Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৫

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৫

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৫
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

​জিয়া টেবিলের ওপর থেকে কোনোমতে উঁকি মেরে চোখ দুটো বড় বড় করে বলল, “ভাইয়া তো শেষ! একটা সাধারণ বাঁদর দেখে এভাবে হার্ট অ্যাটাক করল নাকি!”
​কথাটা শুনেই জিহাদ জিয়ার মাথায় এক শক্ত গাট্টা মেরে ফিসফিসিয়ে বললো, “একদম চুপ যা! নাহলে মামুনি তোকে পিটিয়ে সোজা করে দেবে নে। দেখছিস না ঘরের পরিস্থিতি এমনিতেই কেমন গরম হয়ে আছে?”

​জিহাদের ধমক আর হাতের গাট্টা খেয়ে জিয়া আর কথা বাড়াল না। মুখটা বাংলা পাঁচের মতো করে একদম চুপ হয়ে গেল।
​ড্রয়িংরুমের মেঝেতে অচেতন হয়ে পড়ে থাকা জিয়ানকে ধরাধরি করে সবাই তার নিজের শোবার ঘরে নিয়ে গেল। খাটের চারপাশে পুরো পরিবারের মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুখে চিন্তার কালো ছায়া। আর এই পুরো ভিড় থেকে কিছুটা দূরে, ঘরের এক কোণে অপরাধীর মতো গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে রিত্তিকা। তার কোলে তখনও সেই ছোট্ট বানরটা ছটফট করছে। রিত্তিকার বুকটা দুরুদুরু কাঁপছিল—তার একটা ছোট্ট খামখেয়ালির জন্য যে এত বড় অঘটন ঘটে যাবে, সে ভাবতেও পারেনি।বানর টা তখনই সে তাড়িয়ে দিলেই পারতো।

​ঠিক এমন সময় নওশাদ কায়সার সাহেব তাদের পারিবারিক ডাক্তারকে প্রায় ঘরের ভেতর নিয়ে এলেন। ডাক্তারবাবু ঘরে ঢুকেই আর সময় নষ্ট করলেন না। স্টেথোস্কোপ বুক পকেটে গুঁজে তিনি দ্রুত জিয়ানের নাড়ি পরীক্ষা করতে লাগলেন, চোখে টর্চ জ্বেলে দেখলেন। পুরো ঘর তখন পিনপতন নীরবতায় থমথম করছে।
​কিছুক্ষণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর ডাক্তারবাবু কপাল থেকে চশমাটা একটু ওপরে তুলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “ভয়ের কিছু নেই। জিয়ান আসলে একটা ‘মিনি স্ট্রোক’ করেছে। অতিরিক্ত আতঙ্ক বা মানসিক ধাক্কা থেকে এমনটা হতে পারে। তবে খুব বেশি চিন্তা করার কারণ নেই। আমি কিছু ঔষুধ লিখে দিচ্ছি, ঠিকমতো খাওয়ালে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। কিন্তু আমার একটা খটকা লাগছে…”

​ডাক্তারবাবু থামতেই নওশাদ কায়সার উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী খটকা ডাক্তারবাবু?”
​”ও ওষুধ খেলে ঠিক হয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু ও এভাবে পুরোপুরি অজ্ঞান কেন হয়ে গেল? শুধু ভয় পেয়ে তো এতটা হওয়ার কথা নয়। ওর কি আগে থেকেই কোনো মানসিক চাপ ছিল?” ডাক্তারবাবু প্রশ্ন করলেন।
​নওশাদ সাহেব মাথা নেড়ে অসহায়ভাবে বললেন, “তা তো আমরা ঠিক জানি না ডাক্তারবাবু।
​”আচ্ছা, ঠিক আছে। ওনার খেয়াল রাখুন, আমি তাহলে এখন আসি।”
​জিহাদ ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনটা হাত বাড়িয়ে নিল এবং তাঁকে সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

