প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৩
নীতি জাহিদ
কক্সবাজার পৌঁছাতেই মধ্যরাত। প্রায় দেড়টা। এয়ারপোর্টে ফ্লাইট ডিলে হওয়া। সেখান থেকে গাড়ি এসে তাদের নিয়ে আসা সব মিলে ঘন্টা তিনেক।হোটেলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো সবাই। মেরিন ড্রাইভ রোডের পথ ধরে এগিয়ে চলছে মোনাদের গাড়ি। গাড়ির উপরের রুফ খুলে দিতেই ইশান মাথা বের করে চিৎকার দিয়ে বললো,
– পাপা ইটস আমেজিং।
ইমরান হাসছে ছেলের উচ্ছ্বাস দেখে। ইশান নিজের সাথে মাকেও উঠিয়ে নিলো। মোনা ইশানের সাথে দাঁড়িয়ে দু হাত শূন্যে মেললো। বাতাসের শো শো শব্দ। একপাশে সাগর অপর পাশে পাহাড়। সমুদ্রের গর্জন। এমন মোহনীয় পরিবেশ খুব একটা দেখা যায় না। চারদিকে গুটগুটে অন্ধকার। হঠাৎ ইশান লক্ষ্য করলো পেছনে বেশ কিছু গাড়ি। মাথা নামিয়ে ইমরানকে বললো,
– পাপা পেছনে সাসপিশাস কিছু গাড়ি।
ইমরান চমকে পেছনে তাকাতেই গাড়ির অবয়ব দেখে ছেলেকে আশ্বাস দিলো,
– প্রিন্স ডোন্ট ওরি। ওরা বীচ পাহারা দিচ্ছে। আই নো দেম। দে আর রোমিং ফর সিকিউরিটি পারপাস।
ইশান আবার খুশী হয়ে শীত শীত আবহাওয়াটাকে এঞ্জয় করছে। ইমরান রবিনের দিকে তাকিয়ে ইশারায় কিছু একটা জিজ্ঞেস করতেই রবিন হালকা ঝুঁকে বললো,
– স্যার আমাদের গাড়ি।
ইমরান মাথা নেড়ে সায় জানালো।
ইমরান স্ত্রী সন্তানের আনন্দ দেখে দুজনকে বললো,
– মোনালিসা, ইশান দুজনই হুডি পরো। জ্যাকেটের জিপার লাগাও। বাইরে প্রচুর ঠান্ডা। ট্যুরের মজা পাবেনা অসুস্থ হয়ে গেলে।
দুজনই জ্যাকেটের জিপার লাগিয়ে হুডি পরলো। গাড়ি এসে থামলো রিসোর্টে। মেরিন ড্রাইভ রোডে এই রিসোর্ট। গাড়ি থেকে নেমে ঢুকতেই যে নাম চোখে পড়লো মোনা ইশান অবাক। রিসোর্টের নাম ‘ ইশান মারমেইড ‘ বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– পাপা এটা আমার নামে?
– না এটার তোমার নামে না, এটা তোমারই।
মোনা রিসোর্টের আঙিনায় দাঁড়িয়ে বললো,
– ইশান আমার মনে এই রিসোর্ট টাই একটা ইশান। দেখো তোমার মতো জ্বলজ্বল করছে, কেমন হাসছে। চারদিকটা কি সুন্দর সবুজ। তোমার প্রাণবন্ত রূপ। পাশে সমুদ্র মনে হচ্ছে তুমি যেভাবে নিজেকে উজাড় করে ভালোবাসো তারই প্রতিচ্ছবি। কেমন সমুদ্রের পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছো যেভাবে সবসময় আমার পাশে থাকো।
ইশান এবং ইমরান দুজনই মুগ্ধ হয়ে শুনছে মোনার কথা। মোনার হাত ধরে ইশান বললো,
– মা তুমি আমাকে এত বুঝো?
