প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৪০
insia isha chowdhury
এগুলো কি কোনো প্র্যাঙ্ক হচ্ছে, নাকি সত্যিই কিছু একটা ঘটেছে? আমি তো সেটাই বুঝতে পারছি না! রাফি আর ঋতুর বিয়ে হয়েছে মানে? এসবের মানে কী? আমার তো বিরক্তিতে মাথা ফেটে যাওয়ার জোগাড়! আঙ্কেল, আপনি এসব কী বলছেন?”
প্রণয় প্রচণ্ড হুংকার দিয়ে কথাগুলো বলল। তার কণ্ঠের তীব্রতা পুরো ঘরটাকে কাঁপিয়ে তুলল। মুহূর্তেই কথাগুলো চার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। প্রণয়ের হুংকারে ঋতু ভয়ে কেঁপে উঠল। অন্যদিকে রাফির মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। আজকের পুরো ঘটনায় সে এতটাই ক্লান্ত ও বিরক্ত যে কারও কথাতেই আর প্রতিক্রিয়া দেখানোর শক্তি অবশিষ্ট নেই। ফখরুল ইসলাম বুঝলেন, এদের সামনে পুরো ঘটনাটা পরিষ্কার করে বলা দরকার। তাই শান্ত গলায় বলতে শুরু করলেন,
“প্রণয়, আমার কথা শোনো। তুমি জোর করে চাইলে এদের দুজনকে আলাদা করতে পারবে। কিন্তু এদের মনের ভেতরটা তো আলাদা করতে পারবে না।”
প্রণয় কপাল কুঁচকে তাকাল। আঙ্কেলের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
“আঙ্কেল, আপনি আসলে কী বোঝাতে চাইছেন? কী বলতে চাইছেন, একটু পরিষ্কার করে বলবেন?”
ফখরুল ইসলাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“আমি সেটাই বলছি। তোমরা ঋতু মামনির বিয়ে ঠিক করেছিলে। কিন্তু ওর মনে যে অন্য একজন রয়েছে, সেটা তোমরা জানতেই না। আবার আজ রাফিরও এনগেজমেন্ট ছিল। কিন্তু ও নিজেও সেই এনগেজমেন্টে রাজি ছিল না। ওখান থেকে বেরিয়ে এসে রাফি আর ঋতু একসঙ্গে পালিয়ে যায়। তারপর পথ হারিয়ে জঙ্গলের ভেতর চলে যায়। সেখানে গ্রামের লোকজন ওদের একসঙ্গে দেখে ভুল বোঝে। আর সেই ভুল ধারণা থেকেই… ওদের বিয়ে দিয়ে দেয়।”
কথাগুলো শেষ হতেই প্রণয়ের মাথার ওপর যেন আচমকা পুরো আকাশটা ভেঙে পড়ল।
সে বিস্ময়ে বললো, “কী?!”
ঘরের প্রতিটি মানুষই যেন পাথর হয়ে গেছে। কেউ কিছু বলছে না, কেউ নড়ছে না। এমনকি অবাক হওয়ার প্রতিক্রিয়াটুকুও সবাই ভুলে গেছে।
কিছুক্ষণ পর সবার নীরবতা ভেঙে সূচনা ধীর কণ্ঠে বলল,
“দিনশেষে এটা বিশ্বাস করতে হবে যে রাফি ভাইয়া আর ঋতু একে অপরকে ভালোবেসে পালিয়ে বিয়ে করে নিল? কেউ আমাকে একটা চিমটি দাও তো! আমার তো এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না!”
রাফি আর ঋতু দুজনেই বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। দুজনেরই মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবকিছু থেকে দূরে কোথাও চলে যেতে পারলে বাঁচে। গ্রামে তাদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর ফখরুল ইসলামই তাদের সেখান থেকে নিয়ে এসেছেন। রাফির বাবাকে তিনি বহুদিন ধরে চেনেন। আর আজকের দিনটির ব্যাপারেও তিনি দুই পরিবার থেকেই আমন্ত্রিত ছিলেন ঋতুর বিয়ে উপলক্ষে এবং রাফির এনগেজমেন্ট উপলক্ষে। কিন্তু ডিউটির কারণে কোনোটিতেই উপস্থিত হতে পারেননি।
তাই রাফির কাছ থেকে যখন জানতে পারলেন যে আজ তার এনগেজমেন্ট ছিল, আর ঋতু নিজের বিয়ে থেকে পালিয়ে এসেছে, তখন ফখরুল ইসলাম নিজের মতো করে সবকিছু মিলিয়ে নিলেন। দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে তার মনে হলো এরা নিশ্চয়ই একে অপরকে ভালোবাসে। তাই সবকিছু ছেড়ে একসঙ্গে পালিয়েছে। আর এমন পরিস্থিতিতে পড়েই হয়তো গ্রামের মানুষ তাদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। তিনি আর গভীরে গিয়ে কিছু খোঁজ করেননি। বরং যা বুঝেছেন, সেটাই সত্যি ধরে নিয়ে দুজনকে সঙ্গে করে মির্জা বাড়িতে নিয়ে এসেছেন।
রাফি আর ঋতু নিজেরাই এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। শায়লা খাতুন ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়লেন। তিনি নির্বাক। রাফি মুখ খুলে কিছু বলার আগেই প্রণয় ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে তার কলার চেপে ধরল।
“কাজটা তুই একদম ঠিক করিসনি, রাফি! আমার সঙ্গে তোর শত্রুতা আছে বলে আমার বোনকে এভাবে ব্যবহার করবি আমি কখনো কল্পনাও করিনি!”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে প্রণয়ের হাত ধরে ফেলল।
“প্রণয়! আপনি কী করছেন? ভাইয়াকে ছাড়ুন!”