​ডাক্তার চলে যাওয়ার পর রিহানা কায়সার জিয়ানের বিছানার পাশে এসে বসলেন। পরম মমতায় ছেলের কপালে ও মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। মায়ের চোখ দুটো তখন অশ্রুসজল।
​কিছু সময় পার হওয়ার পর, ঘরের গাম্ভীর্য কাটাতে সুফিয়ান কায়সার গম্ভীর গলায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “এখন সবাই ঘর থেকে বের হও। জিয়ানের চারপাশে এত ভিড় জমিয়ে রাখলে ওর অক্সিজেনের অভাব হবে। ও একা একটু শান্তিতে ঘুমাক। ঘুম থেকে উঠলেই ও ঠিক হয়ে যাবে।”
​বাবার কথা অমান্য করার সাহস কারও ছিল না। একে একে সবাই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। শুধু রয়ে গেল রিত্তিকা। জিয়ানের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জিহাদ যাওয়ার সময় একজন বাড়ির গার্ডকে ডেকে রিত্তিকার হাত থেকে সেই বানরটা নিয়ে যেতে বলল। খাঁচাবন্দি বানরটা বিদায় হতেই রিত্তিকার বুকের ওপর থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল, কিন্তু জিয়ানের এই অবস্থার জন্য তার ভেতরের অপরাধবোধটা আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠল।
​সবাই চলে যেতেই পুরো ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রিত্তিকা ধীর, অপরাধী পায়ে বিছানায় শুয়ে থাকা জিয়ানের নিকটে এগিয়ে আসল। জিয়ানের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে তার নিজের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

​সে জিয়ানের বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। খুব নিচু স্বরে, যেন জিয়ান শুনতে পাবে—এমনভাবে বলল, বেডায় বানর দেখে ভয় পাইছে, কিন্তু ওনার জন্য খুব মায়া হচ্ছে, “হয়তো… হয়তো আপনি আমার জন্যই আজ এভাবে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়লেন। ! বিশ্বাস করুন স্যার, আমার কোনো খারাপ ইনটেনশন ছিল না এমনটা করার। বানরটা দেখে খুব মায়া লেগেছিল, তাই একটু আদর করেছিলাম। কিন্তু সেটা যে আপনার জন্য এতটা বিপজ্জনক হবে, আমি জানতাম না…”

​বলতে বলতে রিত্তিকার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। অপরাধবোধ আর এক অদ্ভুত মায়া যেন তাকে গ্রাস করে নিল। আর ঠিক তখনই, নিজের আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রিত্তিকা হঠাৎই এক অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ করে বসল। সে আলতো করে ঝুঁকে পড়ে জিয়ানের তপ্ত ললাটে নিজের ওষ্ঠাধর ছুঁইয়ে দিল—একটি গভীর চুম্বন একে দিয়ে সে দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়াল।
​জিয়ান গভীর অজ্ঞানের সাগরে ডুবে থাকার কারণে এই চুরির মতো দেওয়া চুম্বনের কিছুই টের পেলো না।
​চুম্বনটা দিয়েই রিত্তিকার নিজের হুঁশ ফিরল। সে কী করে ফেলল এটা! লজ্জায়, ভয়ে আর সংকোচে তার কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল। সেদিন রিত্তিকা আর জিয়ার কাছ থেকে নোটস নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করল না। কাউকে কিছু না বলে, একপ্রকার প্রায় দৌড়েই কায়সার বাড়ি থেকে বের হয়ে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

​নিজের ঘরে এসে রিত্তিকা বিছানায় মুখ গুঁজে পড়ে রইল। আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকাতেও তার লজ্জা লাগছিল। সে নিজের মনেই বিড়বিড় করতে লাগল—”ধ্যাত! আমি জানি আমি একটা ভীষণ খারাপ কাজ করে ফেলেছি। কিন্তু হঠাৎ করে আমার কী হলো? কেন আমি নিজেকে সামলাতে পারলাম না? ইশ… নিজের ওপরই নিজের বড্ড লজ্জা লাগছে! স্যার যদি কখনো জানতে পারেন, আমি ওনাকে মুখ দেখাব কী করে?”

