Home প্রিয় জারুলফুল প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২১

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২১

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২১
সাদিয়া সাদু

সকাল গড়িয়ে দুপুর নেমেছে ধরনী জুড়ে , সাথে সূর্যটা ঠিক মাথার উপরে খাড়া হয়ে আছে । ভদ্র মাসের তপ্ত হাওয়া , কাঠফাটা রোদ , ক্লান্তি আর অবসান এই সবকিছু মিলিয়ে যেনো ঢাকা শহর । এই সময়ে চারদিকে তীব্র তাপ অনুভূত হয় , যা জনজীবনকে কিছুটা স্থবির করে তোলে । আজকের তাপমাত্রা ৪২ ছুঁইছুঁই । গরমটা একটু বেশিই মনে হচ্ছে, এই গরমে অস্থির লাগছে। আজকে যেনো সূর্য্যিমামা একটু বেশিই ত্যাজ দেখাচ্ছে । পর পর কয়েকবার সূয্যিমামাকে গালি দিয়ে গাড়ির গিয়ারিং ঘুরাচ্ছে দিগন্ত কাঁচা পিচঢালা রাস্তা যেনো আগুনের তাপ ‌। পায়ে ফোস্কা পড়ে যাওয়ার মতো গরম ।

এই গরমে দিগন্ত দ্রুত গাড়ি চালিয়ে বাসায় পৌছে ‌ , দরজাটা ঠেলে ভেতরে পা দিয়েই বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয় দিগন্ত
কপাল, গলা, পিঠ — সব জায়গা ঘামে ভেজা। রোদে পোড়া মুখটা লাল। চুলগুলো ঘামে লেপ্টে আছে। শার্টের কলার ভিজে চুপচুপে। হাতের ফাইলের ভাঁজে ভাঁজে ধুলো। জুতোর তলায় রাস্তার পিচ লেগে আছে। বাইরের আগুনের মতো গরমের পর বাসার ভেতরের বাতাসটা তার কাছে স্বস্তি লাগছে । একটা লম্বা শ্বাস ফেলে সোফায় ধপ করে বসে পড়ে। চোখ বন্ধ।
দীনা ব্যস্ত হাতে ফ্রীজ থেকে পানি নিয়ে আসে ছেলের জন্য। ঠান্ডা পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়। দিগন্ত কোনো শব্দ প্রয়োগ না করে মায়ের হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে এক শ্বাসে খেয়ে ফেলে । অমনি উপর থেকে জহুরা জিসা আর নাসিমা নেমে আসে । জহুরার মলিন মুখটাই একটুখানি হাসির রেখা দেয়া দেয় । জহুরা হাঁটার গতি বাড়ি এসে দিগন্ত সামনের সোফা সেট বসে , তৎক্ষণে দীনা হলরুম ত্যাগ করে রন্ধনশালায় পা রাখে ।
দিগন্ত তাদের টের পেয়ে হাতের কাগজ গুলো আড়াল করে ফেলল । নিজের বুক পটেকে রেখে দিল ।

_’ দাদুভাই তুমি আসছো আমি অনেক খুশি হয়েছি । তোমার সাথে অমন ব্যবহার করা আমার উচিৎ হয় নি, রাগের মাথায় বলে ফেলেছি। রাগ কোরো না দাদুর প্রতি। ‘
পাশ থেকে নাসিমা ও ঠোঁট মিলাল ।
_” হ্যাঁ দিগন্ত তুমার দাদু তো তোমার ভালোর জন্যই এতো কিছু করেছে, দেখো তোমার চিন্তায় কাল রাত থেকে নাওয়া খাওয়া । শুধু কথায় কথায় বলছে দিগন্ত কখন আসবে ?দিগন্ত আসলে আমি খাবো । তোমার প্রতি মায়ের ভালোবাসা দেখলে আমার হিংসে হয় মাঝে মাঝে ।” ‘
দিগন্ত একটু হাসল। ঠোঁট দুইটা প্রসারিত করে হাসল , অমনি ডান গালে লম্বা করে গর্ত হয়ে গেল । জিসা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়ই দিগন্তের সেই হাসির দিকে । ছেলের এমন সুন্দর মনকাড়া হাসিটাই খেয়েছে তাকে । সম্পত্তির থেকে তাকে পাওয়ার লোভটা জিসার কাছে কয়েকগুণ বেশি । জিসা নিজেও একটু হাসল ।‌
কয়েক মূহুর্তের জন্য নীরবতা নেমে এল হলরুমে জুড়ে, দিগন্ত চুপচাপ বসে আছে । মুখের কোণে একটু মুচকি হাসি , জহুরা সামনের দিকে একটু চেপে দিগন্তের হাতটা হাল্কা স্পর্শ করে বলল ।

