Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪০ (৩)

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪০ (৩)

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪০ (৩)
জান্নাত নুসরাত

ইসরাত ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে হাতের তোয়ালি দিয়ে আলগোছে মুখ মুছে নিয়ে সামনের মিররের দিকে অগ্রসর হলো, যেতে যেতে কাউচের উপর সামান্য ভিজে তোয়ালিটা রেখে দিল৷ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে চিড়নি চালাতে চালাতে একবার চোখ তুলে তাকাল পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা জায়িনের দিকে। জায়িন রুমে প্রবেশ করার পর থেকে এমনই দাঁড়িয়ে আছে। এবার ইসরাত ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল,”কী হয়েছে? খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ”

জায়িন কথা বলল না। অবিচল দৃষ্টি সামনে স্তম্ভিত রেখে এক-পা দু-পা করে এগিয়ে ইসরাতের সন্নিকটে দাঁড়াল। সম্মুখে প্রশ্নাত্মক চেহারা নিয়ে দাঁড়ানো ইসরাতের কথার উত্তর না দিয়ে আলগোছে বাহু ধরে ওপাশ ফিরিয়ে দিল। গম্ভীর মুখে তখন নমনীয়তা দোলা দিচ্ছে। ব্রাশ করে রাখা চুলগুলো পিঠের উপর থেকে আলগোছে সরিয়ে দিয়ে সামনে সেট করে রাখল। মেয়েলি ঘাড় হতে চোখ তুলে সামনের দর্পনে তাকাতেই প্রতিবিম্বের সাথে চোখাচোখি হলো। পকেট হাতড়ে বুশরঁ ব্রান্ড এর পেন্ডেন্ট বের করল জায়িন। তা ধীরে ধীরে মেয়েলি গলায় পরিয়ে দিয়ে লহু সুরে উচ্চারণ করল,
”দিজ পেন্ডেট ইজ মেইড ফর ইউ রেই..!”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

কথা শেষে ইসরাতের চুলের ভাঁজে শব্দ করে চুমু খেল। ইসরাত এতক্ষণ যাবত গলায় ঝুলানো হোয়াইট ডায়মন্ডের পেন্ডেন্টটা দেখছিল, জায়িনের কথায় সামান্য নড়ে উঠল সে। চোখ তুলে তাকাতেই আবারো চোখাচোখি হলো। জায়িন ইসরাতের বাহু ধরে নিজের দিকে ফিরাতে ফিরাতে চমৎকার হাসল। শুধাল, ”ভালো লেগেছে?”
ইসরাত মুখ ফুটে কিছু শব্দ ব্যয় করার আগেই জায়িন বলে ওঠল ,
”ভালো না লাগলে কোনো কিছু করার নেই, আপনাকে আমার চিহ্ন বয়ে বেড়াতে হবে। এটা আপনি আমার তার প্রমাণ বহন করবে।”

জায়িন ঝুঁকে ইসরাতের কপালে চুমু খেতে যাবে ইসরাত দু-পা পিছিয়ে গেল। আকস্মিক বাঁধা দেওয়ার কারণ জায়িন খুঁজে পেল না। কপালে সামান্য ভাঁজ ফেলে জানতে চাইল,
”সমস্যা কী?”
কথা শেষ করে এগিয়ে আসলো ইসরাতের সম্মুখে, দু-হাতে বাহু চেপে ধরতে যাবে ইসরাত আবারো সরে গেল দূরে। জায়িন এবার সামান্য বিরক্ত হলো, শুধাল,”ইসরাত, সমস্যা কী বলবেন আমায়?”
ইসরাত ভ্রু যুগলের মাঝে ভাঁজ ফেলে বলে,
“আমাকে বলার সুযোগ দিলে তো আমি বলব।

জায়িন বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে শুধাল,
“আমার স্পর্শ খারাপ লাগছে?”
ইসরাতের সহজ গলা,
“জ্বি না..!”
জায়িন কপালের মধ্যিখানে ভাঁজ ফেলে, গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করল,”অস্বস্তি হচ্ছে?
ইসরাত এবারো না বোধক মাথা নাড়িয়ে বলল,
“জ্বি না..!”
বিরক্ত কন্ঠে জায়িন জানতে চাইল,
“তাহলে সমস্যা কী?”

ইসরাতের নিরুদ্বেগ কন্ঠেস্বর,
“আমার দেনমোহর আপনি এখনো আদায় করেননি। ”
কথা শেষে মেয়েলি কোমল হাত বাড়িয়ে দিল পুরুষালি দেহের সম্মুখে। বলে ওঠল,
“দেনমোহর দিন..!”
জায়িন পকেট হাতাল, না কিছুই নেই। ইসরাতের দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বলে ওঠল, ”আগামীকাল দেই?”

ইসরাত ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“এক্ষুণি চাই, দেনমোহর দিন, নাহলে স্পর্শ করার অনুমতি দিব না।”
জায়িন শ্বাস ফেলল ইসরাতের পানে দৃষ্টি নিবিষ্ট করে। বিরস কন্ঠে বলল,
”দিচ্ছি দেনমোহর। ”
ইসরাত ভ্রু উচিয়ে শুধাল,
“এখন টাকা কোথায় পাবেন আপনি?

জায়িন ইসরাতের দিকে তেরছা চোখে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,
”আমি তো ফতুর, টাকা পাব কোথা থেকে, সঠিক আপনার কথা, সত্যিতো টাকা পাব কোথা থেকে..!”
জায়িন গালে হাত দিয়ে মেকি ভাবনার ভান করল। ইসরাত জায়িনের বাহুতে ঘুষি মেরে বলে ওঠল,”নাটক কম করুন।”

জায়িন ইসরাতের হাত মুঠিতে চেপে ধরে নাইটস্টেন্ডের দিকে পা বাড়াল। ড্রয়ার খুলে টাকার চেক বের করতে করতে শুধাল,”কতটাকা দেনমোহর আপনার?”
ইসরাত হিসাব করল, করা শেষে বলে ওঠল,
“এভাবে ধরলে তো দশ লাখ, এর আগে বিয়ে করেছিলেন তখনো দশ লাখ ছিল, তাহলে এভাবে-অভাবে বিশ লাখ হয়।”
জায়িন ইসরাতকে উল্টাপাল্টা হিসেব দিতে দেখে বলে ওঠে,
“এভাবে অভাবে ধরে যতটাকা হয় বলুন।”
“এভাবে অভাবে ধরলে বিশ লাখটাকা হয়,আপনি চাইলে ত্রিশ-চল্লিশ লাখটাকা দেনমোহর দিতেই পারেন… ”

ইসরাত শেষের কথা এমনি বললেও জায়িন তা সিরিয়াস হিসেবে নিল। মুখের কথা মাটিতে পড়ার পূর্বেই বল পয়েন্ট কলম দিয়ে ছোট ছোট অক্ষরে টাকার এমাউন্টে বসিয়ে দিল চল্লিশ লাখ টাকা..! নিজের সিগনেচার দেওয়া শেষে বাড়িয়ে দিল চেকখানা ইসরাতের দিকে, বলে ওঠল,
”দেখে নিন এমাউন্ট ঠিক আছে কিনা..!”