ঋতু আতঙ্কিত চোখে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে গেছে। একটা কথাও মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না। সোহেলও এগিয়ে এসে জোর করে প্রণয়কে রাফির কাছ থেকে সরিয়ে নিল।
ঠিক তখনই মির্জা বাড়ির দরজা দিয়ে নিলুফা খাতুন, নাজমুল সাহেব এবং টিনা প্রবেশ করল।
ঘরে ঢুকেই নিলুফার চোখ পড়ল ছেলের ওপর। ছেলেকে এমন অবস্থায় দেখে তিনি ছুটে গেলেন তার কাছে।
“রাফি! তোর কী হয়েছে?”
নিজের মামিকে দেখে সূচনা মনে মনে বলল,
“আল্লাহই ভালো জানেন, এখন আবার কী কী নাটক শুরু হবে!”
এরই মধ্যে ফখরুল ইসলাম নিলুফার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ভাবি, আমি আপনাদের ফোন করেছিলাম। আজ সম্ভবত রাফির এনগেজমেন্ট ছিল। কিন্তু ও সেই এনগেজমেন্ট করতে চায়নি। ও নিজের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিল।”
কথাটা শুনতেই নিলুফার মেজাজ মুহূর্তে খারাপ হয়ে গেল। একেই এটা সূচনার শ্বশুরবাড়ি। তার ওপর রাফির পছন্দের মেয়ের কথা বলা হচ্ছে! নিলুফার মনে হলো, নিশ্চয়ই আবার সূচনাকে নিয়েই কোনো কথা উঠছে। তিনি ক্ষিপ্ত গলায় বললেন,
“পছন্দের মেয়েকে কী চাইলেই বিয়ে করা যায় নাকি? সময়, সম্পর্ক, পরিবার কোনো কিছুরই কি মূল্য নেই?”
ফখরুল ইসলাম শান্তভাবে বললেন,
“একদম ঠিক বলেছেন, ভাবি। কিন্তু আপনার ছেলে এরই মধ্যে নিজের বিয়ে সম্পন্ন করে ফেলেছে।”
নিলুফা নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না। তিনি বিস্ফারিত চোখে ছেলের দিকে তাকালেন।
“রাফি, তুই এসব কীভাবে করতে পারলি?”
তারপর হঠাৎ সূচনার দিকে তাকালেন। সূচনাকে দেখেই তার মুখের বিরক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
“এই মেয়েটা তো বিবাহিত! তাহলে রাফি আবার কাকে বিয়ে করল?’”
ঠিক তখনই ফখরুল ইসলাম ঋতুর হাত ধরে তাকে রাফির পাশে এনে দাঁড় করালেন।
“এই হলো আপনাদের পুত্রবধূ ঋতু। দুজন দুজনকে অনেক ভালোবাসে। একে অপরকে হারাতে চায়নি। তাই যেভাবেই হোক, আল্লাহর ইচ্ছায় ওদের বিয়ে হয়ে গেছে।”
নিলুফা বিস্মিত চোখে ঋতুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার ছেলে এই মেয়েকে বিয়ে করেছে?
এই মেয়েটা তো তার পরিচিতই নয়! এমনকি জীবনে একবারও রাফির মুখে এই মেয়ের নাম শোনেননি। এই মেয়ে তো সিলেবাসের বাইরে!
তার ওপর রাফির মুখে আনন্দের কোনো চিহ্ন নেই!
বরং ছেলেটার চোখেমুখে বিরক্তি আর ক্লান্তি স্পষ্ট।
নিলুফা এবার কঠিন গলায় বললেন,
“এই মেয়েকে তো আমরা চিনি না! আমার ছেলে কীভাবে এই মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করতে পারে? আমি তো জীবনে কখনো এই মেয়ের নামই শুনিনি ওর মুখে। এসব নিশ্চয়ই কোনো ষড়যন্ত্র! আমার ছেলেকে ফাঁসানো হয়েছে। আমি এই বিয়ে মানি না। কোনোভাবেই মানি না!”
