প্রিয় প্রণয়িনী পর্ব ৫২ (২)
জান্নাত নুসরাত
নিস্তব্ধ রাতে চারিদিকে ঝিরিঝিরি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। ইসরাত নিজের রুমে একা শুয়ে আছে জানালার দিকে তাকিয়ে। দিনে ঘুমানো জন্য এখন চোখে ঘুম নেই।এখন ও পর্যন্ত ও মেহেরুন নেছার সাথে কথা বলে নি সে। হঠাৎ দরজায় খুলে কেউ ভিতরে প্রবেশ করলো।
“কেমন আছো ইসরাত? সকালে তোমার সাথে ঠিক করে কথা বলতে পারি নি।
” ভালো।
“ইসরাত তুমি কিছু মনে না করলে, কি কিছু জিজ্ঞেস করতে পারি?
” ভাইয়া এতো হ্যাসিটেইট ফিল করার কোনো কিছু নেই! যা জিজ্ঞেস করার করে ফেলুন।
“বড় ভাইয়া কি জানতো তুমি এখানে এসেছ?
ইসরাত চুপ থেকে মাথা নাড়ালো। আরশ চুপ করে কিছুক্ষণ বসে থেকে কিছু ভাবল। ঠোঁট কামড়ে ইসরাতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,”তোমাদের মধ্যে এক্সেক্টলি কি হয়েছে?
ইসরাত ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বসে রইলো। একবার বলবে ভাবল তারপর আবার নিজের মনই বলল তাদের স্বামী স্ত্রীর ব্যাপার অন্য কাউকে কেন বলবে সে?
ইসরাত শান্ত গলায় বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
” তেমন কিছু না ভাইয়া! হাজবেন্ড ওয়াইফের মনমালিন্য চলছে এইরকম কিছুই।
আরশ সন্দেহের চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আর ইউ সিউর ইসরাত?
ইসরাত হঠাৎ এমন প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল। ঢুক গিলে বলল,”জি, জি আমি সিউর।
পিছন থেকে নুসরাত টনেডোর মতো রুমে প্রবেশ করলো। হাতে আইস্ক্রিম, চিপস্, জুস হাবিজাবি খাবার। নুসরাত রুমে ঢোকার সময় দরজার সাথে ধাক্কা লেগে শব্দ করে উঠলো। আরশ চোখ ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল। নুসরাতের হাতে আইস্ক্রিম দেখে ভ্রু উঁচিয়ে নিল।
” এই ঠান্ডার মধ্যে তুই আইস্ক্রিম খাবি?
নুসরাত কথা না বলে মাথা উপর নিচ নাড়ালো। মানবতার খাতিরে আরশকে ও শুধালো,”আপনি খাবেন?
আরশ নাক কুঁচকে বলল,
“না বইন তুই খা!
নুসরাতের থেকে চোখ ঘুরিয়ে ইসরাতের দিকে তাকালো। ইসরাত তখনো চুপ করে বসে, নির্লিপ্ত চোখে বোন আর বোন জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে।
” তাহলে আসি ইসরাত! কোনো প্রয়োজন হলে নির্দ্বিধায় জানাবে?
নুসরাত চিপসে্র প্যাকেট থেকে চিপস্ বের করে মুখে পুরল। আরশ ইসরাতের থেকে বিদায় নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। কাপড় টেনে ভাঁজ ঠিক করে নুসরাতের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাঁকা নয়নে নুসরাতের পানে তাকিয়ে টুকুস করে হাত চিপসে্র প্যাকেটে ঢুকিয়ে চিপস্ নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। যেতে যেতে নুসরাতের উদ্দেশ্যে বলল,”তাড়াতাড়ি রুমে আয়! নাহলে দরজা লাগিয়ে দিব।
নুসরাত মুখ ভর্তি চিপস্ থাকায় হাউ হাউ করে কিছু বলল। যার কোনোটা ইসরাতের আর আরশের বোধগম্য হলো না।
সকাল সকাল সৈয়দ বাড়িতে হইচই শুরু হলো। আশিক,মমো,ডেলা আর ইনায়া আসছে। এই সপ্তাহের শুক্রবারে আশিক আর ডেলা ফ্রান্স সিফট হচ্ছে। ডেলা আরো কিছুদিন দেশে সময় কাটাতে চাইছিল কিন্তু বিজনেস এর কারণে যেতে হচ্ছে।
ইসরাত নিচে হইচই শুনে রুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে আসলো। নিচে নামতেই চোখ গোল গোল করে ইসরাতের পানে তাকাল আশিক, মমো, ডেলা, ইনায়া। ইসরাত সবার এভাবে থাকানো দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসল। সোফার দিকে অগ্রসর হতে হতে জিজ্ঞেস করলো, “সারপ্রাইজ কেমন লাগলো?
মমো অত্যাধিক বিস্ময় নিয়ে ইসরাতের উদ্দেশ্যে বলল,
“এটা সত্যি আপু তুমি?
