Home প্রিয় জারুলফুল প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৭

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৭

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৭
সাদিয়া সাদু

বিকেলের শেষ আলো ধীরে ধীরে হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর ছড়িয়ে পড়ছে। চারপাশে যতদূর চোখ যায়, শুধু পানি আর সবুজের বিস্তার। দূরের গ্রামগুলোকে মনে হচ্ছে জলের বুকের ওপর ভেসে থাকা ছোট ছোট দ্বীপ। মাঝে মাঝে হাওয়ার ঝাপটায় পানির ওপর ছোট ছোট ঢেউ তৈরি হয়ে তীরে এসে নিঃশব্দে ভেঙে পড়ছে।
দিগন্ত জারুল আর দিয়াকে তার নানার বাড়িতে নিরাপদে রেখে গেছে। খান বাড়ির অশান্তি আর জহুরার প্রভাব থেকে কিছুটা দূরে এই জায়গাটাকেই আপাতত নিরাপদ মনে হয়েছে তার। মেয়েকে রেখে যাওয়ার পরও মনটা পুরোপুরি শান্ত হয়নি, কিন্তু অন্তত জানে—দিয়া এখন নিরাপদ মানুষের আশ্রয়ে আছে।
হাওরের ধারে বসে আছে জারুল আর দিয়া।

দিয়া মাটিতে বসে ছোট ছোট পাথর আর ঘাস নিয়ে খেলছে। কখনো পানির দিকে তাকাচ্ছে, আবার মায়ের দিকে ফিরে কিছু একটা বলছে। জারুল মেয়ের মাথায় হাত রেখে চুপচাপ বসে আছে।
হাওরের বাতাস এসে তার লম্বা চুলগুলো বারবার এলোমেলো করে দিচ্ছে।
জারুল চোখ বন্ধ করল। করে অনুভবে করল বাতাসটা । এই হাওরেই দিগন্তের সাথে তার প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল । কিশোরগঞ্জ মিঠামন হাওরের পাশেই ছিল জারুল এর দাদি বাড়ি সেখানেই তারা ছিল । তারপর তার বাবার চাকরির সুবাদে ঢাকায় স্থানান্তর হয় ।
হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল সেই প্রথম দিনের কথা।এই হাওরেই প্রথম দেখা হয়েছিল দিগন্তের সঙ্গে।প্রথম দেখায় দিগন্তকে তার ভালো লাগেনি। মনে হয়েছিল, মানুষটা ভীষণ বাচাল ।
কথাবার্তাও ছিল অদ্ভুত।
আর সেই মানুষটাই যে একদিন তার জীবনের এতটা জুড়ে থাকবে, সেটা কি তখন জারুল কল্পনাও করতে পেরেছিল?

জারুলের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।তারপর সেই হাসিটা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেল।
কত কিছু বদলে গেছে! ছয়টা বছর আলাদা ছিল । সেই প্রথম দেখা থেকে আজ পর্যন্ত কত পথ পেরিয়ে এসেছে তারা। কত অভিমান, কত ভুল বোঝাবুঝি, কত বিচ্ছেদ, কত অশ্রু—সবকিছুর পরও দিগন্ত আবার তার জীবনে ফিরে এসেছে।
আর তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে এসেছে ছোট্ট দিয়া।
জারুল মেয়ের দিকে তাকাল।
দিয়া তখন পানির দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে আছে।জারুল ধীরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
— জানিস মা, এই জায়গাটাতেই তোর বাবার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল।
দিয়া বিস্মিত চোখে মায়ের দিকে তাকাল।

— সত্যি মা?
জারুল মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ। এই হাওরেই।
বাতাস বইতে শুরু করল ।
পানির ওপর সূর্যের শেষ আলো ঝিকমিক করে উঠল। দূরে কয়েকটি নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝির বৈঠার ছন্দময় শব্দ বাতাস কেটে এসে জারুলের কানে পৌঁছাল।সে অনেকক্ষণ চুপ করে সেই দৃশ্য দেখল।
এই হাওর একদিন তার জীবনে দিগন্তকে এনে দিয়েছিল।আজ সেই একই হাওর তাকে আবার দিগন্তের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে তবে এবার অনুভূতিটা অন্যরকম।
প্রথম দেখার সেই অচেনা কৌতূহল নেই।
আছে দীর্ঘদিনের ভালোবাসা, হারানোর ভয় আর ফিরে পাওয়ার আকুলতা।
জারুল আকাশের দিকে তাকাল।

