Home প্রণয়ের নব্য সূচনা প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩০

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩০

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩০
insia isha chowdhury

সোহেল সামিরা হোসেনের পা জড়িয়ে ধরে বসে আছে। কিছুতেই সে তার মায়ের পা ছাড়তে রাজি নয়। সামিরা বেশ কিছুক্ষণ ছেলের কাণ্ডকারখানা দেখার পর অবশেষে বিরক্ত হয়ে হাতের কাছে থাকা একটি নোটবুক দিয়ে ছেলের মাথায় আলতো করে বাড়ি দিলেন। তারপর বিরক্ত কণ্ঠে বললেন,
“কী ব্যাপার সোহেল? কী হয়েছে তোর? এমন করছিস কেন? বাপ আমার, আরও অনেক কাজ আছে। তুই আসলে কী করতে চাইছিস?”
এতক্ষণে সোহেল বুঝতে পারল, এবারই উপযুক্ত সময় নিজের মনের কথাটা মাকে বলার। তাই আর দেরি না করে এক নিঃশ্বাসে গড়গড় করে বলে উঠল,

“মা, আমার ভালোবাসার মা! আমার সবকিছু তুমি, মা!”
“হয়েছে হয়েছে, বুঝেছি! কিছু একটা দরকার বলেই তুই এত ভালোবাসা দেখাচ্ছিস। কী হয়েছে, তাড়াতাড়ি বল। আর আমাকে উঠতে দিচ্ছিস না কেন? আমার আরও অনেক কাজ বাকি।”
সোহেল এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
“তার আগে বলো, তুমি বাবার সঙ্গে কথা বলে বাবাকে রাজি করাবে।”
সামিরা ভ্রু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আশ্চর্য! আমি তো বুঝতেই পারছি না তুই কী বলছিস। তোর বাবাকে আবার কিসের জন্য রাজি করাব?”
সোহেল এবার নত মুখে ধীর কণ্ঠে বলল,
“মা, আমি একটা মেয়েকে পছন্দ করেছি। বলতে গেলে, আমি ওকে খুব ভালোবাসি। আমি ওকে বিয়ে করতে চাই।”

সামিরা হতভম্ব হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মুখ বাঁকিয়ে মৃদু বিদ্রূপের সুরে বললেন,
“আচ্ছা, তো এই ব্যাপার! এই জন্যই এত ভালোবাসা উথলে পড়ছে! এই জন্যই সকালবেলা থেকে নিজের মাকে রান্নাঘরের কাজে সাহায্য করা হচ্ছে। আমি তো বুঝতেই পারছিলাম, কিছু একটা চলছে তোর মাথায়। তুই তো এমনি এমনি সাহায্য করার মানুষ না!”
সোহেল সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলল,
“এভাবে বলছ কেন, মা? আমি কি তোমাকে সাহায্য করি না?”
“ঠিক আছে, বুঝেছি। তবে তোরও তো বিয়ের বয়স হয়েছে। বিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু মেয়েটা কে?”
সোহেল কিছু বলার আগেই রাশেদ হোসেন ড্রয়িংরুমে এসে উপস্থিত হলেন। সোহেল মায়ের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল,
“মা, মেয়েটা প্রণয়ের বোন।”

কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না সোহেল। দ্রুত পায়ে সেখান থেকে চলে গেল। সে বেশ ভালোভাবেই জানে, এবার তার মা-ই বাকি সবকিছু সামলে নেবেন। রাশেদ হোসেন সোফায় বসে হাতে থাকা খবরের কাগজটি মেলে ধরতেই সামিরা স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“শুনছেন, আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে।”
রাশেদ হোসেন এক পলক স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“হ্যাঁ, বলো। কী বলবে?”
সামিরা একটু গুছিয়ে নিয়ে বললেন,
“বলছিলাম, তোমার ছেলের তো বিয়ের বয়স হয়েছে। ওর বিয়ের ব্যাপারে কিছু ভেবেছ?”
রাশেদ হোসেন খবরের কাগজে চোখ রেখেই বললেন,
“এখনকার ছেলেদের বিয়ের ব্যাপারে আবার কী ভাবব? নিশ্চয়ই নিজের কোনো পছন্দ-অপছন্দ আছে!”
সামিরা মৃদু হেসে বললেন,

