Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৭

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৭

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৭
রাত্রি মনি

দরজা খোলার সাথে সাথেই মাত্তেওকে মুখ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জেইনের মাথা যেন দপ করে জ্বলে উঠলো। জেইন তার বিশাল পুরুষালী বুক সামনে এগিয়ে এনে, চোখে তীব্র আগুন নিয়ে গর্জন করে উঠলো,
“হোয়াট দা ফা*ক! কি চাই এখানে? তোকে বলেছি না, আমরা দু’জন যখন রুমে একা থাকবো তখন ডিস্টার্ব করবি না কেউ? আমার কথা তোদের মাথায় ঢোকে না? তুই জানিস না, আমি সকালে জিম করার পর ফ্রেশ হতে সময় নিই? তারপরেও কোন সাহসে দরজায় নক করলি তুই?”

মাত্তেও চোখ-মুখ অন্ধকার করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। জেইন তার ঠিক সামনে বুকে হাত গুজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে শুধু একটা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট, যেটা নামানো নাভির অনেকটা নিচে। আর উন্মুক্ত হয়ে আছে তার শক্তপোক্ত, পুরুষালি বুক। সেই পুরুষালী শরীরের আটটি ভাঁজ স্পষ্ট দৃশ্যমান, যার ওপর চকচক করছে ঘামের বিন্দু বিন্দু রেখা।চুলগুলোও এলোমেলোভাবে পড়ে আছে কপালে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এই রাক্ষসটা কিছুক্ষণ আগেই জিম করে এসেছে—সকালে উঠে প্রথমে জিম করা তার অভ্যেস।
কিন্তু মাত্তেও একটা বিষয় বুঝতে পারছে না—তার ভাই তো জিম করে অনেক আগেই বেরিয়েছে, তাহলে এখনো ফ্রেশ না হয়ে এভাবে আছেন কেন? প্রশ্নটা তার মাথায় থাকলেও করার সাহস হলো না। সে মুখ অন্ধকার করে, গাল ফুলিয়ে, দ্রুত এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললো,

“আমি কি করবো, ইয়াশ ভাই’ই তো আমাকে জোর করে পাঠালেন। বললেন আজকে নাকি আপনাদের মিশন আছে। সবকিছু রেডি। আপনার সাথে কথা আছে, তাই ডেকে পাঠিয়েছেন। আমি অনেক বার বলেছিলাম, ‘ভাই এখনি রুমে ঢুকেছেন। ঘরে ভা-বী… আ…আছেন। ভাই এখন হাজার ডাকলেও আসবেন না।’ কিন্তু কি করবো, উনি তো উনি’ই। জোর করে পাঠালেন আমায়। এখন আপনার কাছেও বকা শুনতে হচ্ছে, পরে আবার উনার কাছেও শুনতে হবে! কিছু না করেও সব দোষ শুধু আমার হয়। আর আপনাদের কাছে বকা খেতে হয়!”
একটানা কথাগুলো বলেই মাত্তেও মুখ নামিয়ে ফেললো, যেন পৃথিবীর সমস্ত ভার তার ঘাড়ে।
জেইন বিরক্তিতে ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো। কতদিন পর বউয়ের একটু কাছে যেতে পেরেছিল, সেটাও সহ্য হলো না এই ছাগলগুলোর। মনে হচ্ছে বউকে নিয়ে আবার দূরে কোথাও যেতে হবে। সে নিজের রাগ সামলানোর চেষ্টা করে কিছুটা শান্ত স্বরে বললো,

“ওকে গিয়ে বল, ভাই এখন বিজি। খুব ইম্পর্ট্যান্ট কাজ করছে। এখন আসতে পারবে না। ভাইয়ের ফ্রেশ হতে সময় লাগবে। আর তাছাড়া আমরা মিশনে বেরোবো রাত্রে। এখন তো মাত্র সকাল। এখনি কিসের এতো প্রয়োজন ওর। আমি ওর সাথে পরে কথা বলবো। ওকে বল কোথাও থেকে একটু ঘুরে আসতে, পারলে সাথে এলেনাকে নিয়ে যেতে বল।”
এরপর জেইন বিরক্তি নিয়ে আপনমনে বিড়বিড় করলো,
“ব্লা*ডি ফা*কার! নিজে তো ঠিক করে রোমান্স করতে পারে না, আমাকেও ডিস্টার্ব করতে চলে আসে। মুডটাই নষ্ট করে দিল!”
তারপর আবার মাত্তেওর দিকে তাকিয়ে দেখলো সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এতে জেইনের মাথায় রক্ত টগবগ করে উঠলো। সে চোখ পাকিয়ে প্রায় ধমকে উঠলো,
“ইডিয়ট! এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা ভাগ এখান থেকে!”
বলেই ধরাম করে দরজাটা এমন জোরে লাগিয়ে দিল যে, সেই তীব্র শব্দে মাত্তেওর শরীর সহ আত্মা যেন কেঁপে উঠলো।
রুমে চোখ বুলিয়ে রিমকে কোথাও দেখতে না পেয়ে জেইনের ভ্রু কুঁচকে গেল। তারপর যখন দেখল বারান্দার দরজা খোলা, তখন বুঝলো রিম বারান্দায় চলে গেছে। সেও আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে বড় বড় পা ফেলে চলে গেল সেখানে।

সকালের মিষ্টি রোদ রিমের মুখে এক অদ্ভুত দ্যুতি ছড়াচ্ছিল। সেই আলোয় ঝলমল করছে তার খিলখিল হাসি। জেইন এক মুহূর্তে যেন এক গভীর ঘোরের মধ্যে চলে গেল। তার সমস্ত রাগ, সমস্ত বিরক্তি যেন নিমেষে উধাও। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে এক দৃষ্টিতে রিমের দিকে তাকিয়ে রইলো। মনে হলো যেন কোনো পবিত্র, মোহময়ী প্রতিমা দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।
কিন্তু হঠাৎই, জেইনের ভ্রু কুঁচকে গেল। রিমের কোলে একটা ছোট্ট কাঠবিড়ালীর ছানা। ছানাটা কেমন সযত্নে তার বউয়ের উষ্ণ শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। জেইনের বুকের ভেতরে যেন এক অদ্ভুত ঈর্ষার আগুন জ্বলে উঠলো।
রিম জেইনকে দেখতে পেয়ে খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে কাছে চলে এলো। কোলে থাকা কাঠবিড়ালীটার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে সে বলতে লাগলো,

“দেখো, কত্তো কিউউট না বাচ্চাটা! আমাদের বারান্দা থেকে পেলাম। হয়তো আটকে গেছে। ওকে বলেছি এখন থেকে যখন ইচ্ছে আমার কাছে আসবে। আমার সাথেই রাখবো ওকে। ইশ… কি কিউট!”
কাঠবিড়ালীটাকে আদর করে কথাটা বলা মাত্রই, রিম ঠোঁট ডুবিয়ে শব্দ করে একটা চুমু খেলো ছানাটার মাথায়।
জেইনের হাত ততক্ষণে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেছে। তার চোখ দুটো হিংস্র পশুর মত হয়ে গেছে যেন লালচে আগুনে জ্বলছে। রাগে সে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। তার বুক যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো। কিন্তু রিমের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। সে তো কাঠবিড়ালীর সাথে খুনসুটি আর খেলায় মগ্ন।
জেইন আর সহ্য করতে না পেরে রিমের হাতটা তীব্রভাবে টেনে ধরলো। সেই ফাঁকে কাঠবিড়ালীটা লাফিয়ে নেমে পড়লো তার কোল থেকে। ফলে কাঠবিড়ালীর নখের সামান্য আঁচড় বসে গেল রিমের হাতে। কিন্তু রিম সেটা টেরই পেল না। সে উল্টো জেইনের ওপর বিরক্ত হলো,

“এটা কী করলে তুমি? বাচ্চাটাতো ভয় পেয়ে চলে গেল! এখন যদি ও আর না আসে? ধুর ব্যাঙ, ভাল্লাগে না! আমি কিছু জানি না, তুমি এখনই ওকে এনে দেবে আমার কাছে।”
রিমের কোনো কথাই যেন জেইনের কানে ঢুকছে না। তার দৃষ্টি তখন স্থির হয়ে আছে রিমের হাতের দিকে—যেখানে কাঠবিড়ালীর নখের আঁচড় লেগেছে।
সে খপ করে রিমের হাতটা ধরে ফেলতেই রিম হাতে তীব্র জ্বলুনি অনুভব করলো। তার মুখ থেকে মৃদু আর্তনাদ বেরিয়ে এলো,
“আহহ্! জ্বলছে।”
আর্তনাদে রিমের চোখজোড়া ভিজে উঠলো। জেইন তখনো রিমের আঁচড় লাগা হাতটা খপ করে ধরে আছে। তার চোখ দুটো যেন হিংস্র পশুর মতো জ্বলছে। এই মুহূর্তে কাঠবিড়ালী নয়, যেন অন্য কোনো পুরুষ তার ফায়ারফ্লাইয়ের শরীরে চিহ্ন এঁকে দিয়েছে!

