প্রণয়ের বিরহ পর্ব ৩

589

প্রণয়ের বিরহ পর্ব ৩
তাসনিয়া রহমান স্নিগ্ধা

‘ আপু, আজকে না তোর ইন্টারভিউ আছে চাকরির?কখন যাবি।’
আটটার দিকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো আমাকে।রাতে বারোটার দিকে ঘুমিয়েছি তার রেশ এখনও কাটেনি ভালো করে। ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে বললাম,,

‘ সময় আছে তো অনেক। আরেকটু ঘুমাতে দে,এমনিতে তো মায়ের জন্য ঘুমাতে পারিনা কখনও।'(আমি)
‘ ঠিক আছে, তুই ঘুমা।আটটা বাজে এখন। একটু পরে মা যখন আবার তোকে মে’রে ঘুম থেকে উঠাতে আসবে তখন তোর হুঁশ ফিরবে আমি বলে দিলাম।'(তাহমিমা)

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

তাহমিমার কথায় তড়াৎ করে বিছানায় উঠে বসলাম আমি।আটটা বেজে গেছে, স/র্ব/না/শ। নয়টার মধ্যে অফিসে পৌঁছাতে হবে আমাকে নাহলে চাকরি……….
সকাল নয়টার দিকে তাড়াহুড়ো করে বাসা থেকে বেরিয়ে এলাম আমি, হাতে আর একটুও সময় নেই। দু’দিন আগে একটা চাকরির জন্য পরীক্ষা দিয়েছিলাম,আজ তার ইন্টারভিউ আছে। সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে চাকরি হাতছাড়া হয়ে যাবে তাই দৌড়ালাম।

‘ মে আই কামিং স্যার?’
প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে এমডি স্যারের কেবিনের দরজায় নক করলাম। সাড়ে দশটার দিকে অফিসে এসে পৌঁছেছি আমি, আসামাত্রই শুনলাম আমার ইন্টারভিউ নাকি এমডি স্যারের কেবিনে হবে এবং কোনো ইন্টারভিউ বোর্ড ও ডাকা হয়নি। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জোরে নিঃশ্বাস নিলাম একটা, দেরি করার জন্য ভাগ্যে কি আছে জানি না তবে আল্লাহর কাছে খুব করে চাইতে লাগলাম চাকরি টা যেন পেয়ে যাই।

পাঁচ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে থাকার পর ভিতরে যাওয়ার অনুমতি মিললো।এমডি স্যার পিছন ঘুরে বসে আছেন, খুব সম্ভবত তিনি ল্যাপটপে কোনো কাজ করছেন। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে না ঘুরেই চেয়ারে বসতে বললেন। আমি শান্ত হয়ে চেয়ারে বসে পড়লাম, কিরকম ইন্টারভিউ নেওয়ার পদ্ধতি এটি কিছুই মাথায় ঢুকছে না। একজন সামনে এসে আছে অথচ তিনি নিজের মনে কাজ করে চলেছেন, পিছন ফিরে থাকায় ঠিক করে চিনতে ও পারছিলাম না মানুষ টাকে।

‘ আপনিই মিস তাসনিয়া রহমান স্নিগ্ধা?’
অন্যমনস্ক হয়ে উনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম হঠাৎ করেই সামনে ঘুরলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নিচু করে ফেললাম আমি। হঠাৎ এমন প্রশ্নের জবাবে কিছু বুঝতে না পেরে থতমত খেয়ে গেলাম, বললাম,,,
‘ হ্যা, হ্যা আমি তাসনিয়া রহমান স্নিগ্ধা।’

এরপর মিনিট কয়েক পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে দেখে আস্তে আস্তে চোখ তুলে তাকালাম। সামনের দিকে তাকিয়ে চারশো চল্লিশ ভোল্টের একটা শক খেলাম মনে হলো যেন। এতো সেই লোকটাই যার সাথে কালকে ওরকম……. আর ভাবতে পারলাম না। উনি ও আমার দিকে তাকিয়ে আছেন তবে আমার মতো অবাক চোখে নয় অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে।এক মুহুর্তের জন্য আমার মনে হলো কেউ হয়তো বা উনাকে সম্মোহিত করে দিয়েছে তাই ওভাবে তাকিয়ে আছেন। নিজের অবাক তা কাটিয়ে নিয়ে ডাকলাম,,

