প্রণয়ের বিরহ পর্ব ২

687

প্রণয়ের বিরহ পর্ব ২
তাসনিয়া রহমান স্নিগ্ধা

‘ ক কোন ছেলে টা মা?’
‘ একটু আগে বাসা থেকে যেই ছেলে টা বেরিয়ে এলো আমি তার কথা বলছি।ও কি বলেছে তোকে?'(মা)
‘ কই আমি কোনো ছেলে কে দেখিনি তো। আমি তো এই মাত্র বাসায় ঢুকলাম, এতোক্ষণ তো গেটের বাইরেই ছিলাম।’
আমার কথা শুনে মা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। অবিশ্বাস্য গলায় বললেন,,

‘ তুই সত্যি বলছিস? কাউকে দেখিস নি , কিন্তু একটু আগেই যে,,,,,,,,’
‘ হ হ্যা, আমি তোমাকে মিথ্যে বলবো কেন?’
মা’কে কোনোরকমে পাশ কাটিয়ে বাসায় ঢুকলাম। বাসায় মেহমানে ভরপুর। তাহমিমা কে দেখতে আসা উপলক্ষে নতুন মায়ের আরো দুই বোন,মা ভাই এসেছে। সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছে আর তাহমিমা কে এটা ওটা বলে খেপাচ্ছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

বাসায় ঢুকেই ব্যাগ রেখে রান্নাঘরে কাজে লেগে পড়লাম, নাহলে রক্ষে থাকবে না আর। মেহমানদের রেখে যাওয়া এঁটো প্লেট গুলো সব বেসিনে জমে আছে,মা হাত লাগায়নি তাতে। প্লেটগুলো ধুয়ে রান্না বসিয়ে রুমে যাচ্ছিলাম তখন নানী, খালাদের ই’য়া’র্কি শুনে বুঝতে পারলাম যে তাহমিমা কে ওদের পছন্দ হয়েছে। কি সব বাসর ঘরের নোং’রা ইয়ার্কি করছে তাহমিমার সাথে,আর ও লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে রুমে চলে এলাম।নীলুর নাম্বারে ডায়াল করেছি তখন তাহমিমা পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললো,,

‘ জানিস আপু, আমি না আজকে ভীষণ খুশি। আমার এতো দিনের স্বপ্ন অবশেষে পূরণ হতে চলেছে, আমার মনের মানুষ কে আমি আমার করে পেতে চলেছি।’ (তাহমিমা)
‘ তোর মনের মানুষ মানে?'(আমি)

‘ আরেহ্ আপু, আজ আমাকে যে দেখতে এসেছিল শাহরিয়ার চৌধুরী তূর্য, ওর উপর আমি কবে থেকে ক্রাশড্ তুই জানিস? কলেজে সবাই জানে আমি শাহরিয়ার চৌধুরী তূর্য কে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি।আর তুইই বল,যাকে এতো ভালোবাসি তাকেই যদি নিজের হাজব্যান্ড রূপে পাই তাহলে খুশি হবো না কেন?'(তাহমিমা)
‘ ও, আচ্ছা।'(অন্যমনস্ক হয়ে বললাম )

‘ এই আপু, আমার কাছে উনার ফোন নাম্বার আছে।কল করি এখন?’
তাহমিমার কথায় আকাশ থেকে পড়লাম আমি। বহুত পাকনা মেয়ে তো, আজকে দেখতে এলোই মাত্র আর এর মধ্যেই ও হবু বরের ফোন নাম্বার ও জুটিয়ে ফেলেছে।ওর মাথায় গাট্টা মে’রে বললাম,,
‘ তুই ফোন নাম্বার পেলি কোথায় তামু?’

‘ একটু আগে যখন উনারা চলে যাচ্ছিলেন তখন আমি উনার কাছ থেকে কায়দা করে ফোন নাম্বার চেয়ে নিয়েছি।আর তার জন্যই তো উনার ওদের সাথে যেতে দেরী হলো।তো মি. শাহরিয়ার চৌধুরী তূর্য,ইউর টাইম স্টার্ট নাউ,,,’
এসব বলতে বলতে তাহমিমা রুম থেকে বেরিয়ে গেল, তূর্য কে কল করার জন্য। আমি কেন জানি আর খুশি হতে পারলাম না তাহমিমার কথায়।