রিমের সেই জ্বলুনি মেশানো আর্তনাদ যেন জেইনের হিংসাকে আরও উন্মত্ত করে তুলল। সে রিমের হাতটা নিজের মুখের কাছে টেনে নিলো। কোনো কিছু না ভেবে, সেই সামান্য আঁচড়ের ওপরই সে তার শক্ত দাঁত বসিয়ে দিলো—রিম কেঁপে উঠে যন্ত্রণায় গোঙিয়ে উঠলো। চোখে জল চিকচিক করছে।
জেইন তার জিভ দিয়ে সেই কামড়ের স্থানটা চাটতে লাগলো। তার দৃষ্টি তখন রিমের ভীত, উন্মুক্ত চোখের দিকে স্থির। তার কণ্ঠস্বর তখন অন্ধকার, শীতল এবং চরম অধিকারবোধে মেশানো,
“কার সাধ্য আছে আমার জিনিসে হাত দেওয়ার?এমনকি একটা ছোট্ট প্রাণীও নয়। কোনো চিহ্ন, একফোঁটা সামান্য আঁচড়ও থাকতে দেবো না তোমার শরীরে! এই সুন্দর শরীরে, কেবল আমারই চিহ্ন থাকবে। কেবল আমার!”
সে রিমের হাত ছেড়ে দিলো। তার কামড়ানো স্থানটা রক্তিম হয়ে ফুলে উঠেছে। জেইনের কন্ঠ শীতল বরফের মতো,
“আমার ছোঁয়ার বাইরের কোনো স্পর্শ তোমার জন্য কতটা যন্ত্রণার হতে পারে, বুঝতে পারলে তো!”
রিম তখনো যন্ত্রণায় কাঁপছে, আর তার চোখে জেইনের সেই হিংস্র রূপ দেখে আতঙ্ক ঘনিয়ে এসেছে। সে শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠলে, জেইনের যেন মুহূর্তেই হুঁশ ফিরে আসে। তার চোখে-মুখে সেই উন্মত্ততা সরে গিয়ে এক ধরণের অস্থিরতা ফুটে উঠে—যেন সে নিজেই তার আগের আচরণে চমকে গেছে। সে রিমের হাতটা নিয়ে অস্থির ভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলো। তার কন্ঠে এক অস্বাভাবিক আহ্লাদের সাথে অস্থিরতা মেশানো,

“খুব বেশি জ্বলছে, সোনা? দাঁড়াও, আমি এক্ষুনি ঠিক করে দিচ্ছি।”
রিম তখনো অভিমানে মুখ ফুলিয়ে রেখেছে। হাতের সামান্য জ্বলুনির চেয়ে, জেইনের আচরণের এই হঠাৎ পরিবর্তন যেন তাকে আরও বেশি কষ্ট দিচ্ছিল।
জেইন উন্মাদের মতো, দ্রুতগতিতে, রিমের হাতের আহত অংশের ওপর এলোপাথাড়ি ঠোঁট ছোঁয়াতে লাগলো। তার চুম্বন ছিল ত্রস্ত, যেন সে সময় নষ্ট করতে নারাজ। চুমু দিতে দিতে সে ভিজিয়ে ফেললো রিমের হাত। হাতের জ্বলুনি আর জেইনের এই পাগলামি মাখানো আদর—এই দুইয়ের ধাক্কায় রিম বারবার শিউরে উঠছিল।
হঠাৎই, রিম সর্বশক্তি দিয়ে জেইনকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দিল। জেইন ব্যালেন্স হারিয়ে দেয়ালের সাথে মিশে গেল।
রিম কান্না মেশানো কন্ঠে কাঁপতে কাঁপতে বললো,

“ছুঁবে না আমায়।”
জেইন তার কথা শুনে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইলো। তারপর সামান্য ক্রুর হেসে রিমকে অবাক করে দিয়ে আচমকাই এক ঝটকায় কোলে তুলে নিলো। রিম ঘাবড়ে গিয়ে দুই হাতে শক্ত করে জেইনের গলা আঁকড়ে ধরলো। জেইন রিমের ডান চোখের পাতায় আলতো করে একটি চুম্বন এঁকে দিয়ে ফিসফিস করে বললো,
“কোথায় ছুঁবো না? এখানে?”
তারপর অপর চোখের পাতায় একটি নরম চুমু, আরও গভীর কণ্ঠে বললো,
“এখানে?”
এরপর তার ফোলা ফোলা, লাল গাল দুটোয় ঠাস ঠাস করে তীব্র চুম্বন দিল,
“এখানে?”
তারপর নাকের ডগায় একটি দুষ্টু চুম্বন,
“এখানে?”
সর্বশেষে, সে রিমের ঠোঁটে ঝুঁকে শব্দ করে একটা গাঢ় চুম্বন দিয়ে তার নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে দিল, তারপর চরম কামুক স্বরে বললো,

“নাকি… এখানে?”
লজ্জায় রিমের গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠলো। তার সমস্ত অভিমান যেন নিমিষেই উধাও হয়ে গেল। জেইন তাকে যত বেশি কষ্ট দেয়, তার চেয়েও যেন হাজার গুণ বেশি আদরে আদরে ভরিয়ে দেয়।
জেইন তার লাল হয়ে ওঠা নাকে আলতোভাবে নিজের নাকটা ঘষে নিলো—সেই মিষ্টি স্পর্শে রিম সঙ্গে সঙ্গে লাজুক ভঙ্গিতে তার শক্ত বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল।
জেইনের ঠোঁটে এক হালকা বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার নজর আবার রিমের সেই সামান্য আহত হাতের দিকে পড়তেই, তার অস্থিরতা ফিরে এলো। সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে, দ্রুত পায়ে রিমকে কোলে নিয়েই রুমে নিয়ে গিয়ে বিছানায় আলতোভাবে বসিয়ে দিলো।
এরপর সে যেন সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ড্রয়ার হাতড়ে পাগলের মতো এলোমেলোভাবে কিছু একটা খুঁজতে লাগলো। রিম শুধু চুপচাপ বিস্ময় ও কিছুটা আতঙ্ক নিয়ে তার কার্যকলাপ দেখতে থাকলো।
অবশেষে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা হাতে পেয়ে জেইনের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠলো। সে রিমের হাতটা নিয়ে খুব যত্নে তুলো দিয়ে ক্লিন করে নিলো। তারপর ধীরে ধীরে ফুঁ দিতে দিতে মলম লাগিয়ে দিল। ঠান্ডা মলম আর জেইনের সেই গভীর স্পর্শে রিম বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছিল। কাঠবিড়ালীর দেয়া এই সামান্য আঁচড়ের জন্য জেইনের এই অস্থিরতা দেখে রিম বুঝতে পারল, তার এই পাগলামি আর অধিকারবোধ স্বাভাবিক নয়। শ্বাস আটকে, কাঁপা কন্ঠে সে ফিসফিস করে বলল,

“এসব, কী করছো তুমি?”
জেইন রিমের চোখে চোখ রাখলো। তার চোখ তখনো গভীর কামুক দৃষ্টিতে জ্বলছে—নেশার লাল আভা তাতে মিশে আছে। সেই দৃষ্টি রিমের শরীরে এক অদ্ভুত, বিদ্যুৎবাহী শিহরণ ছড়িয়ে দিল। তার হৃদপিণ্ড যেন পাঁজরের খাঁচায় প্রচণ্ড জোরে আছড়ে পড়ছে।
জেইন তার দিকে ঝুঁকে এলো, প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক একটা প্রহর। রিমের বুকের অনিয়মিত ওঠানামা দেখেই জেইন তার দিকে আরও ঘনিষ্ঠ হলো। রিম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিছানার দিকে সামান্য হেলে পড়লো, পিঠের নিচে চাদর খামচে ধরলো শক্ত করে। তাদের দূরত্ব তখন কেবলই নিঃশ্বাসের উত্তাপের!
রিমের নিঃশ্বাস যেন পুরোপুরি থেমে গেল। সে চোখ বুজে, যেন কোনো তীব্র যন্ত্রণার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে—কিন্তু এই যন্ত্রণা মিষ্টি।
জেইন এবার এক ধাক্কায় রিমকে নরম বিছানায় ফেলে দিলো। রিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই, জেইন তার উপরে উঠে পড়লো, দুই হাতে রিমের দুপাশ ধরে ঝুঁকে রইলো। সে রিমের গালে হাত রেখে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে তার তুলতুলে ঠোঁটে স্লাইড করলো, তারপর নিজের ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিল। তার চোখে তখন তীব্র, নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়া নেশা।

খুব ধীরে, জেইন তার ঠোঁট দুটো রিমের ওষ্ঠদ্বয়ের উপর স্থাপন করলো। প্রথমে আলতো স্পর্শ—তারপর সে রিমের নরম ঠোঁট দুটো গভীরভাবে আঁকড়ে ধরলো। ধীরে ধীরে সেই মধু যেন নিজের ভেতরে টেনে নিতে লাগলো, প্রতিটি চুম্বনে যেন রিমের জীবনীশক্তি শুষে নিচ্ছে। সে তার জিভ দিয়ে মুখের চারপাশে ধীরে ধীরে লেহন করতে লাগলো, যেন প্রতিটি বিন্দু তার কাছে অমূল্য।
চুম্বনের এই গভীরতায় রিম শিরশির করে কেঁপে উঠলো। অবচেতনভাবেই সে জেইনকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো, এক হাতে তার পিঠ, অন্য হাতে তার চুল টেনে ধরছে। জেইন রিমের মুখে তার জিভ ঢুকিয়ে দিতেই, রিম যেন এক অজানা কামুক ঘোরের মাঝে চলে গেল। সেও তাকে শক্ত করে ধরে, শ্বাসরুদ্ধকর গতিতে জেইনের জিভ ধীরে ধীরে শুষে নিতে লাগলো।

রিমের এই অপ্রত্যাশিত, ছোট্ট কিন্তু তীব্র প্রতিক্রিয়া জেইনকে যেন আরও বেপরোয়া, আরও উন্মত্ত করে তুলল। তার হাত মুহূর্তের মধ্যে এলোমেলোভাবে ছুঁয়ে গেল রিমের শরীরের স্পর্শকাতর, নরম স্থানগুলো, যেন সে তার মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে। তাদের দু’জনের নিঃশ্বাস তখন মিশে গেছে, রুমের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
চুম্বন যখন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছিল, জেইন ধীরে ধীরে রিমের সিল্কের নাইট ড্রেসের ওপরের কোটির ফিতা টেনে খুলে ফেলল। ভেতরে আরও একটা আবরণ! তার চোখে তখন সামান্য বিরক্তি—যেন এই আলগা পোশাকগুলো তাদের মাঝে অবাঞ্ছিত বাধা সৃষ্টি করছে। কোটির নিচে পাতলা ড্রেসটা, যার চিকন ফিতে রিমের ফর্সা ঘাড়ে জানালার ফাঁক গলে আসা রোদের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। গলা বড় হওয়ায় বুকের বেশ খানিকটাই উন্মুক্ত হয়ে আছে, জেইনের দৃষ্টি সেখানেই স্থির। সে আর বিলম্ব না করে, ঘাড় থেকে ধীরে টেনে নামিয়ে দিল নাইট ড্রেসের সেই চিকন ফিতেটা।

