Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১২

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১২

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১২
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

রিহান আর রিদিতা খুশিতে ফাইলটা লুফে নিয়ে রিত্তিকাকে একটা স্যালুট দিল, তারপর গুড নাইট জানিয়ে ডানা কাটা পাখির মতো ফুরফুরে মেজাজে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রিত্তিকা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবার নিজের বইয়ের দিকে মনোযোগ দিল।
​রাত জেগে ভাই-বোনের প্রজেক্টের কাজ গুছিয়ে দেওয়ার পর নিজের পড়াটা শেষ করতে করতে কখন যে রিত্তিকা টেবিলের ওপরই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল, তা সে নিজেও জানে না। সকালে যখন জানালার ফাঁক গলে আসা তীব্র রোদ ওর চোখে এসে পড়ল, তখন ওর ঘুম ভাঙল। আড়মোড়া ভেঙে, চোখ কচলাতে কচলাতে টেবিল ঘড়িটার দিকে তাকাতেই রিত্তিকার আত্মা খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়!

​”আল্লাহ্! সকাল আটটা বাজে?!” রিত্তিকা লাফ দিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
​নিজের কপালে থাপ্পড় মেরে সে মনে মনে বলতে লাগল, “এত সময় ধরে ঘুমালাম আমি! আজ তো প্রথমে ওই খরগোশ মার্কা স্যারের ফিজিক্স ক্লাস আছে! ক্লাসে ঢুকতে এক মিনিট দেরি হলেই নির্ঘাত পুরো হলের সামনে কথা শোনানো শুরু করে দেবে। অবশ্য, খিটখিটে হলে কী হবে, বেডায় ফিজিক্স পড়ায় কিন্তু বেশ ভালো।” আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই ভেবে রিত্তিকা ঝড়ের গতিতে ওয়াশরুমের দিকে ছুটল। আজ যেকোনো মূল্যে শেষরক্ষা করতেই হবে!

​কোনোমতে রেডি হয়ে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে সিঁড়ি দিয়ে প্রায় উড়তে উড়তে নিচে নামছিল রিত্তিকা। ঠিক তখনই ড্রইংরুমে বসে থাকা দাদু সাদমান ইসলাম গম্ভীর কিন্তু স্নেহমাখা গলায় হেঁকে বললেন, “আস্তে নাম রিত্তি! ওভাবে নামলে পড়ে গিয়ে হাত-পা ভেঙে ব্যথা পাবি তো দাদুভাই!”
​রিত্তিকা সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে জুতো পরতে পরতে বলল, “আজ সব কাজ ধীরে করলে হবে না গো দাদু! অনেক দেরি হয়ে গেছে, আজ প্রফেসরের ক্লাসে লেট হলে আমার কপালে শনি আছে!” দাদুকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সে এক ছুটে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল।

​কোনোমতে হাঁপাতে হাঁপাতে রিত্তিকা যখন ক্লাসরুমে ঢুকল, সৌভাগ্যবশত প্রফেসর জিয়ান কায়সার তখনও বোর্ডে মার্কার দিয়ে গ্রাফ আঁকায় ব্যস্ত ছিলেন। রিত্তিকা নিঃশব্দে গিয়ে নিজের সিটে বসল।
____​ক্লাস শুরু হওয়ার পর থেকে রিত্তিকার মন ফিজিক্সের জটিল সূত্রে যতটা না ছিল, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ছিল প্রফেসরের দিকে। জিয়ান যখন গম্ভীর গলায় লেকচার দিচ্ছিল, রিত্তিকা অপলক দৃষ্টিতে তার তীক্ষ্ণ চোখ, নিখুঁত চোয়াল আর ব্যক্তিত্বের দিকে তাকিয়ে ছিল। জিয়ান অবশ্য ক্লাসের মাঝেই রিত্তিকার এই চাউনিটা খেয়াল করল। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষকের মতো সে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পেরেও মুখে কিছু বলল না, বরং রিত্তিকাকে পুরোপুরি ইগনোর করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ক্লাস নেওয়া শেষ করল।
​ক্লাসের একদম শেষ মুহূর্তে, জিয়ান যখন ডাস্টার দিয়ে বোর্ড মুছছে, ঠিক তখনই ক্লাসরুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন ভার্সিটির স্পোর্টস টিচার। তার হাতে একটা নোটিশ ।
তিনি ক্লাসের সবার উদ্দেশ্যে বললেন, “মনোযোগ দাও সবাই। আগামী সপ্তাহে আমাদের ভার্সিটির একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট আছে প্রতিপক্ষ ভার্সিটির সাথে। আর এবার নিয়ম অনুযায়ী, আমাদের ভার্সিটির পক্ষ থেকে একজন স্টুডেন্ট এবং একজন টিচারকে একসাথে মিক্সড ডাবলসে খেলতে হবে।”