মনে হলো, জীবনের কত গল্প এই হাওরের বাতাসের সঙ্গে মিশে আছে। কত মানুষ এসেছে, কত মানুষ চলে গেছে। কিন্তু কিছু স্মৃতি থেকে যায়—জলের ঢেউয়ের মতো, বারবার ফিরে আসে।
হাওরের বাতাস আবার তার চুল ছুঁয়ে গেল।
জারুল চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল।
মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, সব দুশ্চিন্তা যদি এই বাতাসের সঙ্গে দূরে কোথাও মিলিয়ে যেত!
দিগন্তকে খান বাড়িতে ফিরে যেতে হয়েছে।
আর সে এখানে—দিয়াকে নিয়ে, নতুন এক আশ্রয়ে।
তবুও এই মুহূর্তটুকুতে সে শান্ত।
কারণ তার পাশে তার মেয়ে আছে।
আর চারপাশে আছে সেই হাওর—যে হাওর একদিন তার জীবনের গল্পের প্রথম পাতা খুলেছিল।

_’শেয়াল একটু বুদ্ধিমান দেখে কিন্তু সে কখনোই বনের রাজা হয় না । যতই গুটি নাড়াচাড়া করুক দিনশেষে কিন্তু তাকে কেও গুনাই ধরে না। একটু ছলচাতুরি আর বুদ্ধি খাটিয়ে আমাকে বিদেশ পাঠালেই কেও আমার থেকে বড় মাদ***** হতে পারবে না । একটা একটা করে বের করে টুক*রো টুক*রো করব আমি দিগন্ত । ‘
দিগন্তের ঠান্ডা কণ্ঠে ভয়ংকর কথা শুনে কিছুটা ভরকে গেল জহুরা । মনের ভিতর একটু ভয় কাজ করলেও সেইটার পাত্তা না দিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে।
_’ কি বললে ? ‘
_’ আমার কথা গভীর মানুষরাই বুঝে দাদি জাআআআআননন । ‘
কিছুটা নাট্যকিয় ভঙ্গিতে বলল দিগন্ত।
তার কথার তাল শুনে রাগে জহুরার ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে । কিন্তু সে রাগ প্রকাশে অনিচ্ছুক। এখন রাগে কোনো কথা বললে হিতে বিপরীত হতে পারে ।
জিসা তো এক লাফে দিগন্তের পাশে বসে পড়ে ‌ । ফ্যাচ ফ্যাচ করে ন্যাকা কান্না জুড়ে দিয়েছে দিগন্ত তার দিকে বিরক্তিকর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল , জিসা দিগন্তের দৃষ্টি দেখে কিছুটা জায়গা ছেড়ে বসল ।

__’ দেখ দিগন্ত , আমি তোমার খারাপ চাইব না কক্ষনো। তুমি আমার এক এবং একমাত্র নাতি , আমার সকল স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি তোমার নামে । তুমি কেনো আমার কথা অবাধ্য হচ্ছো ? ‘
দিগন্ত সোফা ছেড়ে সটান দাড়িয়ে পড়ল ।
_’। আপনারা বিয়ের ব্যবস্থা করেন । এতো কিছু না করে আজ রাতে ডিরক বিয়ে হবে ।
যত পরিচিত ব্যবসায়ীক আছে সকলকে রাতেই ইনভার্ট করেন । ”
কথাটা শেষ করে দিগন্ত সোজা হাঁটা ধরল ।
জিসা তো মহাখুশি । তার খুশি যেনো উপচে পড়ছে ‌, খুশির ঠেলায় শরীর কাঁপছে ।
_’ ও নানুমনিইইই । আমার বিয়েয়য়। ‘
জহুরা কে একপ্রকার জড়িয়ে ধরল জিসা । জহুরা নিজের গুরুগম্ভীর মুখটা একটু হাসি টেনে জিসানকে শান্ত করল ।
তার বহুত কাজ । রাতেই বিয়ে ! এই যেনো জহুরার কাছে আকাশের চাঁদ পাওয়ার সামান , সে এক এক করে সকল চিন্তা পরিচিত ব্যক্তিকে একে একে কল করতে আরম্ভ করল ।

দিগন্ত রুমে পৌঁছানোর সাথে সাথে আরেক জোড়া পা এসে থামে ।
_’ তুই ঠিক কি করতে চাচ্ছিস দিগন্ত? ‘
দীনা এক প্রকার চিৎকার করেই বলে উঠে কথাটা ‌। মায়ের কথায় পিছু ফিরে মায়ের
রাগান্বিত মুখটা পরখ করে কঠিন স্বরে বলল ।
_’যা হচ্ছে দেখতে থাকো আম্মু। খেলা তো সবে শুরু হলো । তুমি দেখবে ঠিক কিভাবে আমি ভাঙ্গি জহুরা খানকে । ‘
_’ তুই কি বিয়েটা করবি ? ‘
_’ জন্ম , মৃত্যু, বিয়ে একবারই আর তা আমি করে ফেলেছি । ‘
দীনা কর কথা বলেনি ।‌ পিছু হেকে রুম ছেড়ে চলে আসলো ।‌