“সেটাই তো আছে। তবে তোমার ছেলে পছন্দ করার জন্য আর কাউকে পেল না, শেষে কিনা নিজের বন্ধুর বোনকেই পছন্দ করল!”
রাশেদ হোসেন এবার খবরের কাগজটা নামিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
“বন্ধুর বোন? কোন বন্ধুর কথা বলছ?”
“প্রণয়ের বোনকে পছন্দ করেছে। ওই যে, একবার বাসায় এসেছিল। মনে নেই? যদিও অনেক বছর আগে এসেছিল। এখন তো মেয়েটা নিশ্চয়ই বড় হয়ে গেছে।”
রাশেদ হোসেন এবার যেন বিষয়টা মনে করতে পারলেন। মাথা নেড়ে বললেন,
“আচ্ছা, আচ্ছা! পরিবার তো বেশ ভালোই। প্রণয়কে দেখেছি, ছেলেটাও ভালো। তাহলে ওর বোনও নিশ্চয়ই ভালোই হবে। আর ছেলের পছন্দ বলে কথা, একেবারে না করেও তো থাকা যায় না।তা মেয়ের পুরো নাম কী?”
সামিরা উত্তর দিলেন,

“সিদরাতুল ঋতু মির্জা।”
রাশেদ হোসেন কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার জানতে চাইলেন,
“তা, তোমার ছেলে তোমাকে কী বলে গেল এ বিষয়ে?”
সামিরা মৃদু হাসলেন।
“তোমার ছেলে চাইছে, ঋতুকে বিয়ে করতে। কথাগুলো যখন বলল আমার ছেলেটা ভীষণ খুশি হয়েছিল। তো আমরা যদি মেয়ের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাই। তাহলে তো আমার ছেলে আরও বেশি খুশি হবে।”
রাশেদ হোসেন আর কোনো আপত্তি করলেন না। বরং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,
“ঠিক আছে। একমাত্র ছেলের জন্য এতটুকু তো করাই যায়।”

আজ আকাশটাও কেমন যেন মেঘলা মেঘলা। কখনো ঘন কালো মেঘের চাদরে আকাশটা ঢেকে যাচ্ছে, আবার ঠিক তার কিছুক্ষণ পরেই সেই মেঘের আড়াল ভেদ করে সূর্য মামা উঁকি দিচ্ছে। প্রকৃতির এই লুকোচুরি খেলায় বোঝারই উপায় নেই কখন বৃষ্টি নামবে আর কখন রোদের মিষ্টি হাসি চারপাশটা ভরিয়ে দেবে।
এমন এক মায়াময় আবহাওয়ায় নিজের ঘরের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে সূচনা। মৃদু বাতাসে তার চুলের কয়েক গোছা বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছে। অথচ সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তার। আজ যে বহু বছর পর আবার ও রং-তুলির জগতে ফিরে এসেছে সে।
শৈশব থেকেই ছবি আঁকার প্রতি সূচনার এক অদ্ভুত ভালোবাসা ছিল। রঙের মাঝে নিজের মনের কথাগুলো খুঁজে পেত সে। কিন্তু নানা কারণে সেই ভালোবাসাটা কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ একটা সময় পর আজ আবারও তার আঙুলের ফাঁকে ধরা পড়েছে রংতুলি। বেশ কিছুদিন আগেই প্রণয় অনলাইন থেকে ছবি আঁকার জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় জিনিস অর্ডার করে রেখেছিল। কাল সেগুলো হাতে পাওয়ার পর থেকেই সূচনার আনন্দ যেন আর ধরে না। একে একে রং, তুলি, ক্যানভাস আর ছবি আঁকার অন্যান্য সরঞ্জামগুলো দেখে তার চোখেমুখে যে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস ফুটে উঠেছিল, তা দেখে প্রণয়ের ঠোঁটেও মৃদু হাসি ফুটে উঠেছিল।