​স্পোর্টস টিচারের কথা শেষ হতে না হতেই রিত্তিকার পাশে বসা তার তিন বান্ধবী—আনুশা, নিহারিকা আর আনিকা ফিসফিস করে রিত্তিকাকে কনুই দিয়ে গুঁতো মারতে লাগল। আনুশা বলল, “দোস্ত, তুই নাম দে না! তুই তো দারুণ খেলিস।” আনিকাও সুর মিলিয়ে বলল, “হ্যাঁ রিত্তি, তুই খেল!”
​রিত্তিকা মাথা নেড়ে ইশারায় বলল, “পাগল নাকি তোরা? আমি এসবের মধ্যে নেই।”
​ঠিক তখনই ডায়াসের পাশ থেকে জিয়া রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, “তুই ব্যাডমিন্টন খেলতে পারিস নাকি রিত্তি?”
সে আমতা আমতা করে বলল, “ওই… পারি টুকটাক আরকি।”
​পাশ থেকে নিহারিকা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে সোজা দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার রিত্তি খেলবে। রিত্তি অসাধারণ খেলে!”

নিহারিকার এই অতি-উৎসাহী কথা শুনে জিয়ানের মুখ মুহূর্তের মধ্যে কঠোর হয়ে উঠল। সে ডেস্কে হাত রেখে ঠান্ডা কিন্তু অত্যন্ত তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “এটা কোনো বাড়ির পাশের খেলার মাঠ না, নিহারিকা! এই টুর্নামেন্টের সাথে আমাদের পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান জুড়ে আছে। তাই এখানে ছেলেখেলা করার কোনো সুযোগ নেই। আর যে খেলবে সে নিজে না বলে, তুমি কেন ওর হয়ে ওকালতি করছ? ও নিজেই তো খেলতে ইচ্ছুক না, কারণ ও জানে টুর্নামেন্টের প্রেশার নেওয়ার ক্ষমতা ওর নেই।”
​জিয়ানের এই তাচ্ছিল্যভরা কথাগুলো রিত্তিকার একদম বুকে গিয়ে লাগল। তার আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত লাগল। ক্লাসের সবার সামনে প্রফেসর তাকে এভাবে খাটো করলেন?!
রিত্তিকা আর চুপ করে থাকতে পারল না। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জিয়ানের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল, “স্যার! আপনি আমার খেলা না দেখে আগে থেকে বলতে পারেন না যে আমি পারি না বা আমার ক্ষমতা নেই। আপনারা তো ট্রায়াল নিচ্ছেন, তাই না? তাহলে ট্রায়ালে দেখুন আমার খেলা কেমন, তারপর বিচার করবেন আমি যোগ্য নাকি অযোগ্য!”