ইশানের মাথার চুল এলোমেলো করে বললো,
– আমি তোমার সব খেয়াল করি । আমার দুইটা বাবাকে আমি খুব মানি। একটা আপাতত আমার চেয়ে দূরে, আরেকজন কাছে। তার সেবা করা আমার কর্তব্য।
ইশান মাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– যদি পরের জন্ম বলে কিছু থাকতো প্রতিবার মা হিসেবে তোমাকেই চাইতাম।
– আমিও আল্লাহকে বলবো যেন আমাকে ইশানকেই দেয় ছেলে হিসেবে পরকালে।
পেছনে দাঁড়িয়ে ইমরান চুপচাপ এদের কথা শুনছে। তার অনুভূতি খুব শান্ত। নীড় হারা নদীর মতন। সৎ মা এমন হয়! হতেও পারে। একজীবনে বিস্ময়ের অনেক কিছু হয়। এটিও একটি বিস্ময়। তবে মোনাকে ইশানের সৎ মা আক্ষরিক অর্থে বলা গেলে ভাবার্থে বলাটা ঘোর অন্যায় হবে। দুজন যেভাবে মিশে গিয়েছে ইশানের কম্ফোর্ট জোন এখন মোনা। রাত গভীর হচ্ছে। দুজনকে ডাক দিলো।
– ভেতরে চলো। সকালে এসো। এখন খেয়ে রেস্ট নিবে।
ইশানের জন্য সাজানো রুমটা পেয়ে সে খুব খুশী হলো। ইশানের রুম থেকে সী ভিউ টা খুব সুন্দর। ইমরান বাইরে ম্যানেজারের সাথে কথা বলছে। ইশান এবং মোনা কটেজের দোতলার বারান্দা থেকে সাগরের গর্জন শুনছে। ইশান বলে উঠলো,
– মা তোমার ফোনটা দাও তো। এখানে আমাদের ছবি তুলি। তুমি মেমোরিতে রেখে দিও। ঢাকা গিয়ে একটা ফোটো মেমোরি ক্রিয়েট করে আমার ল্যাপটপে রাখবো।
মোনা ব্যাগ থেকে ফোন বের করে ছবি তুলে নিলো। ইমরান দুজনকে দেখে বললো,
– এখনো ফ্রেশ হওনি ইশান? বাইরে বাতাস ঠান্ডা। ফ্রেশ হও। ব্যালকনির দরজা লাগাও। এসো এসো।
মোনা ও ইশান ভেতরে এলো। ইমরান ইশানকে বললো,
– নাও এটা তোমার রুম কিই। রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই দরজা জানালা আটকে শোবে। বাতাস খুব ঠান্ডা। ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নাও। খাবার এখানে রাখা আছে। আজ বের হওয়ার আর প্রয়োজন নেই। তোমার পাশের রুমটা পাপা আর মায়ের। যেকোনো প্রয়োজনে ডাক দিবে। সকালে উঠার কোনো তাড়া নেই। তবে অবশ্যই সালাত আদায় করে নিবে এরপর যতক্ষন ইচ্ছে ঘুমাবে, ওকে?
