প্রফেসর উজান চৌধুরী ঈদ স্পেশাল
বন্যা সিকদার
দূর মসজিদ থেকে ভেসে আসা নামাজের মিষ্টি মধুর ধ্বনি কানে আসতেই আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় উঠে বসল মৌ। প্রতিদিন নিয়ম করে ফজরের সালাত আদায় করা তার বহুদিনের পুরোনো অভ্যাস‚ তবে বিয়ের হুলস্থুল আর ঝামেলার কারণে গত দুটো দিন ভোরে ঠিকমতো ওঠা হয়নি। কিন্তু আজ ঈদের পবিত্র সকালে ঠিক সময়েই তার ঘুমটা ভেঙেছে। ঘুম ভাঙতেই নিজেকে নরম ও আরামদায়ক বিছানায় আবিষ্কার করে তীব্র অবাক হলো মৌ। তার স্পষ্ট মনে আছে‚ কাল রাতে উজানে’র ওপর চরম অভিমান করে সে মেঝেতেই গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাহলে বিছানায় সে এলো কীভাবে?
তবে তার চেয়েও বড় চমক অপেক্ষা করছিল যখন সে ডানপাশে ঘুরে তাকাল। বিছানার ঠিক পাশেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে আছে উজান! শুধু শুয়েই নেই‚ সে মৌ’য়ের ওড়নার আঁচলটা নিজের এক হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। দৃশ্যটা দেখা মাত্রই মৌ’য়ের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ী ও মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। তবে পরক্ষণেই নিজের দুই হাতের দিকে তাকাতেই তার চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল! এ কী? তার দুই হাত কনুই অবধি অপরূপ সুন্দর মেহেদীর লালচে রঙে রাঙানো! হাতের তালু আর পিঠের নিখুঁত নকশা দেখলেই বোঝা যায় ‚ কেউ একজন পরম মমতা আর অত্যন্ত যত্ন সহকারে সারা রাত জেগে এই ছবি এঁকেছে।
বিছানার পাশে তাকাতেই দেখল বেশ কয়েকটি মেহেদী ছড়ানো-ছিটানো পড়ে আছে। কিছু সময় একদম চুপ করে গভীর ভাবনায় ডুব দিল মৌ। মনে মনে ভাবল এই গভীর রাতে দরজা বন্ধ রুমে কে তাকে এত সুন্দর করে মেহেদী পরিয়ে দিল? একবার তার অবুঝ মনে উজান চৌধুরীর নামটা ভেসে উঠলেও সে নিজেই নিজের মাথা নাড়িয়ে উড়িয়ে দিল‚ এটা অসম্ভব! যে লোক তাকে দু-চোখে দেখতে পারে না‚ সে মাঝরাতে তাকে কোলে তুলে বিছানায় শোয়াবে আর হাত ধরে মেহেদী দেবে? অবাস্তব। আপাতত এই রহস্যময় চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সালাত আদায় করার জন্য বিছানা থেকে নামল সে। ওজু শেষ করে অত্যন্ত শান্ত মনে নামাজ আদায় করে নিল মৌ।
নামাজ শেষ করে জায়নামাজ গুছিয়ে রাখলো।
ঠিক তখনই ড্রেসিং টেবিলের সামনে একটা প্যাকেট দেখে কৌতূহলী বশত সেটা হাতে নিল এবং খুলে দেখলো। সাথে সাথে চমকে তাকালো মৌ। সেখানে একটা মেরুন রঙের শাড়ি‚ সাথে ম্যাচিং চুরিও৷ মূহুর্তেই মৌ’য়ের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠলো। মানুষটা তাহলে তার জন্য মেহেদীর সাথে শাড়িও কিনে এনেছে। সে মুচকি হেসে প্যাকেটা সেখানেই রেখে গুটি গুটি পায়ে উজানে’র পাশে শুয়ে পরলো।