‘ এক্সকিউজ মি স্যার। আপনি আমার ইন্টারভিউ নিচ্ছিলেন।’
পূর্ব সামলে নিলো নিজেকে, একটু আগেই কি করছিল ও।সামনে বসা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,,
‘ আপনার কোয়ালিফিকেশন কি?’
‘ স্যার, আমি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী।’
‘ আপনার চাকরি হয়ে গেছে।কাল থেকে আপনি চাকরিতে জয়েন করবেন আর আপনার পোষ্ট কি সেটা ম্যানেজার জানিয়ে দেবেন। এবার আপনি আসুন।’

এমডি স্যারের কথা শুনে অবাকের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেলাম আমি। কোনোকিছু জিজ্ঞেস না করেই,যাচাই বাছাই ছাড়াই আমার চাকরি টা হয়ে গেল কি করে?যদিও অবাক হয়েছি কিন্তু তা বাইরে প্রকাশ করলাম না। চুপচাপ কেবিন থেকে বেরিয়ে এলাম। বাসায় আসতে আসতে পুরো বিষয়টি মাথায় ঢুকলো,ইনি তো আমার ছোট বোনের উডবি বর। সেজন্যই হয়তো বা আমাকে এভাবে চাকরি টা দিয়ে দিলেন। উনি আমার দিকে ওভাবে তাকিয়ে ছিলেন ব্যাপারটা ভাবতেই কেমন যেন লজ্জা লাগছিলো। শাহরিয়ার চৌধুরী তূর্য, বোনের চয়েজ আছে বলতে হবে নাহলে কি আর এমন হিরোর মতো হাজব্যান্ড পায়?

‘ কি হয়েছে দোস্ত,আর্জেন্ট ডাকলি কেন?’
পূর্বের সামনে বসে বললো তূর্য। পূর্ব কে দেখে বেশ অবাক হলো সে,ওমন গম্ভীর ছেলেটা আজকে এতো স্বাভাবিক ভাবে কাজ করছে বিষয়টা বেশ সন্দেহজনক মনে হচ্ছে তূর্যের কাছে।ল্যাপটপের দিকে একদৃষ্টিতে কি দেখছে পূর্ব, তূর্য যে এসেছে খেয়াল করেনি মনে হয় । চোখের সামনে তুড়ি মে’রে আবার জিজ্ঞেস করল,,,,
‘ হ্যালো স্যার, আমি আপনার সাথে কথা বলছি।’

ধ্যান ভাঙল পূর্বের। এতোক্ষণ স্ক্রীনে তাকিয়ে তাসনিয়া কে দেখছিল ও। কেবিনে সিসি ক্যামেরা সেট করা ছিল বিধায় তাসনিয়া কেবিনে ঢুকা থেকে বের হওয়া অবধি সবকিছু রেকর্ড হয়েছে ক্যামেরায়। তূর্য কে আর্জেন্ট ডেকে বসে বসে সেই রেকর্ডই দেখছিল পূর্ব। কেন জানি মেয়েটাকে বারবার দেখতে ইচ্ছে করছে তার,কাল রাতে ওই ইনসিডেন্টের পর থেকেই মেয়েটা ওকে টানছে ওর দিকে।যদিও মেয়েদের ব্যাপারে তার কোন ফিলিংস নেই বেশি একটা, সবার আগে তার কাজ। বাবার একমাত্র ছেলে হিসেবে সম্পূর্ণ কোম্পানির মালিক ও,তাই তার দায়িত্ব ও সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এই মেয়েটা? ওরকম মায়াভরা চাহনিতে পুরো দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছে ওকে।

‘ কথা বলবি না আমি যাবো পূর্ব?'(বেশ রেগে গিয়ে বললো তূর্য)
‘ এই মেয়েটার সমস্ত ডিটেইলস আমার চাই। কোথায় থাকে,কি করে,কার রিলেটিভ,রিলেটিভ হলেও সেটা কেমন রিলেশন সব সবকিছু চাই আমার।আর হ্যা,কাল থেকে ও আমার পি এ পোস্ট এ জয়েন করবে। ওকে ওর পজিশন টা বুঝিয়ে দিস কাল অফিসে এলে।'(পূর্ব)