_”দিগন্ত অনেক তো হলো , আমার বয়স ও দিনদিন বাড়ছে । আগের মতো আর শক্তি কুলায় না , ব্যবসায় কোনো কাজে যেতে পারি না , তুমি এইবার সবকিছু বুঝে নাও ।
তার আগে শুনো জিসাকে বিয়ে না করলে তোমার পছন্দ কাউকে থাকলে বলো বয়স তো তোমার কম হলো না ২৮ এ পা দিবে । ”
অমনি জিসার মুখটা চুপসে গেল । হাস্যোজ্জ্বল চোখজোড়া ছলছল করে উঠলো মূহূর্তেই। মুখ জোড়ে নেমে এল আঁধার । জহুরা নাতনির দিকে আড় চোখে তাকালেও কিছু বললো না । মেয়ের সাথে নাসিমার ও হাসি মুখ মূহূর্তেই চুপসে গেল ।
দিগন্ত তিনজনের দিকেই দৃষ্টি ঘুরায় হাসিমুখে । হাসিহাসি মুখ করেই দাঁতে দাঁত চেপে ধরে আওড়ায়।
” আমি জন্মগত ব্যাড বয়, ভোলাভালার ভঙ ধরে থাকি। আর তোমরা সেইটার সুযোগ নিয়েছ। নিচ্ছো এখনো , এক দুইবার ছাড় পাবে , আমি আবার ভালো সাজার ভঙ বেশি সময় ধরে ধরে রাখতে পারি না । ‘

_’ ও দাদু ভাই , কি বলো বিরবির করে । জোরে বলো শুনি আমরা । ”
দিগন্ত সটান দাঁড়িয়ে পড়ে সোফা ছেড়ে । এক পা টেবিলের থেকে সামনে এগোতে এগোতে বলল
_” আমি কাল অফিসে যাব , আগের এসিস্ট্যান্ট কে বরখাস্ত করে নতুন এসিস্ট্যান্ট নিয়োগ দাও । আর বিয়ে আমি অতি দ্রুতই করছি চিন্তা করতে হবে না কারোর ‌। ”
দিগন্ত এগোতে গিয়েও আবার পিছিয়ে এসে বলল ।
_’ না থাক এসিস্ট্যান্ট নিয়োগ দিতে হবে না । শুধু রিজাইন লেটার পাঠিয়ে দিতে বলো কাল , ইতালি থেকে আমার এসিস্ট্যান্ট চলে আসবে ।”
দিগন্ত আর দাঁড়াল না ‌ । বড় বড় পা ফেলে হলরুম ত্যাগ করে দুতলায় পা রাখে ‌।
অমনি জহুরা খানের হাসিমুখটাই ভর করল রাগ , কপাল টানটান করে দিগন্তের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রয় ‌ । দাঁতে দাঁত চেপে ধরে ‌ ।