আজ প্রণয় বাড়িতে নেই। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ একটি মিটিংয়ের কাজে তাকে বাইরে যেতে হয়েছে। আর সেই সুযোগেই সূচনা নিজের পুরোনো ভালোবাসাটাকে একটু সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্যালকনির একপাশে ছোট্ট একটা টেবিল টেনে নিয়ে তার ওপর ক্যানভাসটা সুন্দর করে বসিয়ে নিল সে। পাশে সাজিয়ে রাখল রং আর তুলি। চারপাশের মেঘলা আকাশ, হালকা বাতাস। সব মিলিয়ে পরিবেশটাকে তার কাছে আজ ভীষণ আপন মনে হচ্ছে। মনে হলো, এমন সুন্দর একটা দিনে কিছু একটা আঁকা যাক। একটু মৃদু হেসে সূচনা রঙের প্লেটটা নিজের দিকে টেনে নিল। তুলি হাতে নিয়ে ক্যানভাসের দিকে মনোযোগ দিয়ে বেশ কিছু সময় নিয়ে নিজের কাজটা করল। আর কিছুক্ষণ পর ‌হঠাৎ করেই তার পাশে রাখা ফোনটা বেজে উঠল।
ঝনঝন শব্দে বেজে ওঠা ফোনটার দিকে সূচনা তাকাল। হাতের তুলিগুলো সাবধানে একপাশে রেখে ফোনটা তুলে নিল সে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নম্বরটা দেখেই মুহূর্তেই তার ভ্রু দুটো কিঞ্চিৎ কুঁচকে গেল। অপরিচিত একটি নম্বর। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে নম্বরটার দিকে তাকিয়ে রইল সূচনা।
ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক চেনা, বহু পরিচিত কণ্ঠস্বর,

“সুজি, আমি রাফি বলছি।”
কণ্ঠস্বরটা শুনেই সূচনার চোখেমুখে খানিকটা বিস্ময় ফুটে উঠল। অবাক স্বরে বলল,
“ভাইয়া, তুমি?”
“হ্যাঁ, তোর সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
রাফির কণ্ঠে কেমন যেন একটা গাম্ভীর্য। কথাগুলো শুনে সূচনার ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে গেল। তার সঙ্গে আবার কী এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা থাকতে পারে? মনে মনে নানা প্রশ্ন উঁকি দিলেও শেষ পর্যন্ত বলল,

“হ্যাঁ, বলো। কী গুরুত্বপূর্ণ কথা?”
ওপাশ থেকে রাফি কিছুক্ষণ নীরব থেকে নাকচ করার ভঙ্গিতে বলল,
“না, এই কথাটা ফোনে বলা যাবে না। আমি চাইছি তোর সঙ্গে দেখা করে কথাটা বলতে।”
রাফির কথায় সূচনা খানিকটা ভেবে নিল। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, রাফি প্রথমবার তাদের বাড়িতে আসার দিনটার কথা। সেদিন ঠিকমতো ভাইয়াকে আপ্যায়ন পর্যন্ত করতে পারেনি সে। বরং তার উপস্থিতিতে উল্টো কত ঝামেলাই না তৈরি হয়েছিল! সেই কথা মনে পড়তেই এবার যেন তার ভেতরটা একটু নরম হয়ে এলো। মনে হলো, ভাইয়া যখন দেখা করতে চাইছে, তাহলে বরং বাড়িতেই আসুক। অন্তত এবার ঠিকমতো বসে কথা বলা যাবে। তাই কিছুটা খুশি হয়েই বলল,
“ও আচ্ছা, এই ব্যাপার! দেখা করতে চাও তাহলে তুমি বাসায় চলে আসো।”
কিন্তু সূচনার কথায় রাফি যেন সন্তুষ্ট হলো না। সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
“না। আসলে আমি তোর সঙ্গে একটু আলাদা একটা জায়গায় দেখা করতে চাই।”
সূচনার কপালে এবার হালকা ভাঁজ পড়ল।

