প্রণয়ের বিরহ গল্পের লিংক || তাসনিয়া রহমান স্নিগ্ধা

1720

প্রণয়ের বিরহ পর্ব ১
তাসনিয়া রহমান স্নিগ্ধা

‘ কাল থেকে আমার মেয়েকে আর পড়াতে এসো না তুমি। আমার মেয়ের আর টিউটরের দরকার নেই।’
ফারিয়া কে পড়াচ্ছিলাম এমন সময় আন্টি এসে কথাটা বললেন। পড়ানো বাদ দিয়ে আন্টির দিকে তাকিয়ে বললাম,,
‘ আমার পড়ানো কি খারাপ হচ্ছে আন্টি? আমি আরো ভালো করে পড়ানোর চেষ্টা করবো কিন্তু আমাকে এভাবে বাদ দিয়ে দেবেন না প্লিজ।’

‘ দেখো তাসনিয়া আমি তোমার সাথে এতো কথা বলতে চাইছি না। তোমার চালচলন আমার ভালো লাগে না, তোমার কাছে আমার মেয়ে পড়লে ও তোমার মতোই গেঁয়ো স্বভাবের হয়ে যাবে যেটা আমি একদম চাই না। এই নাও তোমার মাসের বেতন। পাঁচ হাজারের চেয়ে একটু বেশিই আছে এখানে,মাস শেষ হওয়ার আগেই দিয়ে দিলাম তোমাকে। এখন তুমি এসো।’

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আন্টির কথা শুনে হাত বাড়িয়ে টাকা গুলো নিতে বিবেকে বাঁধল আমার। উঠে দাঁড়িয়ে টাকাগুলো আন্টির হাতের মুঠোয় গুঁজে দিয়ে বললাম,,
‘ আপনার মেয়েকে আর যখন পড়াতেই পারবো না তখন আর এই টাকাগুলো নিতে পারি না আমি। এই টাকা দিয়ে আপনি ফারিয়া কে পুতুল কিনে দিয়েন,ও খুশি হবে।’

আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দোতলা ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এলাম।রাত আটটা ছুঁই ছুঁই করছে। মেইন রোডের পাশে স্টুডেন্টের বাড়ি হওয়ায় আসা যাওয়ায় কোন সমস্যা হয়নি আমার। বাড়ির সামনে থেকেই একটা রিকশা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।

একবার ঘুরে তাকাতেই দেখি আন্টি মুখ কালো করে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আমাকেই দেখছেন, মুখের উপর ওভাবে টাকাটা ফিরিয়ে দেবো এটা তিনি আমার কাছে ঠিক আশা করেননি।আমি তাসনিয়া রহমান স্নিগ্ধা, এবার অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা করে অনার্স এ এসে উদ্ভিদ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছি।

পড়াশোনায় আমি যথেষ্ট ভালো বলে আমার পরিচিত একজন একটা টিউশনি জোগাড় করে দিয়েছে।মাস দুয়েক ভালোই চলছিল কিন্তু এখন তিন মাসের মাঝামাঝি এসে আন্টি আমাকে মানা করে দিলেন। শান্ত হয়ে রিকশায় বসে রইলাম।এক ঘন্টা পর রিকশা আমার বাড়ির গেটের সামনে এসে দাড়ালো,ভাড়াটা দিয়ে বাসায় ঢুকতে যাবো ঠিক তখনই মা এসে আমার হাত ধরে টেনে গেটের বাইরে নিয়ে এলো।

‘ মা, কি করছো তুমি? আমার লাগছে তো।’
‘ চুপ। তুই এখন বাড়িতে ঢুকবি না তাসনিয়া।তোর বোন তাহমিমা কে দেখতে এসেছে পাত্র পক্ষের লোকজন,এর মধ্যে তুই বাড়িতে ঢুকলে ওরা যদি ওকে বাদ দিয়ে তোরে পছন্দ করে তাহলে তাহমিমা কে বিয়ে দিবো কিভাবে?এমনিতেও তুই আমার মেয়ের মতো এতো আধুনিক না হলেও রূপের বাহার বেশ ভালোই আছে তোর। এখন তুই কোথাও একটা চলে যা, পরে বাড়িতে আসিস।’

হাত ছেড়ে দিয়ে মা বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল। আমি গেটের বাইরেই মাটিতে বসে পড়লাম। এইমাত্র যিনি আমাকে বাড়িতে ঢুকতে মানা করলেন তিনি আমার নতুন মা। খুব ছোট বেলায় মা মা’রা যাওয়ার পর বাবা এই মহিলাকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছিল আমাদের বাসায়। বিয়ের পর কয়েকমাস আমাকে খুব আদর করলেও যখন নতুন মায়ের কোলে আরেকটা মেয়ে এলো তখন থেকেই বাবার আদর আমার জন্য হারাম হয়ে গেল সাথে নতুন মায়ের আদর ও।

বাবার সব আদর সৎ বোনের কপালে জুটল, আমি বাবার মেয়ে এটা শুধু কাগজে কলমে ছিল।বাস্তবিকে আমি বাড়ির কাজের মেয়ে হয়ে গেলাম। আস্তে আস্তে বাড়ির সব কাজ আমাকে দিয়ে করানো শুরু করলো মা। তখন তো খুব ছোট ছিলাম, ঠিক ভাবে কাজ করতে পারতাম না তার জন্য কত মা’র খেয়েছি নতুন মায়ের হাতে তার হিসাব নেই। ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলাম আর সব কাজ শিখে গেলাম।

