Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭২

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭২

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭২
সাইদা মুন

তালহা কাউকে ফোন করে আসতে বলেই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ঘরে তখন চাপা উত্তেজনা। সবাই হাসাহাসি থামিয়ে যেন সিরিয়াস এখন। তালহা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে টি-টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে রাখা কাচের জগ থেকে একটি গ্লাসে পানি ঢালল। তারপর গ্লাসটা হাতে নিয়ে সরাসরি এগিয়ে গেল মেহরীনের চাচির সামনে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতার চেয়ে বিদ্রূপই বেশি ছিল। গ্লাসটা সামনে বাড়িয়ে দিয়ে কটাক্ষ করে বলল,
—আপনি তো আমার চাচি শাশুড়ি হন… ওহ সরি, ভুল বললাম। কুটনি চাচি শাশুড়ি। এম আই রাইট?
কথাটা শুনে উপস্থিত সবাই চুপসে গেল। কেউ কেউ মুখ টিপে হেসে ফেলল। মেহরীনের চাচি তো ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়ালেন। রাগে তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন তিনি,

—মুখ সামলে কথা বলবে!
তবে এতে তালহার মুখের হাসি একচুলও কমল না। বরং শান্ত কণ্ঠেই বলল,
—মুখ আমি সবসময় সামলেই কথা বলি। তবে সেটা মানুষের সঙ্গে। অমানুষদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে মুখটা মাঝে মাঝে বিগড়ে যায়। আশা করি কিছু মনে করবেন না।
চারপাশ নিস্তব্ধ। ফুঁসতে ফুঁসতে দেখছে চাচি তালহাকে। সে আবার গ্লাসটা এগিয়ে দিল,
—অনেকক্ষণ ধরে ঘেউ ঘেউ করছেন। গলা শুকিয়ে যাওয়ার কথা। নিন, একটু পানি খেয়ে নিন।
এইবার যেন ধৈর্যের শেষ সীমাও অতিক্রম করে গেল সে। মেহরীনের চাচি রাগে অপমানে কাঁপতে কাঁপতে ছো মেরে গ্লাসটা ছিনিয়ে নিলেন। পরের মুহূর্তেই “ছপাৎ” করে পানির শব্দ হলো। পুরো গ্লাসের পানি গিয়ে পড়ল তালহার মুখে। পানির ফোঁটাগুলো তালহার মুখ বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। তবু আশ্চর্যজনকভাবে সে একটুও নড়ল না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। ঘরের সবাই হকচকিয়ে উঠল। কেউ ভাবেনি তিনি এমন কিছু করবেন। রেগে উঠল বড়রা। তাদের বাড়িতে এসে তাদেরই ছেলের সাথে এমন ব্যবহার। কিছু বলতে যাবে কিন্তু তার আগেই আরেকটা ঘটনা ঘটে গেল। যেন ঝড়ের বেগে ছুটে এলো মেহরীন। রাগে থরথর করে কাঁপতে থাকা হাতটা দিয়ে টি-টেবিলের ওপর রাখা পানির জগটা হাতে তুলে নিল। তারপর এক ঝটকায় তালহাকে পাশে সরিয়ে দিল। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে কেউ কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ পেল না।

পরের মুহূর্তেই আবারও “ছপাৎ” করে পানির শব্দ হলো। এবার জগভর্তি পানি গিয়ে পড়ল মেহরীনের চাচির মুখে। ঘরজুড়ে আবারও স্তব্ধতা নেমে এলো। এবার সবাই সত্যিই হতবাক। শক খেল যেন সবাই। অবাক চোখে দেখছে মেহরীনকে। মেহরীনের চাচিও থতমত খেয়ে গেলেন। নাক-মুখে পানি ঢুকে কাশতে কাশতে মুখ মুছতে লাগলেন। কিন্তু মেহরীন থামল না। জগে যতটুকু পানি বাকি ছিল, সেটুকুও ঢেলে দিল তার মাথার ওপর। চিৎকার করে উঠলেন তিনি,
—এই মুখপুড়ি! নষ্ট মেয়ে! কী করছিস তুই? সাহস তো খুব বেড়েছে..
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মেহরীন গর্জে উঠল। এতদিনের জমে থাকা রাগ অভিমান অপমান ক্ষোভ সব যেন একসঙ্গে বেরিয়ে এলো তার কণ্ঠে। গলা ফাঁটিয়ে বলে উঠল,
—আমি কোনো নষ্ট মেয়ে না!
ঘরের সবাই চমকে তার দিকে তাকাল। মেহরীনের বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। ফুঁসতে ফুঁসতে ফের বলল,