ইসরাত হেসে বলল,
“না এটা আমি না।
আশিক বিস্ময় কাটিয়ে বলল,
” ওয়াট আ সারপ্রাইজ ইসরাত? আমি তো তোকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এটা কোনো কথা দেশে আসলি আমাদের জানালি না। ফ্রান্স যাওয়ার আগে বিদায় দেওয়ার জন্য, না আসার জন্য জানাসনি নাকি? তখন একটা কাজে ফেঁসে গিয়েছিলাম। তাই তো আম্মুকে আর মমোকে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। না আসার জন্য এভাবে পর করে দিলি। আচ্ছা, আমাদের বলিসনি ঠিক আছে আম্মুকে জানালি না কেন? দিনে জানাসনি রাতে জানালি না কেন? রাতে জানালে ও তো আম্মু তখন এসে হাজির হতো তোকে দেখার জন্য। জায়িন ভাইয়া কোথায়? দেখতে পাচ্ছি না কেন?
ইসরাত আস্বস্থ করে বলল,
“আগে শ্বাস নাও ভাইয়া! আস্তে ধীরে জিজ্ঞেস করো আমি উত্তর দিচ্ছি! একটা একটা করে লাইন বায় লাইন প্রশ্ন করো। আমি উড়ে যাচ্ছি না। এখন তোমার সামনেই আছি।
আশিক শ্বাস নিল। প্রথম থেকে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা শুরু করলো।
” দেশে আসলি জানালি না কেন?
ইসরাতের ঠোঁটের আগায় উত্তর ছিল। ইসরাত ঝটপট বলল,”সময় হয়ে উঠেনি! হঠাৎ করে সব হয়ে গেছে।আম্মু-আব্বু, চাচ্চু-ছোট আম্মু, দাদি, ভাইয়া রা কেউই জানতো না আমি আসছি। শুধু নুসরাত জানত।
“দিনে আসলে রাতে জানালি না কেন আমাদের? তুই এসেছিস!
” ট্রায়াড ছিলাম ভাই এসে শুয়ে পড়েছি!
“জায়িন ভাইয়া কোথায়? সে আসেনি! দেখতে পাচ্ছি না কেন?
আশিকের শেষ প্রশ্নে ইসরাতকে ভিতর থেকে কিছুটা নাড়িয়ে দিল। সত্যিতো সে কি উত্তর দিবে? জায়িন কোথায়? যথাযথ উত্তর মগজ থেকে বের হয়ে আসলো না। নুসরাত পা দাপিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসলো। সিঁড়ি থেকে চিৎকার করে সবাইকে সালাম দিল,”আসসালামু- আলাইকুম! কেমন আছো সবাই?
মমো উৎফুল্ল ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো। দু-হাত মেলে গিয়ে নুসরাত কে জড়িয়ে ধরলো। নুসরাতের হঠাৎ আসায় আশিকের করা প্রশ্নে ভাটা পড়ল। ইসরাত আর সেটা নিয়ে কথা বলল না। সতর্কতার সহিত আলগোছে এড়িয়ে গেল জায়িনের না আসার ব্যাপারটা।
মমো আবেগীয় গলায় বলল,
“কত দিন পর তোর সাথে দেখা?
নুসরাত ভ্রু বাঁকাল। আশিক নিজের কথা ঢুকিয়ে দিল মমোর কথার মাঝখানে।
” এক্সেক্ট কত দিন পর নুসরাতের সাথে তোর দেখা হয়েছে?
মমো হাতের আঙুল গণতে লাগলো। নুসরাত মমোর মাথায় গাট্টা মেরে বলল,”বেশি না ভাইয়া এই তো এক সপ্তাহ আগ-পিছ হবে। এর কথায় কান দিও না তো।
নুসরাত মমোর হাত মুঠোয় বন্দী করে নিচে নেমে আসলো। নুসরাত আর মমো একসাথে সোফায় বসতেই ডেলার পেটের দিকে চোখ পড়ল। পেট কিছুটা ফোলা ডেলার। নুসরাত চোখ ওদিকে রেখেই ভ্রু কুঁচকে ফেলল। মমোর দিকে বিস্ময় নিয়ে একবার তাকিয়ে আবার আশিকের দিকে তাকালো তারপর আবার ডেলার পেটের দিকে। নিজের সিক্সথ সেন্স যা বলছে, তাহলো সে ফুফু হতে চলেছে।
আশিকের দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “আমি যা ভাবছি বা দেখছি তা কি সত্যি?
আশিক নুসরাতের এমন সন্দেহ দৃষ্টি দেখে থতমত খেল। চোখ ঝাপটে নুসরাতের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি ফেলে বলল,” কি তুই ভাবছিস?
নুসরাত ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসল। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলল, “ডেলা আই মিন ভাবি কি প্রেগন্যান্ট?