– ওকে পাপা।
ইমরান মোনা বেরিয়ে নিজেদের কামরায় এলো। মোনা ব্যাগটা একপাশে রেখে বসে পড়লো। ভীষণ ক্লান্ত। ইমরানের জোরাজোরিতে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে নিজেদের জন্য রাখা খাবারের কিছুটা খেলো। ইমরান মোনার নিরবতা দেখে প্রশ্ন করলো,
– বেশ তো হাসিখুশি ছিলে। এমন চুপ হয়ে গেলে যে।
– তেমন কিছুনা শরীর ভালো লাগছেনা।
– বিশ্রাম নাও।
বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতেই ঘুমে আচ্ছন্ন দুজন।
ভোরের পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভেঙে গিয়েছে। সালাত আদায় করে শুয়ে পড়ে পুনরায়। বসন্তের আমেজ সকাল সকাল বেশ লাগছে। ঘড়িতে আটটা। তবুও চারদিকে ধোয়াশা। মোনা বাচ্চাদের মতো কম্ফর্টার জড়িয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন। ইমরান উঠে ফ্রেশ হয়ে নিজের জন্য কফি বানালো। সাগর ঝাপসা লাগছে। কফি খেয়ে জগিং স্যুট পরে মোনাকে ঘুমে রেখে বের হলো। মেসেজ দিলো যেন উঠে ফোন দেয়। রুম লক করে বেরিয়ে গেলো। রিসোর্টের আশপাশটা ঘুরে দেখলো। হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর আসলো। গাড়িতে তার লোকেরা অপেক্ষা করছিলো। দেখা করে ঘন্টা খানেকের মাঝে ফিরে এলো। ফোনে কল না আসাতে বেশ বুঝতে পারছে মোনা বা ইশান কেউই ঘুম ছাড়েনি। রিসোর্টের গার্ডেন এরিয়াতে বসে ম্যানেজারকে ডেকে বললো গাছ থেকে পিউর ডাব পেড়ে আনতে। ডাবের পানিটা ইমরানকে সার্ভ করলো আর শাস দিয়ে ইমরান নারকেল চিংড়ি করতে বললো দুপুরের লাঞ্চে৷ লাঞ্চ আইটেমে কি কি থাকবে ইমরান মেন্যু সেট করে দিলো। সকাল হতেই আস্তে আস্তে রিসোর্টে টুরিস্ট আসা শুরু করেছে। ইমরানের পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। রিসোর্টেই ঘুরতে এসেছে। কিছুক্ষনের মাঝে ইমরানের বুয়েট ব্যাচের একদল বন্ধু আসলো পরিবার নিয়ে। তারা জানালো পরিকল্পনাই ছিলোনা। নতুন রিসোর্ট ঘুরতে এসে যে ইমরানের সাথে দেখা হবে ভাবতেই পারেনি। ম্যানেজারের কাছ থেকে জানতে পারলো ইমরান পরিবার নিয়ে এসেছে। সবাই বিশ্রামে চলে গেলে ইমরান কামরায় ফিরে এলো। মোনা তখনো ঘুমে। ঘড়িতে সাড়ে দশটা। ইমরান লোনলি ফিল করছিলো। মোনার পাশে চুপচাপ শুয়ে পড়লো। এরমাঝে মোনা নড়ে চড়ে উঠলো। হাতড়ে ফোনে দেখলো সাড়ে দশটা। ইমরানের দিকে তাকিয়ে ঘুমো ঘুমো কন্ঠে বললো,
– গুড মর্নিং ইমরান সাহেব।
– গুড মর্নিং মাই হামিং বার্ড। উঠবেন না?
– উঁহু। ঘুমাতে ভাল্লাগছে।
ইশ কি সুন্দর করে আদো আদো কথা বলছে। টপস পরে শুয়েছিলো। ঘুমের মাঝে এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। গলার কাছে একটা বাটন খুলে গেছে। কলার উপরের দিকে উঠে গিয়েছে। কাধের অনেকটা উন্মুক্ত অংশ দেখা যাচ্ছে। ইমরান নিজেকে সামলে বললো,
– মোনালিসা, জামাটা তো ঠিক করো সোনা। কেমন এলোমেলো হয়ে শুয়েছো দেখো।
– তাতে কি। আপনিই তো।
ঘুমের ঘোরে আবোলতাবোল বলছে। ইমরান ও মজার ছলে বললো,
– তাই নাকি। আমি হলে সমস্যা নেই।
– না।
– তাহলে আরো খুলে দিই।
– আচ্ছা।
– সত্যি?