_”তোমার এই অহংকার যে আমি কিভাবে মাটির সাথে গুঁড়িয়ে দেয় তা তুমি বুঝতেও পারবে না , সামান্য দুইদিনের ছেলে হয়ে আমার সাথে পাঙ্গা নিচ্ছো জানের মায়া নেই। ‘
রাগে জহুরার চোখ দুইটা লাল বর্ণ ধারণ করল ‌। একটু আগের উপচেপড়া খুশিটা
এখন আর নেই , ডোরা সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছে । জিসা তো পাশে বসে কেঁদে কেঁটে একাকার ।
_” নানুমনি তুমি দিগন্তকে অন্য জায়গায় বিয়া দিবে ? ‘
জিসার কথায় জহুরার গা পিত্তি জ্বলে যায়।
কর্কশ গলায় ধমকে উঠল ‌ ।
_” একদম নাটক করবে না । পারো না তো কিছু , খালি ঢং করতে পারো আর আমার টাকা উড়াতে পারো । যত্তসব নাটক ।
তোমার মায়ের সাথে ওই নাসিরউদ্দিনের বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম, কালো বলে গাঞ্জাখোড়ের সাথে পালিয়ে গিয়েছিল এখন আবার সেই আমার ঘাড়েই এসে পড়ল । যদি বিয়েটা করে ফেলত তাহলে কি আজ আমার এতো গুলো পাপ কাজ করতে হত , না তার এই অবস্থা হতো । ‘
মায়ের কথায় অপরাধির ন্যায় মাথাটা নামিয়ে ফেলে নাসিমা । জহুরা এতো কিছু প্ল্যান করে রাখলেও তার বিন্দু পরিমাণ টের পেতে দেননি নাসিরুদ্দিন কে , সে এখন পর্যন্ত জানে তারা তার আপন মা বোন । এমন কি আলী আহমেদ কেও এই কথা জানাননি জহুরা , তার আগেই এলাকার পাতি মাস্তানের সাথে পালিয়ে যায় নাসিমা ।
জহুরা আর এ মুহূর্তেও বসল না , উঠে হনহনিয়ে নিজেরা রুমের দিকে হাটা ধরল।

দিগন্ত নিজের রুমে এসে কাগজ গুলো বের করে সুন্দর করে আলমারিতে লুকিয়ে রাখতে দরজা খুলে , অমনি দীনা খাবার প্লেট হাতে রুমে প্রবেশ করে । দিগন্ত ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের মুখটা দেখে নিজের কাজ শেষ করে খাটে এসে বসল ‌ । দীনাও ছেলের পাশে বসে , ভাত মেখে লোকমা বানিয়ে ছেলের মুখের কাছে ধরে , দিগন্ত বিনা বাক্যে খেয়ে নেয় ‌ ।
_'” আমার নাতনিটা কেমন আছে ? ”
দিগন্ত মুখের ভাত চিবিয়ে টোক গিলে বলে
_’ ভালো । ‘
_’ আবার চলে যাবি ? ‘
_’ হু, না গেলে মেয়েটা কান্না করে , আম্মু শুনো । ‘
দীনা ছেলের মুখে ভাত লোকমা ঢুকিয়ে বলল
_’বল । ‘
দিগন্ত মুখের খাবার শেষ করে পাশের টেবিল থেকে পানি খেলে মায়ের আঁচল দিয়ে মুখ মুছে বলল ।

_” এই বাড়িতে অনেক বড় রহস্য লুকিয়ে আছে , সাবধান থাকবে । এই বাড়ির ভেতর কালসাপ রয়েছে কয়টা । যখন তখন কামড়ে দিবে। সাবধান। ‘
দীনা ভয় পেয়ে যায় ।
_’ কালকের আমি করিমকে বলবো সারা বাড়ি পরিষ্কার করতে । আল্লাহ ভয়ঙ্কর বেপার সেপার । ”
দিগন্ত মায়ের কথায় হেসে দেয় । মায়ের কাধ জড়িয়ে ধরে বলল ।‌
_'” আরে আমার বোকা মা । আমি তো শুধু তোমাকে ভয় দেখাতে বলেছিলাম , কিন্তু তুমি তো আমার কথায় ভয় পেলে ঠিকই আমার কথার মুলটা বুঝলে না , যায় হোক তুমি কারো সাথে কোনোরূপ কথা বলবে না , আমি না থাকা পর্যন্ত আব্বুকে ও বলবে কোনো কথা না বলতে । ‘
দীনা ছেলের কথায় কিছু বলে না চুপচাপ রুমে থেকে বেরিয়ে যায় ।