নিলুফার এমন কথা শুনে ঘরের সবাই বিরক্ত হয়ে উঠল। সবসময় নিলুফাকে ভয় পেয়ে চলা সূচনাও আজ কেমন করে যেন সাহস পেয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে নিলুফার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“মামি, রাফি ভাইয়া কি ছোট বাচ্চা নাকি যে ঋতু ওনাকে ফাঁসাবে? আর বিয়েটা কি আপনি করেছেন যে আপনি বলছেন, এই বিয়ে মানি না?”
কথাটা মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সূচনা নিজের মুখ চেপে ধরল।
“হায় আল্লাহ! আমি এটা কী বলে ফেললাম!”
ঠিক তখনই টিনা ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“ফুপি, সূচনা ঠিকই বলছে! আমি এর আগেও ওদের দুজনকে একসঙ্গে দেখেছি। সেদিন তো আমাকে ক্যাফেতে রেখেই রাফি এই মেয়েটাকে নিয়ে চলে গিয়েছিল। নিজের চোখে দেখেছি!”
নিলুফার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। প্রণয়ও কথাটা শুনে সঙ্গে সঙ্গে ঋতুর কাছে এগিয়ে গেল।
“তুই রাফির সঙ্গে ক্যাফেতে দেখা করেছিলি? তুই এই রাফিকে নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেছিস?”
ঠিক তখনই রবিন ও ঋতুকে জিজ্ঞাসা করল,
“ঋতু প্রণয়ের প্রশ্নের জবাব দে তুই নিজের ইচ্ছায় এই বিয়ে করেছিস?”
ঋতু ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ল। অর্থাৎ হ্যাঁ। প্রণয়ের মাথায় মুহূর্তেই অন্য একটা হিসাব দাঁড়িয়ে গেল।
“তাহলে রাফি এতদিন ধরে আমার ওপর রাগ পুষে রেখেছিল! আমার সঙ্গে শত্রুতার প্রতিশোধ নিতে এবার আমার বোনকেই ব্যবহার করছে!”
ভাবনাটা মাথায় আসতেই প্রণয়ের মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল। অন্যদিকে নিলুফা আবারও কঠিন গলায় বললেন,
“আমি এসব কিছুই মানি না। এই মেয়েকে আমি আমার ছেলের বউ হিসেবে মেনে নেব না।”
প্রণয়ও সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল,
“আমরাও কেউ আমার বোনের স্বামী হিসেবে এই রাফিকে মানি না!”
ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠল।
ফখরুল ইসলাম এবার বিরক্ত ও রাগান্বিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, “চুপ করো! সবাই শুধু নিজেদের মতামত দিচ্ছ। অথচ কেউ একবারও ভাবছ না, আমাদের বাচ্চারা একে অপরকে ভালোবাসে! তোমরা কেন সেটা দেখতে পাচ্ছ না?”
আরিফুল মির্জা আর নাজমুল সাহেব এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। ব্যবসায়িক সূত্রে এর আগেও তাদের বহুবার দেখা হয়েছে, বিশেষ করে সূচনার বৌভাতের অনুষ্ঠানেও তারা একসঙ্গে ছিলেন। দুজনেই নিজেদের সন্তানদের বিয়ের ঘটনায় ভেতরে ভেতরে খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু ঘরের এই বাড়াবাড়ি, চিৎকার-চেঁচামেচি তাদের কারোরই ভালো লাগছিল না। ঠিক তখনই টিনা হঠাৎ রাফির হাত শক্ত করে চেপে ধরল।
কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“রাফি, তুমি এই মেয়েটাকে ডিভোর্স দিয়ে দাও। তারপর আমাকে বিয়ে করো। তুমি ওকে ছেড়ে দাও, রাফি!”
রাফি বিরক্তিতে টিনার দিকে তাকাল। পরক্ষণেই এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল।
সে আগেই জানত, টিনার সঙ্গে দেখা হলে এমন কিছুই ঘটবে। আর সেই কারণেই মির্জা বাড়িতে আসার আগেই গাড়ির ভেতর ঋতুর সঙ্গে সে কথা বলে নিয়েছিল।
কিছুক্ষণ আগের মুহূর্ত…
বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর থেকেই ঋতু কাঁদছিল।
সে কিছুতেই ঘটনাটা মেনে নিতে পারছিল না। তার চোখের পানি থামতেই চাইছিল না। রাফি গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসে চুপচাপ সবকিছু ভাবছিল।
যদি ফখরুল ইসলাম তাদের বিয়ের কথা জানতে না পারতেন, তাহলে হয়তো একটা উপায় বের করা যেত। দুজন আলাদা আলাদা বাড়িতে চলে যেত। কেউ এই বিয়ের কথা জানতে পারত না। তারপর পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে তারা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে দুজন ডিভোর্স নিয়ে আলাদা হয়ে যেত।
কিন্তু ফখরুল ইসলাম তাদের দুজনের পরিবারকেই চেনেন। শুধু তাই নয়, তিনি এখন তাদের সঙ্গে বাড়িতেও যাচ্ছেন। তাই বিয়ের কথাটা গোপন রাখার কোনো সুযোগ নেই। রাফি জানত, বাড়িতে পা রাখার পরেই ঝামেলা শুরু হবে। আর তার থেকেও বড় সমস্যা এই টিনা। টিনা যদি কোনোভাবে তাকে আবার বিয়ে করার জন্য চাপ দিতে শুরু করে! সবকিছু ভেবেই রাফি ঋতুর দিকে তাকালো আর আর দেখল ঋতু কাঁদছে তখন রাফি বিরক্তিতে বলল,
“আশ্চর্য তুমি যেভাবে কাঁদছো মনে হচ্ছে তুমি বিধবা হয়ে গেছো!”
