্যি বলছি ম্যাম, আপনার মতো একজন মানুষকে নিজের মালিক হিসেবে পাওয়াটা আমার জন্য ভাগ্যের ব্যাপার। আপনি শুধু আমাদের কাজ দেননি, সম্মানও দিয়েছেন।

আমাদের সুখ-দুঃখের কথাও জানতে চেয়েছেন। তাই আপনাকে শুধু ম্যাম বলতে গেলেও কোথাও যেন মনে হয়, আপনি তার চেয়েও অনেক বেশি আপন। রিটার কথাগুলো শুনে ইনায়া মৃদু হেসে চোখ বন্ধ করে রইল।কিন্তু হঠাৎই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন উল্টেপাল্টে উঠল।ইনায়া আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে মুখ চেপে ধরে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে ছুটে গেল ম্যাম! রিটাও সঙ্গে সঙ্গে তার পেছনে ছুটল।ওয়াশরুমে ঢুকতেই ইনায়া বমি করতে শুরু করল। কিছুতেই যেন থামছে না। রিটা উৎকণ্ঠিত হয়ে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।ম্যাম, আজ তো বমি থামছেই না! ইউভি স্যারকে ডাকি?
ইনায়া কোনোভাবে মাথা নেড়ে তাকে থামিয়ে দিল।

না… রিটা কণ্ঠটা দুর্বল, তবু কথাগুলোর মধ্যে অদ্ভুত এক অনুরোধ ফুটে উঠলো দেখছ না, উনি কতটা হাসিখুশি আছেন? এতদিন পর সবাইকে পেয়ে কত খুশি এখন ওনাকে কিছু বলো না। প্লিজ।”
রিটা আর কিছু বলল না। শুধু উদ্বিগ্ন চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।অবশেষে বেশ কিছুক্ষণ পর ইনায়ার বমি থামল। রিটা তাকে ধরে ধীরে ধীরে ঘরে নিয়ে এসে বিছানায় বসিয়ে দিল।দুজনের মাঝখানে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে রইল।তারপর রিটা ধীরে ধীরে বলল ম্যাম… একটা কথা বলব? ইনায়া ক্লান্ত চোখে তাকাল।
— “হুম?”
রিটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলল আজ প্রায় এক মাস ধরে আমি আপনার কিছু বিষয় খেয়াল করছি। আমি নিজেও একটা বাচ্চার মা, তাই কিছু জিনিস এখন বুঝতে পারি। এতদিন শুধু এই ভেবে কিছু বলিনি, যদি আপনি কষ্ট পান। কিন্তু আজ আর চুপ থাকতে পারছি না। ইনায়ার বুকটা কেমন ধক করে উঠল।রিটা ধীরে ধীরে বলল আপনার মধ্যে… প্রেগন্যান্সির অনেকগুলো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে, ম্যাম। কথাটা শুনে ইনায়া যেন পাথর হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড তার চোখের পলকও পড়ল না।
তারপর কাঁপা কণ্ঠে বলল তুমি… কী বলছ, রিটা?”
রিটা চোখের পানি সামলাতে না পেরে বলল আপনি আরেকবার টেস্ট করে দেখুন না, ম্যাম। ইনায়ার চোখ মুহূর্তেই ভিজে উঠল।

তুমি বলছ আমার মধ্যে সত্যিই ওই লক্ষণগুলো আছে? রিটা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।কাঁপা হাতে সে ইনায়ার লাগেজের কাছে গিয়ে তার মেডিসিন বক্স খুলল। সেখান থেকে একটি প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট বের করে ইনায়ার হাতে দিয়ে বলল প্লিজ, ম্যাম… একবার পরীক্ষা করে দেখুন। ইনায়া আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।কাঁপতে থাকা হাতেই কিটটা নিয়ে প্রায় দৌড়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে ভেসে এল তার কাঁপা কণ্ঠ রিটা .. কিটটা নষ্ট। আরেকটা দাও।”রিটা দ্রুত আরেকটি কিট এগিয়ে দিল।আবারও কিছুক্ষণ পর একই কণ্ঠ শোনা গেল রিরা… এটাও মনে হয় নষ্ট। আরেকটা দাও। রিটার বুকের ভেতরটাও এবার কাঁপতে শুরু করেছে।তৃতীয় কিটটা হাতে নিয়ে ইনায়া আবার ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।সময় যেন হঠাৎ থেমে গেল।
রিটদ দরজার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ ইনায়া চিৎকার শোনা গেল রিটা…!”