“আলাদা জায়গায়?”
“হ্যাঁ। কোনো নিরিবিলি জায়গায়। তুই একটা কাজ কর, তোর বাসার আশেপাশে যে রেস্টুরেন্টগুলো আছে, তার কোনো একটা রেস্টুরেন্টে চলে আয়।
আচ্ছা তুই এত টেনশন করিস না আমি তোকে লোকেশন পাঠিয়ে দেব। আর সেটা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে তুই বাড়ি থেকে বের হ। আমি তোকে পিক করে নিয়ে যাব।”
রাফির কথায় সূচনা এবার সত্যিই কিছুটা অবাক হয়ে গেল।
“এখন এই মুহূর্তে বাসা থেকে বের হব?”
ওপাশে রাফি যেন একটু বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর খানিকটা একঘেয়ে, তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“কেন? তোর শ্বশুরবাড়ি থেকে কি তোর বাইরে যাওয়ার কোনো পারমিশন নেই? নাকি এখন তুই সেই অধিকারটাও হারিয়ে ফেলেছিস?”
রাফির কথায় সূচনা থমকে গেল। কথাটা তার কানে কেমন যেন বিঁধল। তবে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“না, এমন কিছু না। কিন্তু…”
সূচনার কথা শেষ হওয়ার আগেই রাফি তাকে থামিয়ে দিল।
“আর কয়েকটা দিনই আমি দেশে আছি, সুজি। তারপরই চলে যাব। যাওয়ার আগে তোর সঙ্গে কিছু কথা বলে যেতে চাই। খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা। আশা করি তুই বিষয়টা বুঝবি। আর অন্তত আমার এই কথাটা রাখার চেষ্টা করবি।”
রাফির কণ্ঠের গাম্ভীর্য এবার সূচনাকে একেবারে চুপ করিয়ে দিল। বুঝতে পারল না, কী এমন কথা যার জন্য রাফি ফোনে বলতেও রাজি নয়। দেখা করেই বা কী বলতে চায়? একটা মানুষ আর মাত্র কয়েকটা দিন পরেই দেশ ছেড়ে চলে যাবে। হয়তো সত্যিই এমন কিছু কথা আছে, যা যাওয়ার আগে তাকে বলতে চাইছে। পরক্ষণেই আবার সূচনার মনে আরেকটা চিন্তা উঁকি দিল। প্রণয় যদি বিষয়টা জানতে পারে? তাহলে আবারও কি কোনো ঝামেলা তৈরি হবে? সেটা ভাবতেই সূচনার বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল।
তবুও রাফি যেভাবে বারবার অনুরোধ করছে, তাতে এবার আর তাকে ফিরিয়ে দিতে পারল না সূচনা। কিছুক্ষণ নীরব থেকে শেষ পর্যন্ত ধীর কণ্ঠে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে ভাইয়া, আমি আসব।”
সূচনার সম্মতি শুনে ওপাশ থেকে রাফির কণ্ঠটা এবার কিছুটা স্বস্তির শোনাল,
“ঠিক আছে।”
সূচনা একবার গভীর দৃষ্টিতে ক্যানভাসে আঁকা চিত্রটির দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ নীরবে সেটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর ছবিটা যত্ন করে হাতে তুলে নিয়ে নিজের ঘরে এনে রেখে দিল।
এরপর আলমারি থেকে হালকা রঙের একটি বোরকা বের করে পরল। মাথায় সুন্দর করে হিজাব জড়িয়ে নিল। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সঙ্গে ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে কিছু টাকা নিয়ে নিল। তারপর আর কোনো শব্দ না করে ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে এলো।
নিচে এসে দেখল, শায়লা খাতুন কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন। সূচনাকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে দেখেই তিনি ফোনটা একটু নিচে নামিয়ে রেখে কৌতূহলী দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকালেন।
“এই অসময়ে কোথায় যাচ্ছো, আম্মু?”
সূচনা মায়ের প্রশ্নে এক মুহূর্ত থমকে গেল। কী বলবে, সেটা মনে মনে গুছিয়ে নিয়ে তারপর স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