ঋতু নাক টেনে বলল,
“আপনার সাথে বিয়ে হয়েছে এর থেকে খারাপ আর কি হতে পারে?”
“ঋতু, আমার কথা শোনো।”
ঋতু কান্নাভেজা চোখে তাকিয়ে বলেছিল,
“আর কী শুনতে বাকি আছে?”
“শোনো। আমরা যদি বাড়িতে গিয়ে এখন সত্যিটা বলে দিই যে গ্রামের লোকজন ভুল বুঝে আমাদের বিয়ে দিয়েছে তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। সবাই আমাদের নিয়ে প্রশ্ন করবে। তোমার পরিবার হয়তো আবার তোমার বিয়ে দিতে চাইবে। আমার পরিবারও আমাকে টিনাকে বিয়ে করার জন্য চাপ দেবে।”
ঋতু চুপ করে রইল। রাফি এবার নিচু গলায় বলল,
“তাই আপাতত আমাদের এই বিয়েটা মেনে নেওয়ার অভিনয় করতে হবে।”
ঋতু অবাক হয়ে তাকাল।
“অভিনয়?”
“হ্যাঁ। কিছুদিন সবাইকে এটা বিশ্বাস করতে দাও যে আমরা নিজেদের ইচ্ছায় বিয়ে করেছি। পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে আমরা একে অপরকে ডিভোর্স দিয়ে আলাদা হয়ে যাব। তারপর তুমি তোমার রাস্তায় আর আমি আমার রাস্তায়। তখন সবাইও ধীরে ধীরে বিষয়টা মেনে নেবে।
রাফি আরও দৃঢ় গলায় বলল,
“আর একটা কথা। তুমি যদি এখন আমার সঙ্গে বাড়িতে যাও, আর বিয়ে যদি বল আমাদের বিয়েটা আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হয়েছে তাহলে তোমার পরিবার তোমাকে জোর করে কিছুদিনের মধ্যে বিয়ে দিতে চাইবে। কিন্তু যদি আমরা এটা স্বীকার করি যে আমরা নিজেদের ইচ্ছায় বিয়ে করেছি
তাহলে অন্তত তোমার পরিবার আর তোমার বিয়ে নিয়ে তাড়াহুড়ো করতে পারবে না।”
“আজব আমার পরিবার এই সবকিছু জানলে আমাকে বিয়ে কেন দিতে চাইবে?”
“কারণ আমার সাথে তোমার এই বিয়ের বিষয়ে বাইরের মানুষ জানলে তোমার পরিবার অবশ্যই তোমার বিয়ে দিতে চাইবে।”
ঋতু কোনো উত্তর দিল না। রাফির কথাগুলো তার কাছে অদ্ভুত লাগলেও যুক্তিহীন ছিল না।
কিন্তু রাফির এই পরিকল্পনার পেছনে ছিল শুধু ওর নিজের স্বার্থ। সে জানত, এখন যদি ঋতুকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে যায় এবং সবাই তাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়, তাহলে টিনার সঙ্গে বিয়ের চাপটা অন্তত সাময়িকভাবে বন্ধ হবে।
আর কিছুদিন পর, যখন পরিস্থিতি শান্ত হবে, তখন তারা দুজন আলাদা হয়ে যাবে। এরপর রাফি সময় বুঝে এই দেশ থেকে চলে যাবে।
কিন্তু এই মুহূর্তে ঋতুর সামনে আর কোনো পথ নেই। সে তো সত্যিই কবুল বলেছে। গ্রামের মানুষের ভুল বোঝাবুঝি থেকেই হোক,আর পরিস্থিতির চাপে হোক কিংবা অন্য কোনো কারণে সে এখন রাফির স্ত্রী। আর যদি সত্যিই সে রাফির সঙ্গে এই বাড়িতে গিয়ে থাকে, তাহলে হয়তো তার পরিবারও আর সহজে তার অন্য কোথাও বিয়ে দিতে চাইবে না।
এই একটা চিন্তাই ঋতুকে স্থির করে দিল। সে নিঃশব্দে রাফির কথা মেনে নিল।
অতঃপর সবাইকে রীতিমতো অবাক করে দিয়ে আরিফুল মির্জা ও নাজমুল সাহেব দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠলেন,
“আমরা আমাদের ছেলে আর মেয়ের বিয়েটা মেনে নিয়েছি।”
কথাটা মুহূর্তেই ঘরের ভেতর এক বিস্ফোরণ ঘটাল। উপস্থিত সবাই বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল তাঁদের দুজনের দিকে। রাফি অবশ্য কারও প্রতিক্রিয়ার তোয়াক্কাই করল না। সে সঙ্গে সঙ্গে ঋতুর এক হাত শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় আবদ্ধ করে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আপনারা মানুন আর না মানুন, তাতে আমার কিছুই যায় আসে না। ঋতু এখন আমার বিয়ে করা বউ। আর আমি এই মুহূর্তে ওকে নিয়ে এখান থেকে চলে যেতে চাই। এত নাটক দেখার ধৈর্য আমার আর নেই।”