রিম তখনো শ্বাস আটকে বিছানায় স্থির হয়ে পড়ে রইলো। জেইন এরপর এক টানে তার নাইট ড্রেস সম্পূর্ণ খুলে, তাকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিল। রিম লজ্জায় চোখ বুজে ঘন ঘন কম্পিত নিঃশ্বাস ফেলছিল। তার মুখমণ্ডল তীব্র রক্তিম, আর প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে তার ন*গ্ন ব*ক্ষ ধীর লয়ে ওঠানামা করছিল।
জেইন যেন এক গভীর, অন্ধকার নেশায় সম্পূর্ণরূপে ডুবে গেছে। সে রিমের বুকে মুখ ডুবিয়ে উন্মত্তের মতো চুমু খেতে লাগলো। কখনও গভীর চুম্বন, কখনও বা জিভ দিয়ে লেহন করে রিমের শরীরকে অস্থির করে তুলছে। রিমের শরীর বারবার শিউরে উঠছিল, জেইনের অবাধ্য হাতের ছোঁয়ায় তার শরীর বারবার সাপের মতো পেঁচিয়ে যাচ্ছিল, নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিল। ছোট্ট মেয়েলী শরীরটা সেই গভীর স্পর্শে সারা দিতে শুরু করলো।
জেইন এবার ধীরে ধীরে, ইঞ্চি ইঞ্চি করে চুমু দিয়ে নিচের দিকে নামতে লাগলো। তার ঠোঁটের উষ্ণ পথ ধরে রিমের শরীরে যেন নতুন এক আগুনের স্রোত বইছিল। সে উষ্ণ নাভিতে মুখ ডুবিয়ে একবার দীর্ঘ লেহন করলো, তারপর সেই স্থানে এক গভীর চুম্বন এঁকে দিল। রিম তখন যন্ত্রণাবিহীন এক কামুক উত্তেজনায় কাঁপতে শুরু করলো। এতে করে জেইনের মনোযোগ বিঘ্ন হলো। সে রিমের কোমর দু’হাতে শক্ত করে চেপে ধরলো, স্থির রাখার জন্য।
জেইন যখন আরও নিচে, নিজের লক্ষ্যের দিকে নামতে যাবে—ঠিক তখনই তার ভ্রু জোড়া মুহূর্তে তীব্রভাবে কুঁচকে গেল। তার চোখ তখন অনুসন্ধিৎসু, যেন সে কোনো ত্রুটি খুঁজছে। রিমের কোমরের কাছটা সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো।

তারপর সে সরে গিয়ে রিমের পায়ের কাছে নামলো, তার বাঁ পা-টা উল্টে-পাল্টে দেখতে লাগলো। ন*গ্ন শরীরে জেইনের এমন তীব্র অধিকারবোধ এবং অস্বাভাবিক মনোযোগ দেখে রিম লজ্জায় যেন আরও রক্তিম হয়ে গেল।তার গলা দিয়ে কোনো স্বরই বের হচ্ছিল না। সে শুধু শ্বাস আটকে বিছানার চাদর খামচে পড়ে রইলো। হঠাৎ জেইন তাকে অবাক করে দিয়ে উঠে গেল বিছানা থেকে।
রিম হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। পরমুহূর্তেই নিজের দিকে নজর পড়তেই, তীব্র লজ্জায় সে তড়িঘড়ি করে নিজের ন*গ্ন শরীরটা কম্ফোর্টার দিয়ে ঢেকে দিল। জেইন তার সামনে নিয়ে এলো একটা XL সাইজের টিশার্ট আর ট্রাউজার।
জেইন কম্ফোর্টার টেনে ধরতেই, রিম অসহায় চোখে তার দিকে তাকাল। কিন্তু জেইন সেই দৃষ্টির কোনো পরোয়া না করেই, তার শরীর ঢেকে থাকা কম্ফোর্টার সরিয়ে, রিমকে আলতো করে কোলে বসিয়ে নিলো। তার সেই গভীর, নেশাভরা দৃষ্টি তখনো রিমের ওপর স্থির, কিন্তু আচরণে এক বিস্ময়কর যত্নশীলতা। রিম লজ্জায় মুখ নামিয়ে মূর্তির মতো বসে রইল। তার শরীর যেন পুরোপুরি বরফের মতো জমে গেছে। জেইন ধীরে ধীরে, খুব যত্নে, তাকে পরিয়ে দিল সেই টিশার্ট এবং ট্রাউজার।

ড্রয়িং রুমের সোফায় রিমকে কোলে নিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে বসে আছে জেইন। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মাত্তেও, ইয়াশ আর সেদিনের সেই বেচারা ডাক্তার।
ডাক্তারকে এতদিন বেইজমেন্টের সেই অন্ধকার কক্ষেই আটকে রাখা হয়েছিল; শুধু রিমের চিকিৎসার সময় তাকে বের করা হতো। ভয়ে এখনো থরথর করে কাঁপছে বেচারা। তার দোষ কী, সেটাই বুঝতে পারছে না। সে তো জেইনের কথা মতো খুব সতর্কভাবেই রিমের চিকিৎসা করছে। তারপরেও এই মেন্টালটা এভাবে ক্ষেপে আছে কেন? সেটাই মাথায় ঢুকছে না।
তার কপাল বেয়ে আতঙ্কে ঘাম ঝরছে। সে অনুভব করছে, হয়তো একটু পর সে নিজেই জ্ঞান হারাবে। কিন্তু তবুও সে নিজেকে শান্ত করে রেখেছে। কারণ, যদি সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, তাহলে হয়তো সেই সুযোগে এই মেন্টালটা তাকে সারাজীবনের মতো অজ্ঞান করে দিবে।
অন্যদিকে, সবার সামনে এভাবে কোলে নিয়ে বসে থাকায়, লজ্জা আর অস্বস্তিতে রিম নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে রেখেছে জেইনের বাহুতে। তার রাঙা মুখ লুকিয়ে রেখেছে জেইনের উষ্ণ, শক্তপোক্ত বুকে। জেইনের হৃদস্পন্দন সে স্পষ্ট অনুভব করছে।

জেইন রিমকে ছোট্ট বিড়াল ছানার মতো আরও গভীরভাবে মিশিয়ে নিলো নিজের বুকের সাথে। পিঠে আলতোভাবে আদুরে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। তাদের এই ঘনিষ্ঠতা যেন রুমের মধ্যে উপস্থিত অন্যদের থেকে তাদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।
ইয়াশ তখন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। তার কাছে জেইনের এসব একটু বেশিই বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে। মনে মনে সে চরম বিরক্ত: ‘কেন, পৃথিবীতে কি আর কারোর বউ নেই? এমন ভাব করছে যেন এই হচ্ছাড়ারার একারই বউ আছে! এতো আদিখ্যেতা না করে, পারলে বুকের মধ্যেই ঢুকিয়ে রাখ না! এভাবে দেখিয়ে দেখিয়ে অন্যের বুকের জ্বালা কেন বাড়াচ্ছিস? আজিব!’
সকলের চাপা অস্বস্তি এবং ভাবনার মাঝেই ড্রয়িং রুমের নীরবতা ভেঙে দিল জেইনের ধারালো, তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বর। তার চোখে তখন তীব্র ক্রোধের আগুন,

“তোকে কী বলেছিলাম আমি? ওর গায়ে যেন একটাও ক্ষতচিহ্ন না থাকে! তাহলে ওর শরীরে এখনো পিরানহার দাঁতের চিহ্ন কেন রয়েছে? এতোদিন কী চিকিৎসা করেছিস তুই ওর!”
ডাক্তার অবাক না হয়ে পারল না, তার চোয়াল রীতিমতো ঝুলে গেল। মনে মনে ভাবলো, ‘এতো গভীর ক্ষত এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে সেরে উঠবে? একটু তো সময় দিতে হবে!’ মনে মনে জেইনকে আচ্ছা করে গালি দিলেও, মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস হলো না।
তখন আবারো জেইন দাঁতে দাঁত চেপে উঠে উঠলো, তার কণ্ঠস্বরে একধনের শীতলতা বহন করছিল,

“হেই বা*স্টার্ড! কথা বলছিস না কেন? অ্যান্সার মি, ড্যামন ইট! ওর গায়ে আমি কোনো চিহ্ন দেখতে চাই না! ওর শরীরে যদি কোনো মার্ক থাকে, তাহলে সেটা শুধুমাত্র আমার দেওয়া আদরের স্পর্শে তৈরি হবে, আন্ডারস্ট্যুড!”
উপস্থিত সবার মুখেই কাশি উঠে গেল এমন লাগাম ছাড়া কথায়। আর রিম?… সে তো লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতেই পারছে না। মনে মনে আচ্ছা করে বেশ কয়েকটা গালি দিল সে—’অসভ্য বজ্জাত লোক একটা। একটুও লজ্জা-শরম নেই!’ কিন্তু রিমের তো আছে! এভাবে সবার সামনে কী দরকার ছিল এসব বলার? এখন কি কাউকে মুখ দেখাতে পারবে সে? দুঃখে-কষ্টে তার কান্না পাচ্ছে। লজ্জায় সে জেইনের বাহুতে আরও শক্ত করে মুখ গুঁজে দিলো।
আর এদিকে ডাক্তার একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করে নিলেন। মনে সাহস সঞ্চার করে তিনি বেশ গুছিয়ে দ্রুত বলে ফেললেন,

“স্যার, এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে ক্ষতচিহ্ন সেরে যাবে? ওষুধকে তো তার কাজ করতে একটু সময় দিতে হবে, তাই না? এই ক্ষতগুলো তো সাধারণ নয়। তবে আপনি চিন্তা করবেন না, আমরা সবচেয়ে পাওয়ারফুল ক্রিম আর ইনজেকশন ব্যবহার করছি। আপনি জাস্ট সাতটা দিন সময় দিন, দেখবেন কোনো দাগ বা চিহ্ন কিছুই থাকবে না। আমাদের কাছে এমন কেস আছে—জাপানে এক মেয়ের শরীর থেকে কুকুর মাংস তুলে নিয়েছিল, তার দাগ দূর করা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু আমাদের এই জেনেটিক্যালি তৈরি ক্রিম আর ইনজেকশন ব্যবহারের পর মেয়েটি পুরোপুরি আগের মতো হয়ে গেছে। দেখলে বোঝার উপায় নেই কোনো ক্ষত ছিল। আপনার মিসেসের চিহ্নগুলোও মুছে যাবে, কিন্তু তার জন্য আপনাকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে, স্যার।”

এতক্ষণে জেইনের ভেতরে জমে থাকা রাগ এবার যেন আগুন জ্বলন্ত লাভার মতো ফুঁসলে উঠলো। তার চোখ দুটো যেন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। সে হিংস্র হয়ে উঠলো, শিরাগুলো কপালে ফুলে উঠলো। ডাক্তারকে লক্ষ্য করে সে দাঁতে দাঁত পিষে, হিংস্র পশুর মতো গর্জন করে উঠলো,
“*শুয়ো*রের বাচ্চা!!! তোর জিভ অনেক বেশি বড় হয়ে গেছে। মুখটা, খুব বেশি চলে। শুনে রাখ, আমি মুখের মিথ্যা আশ্বাসে নয়— রেজাল্ট চাই! ওর শরীরে আমি কোনো চিহ্ন দেখতে চাই না, মানে চাই না! এক্ষুণি! এক্ষুণি ঠিক করে দিবি তুই ওকে!”