—আর না আমার কোনো কলঙ্ক আছে। অনেক হয়েছে, সারাজীবন যা খুশি তাই বলেছ। অপমান করেছ। দোষ না করেও শাস্তি দিয়েছ। আমিও সব মুখ বুজে মেনে এসেছিলাম কারণ তোমরা তিনবেলা খেতে দিতে থাকার জন্য একটা জায়গা দিতে। তোমরা না থাকলে হয়তো আমার বেঁচে থাকা আরও কষ্টকর হতো। কিন্তু আজ আর মেনে নিতে পারছি না।
কথাগুলো বলতে বলতে কন্ঠ কাঁপছিল তার৷ থেমে নিশ্বাস ফেলল। কাঁপা কাঁপা হাতটা তুলে আঙুল তাক করল তার চাচির ঠিক চোখের দিকে। নজরে নজর মিলিয়ে তাকাল চোয়াল শক্ত করে বলল,
—আজ থেকে আমার সম্পর্কে একটা বাজে কথাও বলবে না। মুখ সামলে কথা বলবে এখন থেকে। আগে আমি এতিম ছিলাম একা ছিলাম তাই মেনে নিতাম। এখন আমার একটা পরিবার আছে। এবং আমি অনেক সুখি এই পরিবার এই ভালোবাসাগুলো পেয়ে। এগুলো যদি আমার থেকে ছিনিয়ে নিতে আসো আমি ছেড়ে দিব না এমনি এমনি।
কথাটা শেষ হতেই এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে। কিন্তু এবার সেই চোখে ভয় ছিল না, ছিল সাহস। দাঁড়িয়ে থাকা তালহাসহ প্রত্যেকে মেহরীনকে দেখছে। মেয়েটাকে যেন সকলের কাছে নতুন লাগছে। পরক্ষণেই সকলের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সকলেই খুশি এবার অন্তত মেহরীন নিজের জন্য লড়াই করা শিখলো।

এদিকে মেহরীনের চিৎকারে যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল চাচি, চাচা আর জাবেদ। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। এ যেন সেই মেহরীন নয়। যে মেয়েটা মাথা নিচু করে সব সহ্য করত, আজ তার চোখে অন্যরকম আগুন। নরম তুলো কঠিনে রূপান্তর হলো এ যেন অবিশ্বাস্য। মেহরীনের চাচি কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে থেকে আমতা আমতা করে বললেন,
—সাহস বেশি বাইড়া গেছে নাকি? আমার মুখের উপরে কথা কস? এত সাহস কই থেইকা পাইছস?
মেহরীন একটুও পিছু হটল না। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