​রিত্তিকার কণ্ঠের এই তেজ দেখে ক্লাসের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। স্পোর্টস টিচার পরিস্থিতি সামাল দিতে হাত তুলে বললেন, “ঠিক আছে, শান্ত হও সবাই। রিত্তিকা যখন চ্যালেঞ্জটা নিয়েছে, তখন আজকেই ওর ট্রায়াল হবে। চলো, আমরা সবাই ইনডোর ব্যাডমিন্টন হলের দিকে যাই। দেখি তুমি কেমন খেলো।”
​তিনি একটু থেমে জিয়ানের দিকে তাকিয়ে যোগ করলেন, “আর হ্যাঁ, আগেই তো বলেছি—ভার্সিটির পক্ষ থেকে স্টুডেন্টের সাথে পার্টনার হিসেবে খেলবেন আমাদের প্রফেসর জিয়ান কায়সার নিজে।”
​স্পোর্টস টিচারের এই শেষ কথাটা শুনে রিত্তিকার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল! সে জিয়ানের দিকে তাকাল। সে স্বপ্নেও ভাবেনি যে, যাকে সে মনে মনে এত পছন্দ করে, আবার যার অহংকারে তার রাগ হয়, সেই জিয়ান কায়সারের সাথেই তাকে জুটি বেঁধে বিরুদ্ধ দলের বিরুদ্ধে খেলতে হবে! মনের ভেতর একটা তীব্র নার্ভাসনেস কাজ করলেও রিত্তিকা নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাল না। সে বুক ফুলিয়ে বলল, “ওকে স্যার। আমি রেডি।”

​কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো ক্লাসসহ স্পোর্টস টিচার ইনডোর ব্যাডমিন্টন হলের গ্যালারিতে গিয়ে বসলেন। রিত্তিকা তখন কোর্টের একপাশে দাঁড়িয়ে রেকেটটা হাতে নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই জিয়ান গম্ভীর পায়ে রিত্তিকার পাশে এসে দাঁড়াল।
​জিয়ান রিত্তিকার দিকে একপলক তাকিয়ে নিচু, অবজ্ঞাসূচক গলায় বলল, “আমার পাশে দাঁড়িয়ে পার্টনার হিসেবে খেলার যোগ্যতা তোমার নেই, মিস রিত্তিকা। ইজ্জত বাঁচানোর একটাই উপায়—খেলার আগেই নিজের হার স্বীকার করে কোর্ট থেকে সরে দাঁড়াও।”
​রিত্তিকা জিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে এবার একটা চতুর এবং আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, “আমার যোগ্যতা আছে কি নেই, মিস্টার জিয়ান… সেটা নাহয় এই ম্যাচটা শেষ হওয়ার পরই বিচার করবেন। তার আগে নয়।”

​ট্রায়াল ম্যাচের জন্য ভার্সিটির প্রাক্তন তুখোড় প্লেয়ার রাফসানকে ডেকে আনা হয়েছে। রাফসান আর রিত্তিকার মধ্যে ম্যাচ শুরু হলো। রেফারি বাঁশি বাজানোর সাথে সাথেই খেলা শুরু হলো।
​ট্রায়াল ম্যাচের জন্য ভার্সিটির প্রাক্তন তুখোড় প্লেয়ার রাফসানকে ডেকে আনা হয়েছে। রাফসান আর রিত্তিকার মধ্যে ম্যাচ শুরু হলো। রেফারি বাঁশি বাজানোর সাথে সাথেই খেলা শুরু হলো।
​প্রথম পাঁচ মিনিট রিত্তিকা সত্যি খুব খারাপ খেলছিল। জিয়ানের সেই কটু কথাগুলো আর নার্ভাসনেসের কারণে সে ঠিকমতো শট নিতে পারছিল না, একের পর এক পয়েন্ট রাফসান পেয়ে যাচ্ছিল। গ্যালারি থেকে একটা গুঞ্জন শোনা গেল। জিয়ান একপাশে দাঁড়িয়ে বাঁকা হেসে ভাবল, “আমি আগেই জানতাম, এই মেয়ে শুধু মুখেই কথা বলতে পারে।”