নুসরাতের এরকম গলা ফাটিয়ে প্রশ্ন করা দেখে আশিক কিছুটা লজ্জা পেয়ে গেল। ডেলার লজ্জা গাল গুলো লাল টকটকে হয়ে গেল।
মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলতেই নুসরাত লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
” তাহলে আমার সন্দেহ সত্যি! তুমি তো ইসরাত বিদেশ থেকে আসার থেকে বড় সারপ্রাইজ দিয়ে দিল। আর এতো দিন আমাদের বললেই না।
মমোর পিঠে ধুপধাপ কিল বসালো নুসরাত। মমো পিঠে হাত বুলিয়ে চোখ মুখ অন্ধকার করে নুসরাতের দিকে তাকালো। অভিমানি গলায় বলল, “আমাকে মারলি কেন? আমি কি করেছি?
নুসরাত আঙুল তুলে মমোকে ঠোঁটে হাত চেপে চুপ দেখালো। মমো নাক ফুলিয়ে তাকিয়ে থাকলো নুসরাতের দিকে। কিছু বলতে নেবে নুসরাত বলল,”চপ বেডি! তুই আর একটা কথা বললে পিটিয়ে তোকে তক্তা বানিয়ে দিব।আমাদের বাড়িতে দু-দিন পর পর আসিস আর তুই বললি না ডেলা ভাবির বাচ্চা হবে। তোকে তো আমি….
নুসরাত আবার তেড়ে গেল মমোর দিকে। ইরহাম এসে আটকালো।
“আরে আরে, মেয়েটাকে মারছিস কেন? কি করেছে?
নুসরাত দাঁত কিড়মিড় করে কটমট শব্দ করলো। ফিসফিস করে ইরহামের আর মমোর শোনার মতো করে বলল,” শালি বাইনঞ্চ*ত, বলেনি ওর ভাইয়ের দু-দিন পর বাচ্চা হবে। কি সুন্দর চেপে গেছে? এ নাকি আমার বন্ধু?
মমো মুখ কাঁদো কাঁদো করে বলল,
“তুই ওতো কত কি বলিস না আমাদের? আমরা কি তোকে এরকম জানার পর পিটিয়েছি? যে তুই আমাকে গরুর মতো পিটাচ্ছিস।
ইরহাম মাথা নাড়ালো মমোর কথায় তাল দিয়ে। সে সমান ভুক্তভোগী এই বিষয়ে। তাই মমোর সাপোর্ট করলো। নুসরাত থতমত খেয়ে ঢোক গিলল। নিজের সাফাই দিয়ে বলল,”আমি না বললে সেটা অন্য বিষয়! তুই কেন আমাকে বললি না আগে? আমি নিজের ব্রেইন কাজে লাগিয়ে কেন জানবো ভাবির বাচ্চা হবে?
মমো মিনমিন করে বলল,
” তোর ব্রেইন কাজে লাগিয়েছিস কোথায়? পেট উঁচু দেখেই তো আন্দাজে ঢিল ছুঁড়লি। তোর ঢিলটা শুধু ঠিক জায়গা মতো বসেছে। এখানে তুই ব্রেইন কাজে লাগালি কই? আর ভাইয়াই তো বলতে না করলো। সে নিজে এসে বলবে বলেছে তোকে আর আরশ ভাইয়াকে।
আশিকের দিকে ক্ষিপ্ত চোখে তাকিয়ে মমো কিছুটা রুঢ় গলায় বলল,”ভাইয়া এখন বলছো না কেন বলো? হা করে আমার আর ওর মুখ দেখছো কেন? তুমি তো তখন বললে না, ও জানেনা, তাহলে তুই আর জানাস না। আমি নিজে সারপ্রাইজ দিব নুসরাত কে।
আশিক চোরের মতো মুখ লুকালো। নুসরাত মমোকে বেশি কথা বলতে দেখে হম্বিতম্বি করে এগিয়ে গেল। ইরহাম নুসরাত কে হাত ধরে আটকালো। নুসরাতদের থেকে দু-হাত দূরে দাঁড়িয়ে থেকে এসব মনোযোগ সহকারে দেখছে ইসরাত, ডেলা, আশিক, আর ইনায়া।
” ইরহাম সর সামনে থেকে শালিকে আরো দুটো না দিলে হবে না। শালি বেশি মুখ চালাচ্ছে আজকাল ।
নুসরাত শার্টের হাতা গুটিয়ে নিল মমোকে কয়েক ডোজ দেওয়ার জন্য। মমো কিছুটা ভয় পেল এবার। যেভাবে তাকাচ্ছে তার দিকে মনে হচ্ছে পিষে ফেলবে। ইসরাতের দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত গলায় বলল,”আপু দেখোনা কি করছে? কীভাবে হাত গুটাচ্ছে আমার মতো এক অবলা মেয়েকে মারার জন্য? প্লিজ বাঁচাও এই পিশাচিনীর হাত থেকে।
ইসরাত বিরক্ত হয়ে নুসরাতের দিকে তাকালো। নুসরাতের দিকে এগিয়ে এসে টেনে নিয়ে গেল সোফার দিকে। সোফার উপর বসিয়ে মাথায় দুটো থাপ্পড় মারল।
“গুন্ডি হচ্ছিস দিন দিন?