জেইন এমন হিংস্রভাবে তাকিয়ে আছে যেন পারলে এক্ষুণি এই ডাক্তারের কলিজাটা বের করে কাঁচা চিবিয়ে খেত। কিন্তু রিম কোলে থাকায়, সেই ক্রোধকে সে শুধু চোখেই সীমাবদ্ধ রাখল। জেইনের এমন হিংস্র, ভয়াবহ রূপ দেখে রিম ভয়ে পুরোপুরি গুটিয়ে গেল, আরও গভীরভাবে মিশে রইলো তার বুকে। রিমকে এভাবে ভয় পেতে দেখে জেইন নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করলো। নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে, ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো। যেন নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু তার শরীরের উত্তেজনা তখনো স্পষ্ট।
ডাক্তার তখনো কাঁপছে। সে শুকনো গলায় ফ্যাসফ্যাস করে বললো,
“এটা কিভাবে সম্ভব! এমন কোনো ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক এখনো পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি, যেটা একদিনের মধ্যেই ক্ষতচিহ্ন সারিয়ে তুলতে পারে, স্যার!”
জেইন এক মুহূর্তও কথাটি কানে না নিয়ে, ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠলো,
“আবিষ্কার না হলে, আবিষ্কার করবি—অ্যানি হাউ! সেটা সম্পূর্ণ তোর বিষয়। আমি শুধু ওকে আগের মতো পারফেক্ট দেখতে চাই।”

ডাক্তার ভয়ে নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে প্রায় আর্তনাদ করে উঠলো,
“ইটস্ ইমপসিবল! আমি তো ডক্টর! কোনো সাইন্টিস্ট না!”
জেইন হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সোফায় একটা প্রচণ্ড ঘুষি ছুড়ে দিল। সেই ধমকে ভয়ে কেঁপে উঠলো রিম। জেইন ষাঁড়ের মতো ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে নিতে দাঁতে দাঁত চেপে, হিমশীতল কণ্ঠে আদেশ করলো,
“মাত্তেও… এটাকে নিয়ে ট্রেজানের খাঁচায় ছেড়ে দিয়ে আয়। অনেকদিন মানুষের মাংস খায়নি আমার বেবিটা। আজকে ভুরিভোজ করবে।”
মাত্তেও সাথে সাথে বাধ্য ছেলের মতো টানটান হয়ে বললো,
“জি ভাই! এক্ষুনি নিয়ে যাচ্ছি।”
বলেই ডাক্তারকে ধরে টানাহেঁচড়া করতে শুরু করলো। বেচারার আত্মায় তখন পানি শুকিয়ে গেছে।
এদিকে রিমকে এভাবে কাঁপতে দেখে জেইনের হিংস্রতা নিমেষে কোমলতায় রূপান্তরিত হলো। সে রিমের মুখটা দু’হাতে ধরে, কপালে একটা আদুরে চুমু দিলো। গালে আলতো হাত রেখে ফিসফিস করে বললো,
“ভয় পেয়েছো, সোনা?”

রিম ধীরে মাথা নাড়িয়ে না বোঝাল। জেইন তার কপালে আবার একটা চুমু দিয়ে আরও নিবিড়ভাবে বুকের সাথে মিশিয়ে রাখলো।
মাত্তেও, ডাক্তার আর জেইনের এই নাটক দেখে ফোঁস করে বিরক্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো ইয়াশ। মনে হচ্ছে যেন কোনো সার্কাসের শো দেখছে সে।
“হোয়াট ইজ দিস, এজে? এসব কী নাটক শুরু করেছিস তুই?”
তারপর মাত্তেয়োর দিকে তাকিয়ে কঠোর গলায় বলল,
“মাত্তেও, ছাড় ওকে। তোরা দু’জনে এখান থেকে বিদেয় হ!”
মাত্তেও মুখ ফুলিয়ে প্রতিবাদ করলো,
“আমি কী করলাম ভাই? ভাই’ই তো আমাকে বললো… আপনি কিছু হলে শুধু আমাকেই বকাবকি করেন। যত দোষ মাত্তেও ঘোষ! যাচ্ছি আমি। আর ডাকলেও আসবো না।”
মাত্তেও মুখ অন্ধকার করে চলে গেল। ইয়াশ নিজের কোটটা ঠিক করে জেইনের সামনে সোফায় বসে পড়লো। তার চোখে বিরক্তি,

“কী সব চাইল্ডিশ খেলা শুরু করেছিস তুই? একটু তো প্র্যাক্টিক্যালি আর লজিক্যালি চিন্তা করতে পারিস।”
“প্র্যাক্টিক্যালি আমি শুধু বউকে আদর করতে পারি। ফা*কিং চিন্তা ভাবনা করার সময় আমার নেই।”
ইয়াশ কপালে হাত দিয়ে চোখ বুঝে বিরক্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো।এ ছেলেকে বোঝানো মানে নিজের মাথা নষ্ট করা। সে ধৈর্য ধরে বললো
“ভুলে গেছিস, আজকে আমাদের মিশনে যাওয়ার প্ল্যান ছিল।”
“ইয়া আই রিমেমবার দ্যাট।”
“তাহলে কখন যাবি? সব তো রেডি।”
“কিছুক্ষণ পরেই। কিন্তু এখন একটু বউয়ের সাথে সময় কাটাতে চাই। মিশন কমপ্লিট করে আসতে আসতে কাল সকাল। ততক্ষণে আমার আদর না পেয়ে বউটা তো শুকিয়ে যাবে! তাই বউকে ১২ ঘন্টার সব আদর একসাথে দিয়ে যেতে চাই। তুই এখন যা, আই নিড সাম প্রাইভেসি।”
জেইন মিশনে যাবে এই কথাটা কানে পৌঁছানো মাত্রই রিমের মন খারাপ হয়ে গেল মুহূর্তে। তার বুকটা ধক করে উঠলো, যেন হৃৎপিণ্ড খাঁচা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। জেইনকে ছাড়া একা কিভাবে থাকবে সে? এই শরীরের পরিচিত, উষ্ণ ঘ্রাণ না পেলে তার তো প্রতিটি মুহূর্ত ভারী বোঝা মনে হবে, দিন’ই কাটতে চায় না। তার চোখ ছলছল করে উঠলো।
সে জেইনের গলা সর্বশক্তি দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো, তার গ্রীবাতে মুখ গুঁজে দিলো—যেন এক মুহূর্তের জন্যও তাকে যেতে দেবে না। আদুরে বাচ্চার মতো, কম্পিত, আকুতিভরা কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বললো,

“কোথায় যাবে তুমি? আমি তোমাকে ছাড়া একা থাকতে পারবো না। আমার তোমাকে ছাড়া থাকতে একদম, একদম ভালো লাগে না। আজকে না গেলে হয় না? প্লিইইজ। তুমি যা চাইবে, আমি তাই করবো। তোমার সব কথা শুনব—আর একটুও অবাধ্য হবো না। শুধু আমাকে ছেড়ে যেও না। আমার তোমাকে ছাড়া থাকতে কষ্ট হয় তো।”
জেইন রিমের পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে, তার কপালে এক দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল। তার কণ্ঠস্বর তখন গভীর, আদরে মাখা,
“যেতে হবেই সোনা। আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো। সাথে তোমার জন্য অনেক সুন্দর একটা সারপ্রাইজ নিয়ে আসবো। একটা দিন একটু কষ্ট করে থাকো। ফিরে এসে অনেক গুলো আদর করবো তোমায়। প্রমিস।”
রিম মুখ ফুলিয়ে জেইনকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরলো। তার চোখ থেকে এক ফোঁটা উষ্ণ জল গড়িয়ে পড়লো জেইনের কাধের শার্টে।

ইয়াশ বিস্ময়ে হা হয়ে তাকিয়ে আছে। যেন এক কেজি মশা অনায়েসেই ঢুকে যাবে মুখের ভেতর। মাথায় কিছুই ঢুকছে না তার-এই অসম্ভবপ্রায় ব্যাপারটা কিভাবে সম্ভব হলো? হাউ? যেই মেয়েটা এই ছেলেটাকে দু’চোখে সহ্যই করতে পারতো না, সে এখন তাকে এভাবে লেপটে ধরেছে। আবার, একদিন একটু বাইরে যাবে শুনে এভাবে চোখের জল ফেলছে! ইজ ইট ট্রু? নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সে।
জেইন রিমের চোখের জল দু’হাত দিয়ে পরম যত্নে মুছিয়ে দিল। এক হাত রিমের পিছন দিক দিয়ে টি-শার্টের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল,অন্য হাতে কোমরের উষ্ণতা অনুভব করলো। ইয়াশের দিকে চোখ পড়তেই জেইনের মাথায় রক্ত উঠে গেল। ইয়াশ তখনো হা করে তাদের দিকে তাকিয়ে। জেইন দাঁতে দাঁত চেপে, চাপা ক্ষোভে ফিসফিস করে বললো,
“হা করে তাকিয়ে আছিস কী ইডিয়ট? দেখছিস না আমার বউ কাঁদছে? বউকে শান্ত্বনা দিবো এখন। প্রাইভেসি চাই আমার। আমি এক গোনার আগেই এখান থেকে কেটে পড়বি তুই। গট ইট?”