যেখানে ওর খুশি তেই আমার খুশি ছিল এতো দিন সেখানে কেন জানি প্রথমবারের মতো ওর খুশিতে মন খারাপ হয়ে গেল আমার। বারবার মনে হতে লাগলো কিছুক্ষণ আগে যার সাথে ধাক্কা খেয়েছিলাম উনিই শাহরিয়ার চৌধুরী তূর্য হবেন।যদিও উনাকে নিয়ে ভাবার কোন কারণ নেই আমার তবুও প্রথম কোন পুরুষের ছোঁয়া লেগেছে আমার শরীরে, তারপরও কোনরকম অস্বস্তি বোধ করিনি উনার ছোঁয়ায়। কয়েক মুহুর্তের জন্য মনে হয়েছিল এভাবেই যদি কেউ আমাকে সব বিপদ থেকে বাঁচাতো, কারো ভালোবাসার ডালপালা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে পারতাম নিজের মতো। হঠাৎ কারো ককর্শ কন্ঠস্বরে ধ্যান ভাঙল আমার,,,

‘ কিরে নবাবজাদী, এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোন নাগরের কথা ভাবিস? রান্না ঘরে যে তরকারি চুলার উপরে সেটা খেয়াল আছে তোর?’
খালার কথায় হুঁশ ফিরল আমার,প্রায় দৌড়ে রান্না ঘরে গেলাম। ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে, তরকারি প্রায় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।বেশি আঁচে রেখেছিলাম গ্যাস টা।উপায়ন্তর না পেয়ে তরকারির কড়াই য়ে পানি ঢেলে দিলাম আর তখনই মা হায় হায় করতে করতে রান্নাঘরে এলো।

‘ এটা কি করলি তুই তাসনিয়া? তখন বাসায় ঢুকতে দেইনি বলে তুই এভাবে প্রতিশোধ নিলি, আমার হাড়ি পাতিল সব পুড়িয়ে খাবার নষ্ট করে দিলি তুই?'(কপালে হাত দিয়ে বললেন মা)
‘ মা, আমি আসলে খেয়াল……………’

‘ ওরে মুখ পুড়ি ‘ বলেই মা চুলের মুঠি ধরে টেনে রান্না ঘর থেকে বের করে নিয়ে এলো। এলোপাথাড়িভাবে দু গালে কয়েকটা চ’ড় বসিয়ে দিল সঙ্গে সঙ্গেই।বাবা তখন বাজার থেকে ফিরেছে, মা’কে ওভাবে আমাকে মা’র’তে দেখে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে। বাবা কে দেখেই আমাকে ছেড়ে দিল মা। এরপর শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদো কাঁদো গলায় বাবাকে বললো,,,

‘ তোমার মেয়ে তো আমাকে সহ্যই করতে পারেনা। তখন আমাদের তাহমিমা কে দেখতে এসেছিল না, আমি শুধু ওকে বলেছিলাম যে তুই একটু বাইরে ঘুরা ঘুরি করে আয়। অনেক দিন ধরে কোথাও ঘুরতে যাস না, সবসময় কলেজ থেকে কোচিং এ যাওয়া আসা করতে করতেই চলে যায় তোর।আর তুমি ও দেখলে ওকে আমি যেতে বলেছিলাম,,,,,,’
বাবা কিছুক্ষণ আগের ঘটনা টা মনে করে বললেন ‘ হ্যা।’ অন্ধকার থাকায় মা আমাকে টেনে বাইরে নিয়ে গিয়েছিল সেটা বাড়ির ভিতর থেকে বোঝা যায় নি, তাই বাবা ভেবে নিল মা আমাকে ঘুরতে যেতে বলেছিল তখন। মা বাবার হ্যা বোধক উত্তর শুনে আবার শুরু করলো ,,,,

‘ আর সেটাই আমার কাল হলো। তখন ওকে কোন পাপের জন্য যে যেতে বলেছিলাম আমি। তখনকার জেদ ধরে ও এখন রাতের সব খাবার পুড়িয়ে দিয়েছে, আমার এতো সাধের কড়াই টা পুড়ে ছাই করে দিয়েছে। তোমাকে বলছি শুনে রাখো, সময় থাকতে তোমার এই কুলক্ষণা মেয়েকে সামলাও নাহলে কোন দিন জানি রাগের বশে আমাকেও পুড়িয়ে দেয়।’ (মিথ্যা কান্নার শব্দ তুলে আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বললো মা)