নুসরাত মাথা নাড়িয়ে না বলল। আবার উপর নিচ নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল। ইসরাতের কথার উত্তর দুটোই দিল। ইসরাত নুসরাতের হাত চেপে ধরে নুসরাতের পাশে বসে ডেলার দিকে মনোযোগ দিল। ডেলার আগের তুলনায় কিছুটা স্বাস্থ্যবান হয়ে গিয়েছে। দেখতে খারাপ লাগছে না! ভালোই লাগছে! দেখলেই ইচ্ছে করছে ফোলা গাল গুলো টিপে দিতে।
হালকা হেসে ইসরাতের দিকে তাকিয়ে থাকল ডেলা। ইসরাত ও অধর প্রসারিত করলো ডেলার দিকে তাকিয়ে। চোখাচোখি হতেই ডেলা কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য গাই গুই করলো। ইসরাত ডেলার অস্বস্থি বুঝে নিজে থেকে জিজ্ঞেস করলো,”ভাবি কয়মাস চলছে আপনার?
ডেলা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো। ইসরাতের কথার উত্তর দিতে গিয়ে একটু সময় নিল ডেলা। তারপর নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল,” চার মাস চলছে। তোমার অবস্থা কেমন?
“যেমন দেখছেন! আর আপনার তো বাংলা দেখছি পার্ফেক্ট হয়ে গিয়েছে।
ডেলা হালকা হাসল। তারপর জিজ্ঞেস করলো,”আর জায়িনের….
কথাটা বলতে গিয়ে বার বার আটকে গেল ডেলা। ইসরাত স্বাভাবিক গলায় বলল,”জি উনার ও ভালো অবস্থা।
“কিছু মনে না করলে, আমি কিছু কি জিজ্ঞেস করতে পারি? একটু পার্সোনাল আর কি?
ইসরাত নির্লিপ্ত গলায় বলল,
” জি, জিজ্ঞেস করুন।
“তোমরা বাবু কবে নিবে? কোনো প্লানিং করেছো?
ইসরাত ঢোক গিলল। নুসরাত কেঁশে উঠলো। ইরহাম আর ইনায়া ঠোঁট চেপে হাসতে লাগলো। মমো বিবাহিত মানুষদের মাঝখানে বসে নিজেকে সিঙ্গেল পুওর মনে হলো। এখানে সবাই বিবাহিত, শুধু সেই অবিবাহিত।
ইসরাত স্বাভাবিক গলায় বলল,
” এখনো কোনো প্লানিং করিনি। ইনশাআল্লাহ শীগ্রই কিছু প্লানিং করবো।
নুসরাত উঠে দাঁড়ালো, ব্যঙের মতো লাফ দিয়ে। নুসরাত কে ব্যঙের মতো লাফ দিয়ে দাঁড়াতে দেখে মমো আর ডেলা নুসরাতের দিকে তাকালো। ইসরাত আর ডেলার দিকে তাকিয়ে চোখ বাঁকা করে নুসরাত বলল, “তোমাদের দু-জনের লজ্জা লাগছে না আমার মতো এক মেয়ের সামনে বসে বিবাহিত মহিলাদের মতো এডাল্ট কথা বার্তা ডিসকাস করছো। লজ্জায় তো আমার গাল লাল হয়ে গিয়েছে। নুসরাত গালে হাত দিয়ে বলল,” দেখো গাল কেমন গরম হয়ে গিয়েছে লজ্জায়?
নুসরাতের কথায় ফোঁড়ন কেটে পিছন থেকে আরশ বলল,
” কে মেয়ে? আমি তো মেয়ে কাউকে এখানে দেখতে পাচ্ছি না!
নুসরাত নিজের দিকে তর্জনী আঙুল তুলে ইশারা করে বলল, “এই যে আমি মেয়ে!
নুসরাতের কথায় পাত্তা না দিয়ে আরশ বলল,
” আমি তো এখানে কোনো মেয়ে দেখতে পাচ্ছি না? আমি শুধু দেখতে পাচ্ছি, চারজন নারীর মধ্যে এক রোগা মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন।
নুসরাত আরশের কথায় পাত্তা দিল না। ইরহাম আরশের কথা শুনে ঠোঁট চেপে হালকা শব্দ করে হেসে উঠলো। আরশ নুসরাতের থেকে কোনো পাত্তা না পেয়ে ডায়নিং টেবিলের দিকে চলে গেল। নুসরাত মমোর দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখ লজ্জায় আমার গাল হয়ে গিয়েছে! যা তো শালি আয়না নিয়ে আয় দেখি, গাল কেমন লাল হয়েছে? উপ্যানাসের নায়িকাদের মতো টকটকে কি হয়েছে? উপন্যাসের নায়িকারা লজ্জা পেলে তাদের গাল গোলাপ ফুলের পাপড়ির মতো লাল হয়ে যায় আমার ও কি হয়েছে?
ইরহাম নিজের কথা ঢুকিয়ে দিয়ে বলল,
” তোর গালতো লালের ল ও হয়নি।
নুসরাত বিস্ময় নিয়ে ব্যথিত গলায় বলল,
“সত্যি! কিন্তু গল্পের শ্যামলা নায়িকাদের তো লজ্জায় শ্যামলা গাল ও লাল হয়ে যায়। আমার কেন হলো না?