ইয়াশ আর এক মুহূর্ত দেরি না করে, চুপচাপ উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেল। তার বিস্ময় ভাব তখনও কাটেনি।
জেইন এবার রিমের টি-শার্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে এলোমেলোভাবে তার শরীরে বুলাতে লাগলো। জেইনের সেই ঠান্ডা হাতের স্পর্শে রিম ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে উঠলো। জেইন রিমের নাকে নাক ঘষে, অত্যন্ত আদুরে কণ্ঠে বললো,
“এভাবে কাঁদছো কেন? আমি কি একেবারের জন্য চলে যাচ্ছি? আবার তো তোমার কাছেই ফিরে আসবো। এই আমিটা তো সম্পূর্ণ তোমারই। আমাকে ছেড়ে থাকতে তোমার যতটা না কষ্ট হচ্ছে, তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি জ্বলছে এই বুকে। কাঁদে না সোনা। কি লাগবে বলো? যা লাগবে তাই দিবো। আদর চাই?”
“উমহ্..”
রিম চোখ বড় বড় করে শুষ্ক ঢোক গিললো—তার শরীর তখনো কাঁপছে। জেইন শয়তানি হেসে রিমের নিচের দিকে হাত নিয়ে তার ট্রাউজারের ফিতে ধরে টান দিলো। রিম আতঙ্কে শ্বাস আটকে জেইনের গলা শক্ত করে খামচে ধরলো।

জেইন আর কোনো কথা না বলে, তার ঠোঁট দুটো আঁকড়ে ধরে, তীব্রভাবে ডুবে গেল তার মাঝে। রিমের চোখে জল গড়িয়ে পড়লো। সে ধীরে ধীরে, কম্পিত স্বরে শ্বাস ফেলতে লাগলো।জেইন তার ঠোঁট দুটো আঁকড়ে ধরেই, আলতোভাবে শুইয়ে দিল সোফার মাঝে। নিজেও ঝুঁকে গেল তার উপর, সমস্ত ভার যেন রিমের শরীরের উপর। টিশার্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে সে রিমের বুকের নরম অংশে আলতো বুলিয়ে ধীরে ধীরে চাপ প্রয়োগ করতে লাগলো।রিম ছটফট করতে লাগলো। কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বললো,
“ক… কী করছো? এটা ড্রয়িং রুম! কেউ যদি চলে আসে?”
জেইন তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে, গভীর কামুক স্বরে বললো,
“কেউ আসবে না। তুমি শুধু সব ভুলে আমাকে ফিল করো।”
জেইনের হাতের চাপ বাড়তে থাকলে রিম মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো,
“আহহ্… ছাড়ো, আমি পারছি না।”
জেইন তার ঠোঁট কামড়ে নেশাক্ত চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো,

“কেন? তুমিই তো বললে আমাকে ছাড়া থাকতে তোমার কষ্ট হবে। তাইতো বেশি করে আদর করে দিচ্ছি, যেন তোমার একটুও কষ্ট না হয়।”
“তাই বলে এখানে, এভাবে?”
রিম অসহায় ভাবে বললো।
“রুমে গিয়ে সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই এখন।”
আর কোনো কথা না বলে, জেইন তার ঠোঁট দুটোকে আবার আঁকড়ে ধরে, তাদের শেষ মুহূর্তটুকু চরম তীব্রতায় নিয়ে যাবে, ঠিক তখনই!
“ভাইইইইইইইইইইইইই….আআআআআআ……”
এক হাতে চোখ বন্ধ করে, জোরে শ্বাস নিয়ে তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলো মাত্তেও,
“দেখিনি দেখিনি, কিচ্ছু দেখিনি আমি।”

ড্রয়িং রুমে জেইনকে কিছু বলতে হেঁটে আসছিল মাত্তেও। তখনই তাদের দু’জনকে এভাবে ঘনিষ্ঠভাবে দেখে তার চক্ষু চড়কগাছ! ভাই ডাকতে গিয়ে বিস্ময়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠে সে। এদিকে রিম নিজের লজ্জা লুকাতে জেইনের নিচে লুকিয়ে রেখেছে মুখ। লজ্জায় তার কান্না পাচ্ছে।
বারবার এমন অপ্রত্যাশিত বাঁধা পাওয়াতে, জেইন ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে, দাঁতে দাঁত চেপে, চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
“ইডিয়ট! এখানে কী করছিস তুই? জানিস না কারো রুমে ঢুকতে গেলে নক করে ঢুকতে হয়?”
মাত্তেও এক ভ্রু উঁচিয়ে আড় চোখে তাকিয়ে বললো,
“কিন্তু ভাই, এটা তো ড্রয়িং রুম!”
জেইন চোখ লাল করে বললো

“ড্রয়িং রুম হোক আর ওয়াশ রুম! এখন থেকে সব জায়গায় নক করে ঢুকবি তুই। বুঝেছিস?”
মাত্তেও আড় চোখেই তাকিয়ে রইলো। তাদের কথোপকথনের মাঝেই রিম ফ্যাসফ্যাস করে কেঁদে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতে সে নাক টানছে।জেইন দ্রুত তার ঠোঁটে চুমু দিয়ে বললো
“কী হয়েছে সোনা? কাঁদছো কেন?”
রিম আরও জোরে শব্দ করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো,
“এ্য্য্য্য্য্য্য্য্য্য্য্য্য্য্য…”
মাত্তেও তাড়াহুড়ো করে, অস্থিরতায় বলে উঠলো,
“আরে.. ভাবি, কাঁদবেন না। আমি কিছু দেখিনি, বিশ্বাস করুন! শুধু একটু…….
রিম আরও তীব্রভাবে কেঁদে উঠলো,
“এএএ্য্য্য্য্য্য্য্য…”
জেইন চরম বিরক্তিতে মাত্তেওকে বলে উঠলো,
“ইডিয়ট! দিলি তো আমার বউটাকে কাঁদিয়ে! এমনিতেই আমি চলে যাবো দেখে কষ্ট পাচ্ছে সোনা বাবুটা, তার ওপর তুই! তোর ব্যবস্থা তো আমি করছি।”
মাত্তেও দ্রুত বলে উঠলো,

“কোনো ব্যবস্থা করতে হবে না ভাই। আপনি ভাবিকে শান্ত্বনা দিন, আমি যাচ্ছি।”
তারপর যাওয়ার আগে আবার উঁকি দিয়ে, বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বললো,
“ভাবি, আপনি কষ্ট পাবেন না। আমি কিন্তু সত্যিই কিছু দেখিনি…”
তারপর উল্টো ঘুরে, যেতে যেতে ছাড়া গলায় গান গেয়ে উঠলো,
“Sochta hoon ke who kitne
Masoom the…(2)
Kya se kya ho Gaye
dekhte… dekhte~~~🎶
মাত্তেও চলে যেতেই জেইন রিমের মুখটা ধরে আলতো করে তুলে ধরলো।
“সোনা, এবার কি আমরা কন্টিনিউ করতে পারি?”
রিম অভিমানী স্বরে, নাক টেনে বললো,
“নাহ্, ছাড়ো আমাকে।”
জেইন তার গালে চুমু দিয়ে, আদরে ভরিয়ে দিয়ে বললো,
“আরে এতো রাগ করে কেন? আদর করবো তো। রাগ করে না লক্ষ্মীটি।”

“বাহ্ তোমাকে তো আগের থেকেও অনেক বেশি সুন্দর লাগছে! তোমার ত্বকে একটা অন্যরকম দ্যুতি, চোখে এক গভীর উজ্জ্বলতা…এর রহস্য কি বলোতো?”
ড্রয়িং রুমে সোফায় বসেছিল এলেনা আর রিম। এলেনা রিমের গাল ছুঁয়ে, কণ্ঠে মোলায়েম আন্তরিকতা এনে বলে উঠলো কথাটা। রিম লজ্জায় মুখ নামিয়ে ফেললো।তার গাল তখনো সামান্য রক্তিম।
ঠিক তখনই জেইন আর ইয়াশ একসাথে, নিখুঁত স্যুট-বুটে তৈরি হয়ে সেখানে এলো। জেইন আড় চোখে বারবার রিমকে দেখছে। কিন্তু রিম একবারও তার দিকে মুখ তুলে তাকাচ্ছে না, হয়তো এখনো সেই অভিমানটুকু ধরে রেখেছে। জেইন রিমের দিকে দৃষ্টি রেখেই এলেনাকে বলে উঠলো
“চলো, আমাদের আর দেরি করা চলবে না। বের হতে হবে।”
এলেনা উঠে দাঁড়ালো। মাত্তেও মেইন ডোরের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। জেইন সামনে এগিয়ে কোনও পূর্বাভাস না দিয়ে, আচমকাই মাত্তেওকে শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলো—এক গভীর, ভাইসুলভ বন্ধন। মাত্তেও প্রথমে অবাক হলেও, ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো, তার মুখে তখন এক গভীর প্রশান্তির হাসি। জেইন তাকে জড়িয়ে হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে, গুরুগম্ভীর স্বরে বললো,

“যা বলেছিলাম, মনে আছে তো? ভাবির খেয়াল রাখিস। ওকে দেখে রাখার গুরুদায়িত্বটা তোকেই দিলাম আমি। আই ট্রাস্ট ইউ, ব্রাদার।”
মাত্তেওর চোখে তখন গভীর আস্থা আর দায়িত্ববোধ।
“আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন ভাই। ভাবিকে আমি আগলে রাখবো।”
জেইন তাকে ধীরে ধীরে ছেড়ে দিয়ে, ঘাড় ছুঁয়ে বললো,
“আমার তোর প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে। আর হ্যাঁ, নিজেরও খেয়াল রাখবি কিন্তু। শুধু ভাবিকে দেখে রাখলেই হবে না।”
মাত্তেওর মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠলো,
“জি ভাই।”