কথাটা বলেই রাফি টিনার দিকে একবার তাকাল।
ঋতু তখনও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাফির দিকে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎই সে রাফির হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল মায়ের কাছে। মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“মা, আমাকে ক্ষমা করে দাও।”
শায়লা খাতুনের চোখ অশ্রুসিক্ত। মেয়ের কণ্ঠ শুনে তাঁর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলেও তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। কিছুক্ষণ আগেই তিনি শুনেছেন, তাঁর স্বামী এই বিয়ে মেনে নিয়েছেন। স্বামীর এমন সিদ্ধান্তে তিনি বিশেষ কোনো বিরোধিতাও দেখলেন না। তিনি মেয়ের মাথায় স্নেহভরে হাত বুলিয়ে দিলেন। কিন্তু রাফি আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। কারও কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সে ঋতুর হাত ধরে টেনে তাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটে গেল যে প্রণয় পর্যন্ত কিছু বলার সুযোগ পেল না। রাফি ও ঋতু চোখের আড়াল হতেই নাজমুল সাহেব আরিফুল মির্জার দিকে তাকিয়ে আন্তরিক কণ্ঠে বললেন,
“বিশ্বাস করুন, বেয়াই সাহেব, আমি ভীষণ খুশি হয়েছি। আমার ছেলে এতদিন পর অন্তত একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
আরিফুল মির্জা মৃদু হেসে জবাব দিলেন,
“বেয়াই সাহেব, প্রথমে আমারও একটু রাগ হয়েছিল। কিন্তু সবশেষে আমার মেয়ের খুশিই আমার খুশি।”
অন্যদিকে নিলুফা টিনাকে সঙ্গে নিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। নাজমুল সাহেবও সেখান থেকে চলে গেলেন। সবাই একে একে সরে যাওয়ার পর প্রণয় ধীর পায়ে এগিয়ে গেল নিজের বাবার কাছে। এতক্ষণ বাবার সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়ে চুপ থাকলেও এবার আর নিজের ক্ষোভটা সামলে রাখতে পারল না। রাগে বলে উঠল,
“বাবা, তুমি এটা কী করলে? ওই হারামজাদা আমার বোনকে জীবনে কোনোদিন সুখী রাখতে পারবে না। বরং ওর জীবনটা আরও অশান্তিতে ভরে দেবে।”
আরিফুল মির্জা ছেলের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“প্রণয়, আমি রাফিকে ভালোভাবেই চিনি। ও যথেষ্ট ভালো একটা ছেলে। আমার বিশ্বাস, ও তোমার বোনকে সুখেই রাখবে।”
কিন্তু প্রণয়ের রাগ তখনও কমেনি। আরিফুল মির্জা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ঘরে উপস্থিত সবার উদ্দেশে বললেন,
“অনেক রাত হয়ে গেছে। সবাই এবার যার যার ঘরে চলে যাও।”
কথাটা বলেই তিনি শায়লা খাতুনের হাত ধরলেন। দুজন ধীর পায়ে নিজেদের ঘরের দিকে চলে গেলেন। অন্যদিকে সোহেল পুরো ঘটনাটার ভারে নিঃশব্দ হয়ে বসে রইল। এতক্ষণে একে একে সবাই চলে যেতেই বিশাল ড্রয়িং রুমে এখন কেবল তিনজন মানুষ সূচনা, প্রণয় আর সোহেল। দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়ির কাঁটা তখন রাত প্রায় একটা ছুঁইছুঁই।
সোহেল হতাশ মুখে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ধুর! এতসব নাটকের মাঝে আমার বাসরটাই পণ্ড হয়ে গেল। শালার কপালটাই খারাপ আমার!”
প্রণয় বিরক্তিতে সোহেলের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“সবকিছুরই একটা সীমা থাকা প্রয়োজন।”
কথাটা কানে যেতেই সূচনা তৎক্ষণাৎ প্রণয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করল,
“সীমা? কে এই সীমা? সবার সীমা থাকা প্রয়োজন মানে কী? আপনি কি বলতে চাইছেন, আপনার জীবনে ‘সীমা’ নামে কেউ আছে?”