জায়িনের বাড়ানো হাত থেকে চেক হাতে নিতেই ইসরাতের চোখ দুটো রসগোল্লার ন্যায় বড় বড় হয়ে গেল। বিমূর্ত নেত্র চেক থেকে তুলে সামনের ব্যক্তির দিকে স্থির করে বিস্ময়পূর্ণ কন্ঠে জানতে চাইল,
”আপনি পাগল, চল্লিশ লাখ টাকা দিয়ে দিয়েছেন?”
জায়িনের অবাক কন্ঠস্বর,
“আপনি না বললেন চল্লিশ লক্ষ টাকা, তাহলে…”

জায়িনের কথা কেটে দিয়ে ইসরাত বলল,
“তাই বলে চল্লিশ দিয়ে দিবেন!”
“এসব ছাড়ুন, দেনমোহর আদায় করা শেষ,কাছে আসুন!”
ইসরাত ঠোঁট নাড়িয়ে দুটো শব্দ ব্যয় করার পূর্বেই জায়িন ঝড়ের গতিতে কাছে চলে আসলো তার। ঠোঁটে আঙুল চেপে হিসহিসিয়ে বলে ওঠল,
”উঁহু, আর কোনো কথা নয়, দেনমোহর আদায় করা ফেলেছি আর কোনো কথা শুনতে চাই না।”

পরের কয়েক সেকেন্ড কাটল ঘোরে, জায়িন একহাতে সুইচ টিপে বাতি অফ করল, অন্যহাতে কাছে টেনে নিল নিজের নতুন বধুকে। ইসরাতের পিঠ ঠেকল গিয়ে তুলতুলে বিছানায়, চোখ তুলে তাকাতেই জানালা দিয়ে আসা পূর্ণিমার হলদেটে আলোয় চোখাচোখি হলো নিজের সানিধ্যে থাক জায়িনের সাথে। জায়িন একহাতের আঁজলায় ইসরাতের গাল চেপে ধরে কপালে ঠোঁটের পরশ বোলাল। মৃদু সুরে কানের কাছে শুধাল,
”অস্বস্তি হচ্ছে?”

জায়িন কথা শেষে ইসরাতের ঠোঁটের দিকে আগাতেই ইসরাত বাঁধা দিল। দ্বিধাযুক্ত নেত্র জায়িনের পানে নিবিষ্ট করে বলে ওঠল,
”জায়িন আমার ভয় লাগছে।”
জায়িন হাসল, বলল,
“ভয় পাবেন কেন, আমি আছি তো আপনার সাথে!”
ইসরাত দু-পাশে মাথা নাড়াল। জায়িনকে বোঝাতে বলল,
’”আমি আপনাকে ভয় পাচ্ছি।”

জায়িনের শ্রবণে কথাটুকু ঢুকতেই থমকাল সে, বিমূড় বিহ্বল কন্ঠে শুধাল,
”কেন, আপনি আমায় ভয় পাচ্ছেন কেন ইসরাত? ”
ইসরাত জায়িনের দিকে তাকিয়ে শীতিল কন্ঠে বলল,
“আমার সময় চাই।”

ইসরাতের ধারণা ছিল তার কথাটুকু শুনতেই জায়িন দূরে সরে যাবে, রাগ করে চেচামেচি করবে, এমন অবস্থায় থাকলে যে কেউ করত কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে জায়িনের নমনীয় হাসি স্বর রুমের চার দেয়ালে ঘুরে বেড়াল, পুরু কন্ঠ ভেসে আসলো,
”এটা বলতে এত ভয় পাচ্ছিলেন?”

ইসরাত দেখল গম্ভীর শুভ্র মুখের লোকটার হাসি তাকিয়ে থেকে, যার হাসির ধমকে চোখের নিচের চামটা কুঞ্চিত হয়েছে। শুভ্র চেহারার পুরুষালি গাল দুটো টকটকে হয়ে উঠছে সময়ের সাথে। জায়িন সময় নিয়ে হাসল শব্দ তুলে, ধীরে ধীরে শব্দ কমে আসলেও ঠোঁটের কোণ থেকে হাসি রেশ কমল না। শব্দ করে ইসরাতের গালে চুমু খেল। ইসরাতের দেহ নিজের বুকের উপর টেনে নিয়ে চুলের ভাঁজে খেল শব্দ করে আরেকটা চুমু। ইসরাত জায়িনের বাহুবন্ধনীর ভেতর থেকে মাথা তুলে শুধাল,
”রাগ করেছেন?”

ইসরাতের প্রশ্নের বিপরীতে জায়িন প্রশ্ন করল,
“আপনার কী মনে হয়?”
ইসরাত সহজ কন্ঠে বলে,
“আপত দৃষ্টিতে দেখলে মনে হয় রাগ করেননি, কিন্তু একটু ভেতরে গিয়ে খোঁচালে হয়তো জানা যাবে রাগ করেছেন নাকি না!”
ইসরাতের কথায় আবারো হাসল জায়িন। ইসরাত বিগলিত গলায় আবার বলল,
”আপনার জায়গায় অন্যকেউ থাকলে রাগ করত।”

জায়িন এতে সামান্য নারাজ হলো। নিজের ভেতর নারাজি চেপে রেখে বলে ওঠল,”আমার জায়গায় অন্যকেউ বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছেন আপনি?
ইসরাত চোখা দৃষ্টি জায়িনের দিকে নিবদ্ধ করে বলে,
“সামান্য এই কথায় পুড়ছেন ব্রো, নট বেড..!”