“মা, আসলে আমার একটা কাজিনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। একটু দরকার ছিল।”
শায়লা খাতুন সূচনার মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। তারপর আর কিছু জিজ্ঞেস না করে বললেন,
“আচ্ছা, ঠিক আছে। তবে বেশি দেরি করো না।”
সূচনা হালকা হেসে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“না মা, বেশি দেরি হবে না। আমি তাড়াতাড়িই চলে আসব।”
এই বলে সূচনা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
সূচনার দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতেই শায়লা খাতুন আবার ফোনটা কানে তুললেন। অপর প্রান্তে থাকা সামিরার সঙ্গে কথা বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট আনন্দের আভা ফুটে উঠল।
“ভাবী, আপনার ছেলে কেমন, সেটা আমরা ভালোভাবেই জানি। পরিবারের সবার সঙ্গে কথা বলে বাকি সবকিছু ঠিকঠাক করে তারপর আপনাকে আমাদের সিদ্ধান্ত জানানো হবে, ভাবী।”

রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া ওঠা দু’কাপ কফি নিয়ে শায়লা খাতুনের কাছে এগিয়ে এলো সুপ্তি। সবে মাত্র ফোনে কথা বলা শেষ করেছেন তিনি।
সুপ্তির বুকের ভেতরটা এখনও অস্থিরতায় ভার হয়ে আছে। বাবার ভয় দেখানোর কথা সবকিছুই আজ খালামণির সঙ্গে খুলে বলতে চেয়েছিল সে।
কিন্তু কাছে আসতেই থমকে গেল সুপ্তি। শায়লা খাতুনকে আজ বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে। মুখজুড়ে যেন অদ্ভুত এক প্রশান্তির ছাপ। সুপ্তি কফির কাপটা এগিয়ে দিয়ে কৌতূহলী গলায় বলল,
“খালামণি, কিছু হয়েছে? তোমাকে ভীষণ খুশি দেখাচ্ছে যে!”
শায়লা খাতুন প্রথমে কিছু বললেন না। মৃদু হেসে ট্রে থেকে এক কাপ কফি তুলে নিলেন। তারপর কাপে ছোট্ট এক চুমুক দিয়ে বললেন,
“আরে, বলিস না। সেদিনও তোর খালু ঋতুর ব্যাপারে কথা বলছিল। মেয়েটা তো ভালোভাবেই পড়াশোনা করছে। দেখা যাক সামনে কী হয়। তবে আজ একটা ঘটনা ঘটেছে।”
সুপ্তি ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

“কী ঘটনা ঘটেছে?”
শায়লা খাতুন এবার মুচকি হেসে বললেন,
“প্রণয়ের বন্ধু সোহেলকে তো চিনিস, তাই না?”
সোহেলের নামটা কানে যেতেই সুপ্তির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। মুহূর্তেই ভার্সিটিতে ঘটে যাওয়া কথাগুলো মনে পড়ে গেল। সোহেল যে তাকে পছন্দ করে, সেটা তো একপ্রকার বুঝিয়েই দিয়েছে। তাহলে কি ওরা বাড়িতে কিছু বলেছে?
হঠাৎ করেই গলাটা শুকিয়ে এলো তার। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। চিনি। কী হয়েছে?”
শায়লা খাতুন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,
“সোহেল নাকি তার মাকে বলেছে, সে ঋতুকে পছন্দ করে। আর ঋতুকে বিয়ে করতে চায়।”
কথাটা শুনে সুপ্তির মুখের সমস্ত স্বাভাবিকতা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। বিস্ময়ে চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল তার আর বলল,