​কিন্তু ঠিক তার পরের মুহূর্তেই যেন রিত্তিকার ভেতরে কোনো এক অদৃশ্য শক্তি ভর করল! জিয়ানের সেই উপহাসভরা চাউনি মনে পড়তেই তার হাতের র‍্যাকেট যেন তরবারি হয়ে উঠল। রিত্তিকা হঠাৎ এমন ক্ষিপ্র গতিতে খেলতে শুরু করল যে পুরো হলরুম শান্ত হয়ে গেল।
রাফসান একটা ড্রপ শট দিতেই রিত্তিকা বাতাসে লাফিয়ে উঠে এমন একটা পাওয়ারফুল ‘স্ম্যাশ’ মারল যে রাফসান র‍্যাকেট ছোঁয়ানোরও সুযোগ পেল না! এরপর থেকে রিত্তিকার প্রতিটি শট ছিল নিখুঁত, দ্রুত এবং মারাত্মক। রাফসান কোর্টে এদিক-ওদিক দৌড়েও রিত্তিকার শটগুলো ধরতে পারছিল না।
​এই দৃশ্য দেখে জিয়ান পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের অহংকার ম্লান হয়ে সেখানে চরম বিস্ময় ভর করল। সে মনে মনে বলল, “মাই গড! মেয়েটা তো আসলেই চমৎকার খেলে! রাফসানের মতো প্লেয়ারকেও ও যেভাবে কোর্টে নাচাচ্ছে, তা অবিশ্বাস্য!”

​পুরো ৩০ মিনিটের এক শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ের পর রেফারি শেষ বাঁশি বাজালেন। স্কোরবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে রিত্তিকার নাম। রাফসানকে বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছে রিত্তিকা!
মুহূর্তের মধ্যে পুরো ইনডোর হল জুড়ে করতালির রোল উঠল। সবার মুখে তখন একটাই চিৎকার—”রিত্তিকা! রিত্তিকা!” আনুশা, নিহারিকারা,জিয়া,আনিকা খুশিতে কোর্টে নেমে রিত্তিকাকে জড়িয়ে ধরল।
​কিন্তু রিত্তিকার চোখ তখন গ্যালারির করতালির দিকে ছিল না। সে সবার বাঁধভাঙা উল্লাসকে পাশ কাটিয়ে, র‍্যাকেট হাতে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল কোর্টের কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রফেসর জিয়ানের দিকে। জিয়ান তখনও রিত্তিকার খেলার ঘোর থেকে বের হতে পারেনি, সে স্তম্ভিত হয়ে রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে ছিল।
​রিত্তিকা জিয়ানের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তারপর জিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে একটা চোখ মারল।

​তার ঠোঁটে এক চিলতে বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে সে বলল, “কী স্যার? আপনি না বলেছিলেন আপনার পাশে দাঁড়িয়ে খেলার যোগ্যতা আমার নেই? ইশ! এখন তো নিয়ম অনুযায়ী আমার সাথেই আপনাকে ফাইনাল ম্যাচটা খেলতে হবে। ভাবতে পারছেন স্যার? আমি আর আপনি—একই টিমে, পাশাপাশি!”
​জিয়ান কিছু বলতে গেল, কিন্তু রিত্তিকা তাকে কোনো সুযোগ না দিয়ে র‍্যাকেট ঘুরিয়ে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, “কোর্টে কিন্তু ভালো করে খেলবেন প্রফেসর জিয়ান, যাতে মেইন টুর্নামেন্টের ট্রফিটা আমাদের ভার্সিটিই পায়। আপনার পার্টনার হিসেবে আমি কিন্তু কোনো খামতি রাখব না!”

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১১

কথাটা বলেই রিত্তিকা একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে ঘুরে নিজের বান্ধবীদের দিকে চলে গেল, আর জিয়ান কায়সার নিজের জীবনে প্রথমবার কোনো মেয়ের সামনে সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
​মাঝের একটা সপ্তাহ যেন পলকের মধ্যে কেটে গেল। এই সাতটা দিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনডোর…

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here