প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৫ (২)
ইনান হাওলাদার
রাস্তা পার হওয়ার উদ্দেশ্যে তারিন সেই তখন থেকে দাঁড়িয়ে আছে।সাথে তার ছয় বছর বয়সের পিচ্চি খালাতো ভাই। শক্ত করে কাফির হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে।
রাস্তা পার হওয়া তারিনের কাছে সবচেয়ে কঠিন কাজ। এই বিশ বছরের জীবনে ঠিকমতো রাস্তা পার হওয়া ব্যতীত বাকি সকল কাজ – কাম কম – বেশি সে পারে। রাস্তাও পার হতে পারে,আধ ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর। তবে আজ আধ ঘণ্টার বেশি হয়েছে সে রাস্তার পাশে পা ভেঙে দাঁড়িয়ে আছে। সাথে কাফি রয়েছে বলে আরো বেশি ভয়।পরের ছেলে গাড়ির নিচে চাপা পড়লে তো শেষ।
তারিন যতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক ততক্ষণ ধরেই তাকে ফলো করছে ব্ল্যাক সানগ্লাসের নিচে থাকা দুটি চোখ।
চোখ দুটি ভীষণ অধৈর্য।আর কতক্ষন এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখবে? যতই শীত শীত আমেজ আসুক দুপুরের রোদটা ঠিকই কড়া। মাথার তালু গরম হয়ে গিয়েছে।
তারিনদের দিকে এগিয়ে গেল লোকটা। বলল,
” এই মেয়ে ? রাস্তা পার হবে কখন ? ”
পেছন থেকে হঠাৎ করে বলে ওঠা মেহেদীর কথায় হালকা করে কেঁপে উঠলো তারিন। কাফি চোখ – মুখ কুঁচকে বলল,
” কে আপনি ? আমার আপিকে এভাবে ধ’মকাচ্ছেন কেন?”
মেহেদীও কাফির মতো করে চোখ – মুখ কুঁচকে ওর দিকে তাকালো।দুই বার করে এক ভ্রু নাচিয়ে বলল,
” আপনি কে? আমাকে এভাবে ধ’মকাচ্ছেন কেন?”
” আমি কাফি, কামরুজ্জামান কাফি! ” খুব ভাব নিয়ে বড়দের মতো করে বলল কাফি।
” আচ্ছা,কফি !”
” কফি নয়, কা..”
” তাহলে কি চা? নাকি শরবত ? ” কাফিকে শেষ করতে না দিয়ে কথাটা বলে মুচকি হাসে মেহেদী। কাফি তারিনকে রা’গ দেখিয়ে বলে,
” আপি?কে এই লোকটা? তুমি চিনো এনাকে? না চিনলে বলো ট্রাফিক পুলিশের হাতে তুলে দেই ”
তারিন কাফিকে ইশারায় থামতে বলে মেহেদীকে বলল,
” ভাইয়া আপনি কিছু বলবেন? না বললে রাস্তা পার হবো”
তারিনের মুখে এমন কথা শুনে মেহেদীর মনে হলো সে যেন কতগুলো মিমিস শুনল। দশটা মিমিসের হাসি এক সাথে হাসলেও মানুষ এত হাসে না সে যেভাবে হাসতে শুরু করলো। কাফি বললো,
” আপনি এভাবে পা’গলের মতো হাসছেন কেন? হাসি থামান ,আমরা রাস্তা পার হবো ”
” রাস্তা পার হবে তোমরা ? গত এক ঘন্টা ধরে তোমাদের দুই ভাই বোনের রাস্তা পার হওয়া দেখার আসায় চান্দি ফাঁটা রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি।কিন্তু সেই সৌভাগ্য হচ্ছে না ”
” আপনি কিন্তু অ’পমান করছেন । এই আপি চলতো রাস্তা ক্রস করি ”
” হ্যাঁ চল ” বলে কাফির হাত শক্ত করে ধরে তারিন।