পিনপতন নীরবতা! গোল চক্রাকারে বসা পরপর চারটে মানুষের ঘনঘন নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে বদ্ধ কামড়ায়। মাঝখানে রাখা মোমের আলোয় দেখা গেল নুসরাত একহাতে নিজের গাল চেপে ধরে বসে আছে থম মেরে। ইরহাম, আহান, মমো একইভাবে সবাই থমকানো নয়নে নুসরাতের দিকে দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে। সকলেরই মুখে অবাকতার লালিমা পরিলক্ষিত। কেউই আন্দাজ করেনি এমন কিছু হবে, হুট করে কী থেকে কী হয়ে গেল! নুসরাত গুণে গুণে গত আধঘন্টা যাবত গালে একহাত রেখে বসে আছে। মুখের ভাব গতি স্বাভাবিক, কিন্তু এক জায়গায় কখন থেকে বসে থাকাটা অস্বাভাবিক ঠেকছে সকলের নিকট। দমকা হাওয়া জানালা বেয়ে রুমে প্রবেশ করতেই নুসরাত নড়েচড়ে উঠল। একই জায়গায় গাটি গেড়ে বসার তখন সময় ছিল ত্রিশ মিনিট আটচল্লিশ সেকেন্ড, হঠাৎ করে চোখ মুখ অন্ধকার করে অস্পষ্ট স্বরে আওড়াল,
”ওই খবিশ আরশ চুমু খেয়ে নিয়েছে আমাকে! শালা লম্পট, বদমাশ, ইতর, অসভ্য, কুত্তা, পাটা..!”

ইরহাম নুসরাতের অস্পষ্টে স্বরে উচ্চারণ করা গালি গুলো খুব সহজে বুঝে নিল। রুমের মেঝেতে রাখা মোমবাতি হাতে নিতে যাবেই, তার পূর্বে অন্য একটা হাত এসে মোমবাতি নিজের হাতে তুলে নিল। খোলা জানালার কপাট বেয়ে তখন সনসন বাতাস বইছে, রাতের অন্তিম প্রহরের ঠান্ডা হীম শীতল করা হাওয়া। পুরো রুমজুড়ে ব্ল্যাকবেরি এর মিষ্টি গন্ধে ছেয়ে গেছে, সাথে পুরুষালি শরীরের মাস্কি কুস্তুরির সুগন্ধি। বেসামাল বাতাসে প্রায় নিভু নিভু মোমের জ্যােতি! প্রকান্ড জুড়ে কোথাও একটা বাজ পড়ার সাথেই, পুরো রুম রক্তবর্ণের লাল হয়ে গেল। মমো চিৎকার করে উঠে যাকে কাছে পেল তাকেই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল। আহান নিজের পাশে বসা ইরহামকে জড়িয়ে ধরে বিড়বিড়িয়ে পড়ল,
”লা হাওলা কুয়াতা ইল্লা বিল্লা হিল আলিউল আজিম..!”

ঝনঝন শব্দে বৃষ্টি পড়ছে তখন লাগাতার বাহিরে। প্রকান্ড জোরের বাজ পড়ার শব্দ ভেদ করে নুসরাতের কানের কাছ দিয়ে বয়ে গেল পুরুষালি লুহু স্বর,
” জাস্ট একটা চুমু গালে খাওয়ায় আপনি গুণে গুণে ত্রিশ মিনিট আটচল্লিশ সেকেন্ড নিশ্চুপ ছিলেন, তাহলে আমার উচিত নয় কী প্রতিদিন চব্বিশঘন্টায় আটচল্লিশটা করে চুমু খাওয়া?”

নুসরাত বিরক্তিতে ভ্রু গোছাল, হিসহিসিয়ে বলে ওঠল,
”আর একটা চুমু খাওয়ার ধান্দা করলে ঠোঁট কেটে কাকড়াকে দিয়ে দিব!”
“ওহ তাই নাকি?”
আরশ নুসরাতের দিকে কাঁধ বাঁকিয়ে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল প্রশ্নটা। নুসরাত গাম্ভীর্যের সাথে বলে ওঠল,“জ্বি হ্যাঁ, তাই!”

আরশ গাল ঠেলে ঈষৎ বাঁকা হাসল। চোখ-মুখে তখন দু্‌ষ্টুমি খেলা করছে। নুসরাতের কথা বলা শেষ হতেই আলগোছে দ্বিতীয়বারের মতো গালে চুমু খেল। সন্তর্পণে সরে আসতে আসতে মৃদু স্বরে নুসরাতের কানের নিকট নিজস্ব ভঙ্গিমায় বলে ওঠে,
”তুমি কিছুই করতে পারবে না নুসরাত নাছির, তোমার উপর আমার সবথেকে বেশি অধিকার, রিমেম্বার দ্যাট ইউ আর মাই ওয়াইফ, লিগ্যাল ওয়েডেড ওয়াইফ! ”

রিসিপশনের আয়োজনে সকলেই ব্যস্ত। ডেকচির আওয়াজ ভেসে আসছে সৈয়দ বাড়ি থেকে দূরে খালি প্লট হতে। নাছির মঞ্জিলের সামনে পার্কিং করে রাখা গাড়িগুলো আজ সরানো হচ্ছে সেখান থেকে। ইভেন্ট মেনেজমেন্ট এর লোকেরা রিসিপশনের ভেন্যু সেট করছে, আর তদারকিতে আছে আরশ, ইরহাম, আহান, এমনকি বর নিজেও! কিছুক্ষণ পরপর শোনা যাচ্ছে নুসরাতের গলা ফাটানো চিৎকার ‘’এভাবে না করে এভাবে করুন’’ বলে শাসাচ্ছে। অনেকক্ষণ চিৎকার করে যখন নিজের ইচ্ছা অনুসারে কাজ সম্পাদন করাতে পারল না নুসরাত, তখন নিজেই লোকটাকে নিচে নামিয়ে উঠে দাঁড়াল মইয়ের উপর। সুন্দরমতো কাচা ফুলগুলো ডাবল সাইডেড টেপ দিয়ে আটকে দিয়ে লাফিয়ে নিচে নেমে এলো। হাত ঝেড়ে বলে ওঠল,
”এভাবে লাগাতে হয় ফুল, বুঝেছেএএএ”

নুসরাত কথা শেষ করতে পারল না, তার সামনে দাঁড়ানো সটান দেহি আরশ ঝুঁকে আসলো নিচের দিকে, সুগভীর কন্ঠস্বরে বলে ওঠল,
”না বুঝিনি, বুঝিয়ে বলুন প্লিজ!”