বাবা মায়ের থেকে সব শুনে রাগী দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে। আমি অবাকের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছি মায়ের এতো সুন্দর করে সাজিয়ে গল্প বলা দেখে। তরকারি টা তো ভুল করে পুড়ে গেছে তার জন্য তো মা নিজেই আমাকে শাস্তি দিল তাহলে আবার বাবার সামনে এমন কেন? কিছু বুঝে উঠার আগেই বাবা আমাকে মা’র’তে শুরু করলো। হাজার হলেও তার বউ কে পুড়িয়ে মা’র’তে চেয়েছি বলে কথা ।

তাহমিমা কোথা থেকে দৌড়ে এসে বাবাকে আটকাতে গেল, অনেক কষ্টে বাবাকে ফিরিয়ে নিয়ে আমাকে রুমে নিয়ে গেল।মা ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করছিল কিন্তু তাহমিমা কে মাঝখানে আসতে দেখে রেগে যায়। এতো বড় একটা মেয়ে পড়ে পড়ে বাবার হাতে মা’র খাচ্ছে এটা নিশ্চয়ই শোভনীয় নয়, তাই তাহমিমা কে দেখে একটু ভালো হওয়ার চেষ্টা করে বললো,,,

‘ থাক আর মে’রো না, কি আর করবে বলো?সব কিছু কপালের ভাগ্য তোমার নাহলে কি আর এমন হবে।’
তাহমিমা মায়ের দিকে একবার কড়া দৃষ্টিতে তাকালো, এরপর আমাকে ‘ আপু রুমে চল ‘ বলে নিয়ে চলে এলো।

‘এই ভাইয়া , মেয়ে কেমন দেখে এলি কিছু বললি না তো।বলছি যে ভাবীকে পছন্দ হয়েছে তো তোর?’
ছাদে বসে আড্ডা দিচ্ছে তূর্য আর তার সব কাজিনেরা মিলে।কথার মাঝখানে আরশি হুট করে কথাটা বলে বসলো। সঙ্গে সঙ্গে সবাই ওকে জোর করলো মেয়েটার ব্যাপারে সবকিছু বলার জন্য। তূর্য খানিকটা ঘাড় চুলকে অপ্রস্তুত হয়ে হাসলো তারপর বললো,,,

‘ পছন্দ, পছন্দ জানি না আমি। এতো প্রশ্ন করিস না তোরা, ভাল্লাগে না আমার। এই দেখ, আমি তোদের সাথে আড্ডায় মজেছি আর আমার জানের জিগার দোস্ত একা একা ল্যাপটপে কাজ করছে।ছাড় তোরা আমাকে, আমি ওদিকে যাই।’
ওদের মাঝখান থেকে তূর্য উঠে এসে ছাদের কোনে রাখা একটা চেয়ারে বসে পড়ল। পাশেই তার সবচেয়ে কাছের মানুষ টা বসে একধ্যানে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে।

মানুষটার হাতের আঙ্গুল গুলো কী বোর্ডের উপরে খুব দ্রুত নাড়াচাড়া করছে, নাকের ডগায় রাখা হাই পাওয়ারের গ্লাসে সাদা আলো ঝিলিক দিয়ে উঠছে বারবার। কিছুক্ষণ মৌন ব্রত পালন করে অতিষ্ঠ হয়ে গেল তূর্য, তারপরও পাশের মানুষটিকে কোন হেলদোল না পেয়ে ধাক্কা দিয়ে বললো,,,
‘ রাজ্যের কাজ কি তোর একারই পূর্ব? আমি কতক্ষণ ধরে এখানে বসে বসে মশার চুমু খাচ্ছি সেদিকে কোনো নজরই দিচ্ছিস না যে!’

প্রণয়ের বিরহ পর্ব ১

তূর্যের ধাক্কা খেয়ে ল্যাপটপের স্ক্রীন থেকে চোখ সরিয়ে নিল পূর্ব।ওর দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললো,,, ‘ এই কয়টা দিন মশার চুমু সহ্য করে নে, এরপর তো বউয়ের চুমু খেতেই দিন যাবে তোর।’
আবার কাজে মনোনিবেশ করলো পূর্ব। এদিকে পূর্বের কথা শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছে তূর্য, পূর্ব এটা বললো কি? বেরসিক পূর্ব এই কথা বলেছে, লাইক সিরিয়াসলি,,,,,,,,

প্রণয়ের বিরহ পর্ব ৩