—সাহস? সাহস তো আমি পেয়েছি এই পরিবারটাকে পাশে পেয়ে। তারা সবসময় আমাকে আমার প্রাপ্য মর্যাদা দিয়েছে, আমার মূল্য বুঝিয়েছে। হারিয়ে ফেলা আত্মসম্মানবোধটাও আমি ফিরে পেয়েছি তাদের কাছ থেকেই। আমি আর আগের সেই নির্বোধ মেহরীন নই। এখন আমি নিজের জন্য, নিজের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে জানি। এটা আমার শ্বশুরবাড়ি, আমার বাড়ি, আমার ঘর। এখানে দাঁড়িয়ে কেউ আমাকে অপমান করে চলে যাবে, আর আমি নীরবে সব সহ্য করে যাব, সেই মেহরীন হারিয়ে গিয়েছে।
চাচি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
—এই তোর যোগ্যতা আছে এই বাড়ির বউ হওয়ার? সবাই একটু তোর হয়ে কথা কি কইছে তাই বইলা মাথায় উইঠা নাচঁবি। তুই এসবের যোগ্য না। আপনারা জানেন না কত কী করছে এই মেয়ে…
—চুপ!
তুমুল গর্জনে কথাটা বেরিয়ে এলো মেহরীনের মুখ থেকে। কেঁপে উঠল চাচি। মেহরীন কয়েক মুহূর্ত ভারী শ্বাস নিতে নিতে দাঁড়িয়ে রইল। নিচু কিন্তু ধারালো কণ্ঠে বলল,
—বয়সে বড় বলে সম্মান করছি। নয়তো এই চিৎকারের জায়গায় আমার হাত উঠত।
কথাটা শুনে চাচি ক্ষিপ্ত হয়ে হাত তুলতেই মেহরীন খপ করে তার কবজি ধরে ফেলল। শক্ত করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

—এটা একটা ভদ্র লোকের বাড়ি এখানে অসভ্যতামি করবে না। আর আমি চরিত্রহীনা নই। আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলার আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করবেন আপনি কেমন।
চাচি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে চারপাশের বাকিদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলেন,
—দেখছেন? সত্য কথা কইতাছি দেইখা আমার মুখ বন্ধ করতাছে। দেখো তালহা বাবা, এই মাইয়ারে বিশ্বাস কইরো না। এর আসল রূপ বের হইয়া আসতেছে দেখো দেখো..
তিনি আবারও কথাটা শেষ করতে পারলেন না। মেহরীন কথার মাঝেই থামিয়ে দিল,
—আর একটা কথাও না। নিজের মনের অন্ধকার দিয়ে অন্যকে বিচার করবে না একদম। সবাই তোমার মতো নয়।
—এই, আমার মতো না বলতে কী বুঝাইতে চাচ্ছিস?
মেহরীন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল,
—কেন? বুঝতে পারোনি?

স্বাভাবিক স্বরেই কথাটা বলল সে। অথচ সেই স্বাভাবিকতার মাঝেই এমন কিছু ছিল, যা তার চাচিকে অস্বস্তিতে ফেলে দিল। কথাটা বলেই সে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল নিজাম শাহের দিকে। তখনো শক্ত করে চেপে ধরে আছে চাচির হাত। ব্যথায় মহিলার মুখ কুঁচকে আছে, তবু মেহরীনের চোখে আজ কোনো ভয় নেই। সে ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল,
—পাশের বাড়ির ফরিদ চাচাকে চিনো তো?
নিজাম শাহ কপাল কুঁচকে বললেন,
—কেন চিনব না? চিনি।
—তাহলে তোমার অবর্তমানে উনি প্রায়ই আমাদের বাড়িতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চাচির সঙ্গে কী এমন গল্প করতেন, সেটা একবার জিজ্ঞেস করে দেখো।
কথাটা বলা শেষ হতেই মেহরীন এক ঝটকায় চাচির হাত ছেড়ে দিল। বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। হাত-পা কাঁপছে। এত বড় কথা বলার সাহস জোগাতে তার ভেতরের সমস্ত শক্তি যেন খরচ হয়ে গেছে। ঠিক তখনই তালহা এগিয়ে এল। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে মেহরীনের দুই বাহু ধরে নিজের পাশে টেনে নিল। শক্ত, আশ্বস্ত করা এক স্পর্শ। মেহরীন অনুভব করল, কাঁপতে থাকা শরীরটা ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে। যেন কেউ নীরবে বলে দিচ্ছে “আমি আছি।”
ওদিকে মেহরীনের চাচি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ দুটো বিস্ফারিত। এ যেন তিনি নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না। এই মেয়েটাই কি সেই মেহরীন? কিভাবে বলল এমন কথা। নিজাম শাহ এবার স্ত্রীর হাত ধক্ত করে ধরলেন,নিজের দিকে ঘুরালেন। মুখমণ্ডল ক্রোধে লাল হয়ে উঠেছে। একেরপর এক প্রশ্ন করতে লাগলেন,