“কি?!”
শায়লা খাতুন সুপ্তির প্রতিক্রিয়ায় খানিকটা অবাক হলেও শান্ত গলায় বললেন,
“হ্যাঁ। ছেলেটা হিসেবে সোহেল ভালোই। মন্দ কিছু তো শুনিনি। তবে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইছি না। সবার সঙ্গে একবার বসে কথা বলে তারপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাই।”
সুপ্তি আর কোনো কথা বলল না। বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। মুখে জোর করে স্বাভাবিকতার ছাপ এনে বলল,
“ঠিক আছে, খালামণি। আমার একটু পড়া আছে। আমি ঘরে গেলাম।”

এই বলেই আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না সুপ্তি। দ্রুত পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল সে। অথচ তার মাথার ভেতর তখন কেবল একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সোহেল যদি ঋতুকে বিয়ে করতে চায়, তবে ভার্সিটিতে তাকে সেদিন সেসব কথা কেন বলেছিল? তারপর আবার ভাবল এখনকার ছেলেদের ক্যারেক্টার গুলোই এমনই। সুপ্তি ভাবল, সোহেল ছেলে হিসেবে একদমই ভালো না বরং ক্যারেক্টারলেস। তাহলে ঋতুর সাথে সোহেলের বিয়ে হওয়া একদমই উচিত না।
সূচনাকে দেওয়া লোকেশন অনুযায়ী রেস্টুরেন্টটির সামনে এসে থামল গাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল সূচনা। তারপর ধীর পায়ে রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরে ঢুকতেই একজন ওয়েটার এগিয়ে এসে বিনীতভাবে তাকে স্বাগত জানাল। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই সূচনার চোখে পড়ল অদ্ভুত এক দৃশ্য।

পুরো রেস্টুরেন্টটি নিস্তব্ধ। কোথাও কোনো অতিথি নেই, নেই স্বাভাবিক কোলাহল কিংবা ব্যস্ততার ছিটেফোঁটাও। বিশাল রেস্টুরেন্টের এক কোণে কেবল একটি টেবিলে একা বসে আছে রাফি।
কপালের মাঝখানে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে গভীর চিন্তায় ডুবে আছে সে। সূচনার পায়ের শব্দ কানে যেতেই রাফি ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। আর চোখ খুলতেই দৃষ্টির সামনে ভেসে উঠল তার পরিচিত মুখ তার সুজি।
মুহূর্তেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল রাফির। কতটা মায়াবী হয়ে উঠেছে মেয়েটা!

হয়তো সবকিছু অন্যরকম হতে পারত। যদি বিশ্বাসের জায়গায় বিশ্বাসঘাতকতা এসে দাঁড়াত না, তাহলে হয়তো আজ এই মেয়েটাই তার পাশে থাকত। হয়তো আজ সূচনা শুধুই তার সুজি হয়ে থাকত না, হয়ে উঠত তার নিজের মানুষ।
রাফি দ্রুত নিজের ভাবনাগুলো আড়াল করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর সূচনার জন্য রাখা চেয়ারটি টেনে ঠিক করে দিয়ে বলল,
“বসে পড়। কেমন আছিস, সুজি?”
সূচনাও চুপচাপ চেয়ারে বসে পড়ল। মৃদু হেসে বলল,
“আমি ভালো আছি, ভাইয়া। তুমি কেমন আছো?”
রাফির ঠোঁটের কোণে তিক্ত এক হাসি ফুটে উঠল।
“আমি কেমন আছি, সেটা শুনে কি তোর আদৌ কিছু যায় আসে?”
রাফির কথায় থমকে গেল সূচনা। কথাটার অর্থ যেন ঠিক বুঝতে পারল না সে। খানিকটা অবাক হয়ে বলল, “মানে?”
ঠিক তখনই কয়েকজন ওয়েটার এসে একে একে টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিতে শুরু করল। আর খাবারের সঙ্গে যখন সূচনার প্রিয় প্রিয় ডেজার্টগুলোও সামনে রাখা হলো, তখন অবাক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল সূচনা। রাফি এতদিন পরেও তার পছন্দগুলো মনে রেখেছে!
রাফি সূচনার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“তোকে একটা গল্প শোনাই।”
সূচনার তখন বলল,
“তুমি এখানে গল্প শোনানোর জন্য আমাকে ডেকেছো, ভাইয়া?”
রাফি মৃদু হেসে বলল,
“এতটা অনীহা হোস না। সত্যি বলছি, মাত্র কিছুটা সময় নেব।”
সূচনার কণ্ঠে এবার নরম ভাব ফুটে উঠল।
“না, আমি এভাবে বলতে চাইনি। আসলে ভেবেছিলাম হয়তো আরও কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা থাকবে। তাই…”