” চালাও ” বলে মেহেদী তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। তারিন কাফিকে নিয়ে এক পা আগাচ্ছে তো দুই পা পিছাচ্ছে। মেহেদীর ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি। তারিন পিছন ঘুরে ঘুরে কয়েকবার তাকালো।লোকটা যখন দেখতেই পারছে সে রাস্তা পার হতে পারছে না ,তাহলে এত না হেসে একটু হেল্প করলেই তো হয়। এভাবে রাস্তা পার হতে না পেরে তারিনের একটু লজ্জা লজ্জাও লাগছে ।সে ফিরে এসে আবার রাস্তার এক পাশে দাঁড়ালো।মেহেদীর উদ্দেশ্যে বলল,
” আসলে কাফি ছোট তো ,ভয় পায় যদি তাই রাস্তা ফাঁকা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করাই ভালো।”
” আচ্ছা,’ চা – কফি ‘ কে আমি সামলাচ্ছি।তুমি বরং একাই রাস্তাটা পার হও ”
লোকটা তাহলে ধরতে পেরেই গেছেন সে রাস্তা পার হতে পারবে না।কিন্তু তার এই ধারণা তো সত্যি হতে দেওয়া যাবে না। তারিন কাফিকে বলল,
” তুই এখানে দাঁড়া ভাই।আমি রাস্তা পার হয়ে ওনাকে দেখিয়ে আসি।তারপর আবার এসে তোকেসহ পার হবো।”
” এই লোক যদি আমাকে কি’ডন্যাপ করে ? ”
” তোমার মতো ‘ চা – কফি ‘ বেঁচে আমার তেমন লাভ হবে না ভাইজান ”
খুব কষ্টে ,ইউনূস নবীর দোয়া পড়তে পড়তে রাস্তা পার হলো তারিন।অবশেষে সে পেরেছে।দেখাতে পেরেছে সেও রাস্তা পার হতে পারে। ঠোঁটে একটা গর্বের হাসি। রাস্তাটা পার হয়ে পিছু ঘুরতেই দেখলো মেহেদী কাফির হাত ধরে তার পাশে দাঁড়িয়ে । বড় উপকার হলো নাহলে আবার কখন রাস্তা পার হতে পারত, আবার কখন কাফিকে আনতো।এভাবে বারবার রাস্তা পার হতে হতেই বিকেল হয়ে যেত।তারিন একটু গর্ব নিয়ে বলল,
” দেখেছেন পারি কিনা ? ”
” হুম ,মাশাআল্লাহ খুব ভালো পারো। জা’নটাকে হাতের উপরে নিয়ে পার হলে ”
” সে যেভাবেই হই, হয়েছি তো ”
আর মজা করলো না মেহেদী সিরিয়াস হয়ে বলল,
” ভালো করে রোড ক্রস করতে পারো না,আবার একটা বাচ্চাকে নিয়ে চলে এসেছ? ”
” বাচ্চা বলো না আংকেল, সরি ভাইয়া…! কাফি ..কাফি আমার নাম ”
” আরেহ! শিবা দেখো তুমি ? গুড, গুড! আমিও দেখি ”
শিবা কাফির খুব পছন্দের কার্টুন।আর যে শিবা কার্টুন দেখে তাকেও সে খুব পছন্দ করে।যে কারণে এক মুহূর্তে মেহেদীকে তার মনে ধরে গেল। তারিনকে বলল,
” আপি তুমি আইসক্রিম নিয়ে এসো।আমরা গল্প করি ”
তারিনও চলে গেল।মেহেদী আর কাফি নানান গল্প করতে লাগলো।থেকে থেকে দুজনেই উচ্চ কন্ঠে হাসছে । তারা গিয়ে একটা রেস্টুরেন্টের মধ্যে বসলো। তারিন খোঁজাখুঁজি করতে পারে ভেবে তাকে কল করে রেস্টুরেন্টের নামটা বলল। কাফি কপাল কুঁচকে বলল,
” ভাইয়া ? তুমি আমার আপির নাম তবলা দিয়ে কেন সেইভ করেছ, হ্যাঁ? আমার আপি তবলা ? ”
” তোমার আপি আমার নাম এম. সি দিয়ে সেইভ করেছে। বুচ্ছো?