লোকটা সেদিন রাতে দেমাক নিয়ে বলেছিল বিছানায় শুধু মৌ ঘুমাবে আর উজান ঘুমাবে সোফায়। তাহলে আজ নিজের আইন ভেঙে মহাশয় নিজেই কেন বিছানায় এসে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন? হয়তো ভুল করে ঘুমের ঘোরে উঠে এসেছেন। তবে মৌ মনে মনে চাইল না যে উজান কষ্ট করে ওই ছোট সোফাটায় গিয়ে ঘুমাক। তার মায়ায় ব্যাকুল হয়ে মৌ বিছানার ওপর উজান’কে দেখার জন্য এতটা ঝুঁকে পড়ল যে তার ভেজা চুলের সুবাস আর মুখের উষ্ণ ভারী নিশ্বাসগুলো সটান গিয়ে উজানে’র মুখে আছড়ে পড়তে লাগল। ঠিক তখনই ঘটল চরম অনাকাঙ্ক্ষিত সেই ঘটনা! উজান চোখ না মেলেই ঘুমের ঘোরেই আচমকা এক ঝটকায় মৌ’য়ের কোমর ধরে তাকে নিজের শক্ত বুকের মাঝে টেনে নিল।
আকস্মিক এই হামলায় মৌ’য়ের জান প্রায় কবজ হওয়ার দশা! মুহূর্তের মধ্যে উজান নিজের নাক ডুবিয়ে দিল মৌ’য়ের গলার নরম ভাঁজে। ঠোঁট ছোঁলাল তার মসৃণ মখমল ত্বকে‚ আলতো করে এঁকে দিল গভীর এক ভালোবাসার চুম্বন!
শরীরের ভেতর এক তীব্র ও অদ্ভুত অবশ করা শিহরণ বয়ে গেল মৌ’য়ের। বুকের ভেতরের হৃৎপিণ্ডটা যেন বিদ্যুৎ গতিতে লাফাচ্ছে‚ কান পাতলে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে সেই ধকধক শব্দ। পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল তার। কিন্তু সেই সুখকর অনুভূতির রেশ কাটতে না কাটতেই উজানে’র মুখ থেকে অবিন্যস্ত ও কাঁপা কাঁপা গলায় কানের কাছে ভেসে এলো এক নির্মম সত্য।
“আই লাভ ইউ শিরিন। আমি তোমাকে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি। প্লিজ আর একটাবার ফিরে এসো আমার লাইফে। ট্রাস্ট মি‚ আমি আর একটুও ভুল বুঝব না তোমায়। তুমি ছাড়া শূন্য আমি।
কথাগুলো যেন তীক্ষ্ণ তিরের মতো এসে সরাসরি মৌ’য়ের ছোট্ট কোমল বুকে বিঁধল। মুহূর্তের মধ্যে মেয়েটার সাজানো ভালোবাসার পৃথিবী আর কাঁচের মতো নরম হৃদয়টা চুরমার হয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল! এতক্ষণে মৌ’য়ের মগজে আলো ঢুকল। এখন সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে উজান চৌধুরী কেন ‘ভালোবাসা’ শব্দটাকে এত তীব্রভাবে ঘৃণা করে‚ কেন তার মনে মেয়েদের প্রতি এত ক্ষোভ। তবে মৌ-ও এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। সে বড্ড জেদি আর একরোখা মেয়ে। হোক না উজানে’র হৃদয়ে পুরোনো কোনো ক্ষতের দাগ‚ মৌ নিজের পবিত্র ভালোবাসা দিয়ে আবারও নতুন করে উজানে’র বুকে নিজের নাম লিখে ছাড়বে!
ঠিক তখনই উজানে’র ঘুমের ঘোর কাটল এবং সে চোখ মেলে তাকাল। কিন্তু চোখের সামনে মৌ’কে নিজের বাহুবন্ধনে ওভাবে লেপ্টে থাকতে দেখে সে এক ধাক্কায় ছিটকে উঠল। হকচকিয়ে বিছানা থেকে দ্রুত নেমে দাঁড়িয়ে গেলো।
“তু তু তু তুমি আবারও কোন সাহসে আমার আমার কাছে এসেছো?