—মেহরীন কী বলল?
কোনো উত্তর নেই…
—কথা কও!
তবুও নীরবতা।
—এসবের মানে কী?
মহিলা তখনো চুপ শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। তার সেই নীরবতাই যেন উপস্থিত সবার মনে আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দিল। নিজাম শাহের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। রাগে, অপমানে, ক্ষোভে তার শরীর কাঁপছে। হঠাৎই তিনি হাত তুলে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিলেন স্ত্রীর গালে। চড়ের শব্দটা ঘরের চার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
মেঝেতে বসে আছেন মেহরীনের চাচি। এলোমেলো চুল, মুখভর্তি অপমান আর হতভম্বতা। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে একের পর এক কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন নিজাম শাহ। রাগে, ক্ষোভে, কষ্টে মানুষটা যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছেন। সুযোগ পেলে হয়তো এই মুহূর্তেই সব সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলতেন। জাবেদ বারবার তাকে থামানোর চেষ্টা করছে। বাড়ির অন্যরাও শান্ত করার চেষ্টা করছে। অবশেষে বিল্লাল সাহেব এগিয়ে এলেন। দৃঢ় হাতে নিজাম শাহকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে একপাশে বসালেন। কঠিন কণ্ঠে বললেন তিনি,
—যথেষ্ট হয়েছে ।

বাড়িতে ছোটরাও উপস্থিত, তাদের সামনে এসব অকথ্য ভাষা ব্যবহার করা তার সহ্যের বাহিরে। তবু তিনি বেশি কিছু বললেন না, শত হলেও তারা মেহরীনের চাচা-চাচি। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলো। এদিকে মেহরীন এখনও শক্ত করে ধরে আছে তালহার হাত। আজ অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে তার। বুকটা হালকা হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে দীর্ঘদিনের কোনো ভার নেমে গেছে কাঁধ থেকে। সাহস দেখাতে গিয়ে যেন নতুন করে সাহস পেয়েছে সে। ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তালহার দিকে তাকাল। চোখে চোখ পড়তেই তালহার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সবার অগোচরে সে আলতো করে মেহরীনের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। খুব আস্তে করে প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল,
—আই অ্যাম সো প্রাউড অফ ইউ, বউ।
মুহূর্তেই মেহরীনের চোখ ভিজে উঠল। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করল সে। এমন পরিস্থিতিতেও এই লোকটা কিভাবে এত শান্ত থাকছে, কিভাবে তাকে এত সাপোর্ট করছে। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
—আপনি আমাকে এত বুঝেন কেন? কেন এত বিশ্বাস করেন?
তালহার উত্তর আসতে দেরি হলো না,
—কারণ আপনি আমার। আমার সম্পূর্ণ ভরসা আছে আপনার উপর।
সে মেহরীনের হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। মেহরীনের চোখ থেকে অঝরে জল গড়িয়ে পড়ছে। কান্নাভেজা গলায় বলল,

—আপনার এই ভরসা আমি কোনোদিন ভাঙব না।
তালহা কিছু বলল না। শুধু মৃদু হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ফারাহ অনেকক্ষণ ধরেই ছবিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। হঠাৎ কিছু একটা খটকা লাগতেই ছবি হাতে তুলে নিল। ভ্রু কুঁচকে বেশ মনোযোগ দিয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু খুঁজে পেয়েছে। ঠিক তখনই ঘরের নীরবতা ভেঙে গর্জে উঠল জাবেদ,
—অনেক হয়েছে!
সবার দৃষ্টি ঘুরে গেল তার দিকে। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে তার। কটমট করে তাকাল সে। ঝারি দিয়ে বলল,
—বন্ধ করেন এসব পারিবারিক নাটক। আপনাদের এই প্রেম-ভালোবাসা পরে দেখাবেন। নাটক বাড়ি গিয়ে করবেন। আগে ক্ষতিপূরণের হিসাব মিটান।
কথাটা বলেই কয়েক পা এগিয়ে এল। চোখ সরাসরি তালহার দিকে। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে নির্লজ্জ ভঙ্গিতে বলল,