তাহলে তুলনামূলক ভাবে আমি ওর নামটা আরো কিউট করে সেইভ করেছি নাহ? ” পকেটে মোবাইল রাখতে রাখতে বলল মেহেদী। কাফি ভাবুক হয়ে বলল,
” এম. সি মানে কি ?”
” আরেকটু বড় হও বুঝে যাবে।এখন বলো কি খাবে? ”
” কিছু খাবো না ! আচ্ছা বলো তো তুমি কি হও আপির?”
” আমি ? আমি ….আমি তোমার আপির টিচার । এটি
আর তুমি? তুমি তোমার আপির কেমন ভাই ? আপন ? ”
” নাহ তো ..! খালাতো ভাই।কিন্তু আমি আর আপি দুজন দুজনকে অনেক ভালোবাসি ”
” ওওও..বুঝলাম! তা এভাবে ভর দুপুরে বাইরে বেরিয়েছ কেন? ”
কাফি একবার এদিক – ওদিক তাকিয়ে দেখে নিলো তারিন আসছে কিনা তারপর ফিসফিসিয়ে বললো,
” একটা সিক্রেট বলি ,আপিকে বলবে না ! আজকে আপিকে বিয়ের জন্যে দেখতে আসবে । কিন্তু আপি জানে না।আমাকে মাম্মা আর খাম্মা বলেছে দুই – তিন ঘণ্টা ঘোরার নাম নিয়ে আপিকে আটকে রাখতে । তারপর বাসায় ফিরতে ”
” ছেলে কি করে ? ” কাফির মতোই ফিসফিস করে বলল মেহেদী।
” সেটা তো জানি না। কিন্তু আপির বিয়ে হয়ে গেল আমার খুব খারাপ লাগবে।খাম্মাদের বাড়িতে আর আসতে মন চাইবে না ” মন খারাপ করে বলল কাফি।
” তুমি কি চাও তোমার আপির বিয়ে না হোক ? ”
” হ্যাঁ,চাইতো ”
” ওকেই,ডান ! আমি যেটা বলি সেটা শুনবে। ”
” আচ্ছা! কি করলে আপির বিয়ে হবে না? ”
মেহেদী কাফির কানে কানে কিছু বললো।মুহূর্তেই কাফির শিশু মনে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল।সে উত্তেজিত হয়ে বলল,
” এতে কাজ হবে তো ? ”
” হ্যাঁ ,হবে হবে ।এবার চুপ করো তোমার আপি আসছে। ”
ঠোঁটে হাত দিয়ে চুপ হয়ে যায় কাফি। তারিন তিনটা আইসক্রিম হাতে আসলো। কাফির হাত ধরে তাকে উঠাতে উঠাতে বলল,
” আয়” এবং একটা আইসক্রিম মেহেদীর দিকে ধরলো।মেহেদী মুখ বাঁকিয়ে বললো,
” এসব আইসক্রিম আমি খাই না।এত যখন খাওয়ানোর ইচ্ছা এখান থেকে কিছু খায়াও ”
” আমি বেশি টাকা নিয়ে বের হয়নি,ভাইয়া। অন্য একদিন খাওয়াবো ”
” তাহলে আজ আমি খাওয়াই।কফি কি খাবে বলো? ”
” আমরা কিচ্ছু খাবো না।চল ভাইয়া ” বলে কাফির হাত ধরে হাঁটতে যায় তারিন ।মেহেদী বলল,
” তোমাকে কে খাওয়াচ্ছে? কাফি তুমি খাবে না ? ” কথাটা
বলে কাফিকে ‘ হ্যাঁ ‘ বলতে ইশারা দিলো সে। কাফিও ‘ হ্যাঁ ‘ বললো। তারিন ইশারায় ‘ না ‘ বলতে বললো।কিন্তু কাফি শুনলো না।মেহেদী বলল,
” এসব সাই সুই পাতিয়ে লাভ নেই । ও খাবে ! কফি বসো ”