মৌ নিজের বুকের ভেতরের কান্না আর ভাঙচুর লুকিয়ে রেখে তড়িৎ গতিতে বিছানায় উঠে বসল। মুখটা কুঁচকে দেমাকের সাথে বলল‚ “বাহ্ বাহ্ যত দোষ নন্দ ঘোষ। এখন আমি একটুও আপনার কাছে যাইনি প্রফেসর সাহেব বরং আপনিই নিজে মাঝরাতে সোফা ছেড়ে আমার বিছানায় এসেছেন। আর একটু আগে আপনিই আমাকে জোর করে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিয়েছেন হুহ।
“হোয়াটট? উজান চৌধুরীর চরিত্র এতটাও সস্তা বা বাজে নয় যে‚ সে যাকে তাকে মাঝরাতে বুকে টেনে নেবে।
মৌ বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে উজানে’র সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। “ওহ্ তাই নাকি? বউকে মুখে স্বীকার করে না অথচ সেই বউয়ের জন্য মাঝরাতে মল ওলটপালট করে শাড়ি কিনে নিয়ে আসে। আবার সারা রাত জেগে নিজের হাতে এত যত্ন করে মেহেদীর নকশাও এঁকে দেয়! এমনকি শেষ রাতে জড়িয়ে ধরে টুপটুপ করে চুমুও খায়। সে আবার এসেছে এখানে নিজের চরিত্র নিয়ে বড় বড় লেকচার দিতে? ঢং‚ এই খিটখিটে স্বভাবের জন্যই মনে হয় ওই শিরিন ডাইনি আপনাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে।
শিরিনে’র নামটা মৌ’য়ের মুখে শোনা মাত্রই উজান যেন পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পেল না। পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল তার। শিরিনে’র ব্যাপারে এই চৌধুরী বাড়ির লোকজন ছাড়া বাইরের কেউ তেমন কিছু জানে না। বাড়ির লোকও শুধু এতটুকুই জানত যে উজানে’র অতীতে একটা গভীর প্রেম ছিল কিন্তু সেই মেয়ের নাম‚ পরিচয় বা ইতিহাস কেউ জানত না। তাহলে এই পুঁচকে মেয়েটা কীভাবে জানল?
সে অত্যন্ত কাঁপা কাঁপা ও ভীত গলায় জিজ্ঞেস করল‚
“শ শ শ শিরিনে’র ব্যাপারে তুমি কীভাবে জানলে?
মৌ দুই হাত বুকের কাছে গুটিয়ে বেশ ভাব নিয়ে বলল‚ “যাহ্ বাবা একটু আগে নিজেই তো আমাকে ঘুমের ঘোরে জড়িয়ে ধরে সেই ডাইনিকে দশবার ‘আই লাভ ইউ’ বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললেন। এখন আবার আমাকেই উল্টো জিজ্ঞেস করছেন আমি কীভাবে জানলাম?
কথাটা শুনে উজান শুকনো ঢুক গিলল। নিজের ওপর তীব্র রাগ আর ক্ষোভ হতে লাগল তার। ঘুমের ঘোরে সে নিজের অজান্তেই এসব কী আবোলতাবোল বকে ফেলেছে! শিরিন’কে সে মন থেকে যতই মুছে ফেলতে চায়‚ সে ততই জেকে বসে। কাল বিকেলে দূর থেকে হুট করে মেয়েটাকে অন্য একজনের সাথে দেখার পর থেকেই মগজে যেন নতুন করে পুরোনো ক্ষতটা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ঠিক তখনই মৌ বাঘিনীর মতো পা ফেলে উজানে’র একেবারে গায়ের কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর উজানে’র মুখের দিকে ঝুঁকে পড়ে চোখ দুটো সরু করে অত্যন্ত মারমুখী ও ফিসফিসানি গলায় স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিল।
”শুনুন প্রফেসর সাহেব। বিয়ের আগে আপনার লাইফে কোন পেত্নী‚ ডাইনি বা চামচিকি ছিল‚ তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই। বাট‚ এখন যেহেতু আপনি আমার বিবাহিত ক্রাস বর সো আজ থেকে যদি আমি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছেন কিংবা ওই পুরোনো পেত্নীকে আবারও নিজের ঘাড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তবে আমি আপনাকে একদম আল্লাহর নামে কুরবানি দিয়ে দেবো হুহ!