ল্যাপটপ থেকে একটা প্রিন্ট করা ছবি বের করে তূর্যের হাতে দিল পূর্ব। কালকে তাহমিমার বাসায় ওকে দেখার পর থেকে কেন জানি মনে হচ্ছে মেয়েটা তাহমিমার কাছের কেউ।আর সেটা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য তূর্য কেই দায়িত্ব দিলো ওর ডিটেইলস খুঁজে বের করতে।
‘ তোর পি এ এই মেয়েটা?লাইক সিরিয়াসলি পূর্ব?এ তো আমার তাহমিমার বড় বোন তাসনিয়া।'(তূর্য)
পূর্ব চমকে উঠলো তূর্যের কথা শুনে।ও যা ভেবেছে ঠিক তাই,তাহমিমার রিলেটিভ। কোন এক অজানা কারণে মুখে হাসি ফুটে উঠল পূর্বর,,,

‘ তুই ঠিক জানিস তো এই মেয়েটা ভাবীর বড় বোন?'(পূর্ব)
‘ হ্যা।সিয়া কালকে ওদের পুরো ফ্যামিলির ফটো দেখিয়েছে, সেখানেই দেখেছি ওকে।’ (তূর্য)
‘আই সি।তো মিস স্নিগ্ধা, আপনি রেডি হয়ে নিন আপনার ভবিষ্যতের কাজের জন্য। তাসনিয়া নামটা আপনাকে মানায় না ঠিক, স্নিগ্ধা নামটা আপনার জন্য পারফেক্ট।’

(ছবির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো পূর্ব, ঠোঁটের কোণে হাসি)
তূর্য চোখ বড় বড় করে পূর্বের দিকে তাকিয়ে আছে সেটা ওর খেয়াল নেই। তূর্য শুধু ভাবছে এই বেরসিকের হলো টা কি আজ?ওর মুখের হাসি মানে তো নিউ মুন দেখতে পাওয়া,অথচ আজ কি দেখছে আর নিজে নিজেই হাসছে, আবার অতিরিক্ত কাজের প্রেশারে পাগল হয়ে যায় নি তো? একটা ঢোক গিলে তূর্য প্রায় দৌড়ে পূর্বের কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।

বাসায় ব্যস্ত পায়ে পায়চারি করছেন আনোয়ার চৌধুরী। কোনো কিছুতেই শান্তি পাচ্ছেন না তিনি, একবার বাগানে যাচ্ছেন তো আরেকবার ছাদে উঠছেন। স্বামীর এহেন অবস্থা দেখে আফসানা চৌধুরী তাড়াতাড়ি পূর্ব কে কল করলেন, একবার রিং হতেই পূর্ব কল রিসিভ করলো।

‘ হ্যালো, আম্মু,এই সময়ে কল করলে যে?'(পূর্ব)
‘ পূর্ব, তুই তাড়াতাড়ি বাড়িতে আয় বাবা।এসে দেখ তোর বাবার কি অবস্থা হয়েছে, অস্থির হয়ে একবার বাগানে তো আরেকবার ছাদে উঠা উঠি করছেন শুধু। এই বয়সে এভাবে উঠানামা করলে কোমরের সব হাড়গোড় আস্ত থাকবে না আর। তুই তাড়াতাড়ি আয়, আমি কিছু বলতেই পারছি না তাকে।'(আফসানা চৌধুরী)

প্রণয়ের বিরহ পর্ব ২

‘ হ্যা,আমি এখুনি আসছি তুমি চিন্তা করো না।'(পূর্ব)
ছেলে কে খবর দিয়ে আফসানা চৌধুরী বাগানে এলেন, আনোয়ার চৌধুরী তখন বাগানেই ছিল।ভয়ে চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে, শরীর ঘেমে একাকার। আফসানা চৌধুরী বুঝতে পারলেন না তিনি কি নিয়ে এতো ভয় পাচ্ছেন,,,,,,,

প্রণয়ের বিরহ পর্ব ৪