কাফি বসে পড়লো চেয়ারে। একজন ওয়েটারকে ডাকলো মেহেদী।মেনু কার্ড দেখে দেখে অনেক গুলো খাবার অর্ডার করে কাফি।এত খাবার অর্ডার দিতে দেখে তারিন কাফির পাশের চেয়ারে বসে পড়ে।তাকে টেবিলের নিচ দিয়ে চিমটি কাটে এত খাবার অর্ডার দিতে মানা করবে এই কারণে।কিন্তু কাফি চেঁচিয়ে ওঠে,
” আরে আপি চিমটি কাটছ কেন ? তোমার পছন্দের খাবারও তো অর্ডার দিচ্ছি। ”
” এত চিমটি কাটাকাটি না করে তুমিও কি খাবে বলে দেও।লজ্জা পাবার কিছু নেই।আমি কিছু মনে করব না ”
মেহেদীর কথায় লজ্জায় পড়ে যায় তারিন।সে কি খাবার অর্ডার দেওয়ার জন্য চিমটি কেটেছে নাকি? মেহেদী ভাইয়া কি ভাবলেন।এই কাফিটাও না, আস্ত একটা খাদক।খাবারের হদিশ পেলে আর মাথা ঠিক থাকে না।
আসিফ চৌধুরীর কথা মতো আজ অনেকটা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছে তূর্য। কেউ একজন আসবে বলেছিল।কিন্তু বাড়িতে ফিরে কাউকেই দেখতে পায়নি সে। সোজা নিজের কক্ষে চলে গিয়েছে। ফ্রেশ হয়ে আজ নিজের কফি নিজে তৈরি করেছে।কফি নিয়ে আসার পথে হঠাৎ মনে পড়লো কালকে রাতের কাহিনী, আহি বলেছিল মোবাইলে সবটা রেকর্ডিং হচ্ছে। সে দ্রুত আহির রুমের দরজায় গেল।নক করে ভিতরে প্রবেশ করলো।পড়ালেখা করছে আহি। তূর্য গিয়ে বলল,
” মোবাইল কোথায় তোর?”
আহির কিছু মনে না থাকলেও এইটুকু সে বুঝতে পেরেছে যে , কাল তূর্য ভাইয়ের বদলে সে মা’তাল হয়েছিল। না জানি কি কি করেছে। একটু না হয় বাড়াবাড়ি করেছে তাই বলে তিনি মারুফা বেগমকে নালিশ করে দিবেন? বড় মা আর ছোট মা না ঠেকালে তো আজকে কী মা’রটাই না খেতো।আল্লাহর অশেষ রহমত দুইটা চড়ের উপর দিয়ে বেঁচেছে। পিঠটা এখনো ভারি হয়ে আছে চড়ের ওজনে। তাই তো আজ সকাল সকাল বই খাটা নিয়ে বসেছে।নাহলে দেখা গেল আরেক চোট হয়ে যাবে ।
” মোবাইল কোথায় ? ” পুনরায় তূর্যের একই কথায় ভাবনার ছেদ ঘটলো আহির।সে তূর্যের দিকে মোবাইলটা এগিয়ে দিলো।মোবাইলসহ চেয়ার টেনে বসলো তূর্য। মোবাইল ঘেঁটে রেকর্ডিংটা খুঁজলো।কিন্তু কিছু খুঁজে পেল না। হয়তো রেকর্ডিং হয়নি ।সে মোবাইলটা ফেরত দিয়ে বলল,
” মেজো মা ব’কেছে? ”
” জুতো মেরে গরু দান করবেন না,তূর্য ভাই।আপনি আম্মুকে না জানালে তো আর আম্মু জানতে পারত না। আর মা’রও খেতে হতো না ”
” মে’রেছে ? ”
” নাহ! চু’ম্মা দিয়েছে ”
” কেমন মা’রল? হাত – পায়ে তো কোনো দাগ দেখা যাচ্ছে না !”