মমো আর ইরহাম এক সাথে গলা মিলিয়ে বলল,
” ৯৯.৯৯ পার্সেন্ট সত্যি, তোর গাল একটু ও লাল হয়নি।
নুসরাত হে হে করে হেসে উঠলো, সাথে মমো আর ইরহাম। এতক্ষণ যে ডং করছিল নুসরাত তা বুঝতে পারল ডেলা আর ইনায়া। ডেলা আর ইনায়া সিরিয়াসলি নিয়ে নিয়েছিল নুসরাতের কথা। ইনায়া ঘটনা বুঝতে পেরে হেসে সোফায় গড়াগড়ি খেল।
এর মধ্যে লাঠি ভর দিয়ে মেহেরুন নেছা এসে হাজির হলেন। ইনায়ার পিঠে হালকা গুতো দিয়ে বললেন,”কিগো তোর বোন তো সু-খবর দিয়ে দিল। তুই কবে দিবি?
ইনায়া লজ্জা পেয়ে মুখ লুকালো। নুসরাত প্রচন্ড কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,”তুমি জানতে দাদা, আশিক ভাইয়ের….
নুসরাত শেষের কথা না বলে দু-হাত হাত পেটের কাছে বেঁধে উপর নিচ করলো। মেহেরুন নেছা বুঝতে পারলেন না নুসরাত কি বলছে? যখন বুঝতে পারলেন তখন বললেন,
” ও তুই ওইটা বলছিস?
নুসরাত মাথা নাড়ালো।
“আরে আমরা সবাই জানতাম শুধু তুই, ইসরাত, জায়িন,জায়ান,আরশ আর ইরহাম ছাড়া! তুই ওতো জানতে পারতি, এখন অফিস চলে যাস বলে জানতে পারিসনি।
নুসরাত ব্যঙের মতো মুখ হা করে বলল,
” সবাই জানতো শুধু এই বাড়িতে থেকে আমিই জানতাম না কিছু! আজকাল বাড়ির অনেক বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞাতো হয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে নজর রাখতে হবে এখন থেকে চারিদিকে। অফিসে আর যাওয়া যাবে না। কতো ক্লাইমেক্স মিস হয়ে যাচ্ছে অফিসে যাওয়ার জন্য।
মেহেরুন নেছা মাথা নাড়ালেন। নুসরাত কিছুক্ষণ কিছু ভেবে বলল,”ট্রিট কই আমাদের? একে মিষ্টি খাওয়ালে না দুই ট্রিট ও দিলে না। ট্রিট না দিয়ে শু হয়ে যাবে তা তো হবে না। আমাদের ট্রিট চাই!
“টাকা দিয়ে দিব তুই সবাইকে রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে কিছু খেয়ে নিস।
নুসরাত ঠিক আছে বলে সকালের নাস্তা করার জন্য ডায়নিং টেবিলের দিকে চলে গেল। এর মধ্যে লিপি বেগম সকালের নাস্তা করার জন্য সবাইকে ডেকে পাঠালেন। আহান এসে সবাইকে নাস্তা করার জন্য ডায়নিংয়ে যাওয়ার জন্য বলল।
ডেলা পেটে হাত চেপে উঠে দাঁড়ালো। মাথায় ভালো করে ওড়না পেঁচিয়ে খাবার টেবিলের দিকে অগ্রসর হলো। ইনায়া লজ্জা নিয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল। বাড়ির বড়দের সাথে কুশল-বিনিময় শেষে সবাই খাবার খেতে বসল।
হেলাল সাহেব ডেলার দিকে ইশারা করে বললেন,
” ওকে ফ্রুটসের প্লেট এগিয়ে দাও?
ডেলা মিনমিনে গলায় বলল,
“আমি নিতে পারবো বড় মামা,আপনি ব্যস্ত হবেন না।
হেলাল সাহেব হাসলেন। ইসরাতের দিকে তাকিয়ে ধীরে জিজ্ঞেস করলেন, “পরোটা আরেকটা দিব?
ইসরাত মাথা নাড়িয়ে না করলো। হেলাল সাহেব কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন,”মুখ দিয়ে বলো,মাথা নাড়িয়ে বলা আবার কি?
” জি না!
নুসরাতের দিকে দৃষ্টি দিলেন। যে দুটো পরোটা প্লেটে নিয়ে আরাম করে শোয়ার মতো করে চেয়ারে বসে আছে। সবার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মুখে পরোটা পুরছে। তারপর ইরহামের সাথে ফিসফিস করে কিছু কথা বলছে। হেলাল সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, “নুসরাত মা!
নুসরাত নড়েচড়ে হেলাল সাহেবের দিকে তাকালো। চোখ বাঁকা করে হেলাল সাহেবের দিকে তাকাতেই তিনি বললেন,
” খাবার খাওয়া মন দাও, পটর পটর করা বন্ধ করো। গল্প করার অনেক সময় পড়ে আছে। লিপি ওকে আরেকটা পরোটা দাও!