​ভাবতে ভাবতেই কখন যে রাত কেটে সকাল হয়ে গেল, রিত্তিকা টেরই পেল না।
​পরদিন সকালে রিত্তিকা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভার্সিটিতে গেল। রুটিন অনুযায়ী আজ প্রথম ক্লাসটাই ছিল প্রফেসর জিয়ানের। রিত্তিকা বুক দুরুদুরু দুলুনিতে ক্লাসরুমে গিয়ে বসল। মনে মনে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব—সে জিয়ানের মুখোমুখি হতেও ভয় পাচ্ছিল, আবার ওনাকে দেখার জন্য মনটাও ছটফট করছিল। কিন্তু ক্লাস শুরুর ঘণ্টা বাজতেই দেখা গেল, জিয়ান এলো না। তার বদলে অন্য একজন ডিপার্টমেন্টাল প্রফেসর ক্লাসে ঢুকলেন।
​জিয়ান না এলেও ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে জিয়া ঠিকই এসে বসেছিল। ক্লাস শেষ হতেই রিত্তিকা ব্যাকুল হয়ে জিয়ার দিকে এগিয়ে গেল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে গলাটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা জিয়া… স্যার কেমন আছে রে আজ?”
​জিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আগের থেকে বেটার। বাট এখনো কিছুটা সিক। দুর্বলতা কাটেনি পুরোপুরি।”

​রিত্তিকা একটা নিস্তব্ধ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “ওও… এজন্যই তাহলে আজ ভার্সিটিতে এলো না।”
​”হুম, আম্মু তো বিছানা থেকেই উঠতে দিচ্ছে না আজ,” জিয়া বই খাতা ব্যাগে ভরতে ভরতে বলল।
​ভার্সিটির বাকি ক্লাসগুলোয় রিত্তিকা আর একদমই মন দিতে পারল না। ক্লাস শেষ হতেই সে অন্য বন্ধুদের আড্ডা এড়িয়ে সোজা বাড়ি চলে এলো। আজ তার চারপাশের কোনো কিছুই ভালো লাগছে না। কেন ভালো লাগছে না, কিসের এই শূন্যতা—তার কারণ সে নিজেও ঠিকঠাক জানে না। এক অজানা অস্থিরতা তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। বাড়িতে এসেই সে দুপুরের খাবার না খেয়েই নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল এবং একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।

​যখন রিত্তিকার ঘুম ভাঙল, তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত ৮টা বেজে গেছে। সারা বাড়ি নিঝুম, শুধু নিচতলা থেকে হালকা কথাবার্তার আওয়াজ ভেসে আসছে। রিত্তিকা চোখ ডলতে ডলতে বিছানা থেকে নামল। মাথাটা ড্রয়িংরুমের সিঁড়ির কাছে আসতেই তার কানে এলো কিছু চেনা-অচেনা মানুষের কণ্ঠস্বর, আর সেখানে খুব গম্ভীরভাবে কারও বিয়ের কথা হচ্ছে!
​বিয়ে শব্দটা শুনতেই রিত্তিকার ভেতরের কৌতূহল চাড়া দিয়ে উঠল। সে ধীর পায়ে নিচে গিয়ে বসল। বসার ঘরে তার মা, বাবা এবং কয়েকজন আত্মীয় বসে বেশ হাসিমুখে আলাপ করছেন।
​রিত্তিকা কৌতুহল আর কিছুটা মজা করার ছলে হেসে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার মা? তোমরা এত রাত করে কার বিয়ের ঘটকালি করছ শুনি? কার বিয়ে হচ্ছে?”

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৪

​তার মা সোফা থেকে উঠে রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললেন, “কার আবার হবে? তোর বিয়ে!”
​মায়ের মুখের এই দুটো শব্দ যেন রিত্তিকার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো শোনাল। তার হাসিমুখটা পলকে জমে বরফ হয়ে গেল।
​সে চোখ দুটো কপালে তুলে চিৎকার করে বলল, “কিহ…!”

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here