“এখন আসুন, আপনি মে’রে দাগ করুন ”
” ড্রাঙ্কড ছিলি বিধায় বেঁচে গিয়েছিস । নাহলে বলা লাগতো না,ঘুম থেকে উঠেই দেখতে পেতিস ” তূর্যের বিড়বিড় করে বলা কথাটা শুনে ফেলল আহি।কটমট করে বললো,
” এখন তো ড্র্যাংকড নেই।এখন মা’রুন ”
” এখন আমার মুড নেই ”
পরপর তিনটা মুখ ভেংচি কাটলো আহি। তূর্য চোখ সরু করে তাকিয়ে আছে। এই বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্য জানে সে শুধু আহির সাথে ত্যাঁ’ড়া কথা বলে।তাহলে এখন কে ত্যাঁ’ড়া করে কথা বলছে? সে নাকি এই বাড়ির সবচেয়ে ইনোসেন্ট,নি’ষ্পাপ,সাধু,সন্ন্যাসী মেয়ে? ;
” অ্যা’লকোহল কিভাবে আনিয়েছিস ? ” হঠাৎ তূর্যের প্রশ্নে
আহি মাথা নিচু করে বসে রইলো। সে তো প্রমিজ করেছে ধরা পড়লে আরিফের কথা বলবে না।আর মি’থ্যা গুছিয়ে বলতেও তো সময় লাগে।সে একটু দম মে’রে বসে থেকে মিনমিন করে বলল,
” আমি এনেছি ”
” নাকি তোর মেহেদী ভাইয়ার কাছ থেকে শিখেছিস। এইতো এখনো অর্গানিক ক্যামিস্ট্রি পড়ছিস। বিক্রিয়া করে বানিয়েছিস নাকি ? ”
” আমার মেহেদি ভাইয়া কেন বলছেন তূর্য ভাই? মেহেদি ভাইয়া কি আমার নাকি ? ”
” তোর না ? মোবাইলটা একবার দেখ, জাস্ট একদিন ব্যাচে যাসনি কতগুলো টেক্সট, মিসড কল ”
আহি তড়িঘড়ি করে মোবাইল হাতে নিলো । বলল,
” কখন এতগুলো কল করলো ,আমি তো বুঝতেই পারিনি ”
আহির এমন উতলা ভাব দেখে চোয়াল শক্ত করলো তূর্য। হাত থেকে থাবা দিয়ে মোবাইলটা ফেলে দিলো টেবিলে। থমথমে গলায় বলল,
” তুই আর ব্যাচে যাবি না।হোম টিউটর যেটা পড়ায় সেটা পড়বি।না বুঝলে ফে’ইল করবি।আমি তোকে দিয়ে চাকরি করিয়ে খাবো না ”
” ফে’ইল করবো মানে? কিসব বলছেন ? ”
” এত কোশ্চেনের আনসার আমি দিতে পারব না,আহি । নো মিনস নো ”
” আমি যাবো! “গো ধরে বলল আহি।
” আর একদিন, জাস্ট একদিন যেয়ে দেখ। তোর কত বড় কলিজা আমিও দেখি ” তূর্য চেয়ার থেকে উঠে আহির চোয়াল চেপে ধরে কথাটা বলে বড়বড় পা ফেলে চলে গেল।
আহি গাল ধরে বসে আসে। কেমন মুডরে বাবা! মাত্রই মজা করছিল,আর চোখের পলক পড়তে না পড়তেই এভাবে রে’গে – মেগে,হালকার উপরে ঝাঁপসা মে’রে – টেরে চলে গেল?
