Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪
নীতি জাহিদ

মিনহাজ এবং নয়ন বাকিদের নিয়ে আলোচনায় বসেছে ফ্যাক্টরির ভেতর। ঘেরাও করে রেখেছে শ্রমিকরা পুরো ফ্যাক্টরি। শ্রমিকদের সব দাবি উত্থাপিত হলো। দুজন সব শুনে নতুন সিদ্ধান্ত ঘোষনা করতেই না মানার প্রজ্ঞাপন জারি করলো শ্রমিক দল। হট্টগোল বেঁধে গেলো। কিভাবে যেন লাঠিছোটা বের করে
হা মলে পড়লো অফিশিয়াল কর্মকর্তাদের উপর। ঢিল ছুঁড়তেই নয়নের কপালে লাগলো। আচমকা চোটে, প্রচন্ড আ ঘাত পেয়ে বসে পড়লো নয়ন। হয়তো আধ ইঞ্চি নিচে হলে বাম চোখ আজীবনের জন্য দৃষ্টিশক্তি হা রাতো। মিনহাজ নয়নকে ধরতে গিয়ে খুব জোরে লাঠির আ ঘাত পেলো ডান হাতে। কয়েকজন স্টাফ, অফিসার আ হত হলো। তৎক্ষনাৎ ফ্যাক্টরির দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। চারদিক ধোঁয়াশা হলো। চোখ খুলে রাখা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়েছে। এর মাঝে লাঠিচার্জ ও হলো। ধোঁয়ার মাঝে অদেখা কিছু লোক অফিসারদের আড়াল করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে এলো। আঘাত ও পেয়েছে প্রচুর। ধোঁয়ার পরিবেশ কাটিয়ে উঠতেই সবাই লক্ষ্য করলো শ্রমিকদের চারদিক থেকে বেশ কিছু কালো পোশাক পরা লোক সবাইকে ঘিরে রেখেছে । ইমরান চেয়ারে বসলো। দুজন স্টাফ নয়ন এবং মিনহাজকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছে। সকলকে উদ্দেশ্য করে ইমরান বজ্রকন্ঠ ছাড়লো,

– দাবি মেনে নিয়ে এক মাসের ছুটি দেয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে কোম্পানি এটা কি পছন্দ হয়নি? তাহলে আমার সোজা সাপ্টা কথা আজই সকলকে বরখাস্ত করা হোক মাসের বেতন দিয়ে। কোম্পানিতে কোনো গুন্ডা, সন্ত্রাসী রাখার প্রয়োজন বোধ করছিনা। এসব গুন্ডামী বাইরে গিয়ে রাস্তায় রাস্তায় করলেই বেশ মানাবে। পাঁচশ কর্মীকে ছাটাই করে প্রয়োজনে এক সপ্তাহে ছয়শ কর্মী নিয়োগ দিব। দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো। ম্যানেজার সাহেব এদের চিকিৎসার টাকা সহ এক মাসের অগ্রিম বেতন দিয়ে বের করে দিন।
তিনজনই উঠে যাবে এমন সময় পেছন থেকে এক শ্রমিক চিৎকার দিয়ে বলে,
– এই মাদা*****দ তুই কে আমাদের চাকরি খাওয়ার? জিহবা টা বেশি চলতেছে। তোরে আজকে এখানেই খতম করবো।
এতজন অফিসার, নারী শ্রমিক সকলের সামনে গালিগুলো হজম হলোনা। আগে পিছে, ডান বাম সবকিছু ছাড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে ওই শ্রমিকের গালে ঠাসিয়ে এক চড় মা*রলো। ভীষণ শব্দ হলো। বাকিরা পিছিয়ে গেলো। চিৎকার দিয়ে বললো,