নুসরাত আরশের কথা কানে তুলল না, একপ্রকার দৌড়ে ওই স্থান থেকে পালাল। বিড়বিড় করল এমনভাবে দূরে দাঁড়ানো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এর ম্যানেজার শুনে ফেলল তার বিড়বিড়িয়ে বলা কথাটুকু। সে বলছে
,”আরশ ভাইয়ের মাথা খারাপ হয়ে গেছে, এই ব্যাটা তো ইমরান হাসমিকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে অসভ্যতায়।”

দিনটুকু কেটে গেল ব্যস্ততায়৷ সকালের পর আর নুসরাতের দেখা পেল না আরশ। তার থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে থাকল সে। সন্ধ্যার সময় থেকে শুরু হলো বাহির থেকে আনা বাবুর্চিদের রান্নার তোড়জোড়। কিছু মহিলাদের আনা হলো পেঁয়াজ, রশুন, আদা ভাটার জন্য। বাড়ির মহিলারা ও তখন হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দিচ্ছিল সবাই। রিসিপশন শুরু হলো সন্ধ্যা আজান শেষ হতেই। পেস্টেল ব্লু কালার গ্রাউন পরিহিত ইসরাতকে যখন ভেন্যুতে নিয়ে আসা হলো তখন রঙবেরঙের আলোয় য়াকে অপ্সরার মতো সুন্দর লাগল। বংশীয়, ঐতিহ্যে গৌরভপূর্ণ মানুষের ভেতর এক আলাদা আলোজসজ্জার সৃষ্টি হলো। জায়িনের পরণে তখন স্যুট কোট, পুরুষালি চাপদারি বিশিষ্ট মুখটা থেকে অস্বৈগিক জৌতি ছড়াচ্ছে। সুন্দর করে ব্রাইড গ্রুমকে ওয়েলকাম করা হলো ভেন্যুতে। বাফেটে যেমন খাবার সাজানো থাকে তেমনি একপাশে সুন্দর মতো করে সাজানো হলো খাবার। দূর হতে তখন বাতাসে ভেসে আসছে বিরিয়ানির খুশবু! অনুষ্ঠান যখন শুরুর দিকে তখনই বাঁধল বিপত্তি, দেখা গেল টিস্যুর কমতি, সাথে বিদ্যুতের সমস্যার জন্য বারবার আলো জ্বলছে নিভছে। টিস্যু আনার জন্য নাজমিন বেগম পাঠাতে চাইলেন আহানকে, সৌরভি আগ বাড়িয়ে বলে ওঠল,
”আমি নিয়ে আসছি।”

সকলে মাথা নাড়িয়ে সায় দিল টিস্যু আনতে যাওয়ার জন্য, এর মধ্যে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে চাইলেন নিজাম শিকদার। নাতনীকে চোখ রাঙিয়ে বাঁধা দেওয়ার প্রচেষ্টা করলেন, সৌরভি সেসবের তোয়াক্কা না করে হেলে দুলে দ্রুত পদক্ষেপে অগ্রসর হলো নাছির মঞ্জিলের উদ্দেশ্যে।

রাত আটটা থেকে বিদ্যুতের সমস্যা দেখা দিয়েছে নাছির মঞ্জিলে, এত জ্বালাতন করছে কেন আজ তার কারণ কেউই খুঁজে পেল না। নুসরাত মনে করল মেইন সুইচ এ তারে কোনো সমস্যা দেখা দিয়েছে, তাই নিজেই মেইন সুইচ চেক করতে লেগে পড়ল। ইরহামকে নাছির মঞ্জিলে যাওয়ার কথা বললে সে সাফসাফ না করে দিল, সে যাবে না, কিন্তু নুসরাতের জোরাজুরিতে হার মেনে যেতে বাধ্য হলো, তারপরও শুনতে হলো নুসরাতের কান ঝাঁঝানো কথা ,”যা শালা, মেইন সুইচে সমস্যা দেখা দিচ্ছে স্ক্রু ডাইভার নিয়ে আয়, পরে ব্লাস্ট হয়ে যাবে, দেখি খুঁতিয়ে মেইন সুইচে কী সমস্যা!

ইরহাম নুসরাতকে বোঝাতে পারল না যে মেইন সুইচে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু নুসরাত বুঝতে যেন চায় না, কানে তুলো গুজে বলল,
”যেতে বলছি না তোকে, যাবি তুই?”

ইরহাম নাক ছিটকে নাছির মঞ্জিলের ভেতর যেতে যেতে সতর্ক কন্ঠে আওড়ায়,
“পন্ডিতি করবি না একদম আমি না আসার আগ পর্যন্ত, পরে দেখা যাবে পুরো ভেন্যুর আলো চলে গেছে। ”
নুসরাত অহংকার দেখিয়ে বলে,
“আমাকে একদম নেগলেট করবি না ইরহাম। আমি সব পারি, এই নুসরাতের বাঁ-হাতের খেল কারেন্টের জিনিস ঠিক করা।”

“হো বইন, এটা তো গাড়ির চাকা তুমি একটা খুলে আরেকটা লাগাই দিলা।”
নুসরাত বিরক্ত হয়ে খ্যাক করে উঠল। বলল,
“ জ্ঞান না ঝেড়ে স্ক্র-ডাইভার নিয়ে আয়!”
ইরহাম যেতে যেতে আবারো সতর্ককীরণ দিয়ে গেল,
“পন্ডিতি করবি না বলে দিলাম।”

নুসরাত ইরহামের কথা শোনার পাত্রি, সে চোখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে মেইন সুইচ লক্ষ করল। অনেকক্ষণ যাবত লক্ষ করল কোমরে হাত দিয়ে, ইরহামের অপেক্ষায় হাফসাফ করল,না আসলো না ইরহাম৷ ইরহামকে মেসেজ দিল, সে রিপ্লেতে বলল,
”আসতেছি ভাই, পুরো বাড়ি অন্ধকার করে রাখা, আর ওই বুয়ারা ও আসর জমাইছে বাড়ির বাহিরে, ওদের পাশ কাটিয়ে যেতে সময় লাগছে।”

নুসরাত লিখল,
“তুই ওদের সাথে ফ্লার্ট শুরু করেছিস, সেটা বল না?”
ইরহাম মুখ মোচড় মারার ইমোজি পাঠাল। টাইপিং করল,”তোর মতো পাইলি!”

এরপর আর নুসরাতের মেসেজ দেখল না মোবাইলের সাইড টিপে বন্ধ করে দিল। ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে ড্রয়িং রুমে সুইচ টিপে লাইট জ্বালাল। ধীর পায়ে অগ্রসর হলো স্টোর রুমে। স্টোর রুমের ভেতর পা রাখতেই সৌরভির সাথে চোখাচোখি হলো। কেউ কাউকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠল। সৌরভি দু-হাতে টিস্যু নিয়ে যখনই অগ্রসর হলো সামনের দিকে তখনই পুরো স্টোর রুমসহ বাড়ি অন্ধকারে ডুবে গেল। হঠাৎ এমন আলো নিভে যাওয়া অবাক হলো স্টোর রুমে অবস্থানরত সৌরভি। ইরহাম দু-হাতে চুলের মুঠি টেনে ধরে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
”ওহ আল্লাহ, আমাকে ধৈর্য দাও..!”

ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে দরজার সামনে ইরহাম এগিয়ে যেতেই দেখল দরজা বাহির থেকে আটকানো। হালকা হাতে দরজায় চাপড় মেরে উচালো স্বরে চ্যাঁচিয়ে উঠল,
”এইইই দরজা খোলো, বাহিরে কে..! ভেতরে আমি আছি।”
ইরহামের চিৎকারের আওয়াজ শুনে সৌরভির পদক্ষেপ দ্রুত হলো, জিজ্ঞেস করল বিরক্তি নিয়ে,
”হয়েছে কী তোমার? চ্যাঁচাচ্ছো কেন?”

ইরহামের কুঞ্চিত করে রাখা চেহারার দিকে তাকিয়ে থমকে গেল সৌরভি। পুরুষালি গম্ভীর মুখখানা অবলোকন করতেই ঠোঁটগুলো থেমে গেল আপনা-আপনি। ইরহামের ধরে রাখা মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট অনুসরণ করে সামানে তাকাতেই সৌরভি নিজেও চিৎকার দিয়ে উঠল। অবাক সুরে শুধাল,
”দরজা বন্ধ করল কে?”

মেয়েটার এমন প্রশ্নে ইরহাম নিজের নাক উঁচুতে তুলে৷ তিক্ত কন্ঠে চ্যাঁচিয়ে উঠল,“আমি করেছি বন্ধ।
“কিন্তু তুমি তো ভেতরে, বাহির থেকে বন্ধ করলে কী করে!
সৌরভি কথাটা বলেই জিভ কাটল। মেকি হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে চোখ তুলে স্বাভাবিক হাসার চেষ্টা করল, হলো না৷ ইরহাম দেখল না সেসব, একে তো রুমে ভ্যাপসা গন্ধ, সাথে গায়ে পরিহিত কাপড়ের জন্য তরতর করে ঘামছে শরীর, এই মুহুর্তে এই বদ্ধ রুম থেকে বের হওয়াই তার মেইন ফোকাস। মোবাইলটা সৌরভির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,”এটা নাও, দরজার দিকে ধরো।

সৌরভির হাতে মোবাইল ধরিয়ে দিয়ে নিজের বাহুর সাহায্যে ধাক্কা দিল দরজায়। ধাক্কার জোরে দরজা সামান্য পরিমাণ নড়ল না। সৌরভি নিজের গলা উচিয়ে চ্যাঁচাল,”ওপাশে কেউ আছেন, আমরা ভেতরে আটকে গেছি, প্লিজ দরজা খুলুন!
ইরহাম কড়মড় করে বলে ওঠল,
“চুপ, একদম চুপ, চ্যাঁচাচ্ছো কেন!
সৌরভি অবাক কন্ঠে বলে,
“ তো চ্যাঁচাব না, নাহলে বের হবো কীভাবে?
“হ্যাঁ তোমার তো দাদি আম্মা বাহিরে বসে, উল্টোপাল্টা বলবে না তার কী ঠিক আছে!

ইরহামের কথার ভাবার্থ যখন বুঝল সৌরভি তখন জিহ্বায় কামড় দিল। মাথা নাড়াল উপর নিচ সে বুঝেছে বলে। জিজ্ঞেস করল,
“এখন কী করব তাহলে? এখান থেকে বের হওয়ার উপায়?”
“নুসরাতকে কল দাও, বলো এসে দরজা খুলে দিতে।”

ইরহামের কথা শেষ হতেই সৌরভি মোবাইল অন করে ফোন দিতে যাবে, স্ক্রিনে গ্রিন লাইন এসে মোবাইল বন্ধ হয়ে গেল। ইরহাম বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিতে বিড়বিড় করল,
”সাউয়ার সব বিপদ আজ হওয়ার ছিল..! ”

অন্ধকার ভেন্যুতে চাপা হৈ-হল্লোড়! চারিদিকে মানুষের কথা, চাপা গুঞ্জন। নাছির সাহেব জেনারেটর চালু করার কথা বলতেই একজন বলে ওঠল,
”মেইন সুইচ কেউ বন্ধ করে দিয়েছে চাচা।”

গলাটা আরমান শিকদারের। মাহাদি নিজের মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালাতেই সাহেদ খান এসে তার পাশে দাঁড়ালেন। কারোর সংস্পর্শ নিজের কাছে উপলব্ধি করতেই ঘাড় বাঁকায় মাহাদি। বাবাকে পাশে দাঁড়াতে দেখে মৃদু হাসির প্রচেষ্টা করল। পরপর আবার বাবার হাত পিঠে অনুভূত হতেই ভ্রু উচিয়ে শুধাল,
”কী হয়েছে পাপা?”

সাহেদ খানের চোখে নমনীয়তা থাকলেও কন্ঠস্বরে রুক্ষতা,
”নিজের বাড়িতে যাবে না?”
মাহাদি আমতা-আমতা করে বলল,
“হ্যাঁ যাব তো!”
“ কবে?”

পরপর কঠিন স্বরে ছেলেকে শুধালেন শাহেদ খান। পিঠে তখনো স্নেহের হাত। মাহাদি মাথা নিচের দিকে সামান্য ঝুঁকিয়ে নিয়ে স্রীয় গম্ভীরতা বজায় রাখে। অস্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করে,
”শীঘ্রই!”

মাহাদির কথা শেষ হতেই শাহেদ খান জিজ্ঞেস করলেন,
“শীঘ্রই কবে, এই বাড়িতে গাটি গেড়েছো নাকি, গতমাস খানেক এখানে থাকছো, এখনো ইচ্ছে শেষ হয়নি? নাকি এই বাড়ির কোনো মেয়েকে বিয়ে করে ঘর জামাই হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেছ?”
মাহাদি এহসান বাবার রসিকতা হকচকাল। লজ্জা পেয়ে বাবার কথার বিপরীতে মৃদু স্বরে উত্তর দিল,
“যাব তো বলেছি!”