মোনা পুরোপুরি ঘুমে তলিয়ে গেলো। ইমরানের মনে হলো একটা ছোট্ট পুতুলের সাথে দুষ্টুমি করছে। নিজে থেকেই মোনার পোশাক ঠিক করে দিয়ে শুয়ে থাকলো। মোনার ঘুমন্ত চেহারায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেই ঘুমে তলিয়ে গেলো।
দুজনই যখন উঠলো ঘড়িতে প্রায় সাড়ে বারোটা। ইশান দরজায় কড়া নাড়ছে। মোনা উঠে বসে ইমরানকে বললো,
– শুনছেন, দরজা টা খুলে দিন না। আমি ফ্রেশরুমে যাই। বাচ্চাটা কখন থেকে কড়া নাড়ছে।
মোনা কাপড় নিয়ে ওয়াশ রুমে যেতেই ইমরান দরজা খুললে ইশান ঢুকল। রিসোর্ট ঘুরে দেখেছে রবিনের সাথে জানান দিলো। সে প্রচুর খুশি। বেশ চটপটে ভাব। এসে সোফায় বসে বাবাকে বললো,
– পাপা আমি আশপাশটা ঘুরেছি রবিন চাচ্চুর সাথে। খুবই সুন্দর।
ইমরান ঘুমের ঘোরে বলছে,
– হুম, গুড।
– বীচের পাশে জেলেরা মাছ ধরছে। আমিও ধরতে চাই।
– হুম।
ইশান দেখলো পাপা এখনো ঘুমে। ইশান বাবার কাছে এসে কাতুকুতু দিয়ে উঠিয়ে বললো,
– ও পাপা… আমার কথা শুনো। আর ঘুমিয়ো না। অনেক ঘুমিয়েছো। উঠোনা।
– না আরেকটু ঘুমাই। আমি সকালে উঠেছি প্রিন্স।
মোনা তখন ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে বাবা ছেলের দুষ্টুমি দেখছে। ইশান মাকে দেখে সকালের মিষ্টি সম্ভাষণ জানালো। ইমরান এবং ইশানের খুনশুটি দেখে মজা পাচ্ছে। নাস্তার জন্য ইন্টারকমে জানানো হয়েছে। এবার নিজেও বললো,
– আর কত ঘুমাবেন ইমরান সাহেব, উঠুন।
– তোমরা মা ছেলে আরাম করে সারাটা রাত,সকাল ঘুমিয়ে এখন আমাকে জালাচ্ছো কেনো?
– আপনি ঘুমান নি কেনো?
– আমি উঠে জগিং করেছি।
মোনার নাস্তা চলে এসেছে। ওয়েটার নাস্তা দিয়ে যেতেই মোনা ইশানের পাশে বসলো। ইমরান উঠে ওয়াশরুমে যেতেই মোনা প্রশ্ন করলো,
– কেমন ঘুরলে?
– বেশি দূরে যাই নি আশপাশ টা দেখেছি। তবে যা বুঝলাম মা এদিকে সিকিউরিটি নিয়ে অনেক কনশাস থাকতে হয়।
– কেমন?
– এই যে মানুষ জন কেমন যেন। রবিন চাচ্চু বললো বখাটে, চোরাচালান, ড্রাগ এদিকে অনেক বেশি।
– তাহলে তো রিস্ক। আমি ভেবছি আমরা মা ছেলে ঘুরবো।
– চিন্তা করোনা তো মা, আমি আছি। বয়সে ছোট হতে পারি কিন্তু তোমার প্রটেকটশানের জন্য ছোট নই। আর আমিও জানি, তুমি ও জানো আমরা মা ছেলে একসাথে জুডো,কুংফু শুরু করলে নাজেহাল হয়ে যাবে। ওরা তো আর জানবে না যে তুমি আমি বেল্টজয়ী।
মোনা হেসে বললো,
– ঘুরতে এসে জুডো, কুংফু করবো শেষমেশ।
দুজনই হেসে উঠলো। ইমরান বের হয়ে দেখছে মা ছেলের আলাপন। খাওয়া শেষে ফ্রেশ হয়ে ঘুরতে বের হলো সকলে। বীচের কাছটা বেশ শীতল। আশপাশে অনেক পর্যটক। ইমরানের পরিচিত ফ্রেন্ড রা সবাই এসেছে। ওদের দেখে এগিয়ে এলো। ওর ব্যাচমেটদের অনেকে পরিচিত হবার পর মোনার সাথে কথা বলছে। তাদের ওয়াইফদের মাঝে মোনা বেশ অস্বস্তি বোধ করছে। ইশান দূর থেকে কিছুটা উপলব্ধি করছে। বাবার বন্ধুদের ছেলে মেয়েদের সাথে কথা বলছিলো। মোনা ইতস্তত বোধ করাতে ইশান বাবা মায়ের সামনে এসে বললো,
– পাপা ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আমি মাকে নিয়ে সামনে একটু ঘুরবো।
ইমরান ছেলের গলার টোন শুনে অন্য কিছু বুঝতে পারছে। তখন ইমরানের বন্ধু হাসিবের ওয়াইফ বলে উঠলো,
– মাকে খুব পছন্দ নাকি ইশানের?
ইশান হেসে উনার ছেলে সাবিতকে ডাকলো। সাবিত সামনে এলে সবার সামনে বলে,
– সাবিত ডু ইউ লাভ ইউর মম?
সাবিত উত্তর করলো,
– ইয়েস আই ডু। লাভ মাই মম সো মাচ।
ইশান হেসে বললো,
– আন্টি সাবিত যদি আপনাকে ভালোবাসে আমি কেনো বাসবো না আমার মাকে?
ভদ্রমহিলা সাথে সাথে বলে উঠলেন,
– মা আর স্টেপ মায়ের মধ্যে তফাৎ আছে।
– আন্টি কখনো কখনো বায়োলজিক্যাল মায়েদের কোনো ভূমিকাই থাকেনা লাইফে। দ্যাটস হোয়াই আই রেসপেক্ট মাই স্টেপ মম। পশুর ও সন্তানের প্রতি মায়া থাকে কিন্তু সো কল্ড বায়োলজিক্যাল মাদার রা সন্তানকে ফেলে চলে যেতে ভাবে না। সাবিতের কাছে মায়ের সজ্ঞা আপনি। আমার কাছে মা মানে মোনালিসা।
মোনা ইমরানের দিকে তাকিয়ে দেখে মোনাকে ইশারা করছে। মোনা ইশানের হাত ধরে বললো,
– ইশান আন্টি বড়। এভাবে বলোনা। স্যরি বলো আন্টিকে।
– তুমি বলছো আমি রং?
– নো ইশান, আমি এমনটা বলিনি।
– মা তুমি কি আমার সাথে যাবে। আমার মন খারাপ। পাপা আ’ম স্যরি।
ইশান সবাইকে ফেলে সামনের দিকে হাঁটছে। ইমরান মোনাকে বললো,
– যাও সামলাও। আমি গেলেও এখন কথা বলবে না।
হাসিবের ওয়াইফ তাচ্ছিল্য করে বলে উঠলো,
– মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশী হয়ে গেলো না ভাই।
ইমরান কিছু বলার আগেই মোনা বলে উঠলো,
– মিসেস হাসিব আই এম এক্সট্রিমলি স্যরি টু সে দ্যাট আপনার এমন স্টেটমেন্টই যথেষ্ট স্টেপ মায়েদের সন্তানদের প্রতি বিদ্বেষ চলে আসার জন্য। আপনি কথাগুলো আমাকে বললে একটু ও খারাপ লাগতো না। আমার ছেলেটাকে না বললেও পারতেন। ইমরান সাহেবের ছেলে আমার ছেলে হতে পারবেনা কেনো? আমি যদি ছেলেকে নিয়ে ভালো থাকি তাতে অন্য কারো তো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সন্তানদের মাঝে তফাৎ করাটা প্রকৃত শিক্ষার অংশই হতে পারেনা। আফসোস আমরা স্বশিক্ষিত হতে পারলেও সুশিক্ষিত হতে পারিনি একুশ শতকেও। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকলেই হয়না, কিছু মানবিক শিক্ষা ও লাগে। এনিওয়ে, আরেকটা কথা বলে নি, কোনো ভাবেই এমনটা ভাবার অবকাশ নেই যে, আমি অসহায় গরীব বাবার অবহেলিত সন্তান তাই বাবা স্যুগার ডেডি দেখে টাকার জন্য বিয়ে দিয়েছে। আমার পরিচয় দেয়ার জন্য আমি একাই যথেষ্ট। পড়াশোনা করছি স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটিতে। বাবা আপাতত বিজনেস ট্রিপে থাইল্যান্ড আছে। আমার বাবার নিজের বাড়ি আছে। মাশাল্লাহ আমার একার সম্পদের পরিমান যথেষ্ট। আর প্রচন্ড ডানপিটে মেয়ে আমি। মার্শাল আর্টে বেল্ট পেয়ে এত্তগুলো মেডেল বাড়িতে সাজিয়ে রেখেছি। কথার ঝুড়ি বসিয়ে দিতে পারি। আমি বলা শুরু করলে বাকিরা চুপ হয়ে শুনতে বাধ্য। এই যে সবাই চুপ হয়ে গেলেন।
বাকিরা সত্যি চমকে উঠলো। আসলে তো সবাই চুপ হয়ে গিয়েছে। মোনা ফিরে চলে যাচ্ছিলো। আবার এসে বলে,
– ভাবী আরেকটা কথা ইমরান সাহেব আমার ক্রাশ ছিলেন। আ’ম ঠুয়েন্টি ঠু আন্ড হি ইজ ফোর্টি ঠু লুক স্টিল হি ইজ ড্যাম স্মার্ট। আই লাভ হিম ঠু মাচ।
সবাইকে বলদ বানিয়ে মোনা চলে গেলো। ইমরানের ফ্রেন্ড তৌসিফ জোরেই বলে উঠলো,
– ভাই এই মাস্টারপিস কোথায় থেকে পেলি। ও মাই গুডনেস। ফায়ার বোম। সমুদ্রের ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশ গরম করে দিছে।
হাসিব বউকে ধমকে বললো,
– কি দরকার ছিলো ভাবীকে এসব বলার।
ইমরান বন্ধুকে ধমকে বললো,
– ডোন্ট স্পয়েল দ্য ট্যুর। আমি ভাবীকে দোষ দিচ্ছিনা। উনার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে হয়তো সেম প্রশ্ন করতো। ইট’স ওকে। তবে এই মাস্টারপিস আমাকেই মাঝে মাঝে নাকানিচুবানি খাইয়ে দেয়। ইশানের ব্যাপারে ও খুব স্ট্রিক্ট। অন্যদিকে ইশান মায়ের ব্যাপারে সেন্সেটিভ। ওরা মা ছেলে আলোচনায় বসলে আমাকে অপশন হিসেবে রাখে। ইশানের শর্ত ছিলো আমি যদি বিয়ে করি তবে মোনালিসাকেই করতে হবে অন্য কাউকে নয়। উই আর হ্যাপি নাও।
হাসিবের স্ত্রী ভীষণ অপমান বোধ করে চলে এলেন। বাকি মহিলারা কেউ তেমন গায়ে মাখেনি। কারণ সবার কাছেই ইশানকে এসব প্রশ্ন করা বাড়াবাড়ি লেগেছে। মোনাকে বেশ পছন্দ হয়েছে, স্মার্ট ইয়াং লেডি। ইমরান ফোন আসাতে বন্ধুদের থেকে বিদায় নিয়ে আলাদা হয়ে গেলো।
ইমরান হাতে ফোন নিয়ে শুনেই যাচ্ছে দশ মিনিট যাবৎ। কলটা কাঁকনের। ফোনটা মোনা দিয়েছে হাতে। এতক্ষন শোনার পর মাইন্ডে সেট করে নিয়েছে কিভাবে সিচুয়েশন ম্যানেজ করতে হবে। কাঁকন থেমেছে। এবার ইমরান বলে উঠলো,
– কাঁকন তুমি কেনো এখনো আশা নিয়ে আছো? তুমি যদি ভেবে থাকো ইমরান আবার তোমাকে আগের মত করে ভালোবাসবে সম্পূর্ণ ভুল। আজো ফোন রিসিভ করতাম না। মোনা জোর করে দিলো। বললো তোমাকে বুঝাতে। তোমাকে যে ইমরান ভালোবেসেছে সে অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন যাকে দেখছো সে চিনে শুধু মোনাকে। সেদিন আমায় জড়িয়ে ধরলে না, আমার মনে হয়েছে আমি কোনো পাপের সাগরে ডুব দিয়েছি।
কাঁকন প্রশ্ন করলো,
– যখন মোনাকে ধরো?
– শুনতে চাও?
– হুম।
– নিতে পারবে?
– বলো।
– যতবার ওর কাছে গিয়েছি, ওকে বুকে টেনে নিয়েছি ততবার মনে হয় আমি স্বস্তি খুঁজে পেয়েছি। আমি আমার অস্তিত্ব ভুলে যাই ওর মাঝে ডুব দিলে। হারিয়ে যাই অন্য জগতে। এর বেশি বলতে পারবোনা। ইট’স ভেরী পারসোনাল। আশা করি বুঝতে পারছো তোমার মাঝে আমাকে আকর্ষণ করার মত আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। কেনো বাজে মেয়েদের মত আমার পিছু নিয়েছো। আমি যতদূর কাঁকনকে চিনি সে ক্যারিয়ার, ফিল্ম নিয়ে ব্যস্ত। এসব করে নিজের সব ধ্বংস করছো। সংসারটা করো কাঁকন। জারিফের সাথে মানিয়ে নাও। কারণ জারিফ তোমার চয়েজ ছিলো। একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট এর সাথে যোগাযোগ করো। নিজেকে সময় দাও। ইউ উইল বি ফিট এন্ড ফাইন এগেইন। আমার শুভকামনা থাকবে। আমি রাখছি। আর কখনো কথা হবে না। আল্লাহ হাফেজ।
– হ্যালো হ্যালো… ইমরান…
ফোন কেটে গেলো। বুকের ভেতরটা এমন করছে কেনো। সুযোগ পেয়েও কপাল গুনে হারালো। মোনালিসার শাড়ির শ্যুট টা করা হলোনা। কাঁকনের মস্তিষ্কে ইমরানের প্রতিটি কথা আঁছড়ে পড়ছে বাঁধ ভাঙা ঢেউয়ের মত। হিরার সন্ধানে জারিফের কাছে ছুটেছিলো অথচ কোহিনূরকেই হারিয়ে ফেললো। এতটা সম্মান ইমরান এখনো করে তাই সবসময় বুঝিয়ে এসেছে। কতটা বিরক্ত করে ফেলেছে ইমরানকে যে মানুষটা সেদিন গায়ে হাত তুলতেও পিছ পা হয় নি। তবে যাই করেছে কিছু নির্দিষ্ট মানুষের উপস্তিতিতে করেছে। বাইরে একটি খারাপ শব্দ বলেনি। নিজেদের মধ্যে কথার মাঝে অভিযোগ করলেও প্রতিবার সম্মান রেখেছে। নিজেকে অ থৈ সাগরের মাঝখানে পাচ্ছে কাঁকন। ইমরানের কথা শুনেই না হয় এবার নিজেকে প্রস্তুত করবে। যে তাকে চায় না, সে তার কাছে ফিরে যাওয়া যে ভারী অন্যায়। ভালো থাকুক ইমরান তার মোনাকে নিয়ে। আজকের পর আর ওদের বিরক্ত করবেনা। নিজেকে ক্লান্ত মনে হচ্ছে। নিচে নামতে নামতে এতটাই নেমেছে যে এখন মোনাই তার প্রতি দয়া দেখায়।
– কি বললো ইমরান সাহেব?
বারান্দায় শিরশির করা বাতাস। ইমরানের দৃষ্টি শূন্যে। কথা না বলে রুমে ঢুকে গেলো। মোনা পিছু নিলো। বুঝতে পেরেছে রাগ করেছে মানুষটা। তবুও কথা বলার চেষ্টায় আছে মোনা,
– কথা বলছেন না কেনো?
– কি জানতে চাও?
– কি বললো উনি?
– কিছু বলেনি। শুনেছে, আমি বলেছি।
– কি বলেছেন?
– বলেছি এরপর থেকে আমাকে ফোন না দিতে, বেশি শখ হলে তোমাকে ফোন দিয়ে কথা বলতে। তুমি সংসার আর স্বামীর কেচ্ছা শুনাবে।
– আহা! রাগ করছেন কেনো? আপনিই তো বলেন মাথা ঠান্ডা রাখতে।
– তুমি বেশি বোঝো মোনা। আমি আমার কাজ করছি তোমাকে কে বলেছে ওর ফোন রিসিভ করে আমার কানে দিতে?
– আর করবোনা।
– করো! বেশি করে বান্ধবী পাতাও ওই মহিলাকে। দুই সতীন মিলে আমার আলোচনা সমালোচনার আসর জমাও।
ইমরানের রাগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মোনা হেসে বলে,
– রাগলে আপনাকে সুন্দর লাগে। একদম গোলাপজামের মত। জানেন আমি গোলাপজাম অনেক পছন্দ করি। রসে ডোবানো গোলাপজাম। একবার বাবা রাজশাহী থেকে লাল গোলাপজাম এনেছিলো এত্ত মজা। এখন আপনাকে সে রকম লাগছে।
ইমরানের মন চাইলো এগিয়ে গিয়ে মোনাকে তুলে আঁছাড় দিতে। এমন মেজাজ খারাপ করা পরিস্থিতিতে এই মেয়ে অনায়াসে মজা করছে। ইমরানের মুখভঙ্গি দেখে মোনা প্রসঙ্গ বদলাতে বললো,
– শুনুন, আপনাকে হয়তো আমার একজন সিনিয়র ফোন দিতে পারে। এখানে আমার ফোনের নেটওয়ার্ক প্রবলেম করছে। চয়নকে বলেছি আপনার নম্বার দিতে।
ইমরান ফোন এগিয়ে দিয়ে বললো,
– নাম্বার সেভ করে নাও। আমি কোনো মেয়ের ফোন ধরতে পারবোনা এখন। ফোন আসলে কথা বলে নিও।
– মেয়ে না তো ছেলে।
চোখ দুটো ক্ষীণ করে ইমরান প্রশ্ন করলো,
– ঘুরতে এসেছো। সিনিয়রের সাথে কিসের এত কাজ?
– জানিনা। উনি সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবে তাই তো আমি চয়নকে বললাম আমার অভিভাবকের নম্বার দিতে। ফোনটা ধরে ডাক দিবেন প্লিজ। আমি ইশানের কাছে গেলাম। ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন ওই সিনিয়র আমাকে পছন্দ করে প্রায় দুবছর ধরে।
মোনা দরজা খুলে বেরিয়ে যাচ্ছে। একে তো রাগ এর মাঝে গরম তেলে জল দিয়ে রাগের তেজ বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে পেছন থেকে ইমরান চেঁচিয়ে বলছে,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩২
– মোনালিসা ভালো হবেনা বলে দিলাম। ওই ছেলে ফোন দিলে আমি এখানে বসে ঢাকা লোক পাঠিয়ে ওকে থাপ্পড় দেওয়াবো। নাম ভুলিয়ে দিব ওর নিজের সাথে তোমার ও। সাহস কত আমার বউয়ের দিকে চোখ দেয়…
মোনা ততক্ষনে মুচকি হাসতে হাসতে বেরিয়ে পড়েছে। ইমরানকে রাগিয়ে আজ বেশ মজা পেয়েছে। ইমরান মোনার ব্যাপার আসলে এত বেশি চটে যায় ব্যাপারটা মোনা বেশ উপভোগ করে। দেখা যাক কতদূর মজা নেয়া যায়।