আহি পড়লো মহা মুছিবতে।সে যদি ব্যাচে না যায় তাহলে তারিনও যাবে না।আর তারিন ব্যাচে যাওয়ার ছেড়ে দিলে তো সর্ব’নাশ।
আগে তার প্রতি মেহেদীর একটা দুর্বলতা থাকলেও ইদানিং আহি লক্ষ্য করছে তারিনের প্রতি মেহেদীর একটা সফট কর্নার আছে। যদিও প্রায় সময়ই মেহেদী তারিনকে লেগপুল করে। তাদের সম্পর্কটা একটু সাপে – নেউলে। যদিও তারিন ভদ্রতা দেখিয়ে মেহেদীর সামনে মুখ খোলে না।কিন্তু অগোচরে পুরো ডিটারজেন্ট দিয়ে ধোয়।সে এই সম্পর্কের একটা নাম হওয়ার আসায় নিয়মিত ব্যাচ করে।নাহলে কোনো কালেই এত রেগুলার স্টুডেন্ট সে ছিল না। এইদিন যায় তো দুইদিন কামায় করে।
তারিন কত করে বলেছে সে আর ব্যাচে আসবে না।আহি তাকে একপ্রকার জোর করে আটকে রেখেছে। এখন কূলে এসে তো সে তরি ডুবাবে না। মেহেদি আর তারিনের মধ্যে একটা কিছু করিয়েই ছাড়বে।নিজে তো তূর্য ভাইয়ের মনে কাঠি গেড়ে বসতে পেরেছে।তার একমাত্র বেস্টফ্রেন্ড এর একটা ব্যবস্থা না করলে হয়?
তূর্য ভাই আর কি করবেন! একটু ব’কবেনই তো।একটু নাহয় ব’কলেনই।তাতে কী এমন ক্ষ’তি । এগুলো তো রোজই হয়,ভাত – মাছ হয়ে গিয়েছে। সাথে একটু পোলাও – মাংস হলে ভালো হয়।কিন্তু জনাব হবু তূর্য ভাই বর তো এসব পোলাও – মাংস খাওয়াবেন না। খাটাস লোক একটা !
আকবর চৌধুরী যতটা চিন্তা মাথায় নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন ঠিক ততটাই শান্ত মস্তিষ্কে বাড়িতে ফিরেছেন।একটু ক্লান্ত বটে। ওভাবে বের হয়ে যাওয়ার কারণে বাড়ি শুদ্ধু সবাই অনেক চিন্তায় পরে যায়।তারপর মিনিট দশেকের মাথায় আসিফ চৌধুরী তূর্যকে কল করে কিসব বলে,আর তূর্য জানিয়ে দেয়,
” টেনশনের কোনো কারণ নেই ” ব্যাস এটুকুই! কারণ আর ব্যাখ্যা করে বলে না।জিজ্ঞেস করলেও বলবে না। তাই আর জিজ্ঞেসও করেনি। তাছাড়া মারুফা বেগম আর পারভিন বেগমের মনোমালিন্য মিটে গেলেও তূর্যের প্রতি তিনি এখনো অভিমান করে আছেন।
সেই থেকে বাড়ির গিন্নিরা কৌতূহল নিয়ে বসে আছে আসল কারণ জানার জন্যে।কখন বাড়িতে তিন কর্তার যেকোনো এক কর্তা আসবে আর সত্যিটা উন্মোচন করবে।
আকবর চৌধুরীকে আসতে দেখে মারুফা বেগম আর লতা বেগম বড় জাকে খোঁচালেন কারণ জিজ্ঞেস করার জন্য। পারভিন বেগম কয়েকবার করে বললেন ,
” সবে মাত্র এলো।একটু বিশ্রাম নিক ” কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হলো না। বাকি দুইজন ছেলে মানুষী শুরু করে দিয়েছে। পারভিন বেগম অগত্যা একটা চায়ের কাপ নিয়ে এগিয়ে গেলেন। কাপটা দিতে দিতে বললেন,
” কি হয়েছিল সকালে ? আর আজ দুপুরেও তো ফিরলে না ”
” আর বলো না তোমার দেবরদের কথা । দুটোতে এখনো হাড়ে হাড়ে ব’দমাশ রয়েছে।খালি চুল দাঁড়িই পেকেছে ”
” কেন ? কি করেছে আমার দেবর’রা?”