এই বলেই মৌ উজানে’র মুখের ওপর এক বিশ্রী ভেংচি কেটে দরজার দিকে চলে গেল। উজান যেন পাথরের মূর্তির মতো একদম আহাম্মক বনে দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটার কথার তেজ দেখে মনে হচ্ছে‚ সুযোগ পেলে সে উজান’কে সত্যি সত্যি জ্যান্ত জবাই করে কুরবানি দিয়ে দেবে। উজান যখন নিজের স্তব্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে‚ ঠিক তখনই মৌ কোথা থেকে যেন দমকা হাওয়ার মতো আবার দৌড়ে ফিরে এলো। উজান কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচিয়ে উঠে উজানে’র ডান গালে ঠোঁট চেপে এক জোরালো মিষ্টি চুম্বন এঁকে দিল। তারপর উজানে’র কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে আওড়াল„
“ভালোবাসি আমার খিটখিটে প্রফেসর সাহেব! শুভ ঈদ মোবারক!
কথাটা বলেই আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না মৌ‚ খিলখিল করে হাসতে হাসতে এক দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। উজান রাগে গজগজ করে উঠল‚ “অসভ্য মেয়ে একটা। লাজ-লজ্জা বলতে কিছু নেই তার ডিকশনারিতে। ইডিয়েট একটা‚ সুযোগ পায় মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবো একদম।
মেরুন রঙের সেই চমৎকার জমকালো শাড়িটা পরিধান করে ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে ড্রয়িং রুমে হাজির হয়েছে মৌ। বেনারসি শাড়িতে তাকে আজ সত্যিই কোনো পরীর মতো লাগছে। বাড়ির পুরুষ মানুষ আরিফুল চৌধুরী‚ আকবর চৌধুরী‚ ইফাত‚ আরিয়ান এবং উজান সহ সবাই ঈদের নামাজ শেষ করে এইমাত্র মাত্র বাসায় ফিরেছে। সবার পরনে নতুন পাঞ্জাবি-পায়জামা। মৌ ড্রয়িং রুমে ঢুকেই বিন্দুমাত্র লজ্জা না পেয়ে সবার আগে দৌড়ে গিয়ে শ্বশুর আরিফুল চৌধুরী থেকে শুরু করে একে একে সবাইকে নিচু হয়ে সালাম করল এবং অত্যন্ত আদায় করে সবার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চকচকে কড়কড়ে সালামি লুফে নিল।
এবার সে সোজা গিয়ে দাঁড়াল উজানে’র সামনে। উজান তখন নিজের দুই জোড়া ভ্রু কুঁচকে মৌ’য়ের এই মেরুন শাড়ি পরা রূপের দিকে তাকিয়ে অবচেতন ভাবেই মনে মনে একটু মুচকি হাসল। ঠিক তখনই মৌ তার সামনে নিজের ডান হাতটা পেতে বেশ কায়দা করে বলে উঠল‚
“ঈদের সালামি দিন।
উজান সালামির কথা শুনে কোনো পাত্তা না দিয়ে বেশ আরাম করে গিয়ে সোফাটায় পা ছড়িয়ে বসল। মৌ-ও ছাড়ার পাত্রী নয়‚ সে-ও ঠিক ছায়ার মতো সোফার পাশে গিয়ে তপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। উজান এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে তার গম্ভীর ও কর্কশ স্বরে সংক্ষেপে আওড়াল‚ “কত?