ভদ্রলোক আর মাহাদির কথা শেষ হতেই অনিকা এসে দাঁড়াল তাদের পাশে। দু-হাতে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বাবার কথায় ঘি ঢালতে ঢালতে বলল,
” মমো মেয়েটার সাথে বিয়ে দিতে পারো, মেয়েটা ভীষণ ভদ্র, দেখতে ও কেমন নাদুসনুদুস। আমি তো কয়েকবার দেখলাম উন্দা বিড়ালের মতো মাহাদি আড়েআড়ে ওই মেয়েকে দেখে।”
কথা শেষে শুভ্র গায়ের রমনী হেসে উঠল ঠোঁট চেপে। মাহাদি চোখ রাঙাল। শক্ত কন্ঠে বোনের নাম উচ্চারণ করল,
”অনিকা!”

মাহাদিকে রাগ করতে দেখে শাহেদ খান হেসে উঠলেন। দু-জনেই টিপ্পনী কেটে শুধাল,
”এই বাড়ির জামাই হওয়ার ইচ্ছে আছে নাকি মাহাদি?”
শাহেদ খান পরপর ঈষৎ ভ্রু উচিয়ে ছেলের কাছে বললেন,
”বয়স তো অনেক হয়েছে, কথা বলব নাকি হেলালের সাথে, তোমাকে কী ওর ভাগ্নী দিবে!”
মাহাদি জোরাল শব্দে কিছু বলতে নিবে অনিকা কেটে দিয়ে বলে ওঠল,
”দেখো ডেড কিছুই বলতে পারছে না ও লজ্জায়, মাহাদি নিজেও চায় মেয়েটাকে বিয়ে করতে।”

বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া স্টোর রুমে প্রবেশ করে না নাছির মঞ্জিলে থাকা কোনো সদস্য, তাই এর রুমে জানালা ও সচারা খোলা হয় না বদ্ধ পরিত্যক্ত রুম হিসেবে পড়ে থাকে। বদ্ধ কপাটের আড়ালে থাকা ঠেসে রাখা জিনিসের ভারে হাঁটার পথটুকুও ভীষণ সংকীর্ণ। ভ্যাপসা গন্ধে রুমটায় টিকে থাকা মুশকিল। ইরহাম রুমাল মুখে চাপার জন্য বের করেছিল কিন্তু, গুটগুটে অন্ধকারের প্রভাবে হাত ফসকে মেঝেতে পড়ে গেছে তা কবেই, এখন পেট ঠেলে বমির উদ্রেক হচ্ছে যেকোনো সময় বমি হয়ে যাবে ভাব। এতক্ষণ ফ্ল্যাশ লাইটের আলোয় যতটুকু অন্ধকার নিভেছিল, তার তুলনায় এখন দ্বিগুণ আঁধারে ডুবে আছে রুমটা। মাকড়শার সাদা বুনো জাল সেটে আছে দেয়ালে। ভেতর-বাহিরে তখন নিস্তব্ধতা জুড়ে রয়েছে। পেঁয়াজ রশুন এই রুমের মেঝেতে বিছিয়ে রাখায় তেলাপোকা হাঁটছে বলে মড়মড়ে শব্দ হচ্ছে। আকস্মিক অন্ধকারে গায়ে ধাক্কা লাগল দু-জনের অজান্তে, একসাথে চিৎকার দিয়ে ছিটকে দু-দিকে সরে গেল তারা। মেয়েলি গলার মৃদু আর্তনাদ ভেসে বেড়াল কামড়ায়,
”সমস্যা কী তোমার ইরহাম, দরজায় ধাক্কা না দিয়ে আমাকে ধাক্কা দিচ্ছো কেন? তাছাড়া এতক্ষণ যাবত সামান্য দরজাটুকু তুমি ভাঙতে পারলে না?”

সৌরভি কথা ইরহামের শ্রবণান্দ্রিয় প্রবেশ করতেই চ্যাত করে জ্বলে উঠল,
”আমাকে তোমার কী পালোয়ান মনে হয় যে এক ধাক্কা মারব আর দরজা ভেঙে ফেলব?”
ইরহামের বিরক্তি ধরা কন্ঠে কিছুটা দমে যায় সৌরভি। একহাতে নাকে ওড়না চাপা দিতে গিয়ে মনে হলো ওড়না গায়ে নেই খসে কোথাও পড়েছে। আলো বিহীন রুমে চোখ আশপাশ ঘোরাল, কিন্তু বুঝতে পারল না ওড়না কোথায়! হঠাৎ পায়ের উপর দিয়ে শিরশির করে কিছু একটা যাওয়ার অনুভূতি হতেই ভয়ে কাঠ হয়ে গেল মেয়েলি মুখটা। শিরদাঁড়া বেয়ে শিরশির করে বয়ে গেল শীতল বাতাস। শুভ্র বর্ণের মুখটা পাংশুটে বর্ণের হয়ে উঠল নিমেষে। না চাইতেও বদ্ধ কামড়ায় সাপের ভয়ে বিকট এক চিৎকার করে ঢলে পড়ল মেঝেতে। গা টুকু মেঝে স্পর্শ করতেই উচালো শব্দ হলো।

ইরহাম দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিল বাহুর সাহায্যে, এই অন্ধকারে কবে মেয়েটা তার পাশ থেকে সরে গেছে টের ও পায়নি সে। যখন আত্মচিৎকারের শব্দ কান ভেদ করল তখন অনেক দেরি, স্টোর রুমের মৃদু আলোর বাল্প জ্বলে উঠেছে, সাথে সাথে আলোকিত হয়েছে রুমটা। বাহির থেকে দরজা খোলার মড়মড়ে শব্দে চোখ তুলে দরজার ওপাশে তাকাতেই ইরহামের চোখাচোখি জন কয়েক মহিলার সাথে, যারা দরজার কপাট খুলে দিয়েছেন, আর একইসাথে তাদের সন্দেহি নজর ছেলে মেয়ে দুটোর দিকে নিবিষ্ট। কুমার কুমারী ছেলে মেয়ে একই রুমে বদ্ধ অবস্থায় পড়ে ছিল তা তারা স্বাভাবিক মনোভাবে নিতে পারল না, মনে করল ছেলেটা মেয়েটার সাথে জোর জবরদস্তি করে খারাপ কিছু করার চেষ্টা করেছে, মেয়েটা হয়তো নিজের ইজ্জত বাঁচানোর ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। আকরিক অর্থে ইরহামের কাপড় ঠিক থাকলে ও মেঝেতে পড়ে থাকা জ্ঞানহীন সৌরভি গা জড়িয়ে থাকা কাপড়ের ঠিক নেই। ওড়না খসে পড়ে আছে একপাশ তো অন্যপাশে নারী শরীর, বড় গলার কাপড় হওয়ার ধরুণ বক্ষ বিভাজনের একটু অংশ দেখা যাচ্ছে।