” আমার একটা বন্ধু আছে না মানিক ? তুমি তো চিনো।কানাডা থাকে।ও গতকাল রাতে দেশে ফিরেছে ।দেখা করতে এসেছিল। আর হা’রামজাদা দুটো ম্যানেজারকে দিয়ে আমাকে কল করিয়েছে, বলেছে মিরপুরের শোরুমে নাকি আ’গুন লেগেছে । বজ্জাত !”
আকবর চৌধুরীর কথা শুনে পারভিন বেগম মুখ চেপে হাসি শুরু করলেন।আর লতা বেগম – মারুফা বেগম রান্না ঘর থেকে শব্দ করে হেসে দিলেন।আকবর চৌধুরী কপট রা’গ দেখিয়ে বললেন,
” হাসছো তোমরা ? আরেকটু হলে হার্ট অ্যা’টাক হয়ে যেতো আমার। এখন তূর্যকে ডাকো সকালে কি বলতে চেয়েছিল।বাকি অ্যা’টাকটুকু এখন সারি ”
মুহুর্তেই তিন গিন্নির মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল।তূর্য যে কি বলতে গিয়েছিল তারা খুব ভালো করেই বুঝেছিল। হুট করেই এই খবর কানে আসলে হার্ট অ্যা’টাক না করলেও অসুস্থ হয়ে পড়বেন তিনি।পারভিন বেগম বললেন,
” এমনি কি বলতে চেয়েছিল।তেমন কিছু না, মনে হয় ”
“আমার যতদূর মনে পড়ছে আহির কথা কিছু বলতে গিয়েছিল। বাড়িতে আছে তো নাকি? ডাকো একবার ”
” হ্যাঁ ,ডাকছি !কিন্তু শুধু শুধু ডেকে কি লাভ।ওই… আহি কি জিনিস নিয়েছিল মনে হয়,সেটাই বলতে চাইছিল ”
আকবর চৌধুরী শব্দ করে হাসলেন। বললেন,
” আহি বিচার দেওয়া ছেড়েছে আর এখন তোমার ছেলে ধরেছে । তো কি নষ্ট করেছে বলো।আমার মেয়ে নষ্ট করেছে আমি কিনে দিবো । ডাক দেও তাকে ”
” আমি তো কিছু নষ্ট করিনি বড় আব্বু ” ড্রয়িং রুমে নিজেকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে শুনতে পেয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে নিচে নামলো আহি।
” তাহলে তূর্য মিথ্যে বলল ? ”
” আমার সামনে বলতে বলুন তূর্য ভাইকে । ক’সম,আমি কিছু নষ্ট করিনি ”
” ক’সম কাটতে নেই আম্মা।আমি জানি তুমি কিছু নষ্ট করোনি। ”
রাতের তৃতীয় প্রহর।এখনো বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে মেহেদি।ঝিরঝির করে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। সেট হয়ে থাকা চুলগুলো ক্ষণে ক্ষণে দুলে উঠছে। উদাম শরীরে বুকে হাত বেঁধে শূন্যে তাকিয়ে আছে। এই ঠান্ডা আবহাওয়ায় কি তার শীত লাগছে না? অবশ্যয় লাগছে,কিন্তু এতক্ষণে বোধ করে উঠতে পারেনি।কেবলই মস্তিষ্ক নাড়া দিল।সে রুম থেকে একটা চাদর এনে শরীরে পেঁচিয়ে পুনরায় একই জায়গা একইভাবে দাঁড়ালো।
মানুষ কতই বিচিত্র প্রাণী। ক্ষণে ক্ষণে মনের পরিবর্তন ঘটে। দুইদিন আগেও সে আহির জন্য কতইনা পাগলামী করেছে। ঘর ছেড়েছে, পরিবার ছেড়েছে,কোনোদিন মাথায় ঝামেলা না নেওয়া ছেলেটা আস্ত একটা কোচিং সেন্টার খুলে বসেছে।
যখন নিজেদের বিসনেস সামলাতো নিজের নাম ও পদের পাশাপাশি তার একটা অন্য পরিচয়ও ছিল । এই মুহূর্তে মাথায় আসছে না।ছোট মস্তিষ্কে আর কত কিছু থাকবে! যার এক তৃতীয়াংশই আহিকে দিয়ে ভরা। ইদানীং সে বুঝে উঠতে পারে না সে কি সত্যিই আহি কে ভালোবাসে ? এই ভালোবাসার জন্য পরিবার ছেড়েছে? নাকি তার মায়ের কথাই ঠিক? ‘ এটা ভালোবাসা নয় মোহ ‘ বারবার হিসাব করেও কোনো সঠিক উত্তর সে বের করতে পারেনি।
এদিকে তারিন মেয়েটা …..!