সূচনার কথা শুনে প্রণয় কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইল। তারপর রাগে-ক্ষোভে দুহাত দিয়ে নিজের চুল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“এ কোন অশান্তির মধ্যে পড়লাম আমি! ঝামেলার শেষ নেই!”
কথা শেষ করেই সে সূচনার হাত ধরে ফেলল।
“আমার সঙ্গে রুমে চলো।”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“না, যাব না! আগে বলুন, এই সীমা কে?”
প্রণয় চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে শ্বাস নিল। তারপর নিজের দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকেই বোঝাতে লাগল,
“ধৈর্য, প্রণয়… ধৈর্য। মাথা ঠান্ডা রাখ।”
কিন্তু পরক্ষণেই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সূচনার হাত ধরে তাকে প্রায় টানতে টানতেই রুমের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। যাওয়ার আগে একবার সোহেলের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় যেন বলল,
“বুঝলি শালা? বিয়ে মানেই ঝামেলা!’’
সোহেল অবশ্য বন্ধুর নীরব আর্তনাদ বুঝে একটু জোরেই বলে উঠল,
“ভাই, আমি তো স্বেচ্ছায় এই ঝামেলা চাইছি! যাই হোক, এখন আমিও আমার ঘরে যাই। যত রাতই হোক, রাত তো আর শেষ হয়ে যায়নি!”
কথাটা বলেই সোহেল নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিল। আর প্রণয় সূচনাকে নিয়ে অগত্যা নিজের রুমের পথ ধরল।
“ছাড়ুন আমাকে! এভাবে ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসার মানে কী?”
ঋতুর কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাফি তার হাত ছেড়ে দিল। কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা আলমারির কাছে গিয়ে সেখান থেকে একটি ট্রাউজার ও টি-শার্ট বের করতে করতে বলল,
“তোমাকে ধরে রাখার আমার কোনো শখ নেই। শুধু ওই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলাম, তাই তোমাকে নিয়ে চলে এসেছি।”
ঋতু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তাই বলে এভাবে টেনে নিয়ে আসবেন? আমি নিজের মায়ের সঙ্গে কথা বলছিলাম!”
ঋতুর কথার রেশ কাটার আগেই ঘরের দরজা দিয়ে নিলুফা প্রবেশ করলেন। রাফির পেছন পেছন তিনিও চলে এসেছিলেন। ঘরে ঢুকেই তিনি সোজা ঋতুর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। হঠাৎ তাকে সামনে দেখে ঋতু কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেল। নিলুফা চোখেমুখে বিরক্তি ফুটিয়ে বললেন,
“এই মেয়ে, তুমি কী করেছ? কীভাবে তুমি আমার ভোলা-ভালা ছেলেটাকে ফাঁসাতে পারলে?”
ঋতু বিরক্তিতে চোখ উল্টে হাত দিয়ে রাফির দিকে ইশারা করে বলল,
“এ আর ভোলা-ভালা? আর আমার খেয়েদেয়ে কোনো কাজ নেই যে আপনার ছেলেকে ফাঁসাতে যাব?”
রাফি বুঝতে পারল, এদের দুজনের কথাটা এভাবে চলতে থাকলে আর দুই মিনিটের মধ্যেই বিষয়টা অন্যদিকে মোড় নেবে। আর ঋতু এমন একজন, যে রাগের মাথায় কখন কী বলে বসবে, তার কোনো ঠিক নেই। রাফি বিরক্ত হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি থামবেন? এসব বলা বন্ধ করুন। কেউ আমাকে ফাঁসায়নি। আমি নিজের ইচ্ছেতেই ঋতুকে বিয়ে করেছি।”
নিলুফা আরও অবাক হলেন।
“সেটাই তো জানতে চাইছি! কেন বিয়ে করেছিস? কীভাবে করতে পারলি এই বিয়ে?”
রাফি একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“যেভাবে সাধারণ মানুষ বিয়ে করে, সেভাবেই করেছি। কবুল বলে বিয়ে করেছি।”
“তুই কি আমাকে পাগল বানাতে চাচ্ছিস? সেটা তো আমি জানিই। কিন্তু তুই রাজি হলি কীভাবে? এদিকে নিজের এনগেজমেন্ট ছেড়ে চলে গেলি, আমার মান-সম্মান একেবারে মাটিতে মিশিয়ে দিলি। তার ওপর কোথাকার কোন মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে চলে এসেছিস!”