নুসরাত মুখ কালো করে খেতে লাগলো। আরশের নুসরাতের রিয়েকশন দেখে মজা লাগলো। নুসরাতের পিছনে লাগতে, হাতে চিমটি কাটলো। নুসরাত আরশের দিকে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকালো। আরশ কিছু হয়নি এমন করে খেতে লাগলো। নুসরাত ঠাস ঠাস করে আরশের উরুতে দুটো থাপ্পড় মারল।
লিপি বেগম আড়চোখে নুসরাত আর আরশের দিকে তাকিয়ে সরে গেলেন। খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে সবাই হাত ধুয়ে ড্রয়িং রুমের উদ্দেশ্যে চলে গেল।
সময় বারোটা বেজে চুয়াল্লিশ মিনিট। অনেক্ষণ অপেক্ষা করার পর ইনায়া যখন দেখলো জায়ান নিচে নামছে না তখন ভ্রু বাঁকিয়ে তাকালো। নুসরাত, মমো আর ইরহাম একে অপরের সাথে বসে ফিসফিস করে কথা বলছে। কিছুক্ষণ পর পর চোরের মতো লোক দিচ্ছে। ইসরাতের সাথে ডেলা কথা বলছে। আশিক আরশের সাথে বাহিরের দিকে হাঁটতে বের হয়েছে। ইনায়া নুসরাতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,”জায়ান কোথায়? দেখতে পাচ্ছি না!
নুসরাত চোখ উপরের দিকে তুলে ঝাপটে জিজ্ঞেস করলো,”ভাবি ভাইয়া কোথায় আমরা কীভাবে জানবো? তাতো আপনি ভালো জানবে!
নুসরাতের কথায় লজ্জা পেল ইনায়া। মমো ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,”আরে ভাবি লজ্জা পাচ্ছেন কেন? আমরাই আমরাই তো! লজ্জা পাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
ইরহাম বলল,
“ভাবি ভাইয়ার কথা জিজ্ঞেস করতে লজ্জা লাগলো না। আর এখন দেখছি নুসরাত আপনাকে কথাটা বলতেই লজ্জায় লাল, নীল, সবুজ, হলুদ হয়ে যাচ্ছেন।
নুসরাত ফাজলামি করে সুর টেনে বলল,
” আপনি কি ভাইয়াকে দেখার জন্য ভিতরে ভিতরে তড়পাচ্ছেন। তাহলে তড়পাতে থাকেন, কারণ আপনি ভাইয়ার দেখা আজ পাচ্ছেন না ভাবি।
ইনায়া লজ্জায় মরিমরি অবস্থা। ইরহাম ইনায়াকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিল না। নুসরাতের কথার সুর ধরে বলল,”ভাইয়া তো আপনার অপেক্ষা দিন রাত আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাইয়া এখন আকাশের তারা হয়ে গিয়েছে ভাবি গো….
জায়ান দু-তলার রেলিঙের উপর হাত রেখে ইরহামের দিকে তাকিয়ে চঞ্চল গলায় বলল,”কে আকাশের তারা হয়ে গিয়েছে!
ইরহাম থতমত খেল। মমো আর ইরহাম দু-জন দু-জনের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো। নুসরাত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে শরীর ছেড়ে শুয়ে পড়ল। জায়ান কথার উত্তর না পেয়ে ইনায়ার দিকে তাকালো। ইনায়ার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি ফেলে বলল,”একটু আসোতো ইনায়া।
ইনায়া মুখ লুকানোর জায়গা খুঁজলো। জায়ান কথাটা বলে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। নুসরাত ইনায়াকে লজ্জা দিতে বলল,”যান ভাবি যান,আপনার ভাতার আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছে।
ইরহাম আর নুসরাত ব্যথিত গলায়,
“আজ কেউ নাই বলে!
দীর্ঘ শ্বাস ফেলল।
সামনের দিকে তাকিয়ে যখন দেখলো ইনায়া এখনো সামনে বসে আছে নুসরাত ভ্রু বাঁকাল। ইনায়াকে কিছুটা আদেশের স্বরে বলল,” আমার ভাশুর আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছে তাড়াতাড়ি যান মেজ ভাবি। নাহলে টেম্পারেচার হাই হয়ে যাবে।
ইনায়া উঠে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল। লজ্জায় চোখ মুখ কান লাল হয়ে গিয়েছে। শুভ্র বর্ণের হওয়ায় একটু বেশি লাল হয়ে যাওয়া মুখ নাক গাল বোঝা গেল। নুসরাত ইনায়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ইসরাতের দিকে তাকালো।
ইসরাত আর ডেলা নিচু স্বরে গল্প করছে। নুসরাত ইসরাতের আর ডেলার কথা শোনার জন্য কান পাতলো। যখন তাদের আলোচনার বিষয় বস্তু শুনল চোখ মুখ কালো করে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। নুসরাত কে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াতে দেখে ইসরাত চোখ মুখ উল্টে নিল।
নুসরাত ফাটা বাঁশের মতো চিৎকার করে বলল,
“আমাদের মতো অবিবাহিত সিঙ্গেল কমিটির মেম্বারদের সামনে বসে তোমরা দু-জন আবার বিবাহিত মহিলাদের মতো কথা বলছো।
ইরহাম উঠে গেল। নুসরাত কখন কি বলে দে? পরে সে মেয়েদের মধ্যে বসে একাই লজ্জা পাবে। তাই এখনি পালিয়ে যাওয়া উত্তম।
ডেলা অবাক হয়ে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ” কি শুনেছো তুমি?