তারা সকলে একসাথে, সুশৃঙ্খলভাবে গাড়িতে উঠে পড়লো। এলেনা, ইয়াশ, মার্কো, লুকা—সাথে তাদের বিশাল ফোর্স—সবাই যার যার মতো গাড়িতে আসন নিয়েছে। কিন্তু জেইন এখনো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কারোর অব্যক্ত অপেক্ষায়। সময় যখন অতিবাহিত হতে লাগলো, জেইন এক হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গাড়িতে উঠতে নিলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে! রিম যেন সমস্ত দ্বিধা ভেঙে ছুটে এসে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকে। জেইনের পিঠে মুখ গুঁজে দিয়ে সে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগলো। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেছে তার—সেই শব্দ জেইনের কানে যেন এক তীব্র আঘাত হানলো।জেইনের বুকটা ধক করে উঠলো মুহূর্তেই। সে রিমের হাত দুটো ছাড়িয়ে, এক হেঁচকা টানে তাকে নিজের সামনে এনে দাঁড় করালো। জেইন আঁতকে উঠলো—কাঁদতে কাঁদতে রিমের চোখ-মুখ রক্তিম লাল হয়ে গেছে, চোখে জল চিকচিক করছে। জেইন অস্থির হয়ে রিমের সেই উষ্ণ চোখের জল মুছিয়ে দিল।শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলো তাকে। রিমের মাথার চুলে এক গাঢ়, ভেজা চুম্বন এঁকে দিয়ে আদুরে কন্ঠে বললো

“এভাবে কাঁদছো কেন সোনা? আমি তো আবার ফিরে আসবোই। শুধুমাত্র একটা রাতেরই তো ব্যাপার!”
রিম ফোঁপাতে ফোঁপাতে জেইনের পিঠের স্যুট আরও শক্ত করে দু’হাতে খামচে ধরলো। যেন ছাড়বে না কিছুতেই।
“না, না, না, যেও না প্লিজ। তোমাকে ছাড়া খুব কষ্ট হবে। আহ্… হহাআআ….”
জেইন তার মুখটা দু’হাতে ধরে আলতোভাবে তুললো। তার চোখে চোখ রেখে বলল,
“ইশ! পাগলি , এভাবে বাচ্চাদের মতো কাঁদে নাকি? প্লিজ, কেঁদো না। তোমাকে এভাবে কাঁদতে দেখলে আমার কষ্ট হয় তো। তুমি এভাবে কাঁদলে কাজে গিয়ে কিভাবে কনসেন্ট্রেট করবো আমি? আচ্ছা শোনো আর কাঁদে না। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ শেষ করে তোমার কাছে ফিরে আসবো। কাজে গেলেও আমার আত্মাটা যে তোমার কাছেই পড়ে থাকবে, আমার লক্ষ্মী সোনা বাবুটা।”
জেইন আলতো করে রিমের মুখটা দু’হাতে উঁচু করে ধরে, নাকের ডগায় একটা আদুরে চুমু দিল। রিম হেঁচকি দিতে দিতে, ছলছল চোখে জিজ্ঞাসা করলো,

“সত্যিই তাড়াতাড়ি আসবে তো?”
জেইন তার কোমল গাল ছুঁয়ে বললো,
“হ্যাঁ, সত্যিইই। কিন্তু তোমাকে প্রমিস করতে হবে। একদম নিজের অযত্ন করবে না তুমি। নিজের খেয়াল রাখবে, আমার জন্য। ঠিক আছে?”
রিম আলতো মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝাল। জেইন হালকা হেসে আবারো তাকে বুকে জড়িয়ে নিলো। মাথায় একটা দীর্ঘ, গভীর চুম্বন এঁকে দিয়ে বললো
“আসছি আমি। মনে থাকে যেন, আমার জন্য নিজের যত্ন নিবে তুমি। নয়তো আমি কিন্তু ফিরে এসে তোমার সাথে খুব রাগ করবো। কথা দাও, নিজেকে সুরক্ষিত রাখবে।”
রিম তার বুকে মুখ গুঁজে, ক্ষীণ কণ্ঠে উত্তর দিল,
“রাখবো….”
জেইন এক ঝলক হেসে, বুকে আরও চেপে ধরলো,
“এইতো গুড গার্ল। আমার লক্ষ্মী সোনা।”

গাড়িতে ইয়াশের পাশে বসে আছে জেইন। বাইরে রাতের অন্ধকার, তার মুখ টানটান—কিন্তু ভেতরে একধরনের অস্থিরতা। রিমের কান্না মিশ্রিত অসহায় মুখটা বারবার ভেসে উঠছে তার সামনে। ইচ্ছে করছে আবার ছুটে গিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু গন্তব্য তাকে বেঁধে রেখেছে।
অন্যদিকে ইয়াশ গভীর চিন্তায় মগ্ন। গাড়িতে থাকা অবস্থায় রিম আর জেইনের সেই আবেগঘন মুহূর্তটা সে গভীরভাবে পরখ করেছে। কিন্তু একটা কথা তার মাথাতে কিছুতেই ঢুকছে না। এটা সম্ভব হলো কিভাবে? সে আর থাকতে না পেরে জেইনকে ক্ষীণ, নিচু স্বরে ডেকে উঠলো,

“ডিউড…”
“উমম্…” জেইন অন্যমনস্ক ভাবেই উত্তর দিল।
ইয়াশের কণ্ঠে বিস্ময় ও কৌতূহল,
“ডিউড, how the hell is this possible! যেই মেয়ে আগে তোর ছায়া পর্যন্ত সহ্য করতে পারতো না, সে এখন তোকে ছাড়তেই চাইছে না। একবারে ফেভিকলের মতো চিপকে আছে! কি ট্রিকস অ্যাপ্লাই করেছিস? আমাকে একটু শিখিয়ে দে না। আমিও একটু অ্যাপ্লাই করতাম।”
সেই মুহূর্তে জেইনের মুখে এক হালকা বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো— ঠোঁট কামড়ে সে ইয়াশের কাঁধের ওপর লম্বা হাত রেখে, রহস্যময় ভঙ্গিতে বললো
“Nothing much. শুধু একটু আপ অ্যান্ড ডাউন, আর মাঝে এক্সট্রা প্রেশার। তবে, এই খেলার টিপস সবাই বোঝে না। এর জন্য একটা বিশেষ ট্যালেন্ট লাগে, ডিউড।”
“মানে…” ইয়াশ তার কথার কোনো গভীর মানে খুঁজে না পেয়ে, মুখ কুঁচকে রইলো।
তাদের গাড়ি তখন রাতের আঁধারে গতি বাড়িয়ে হারিয়ে গেল নিজ গন্তব্যের দিকে।

রাত তখন গভীর, কালো নিশীথ। বাইরে ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। জানালার ধূসর, ভারি পর্দাগুলো বাইরের শীতল হাওয়ায় মাঝে মাঝে সাপের মতো ফণা তুলে দুলছে। কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত, অবসন্ন রিম সবেমাত্র ঘুমের গভীরে তলিয়ে গেছে। তার বালিশের ঠিক পাশেই, চাঁদের সামান্য আলোয় রুপোলী আভা ছড়াচ্ছে একটি ছোট্ট, মারাত্মক রিভলবার—জেন যাওয়ার সময় যা তার হাতে সঁপে দিয়েছিল।
হঠাৎ, ঘুমের মাঝেই তার ত্বক অনুভব করলো বরফের মতো ঠাণ্ডা বাতাসের এক তীক্ষ্ণ, অস্বাভাবিক স্পর্শ। রিম কপাল কুঁচকে, গায়ের ওপরে থাকা কম্বলটা চেপে ধরলো। কিন্তু না, স্পর্শটা বাতাসে নয়—এটা তার পায়ের কাছে, ত্বকের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে। যেন কেউ বা কিছু আলতো করে তার পায়ের আঙ্গুলগুলো ছুঁয়ে দিচ্ছে, তারপর আরও উপরে উঠে আসছে।
ভিতরের আতঙ্কটা যখন পাক খেয়ে উঠলো, রিম ধরফর করে চোখ খুললো। তার দৃষ্টি তখনো ঝাপসা, ঘুমের ঘোর পুরোপুরি কাটেনি। সেই ঝাপসা দৃষ্টিতেই সে দেখলো—তার ঠিক পায়ের কাছে, বিছানায় বসে আছে একটি কালো হুডিতে ঢাকা ছায়ামূর্তি। লোকটির মুখ অন্ধকারে ঢাকা, শুধু তার চিবুক আর ঠোঁটের একটি অংশ দেখা যাচ্ছে, যা চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে।
আতঙ্কে রিমের গলা শুকিয়ে কাঠ। ফিসফিস করে, কান্নার ফলে ভেঙে যাওয়া অস্পষ্ট স্বরে সে বলল,

“তু… তুমি এসেছো?…”
ছায়ামূর্তিটি ধীরে ধীরে মাথা তুললো। তার কণ্ঠস্বর, একটি গভীর, হিমশীতল হাস্কি ভয়েস, শব্দগুলো যেন সরাসরি কবরের নিস্তব্ধতা ফুঁড়ে উঠে এলো,
“ইয়েস বেবিগার্ল। আমি এসেছি। শুধু তোমার জন্য।”
রিম এক ঝটকায় পিছু হটে বিছানায় উঠে বসলো, কম্বলটা বুকে আঁকড়ে ধরলো শক্ত করে। এই কন্ঠস্বর সে আগে কখনো শোনেনি। তার শরীর ঠাণ্ডা, অনিয়ন্ত্রিত কম্পনে কাঁপছে। ফিসফিস করে, প্রায় কেঁদে ফেলে সে বলল,
“ত…ত…তুমি কে? কিসের জন্য এসেছো?”
ছায়ামূর্তির দিক থেকে এলো এক লোলুপ, ধীর হাসি। লোকটি যেন এই আতঙ্কে উপভোগ করছে,
“I am your crazy lover. Crazy only for you.”
রিম আতঙ্কিত হয়ে চারদিকে তাকালো, পালানোর রাস্তা খুঁজছে।
“তুমি এখানে কিভাবে এলে? চলে যাও প্লিজ! নইলে…”
“চ্য’ তুমি আমাকে চলে যেতে বলছো! কত রাত জেগে, কত দেয়াল টপকে, কত শত বার তোমার স্বপ্ন দেখে আমি এইখানে এসেছি, শুধু তোমার জন্য। আর তুমি কিনা আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছো? দ্যাটস নট স্যুড বি হ্যাপেন্ড ইউ নো। এটা একদম উচিত হচ্ছে না, জানো?”
রিম নিজেকে ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে মুড়িয়ে, শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠলো,
“আমার কাছে কি চাই তোমার?”