দিগন্ত ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায় , রাত তখন ৮ টা । গ্ৰামের ৮ টা মানেই গভীর রাত , শুনশান নীরবতা চারদিকে , শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া মানুষ কোনো সাড়াশব্দ নেই বললেই চলে । দিগন্ত গাড়িটা সাইডে রেখে বাসার দিকে পা রাখে , কয়েকবার কড়ানাড়তেই ওপাশ থেকে জামরুলের ঘুম জড়ানো গলায় আওয়াজ ভেসে আসে ।‌
_’ কে ? ‘
_’ আমি , দরজা খোল ।‌’
জারুল দরজা খুলে সাইট দিয়ে দাঁড়ায় ।‌দিগন্ত কোনো প্রকার বাক্য উচ্চারণ না করে গামছা হাতে ওয়াশ রুমে ঢোকে , প্রায় ২০ মিনিট পর ফ্রেশ হয়ে বের হয় । জারুল গোল হয়ে বিছানায় বসে আছে , দিয়া ঘুমিয়ে আছে । দিগন্ত ঘার নামিয়ে মেয়ের কপালে শব্দ করে চুমু খেয়ে বলল
_’ খেয়েছো , ও খেয়েছে ? ‘
_’ হু ।‌ বোসো আমি খাবার নিয়ে আসছি । ‘
জারুল পাশের রুমে যাওয়ার জন্য পা এগোলে দিগন্ত হাতে টান দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসে , আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে।
দিগন্তের আকস্মিক এমন কাহানিতে হতভম্ব হয়ে যায় জারুল ।

_” কি হয়েছে ? কোনো সমস্যা ? ”
দিগন্ত জারুল এর দুই গালে হাত রেখে বলল ,
_’ বিরাট সমস্যা , এই সমস্যার কোনো সমাধান নেই । ‘
জারুল ঘাবড়ে যায় চোখ দুইটা ছলছল করে উঠল মূহূর্তেই ।
_’ কি সমস্যা বলো আমাকে ।”
দিগন্ত আলতো করে জারুলের অধরে চুমু খেয়ে কোমড় শক্ত করে চেপে ধরে । বলল
__” বলবো? ‘
_’ তোমার মনে হয় না তুমি আজ একটু বেশিই রোমান্টিক মুডে আছো ?”
দিগন্ত ফিচ করে হেসে দিল । আপাতে একটা লম্বা ঘুমের দরকার তাই জারুল কে নিয়ে দিয়ার পাশে শুয়ে পড়ল ‌ । দিগন্তের এমন কার্যকলাপে বেশ বিরক্ত হলো জারুল , সে এইবার একটু ঝাঁজালো কন্ঠে বলল ।

_’ তুমি না কি বলবা ? ‘
দিগন্ত একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল ।‌
_’ দাদা তার সকল কিছু আমার নামে লিখে দিয়ে গেছে , তার সকল প্রোপার্টি আমার ।‌’
জারুল বিস্ময়ে হতবাক । দিগন্তের বুক থেকে মাথা তুলে তাকাল , দিগন্ত ফের বলল।
_’ জহুরা খান আমার আপন দাদি নয় , তার মেয়ে নাসিমা ও আমার আপন ফুফু না । আগের পক্ষের মেয়ে নিয়ে আমার দাদার কাছে বিয়ে বসছে , সম্পত্তির লোভে । আই থিংক এই লোভে পড়েই আমার দাদাকে মেরেছে ওই বুড়ি । বৃষাক্ত ইনজেকশন দিয়ে , পরে নাটক সাজিয়েছে হার্ট অ্যাটাক। ”
দিগন্ত অতি সহজেই কথাগুলো বলে যাচ্ছে , জারুল যেনো কথা বলতেও ভুলে গেল , তার হাত পা জমে বরফ হয়ে গেছে । মুখ দিয়ে কোনো প্রকার কথাও বের হচ্ছে না , সব যে এখন দিগন্তের নামে এইটা জানলে নির্ঘাত দিগন্তকে কিছু করতে চাইবে।
_’চিন্তা করো না , বুড়ি এখনো কিচ্ছু জানে না । এমনকি আমার মা বাবাও না । ‘
দিগন্ত হয়তো জারুল এর অবস্থা বোঝাতে পেরেছে তাই শান্তনা স্বরুপ কথাগুলো বলল
_’ তাই যেনো , আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। ‘

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২০

জহুরা রুমে বসে পায়ে গরম সরিষা তেল মালিশ করতে আর কাউকে এক নাগারে কৃ করেই যাচ্ছে। বিরক্তিতে চোখমুখে কুঁচকে আছে । কয়েক টা কল দেওয়ার পর জহুরা গম্ভীর কন্ঠে বলে।
‘ যে নাম্বার দিয়েছি ওই নাম্বা ট্র্যাকিং করো , মা মেয়ে দুইটাকে জানে মেরে ফেলবে ।
কাজ হলে উপহার হিসেবে চার লাখ পাবে আরো ।‌”

প্রিয় জারুলফুল পর্ব ২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here