– বাই*****দ, শূ********চ্চা আমি কে? তোর আব্বারে গিয়ে জিজ্ঞেস কর আমি কে? আরেকবার যদি দেখেছি আমার কোম্পানিতে এসে ঝামেলা লাগিয়েছিস তো প্রাণটাও নিয়ে আগাতে দিব না। তুই কি ভাবছিস তোকে পোষা কু*ত্তা বানায় কোম্পানিতে পাঠালে জানতে পারবোনা কে কাজ গুলো করাচ্ছে? যে পাঠিয়েছে তাকে বলবি সাহস হয়তো ইমরানের সামনে এসে কথা বলতে। কাপুরুষের মতো পেছন দিক থেকে ছো*বল না মা*রতে। কামাল ওরে নিয়ে জারিফের নর্দমায় ছুঁড়ে মা*রবি আর বাকিদের চব্বিশ ঘন্টা সময় দিলাম। যদি দেখি আগামীকাল ফ্যাক্টরি খালি,তবে কালই শেষদিন এখানে সবার। ফ্যাক্টরির দরজা বন্ধ হয়ে যাবে তাদের জন্য।
কেঁপে উঠলো সবাই। মানুষটা কিছুক্ষন আগেও মিটিংয়ে শান্ত স্বরে সকলকে বুঝিয়ে বললো। নারী শ্রমিকরা অনেকেই খুশি হয়েছে। অনেক ফ্যাক্টরি তো বেতন ও দিতে চায়না। এখানে তো তাও ছুটি বেতন এবং সাথে চিকিৎসা খরচ দিবে। এতকিছুর পর ও আক্রমনটা ইমরানের সম্মানে লেগেছে।
মিনহাজের আঘাত বেশি লেগেছে। নয়নের কপালে ব্যান্ডেজ। ব্যাথা পেয়েও মিনহাজকে বললো,
– ভাই, ওয় তো দেখি ভালোই গাইল পাড়তে পারে। আমি তো ভাবছিলাম শা*লা ভুইলা গেছে। যেমন ভদ্র মানুষের রূপ ধইরা থাকে। ওর সামনে গাইল পাড়লে মনে হয় কয়েকবার গোসল করে শুদ্ধ হওয়া লাগবে।
মিনহাজ দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে,

– তুই কপালে ব্যাথা পেয়েও মশকরা ভুলিস নি? ও কি না মরদ যে গালি ভুলবে? পুরুষ মানুষ প্রয়োজনেই গালি ছোঁড়ে, আর তাদের উপরই ছোঁড়ে যারা এটার যোগ্য। ঘুষিতে তোর নাক চ্যাপ্টা বানাবে, আপাতত চুপ থাক।
– আমি তো এমনি বললাম, বকতাছো ক্যান?
– চুপ।
ইমরান এগিয়ে মিনহাজের হাত ধরে ওকে নিয়ে বের হলো নয়নকে ধরলো অন্য স্টাফ। গাড়িতে উঠেই শরীর ছেড়ে দিয়েছে মিনহাজের। মিনহাজ এবং নয়নের অবস্থা দেখে ইমরান নিজেকেই দোষারোপ করছে। এতক্ষন হুমড়ি তুমড়ি করা স্বর বেশ ধীর হলো। শান্ত স্বরে বললো,
– ব্যাপারটা এতটা গড়াতে দেয়া ঠিক হয়নি।
নয়ন হেসে বলে,
– এই অল্প ত্যাগে যদি ভালো কিছু হয় তবে ত্যাগই ভালো।
মিনহাজ ও সাঁয় দিলো। ইমরানকে নিরব দেখে ধীর গলায় বললো,
– ওভার থিংকিং বন্ধ কর ইমরান। যা হয়েছে ভালো হয়েছে। আল্লাহ কাউকে নিরাশ করেন না।
ইমরান মুচকি হেসে বললো,

– ভালো চেয়েছি তবে তোমাদের রক্তের বিনিময়ে নয়। রক্ত আমার ঝরুক। রক্ত ঝরিয়েই আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছি।
পরিস্থিতি কিভাবে সামলাতে হয় নয়ন উপলব্ধি করেছে। হেসে হেসে বললো,
– কিন্তু তুই তো গালি ভুলোস নাই এটা দেখে আমি চমকিত,ধমকিত, আশ্চর্যন্নিত?
বিরক্ত নিয়ে ইমরান বলে উঠলো,
– ঢিল মাথায় কয়টা লাগছে? পাগলের প্রলাপ বকছিস কেনো? বাংলাটাও ঠিক মতো শিখিস নি। এসব শব্দ কি তোর অভিধানের? মগজ ঠিক জায়গায় আছে?
– আমার তো আছে। তবে আমি ভীষণ অবাক হলাম। ফ্যাক্টরির কিউসি ম্যানেজার মাহবুবা তোফা তোর দিকে প্রেমের চোখে তাকিয়ে ছিলো। বেচারী বোধ হয় ক্রাশ খেয়েছে? এ্যাই মিনহাজ ভাই, একটা জিনিস খেয়াল করছো তোফা কিন্তু বিয়ে করেন নাই। বয়স মোটামুটি আমার বা ইমরানের মত হবে। ইশ মেয়েটার আজকে শিউর ইমরানকে দেখে এই গান মনে পড়ছে,

আমার ও তো বিয়ার বয়স
হইছে অনেক আগে
তাই তো এখন তোরে দেখলে
কেমন জানি লাগে
তোর জীবনে কিসের অভাব আমি কিন্তু বুঝি
অনেক দিন হয় আমি ও তো
এমন ছেলে খুঁজি…
দরকার একজন রসিক চাবিওয়ালা রে…
রবিন সামনে থেকে কারেকশন করে বলে,
– ওটা ছেলে না মেয়ে হবে, স্যার।
প্রতিউত্তরে নয়ন বলে,
– আরেহ তোহফা তো বলবে ছেলে।
– ও হ্যাঁ হ্যাঁ।
রবিনকে এক ধমক দিলো ইমরান। ধমক খেয়ে চুপচাপ গাড়ি চালাচ্ছে। পেছন ঘুরে ইমরান নয়নের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালো। এই অবস্থায় ও কেউ মজা করতে পারে নয়নকে না থাকলে বুঝার সাধ্য ছিলোনা। নয়ন বুঝতে পেরে এদিক সেদিক কাচুমাচু করছে। ইমরান মিনহাজের দিকে তাকাতেই মিনহাজ ব্যাথার ঘোরে নয়নকে ধমকে উঠলো।
– এক চড় দিবো বেয়াদপ থাম।
নয়ন- ইমরানের মাঝে সেই প্রতিবার ফেঁসে যায়। সাপে নেউলে সম্পর্কে দুটোতে। সময় বুঝেনা যখন তখন যা তা বলে।

নয়নকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে মিনহাজকে নিয়ে তার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে। রিক্তা বসার জন্য জোর করলেও আজ কেউ বসেনি মিনহাজের অবস্থা বেশ খারাপের দিকে। পালটা রিক্তাকে আগ বাড়িয়ে ইমরান বলে এসেছে নয়নের মস্তিষ্কের চিকিৎসা করাতে। রিক্তা কথাবার্তায় বুঝেছে গন্ডগোল পাকিয়েছে। নয়নের যত বোল রিক্তার কাছে আসলেই বন্ধ হয়। ইমরান সঠিক জায়গায় এসে নালিশ করাতে বেচারা চুপসে গিয়েছে।
মিনহাজের ফোনে কল আসলো। কথা শেষ করে মিনহাজ ইমরানের দিকে তাকিয়ে ভাবছে কথাটা কি বলা উচিত হবে? তবু আইঢাঁই করে বললো,
– ইমরান একটু মেয়ের কলেজের দিকে যাওয়া লাগবে যে?
ইমরান চোখ ছোট করে বুঝার চেষ্টা করলো কি বুঝাতে চাইছে? প্রশ্ন করেনি যদি বন্ধু সুলভ সিনিয়র ভাই ইতস্তত করে। তাই সরাসরি উত্তর দিলো,
– আচ্ছা, লোকেশন বলো। রবিন চলো কলেজের দিকে।
ইমরান প্রশ্ন না করাতে মিনহাজ স্পষ্ট উপলব্ধি করলো আগের মতই রয়েছে মানুষটা। কারো ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। প্রশ্ন করাটা জরুরি তবুও প্রশ্ন করেনি৷ তাই নিজ থেকেই বললো,
– মেয়েটা কলেজে চলে গিয়েছে ক্লাস করাটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। এই শরীরে বাসায় কিভাবে পৌঁছাবে? তাই ভাবলাম…
ভ্রু কুঁচকে প্রতিউত্তর করলো ইমরান,

– মিনহাজ ভাই আমি কোনো প্রশ্ন করিনি। কেনো লজ্জ্বায় ফেলছো?
– তুই তো প্রশ্ন কখনোই করিস না।
– প্রয়োজন পড়লে করবো।
কথা বলতে বলতে গাড়ি মোনার কলেজ গেইটে। এই শরীরে গাড়ি থেকে নামতে যাবে তখনই ইমরান গম্ভীর স্বরে বললো,
– নামছো কেনো?
– মোনা গাড়ি চিনবেনা। আমাকে না দেখলে বুঝবে কি করে।
– বসো আমি দেখছি।
ইমরান বের হয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়ালো। গেইট দিয়ে অনেকেই বের হচ্ছে। ছুটির সময়। রবিন ও বের হয়ে আসলো। একটু ঝুঁকে ভেতরে মিনহাজের দিকে তাকিয়ে বললো,
– কোন জন? আমাকে জানিও।
মিনহাজ সামনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– ওই যে, ইউনিফর্ম পরা, লম্বা চুল এক বেণী। সাথে ওর বন্ধু চয়ন ও আছে।
ইমরান রবিনকে ইশারা দিতেই এগিয়ে গেলো। মোনা আর চয়ন একসাথে হাঁটছে। চয়ন মোনাকে খুব করে বকছে। এই শরীরে আসার তো দরকার ছিলোনা। নিজেই মোনার বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসতো প্র্যাক্টিকেল খাতা। মোনা বিরক্ত হয়ে চয়নকে বললো,

– চুপ থাক। জ্বরের শরীরে সব অসহ্য লাগছে।এর মাঝে তোর প্যান প্যান। আচ্ছা বাসায় যখন যাবি আসার সময় গিফট নিয়ে আসিস আমার নতুন পাখির জন্য।
– এক পাখি পাখি করে জ্বর বাঁধালি এখন আবার নতুন কাকাতুয়া। আংকেল তোকে যে কেনো আ ছা ড় দেয় না বুঝিনা।
– মেজাজ খারাপ করবিনা বললাম।
– ওকে ওকে।
হঠাৎ চয়ন ও উৎসাহিত হলো। প্রশ্ন করলো,
– নতুন কাকাতুয়ার নাম কি দিয়েছিস?
– মিন্নি।
– মিন্নিইইইই! এই নাম কেনো?
– আমার নাম মোনা আর পাখির মিন্নি।
– সুন্দর নাম। আচ্ছা বিকেলে যাবো নে।
আচমকা সামনে একজন লোক এসে দাঁড়ায়। দুজন থমকে গিয়ে লোকটাকে দেখতে থাকলো। রবিন কিছু বলার আগেই মোনা বললো,
– এভাবে সামনে দাঁড়িয়ে পড়া কোন ধরনের অভদ্রতা? আপনাকে তো আমরা চিনিনা।
রবিন মা*রাত্মক থতমত খেয়ে গেলো। এতখানি মেয়ের কি দাপুটে ব্যবহার। রবিন দু হাত উঁচু করে বুঝাতে লাগলো,
– স্যরি এভাবে দাঁড়িয়ে পড়তে চাইনি। আপনাদের মধ্যে মোনা কে?
চয়ন ভেবেছে আগে জানুক লোকটা কি চায়,এরপর না হয় বলবে। এর আগেই মোনা বললো,

– আমি, কেনো?
– আপনার বাবা এসেছে। ওই যে গাড়িতে আছে। আপনাকে নিয়ে যেতে বললো।
মোনা এক পলক তাকালো ইঙ্গিত করা গাড়ির দিকে। বাবার গাড়ি সাদা,আর এটা কুচকুচে কালো, সামনের দুটো লাইট নির্ঘাত ঘোর অন্ধকারে বিপ বিপ করে জ্বলবে। দেখতে পুরোপুরি কালো চিতার মত। আর দেহেও বেশ বড় বাবার গাড়ির তুলনায়। তাকিয়ে দেখলো অপরিচিত গাড়ির সামনে অচেনা সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত লোক দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ মাথায় ভয় খেললো। রবিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
– সত্যি করে বলুন,আপনি ছেলেধরা নাতো? গাড়িটা আমার বাবার নয়,আর যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, উনি আমার বাবা নয়। যেমন কালো গাড়ি, তেমন গাড়ির মালিক। একেবারে ব্ল্যাক ডায়মন্ড। মানিকে মানিক চেনে। এনিওয়ে, ব্ল্যাক ডায়মন্ডের ড্রাইভার, আমি কিন্তু চেঁচাবো।
রবিন চমকে উঠলো। কি আশ্চর্য! স্যারকে কালো বললো! দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বললো,
– আরেহ উনি কেনো আপনার বাবা হবে? আর স্যারকে কালো বলছেন কেনো? আপনার বাবা গাড়ির ভেতর। উনার শরীর খারাপ। আগে চলুন সামনে। বাবাকে পছন্দ না হলে অন্য গাড়িতে উঠবেন।
কি বললো লোকটা! বাবাকে পছন্দ না হলে? কত্ত বড় কথা। ক্ষেপে বললো,
– এ্যাই অভদ্র লোক। বাবা কিভাবে অপছন্দ হয়? যাবোনা আপনার গাড়িতে।
রবিন দু হাত জোর করে বললো,

– স্যরি ম্যাডাম আমি তা বলিনি। হাত জোর করছি প্লিজ সামনে চলুন, যেয়ে নিজ চোখেই দেখুন।
চয়ন হাত ধরে আশ্বস্ত করে মোনার। রবিনের পেছন পেছন এগিয়ে এলো। এতক্ষন দূর থেকে সব দেখছে ইমরান এবং মিনহাজ। মিনহাজ লজ্জায় পড়ে গেলো মেয়ের আচরনে। নিশ্চিত রবিনকে আচ্ছামতন কথা দিয়ে ধোলাই দিচ্ছে। ইমরান নিশ্চুপ। চোখে এখনো আগের মত রোদচশমা। সাদা পাজামা পাঞ্জাবিতে সুপুরুষ লাগছে। মোনা এবং চয়ন গাড়ির কাছে আসতেই ইমরান গাড়ির দরজা খুলে দিলো মোনার জন্য। ভীষণ অবাক হলো মেয়ে দুটো। এভাবে কেউ দাঁড়িয়ে ছিলো গাড়ির দরজা খোলার জন্য ব্যাপারটা খুবই আশ্চর্যজনক। ঘুরে ঘুরে ইমরানকে দেখছে। মোনা সামনে আসতেই বাবাকে দেখে একটু খানি হাসলেও হাতে ব্যান্ডেজ দেখে কেঁদে দিলো। রবিন চয়নকে প্রশ্ন করলো,
– ম্যাডাম আপনি কি যাবেন?

চয়ন দু পাশে মাথা নেড়ে জানালো যাবেনা। মোনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। এদিকে মোনা এখনো আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে। মিনহাজ মেয়ের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে মেয়েকে ভেতরে বসার জন্য বললো। চোখ ভর্তি পানি নিয়ে মোনা ভেতরে ঢুকতেই ইমরান দরজা আটকে রবিনের সাথে সামনের সিটে বসলো। মোনা বাবার এই অবস্থা দেখে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। মেয়েকে বুকে নিয়ে সুস্থ হাতে আগলে নিয়ে চুলে আদর করে বললো,
– আম্মাজান, এমন করলে হবে? কেনো কাঁদছেন। বাবার হালকা ব্যাথা লেগেছে।
কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠিয়ে বলে,
– আমি দেখতে পাচ্ছি অনেক ব্যাথা লেগেছে। কে ব্যাথা দিয়েছে আমার বাবাকে। তাকে মে*রেই ফেলবো। আমার বাবার কিছু হলে আমার কি হবে?
– প্রিন্সেস তাকাও বাবার দিকে। দেখো কিচ্ছু হয়নি। সামনে দেখো একজন আংকেল আছেন উনি পঁচা ভাবছে আমার প্রিন্সেসকে?
নাক টেনে মোনা সামনের সিটে তাকায়। ইমরানকে উদ্দেশ্য করে মিনহাজ বললো,

– ইমরান, আমার মোনাশা।
ঘাড় ঘুরিয়ে ইমরান ইষৎ হেসে হাত তুলে হাই দেয়ার ভঙ্গিতে বললো,
– হাই, মোনালিসা।
মোনা বাবার দিকে তাকায়। দু অধর আগলা করেই বুঝার চেষ্টা করে লোকটা মোনালিসা কেনো ডাকলো! ইমরান এতটুকু বলেই পুনরায় রাস্তায় মনোযোগ দেয়। মিনহাজ হেসে মেয়েকে বললো,
– আপনার মনে পড়ে আম্মা, আপনাকে ইমরান মোনালিসা বলেই ডেকেছিলো আরো আগে। ফোনে কথা হয়েছিলো তখন আরেকটু ছোট ছিলেন।
মোনা দুপাশে ‘না’ জানিয়ে মাথা নাড়ে। ইমরানকে আরেকবার দেখতে ঘাড় কাত করে। মিররে মোনার এই অবস্থা দেখে কিঞ্চিৎ হেসে পেছন ফিরলো। মোনা আচমকা এক বিস্ময়কর উক্তি করে বসলো,
– মি.ইমরান… নাহ ভালো শুনাচ্ছে না। ইমরান সাহেব আপনি অনেক স্মার্ট। হাসিটা খুব সুন্দর।
মোনার হঠাৎই মনে হলো মানুষটার হাসি চরম সুন্দর। চমকে উঠলো গাড়িতে উপস্থিত প্রতিটি মানব প্রানী। চক্ষুদ্বয় বৃহদাকৃতি ধারণ করলো। মিনহাজের দিকে তাকাতেই বুঝলো লজ্জা পেয়েছে মেয়ের কথায়। মোনার হুটহাট এমনভাবে মানুষকে অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়ার অভ্যাস আছে তা মিনহাজের জানা, তবে ইমরানের তো অজানা। ধুম করে গাড়ির ব্রেক কষলো রবিন। ক্ষেপে মোনাকে বললো,

– এই আপনি না একটু আগে স্যারকে ব্ল্যাক ডায়মন্ড বললেন?
মোনা লজ্জা পেয়ে জিহবায় কামড় দিয়ে বলে,
– তখন তো রোদের মাঝে চকচক করছিলো, বাস্তবে অত কালো নয়। চকলেট কালার। ভীষণ স্মার্ট, গায়ের রঙ রোদে পড়া শ্যাম বর্ণ,তামাটে আর কি।
খুক খুক করে কেশে উঠলো ইমরান। হতচকিত হলো এমন বাক্য শুনে। পানির বোতল থেকে পানিটুকু গিলে পরিস্থিতি সামাল দিতে বললো,
– ইয়েস ডিয়ার, ইউ আর অলসো ভেরি প্রিটি। লাইক আ বার্বি ডল।
হাসি পেলো ইমরানের। কি অদ্ভুতভাবে সজ্ঞায়িত করলো গায়ের রঙকে। মুখ হাত দিয়ে ঠোঁট চেপে হাসি আড়াল করলো।
এবার মিনহাজ হেসে দিলো। বুঝতে পারলো পরিস্থিতি স্বাভাবিক। ইমরান ও ব্যাপারটা সহজ ভাবে নিয়েছে। ইমরানকে উদ্দেশ্য করে বললো,

– কিছু মনে করিস না ইমরান, ও মাঝে মাঝেই এমন বেফাঁস কথা বলে ফেলে।
ইমরানা উপর নিচ মাথা নেড়ে সামনে তাকায়। মোনা প্রসঙ্গে বদলে বাবার হাতটা কাছে নিয়ে চুমু দিয়ে বলে,
– আমার খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা, এখানে অনেক ব্যাথা তাই না? আজকে সারা রাত মোনা তোমার পাশে থাকবে।
মিনহাজ মেয়েকে আগলে ধরে বললো,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩

– কিন্তু মোনা পাখিও যে অসুস্থ।
বাবা মেয়ের টুকটাক কথা কানে আসছে ইমরানের। সামনে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ভাবছে আগামীকাল ফ্যাক্টরিতে কি কি হতে পারে। একটা বড় রকমের দুশ্চিন্তা তৈরি হলো। বাইরের মহলকে কাল ইতালী থেকেই শনাক্ত করে নিয়েছে। ছোট্ট জীবনটাতে আর কোনো ঝামেলা চায়না ইমরান।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