নুসরাত লজ্জা সরম উড়িয়ে বলল,
“ওই তো বলছিলে স্বামী স্ত্রী সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছে কিনা?
ডেলা মুখ ব্যঙের মতো হা হয়ে গেল। ইসরাত চোখ-মুখ অন্ধকার করে নুসরাতের দিকে তাকালো। এতো জোরে বলার কি প্রয়োজন ছিল? ধীরে কথা বলতে পারে না এই মেয়ে।
ইসরাত সতর্ক গলায় নুসরাত কে শাসিয়ে নিল। চোখ রাঙিয়ে আদেশ করলো,” ধীরে কথা বলো? আমরা কেউই এখানে কম শুনিনা।
“ধীরে কথা বলবো কেন? আমার গলা যেমন আমি সেরকম কথা বলবো?
আরশ আর আশিক দূর থেকে দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনছিল। আরশ এবার রাশভারী গলায় বলল,” তুই তো ফাঁটা বাঁস। ফাটা কলসি বাজে বেশি তুই ও সেরকম? নিজেকে অবিবাহিত আর সিঙ্গেল দাবি করতে তোর বিন্দুমাত্র লজ্জা লাগে না।
নুসরাত দু-পাশে মাথা নাড়িয়ে আরশের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে বলল,”জি না আমার বিন্দুমাত্র লজ্জা লাগে না। আমি যদি আরো চারটে প্রেম আর দুটো বিয়ে করি তাহলে আমার রিলেশন সিপ স্টেটাস একটাই থাকবে আই এম অলওয়েজ সিঙ্গেল।
এদিকে সিঙ্গেল মমো চোখ-মুখ কালো করে সবার দিকে তাকিয়ে থাকলো। কারণ এখানে সবাই বিবাহিত! আর সে নাম্বার ওয়ান সিঙ্গেল প্লাস অবিবাহিত !
আরশ রাগী চোখে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। নুসরাত আরশের তাকানো একদম পাত্তা দিল না। আবার কান পাতল ডেলা আর ইসরাতের কথা শোনার জন্য।
রাত এগারোটা মমো,ইনায়া,ডেলা,আশিক বিদায় নিচ্ছে। লিপি বেগম থেকে যাওয়ার জন্য বলছেন। আগামীকাল সকালে উঠে চলে যাবে। কিন্তু, আশিকের এক কথা সেই তো সকালে চলে যেতে হবে তাহলে এখন থেকে কি লাভ হবে? অগত্যা বিদায় নিয়ে সবাই গাড়িতে উঠে চলে গেল। ইনায়া যাওয়ার সময় বার বার জায়ানের দিকে ফিরে তাকিয়ে তাকিয়ে গেল।
রাত বারোটা বেজে চল্লিশ মিনিট।
নুসরাত রুমের দরজা জানালা লাগিয়ে চোরের মতো এদিক সেদিক উঁকি ঝুঁকি মারতে লাগলো। ইসরাত নুসরাতের চোরের মতো বিহেভিয়ার দেখে কপালে ভাঁজ ফেলে নুসরাতের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো।
“কি হয়েছে? এরকম চোরের মতো বিহেভিয়ার করছিস কেন?
নুসরাত সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল,
” ফ্রান্স থেকে কি নিয়ে এসেছিস আমার জন্য?
ইসরাতের নির্লিপ্ত গলার আওয়াজ,
“কিছু আনিনি!
নুসরাত ভেংচি কাটলো।
” এ্যাঁ বললেই হলো!
” হ্যাঁ হলো।
নুসরাত গালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
“যাওয়ার সময় তুই দুটো লাগেজ নিয়ে গিয়েছিলি। আর এখন নিয়ে আসছিস চারটে। তার মানে তুই জম্বেশ জিনিস নিয়ে এসেছিস! লাগেজের চাবি দে।
ইসরাত নির্লিপ্ত গলায় বলল,
” নেই!
নুসরাত রুমের দরজা খুলে দৌড় দিল। ইসরাত ভ্রু বাঁকিতে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকল। পাঁচ মিনিট পর নুসরাত ছুটে রুমে এসে দরজা লক করে দিল। নুসরাতের হাতের দিকে তাকাতেই ইসরাতের চক্কু চড়কগাছ হয়ে গেল। লাগেজের তালা খোলার জন্য নুসরাত হাতুড়ি নিয়ে এসেছে স্টোর রুম থেকে। ইসরাত বিস্ময় কাটিয়ে নুসরাতের দিকে তাকাতেই দেখলো হাতুড়ি দিয়ে তালা পিটিয়ে ভেঙে ফেলেছে। চেইন খুলে লাগেজের ভিতরে তাকাতেই নুসরাতের চোখ মুখ হা হয়ে গেল। ইসরাত লাগেজ ভর্তি ব্রান্ডের ব্যাগ আর জুতো নিয়ে আসছে। সেন্ট লরেন্টের হাই হিল নুসরাত হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো এর প্রাইজ কত?