—পাঁচ লাখ টাকা দিন। টাকা পেলেই আমরা চুপচাপ চলে যাব। নয়তো বিষয়টা যদি মিডিয়া পর্যন্ত যায়, সম্মানহানি কিন্তু আপনারই হবে, স্যার।
কথাটা বলেই সে আত্মতৃপ্তির হাসি হাসল। যেন মনে করছে এবার সে সত্যিই তালহাকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। প্রত্যুত্তরে তালহা কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ফারাহ ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এলো। তার হাতে সেই ছবিগুলোর একটা। অনেকক্ষণ ধরেই ছবিগুলো বারবার উল্টেপাল্টে দেখছিল সে। প্রথমে বিষয়টা চোখে পড়েনি, কিন্তু একটা ছোট্ট অসামঞ্জস্য বারবার তার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। ছবিটার দিকে তাকিয়েই সে বলল,
—মেহরীন, তোমার কি এক হাতে ছয়টা আঙুল? মানে এক্সট্রা আঙুল আছে?
প্রশ্নটা শুনে মেহরীন ভ্রু কুঁচকে ফেলল,
—না তো। আমার কোনো এক্সট্রা আঙুল নেই।
ফারাহ ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে হাসল,
—ওহ্, তোমার নেই। তবে মজার বিষয় হচ্ছে তোমার জমজ বোনের আছে।
কথাটা শুনে ঘরের সবাই চমকে উঠল। মেহরীন হতবুদ্ধি চোখে তাকিয়ে বলল,
—মানে?

ফারাহ ছবিটা সবার সামনে তুলে ধরল,
—মানে খুব সহজ। ছবিতে তোমার সঙ্গে নয়, তোমার জমজ বোনের সঙ্গে ছিলেন মিস্টার জাবেদ।
এবার চারিদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবাইকে দেখাতে লাগল ছবিটা,
—এই যে দেখ। মেয়েটার বাঁ হাতে ছয়টা আঙুল।
সবাই ছবিটার দিকে তাকাল। ফারাহ এবার জাবেদের দিকে ফিরল। লোকটার মুখ দেখে মনে হচ্ছে শরীরের সব রক্ত এক নিমিষে শুকিয়ে গেছে। চোখেমুখে স্পষ্ট অস্থিরতা। ফারাহ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—কি মিস্টার জাবেদ? খুব কনফিউজড লাগছে আপনাকে। ভীতুও লাগছে বটে।
জাবেদ ঢোক গিলল। তারপর তোতলাতে তোতলাতে বলল,
—ক…কীসব উল্টাপাল্টা কথা বলছেন! আ…আমাকে ছবিটা দিন।
সে তড়িঘড়ি করে ছবিটার দিকে হাত বাড়াল,

—দাও… দাও তো ছবিটা!
কিন্তু ফারাহ তার আগেই ছবিটা পেছনে সরিয়ে নিল। মাথা নেড়ে এক কদম পিছিয়ে গিয়ে বলল,
—উহু। এত তাড়া কিসের? ছবি তো দিবই। তবে আপনার হাতে নয়, জায়গামতো দিব।
জাবেদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কপালের পাশে চিকচিক করে ঘাম জমেছে। ফারাহ এবার শান্ত গলায় তালহার দিকে তাকাল।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭১

—তালহা ভাই, পুলিশে কল করেছেন?
তালহা কব্জিতে থাকা ঘড়িটায় সময় দেখে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
—এতক্ষণে চলে আসার কথা…

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here