আগন্তুক এবার একটু ঝুঁকে এলো, তার কণ্ঠস্বর যেন আরো বেশি অন্ধকার।
“আমার শুধু তোমাকে চাই… মাই লিটেল অ্যাঞ্জেল। এই অন্ধকার ঘরে, আজ এই রাতে, তোমাকে শুধু আমার জন্য।”
মুহূর্তের মধ্যে, রিম তার আতঙ্ককে একপাশে সরিয়ে, বিদ্যুৎগতিতে বালিশের পাশ থেকে রিভলবারটা তুলে নিলো। তার হাত কাঁপছে, কিন্তু চোখ দুটো এখন তীক্ষ্ণ, পাথরের মতো স্থির। সে দাঁতে দাঁত পিষে, খাঁটি ইস্পাতের মতো শীতল গলায় বলল
“ভালোয় ভালোয় এখান থেকে বেরিয়ে যা বলছি। কাছে আসার চেষ্টা করবি না এক চুল। নইলে আমার হাতেই আজ বেঘোরে প্রাণটা যাবে তোর।”
আগন্তুক ঠোঁট কামড়ে, বাঁকা, নিষ্ঠুর এক হাসি দিলো। তার চোখে যেন এক হিংস্র উন্মাদনা। সে ধীরে ধীরে, সামনে এগিয়ে আসতে লাগলো। বুক পকেটে হাত রেখে সে বললো,
“উপস! এই জন্যই তো…..! তোমার মধ্যে না একটা আলাদা ব্যাপার আছে, বুঝলে? তাই তো এতো এতো মেয়ে রেখে শুধু তোমার জন্যই আমার এই পাগলামি, এই বুকের কম্পন। এই উত্তেজনা… সব শুধু তোমার জন্য।”
লোকটি এখন রিমের একেবারে কাছে। রিভলবারের নল তার বুকের দিকে তাক করা। রিমের নিঃশ্বাসের শব্দ বাড়লো, বুক কাঁপছে অজানা, অন্ধকার এক বিভীষিকায়। কিন্তু সে নিজেকে শক্ত করে, বিষাক্ত ফিসফিসানির মতো বলল,

“আর এক পা এগোবি না, বলছি! আমি কিন্তু গুলি চালিয়ে দেব! শেষ করে দেব তোকে!”
আগন্তুক শেষ হাসিটা হাসলো। এক লাফে সে সামনে এলো। বিদ্যুৎ-গতিতে রিমের হাত থেকে বন্দুকটা ছিনিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো দূরে। পরমুহূর্তেই সে রিমকে জাপটে ধরে, তাকে বিছানায় ফেলে দিলো। রিমের উপর চেপে বসলো লোকটির ভারি দেহটা।
সে রিমের ঘাড়ে মুখ গুজে দিলো। তার সেই ঠান্ডা, হাস্কি ভয়েসটা রিমের কানের কাছে এক বিভীষিকাময় উষ্ণতা নিয়ে ফিসফিস করলো,
“আহহহ্… দিস স্মেইল! This mixture of fear and fragrance… will surpass all the addictions in the world. এখন তুমি শুধু আমার, বেবিগার্ল… শুধু আমার!”

রিম তখনো আগন্তুকের প্রচণ্ড বাহুবন্ধনে শ্বাসরুদ্ধ। তার সারা শরীর কাঁপছে, কিন্তু মনের গভীরে জন্ম নিচ্ছে এক উন্মত্ত বাঁচার তাগিদ। এই মুহূর্তে দুর্বলতা দেখালে মৃত্যু নিশ্চিত।
আগন্তুক যখন তার ঘাড়ের গভীরে মুখ গুজেছিল, ঠিক সেই সুযোগে, রিম তার কালো চুলের ক্লিপটা খুব সতর্কভাবে, সামান্যতম শব্দ না করে, খুলে ফেলল। পরমুহূর্তেই, কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই, ক্লিপের তীক্ষ্ণ অংশটা সে ঢুকিয়ে দিল আগন্তুকের বাঁ-চোখের কোণে।
শিকারের আকস্মিক আক্রমণে আগন্তুক এক হিংস্র আর্তনাদ করে উঠলো। যন্ত্রণায় রিমকে ছেড়ে দিয়ে সে তার রক্তাক্ত চোখে দু’হাত চেপে ধরে, ছটফট করতে লাগলো। উষ্ণ, টকটকে গাঢ় রক্ত ঝরছে তার হাতের ফাঁক দিয়ে।
সেই এক মুহূর্তের সুযোগ—রিম বিদ্যুতের বেগে বিছানা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। দৌড়াতে দৌড়াতে সে তার পাশে থাকা টেবিলের উপর রাখা লাল এমার্জেন্সি বাটনটি সজোরে টিপে দিল।
ক্র্যাশ! ডিং-ডিং-ডিং!

আচমকা বাজনাটা যেন নিস্তব্ধ করিডোরের বুক চিরে দিলো। রিম দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেল। বাটন প্রেসের শব্দ শুনে ছুটে আসতে গিয়ে, মাত্তেও করিডোরে কিছুর সাথে ধড়াম করে ধাক্কা লেগে মেঝেতে পড়ে গেল। মাথা তুলে সামনে তাকিয়েই তার চোখ বিস্ফারিত হলো—রিমের শয়নকক্ষের দরজা খোলা, আর তার চোখের সামনে বিধ্বস্ত, ত্রস্ত অবস্থায় পড়ে আছে রিম।
আতঙ্ক, বিভ্রান্তি আর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়লো মাত্তেওর চোখে-মুখে,
“ভাবী! আপনার এ কী অবস্থা! কী হয়েছে আপনার? রক্ত কেন?”
রিম দু’হাতে মুখ ঢেকে শব্দ করে কেঁদে উঠলো, তার কান্নায় ছিল তীব্র হিস্টিরিয়া,
“এখান থেকে পালাতে হবে মাত্তেও! ও… ওহ্, ঐ লোকটা! ঐ ছেলেটা যেকোনো সময় চলে আসবে। ওহ্ খুব, খুব ভয়ংকর, খুব ভয়ংকর! আ… আমার ভয় লাগছে মাত্তেও, ভীষণ ভয় লাগছে! এ… এখান থেকে চলো…”
মাত্তেও দ্রুত উঠে দাঁড়ালো।

“আপনি কার কথা বলছেন ভাবী? কোন ছেলে? কী হয়েছে স্পষ্ট করে বলুন!”
“জানি না! আমি কিচ্ছু জানি না! হহাআআ…”
অসহায় কান্নার বাঁধ ভেঙে পড়লো রিমের। তার মনে হচ্ছিল যেন অশুভ এক ছায়া আজ সবকিছু গ্রাস করবে। এই জন্যই সে জেইনকে আজ রাতে ছাড়তে চায়নি।
“ভাবী, আপনি একটু শান্ত হোন। চিন্তা করবেন না। এই ম্যানশন ভেদ করে কেউ আপনার ক্ষতি করতে পারবে না। আমি এখুনি সমস্ত গার্ডদের অ্যালার্ট করে দিয়েছি। ওরা এক্ষুনি এসে পড়বে। আপনি আমার সাথে চলুন, সিকিউর রুমে!”

মাত্তেও ধীরে ধীরে রিমকে নিজের সাহায্যে ধরে টেনে তুলল। তারা এক পা সামনে বাড়াতে যাবে—ঠিক সেই মুহূর্তে!
করিডোরের মোড় থেকে ভেসে এলো পায়ের ভারি, ঠান্ডা পদশব্দ। মাত্তেও আর রিম থমকে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে সেই আগন্তুক। বাম চোখ থেকে গাঢ় রক্তের ধারা গাল বেয়ে নেমে এসেছে। সেই রক্তে তার কালো হুডি ভিজে গেছে। তার মুখে ফুটে উঠেছে এক অস্বাভাবিক, বীভৎস শয়তানি হাসি—যা দেখে রিমের শরীর কেঁপে উঠলো। মৃত্যুভয় যেন তার শিরায় শিরায় প্রবেশ করলো।
রিম ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগলো। আগন্তুক এক পা, দু’পা করে এগিয়ে আসছে। রিমের মনে হচ্ছে তার হৃৎপিণ্ড যেন খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসবে। পেছাতে পেছাতে রিম করিডোরের শেষ মাথায়, দেয়ালের সাথে মিশে গেল।
আগন্তুক এক শীতল, হিংস্র হাসিতে ঠোঁট বাঁকিয়ে, রিমের খুব কাছে চলে এলো।
মাত্তেও এই সুযোগে পিছন থেকে আঘাত করতে এলে, আগন্তুক বিদ্যুতের মতো গতিতে এক হাত বাড়িয়ে তার গলা চেপে ধরলো। চোখের পলকে মাত্তেও শূন্যে ঝুলতে লাগলো! ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলো সে। তার পা দুটো শূন্যে ঝুলে আছে।