মৌ খুশিতে একেবারে গদগদ হয়ে চোখ দুটো বড় বড় করে দুই হাত নেড়ে উত্তর দিল‚ “৩৪ হাজার।
মৌয়ের মুখে এই আকাশচুম্বী অঙ্কের কথা শোনা মাত্রই উজানে’র চোখ জোড়া কপালে ওঠার উপক্রম হলো। সে সোফা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠে আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল।
“হোয়াটটট? টাকা কি ঘোড়ার পেছন দিয়ে বের হয় যে চাইলেই দিয়ে দেবো?
উজানে’র এমন কিপটেমি মার্কা চিৎকার শুনে মৌ আর নিজের মুখ সামলাতে পারল না। সে নিজের কোমর দুই হাত দিয়ে ধরে তড়িৎ গতিতে উত্তর দিল।
”না আপনার নিজের পেছন দিয়ে বের হয়।
কথাটা মুখ থেকে বের হওয়া মাত্রই মৌ’য়ের নিজের হুশ ফিরল। সে দ্রুত নিজের দু-হাত দিয়ে নিজের মুখটা শক্ত করে চেপে ধরল। মনে মনে নিজেকেই গালি দিল‚ ধুর ছাই। এই পোড়া মুখটা কি এক সেকেন্ডও চুপচাপ থাকতে পারে না? বাড়ির সবার সামনে এই নোংরা কথাটা না বললে কি পেটের ভাত হজম হতো না তার? এদিকে মৌ’য়ের এমন অভাবনীয় ও মারাত্মক ভাষার উত্তর শুনে ড্রয়িং রুমে উপস্থিত সবাই “হো হো” করে হাসির রোল পড়ে গেল। ইফাত আর আরিয়ান তো হাসতে হাসতে সোফা থেকে মেঝেতেই গড়িয়ে পড়ার দশা। বাড়ির সবার সামনে নিজের বউয়ের মুখে এমন অবাস্তব কথা শুনে উজানে’র ফর্সা মুখ এবার রাগে একেবারে বেগুনি হয়ে গেল। সে রাগী চোখে মৌ’য়ের দিকে তাকাতেই মৌ চোরের মতো মুখ লুকিয়ে শাশুড়ীর পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিল।
সবার হাসির রোল দেখে উজান নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে রাগে-ক্ষোভে একেবারে বাঘের মতো গর্জন করে উঠল‚ “দেখেছ আম্মু? তোমাদের এই পরম আদরের ফাজিল বউমা কেমন ভাষায় কথা বলছে? এরপরেও কি তোমাদের মনে হয় যে এই বেয়াদব মেয়ের সাথে আমার একটুও ভালো ব্যবহার করা উচিত? আমার তো এখন মন চাইছে যে ওকে আমি…
উজান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে যেই না মৌ’য়ের দিকে এক পা দু-পা করে এগিয়ে যেতে চাইল। ঠিক তখনই তার সামনে এসে দাঁড়ালো ইফাত।
”আরে হোপ শালা। ঘরে এমন রূপবতী বউ থাকতে বিন্দুমাত্র কদর করিস না‚ সারাক্ষণ শুধু রাগ দেখাস। তোর যদি এতই অপছন্দ হয়, তবে মৌ’কে আমাকে দিয়ে দে। আমার নিজের বাপ তো আর জীবনেও আমাকে নিজে থেকে এভাবে ধরে-বেঁধে বিয়ে করিয়ে দেবে না। তাই তোরটাই আমাকে দে।
ইফাতের এমন রসাত্মক আর ধেষ্টামো মার্কা কথা শোনা মাত্রই উজান নিজের দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে গেল। সে আচমকা ইফাতে’র পিঠের ওপর সজোরে এক মোক্ষম কিল বসিয়ে দিল। “শালা তোকে আমি রাতে দেখে নেব।
ইফাত পিঠে কিল খেয়েও বিন্দুমাত্র দমল না বরং মুখ কুঁচকে আরও জোরে হেসে উঠল। “ঘরে এত সুন্দর নতুন বউ রেখে তুই মাঝরাতে আমার রুমে আমার কাছে আসবি? সিরিয়াসলি? নাকি তোর মধ্যে ভেজাল আছে‚ হ্যাঁ?