ইসরাত শান্ত গলায় বলল,
“৮০০টাকা!
নুসরাত ভ্রু উচিয়ে বলল,
” আটশত টাকা মিন আটশত ইউরো।
“হু!
” বাংলার টাকায় কত হয়?
নুসরাত নিজেই গণল হাতের মধ্যে। চোখ মুখ বড় বড় করে বলল,” নব্বই হাজার টাকা এর দাম!
ইসরাত ওইরকম বলতেই, নুসরাত অজ্ঞান হওয়ার মতো চোখ বন্ধ করে শীতের মধ্যে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। ইসরাত বলল,”আরে আরে কি করছিস?
“এতো টাকা দিয়ে তুই এই বালের জুতা কিনে এনেছিস?
” বালের জুতা কেন বলছিস? জুতোটা কত্ত সুন্দর!
নুসরাত ধীরে ধীরে সব বের করে দেখলো। তার পছন্দ মতো কোনো জিনিস খুঁজে পেল না। ইসরাত ব্যগি প্যান্ট চারটে নিয়ে এসেছে। চারটে কার্গো প্যান্ট, আর স্লিপার নিয়ে আসছে।
নুসরাত আরেকটা লাগেজ খুলতেই সেখান থেকে খাবারের জিনিস বের হলো। বিভিন্ন ধরণের চকলেট , কিটকাট,আমুল ডার্ক চকলেট,ডাব,কিন্ডার বয় নামা, ডেইরি মিল্ক, পির্ঙ্গেল’স,লেইস,আরো অনেক চকলেট চিপস্। নুসরাত লাগেজের চেন বন্ধ করে পরের লাগেজ খুলতে নিবে ইসরাত বলল,”আব্বু, চাচ্চু, ফুফু, ভাইয়া আর আম্মুদের জন্য ওটায়? তোর কোনো জিনিস নেই ওখানে।
নুসরাত তবুও খুলল। লাগেজের ভিতরে প্যাকিং করে রাখা সবার জিনিস আলাদা আলাদা ভাবে। যার যার জিনিসের প্যাকেটের উপর যার যার নাম লেখা। আরশের জন্য কিনা শার্ট ইসরাত এক কোণায় আরশ ভাইয়া লিখে প্যাকিং করে রেখেছিল। নুসরাত আরশ লেখা দেখে আরশের প্যাকেট খুলল। খুলে আরশের জন্য রাখা কাপড় বের করে দেখতে লাগলো। আরশের জন্য রাখা কাপড় গুলো নুসরাতের পছন্দ হলো। ইসরাত কে উদ্দেশ্য করে বলল, “এই তুই যেগুলো কাপড় আরশের জন্য নিয়ে এসেছিস ওইগুলো আমার পছন্দ হয়েছে? আমি নিয়ে নিয় কাপড় গুলো?
ইসরাত বলল,
” নিয়ে নে? আমি ভাইয়াকে নতুন কিনে দিব?
“আর আমাকে?
” যা দিব কিনে? এখন লাগেজ গুছিয়ে এসে ঘুমা।
রাত তিনটে,
নুসরাত নিশাচর প্রাণীর মতো এদিক থেকে ওদিক পায়চারি করছে। হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠতেই নুসরাত ভ্রু বাঁকিয়ে মেইন দরজার দিকে তাকালো। এই অসময় আবার কে এলো ভেবে নুসরাত নিচ তলার দিকে অগ্রসর হলো। দরজার হতে দু-হাত দূর থেকে প্রস্তুতি নিল হুডির হাতা গুটিয়ে। আবার কলিং বেল বাজতেই নুসরাত দরজার ওপাশের ব্যক্তিকে গালি দিল “আরে চুথমারাউনা দাঁড়া দরজা খুলছি। এতো কলিং বেল বাজাচ্ছিস কেন? মানুষ ঘুমিয়ে আছে! তোর মতো বালের জন্য রাতের বেলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ অপেক্ষা করছে না। দাঁড়া বাপ আমার, খুলছি দরজা আমি। কলিং বেলের উপর থেকে হাত সরা বাপ আমার।
প্রিয় প্রণয়িনী পর্ব ৫২
নুসরাত মেইন দরজা খুলল খুবই সতর্কতার সহিত। দরজার ওপাশের ব্যক্তিকে দেখে অবাক হলো। কিন্তু অবাকতা গিলে নিয়ে চোখ মুখ তীক্ষ্ণ করে তাকিয়ে রইলো দরজার ওপাশের ব্যক্তির দিকে।
দরজার ওপাশের ব্যক্তি রাশভারী গলায় বলল,
” ভিতরে ঢুকবো! দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়াও।