“ঠিক আছে। গল্পটা বলি।”
“হ্যাঁ, বলো।”
রাফি কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
“মনে কর, তুই খুব পছন্দ করে একটা গাছের চারা কিনে আনলি। চারাটাকে নিজের হাতে একটা ছোট্ট টবে লাগালি। তারপর প্রতিদিন নিয়ম করে পানি দিলি। খেয়াল রাখলি, ও ঠিকমতো রোদ পাচ্ছে কি না, মাটি শুকিয়ে যাচ্ছে কি না, গাছটা ভালো আছে কি না।”
সূচনা নীরবে শুনছিল। রাফি একটু থেমে আবার বলল,
“গাছটার প্রতি তোর এত মায়া জন্মাল যে, তুই ওকে শুধু একটা গাছ হিসেবে দেখলি না। নিজের ভালোবাসা, যত্ন আর সময় দিয়ে ধীরে ধীরে বড় করে তুললি। কিন্তু কোনো একসময় তোকে কয়েক দিনের জন্য দূরে যেতে হলো। যাওয়ার আগে গাছটার দায়িত্ব তুই এমন একজন মানুষের হাতে দিয়ে গেলি, যাকে তুই বিশ্বাস করিস। তুই নিশ্চিন্ত ছিলি ভাবলি, মানুষটা নিশ্চয়ই তোর গাছটার ঠিকমতো যত্ন নেবে।”

রাফির কণ্ঠ ধীরে ধীরে আরো ভারী হয়ে উঠল।
“এরপর কেটে গেল বেশ কিছুদিন। তুই দূরে থেকেও মনে মনে ভাবলি, তোর ছোট্ট চারাটা নিশ্চয়ই এখন আরও বড় হয়েছে। আরও সুন্দর হয়েছে। তারপর একদিন তুই ফিরে এলি…”
রাফি এবার সূচনার চোখের দিকে তাকাল।
“কিন্তু বাড়িতে ফিরে দেখলি, এতদিন ধরে তুই যে গাছটাকে নিজের হাতে আদর-যত্ন আর ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছিস… সেই গাছটা আর তোর নেই।
কেউ একজন সেটাকে উপড়ে নিয়ে নিজের বাড়ির আঙিনায় লাগিয়ে নিয়েছে। আর সেই গাছটা এখন চিরদিনের জন্য অন্য কারও হয়ে গেছে।”
রাফির চোখে তখন অদ্ভুত এক শূন্যতা। দৃঢ়তার সাথে বললো,