কথাটা বলেই ইফাত আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। উজানে’র পরবর্তী মার থেকে বাঁচতে এক লাফে ড্রয়িং রুমের অন্য প্রান্তে দৌড়ে গিয়ে সবার পেছনে সরে দাঁড়াল। উজান এবার রাগে একদম বোম হয়ে গেল। এই বাড়িতে এক মুহূর্ত থাকা মানেই নিজের সম্মান ধূলিসাৎ হওয়া। সে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে যেই না ড্রয়িং রুম পার হয়ে সদর দরজার দিকে চলে যেতে চাইল‚ ঠিক তখনই মৌ একদম চিলের মতো ডানা মেলে উজানে’র যাওয়ার পথ আটকে সোজা সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে নিজের ডান হাতটা উজানে’র সামনে পেতে বলে‚
“সালামিটা দিয়ে যান।
উজান নিজের ক্ষিপ্ত ও তপ্ত দৃষ্টি দিয়ে মৌ’য়ের দিকে তাকাল। যেন চাউনি দিয়েই মেয়েটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। তবুও মৌ’য়ের সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। সে নিজের বড় বড় হরিণী চোখ দুটো মেলে একদম নিষ্পাপ বাচ্চার মতো ফ্যালফ্যাল করে উজানে’র মুখের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়েই রইল। মৌ’য়ের এমন নাছোড়বান্দা রূপ দেখে উজানে’র ঠোঁটের কোণে এবার এক চরম বাঁকা ও রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে নিজের প্যান্টে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা খুঁজল। তারপর অত্যন্ত ভাব নিয়ে পকেট থেকে একটি ‘দুই টাকার নোট’ বের করে মৌ’য়ের হাতের মুঠোয় শক্ত করে গুঁজে দিল। নোটটা গুঁজে দিয়েই উজান খানিকটা নিচু হয়ে মৌ’য়ের কানের একদম কাছে মুখ এনে ফিসফিসানি স্বরে আওড়াল—
“লিসেন পুঁচকে মেয়ে। উজান চৌধুরী তার বাপের জন্মেও কোনোদিন এত বড় অঙ্কের টাকা কাউকে ফ্রিতে সালামি দেয়নি। কিন্তু আজ তোমাকে দিল। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো তুমি কতটা স্পেশাল?
মৌ নিজের হাতের ওই দুই টাকার নোটটার দিকে একবার তাকাল‚ আর একবার উজানে’র দেমাকী মুখের দিকে তাকাল। তার খুশিতে ডগমগ করা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে তপ্ত হয়ে উঠল। সে রাগে রি রি করে উঠে বলল‚ “কী বললেন? খাটাশ লোক একটা। আপনি কি এই দুই টাকা আমাকে ভিক্ষা দিচ্ছেন?
উজান নিজের কলারটা একটু সোজা করে বলল‚ “লাইক সিরিয়াসলি? এটা তোমার কাছে ভিক্ষা মনে হচ্ছে? তুমি আমার আম্মুর অতি আদরের নতুন বউমা তাই তোমাকেই স্পেশালি দিলাম। অন্য কেউ হলে তো আজ এক আনাও পেত না।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪
উজানে’র এমন চরম কিপটেমি সহ্য করতে না পেরে মৌ’য়ের মাথার সমস্ত রক্ত এক নিমেষে চড়ে গেল। সে আর নিজের রাগ সামলাতে পারল না। উজান কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৌ নিজের হাতের আঙুল দিয়ে উজানে’র শক্ত পেশিবহুল হাতের ওপর শরীরের সমস্ত শক্তি খাঁটিয়ে এক মারাত্মক চিমটি কেটে দিল। উজান ব্যথায় ককিয়ে ওঠার আগেই মৌ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে পা দাপাতে দাপাতে হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল।