ইরহাম যতক্ষণে বুঝল ঘটনা খারাপ দিকে ঘড়াচ্ছে, এরা স্বাভাবিক একটা ঘটনাকে বিপত্নীক রুপ দিতে চলেছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। চারিদিকে হৈ-হুল্লোড় বেঁধে গেল সেকেন্ডের ভেতর, চোখের পলক ফেলার আগেই পরিবর্তী ঘটনা ঘটল যে ইরহাম নিজের নামে সাফাইটুকু গাইতেও পারল না, বলতেও পারল না এখানে খারাপ কিছুই ঘটেনি, সব স্বাভাবিক। বাতাসের গতিতে উড়ন্ত খবরগুলী গিয়ে পৌঁছাল সৈয়দ বাড়ির কর্তা, ও নিজাম শিকদারের কানে, অবিশ্বাস্য নয়নে দু-জনে কয়েকপল তাকিয়ে দ্রুত পায়ে রিসিপশনের ভেন্যু ফেলে ছুটলেন নাছির মঞ্জিলে। তাদের পিছু পিছু ছুটল পুরো পরিবারের মানুষজন, শুধু অজ্ঞাতো থাকল এ বিষয়ে দুটো মানুষ, যারা এ মুহুর্তে নিজেদের তুমুল ঝগড়ায় ব্যস্ত। নিজ নিজ কথার বাণে একে অন্যকে ঝোঁকানোর বৃথা প্রচেষ্টায় রপ্ত।

নুসরাতকে মেইন সুইচের সামনে দাঁড়িয়ে টানা হিঁচড় করতে দেখে আরশ অপ্রকতৃস্থের ন্যায় খেঁকিয়ে উঠল পেছন থেকে। গলার আওয়াজ ধারালো করে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
”ওখানে কী করছ তুমি? মেইন সুইচের কাছে কী কাজ তোমার?”

নুসরাত নিজের মেয়েলি কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“মেইন সুইচে সমস্যা দেখা দিয়েছে তাই আমি ঠিক করছিলাম।”
‘“হ্যাঁ ঠিক করার ধরণ তো দেখতেছি, দেখেই বোঝা যাচ্ছে এখানে ঠিক করা হচ্ছে না, কুস্তিগিরি হচ্ছে!
নুসরাত ভ্রু উচিয়ে শুধায়,
“অপমান করছেন?
আরশ দম্ভের সহিত বলে,
“আমার এত সাহস তোমাকে অপমান করব..!
আরশের কথায় নুসরাত নাক ফোলাল। দু-হাত বুকে বেঁধে শুধাল,”কী চাই ?
আরশ বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“তোমাকে!
নুসরাতের কান পর্যন্ত কথাটুকু পৌঁছাল না। খ্যাকখ্যাক করে জানতে চাইল,”কী?
“কিছু না!
আরশ নুসরাতকে মেইন সুইচের সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে ফ্ল্যাশ লাইট তুলে ধরল সেখানে। তীক্ষ্ণ চোখে পর্যবেক্ষণ শেষে সুইচ টিপে দিল, আর তাতে আবারো চারিদিক ঝকঝকে আলোয় ভরে উঠল। শুধাল,
”কোন অশিক্ষিত মেইন সুইচ বন্ধ করেছে?”

নুসরাত চোখ পাঁকিয়ে চ্যাঁচিয়ে উঠল,
“একদম অশিক্ষিত বলবেন না।
“ তো অশিক্ষিতকে অশিক্ষিত বলব না, একটা মানুষ কতটা মাথা মোটা হলে রিসিপশনের অনুষ্ঠানের মধ্যে মেইন সুইচ বন্ধ করে দেয়!”
নুসরাত হাত তুলে তেড়ে আসলো আরশের দিকে। কড়মড়িয়ে বলল,
”অশিক্ষিত হবে আপনার শ্বশুর।”
“আমার শ্বশুর মশাই তো তোমার বাপ।”
নুসরাত থতমত খেয়ে গেল। জিভ কেটে বলে ওঠল,
“ নিজেই অশিক্ষিত আর অন্যকে বলে অশিক্ষিত! ”
আরশ কপালে ভাঁজ ফেলে শুধাল,
“তুমি এমন চ্যাঁতছো কেন, আমি তো তোমাকে অশিক্ষিত বলিনি, যে মেইন সুইচ অফ করেছে তাকে বলেছি।”

নুসরাত নিজের কন্ঠে ধীরতা বজায় রেখে বলে ওঠল,
“ তো যে কাউকে আপনি কেন অশিক্ষিত বলবেন, আপনাকে এ সাহস কে দিয়েছে?”
আরশ ভ্রু উচিয়ে বিদ্রুপ করল নুসরাতকে। নিষ্প্রাণ বলয় মেয়েলি নেত্রে স্থির করে হিসহিসিয়ে জানতে চাইল,
“তোমার এত ধরছে কেন, ওই অশিক্ষিতটা তো, তুমি না?,”
নুসরাত রাগে ফুসিয়ে উঠল। দু-হাতে আরশের গলা চেপে ধরার জন্য পা বাড়িয়ে বলে ওঠে,
“হ্যাঁ, আমি বন্ধ করেছি তো, তো কী হয়েছে!”

আরশ শ্রাগ করল কাঁধ দিয়ে। নুসরাতের দিকে গ্রীবা বাঁকিয়ে সামান্য ঝুঁকে এসে শুধায়,
”হোয়াট আ কোয়েন্সিডেন্স, তার মানে ওই অশিক্ষিতটা তুমি..!”
নুসরাত আরশের বারবার অশিক্ষিত বলা কথাটায় খ্যাপা ষাঁড়ের মতো হিসহিসিয়ে উঠল। দু-হাত তুলে থাবা মারার জন্য তেড়ে আরশের দিকে এগিয়ে আসলো। দু-জনের ভেতরের তিল পরিমাণ দূরত্ব মিটিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলে,
“আমি অশিক্ষিত না..! ”

পরপর বিড়বিড় করে আরশের শোনার মতো বলল,
“তুই নিজেই অশিক্ষিত গাধা একটা, পাটা কোথাকার, আমাকে বলিস আবার অশিক্ষিত, নিজেই ঠিক মতো স্বরবর্ণ পারিস না মনে হয়।”
আরশ নুসরাতের বানান করে করে বলা কথাগুলো বুঝল না। অবাক নেত্র নিবিষ্ট করে শুধাল,
“কী বললে তুমি, এভাবে বলছ কেন, স্পিক ইন বাঙালি, ইন এন আমেরিকান এক্সেন্ট, ওর ইন আ ব্রিটিশ এক্সেন্ট।”

নুসরাত আরশের কথা কানেই তুলল না, খুশিতে গদগদ করে উঠল যখন সত্যি সত্যি দেখল আরশ স্বরবর্ণ পারে না। বাংলা সিনেমার মতো তার মনে মৃদু স্বরে গান বাজল, দোলা দিয়ে গেল হৃদয়ে। সামনে দাঁড়ানো স্তম্ভিত আরশকে ভালো করে বাজানোর জন্য এবারো একই পন্থা অবলম্বন করল,
”তোরা তো অশিক্ষিত, অ, আ, ক, খ পারিস না। মূর্খ, সরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ শিখার বয়সে প্রেম করলে তো এসবই হবে। খাইষ্ঠা একটা..! ”

নুসরাত কথাগুলো বানান করে করে বলে শেষ করল। সামনে দাঁড়ানো আরশ নুসরাতের কথা কিছুর-ই বোধগম্য হলো না, সে বলল,
“স্পষ্ট, শুদ্ধ বাংলায় বলো!”
“আসছে আমার নবাবজাদা, উনার জন্য বাংলায় বলব, বলব না বাংলা, এই ভাষায় আমি কথা বলব।”
আরশ চ্যাঁচাল,
” নুসরাত তুমি ভালো কিছু বলছ না আমি জানি!”
“তো জানলে কী হবে আমি তো বলব।”
আরশ খ্যাপাটে ষাঁড়ের মতো এগিয়ে এসে নুসরাতের দু-বাহু চেপে ধরল। শক্ত কন্ঠে বলল,
” বাংলায় বলো…!

“অশিক্ষিত শিখিসনি কেন বাংলা, পারব না বাংলা বলতে।”
আরশ রাগে চোখে মুখে সব অন্ধকার দেখল। কটমটিয়ে বলল,
” তুমি কী মনে করো আমি বাংলা শব্দের উচ্চারণ করতে পারি না, আমি সব জানি।”
নুসরাত ভ্রু উচিয়ে বাহ্’বা দিল। আবারো বানান করে করে বলল,
“ভালো খুব ভালো, চ্যাঙ্গিস খানের বাইচ্চা, অশিক্ষিত কোথাকার। তুই সরবর্ণ পারিস না আমি কী করব, আজ থেকে তোর সাথে এভাবেই কথা বলব, তাহলে আর তুই কিছুই বুঝবি না। ”

নুসরাত কথা শেষ করে গদগদ করে উঠল। নিজেকে বাহ্’বা দিল কীভাবে এই ব্যাটাকে জব্দ করছে। আরশকে বিদ্রুপ করে নিজ মনে বিড়বিড় করে,
‘শিখিসনি কেন সরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, এভার বোঝ, ব্যাটা!’
নুসরাত আর আরশের ঝগড়া ভেতরে দূর হতে দৌড়ে দৌড়ে আসলো আহান। চিৎকারের আওয়াজ অনেক জোরাল,বারবার উচ্চারণ করছে, “সর্বনাশ হয়ে গেছে, সর্বনাশ!”

নুসরাত ঘাড় বাঁকিয়ে ওদিকে তাকাতে নিবে আরশ নুসরাতের দু-বাহু ছেড়ে দিল। কটমট করে নুসরাতের না বোঝার মতো আওড়ায়,
“ভাফ্-ফান-কু-লো, নুসরাত নাছির। ”
যার অর্থ দাঁড়ায় ফাক ইউ নুসরাত নাছির। নুসরাত চোখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে, প্রশ্নাতীত কন্ঠে শুধাল,
“আপনি আমায় গালি দিয়েছেন? কী বলেছেন আপনি? সাহস থাকলে এভাবে বলুন!”

আরশ ভাব নিয়ে আড়াআড়ি বুকে হাত বেঁধে দাঁড়ায়। নুসরাত দু-হাত পেঁচিয়ে দাঁড়ানো আরশকে টেনে নিজের দিকে ফিরিয়ে বলে,
“কী বলেছেন, কোন ভাষায় বলেছেন, সাহস থাকলে শুদ্ধ বাংলায় এভাবে বলুন।”

আরশ ঠোঁট উচিয়ে বিদ্রুপ করে হাসল। বলল,
“আমার সাহস কতটুকু তার আন্দাজ তোমার নেই মিসেস আমার।”
“তো বলুন, শুদ্ধ বাংলায় বলুন।
আরশ হাসল। নিচের দিকে ঝুঁকে এসে বলল,
” এত ডেস্পারেট আমার মুখে কথাটা শোনার জন্য, তাহলে তোমার সন্তুষ্টির জন্য বলেই দিই.!”

আরশ ভ্রু নাচাল। নুসরাত আগ্রহ প্রকাশ করতেই, বাতাসে ভেসে আসলো গম্ভীর স্বর,”ফাক ইউ নুসরাত নাছির!
কথাটা শেষ হতেই নুসরাত নিজেও সমান জোরে বলে ওঠল,
“ফাক ইউ টু..!”
আরশ আর কিছু বলবে আহান দু-জনকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল। দু-জনের ঝগড়ায় বাঁধা দিয়ে বলে ওঠল,
“আ আপু সর্বনাশ, হয়ে গেছে..!”

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪০ (২)

আহান জিরিয়ে নিল সামান্য কথাটুকু বলে। হাঁপিয়ে উঠেছে এতটুকু দৌড়ে আসতে গিয়ে, নুসরাত চোখা চোখে চেয়ে শুধাল,
“কী সর্বনাশ!”
আরশ নিজেও আহানের দিকে তাকিয়ে আছে প্রশ্নের উত্তরের আশায়। আহান জোরে জোরে শ্বাস ফেলল। বুকের কম্পনে স্বাস্থ্য বিশিষ্ট শরীর নড়ছে। দু-জনের অবাক চোখের অবাকতা বাড়িয়ে দিতে আহানের স্বর শ্রবণ ইন্দ্রিয় প্রবেশ করল,
“ইরহাম ভাই আর সৌরভি আপু কট..!”
নুসরাত আর আরশ দু-দিকে ছিটকে সরে এবার একইসাথে কান ফাটানো শব্দে দু-জনেই চ্যাঁচিয়ে উঠল,
“কীইইইইই..!”

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪১

1 COMMENT

  1. Apuuuuuuuuu plz next partgulu taratari den next part porar jonno odhir aagrohe bose achi opekkha korte parchi nah r apu plz next partgulu taratari dewar try koiren apu plzzzzzzzzzzzzzzzzzzz

Comments are closed.