ততক্ষণে তাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে সমস্ত গার্ডের দল। মাত্তেও তাদের দিকে আক্রমণ করার জন্য চোখ ইশারা করলো। কিন্তু কেউ নড়ছে না। যেন স্থির কোনো যন্ত্রমানব! মাত্তেও অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল, তার গলা থেকে সামান্যতম শব্দও বেরোচ্ছে না।
এদিকে রিম পালানোর শেষ চেষ্টা করতে গেলে, আগন্তুক মাত্তেওকে শূন্যে তুলে রেলিংয়ের ওপর আছড়ে ফেলে দিলো। ধড়ম!
আঘাতের শব্দে করিডোর কেঁপে উঠলো। রেলিংয়ে আঘাত লেগে মাত্তেওর মাথা থেকে উষ্ণ, তরতাজা গাঢ় রক্ত স্রোতের মতো ঝরে পড়তে লাগলো। নিজের চারপাশে সবকিছু ঝাপসা, ঘূর্ণায়মান দেখছে সে। সে মাথায় হাত রেখে ধীরে ধীরে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে উঠে বসলো। মাথা চক্কর দিচ্ছে। উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই।
আগন্তুক রিমকে দেয়ালে দু’হাতে ভর দিয়ে পুরোপুরি বন্দী করে ফেলেছে। রিমের বুক দুরু দুরু কাঁপছে, সে যেন দেয়ালে মিশে যেতে চাইছে।
যন্ত্রনায় কাতর মাত্তেও গলা দিয়ে কোনোমতে শব্দ বের করলো,

“সোল্ডার্স! তোমরা দাঁড়িয়ে আমার মুখ দেখছো কী? ম্যামকে বাঁচাও! এটা তোমাদের ডিউটি! Attack.!”
কিন্তু একজন গার্ডও সামনে এগিয়ে এলো না। সামনে থেকে ভেসে আসলো আগন্তুকের রক্ত হিম করা শীতল, কর্তৃত্বপূর্ণ ধ্বনি,
“এই ডাস্টবিন’টাকে এখান থেকে নিয়ে যা! আর দেখবি আমাকে যেন কোনোভাবে ডিস্টার্ব করতে না পারে। বাইরে থেকে কেউ এলে আমাকে সাথে সাথে এলার্ট করবি।”
গার্ডদের মুখ থেকে এবার সেই যান্ত্রিক উত্তর,
“ওকে বস।”
মাত্তেও তার শেষ শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠলো,
“এই! তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো! ছাড়ো আমাকে! ওর কথা কেন শুনছো তোমরা? ও তোমাদের বস নয়! তোমাদের বস এজে! হি ইজ দা লর্ড!”
আগন্তুক এবার রিমের কানের কাছে হেসে উঠলো। সেই হাসি যেন শয়তানের বিজয়োল্লাস,
“নো নো নো… আজকের জন্য ওদের বস আমি। ওদের সবাইকে টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছি। তোমার প্রিয় লর্ডের অনেক চেয়েও বেশি দামে।”

মাত্তেও’র চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়লো ভয়াবহ বিশ্বাসঘাতকতার ছাপ।
“হোয়াট! এত বড় বেইমানি! এজে যদি জানতে পারে… কাউকে ছাড়বে না! এজে আস’লে রক্তের বন্যা বইয়ে দেবে এখানে! তোরা নিজেরাও জানিস না, নিজেদের জন্য কত বড় বিপদ ডেকে আনলি! তোদের সব কটাকে ছিঁড়ে কবর দেবে এখানে! কাউকে ছাড়বে না! কাউকে না!”
এজে নামটা যেন আগন্তুকের মাথায় তীক্ষ্ণ ভাবে আঘাত করলো, চোখ দুটো হিংস্র ভাবে জ্বলে উঠলো,সে ঘৃণাভরে গর্জে উঠলো,
“ফা*ক! নিয়ে যা ওকে! এজে এজে এজে… শরীরটা জ্বালিয়ে দিল আমার!”
গার্ডগুলো টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগলো মাত্তেওকে। মাত্তেও শুধু একটা কথাই অবিরাম বিড়বিড় করতে লাগলো, তার কণ্ঠে ছিল ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণীর সুর,
“এজেহ্… এজে আসবে! কাউকে… কাউকে ছাড়বে না, কাউকে না!…”
রিম এখন পুরোপুরি একা, দেয়ালে বন্দী। তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে উন্মত্ত, রক্তাক্ত সেই আগন্তুক। তার সমস্ত শরীর ভয়ে কাঁপছে। নিজেকে মুক্ত করার শেষ চেষ্টা হিসেবে সে ফিসফিস করে অনুনয় করলো, তার কন্ঠস্বর ভেঙে যাচ্ছিল,

“আমাকে যেতে দাও প্লিজ… আমি অনুরোধ করছি। আমার কোনো সর্বনাশ করোনা।”
আগন্তুক, যার বাম চোখ থেকে তখনো রক্ত ঝরছে, একটি বীভৎস বিজয়ের হাসি হেসে রিমের চোয়ালে ধারালো আঙ্গুল রেখে ধরলো। সে রিমের চুলের ঘন গোছা থেকে নেশার্তের মতো ঘ্রাণ নিতে লাগলো।
“সর্বনাশ কেন বলছো, বেবিগার্ল? আমি তোমার সর্বনাশ নয়, বরং তোমাকে সারাজীবন নিজের কাছে সোনার খাঁচায় আগলে রাখবো। এই হোল ওয়ার্ল্ডে তুমিই সেই একমাত্র নেশা, যা আমাকে গ্ৰাস করেছে। সেই নেশা এতো সহজে কি ছেড়ে দেওয়া যায়, বলো?”
এরপর তার আঙ্গুলগুলো রিমের নরম গালে স্লাইড করতে করতে, সে ফিসফিস করলো
“আমার কাছে একবার এসেই দেখ। ঐ ব্লা*ডি মনস্টার জেইনের থেকেও অনেক বেশি সুখ,দেবো তোমায়। এমন সুখ, যা তুমি আর কখনও ভুলতে পারবে না।”
ঘৃণায় রিমের মুখ কুঁচকে গেল। সে তীব্র ক্রোধে মুখ ফিরিয়ে নিলো। চোখ দুটো তার লাল, যেন জ্বলে ওঠা আগুনের ফুলকি। সে দাঁতে দাঁত চেপে, চিবিয়ে চিবিয়ে, একদম ভেতরে গিয়ে আঘাত করার মতো করে বলল,
“কুকুরের বাচ্চা! আমার আরাত্র’র পায়ের নখেরও যোগ্যতা নেই তোর! তুই একটা পঁচা আবর্জনা!”
ঠাস!

একদলা থুথু এসে পড়লো আগন্তুকের ক্ষতবিক্ষত মুখে।
মুহূর্তে আগন্তুকের মুখের শয়তানি হাসিটা মিলিয়ে গেল। তার চোয়াল পাথরের মতো শক্ত হয়ে এলো। সে রক্তমাখা থুথুটা নিজের মুখে অনুভব করলো। সেই চরম অবমাননার দৃষ্টিতে সে রিমের দিকে তাকালো।
“অনেক তেজ না তোর! খুব অহংকার তোর জেইনকে নিয়ে? আজ তোর সমস্ত তেজ ভেঙে চুরমার করে দিবো আমি! ভেবেছিলাম তোকে আমার ঘরের রানী করে রাখবো—আমার একান্ত সম্পত্তি। কিন্তু তুই আমার রক্ত গরম করে দিয়েছিস!তুই জেইনের সাথে আমার তুলনা করেছিস!”
তার কণ্ঠস্বর এবার হিংস্র গর্জনে পরিণত হলো,
“ঠিক আছে। এবার আগে তোকে ভাঙবো, চূর্ণ করবো। তারপর সারাজীবনের জন্য আমার স্ল্যা*ট (Sl*ut) বানিয়ে রাখবো! তুই জানবি তুই কার।”
তবুও রিম পিছু হটলো না। তার ভয় চাপা পড়ে গেল ঘৃণার নিচে। সে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে শেষবারের মতো চ্যালেঞ্জ করলো,

“সেই স্বপ্নই দেখতে থাক! তোর যম আসবে। সে তোর শরীরের প্রত্যেকটা অংশকে আলাদা করে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। এক টুকরোও অক্ষত থাকবে না।”
এই কথাগুলো যেন আগন্তুকের উন্মাদনাকে শতগুণ বাড়িয়ে দিলো। সে রিমের চুলের মুঠিটা বজ্রমুষ্টিতে শক্ত করে ধরে দেয়ালের সাথে তার কপালটা জোরে আঘাত করলো।
ধড়াম!
আঘাতে রিমের কপাল বেয়ে উষ্ণ, গাঢ় রক্ত গড়িয়ে পড়লো। মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো তার। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেল।
আগন্তুক তার রক্তাক্ত, উন্মত্ত চেহারা রিমের মুখের খুব কাছে এনে গর্জন করলো,
“যম আসবে না? আজকে তোকে নরকের দুয়ারের সাথে দেখা করাবো আমি!”

এক ঝটকায় সে রিমকে মেঝেতে ফেলে দিলো। রিম নিজেকে সামলে ওঠার আগেই সে হিংস্রভাবে রিমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। তার ভারি শরীরটা রিমের উপর চেপে বসলো।
রিম তখন যেন পাথরের মূর্তির মতো জমে গেছে। তার চোখে এখন কোনো কান্না নেই, নেই কোনো প্রতিবাদ। শুধু এক ভয়াবহ শূন্যতা।তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো জেইনের উদ্বিগ্ন, প্রিয় মুখখানি। কানে বেজে উঠলো সেই আদুরে, চাপা কন্ঠস্বর: ‘কথা দাও, নিজেকে সুরক্ষিত রাখবে। আমার জন্য।’

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৬

রিমের চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা অসহায়, ব্যর্থতার জল গড়িয়ে পড়লো। বুক ফেটে আর্তনাদ করতে পারছে না সে। যেন তার সমস্ত শক্তি, তার সমস্ত প্রতিরোধ কেউ কেড়ে নিয়েছে।
নিষ্পাপ, অসহায়ভাবে সে মনে মনে শুধু সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে লাগলো। আর বললো,
‘আমাকে ক্ষমা করে দিও, আরাত্র। আমি তোমাকে দেওয়া কথা রাখতে পারলাম না। নিজেকে তোমার জন্য সুরক্ষিত রাখতে পারলাম না……’

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৮