আহির কথা ভাবতে গিয়ে হুট করেই তারিনের কথা মস্তিষ্কে হানা দেওয়ায় প্রচণ্ড পরিমাণে রা’গ হলো মেহেদীর। সে ভাবছে তার সুহাসিনীর কথা, হুট করে কুহাসিনীর কথা মাথায় কেন আসবে? এইযে যে প্রথমবার হলো সেটা নয়,প্রায়ই হয়।বলতে গেলে সবসময়ই হয়। সারাক্ষণ আহির সাথে থাকে এইজন্যে হয়তো মাথায় চলে আসে। এটা তো তার নিজের দোষ ,সেজন্যে ওই মেয়েটাকে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া ঠিক হবে? মেয়েটা তো কুহাসিনী নয় ! তাহলে কেন বলবে ? এমনিতেই আজ একটা বড় ক্ষতি করে দিয়ে এসেছে তার। এটা মোটেও উচিত হয়নি।তাহলে কেন করলো? শুধু মাত্র কাফিকে খুশি করতে?
দুপুর থেকে বিকেল প্রায় চারটা পর্যন্ত বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তারিনদের আটকে রাখে মেহেদী। শেষ মুহূর্তে তারিনকে খুঁজতে তার কাকা আসে এবং তাদের একসাথে দেখে তারিনকে জিজ্ঞেস করে,
” ছেলেটা কে?”
তারিন সত্যিটা বললেও মেহেদি বলে,
” ও মি’থ্যা বলছে।আমি ওর বয়ফ্রেন্ড ”
সাথে সাথে খুব অসহায় দৃষ্টিতে তারিন তার দিকে তাকায়।মেহেদী কথাটা বলেই বুঝতে পারে এটা বলা উচিত হয়নি।এত আগে – পিছে ভেবে সে বলেনি।সে কথাটা বলার পর তারিনের চাচার চাহুনিটা বেশ ভয়ংকর ছিল। আর তারিন তো সেখানেই কান্না করে দিয়েছিল।দুই চোখ জলে টইটুম্বুর হয়ে উঠেছিল।কাফিও বোধ হয় তার এমন কথা পছন্দ করেনি।কিভাবে চেয়ে ছিল।আর ছেলেটা যাওয়ার আগে এই কথাটা কেন বলল?
” আমার তো মনে হচ্ছে আপির বিয়ে আটকানোর ইচ্ছা আমার থেকে তোমার বেশি ”
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৫
সত্যিই কি তাই? ওই মেয়ের বিয়ে আটকে তার কি লাভ? আর ছোট একটা বাচ্চার কথা শুনে সে মেয়েটাকে এভাবে বিকাল অবধি আটকে রাখলো? কেন করলো এটা ?আর ভাবতে পারছে না মেহেদী।মাথাটা পুরো ভারি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার তো এটলিস্ট কল করে খোঁজ খবর নেওয়া উচিত ছিল।এতটা ক্ষতি করে দিলো মেয়েটার।সে ট্রাউজারের পকেট থেকে মোবাইল বের করলো।সময়ের দিকে নজর যেতেই সেটা পুনরায় পকেটে রাখলো।এত রাতে নিশ্চয় ঘুমিয়ে গিয়েছে। সারা বিকেল তো মাটি করলই,রাতটা নাহয় শান্তিতে ঘুমাক।