নিলুফার কথায় ঋতুর রাগ আবার মাথায় চড়ে বসল। সে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই রাফি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“কোথাকার কোন মেয়ে মানে? আপনি একটু আগেই তো আমার বউয়ের বাড়ি থেকে এসেছেন। ঋতু আমার বউ। তাই একটু ভেবেচিন্তে কথা বলুন। আপনি আমার বউয়ের বিষয়ে কথা বলছেন।”
ছেলের কথায় অপমানিত হয়ে নিলুফার মুখ থমথমে হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত রাফির দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে থেকে বিরক্তিতে ফুঁসতে ফুঁসতে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। নিলুফা বেরিয়ে যেতেই ঋতু রাফির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি যে আপনার বউ এটা তো সবাই জেনে গেছে! এত গলা ফাটিয়ে বারবার বলতে হবে না, ‘ঋতু আমার বউ, ঋতু আমার বউ’! আর একটা কথা বলছি, আপনার মা যদি এরপরও বাড়াবাড়ি করেন, আমিও কিন্তু উনাকে জবাব দেব।”
রাফি গা-ছাড়া ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“একদম। আমি তো সেটাই চাই তুমি জবাব দাও।”
ঋতু বিস্মিত হয়ে তাকাল।
“মানে? আমি আপনার মায়ের সঙ্গে ঝামেলা করব, আর আপনি আমাকে সেটা করতে বলছেন?”
“অবশ্যই। আমার মা যদি তোমাকে দুটো কথা বলেন, তাহলে তুমি উনাকে আটটা কথা শোনাবে।”
ঋতু অবাক চোখে রাফির দিকে তাকিয়ে রইল।
কী ছেলে রে বাবা! নিজের মায়ের সঙ্গেই ঝামেলা করতে বলছে! রাফি অবশ্য ঋতুর সেই বিস্মিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে সে দেখল, ঋতু বিছানায় বসে আছে। রাফি বলল,
“যাও, গিয়ে তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো।”
চরম বিরক্তিতে ঋতু বলল,
“কীভাবে ফ্রেশ হব? আপনি কি আমাকে আমার বাড়িতে দুই মিনিট দাঁড়াতে দিয়েছেন? নিজের জন্য কিছুই তো আনতে পারিনি। এখন আমি পরব কী?”
রাফি আলমারির দিকে ইশারা করে বলল,
“আমার আলমারিতে অনেক ট্রাউজার আর
টি-শার্ট আছে। নতুন। এখনো ছুঁয়েও দেখিনি। সেগুলো পরতে পারো।”
ঋতু অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে বলল,
“এখন আমাকে আপনার পোশাক পরতে হবে?”
“হ্যাঁ। কারণ এত রাতে আমার মা তোমাকে নিজের পোশাক কখনোই দেবেন না। তোমার জন্য আমার নতুন আনা ট্রাউজার আর টি-শার্টগুলোই আপাতত বেস্ট হবে।”
“না, না! আমি আপনার পোশাক কিছুতেই পরব না।”
রাফি নির্বিকারভাবে বলল,
“ঠিক আছে। তাহলে ওই ভেজা লেহেঙ্গাটাই পরে থাকো।”
কথাটা শুনে ঋতু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
অবশেষে বাধ্য হয়ে রাফির আলমারি থেকে একটি কালো ট্রাউজার ও নীল টি-শার্ট বের করে নিল।
উচ্চতার দিক থেকে ঋতু ছিল পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি, আর রাফি পাঁচ ফুট দশ। ফলে রাফির ট্রাউজারটি ঋতুর জন্য বড় হবে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেক কষ্টে সেটি পরে নিল ঋতু। টি-শার্টটাও তার গায়ে বেশ লম্বা হয়ে ঝুলে রইল। ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসতেই ঋতুকে দেখতে পেল রাফি। তখন সে ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছিল।
ঋতুর অবস্থা দেখে রাফির চোখে-মুখে মুহূর্তেই হাসি ফুটে উঠল। টি-শার্টটা এতটাই লম্বা যে তাকে আরও ছোট দেখাচ্ছে, আর ট্রাউজারটাও কোনো রকমে সামলে রেখেছে।
দৃশ্যটা দেখে রাফি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। রাফির অট্টহাসিতে ঋতুর মুখ মুহূর্তেই রাগে লাল হয়ে গেল।
“হাসছেন কেন?”
রাফি হাসি থামানোর চেষ্টা করেও পারল না।
“তোমাকে একদম কার্টুনের…”
বাকিটা শেষ করার আগেই ঋতু ঝটকা দিয়ে এগিয়ে এসে রাফির সামনের চুলের মুঠি ধরে টেনে ধরল। এক মুহূর্তেই রাফির হাসি বন্ধ হয়ে গেল।
ঋতু দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমি আপনার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছি বলে এই না যে আপনি যা খুশি তাই করবেন! আমাকে দেখে হাসছেন কেন? আমাকে কি জোকার মনে হচ্ছে?”
কথাটা বলেই সে রাফির চুল ছেড়ে দিল। রাফি বিরক্ত হয়ে নিজের চুল ঠিক করতে করতে বলল,
“তোমার সমস্যা কী? আমার চুল ধরে টানো কেন?”