কণ্ঠটা এমনভাবে কেঁপে উঠল যে রিটার বুক ধক করে উঠল।সে দ্রুত ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকল।
তারপর যা দেখল, তাতে কয়েক মুহূর্তের জন্য তার নিজেরও নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।কাঁপতে থাকা হাতে ইনায়া টেস্ট কিটটা ধরে আছে।কিটে স্পষ্ট দুটি দাগ।রিটা অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল ম্যাম… কিট নষ্ট হয়নি। ইনায়া স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।রিটা কাঁদতে কাঁদতেই বলল এটা পজিটিভ, ম্যাম আপনি… আপনি প্রেগন্যান্ট!”
ইনায়া নিজের মুখ দু’হাত দিয়ে ঢেকে ফেলল।

তার শরীর কেঁপে উঠল প্রবলভাবে।ধীরে ধীরে দেয়াল ছেড়ে নিচে বসে পড়ল সে। তারপর মেঝেতে বসেই ফুঁপিয়ে একেবারে বুকভাঙা কান্নায় কেঁদে উঠল। আল্লাহ…শব্দটা যেন তার বুকের গভীরতম স্থান থেকে বেরিয়ে এল।সত্যি…?”রিটা দ্রুত তার পাশে বসে তাকে সামলাতে লাগল।ম্যাম, শান্ত হন। প্লিজ এত কাঁদবেন না। কিন্তু ইনায়ার কান্না থামার নামই নেই।পাঁচ বছর। দীর্ঘ পাঁচটা বছর ধরে যে স্বপ্নের জন্য সে রাতের পর রাত জায়নামাজে কেঁদেছে, অসংখ্যবার খালি হাতে ফিরে এসেছে, নিজের বুকের শূন্যতাকে লুকিয়ে হাসিমুখে থেকেছে আজ হঠাৎ সেই স্বপ্নটাই কি সত্যি হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়েছে?
তার কাঁপা ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এল রিটা সত্যি বলছ? এটা কি সত্যি?”রিটা তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বলল “হ্যাঁ, ম্যাম। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য অবশ্যই ডাক্তার দেখাতে হবে। কিন্তু… কিটে পজিটিভ এসেছে। ইনায়া রিটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।তার কান্নার শব্দে আনন্দ, অবিশ্বাস, ভয়—সবকিছু একাকার হয়ে গেল।আমি… মা হতে চলেছি? রিটা তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল হ্যাঁ ম্যাম… আল্লাহ আপনার দোয়া শুনেছেন।”
ইনায়া চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে মুখ তুলে ফুঁপিয়ে উঠল আলহামদুলিল্লাহ. তারপর আবার কেঁদে উঠল সে।তবে এবার সেই কান্নায় শূন্যতা নেই।

আছে অবিশ্বাস্য এক সুখ।
রিতা অনেক কষ্টে তাকে শান্ত করে ঘরে নিয়ে এল।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে আয়াতের কণ্ঠ ভেসে এল আপু! অতিথিরা সবাই চলে আসছে। কেক কাটবে! নিচে আসো! ইনায়া চোখের পানি মুছতে চেষ্টা করল।কিন্তু পারল না।রিটা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল ম্যাম, স্যারকে ডেকে নিয়ে আসি? মানুষটা খবরটা শুনলে তো আনন্দে পাগল হয়ে যাবে! ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
চোখের কোনে পানি চিকচিক করছে কিন্তু সেই পানির আড়ালে ফুটে উঠেছে অন্যরকম এক আলো।সে লাগেজ খুলে সেখান থেকে সাদা গাউনটা বের করল।কাঁপা হাতে পোশাকটা ধরে রাখতে পর্যন্ত পারছে না।রিটা সব বুঝে গেল।

নরম গলায় বলল আপনি বসুন ম্যাম। আমি আপনাকে রেডি করে দিচ্ছি। ইনায়া কোনো কথা বলল না।শুধু চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল।
রিতা তাকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করে দিল।
নিচে চৌধুরী বাড়ির সবাই তখন ইনায়ার জন্য অপেক্ষা করছে।ইউভি চারপাশে একবার তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল।আমি নিয়ে আসছি আদরকে।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৯ (৩)

এতটা পথ জার্নি করে আদর অনেক ক্লান্ত হয়ে গেছে। তোমরা অপেক্ষা করো একটু। কথাটা বলে ইউভি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।কিন্তু দু’পা যেতেই তার চোখ থেমে গেল। সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আছে ইনায়া। তার দেওয়া সেই সাদা গাউনটায় তাকে যেন অন্যরকম লাগছে। এক হাত সিঁড়ির রেলিংয়ে রাখা। চোখের কোণ এখনো ভেজা। ঠোঁট কাঁপছে সামান্য।
সবাই নিচ থেকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু ইউভি

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮০ (২)