প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৭
বন্যা সিকদার
মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। পুরো আকাশ জুড়ে কালো মেঘের আছন্ন। আজ আকাশটা যেন ভীষণ অভিমান করে বসে আছে‚ সেই অভিমানেই হয়তো চাঁদেরও আজ দেখা মেলেনি। মাথার ওপরের সেই মেঘলা আকাশটার দিকেই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেহের। রাত তখন বেশ গভীর‚ চারদিক নিস্তব্ধ‚ অথচ এই অসময়েও মেহের একাকী ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এই চৌধুরী বাড়িটা তার ভীষণ পছন্দের একটা জায়গা হয়ে উঠেছে‚ কারণ এখানে সে নিজের মনের মতো করে থাকতে পারে। কেউ কখনো তার কোনো ইচ্ছেতে অনধিকার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে বাধা দেয় না। এত রাতে সে যখন ছাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছিল‚ তখন আকবর চৌধুরী (যিনি সম্পর্কে উজানে’র চাচা এবং ইফাতে’র নিজের বাবা) তাকে এত রাতে ছাদে যেতে বারণ করেছিলেন বটে‚ তবে মেয়েটার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে তার ইচ্ছেতে আর জোর খাটাননি। এই অল্প কদিনের মধ্যেই মেহেরে’র প্রতি এক অন্যরকম পিতৃত্বের টান অনুভব করেন তিনি। নিজের কোনো কন্যাসন্তান নেই বিধায় মেহের’কে তিনি একদম নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করেন। তাই তো মেহের ছাদে আসার পর থেকে এই গভীর রাতের মাঝেও সেই মানুষটা দূর থেকে বারবার উঁকি দিয়ে দেখে গিয়েছেন যে তার মা জননী একা একা ভয় পাচ্ছে কিনা।
মেহের অবশ্য তার সেই স্নেহমাখা চাউনি বুঝতে পেরেছিল। তাই সে নিজে থেকেই তাকে হেসে বলেছিল‚ সে যেন রুমে গিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমান। এই পৃথিবীতে যদি তার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ কোনো জায়গা থাকে, তবে তা হলো আপনাদের এই বাড়িটা। মেহেরে’র মুখে এমন ভরসার কথা শুনে আকবর চৌধুরী নিজের মনের সমস্ত চিন্তা কাটিয়ে কিছুক্ষণ আগেই রুমে ফিরে গিয়েছেন। মেহের এবার নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদের দিকে তাকাল এবং তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। পাশের ছাদের একটা দোলনায় বসে এক কপোত-কপোতী পরম আনন্দে দুলছে আর গল্প করছে। এই চৌধুরী বাড়িতে আসার পর মেহেরে’র ওদের সাথে কয়েকবার কথা হয়েছে। দুজনেই ভালোবেসে একে অপরকে বিয়ে করেছে এবং এখন তারা হাসব্যান্ড-ওয়াইফ। বেশ মানিয়েছে দুজনকে কিন্তু ওই সুখী দম্পতিকে দেখতে দেখতেই আচমকা মেহেরে’র সেই হাসোজ্জ্বল মুখটা যেন এক নিমিষে কালবৈশাখীর কালো মেঘে ঢেকে গেল। ছাদের তীব্র ঠান্ডা বাতাস এসে যেমন তার খোলা চুলগুলোকে ওড়াতে লাগলো‚ ঠিক তেমনি তার ভেতরের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়টাকেও চট করে এলোমেলো করে দিল।
পাঁচ বছর আগের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়ঙ্কর কালরাত আজও তার পিছু ছাড়েনি। প্রতি নিয়ত সেই অতীত মনের ভেতর এক গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গিয়েছে। ঠিক তখনই মেহেরে’র নাসিকাপটে পুরুষালী পারফিউমের এক মিষ্টি ও চেনা ঘ্রাণ এসে ধাক্কা দিল। এই সুবাস বড্ড চেনা তার। সে আলতো করে ঘাড় বাঁকিয়ে পাশে তাকাতেই দেখল ইফাত এসে দাঁড়িয়েছে। মেহের এবার আর আগের মতো রাগ করে বা ঝামটা দিয়ে চলে গেল না বরং রেলিং ধরে আগের মতোই শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই চঞ্চল লোকটার সাথে তার মোটেও কথা বলতে ইচ্ছে করে না কিন্তু লোকটা চুইংগামের মতো সারাক্ষণ তার পিছু ছাড়ে না। অবশ্য এতদিনে মেহের ইফাতে’র মধ্যে কোনো খারাপ বা কুৎসিত উদ্দেশ্য খুঁজে পায়নি। আর ঠিক সেই ভরসাতেই সে এখনো শান্ত হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। ততক্ষণে নীরবতা ভেঙে ইফাতে’র ভরাট কণ্ঠস্বর মেহেরে’র কানের কাছে ভেসে এলো।
“আই অ্যাম রিয়েলি সরি‚ আমার ফুলকন্যা!
ইফাতে’র মুখে ওই একটি শব্দে মেহেরে’র থমকে যাওয়া হৃদয়ে হঠাৎই এক অজানা দোলা দিয়ে উঠল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে এক রাশ গভীরতা নিয়ে ইফাতে’র চোখের দিকে তাকাল। ‘ফুলকন্যা’ নামটা শুনতে ভীষণ কিউট আর মিষ্টি লাগে বটে‚ তবে নামটা যে তার এই অন্ধকারময় জীবনের সাথে বড্ড বেশি বেমানান। সে এক বিষাদময় তপ্ত হাসি হাসলো।
”নামটা ভীষণ সুইট। তবে এই সুন্দর উপাধিটা আমার মতো মেয়ের জন্য একদমই নয়। সেই জন্য আপনি আমাকে ‘মেহের’ নামেই ডাকতে পারেন। আর হ্যাঁ‚ হঠাৎ এত রাতে সরি বলার কারণটা জানতে পারি?
মেহেরে’র মুখে কোনো রাগ বা বিরক্তি না দেখে ইফাতে’র ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চঞ্চল হাসি ফুটে উঠল। মেহেরে’র কথার মাঝে আজ একটুও বিরক্তির ছোঁয়া নেই। ইফাত ঠিক এইটুকুই চেয়েছিল মেয়েটার কাছ থেকে। সে নিজের মাথা চুলকাতে চুলকাতে চপল সুরে আওড়ায়‚
“তুমি এত সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলো কী করে‚ হ্যাঁ? আর তুমি কি জানো‚ যখন তুমি হাসো তখন দেখতে বড্ড বেশি কিউট লাগে তোমায়?
মেহের এবার এক ভ্রু কুঁচকে ইফাতে’র দিকে তাকিয়ে বলল‚ “ফ্লার্ট করছেন আমার সাথে?
“আরে না। আমি একদম সিরিয়াসলি বলছি।
মেহের নিজের মুখটা ঘুরিয়ে আবারও সামনের ওই মেঘলা আকাশের দিকে তাকাল। বুক চিরে এক গভীর শ্বাস ছেড়ে উত্তর দিল‚ “তা আপনার ডজন ডজন গার্লফ্রেন্ড বুঝি আজ অভিমান করে বসে আছে? তাই তাদের না পেয়ে আমার সাথে টাইম পাস করতে এসেছেন এখানে?
“আচ্ছা তুমি কথায় কথায় ওইসব মেয়েদের কেন টেনে আনো বলো তো? শোনো ফুলকন্যা‚ এই গার্লফ্রেন্ড বলে আমার ডিকশনারিতে কোনো শব্দ নেই। ওরা আমার জাস্ট ফ্রেন্ড‚ ব্যস।
”হুম বুঝতে পারছি।
এরপর দুজনেই কিছু সময়ের জন্য একদম চুপ হয়ে গেল। মেহের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলেও‚ ইফাতে’র অবাধ্য চোখ জোড়ার সমস্ত দৃষ্টি কিন্তু পুরোপুরি মেহেরে’র ওই মায়াবী মুখের ওপরই আটকে ছিল। কেন যে তার এই চঞ্চল চোখ দুটো দুনিয়ার সব মেয়েকে বাদ দিয়ে শুধু এই শান্ত মেয়েটার কাছে এসেই থমকে যায়। তা ইফাত নিজেও জানে না। সে অনেক চেষ্টা করেছে মেহেরে’র থেকে দূরে থাকার কিন্তু মন যেন কিছুতেই সায় দেয় না। যে ইফাত চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বাইশ ঘণ্টাই বাড়ির বাইরে বন্ধুদের সাথে টইটই করে আড্ডা দিয়ে বেড়াত। যা নিয়ে তার মায়ের অভিযোগের কোনো শেষ ছিল না। সেই ইফাত এখন চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে হাতে গোনা মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাইরে থাকে আর বাকিটা সময় ঘরের কোণে কাটায়। আর এই জাদুকরী পরিবর্তনের মূল কারণ যে মেহের নিজেই‚ তা বাড়ির অন্য সবাই বুঝতে না পারলেও উজানে’র তীক্ষ্ণ চোখ কিন্তু ঠিকই ফাঁকি দিতে পারেনি। উজান অবশ্য বারণ করেনি‚ তবে সব কিছু ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে। কারণ একটা ভুল সিদ্ধান্ত যে পুরো লাইফটা এক নিমেষে ধ্বংস করে দিতে পারে‚ তার জলজ্যান্ত প্রমাণ তো উজান নিজেই।
এই গভীর নীরবতার মাঝেই হুট করে ইফাতের পকেটে থাকা ফোনটা অনবরত কেঁপে উঠল। আজ এইটুকু সময়ে কম হলেও অন্তত পঞ্চাশবারের ওপর ফোন এসেছে তার মোবাইলে। আর মেসেজের তো কোনো হিসাবই নেই। এই অনবরত নোটিফিকেশনের শব্দে ইফাত ভীষণ বিরক্ত হলো। মনে মনে ভাবল‚ যেখানে সে নিজে থেকে কারো ফোন ধরছে না‚ সেখানে এই মেয়েদের এত মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করার কী দরকার। ইফাতে’র ওই চরম বিরক্তি মাখা মুখের দিকে তাকিয়ে মেহের আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না‚ সে খিলখিল করে হেসে উঠল। মেহেরে’র সেই মুক্তো ঝরানো হাসির দিকে তাকিয়ে ইফাতও নিজের সমস্ত বিরক্তি ভুলে নিঃশব্দে হেসে ফেলল। মেহের নিজের হাসি থামিয়ে বলল‚
“আপনার এত এত ভালোবাসার মানুষ আপনাকে মনে করে ফোন-মেসেজ করছে অথচ আপনি রোমিও সেজে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন? তাদের সাথে কথা বলছেন না কেন?
“আরে চুপ কর তো। ওই অসহ্য মেয়েদের সাথে এখন আর বিন্দুমাত্র কথা বলতে ইচ্ছে করে না আমার। জানো‚ গত এক সপ্তাহ থেকে আমি কারো সাথে একটাও কথা বলিনি। সবার সাথে একদম অফিশিয়ালি ব্রেকআপ করে নিয়েছি। তবুও কিছু বেয়াদব মেয়ে নাছোড়বান্দার মতো আমাকে বিরক্ত করে যাচ্ছে।
“তবে আমি তো জানতাম ওইসব সুন্দরী মেয়েদের সাথে চ্যাট করতে আর ফ্লার্ট করতে না পারলে আপনার মনের নাকি শান্তি মেলে না?
“ওটা শান্তি ছিল না ফুলকন্যা‚ ওটা ছিল একটা সস্তা নেশা। অবশ্য সেই সস্তা নেশা আমার মন থেকে এখন পুরোপুরি কেটে গিয়েছে। এখন আমার লাইফে এমন একজন বিশেষ মানুষ এসেছে‚ যাকে ঘিরে এই চঞ্চল আমিটা বাকি জীবনটা শান্ত হয়ে কাটাতে চাই। তাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য শুধু এই মেয়েদের নেশা কেন‚ আমার লাইফের যত রকমের বাজে অভ্যাস আছে। আমি এক পলকে সব ছেড়ে দিতে রাজি আছি।
মেহের ইফাতে’র চোখের সেই গভীর আকুলতা দেখতে পেলো না। তাই মুচকি হেসে বলল‚ “বেশ ভালো তো। তা আপনার সেই বিশেষ মানুষটার সাথে আমাকে কোনোদিন একটু দেখা করিয়ে দিয়েন তো? না মানে‚ আমি তাকে পার্সোনালি একটু বলে দিতাম। যাতে সে আপনাকে সারাদিন ওভাবে টইটই করে ঘুরতে না দিয়ে জলদি কোনো একটা জবে জয়েন করতে বাধ্য করে।
ইফাত মুহূর্তের মধ্যে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ দুটো উজ্জ্বল করে বলল‚ “আমি কোনো জব বা বিজনেস করলে তুমি খুশি হবে ফুলকন্যা?
”আমার খুশির চেয়েও আপনার মা-বাবা সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন। তারা সবসময় চান তাদের একমাত্র ছেলে যেন এবার একটু সংসারী হয়ে তাদের পাশে এসে দাঁড়াক।
“ওকে ফাইন। আগামীকাল থেকেই আমি ড্যাডের সাথে অফিসে যাব আর মন দিয়ে বিজনেস শিখব।
এরপর মেহের আর কথা বাড়াল না। রাতের শীতল বাতাসের গতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকায় তার শরীরটা কিছুটা কাঁপছিল। তাই সে রেলিং ছেড়ে পাশের দোলনাটায় গিয়ে বসল। ইফাতও কোনো দ্বিধা না করে ধীরপায়ে গিয়ে তার ঠিক পাশেই বসল। গত এক সপ্তাহে এই মানুষটাকে মোটামুটি খুব কাছ থেকে চিনেছে মেহের। সে মনে মনে যতটা খারাপ ভেবেছিল‚ লোকটা আসলে তেমন নয়। শুধু একটু ছন্নছাড়া আর অবাধ্য। এতকাল পুরুষ জাতির প্রতি মেহেরে’র মনে যে তীব্র ঘৃণা আর ভয় জন্মেছিল। চৌধুরী বাড়ির ছেলেদের ব্যবহার দেখে তা যেন এখন একটু হলেও কমতে শুরু করেছে। এই বাড়ির প্রতিটা ছেলেই একদম ভিন্ন ধাতুতে গড়া‚ তারা নারীদের সম্মান করতে জানে। ঠিক তখনই নীরবতা ভেঙে ইফাত আবারও ফিসফিস করে মেহেরে’র কানের কাছে মুখ এনে শুধাল।
“আচ্ছা ফুলকন্যা‚ এই মাঝরাতে একা একা অন্ধকার ছাদে চলে এলে। তোমার একটুও ভয় করছিল না? যদি হুট করে কোনো ভূত-প্রেত চলে আসত?
মেহের এবার নিজের পুরো দৃষ্টিটা স্থির করে ইফাতে’র চোখের ওপর রাখাল। তার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই চিরচেনা বিষাদময় তপ্ত হাসিটা ফুটে উঠল। সে অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর গলায় উওর দিল।
”তাসনুভা মেহের কোনো কাল্পনিক ভূত-প্রেতকে ভয় পায় না মিস্টার। সে যদি এই পৃথিবীতে কাউকে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়‚ তবে তা হলো এই নিষ্ঠুর পুরুষ জাতিকে। যারা নিজের স্বার্থের জন্য একটা মেয়ের আলোয় ভরা সুন্দর জীবনটাকে এক নিমেষে অন্ধকার নরক বানিয়ে দিয়েছিল।
মেহেরে’র কথার ভেতরের সেই তীব্র লুকানো ক্ষত টের পেয়ে ইফাতে’র বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে অত্যন্ত নরম সুরে জিজ্ঞেস করল‚ “সেই জন্যই কি তাহলে তুমি এতদিন আমার সাথে একটাও কথা বলোনি। আমাকে এড়িয়ে চলেছো? কিন্তু কেন তুমি পুরুষ জাতিকে এত ভয় পাও ফুলকন্যা? কী হয়েছিল তোমার অতীতে?
মেহের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালো। “সেসব কথা আপাতত মনের গহীন কোণেই লুকানো থাক। সময় হলে কোনো একদিন না হয় বলব।
“কিন্তু তার আগে বলো‚ শুনলাম তুমি আমাদের এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছ? কথাটা কি সত্যি?
“আপনাদের বাসায় মেহমান হয়ে রয়েছি আজ প্রায় পনেরো দিন হয়ে গেল। তাছাড়া আগামীকাল থেকে আমাদের কলেজও খুলে যাবে। তাই ভাবছি আমি কাল কলেজ শেষ করেই সরাসরি ফুঁপির বাসায় চলে যাব। ভাইয়াকে বলে দিয়েছি‚ সে এসে আমার জিনিসপত্রগুলো নিয়ে যাবে।
“মাত্র পনেরো দিনেই কেউ এভাবে নিজের বাড়ি ছেড়ে চলে যায়?
“বোনের বাড়িতে এত বেশিদিন থাকতে নেই।
মেহের দোলনায় দুলতে দুলতে বলল। ইফাত মেহেরে’র কথা শুনে নিজের মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে বিড়বিড় করে আওড়াল‚ “তাহলে নিজের শ্বশুর বাড়ি বানিয়ে ফেলো।
মেহের ইফাতে’র সেই অস্পষ্ট কথা পুরোপুরি বুঝতে না পেরে নিজের জোড়া ভ্রু কুঁচকে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল‚ “কিছু বললেন আপনি?
“না না‚ কিছু বলিনি। অনেক রাত হলো আকাশে মেঘও বাড়ছে‚ চলো এবার নিচে নামা যাক।
মেহের ইফাতে’র পায়ে পা মিলিয়ে নিচে নেমে গেলো। আর ইফাত আড় চোখে বারবার মুগ্ধকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
আজ উজানে’র ভার্সিটির প্রথম দিন। তাই আগেই রেডি হয়ে ড্রয়িং রুমে হাজির হয়। তারপর ধীরে ধীরে আরিয়ানে’র পাশে গিয়ে বসলো । সোফার অন্য প্রান্তে বসে আরাম করে সকালের গরম চায়ে চুমুক দিচ্ছেন আরিফুল চৌধুরী ও আকবর চৌধুরী। উজান সোফায় বসে কোনোদিকে না তাকিয়ে একমনে নিজের ফোনের স্ক্রিন স্ক্রল করতে লাগল। ঠিক তখনই আরিফুল চৌধুরী চায়ের কাপটা পিরিচে রেখে‚ ছেলের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত রহস্যময় এক হাসি দিয়ে বলে উঠলেন।
”কী রে বাপ? গত রাতের ঘুম কেমন হলো তোর?
বাবার মুখ থেকে হুট করে এমন অদ্ভুত ও বাঁকা প্রশ্ন শুনে উজান নিজের জোড়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সকাল সকাল বাবা হঠাৎ তাকে ঘুমের ব্যাপারে কেন এমন জেরা করছেন? তার মাথায় ঠিক ঢুকল না। সে নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব নিচু রেখে সংক্ষেপে জবাব দিল।
“কেমন আবার হবে? রোজ যেমন স্বাভাবিক ঘুম হয়‚ গত রাতেও তেমনই হয়েছে।
আরিফুল চৌধুরী এবার সোফায় আরও একটু ঝুঁকে এসে চোখ টিপে বললেন‚ “একদম ঠিকঠাক‚ শান্তিমতো ঘুমটা হয়েছে তো?
বাবার এই মাত্রাতিরিক্ত কৌতুহল আর চপল চাহনি দেখে উজান এবার পুরোপুরি বিরক্ত হলো। সে ফোনটা পকেটে পুরে ফিসফিসিয়ে করলো। “ড্যাড সকাল সকাল দয়া করে আমার সাথে ফাজলামো করো না তো। নিজের জোয়ান ছেলেকে সবার সামনে এমন লজ্জাজনক প্রশ্ন করতে তোমার একটুও বাধল না? ছিঃ।
”আরে এতে আমার লজ্জা করতে যাবে কেন‚ হ্যাঁ?
আরিফুল চৌধুরী বুক ফুলিয়ে মোক্ষম জবাব দিলেন। বাবার এমন ত্যাড়াবেঁড়ি উত্তরের পর উজানে’র অবস্থা এখন একদম বেহাল! মনে মনে ভাবল‚ তার কপালটাই আসলে মন্দ। একদিকে ঘরে আছে তার ফাজিল বউ‚ তো অন্যদিকে নিজের ঘরের ভেতরেই বসে আছে সবচেয়ে বড় শত্রু নিজের জন্মদাতা বাপ। রুমে থাকলে বউ সারাদিন জ্বালিয়ে মারে আর একটু শান্তির জন্য বাইরে বের হলে এই বাবা নামক শত্রু পেছনে লেগে থাকে। উজান’কে চুপ থাকতে দেখে আরিফুল চৌধুরী এবার মুখটা বাঁকিয়ে ভেংচি কেটে বলে উঠলেন‚
“ছিঃ তুই আমার ছেলে ভাবতেও লজ্জা লাগে। বিয়ের দুই সপ্তাহ হয়ে গেলো এখনো দাদা হওয়ার সু খবর দিতে পারলি না শালা৷ লজ্জায় আমার মাথা কাঁটা যাচ্ছে। কেমন ছেলে পয়দা করলাম আমি ছিঃ ছিঃ।
বাবার মুখ থেকে সবার সামনে ‘শালা’ উপাধি শোনা মাত্রই উজান সোফা থেকে একপ্রকার ছিটকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল। সকাল সকাল এই টর্চার সে আর নিতে পারছে না। সে ডাইনিং স্পেসের দিকে তাকিয়ে বাচ্চার মতো চেঁচিয়ে ডাকল।
“আম্মু ও আম্মু! তাড়াতাড়ি এদিকে এসে দেখে যাও তোমার ওই শয়তান জামাই সকাল সকাল আমার সাথে কেমন জঘন্য ব্যবহার করছে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই কিচেন রুম থেকে খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলেন মৌসুমি চৌধুরী। এসেই নিজের স্বামীর দিকে চোখ রাঙিয়ে তীব্র ঝাঁঝালো গলায় বললেন‚ ”তুমি আবার সাতসকালে আমার ছেলেটার পেছনে লেগেছো? ছেলেটার আজ ভার্সিটির প্রথম দিন। নতুন করে ক্লাসে নেবে‚ মনটা ফ্রেশ রাখা দরকার। তোমার বুড়ো বয়সের ফাজলামো আর বিরক্ত করা একটুও বাদ যায় না?
বউয়ের ওই বাঘিনী রূপ দেখে আরিফুল চৌধুরী মুহূর্তের মধ্যে মিইয়ে গেলেন। সে আমতা-আমতা করে বললেন‚ “আরে না মৌসুমি তুমি ভুল বুঝছো। আমি তো জাস্ট ওকে….
”তুমি একদম চুপ করো। আর একটাও বাড়তি কথা যদি আমার ছেলের উদ্দেশ্যে বলেছো‚ তবে আজ তোমার কপালে কোনো ভাত জুটবে না বলে দিলাম।
বউয়ের মুখে ভাত বন্ধের হুমকি শোনা মাত্রই আরিফুল চৌধুরী একদম ভেজা বেড়ালের মতো চুপসে গিয়ে সোফায় সোজা হয়ে বসলেন। বাবার এই করুণ দশা দেখে উজান আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে সোফায় বসে শব্দ করে হেসে উঠল এবং বাবার দিকে তাকিয়ে টিটকারির সুরে বলল‚ “কী হলো ড্যাড? এখন একেবারে চুপ মেরে গেলে কেন? হু এসেছে আমার সাথে লাগতে।
মৌসুমি চৌধুরী তখন উজানে’র পাশে বসে তাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিতে লাগলেন। ঠিক তখনই পাশে বসা আরিয়ান উজানে’র গলার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে হাসতে হঠাৎ অত্যন্ত গম্ভীর ও রসাত্মক সুরে বলে উঠল‚ ”আচ্ছা ভাই তোর গলার ডানপাশে ওটা কিসে কামড় দিয়েছে রে? লাল হয়ে ফুলে আছে যে।
সবার সামনে আরিয়ানে’র এমন মারাত্মক ও বোমা ফাটানো প্রশ্নে উজান মুখের খাবার গিলতে গিয়ে একদম থমকে গেল। সে বিষম খাওয়ার মতো অবস্থা করে সাথে সাথে নিজের এক হাত দিয়ে গলার সেই নির্দিষ্ট অংশটা চেপে ধরল। হ্যাঁ‚ সেখানে স্পষ্ট একটা লালচে কামড়ের দাগ বসে আছে। গত রাতে ঘুমানোর ঘোরে মৌ মহাশয়া উজান’কে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন অবস্থায় হঠাৎ করেই উজানে’র গলাটাকে ‘চিকেন লেগ পিস’ ভেবে সজোরে কামড় বসিয়ে দিয়েছিল। এটা নিয়ে আজ সকালেই ঘুম থেকে ওঠার পর দুজনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া আর যুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। আর সেই রাগে-ক্ষোভে মেজাজ গরম করে নিচে নামতেই এখন সবার সামনে এই নতুন কাণ্ড। উজান নিজের লজ্জাটুকু রাগ দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করে আরিয়ানে’র দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে চরম হুমকি দিলো।
“ভাইয়া বেশি কথা বললে তোমাকে আজ এমন জায়গায় লাথি মারব যে সারাদিন মানুষের সামনে মুখ লুকিয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে‚ মনে রেখো।
আরিয়ানে’র কথার খেই ধরে এবার ছোট চাচা আকবর চৌধুরীও নিজের চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে কৌতূহলী গলায় বললেন‚ “সত্যিই তো আরিয়ান তো ভুল কিছু বলেনি। ওভাবে কিসে দাগ হলো তোর গলায়? মশা তো এত বড় কামড় দেয় না।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬
আরিয়ান হাসতে হাসতে বলে‚ “এখনো বুঝলে না ছোট চাচ্চু? নতুন নতুন বিয়ে করেছে। রুমে একদম ব্র্যান্ড নিউ বউ এসেছে সো গলায় এমন মশা-মাছির কামড়ের দাগ তো একটু-আধটু থাকবেই। অথচ আমাদের সামনে জেন্টলম্যান সেজে এমন ভাব ধরে থাকে‚ যেন কত বড় সাধু পুরুষ।
“ভাইয়াআআআআ