বোন আমার মাত্র তিন বছরের ছোট হলেও ওকে দিয়ে মা কুটো টাও ছিঁড়ায় না।যদি ভুল করে ওকে কিছু করতে বলি তাহলে হয় আমার কপালে এক বেলার খাবার বন্ধ থাকে না হয় মায়ের মা’র খেতে হয়। কিছুদিন আগে নতুন মায়ের বোন এসে জুটেছে আমাদের বাড়িতে।

খালার চরিত্র ভাল না দেখে উনার স্বামী উনাকে তালাক দেন,আর উনি আশ্রয় নিতে আমাদের বাসায় এসে থাকতে শুরু করলেন।যখন তখন সবার সামনে আমাকে এমন ভাবে হুকুম করেন যেন তিনি ই এ বাড়ির মালকিন, আর উনার কথা না শুনে ও উপায় নেই। বাবার কাছে নাহলে মায়ের কাছে ঠিক বিচার দিবেন তিনি আর তারপর বাবা আমার কাছে কিছু না শুনেই মা’র’ধ’র করবেন।

কিছুক্ষণ মাটিতে ওভাবেই বসে বসে স্মৃতিচারণ করছিলাম তখন আমার বান্ধবী নীলু কল দিলো।ব্যাগ থেকে ফোন টা বের করে রিসিভ করতে,,,,
‘ হ্যালো তাসু!তোর জন্য একটা সুখবর আছে।তার আগে বল আন্টি কোথায়, আগে আন্টি কে খবর টা দেওয়া দরকার।’
‘ কি খবর, আগে আমাকে বল শুনি।আর মা এখন বাসায় আছে, আমি বাইরে গেটের সামনে বসে আছি।’
‘ আরে ইয়ার, আন্টির হক আগে। তুই তাড়াতাড়ি আন্টিকে গিয়ে ফোন টা দেতো, আমার আর তর সইছে না খবরটা দেওয়ার জন্য। আন্টির কাছে পৌঁছে আমাকে কল দিস।’

নীলু কল কেটে দিল। আমি মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কাপড় থেকে ধুলা ঝেড়ে নিয়ে গায়ের কাপড় ঠিক করে নিলাম।নীলু কি বলবে মা’কে কে জানে,কি এমন সুখবর যেটা আমার আগে মা’কে জানতে হবে? অন্যমনস্ক হয়ে ভাবতে ভাবতে বাড়ির দিকে ঢুকছিলাম এমন সময় আচমকা কারো সাথে ধাক্কায় মাটিতে পড়ে যেতে নিলাম।

হঠাৎ করে এভাবে ধাক্কা খেয়ে ও মাটিতে পড়িনি দেখে আস্তে আস্তে চোখ খুললাম, দেখি একটা সুদর্শন পুরুষ আমার কোমরে হাত দিয়ে আধ জড়িয়ে ধরে আছে। চোখে মুখে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, আমি ভয় পেয়ে গেলাম ওভাবে উনাকে তাকাতে দেখে। দুহাতে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইলাম কিন্তু তার আগেই লোকটা আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললো,,,,,

‘ একটা মানুষ কে ধাক্কা দিতে যেটুকু শক্তির প্রয়োজন হয় মিনিমাম সেই টুকু শক্তি ও তোমার মধ্যে নেই।ভাত খাও তো নাকি হাওয়া খেয়ে বাঁচো?’
নিজেকে সামলে নিয়ে রেগে গিয়ে কিছু বলতে যাবো তখনই আমার ফোনে নীলু কল দিলো আবার উনার ফোনে ও কল এলো আর উনি ফোনে কথা বলতে বলতে গেটের দিকে চলে গেলেন।

যাওয়ার সময় একবার আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে আবার চলে গেল। উনি যাওয়ার সাথে সাথেই নীলু আবার কল দিল, কলটা রিসিভ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখি মা দাঁড়িয়ে আছে।ঢোক গিললাম একটা,মা আবার ওই লোকটার সাথে আমাকে দেখেনি তো। এদিকে নীলু হ্যালো হ্যালো করে চলেছে আমার ওদিকে কোন খেয়াল নেই, ভয়ার্ত হরিনীর মতো চোখ নিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি।

‘ কে কল করছে তোকে?কথা না বলে আমার দিকে তাকিয়ে আমার মুখ কি দেখছিস তুই।’
‘ হ হহ্যা,নী নীলু কল করেছে, তোমার সাথে কথা বলতে চায়।’
‘ দে।’ বলে মা আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে কথা বলতে বলতে বাগানের দিকে এগিয়ে গেল।স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মায়ের কাছে গেলাম।মা কিছু দেখেনি সেটাই শান্তি, নাহলে আজ আর বাড়িতে ঢুকা হতো না আর। কিছুক্ষণ পর মা কথা বলে আমাকে ফোন ফিরিয়ে দিয়ে বললো,,,,

‘ ছেলে টা তোকে কি বলছিল তাসনিয়া?’
চমকে উঠলাম মায়ের কথায়,মা তাহলে ওই লোকটার সাথে আমাকে দেখে নিয়েছে। হার্টবিট ফার্স্ট কাজ করছে আমার, শরীর ঘামতে শুরু করলো। জানি না আজকে কপালে কি লেখা আছে আমার, মা’কে দেখতে ই হলো এই ব্যাপারটা?

প্রণয়ের বিরহ পর্ব ২