খান মহলের চারপাশে ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে এসেছে। বাইরে থেকে পুরো বাড়িটা ঝলমল করছে—ফুল, আলো আর বিয়ের সাজে যেন বহুদিন পর খান মহল নতুন কোনো উৎসবের মুখ দেখেছে। বিশাল হলরুমে শহরের নামকরা ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী আত্মীয়স্বজন এবং পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা উপস্থিত। সবার পোশাক-পরিচ্ছদ, কথাবার্তা আর চলাফেরায় আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট।
অথচ এই সমস্ত আয়োজনের মূল মানুষটিই যেন এর বাইরে। দিগন্ত দৃঢ় পায়ে ওপর তলা থেকে নিচে নেমে এলো।
সারাদিনের ক্লান্তি তার মুখে স্পষ্ট। চোখে ঘুমহীনতার ছাপ, মুখাবয়বে কঠিন স্থিরতা। নিচে এত মানুষ, এত আয়োজন দেখেও তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই। যেন এই বিয়ের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই।
সিঁড়ি থেকে নেমে সে একবার চারপাশে তাকাল।তারপর কোনো কথা না বলে সোজা গিয়ে হলরুমের একপাশের সোফায় বসে পড়ল। পড়নে সাদা শার্ট কালো প্যান্ট।
কিছুক্ষণ পর জহুরা খান এগিয়ে এলেন।
তার চোখে কঠোরতা।

— এতক্ষণ কোথায় ছিলি?
দিগন্ত ধীরে মাথা তুলল।
— বাইরে ছিলাম।
— বাইরে কোথায় ছিলে ? বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হতে যাচ্ছে। উপরে গিয়ে প্রস্তুত হয়ে আয়।’
দিগন্ত কয়েক মুহূর্ত নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর অত্যন্ত ঠান্ডা, কিন্তু ধারালো কণ্ঠে বলল,
— আমি এইভাবেই বিয়ে করব।‌’

_’এইভাবে ? ‘
জহুরা ভ্রু কুঁচকে বলল ।
জিসার মুখের হাসি কিছুটা গাঢ় হলো ।‌
কয়েকজন অতিথি একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইল। জহুরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। জিসাকে দিগন্তের পাশে বসানো হলো । কি লেখালেখির কাজ করছে । তার পাশে সোফায় হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে দীনা , তার পাশে নাসিরউদ্দিন।
_’ অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানানো যাচ্ছে যে আমি এই বিয়ে করতে পারবো না । ‘
দিগন্তের কথাটা চারপাশে বোম বিস্ফোরণের ন্যায় কাজ করল । জহুরা রাগের তুপে কাঁপছে রিতিমত। সবাই একজন আরেকজনের দিকে চাওয়া চাওয়ি করল ‌। জহুরা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল ।

_’ কি বললি?’
_’ আমি এই বিয়ে করব না । ‘
— এত মানুষের সামনে এই নাটক করছিস?
দিগন্তের চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফুটে উঠল।
চারপাশে আবার চাপা গুঞ্জন উঠল।
কেউ ফিসফিস করে বলল,
— ব্যাপারটা তাহলে গুরুতর।
আরেকজন নিচু স্বরে বলল,
— জহুরা খানের সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করার সাহস সবার নেই।
জহুরা সেই গুঞ্জন শুনেও নিজেকে সামলে রাখলেন।
— তুই কি ভুলে গেছিস, আমি কে?
দিগন্ত সোফা থেকে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
_’ কে আপনি ? ‘
জহুরা এইবার তেতে উঠল। জিসা তো কান্না জোড়ে দিয়েছে কথাটা শোনার পর থেকেই । দিগন্ত সেই দিকে তাকিয়ে উচ্চ স্বরে বলল ।

_’ স্টপ ইউর ফা**কি ড্রামা ।
দিগন্ত কথা শোনে তেতে উঠল জহুরা ‌। রাগে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে । তার এতো কৌশল এই বাচ্চা ছেলের জন্য বিফলে যেতে দিবে না । কক্ষনো না ,
জহুরা তেতে উঠল চোখেমুখে ফোটে উঠলো রাগ ‌ । চেঁচিয়ে উঠলো তাৎক্ষণিক।
_’ এই বিয়ে না করলে আমার ১২শ কোটি টাকার এক কানা করিও পাবে না তুমি ।‌ তার সাথে ব্যাংক ব্যালেন্স, তোমাকে আমি এই খান বাড়ি থেকে তেজ্য করবো দিগন্ত খান । ‘
বাঁকা হাসলো দিগন্ত । একটা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে ।‌

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৬

_’ আমাকে ভিখারি মনে হয় ? এতো বছর বিদেশ থেকে কি ভেড়ার বাল ফালছি ? আর তোমাদের এই খান পর
পদবি ব্যবহার করলে দেখা যাবে দুইদিন পর তোমার খ
কান এই থাকবে না। তোমার পদবী ভিজিয়ে মুড়ি খাও।’

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ১৮