“বল তো সুজি…তখন কেমন লাগবে তোর? যখন দেখবি, তুই এতদিন ধরে যেটাকে ভালোবেসে বড় করলি, যার প্রতিটা পাতার খেয়াল রাখলি… সেটা খুব সহজেই অন্য কেউ নিজের করে নিয়ে গেল?”
সূচনা স্থির হয়ে বসে রাফির কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। রাফির প্রতিটি শব্দ কোনো ইঙ্গিত বহন করছিল, অথচ সেই ইঙ্গিতের অর্থ কিছুতেই ধরতে পারছিল না সূচনা। গাছের গল্পের আড়ালে রাফি আসলে কী বোঝাতে চাইছে? কেনই বা তার কথাগুলো এত অদ্ভুত লাগছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না সূচনা। ঠিক তখনই হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা সূচনার ফোনটা বেজে উঠল। প্রণয় নামটা চোখে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে সূচনার মাথায় ঘুরতে থাকা সব চিন্তা যেন কোথায় হারিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা অকারণে কেঁপে উঠল। ফোনটা ধরবে কি না এই দ্বিধায় কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল। আর সেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কলটি কেটে গেল।
সূচনার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে তড়িঘড়ি রাফির দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাইয়া, তুমি আমাকে যেই কথাগুলো বললে… আসলেই যদি আমি কোনো গাছকে এতটা আদর-যত্ন আর ভালোবাসা দিয়ে বড় করি, অথচ অন্য কেউ যদি খুব সহজেই সেটাকে পেয়ে যায়, তাহলে ব্যাপারটা সত্যিই ভীষণ কষ্টের। তার ওপর রাগও হবে। কিন্তু এখন আমাকে যেতে হবে। উনি ফোন….”
কথাটা শেষ করার আগেই রাফি হঠাৎ সূচনার হাতের ওপর নিজের হাত রেখে দিল। রাফির চোখে তখন এক অদ্ভুত উন্মাদনা। কণ্ঠস্বর গভীর, ভারী এবং দীর্ঘদিন ধরে বুকের ভেতর চাপা পড়ে থাকা কোনো যন্ত্রণার মতো কাঁপছিল।

“এক্স্যাক্টলি, সুজি!”
সূচনার শরীর মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল।
রাফি একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি তোকে এতদিন ধরে আদর, যত্ন আর ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছি। তুই চোখের আড়াল হতেই প্রণয় তোকে কতটা সহজে পেয়ে গেল। তাহলে বল, আমার কি রাগ হওয়া উচিত না?”
রাফির কথাগুলো শুনে সূচনার মাথার ভেতরটা আচমকাই শূন্য হয়ে গেল। কিছুক্ষণ সে শুধু নির্বাক চোখে রাফির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অস্ফুট স্বরে বলল, “মানে?”
রাফি ধীরে ধীরে বললো,
“মানে, আমি তোকে আমার মনের কথাটা বলতে চাইছি। আমি জানি, এসব কিছুই ঠিক নয়। জানি, তোর জীবনে আমার এভাবে ফিরে আসার কোনো অধিকার নেই। কিন্তু কী করব বল? নিজের মনের কথাগুলো যদি সারাজীবন বুকের ভেতর চাপা দিয়ে রাখি, তাহলে হয়তো একদিন সত্যিই দম বন্ধ হয়ে মারা যাব।”
সূচনা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। রাফি এবার আরো ভারী কণ্ঠে বলল,

“তাই তোকে সব সত্যি কথা কনফেস করে এখান থেকে চলে যেতে চাই। আর কিছু…”
রাফির বাক্যটি শেষ হওয়ার আগেই বিকট শব্দে একটি ঘুষি এসে আঘাত করল তার মুখে।
আচমকা আঘাতে রাফি ভারসাম্য হারিয়ে চেয়ারসহ মেঝেতে আছড়ে পড়ল। আতঙ্কে সূচনা চমকে উঠে মুখে হাত চাপা দিল। সূচনা ধীরে ধীরে সামনে তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রণয়।
প্রণয়কে কেমন যেন ভয়ঙ্কর লাগছে। চুলগুলো সম্পূর্ণ অগোছালো। কপালের শিরা ফুলে উঠেছে। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। চোখ দুটো রাগে এতটাই লাল হয়ে উঠেছে যে, সেই দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুঃসাহসের নামান্তর। প্রণয় এক ঝটকায় নিচে পড়ে থাকা রাফির কলার চেপে ধরল। তারপর প্রচণ্ড শক্তিতে তাকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিল।
রাফির কলার মুঠোবদ্ধ হাতে চেপে ধরে প্রণয় দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল,

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২৯

“ইউ অ্যাসহোল!”
প্রণয় রাফিকে আরও কাছে টেনে নিয়ে চোখে চোখ রেখে হিসহিস করে বলল,
“তোর সাহস কত বড়! তুই আমার সামনে দাঁড়িয়ে… আমার ওয়াইফকে প্রপোজাল দিস?”

প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩১