প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২১
সাইদা মুন
—তবে যাই বলিস, তোকে আজ বেশ বিবাহিত বিবাহিত লাগছে…
তাহিয়ার কথায় মেহরীনের মনে হঠাৎ অন্য এক ভাবনা খেলে গেল। সে তাড়াতাড়ি গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের প্রতিচ্ছবিটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। সেলোয়ার কামিজের সাথে মাথার বড় ওড়নাটায় পুরো শরীর ঢেকে রয়েছে, হাতে ঝুলছে একজোড়া বালা, যেন সত্যি সত্যিই নতুন বউ নতুন বউ লাগছে!
ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
—আমি তো বউই, মিঃ তালহা সিকদারের একমাত্র বউ।
এই কথাটুকু উচ্চারণ করতেই গাল জুড়ে ছড়িয়ে গেল লাল আভা। মুখের রঙ সাদা থেকে ধীরে ধীরে লালচে হয়ে উঠল, চোখে ঝিলিক দিচ্ছে আনন্দের আলোরা। তালহা তাকে এই নিয়ে তিন তিনবার উপহার দিয়েছে, মনে হচ্ছে খুশিরা যেন দল বেঁধে বুকের ভেতর নাচছে।
খুশিতে মেহরীনেরও ইচ্ছে করল নাচতে। ভাবনা যেই, কাজ সেই। দৌড়ে গিয়ে তাহিয়াকে টেনে এনে দুজনে একসাথে কাপল ডান্সে মেতে উঠল। তাহিয়া তো তার বাচ্চামোতে হেসে খুন। তার ভাইয়ের ছোট বড় প্রতিটি প্রয়াসেই যে মেয়েটি ভীষণ খুশি হয়ে যায়। মেহরীন ঠিক তার নামের মতোই, সুন্দর, কোমল, আর ভীষণ মনখোলা। আজ অবধি কাউকে নিয়ে তাকে ঈর্ষা করতেও দেখেনি সে। উল্টো কেউ কটু কথা বললে তা হেসে উড়িয়ে দেয়, যেমনটা করেছিল রিতুর কথায়ও। মাঝে মাঝে তাহিয়ার খুব খারাপ লাগে, মেহরীনের তো কেউ নেই, সে একা। এইসব ভেবে কিন্তু পরক্ষণেই ভাবে, না, আমরা তো আছি।
ভাবনার মাঝেই হঠাৎ নাচ থামিয়ে মেহরীনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাহিয়া। মনে মনে দোয়া করল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—আল্লাহ, এই মেয়েটাকে তুমি দুনিয়ার সব সুখ এনে দিও। তার জীবনে যা আসুক, তা যেন তার কল্যাণেই আসে। আমার ভাইও যেন তার সত্যিকার ভালোবাসা খুঁজে পায় ওর মধ্যেই। তাদের মিলিয়ে দিও, আল্লাহ।
এরই মধ্যে তালহা ঢুকে পড়ল ঘরে। তাকে দেখে দুজনেই দ্রুত পড়ার টেবিলে গিয়ে বসে যায়। পড়া শেষ করতে করতে রাত দশটা বেজেছে। তারপর উঠে একটু হাত-মুখ ধুয়ে নিচে নামে রাতের খাবার খেতে।
টেবিলে সবাই উপস্থিত, তারাও বসতেই বাড়ির গিন্নিরা পাতে পাতে খাবার তুলে দিতে লাগলেন। তিতলি বেগম মেহরীনের প্লেটে ভাত বেড়ে দিতে গিয়ে হঠাৎ তার হাতের দিকে চোখ পড়ল। কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলেন,
—কিরে মা, তোর হাতের ওই বালা-জোড়া কার? আগে তো দেখিনি।
এক মুহূর্তে সবার দৃষ্টি চলে গেল মেহরীনের হাতের দিকে। হঠাৎ এত চোখ নিজের দিকে টের পেয়ে থতমত খেয়ে গেল সে। কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। তার এমন অভ্যাস, নার্ভাস হলেই উল্টোপাল্টা কথা বলে ফেলে। এখন যদি কিছু ভুল বলে ফেলে, তালহা যে সঙ্গে সঙ্গে ধমক দেবে, সেটা নিশ্চিত জানে সে। তাই চুপ করে রইল।
পাশ থেকে তানিয়া বেগমও এগিয়ে এসে বললেন,
—হ্যাঁ রে, দেখতে তো মনে হচ্ছে সোনার। ডিজাইনটা বেশ সুন্দর। কার রে এইটা?
মেহরীন আড়চোখে তালহার দিকে তাকাল। তালহা নির্বিকার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকেই। সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলল মেহরীন। থমথমে কণ্ঠে কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই রিতু বলে উঠল,
—নিজেদের গয়নার বক্স চেক করে দেখো, কার না কারটা জানি চুরি করেছে। এইসব ছোটলোকদের এসবই কাজ। বড় বাড়িতে থাকে, খায়, আবার চুরিও করে।
মেয়ের কথা শুনতেই তানিয়া বেগম ধমকে উঠলেন,
—রিতু, বাজে কথা বন্ধ কর।
এদিকে রিতুর কথা শুনে মেহরীনের বুকটা ধক করে উঠল। অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল রিতুর দিকে। এতদিন ধরে এই বাড়িতে রয়েছে, কখনও অনুমতি ছাড়া একটা ফুলও ছোঁয়নি, সেই তাকেই আজ চোর বলে দিচ্ছে এতো সহজেই। তারা তো তার স্বভাব জানে, তাহলে এই অপবাদ দেয় কিভাবে?
রিতুও তার দিকে ঘৃণাভরা চোখে তাকিয়ে। তালহার কপালের রগ নীল হয়ে ফুলে উঠেছে, রাগচটা গলায় গর্জে উঠল,
—শাট আপ, রিতু। দুদিন পর তুই বিয়ের পিরিতে বসবি, আর এখনো শিখিসনি কার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়? এই শিক্ষা দিয়েছি আমরা? শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তো আমাদের মানসম্মান খোয়াবি দেখছি।
তআ শুনে রিতু মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
—শ্বশুরবাড়িতে তো আর এমন গরিব লোকজন থাকবে না…
সঙ্গে সঙ্গে বিল্লাল সাহেবও গর্জে উঠলেন,
—রিতু! ভুলে যেও না, সবার আগে আমরা মানুষ। ধনী-গরিবে পার্থক্য করতে শেখাইনি তোমাকে কখনো। আমি জীবনে একটা রিকশাওয়ালাকেও অসম্মান করে কথা বলিনি। সেই বাপের মেয়ে হয়ে তুমি এমনভাবে কথা বলছ, ছি।
বিল্লাল সাহেবের ধমকে রিতুর মুখ একদম চুপসে গেল। বাকিরাও তাকে বকাবকি করছে। তার ভীষণ রাগ হচ্ছে কিন্তু সেই রাগ, সেই অপমান যেন গিয়ে পড়ল মেহরীনের ওপর। তার জন্যই আজ সবাই রিতুকে ধমক দিচ্ছে, ভাবতেই সে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল মেহরীনের ওপর। তবু নিজেকে সামলে নিল, ভাবল, পরে দেখা যাবে। কাঠ কাঠ গলায় বলল,
—সরি মেহরীন, আমার এভাবে বলা উচিত হয়নি।
তার কথাতে মেহরীন হালকা হেসে উঠল। সেই হাসিতে কী তাচ্ছিল্য ছিল, নাকি অন্য কিছু, কেউ বুঝে উঠতে পারল না। পাশে বসা তাহিয়া তার হাত চেপে ধরে চোখের ইশারায় সান্ত্বনা দিচ্ছে। বাকিরাও বলতে লাগল, “কিছু মনে করো না মা, মানুষ বলতেই ভুল।” মেহরীন মাথা নেড়ে সায় দিয়ে, রিতুর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
—আপু, গরিব হতে পারি, কিন্তু চোর না। আপনাদের মতো মহান মানুষজন আমার মতো এতিমকে আশ্রয় দিয়েছেন, বিনা স্বার্থে খাওয়াচ্ছেন, পড়াচ্ছেন, ভালো রাখছেন। এজন্য আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। যদি বলেন, আপনাদের পা ধরে বসে থাকতে, তাও রাজি। কিন্তু আপনাদের খেয়ে, আপনাদের পড়ে, আপনাদেরই পিছে ছুরি মারব। এমন মানুষ আমি নই।
তার কথায় সবাই অসহায় চোখে তাকায় তার দিকে, সকলেই অপরাধবোধ করছেন। তিতলি বেগম মেহরীনকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
—কে বলল তুই এতিম? আমরা কি মরে গেছি নাকি, আমরা আছি তো মা। রিতুর কথায় কিছু মনে করিস না, ও একটু অবুঝ, কিন্তু মন থেকে ভালো।
মেহরীন হেসে বলল,
—কি যে বলো আন্টি, রিতু আপুর কথায় আমি কিছুই মনে করিনি। আপু তো আমার বড় বোনের মতোই। এক কথা বলতেই পারেন।
কথার মাঝে তালহার গম্ভীর কণ্ঠে সবার কথা থেমে গেল।
—বালাজোড়া মেহরীনের মায়ের শেষ স্মৃতি। এতদিন আমার কাছেই ছিল। এখন ও নিজের কাছে রাখতে চায়, তাই পরে আছে। এখন কারও আর কোনো প্রশ্ন আছে? কোনো সন্দেহ?
তার কথায় সকলেই মাথা নেড়ে বুঝায় না। তারপর সবাই খাওয়া দাওয়ায় মন দেয়। একপর্যায়ে বড়দের থেকে জানতে পারে, এই শুক্রবারে রিতুকে ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে। বাড়িতে বিয়ে শুনতে পেয়ে তাহিয়া খুশিতে নেচে উঠে, সাথে মেহেদিও। বাড়ির প্রথম বিয়ে বলে কথা, সকলেই খুশি। রিতুর দিকে তাকাতেই এবার তার মুখেও কিছুটা লজ্জার দেখা মিলে।
তবে তিতলি বেগমের মুখে তেমন একটা খুশির ছাপ দেখা গেল না। তা দেখে বিল্লাল সাহেব তার উদ্দেশ্যে বললেন,
—আপা, তোমাকে দেখে তো খুশি লাগছে না। তোমার কি এই বিয়েতে মত নেই? বলো, তাহলে ওদের আসতে না করে দেবো।
তার কথায় তিতলি বেগম তালহার দিকে চেয়ে আফসোসের সুরে বললেন,
—চেয়েছিলাম আগে ছেলেটার বিয়ে দিয়ে তারপর মেয়েগুলোকে দেব। তবে আমার এই ছেলে তো বিয়ের কথা শুনলেই এড়িয়ে যায়।
বিল্লাস সাহেব আড়চোখে তালহার দিকে তাকালেন। এদিকে মেহরীনের বুকটা যেন মোচর মেরে উঠলো, তালহার বিয়ে মানে সে তালহাকে হারিয়ে ফেলবে। কথাটি ভাবতেই গলায় খাবার আটকে গেল, চিবানোর শক্তিও যেন পাচ্ছেনা। নির্লিপ্ত চোখে দ্রুত তাকাল তালহার দিকে। তবে তালহা নিজের মতো খেয়ে যাচ্ছে, যেন এসব বিষয়ে তার কোনো আগ্রহই নেই।
তার এমন হেয়ালিপনা দেখে তিতলি বেগম রেগে উঠলেন,
—এবার যাই হোক, আমি আর মানবো না। রিতুর বিয়ের পরপরই তালহার বিয়ে দিব। এবং আমার পাত্রিও পছন্দ করা আছে, শেষ কথা।
এতোক্ষণ যতটা নআ খারাপ লাগছিল, তিতলি বেগমের শেষ কথায় যেন তা আরও বেড়ে গেল। মেহরীনের হাতে থাকা ভাতও পড়ে গেল প্লেটে। হঠাৎ বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগতে লাগলো। যেন কিছু একটা হারিয়ে ফেলছে। ‘তালহার জন্য পাত্রি পছন্দ’ মানে তার সাথেই তালহার বিয়ে হবে। কথাটি মনে আসতেই ধম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো।
তাহসান পাশ থেকে উঠে বলল,
—আরে ফুফু, লাগাও বিয়ে, তখন এমনি দৌড়ে এসে বিয়েতে বসবে।
তার কথায় বাকিরাও সায় দিচ্ছে, সকলে হাসা-হাসি করছে। শুধু মেহরীন বাদে, তার চোখে হঠাৎ জ্বালা শুরু হয়েছে। পানি চোখের কোণে চিকচিক করে উঠেছে, মনে হচ্ছে এই বুঝি পড়ল। তালহা নিস্তব্ধ চোখে মেহরীনকেই দেখছে, যেন কিছু বুঝার চেষ্টা চালাচ্ছে। মেয়েটির চোখের পানির রেখা দেখে তার মনে প্রশ্ন জাগালো, বিয়ের কথায় কাদছে না তো মেয়েটা?
মেহরীন দ্রুত উঠে দাঁড়ালো, চোখে বাম হাত দিয়ে নিজের চোখের পানি আড়াল করতে চাইল সে। ভাঙা গলায় কোনোমতে বলল,
—আ..আমার চোখে তরকারির ঝোল পড়েছে, একটু ধুয়ে আসি।
বলেই আর কারো উত্তরের আশা না রেখে ছুটে গেল রান্নাঘরে। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাতে মুখে পানি ঝাপটা দিতে শুরু করল। বেসিনে হেলান দিয়ে দাড়াত এখন যেন শরীরের শক্তি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। চোখ বেয়ে অঝোরে পানি ঝরছে, থামার নামই নেই। বারবার পানির ঝাপটা চোখে-মুখে মারছে। কান্নার ফলে নাকও টানতে শুরু হয়েছে। জামা ওড়না ভিজে-টিজে একাকার।
এদিকে সকলের কথার মাঝে তালহা খাবার শেষ করে উঠে দাঁড়ালো। শান্ত, তবে সতর্ক কণ্ঠে বলল,
—আমার বিয়ের সময় হলে আমি নিজেই বলব। তার আগে যেন কেউ এসব বিষয়ে আমার অমতে আগ না বাড়ায়।
উঠেই সে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে, পেছনে ফেলে গেল পরিবারের আফসোস। সকলেই হায়-হোতাশ করছে, এই ছেলে বিয়ের জন্য কখন রাজী হবে এই ভেবে।
মেহরীন একের পর এক টানা পানির ঝাপটা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে দাঁড়ালো। পানির টেপ বন্ধ করে পেছনে ফিরতেই ধাক্কা লাগলো কারো বুকের সাথে। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠল, মাথা কিছুটা পিছিয়ে চোখ তুলে তাকাল। দেখতে পায় তালহাকে শান্ত চোখে চেয়ে আছে তার দিকেই।
মেহরীন চোখ পিটপিট করতে করতে তাকে পরখ করে। তালহার পড়নের টিশার্ট বুকের দিকে ভিজে একাকার। মনে হচ্ছে, কেউ যেন পানির ঝাপটা দিয়ে ওইটুকু ভিজিয়ে দিয়েছে।
তালহা মেহরীনকে পূর্ণ চোখে তাকিয়ে দেখে চলেছে। মেয়েটির চোখ লাল, কেদেছে স্পষ্ট, কান্নার ফলে নাকের ডগাও টকটকে লাল হয়ে আছে। তবে কান্না করেছে কেন, বিয়ের কথা শুনে নাকি সত্যিই ঝোল পড়েছে৷ তালহা বুঝতে চায় আসল কারন।
সেখানেই দাঁড়িয়ে বুকে দুই হাত গুঁজে দাঁড়ালো তালহা, নিচু কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
—পানি দিয়ে নিজে গোসল করলে, সাথে আমাকেও ভিজিয়ে দিলে?
মেহরীন অপরাধী কণ্ঠে বলল,
—স..সরি, আপনি যে আমার পেছনে ছিলেন, খেয়াল করিনি।
তালহা এবার কিঞ্চিৎ নিচু হয়ে মেহরীনের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল,
—কাদছিলে কেনো?
এতোক্ষনের মেহরীন চোখে চোখ রেখে কথা বললেও। এবার চোখজোড়া সরিয়ে নেয় এদিক সেদিক তাকানো তার চোরাচাহনি। আমতা আমতা করে বলল,
—আ..আমার চোখে ঝোল পড়েছিল।
তালহা আর কিছু বলার আগেই কারো পায়ের শব্দে চুপ করে সরে দাঁড়ালো। সাথে সাথে মেহরীনও দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল সেখান থেকে। তালহাও হাত ধুয়ে নিজের রুমে চলে গেল।
আজ বৃহস্প্রতিবার কলেজ কর্তৃপক্ষ আগের রাতেই নোটিশে জানিয়ে দিয়েছে, আজ কোনো অজ্ঞাত কারণে কলেজ বন্ধ। এতে সকলেই খুশি। আজ তারা বাড়ির সবার সঙ্গে সময় কাটাতে পারবে।
সকাল আটটায় সকলেই খাবারের টেবিলে নাস্তা করছে। তালহারা নাস্তা শেষ করে অফিসে চলে গেছে। এখন বাড়িতে শুধু মহিলারা, তারা আস্তে আস্তে গল্পগুজব করছে আর নাস্তা উপভোগ করছে। কারণ আজ কারো কোনো তাড়া নেই। আগামীকাল রিতুকে দেখতে আসবে ছেলেপক্ষ, তাই সকলে আজ পার্লারে যাবে স্কিন কেয়ার করার জন্য। এই বিষয় নিয়েই আলোচনা চলছে। যদিও বড়রা যেতে চায়নি তবে জোড়াজুড়িতে তারাও যেতে রাজি। একদিন তো নিজেদের সময় দেয়াই যায় বুড়ো হয়েছে তো কি হয়েছে, এই ভেবে।
মেহরীন চুপচাপ তাদের কথাবার্তা শুনছে। সে কখনো পার্লারে যায়নি, তবে মোটামুটি ধারনা আছে। তাদের গ্রামের এক মেয়ে শহরে তার খালার বাসায় থাকতে গিয়ে পার্লারের কাজ করতো, তার থেকে গল্প সে শুনেছে।
খাওয়া শেষ হতেই মেহরীন আর তাহিয়া ছাদে চলে যায়। সকালটা ছিল একদম শান্ত আর উজ্জ্বল। হালকা রোদটা ঠিক যেন শরতের শেষ দিকের কোমল উষ্ণতা নিয়ে ছাদজুড়ে ছড়িয়ে আছে। দূরে কোথাও থেকে পাখির ডাক ভেসে আসছে, মাঝে মাঝে হালকা বাতাস এসে গায়ে লাগছে।
মেহরীন দোলনার দিকে এগিয়ে গিয়ে পা তুলে আরাম করে বসে পড়ল। রোদে তার চুলের আগাগুলো চিকচিক করছে, চোখে প্রশান্তি। তাহিয়া এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করছে, একটু পরপর পাশের বাসার ছাদে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। গালে হাত দিয়ে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আফসোসের সুরে বলল,
—আজ তো ভালোই রোদ উঠেছে। আচার কি শুকাতে দিবে না ওরা?
হঠাৎ কেউ বলে উঠল,
—চুরি করে খেতে ধারুন লাগে বুঝি?
তাহিয়া আনমনেই উত্তর দিল,
—হুম, ভীষণ টেস্টি লাগে।
কিন্তু পরমুহূর্তেই টনক নড়ে—কথাটা বলল কে, পেছন ফিরে মেহরীনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—মেহরীন, মাত্র কি তুই প্রশ্ন করলি?
মেহরীন কিছুটা দূরে থাকায় শুনতে পায়নি কিসের প্রশ্ন, তবে তাহিয়ার প্রশ্নে মাথা নেড়ে না বলে। তা দেখে তাহিয়া চিন্তায় পড়ে গেল, সে ভুল শুনেছে নাকি কেউ সত্যিই বলেছে। ভাবনার মাঝেই কেউ আবার বলে উঠল,
—তুমি ঠিকই শুনেছো, লিলিপুট।
আবারও চমকে উঠল তাহিয়া। পাশের ছাদের সবদিকে চোখ ঘুরাল, কিন্তু কাউকেই দেখতে পেল না। ভয়ে ঢুক গিলে বলল,
—ফ..ফারিস ভাই, আপনি কি ছাদেই আছেন? আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না।
ফারিস হেসে উত্তর দিল,
—কিইই, আচার খেতে খেতে চোখও খেয়ে ফেলেছ নাকি? আমি তো ছাদেই আছি, দেখছো না লিলিপুট?
তাহিয়া দু’কদম পিছিয়ে গেল। চোখ কচলে ফের তাকাল, কিন্তু কাউকেই দেখতে পেল না। ভীতু স্বরে বলল,
—সত্যি বলছি, আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না।
ফারিস শব্দ করে হেসে বলল,
—আরে, যাক। আমার জাদু এতোদিন কাজ করল।
এই কথাটি শুনে তাহিয়ার মনে কৌতূহল জাগল,
—জাদু? আপনি কি জাদু করে ভ্যানিশ হয়েছেন?
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি অনেকদিন ধরে জাদু শিখছিলাম। আজ দেখি কাজও করল।
তাহিয়া সত্যিই বিশ্বাস করে বসলো। এগিয়ে গিয়ে বলল,
—আপনি আবার মানুষ হতে পারবেন?
—আমি কি এখন অমানুষ?
—না, বলতে চাচ্ছি, আপনাকে কি আবার দেখা যাবে?
—অবশ্যই।
এদিকে তাহিয়াকে একা একা কথা বলতে দেখে মেহরীন আশেপাশে তাকালো, কেউ নেই। মেয়েটা কি বলছে বুঝছেও না। তাই উঠে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল তার পাশে,
—কিরে, কার সঙ্গে কথা বলছিস?
মেহরীনকে দেখে তাহিয়া উৎফুল্ল হয়ে বলল,
—জানিস, ফারিস ভাইয়া ম্যাজিক করে ভ্যানিশ হয়েছে, আমাকেও শিখাবেন এই জাদু।
তাহিয়ার আবুলতাবুল কথায় মেহরীন কপাল কুচকে বলল,
—মাথা খারাপ হয়েছে নাকি তোর?
তাহিয়া বিশ্বাস করাতে টেনে নিজের পাশে দাঁড় করালো,
—আরে না, সত্যি, ফারিস ভাইয়া শুনতে পাচ্ছেন। মেহরীনের সামনেও কথা বলে দেখান তো।
ফারিস বলল,
—হাই, ছোট্ট বন্ধু, কেমন আছো?
কথাটুকু শুনে মেহরীন কিছু ভয় পেয়ে উঠল। দ্রুত আশেপাশে চোখ বোলালো কিন্তু কেউ নেই। তাকে ভয় পেতে দেখে তাহিয়া হেসে বলল,
—দেখলি তো। আচ্ছা ভাইয়া, এবার আপনি ঠিক হোন তো।
—তোমাদের সামনে আসবো?
—হ্যাঁ, হ্যাঁ।
—তাহলে তুমি পেছন ফিরো।
—কেনো? আপনার সামনে আসতে পারবেন না?
—আরে তুমি তো জাদু শিখবে। যে শিখে, তার সামনে জাদু করা যায় না।
সহজ-সরল তাহিয়া তার কথামতোই পেছন ঘুরে দাঁড়াল। তবে মেহরীনের মনে হচ্ছিল কোনো ঘাপলা আছে। যা ভেবেছে তাই হলো, ফারিস রেলিং এর নিচ থেকে উঠে দাঁড়ালো। তা দেখে মেহরীন ফিক করে হেসে দিল। ফারিস ইশারায় চুপ থাকতে বলল, চোখ টিপ দিয়ে তাহিয়াকে বলল,
—এবার তাকাও।
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ায়। তালে দেখে অবাক হয়ে বলল,
—ওয়াও, আপনি সত্যি সত্যি জাদু পারেন।
ফারিস হালকা রেগে বলল,
—তো এতক্ষন কি আমি মিথ্যা বললাম? যাও, শিখাবো না।
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে মুখ ইনোসেন্ট করে বলল,
—না না, প্লিজ, শিখান। আমার অনেকদিনের শখ, জাদু শিখবো।
ফারিস ভাব নিয়ে বলল,
—ওকে, যেহেতু এতো করে রিকোয়েস্ট করছ, শিখাবো। আমি কিছু মন্ত্র বলব, সাথে সাথে উচ্চারণ করবে কেমন?
তাহিয়া খুশি হয়ে মাথা নাড়িয়ে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো। মেহরীন নিরবদর্শক হয়ে মজা নিচ্ছে। ফারিস বলতে লাগল,
—চু মান্তার চু কালি কুত্তার পটি ছুউউউউউ।
তাহিয়া নাক কুচকে বলল,
—ইয়াক, এইটা কেমন কেমন না? জাদুতে কি এসব মন্ত্র থাকে?
ফারিস পকেটে হাত গুঁজে বলল,
—শিখতে চাইলে বলো, না চাইলে নাই।
কিন্তু তাহিয়া তো শিখতে চায়, তাই আর না ভেবে সঙ্গে সঙ্গে বলল। ফারিস মোবাইল বের করে বলল,
—তুমি তিনবার এই মন্ত্র পড়ে নিজের ওপর ফু দেবে। আমি ভিডিও করে দেখাবো, তুমি যে ভ্যানিশ হয়েছ।
তাহিয়া সম্মতি জানিয়ে তিনবার উদ্ভট মন্ত্রটি পড়ল ও নিজের গায়ে ফু দিল। সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,
—আমাকে কি এখন দেখা যাচ্ছে?
ফারিস অবাক কন্ঠে বলল,
—ওমা, তাহিয়া, কোথায় তুমি? প্রথমবারেই পেরেছ। আমার তো অনেক সময় লেগেছিল।
কথাটুকু বলেই মেহরীনকে ফের চোখ টিপ দিল। তা দেখে মেহরীন হেসে বলল,
—আরে তাহিয়া, তোকে তো দেখা যাচ্ছে না।
দুজনের কথায় তাহিয়া খুশিতে উড়াধুরা নাচতে লাগল।
—ইয়েএএএ আমি জাদু শিখে গেছি, এখন থেকে ভ্যানিশ হয়ে পরীক্ষার আগের রাতে স্যারের বাসায় গিয়ে সব প্রশ্ন জেনে নিবো। স্যার টের ও পাবেনা ইয়েএএএ।
ভ্যানিশ হয়ে যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে ভেবে তার তো খুশির সীমা নেই। তবে তার এসব বাচ্চামি যে সবাই দেখছে, তা তো বেচারি জানেনা। এবার সে ফারিসকে বলল,
—দেখি, ভাইয়া, আপনার মোবাইলে আমাকে দেখা যায় কিনা।
ফারিস ভিডিও অফ করে মোবাইল পকেটে রাখল,
—আরে, দেখা যায় না। আগে বাড়ির লোকদের ভয় দেখিয়ে আসো যাও যাও।
তাহিয়া নাঁচতে নাঁচতে নিচে নেমে গেল। মেহরীন খিলখিলিয়ে হাসছে, সঙ্গে ফারিসও।
—ভাইয়া, আপনি কিন্তু আমার বান্ধবিটাকে সহজ সরল পেয়ে বোকা বানালেন।
ফারিস মাথা চুলকে হাসল। মেহরীন প্রশ্ন করল,
—আপনি নিচে কি করছিলেন?
—আরে, পুশআপ করছিলাম। তাহিয়ার গলা শুনে মজা করলাম। এখন দেখি সে সত্যিই বিশ্বাস করে ফেলেছে। যাও, দেখো নিচে আবার কি কান্ড করে।
বলেই হাসতে হাসতে চলে গেল। এদিকে তাহিয়া নিচে নামতেই সোফায় মা চাচীদের দেখতে পেল। সিড়ি বেয়ে পা টিপে টিপে নামল, এই ভেবে কেউই তাকে দেখছে না। একে একে সবার সামনে গিয়ে ভূতের মতো ভয় দেখালো। অন্যদিকে তাহিয়ার হঠাৎ এমন অঙ্গভঙ্গি এমন কান্ডে সবাই কপাল কুঁচকে তাকাল। তিতলি বেগম ধমক দিয়ে বলল,
—তোকে কি ভূতে ধরেছে?
মায়ের ধমকে সোজা হয়ে গেল তাহিয়া। মনে হলো তাকে দেখে ফেলেছে, তারা কি সত্যি তাকে দেখেছে? কিন্তু কিভাবে সে প্রশ্ন করল,
—আমাকে কি দেখতে পাচ্ছো তোমরা?
—তো দেখতে পাবোনা কেনো। আমাদের বয়স হলেও চোখ এখনো ক্লিয়ার। কানা ভেবেছিস নাকি।
মায়ের কথায় তাহিয়ার মুখ বাংলার পাঁচের মতো হয়ে এলো। বুঝে গেল, তারা তার সাথে মজা নিয়েছে। খুব রাগ লাগল ফারিসের উপর, রাগে দুক্ষে ধপধপ পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উঠল। উপরে উঠতেই মেহরীনের মুখোমুখি হল। তাহিয়ার চেহারার অবস্থা দেখে মেহরীন হেসে ফেলল,
—ফারিস ভাইয়া তোকে এতো সহজে বোকা বানিয়ে চলে গেল। কি বুদ্ধুরে তুই, তাহু।
মেহরীনের হাসি দেখে তাহিয়ার কাটা গায়ে নুনের ছিটা লাগল বুঝি তেঁতে উঠে বলল,
—আর তুইও ওই বজ্জাতের সাথে সাথ দিয়েছিস। আর কথা বলবি না, তোর সাথে আড়ি যাহহহহ।
অভিমান করে রুমে চলে আসে তাহিয়া। মেহরীনও তার পিছু পিছু যায়, ডংডাং করে বান্ধুবির রাগ ভাঙাতে চেষ্টা করে। এভাবেই তাদের রেশা-রেশি হাসি-ঠাট্টায় কেটে যায় দুপুর।
বিকেল বাজে চারটা, সকলেই রেডি হচ্ছে পার্লারে যাবে বলে। মেহরীন যেতে চায়নি, দাদির সাথে থাকবে বলে থেকে যায়। সে জানে পার্লারে গেলে কতো খরচ হবে, কিছু না কিছু করাবেই তাকে, তখন অযথা টাকা যাবে তার পিছে। এই ভেবে সে যেতে নারাজ। সবাই অনেক জোর করলেও যায়নি, তাই বাধ্য হয়ে তাকে বাসায় রেখেই সবাই বেরিয়ে যায়।
বাসায় এখন মোট তিনজন, দাদী, মেহরীন আর কাজের খালা। তিনজনেই ঘরে বসে গল্প আর আড্ডায় সময় কাটাচ্ছে। মেহরীনের সময় ভালোই যাচ্ছে তাদের সাথে। তারমধ্যেই কলিং বেলের শব্দে মেহরীন যায় দরজা খুলতে। দরজা খুলতেই তালহাকে দেখতে পায়। এতো তাড়াতাড়ি চলে এসেছে দেখে প্রশ্ন করল,
—আপনি এতো তাড়াতাড়ি চলে এলেন যে?
তালহা কোট খুলতে খুলতে ভেতরে এসে সোফায় বসে বলল,
—এমনি। একগ্লাস ঠান্ডা পানি দিতে পারবে?
মেহরীন দ্রুত ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা পানি এনে দেয়। তালহা পানি খেতে খেতেই মেহরীন ফের জিজ্ঞেস করল,
—খাবার গরম করে দিবো? খাবেন এখন?
তালহা নিঃশব্দে একপলক তাকিয়ে বলল,
—না, তার দরকার নেই। অফিসে লাঞ্চ করেছি। তুমি বরং দ্রুত রেডি হও।
—কেনো?
—প্রশ্ন শুনতে ভালো লাগে না, ফাস্ট রেডি হও।
বলেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে যোগ করল,
—পাঁচ মিনিট টাইম দিলাম।
ধমকের ন্যায় গলায় কথা শুনে মেহরীন দ্রুত রুমে চলে যায়। বলা যায়না আবার ধমক দিয়ে না বসে। তিতলি বেগমের দেওয়া সাদা রঙের নরমাল গ্রাউনটা পরে নেয়। চুল ছেড়ে মুখে হালকা ক্রিম মাখে, ঠোঁটে গোলাপি লিপস্টিক লাগিয়ে মাথায় ওড়নাটা দিয়ে নিচে নামে। মেহরীনকে নামতে দেখে তালহা কিছুক্ষণ পরখ করে নেয়, তারপর দাদিকে বলে তাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
গাড়ি চলছে নিজের গতিতে। ভেতরে দুজনেই চুপ।
মেহরীন জানে না কোথায় যাচ্ছে। কৌতূহলী মন নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। প্রায় দশ মিনিট পর গাড়ি এসে থামে এক বিশাল বিল্ডিংয়ের সামনে।
গাড়ি পার্ক করে তালহা মেহরীনকে নিয়ে ভেতরে ঢোকে। দেখে মনে হয় কোনো হোটেল হবে। লিফটে উঠে তিনতলায় প্রেস করে। তিন তলায় পৌঁছাতেই আবারও এগোতে লাগে, তার পিছু লিছু মেহরীন ও। কিছুটা সামনে যেতেই চোখে পড়ে নাম লেখা “Girls Beauty Parlor”।
“তাহলে কি পার্লারে নিয়ে এসেছে তাকে?” এই ভেবে ভেবে ভেতরে ঢুকতেই দেখে তাহিয়ারা সবাই এখানেই। কেউ ফেসিয়াল করছে, কেউ পেডিকিউর-ম্যানিকিউর।
তাহিয়া মেহরীনকে দেখে চিৎকার করে উঠল,
—আরে মেহরীন। এই যে আমিই!
তার ডাকে বাকিরাও তাকিয়ে দেখে, বিস্মিত দৃষ্টিতে, সে তো আসতে চায়নি, আবার তালহার সাথে এসেছে যে। এই প্রশ্ন সকলের চোখে। তাদের প্রশ্ন বুঝে তালহা বলল,
—আমিই জোর করে নিয়ে এসেছি। অনেকদিন আগে একবার বলেছিল নাক ফুটাবে, সময় হয়নি। আজ যেহেতু তোমরা এসেছো, ভাবলাম তোমাদের সাথেই করিয়ে নিবে।
বলেই তালহা তাকাল মেহরীনের দিকে। মেহরীন অবাক চোখে হা করে তাকিয়ে থাকে। কি সুন্দর মিথ্যা বলে লোকটা। আমি তো কোনোদিন বলিনি নাক ফুটাবো। উল্টো এসবে তার ভয় লাগে, দাদী কতই না চেষ্টা করেছে করাতে, সে রাজি হয়নি। ভীত কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল,
—এই আপনি মিথ্যা বলছেন কেনো? আমি করাবো না।
তালহা চোখ গরম করতেই সে চুপসে গেল। তিতলি বেগম এক কর্মী মেয়েকে ডেকে বললে মেয়েটি কাছে এসে মেহরীনকে চেয়ারে বসতে বলে। ভয়ে ভয়ে সে এগিয়ে গিয়ে বসল। পাশে তালহা দাঁড়িয়ে, বাকিরা ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে। মেয়েটি কলম দিয়ে মেহরীনের নাকে জায়গামতো মার্ক করে, তারপর বন্দুকের মতো একটা যন্ত্র হাতে নেয়। তা দেখেই মেহরীন নড়েচড়ে উঠে, সে যে ভয়ে কাঁপছে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তানিয়া বেগম দূর থেকে বললেন,
—তালহা, মেয়েটার হাতটা ধর। ভয় পাচ্ছে তো, আমি এখন আসতে পারছি না পায়ে ক্রিম লাগানো।
চাচীর সাথে সাথেই তিতলি বেগমও বললেন,
—হ্যাঁ, হাতটা ধর বাপ ভয় পাবে নয়তো।
তাদের কথা শুনে তালহা হাত বাড়িয়ে দিলে মেহরীন ভয়ে তা চেপে ধরে। মেয়েটি নরম গলায় বুঝিয়ে বলছে,
—ভয় পেয়ো না, কিছুই হবে না। পিপড়ার কামড়ের মতো লাগবে শুধু।
এই কথাগুলো বলতে বলতেই হঠাৎ ওই যন্ত্রে চাপ দেয়, এক মুহূর্তে কিছু একটা ঢুকে যায় তার নাকে। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি একটা নাকফুল পড়িয়ে দেয়। মেহরীন হালকা ব্যথায় কেঁপে উঠে তালহার হাত আরও জোরে চেপে ধরে।
তালহা নিশ্চুপ ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। মেয়েটি মেশিনটি সরিয়ে রেখে নাকফুলের নিচের অংশ লাগাতে গেলে তালহা থামিয়ে দেয়। পকেট থেকে ছোট্ট একটা সোনার নাকফুল বের করে দিয়ে বলল,
—চেঞ্জ করুন, এটা পরিয়ে দিন।
মেয়েটি আমতা আমতা করে বলল,
—স্যার, এখন খুলে আবার লাগালে ব্যথা পাবে তো।
তালহা শক্ত গলায় বলল,
—ইমিটেশন পড়ালে ইনফেকশন হবে। ফাস্ট এটা পড়ান।
আর কিছু না বলে মেয়েটি আগেরটা খুলে সোনার ছোট্ট স্টার ডিজাইনের নাকফুলটা পরিয়ে দেয়।
মেহরীন দাত চেপে ব্যথা সহ্য করছে। নাক ফুলটা লাগানোর সময় সে হালকা চিৎকারও দিয়ে ওঠে।
তালহা সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিয়ে বলে,
—সুন্দর করে করতে পারেন না? ব্যথা পাচ্ছে কেনো?
তার ধমকে মেয়েটি চুপ মেরে যায়। তিতলি বেগম হেসে বলেন,
—আরে নাক ফুড়ালে এমন ব্যথা লাগেই।
নাকফুল পড়তেই মেহরীন হেলান দিয়ে বসে পড়ে, মাথায় ধরেছে, নাকটাও ব্যথা করছে। তালহা শান্ত চোখে তাকিয়ে তার দিকে, চিকন সরু নাকে নাকফুলটা যেন ভীষণ মানিয়েছে। ডায়মন্ড হলে হয়তো আরও ভালো লাগতো, মনে মনে কথাটি ভাবে তালহা। কিন্তু তখন এমন ছোট সাইজের ডায়মন্ডের নাকফুল পায়নি, বড়গুলো আনলে আবার বয়স অনুযায়ী বেমানান লাগত, তাই এটাই এনেছিল।
নাক থেকে চোখ সরিয়ে পুরো শরীরটা একবার পরখ করল সে। কিছু একটা ভেবে আনমনেই মুচকি হেসে পকেট থেকে প্যারাসিটামল বের করে মেহরীনের হাতে দেয়,
—নে, এটা খেয়ে নিও।
তারপর মায়ের দিকে চেয়ে বলে,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ২০
—আম্মু, আমি যাচ্ছি অফিসে। তোমরা সন্ধ্যার আগে বাড়ি চলে যেও কিন্তু।
বলেই সে বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে মেহরীন আয়নায় নিজেকে দেখে মুগ্ধ, নাকফুলটা তার মুখের কোমলতা আরেকটু বাড়িয়ে দিয়েছে যেন। বাকিরাও প্রশংসা করছে। এক মেয়ে তো প্রশ্ন করেই বসেছিল তালহার বউ কিনা তিতলি বেগম হেসে না বলেন। তাকে সোনার নাকফুল দিয়েছে বিষয়টা নিয়ে কেউ তেমন মাথা ঘামায়নি, কারণ তিতলি বেগমকে আগেই বলে রেখেছিল তালহা। সন্ধ্যার দিকে সকলে ফিরে আসে বাসায়। এখন তাদের কালকের জন্য সব আয়োজন শুরু, কি কি লাগবে লিস্ট করে করে পাঠাচ্ছে কর্তাদের কাছে। সকলেই কালকের দিন নিয়ে বেশ এক্সাইটেড। বিশেষ করে রিতু…