ঋতু নির্বিকারভাবে বলল,
“ঠিকই করেছি।”
তারপর পেটের দিকে হাত রেখে যোগ করল,
“আর এখন আমার খিদে পেয়েছে।”
খাবারের কথা শুনে রাফিও চুপ হয়ে গেল। কারণ তার নিজেরও ভীষণ খিদে পেয়েছে। সারাদিনের দৌড়ঝাঁপে দুজনের কেউই ঠিকমতো খাবার খেতে পারেনি। ঋতু চারপাশে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,
“না জানি আপনার মা কেমন মানুষ! আমরা এভাবে বাড়িতে এলাম, অথচ একবারও খাবার কথা জিজ্ঞেস করলেন না।”
“উনার হাতের খাবার খাওয়ার কোনো দরকার নেই। দেখা গেল খাবারে বিষ মিশিয়ে আমাদের দুজনকেই মেরে ফেললেন।”
রাফির কথা শুনে ঋতু চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“কী? পাগল-টাগল হলেন নাকি?”
তারপর আর কথা না বাড়িয়ে বলল,
“যাই হোক, এখন আমি খাবার খেয়ে ঘুমাতে চাই।”
কথাটা বলেই ঋতু বিছানায় বসে পড়ল।
রাফি সঙ্গে সঙ্গে বলল, “বিছানায় আমি ঘুমাব।”
ঋতু চোখ কুঁচকে তাকাল। “তাহলে আমি কোথায় ঘুমাব?”
“তুমি সোফায় ঘুমাবে।”
ঋতু তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করল,
“আমি আমার বাপের জন্মেও কখনো সোফায় ঘুমাইনি!”
রাফি বিরক্ত মুখে বলল,
“আমিও কখনো সোফায় ঘুমাইনি। আমিও বিছানাতেই ঘুমাব। আর আজ সারাদিন তোমাকে নিয়ে এত দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে, তাই বিছানাটা আমি নেব।”
ঋতু রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“হ্যাঁ, আপনি দৌড়াদৌড়ি করেছেন আর আমি কি বসে বসে ঘুমিয়েছি? আমিও সারাদিন আপনার সঙ্গে দৌড়েছি! আমি বিছানাতেই ঘুমাব। আপনি যদি আমাকে বিছানায় ঘুমাতে না দেন, তাহলে আমি অন্য রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ব!”
কথাটা বলেই ঋতু উঠে দাঁড়াতে চাইলে রাফি দ্রুত তার এক হাত চেপে ধরল।
“দেখো, এই সর্বনাশের কাজটা করো না। আমার মা যদি কোনোভাবে জানতে পারেন যে আমরা অভিনয় করছি, তাহলে সবকিছু ভেস্তে যাবে। আজ বরং আমি বিছানায় ঘুমাই। কাল তুমি ঘুমাবে। একদিন তুমি বিছানায় ঘুমাবে, আরেকদিন আমি। এভাবেই চলবে।”
ঋতু এখনো বিরক্ত চোখে রাফির দিকে তাকিয়ে আছে। তার সেই দৃষ্টি দেখে রাফি বলল, “চলো, রান্নাঘরে যাই।”
ঋতু আর কথা না বাড়িয়ে ভালো করে চুলগুলো মুছে নিল। তারপর দুজন একসঙ্গে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। রাত অনেক হয়ে গেছে। তাই এখন নতুন করে তেমন কিছু রান্না করার কথা ভাবল না রাফি। রান্নাঘরে ঢুকেই সে ঋতুকে বলল,
“তুমি চাইলে এখন রামেন বানাতে পারো। আমরা রামেন খেতে পারি।”
ঋতু বাঁকা হেসে রাফির দিকে তাকাল।
“যেহেতু বিছানায় আপনি ঘুমাবেন, তাই রান্নাটাও আপনাকেই করতে হবে।”
রাফি নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারল না।
“কী বললে তুমি?”
ঋতু নির্বিকারভাবে বলল,
“বললাম, আপনি রান্না করুন। আমি রান্না করতে পারব না।”
রাফি বিরক্তিতে কেবিনেট খুলে দুটি রামেনের প্যাকেট বের করতে করতে বলল,
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩৯
“হ্যাঁ, তা তো রান্না করতে পারবে না। পারবে শুধু আমার মাথা খেতে!”
ঋতু ততক্ষণে ফ্রিজ থেকে একটি আপেল বের করে ভালো করে ধুয়ে তাতে কামড় বসিয়েছে।
আপেলে আরেকটি কামড় দিয়ে সে একেবারে শান্ত গলায় বলল,
“আমি জানি আপনার মাথার মধ্যে কিছুই নেই। তাই আপনার মাথা খেতে নিশ্চয়ই জঘন্য লাগবে। আর আমি ওসব অখাদ্য গিলতে চাই না।”
