প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৩
সাইয়্যারা খান
রাতটা ভীষণ চিন্তায় চিন্তায় কাটলো তৌসিফের। বউটার শরীর ভালো না। তখন বমি করার সময় যেভাবে কাঁদলো তৌসিফ তো ভাবলো তৌসিফ নিজেই মরে যাবে। তার বউ সচরাচর কাঁদে না৷ কতটাই না খারাপ লেগেছে যে ওভাবে কাঁদলো। নিজের উপর খুব রাগ হয়েছিলো তৌসিফের। জুলুম হয়ে গেলো পৌষটার উপর। ওভাবে জোর করাটা উচিত হয় নি। গেলো তো বউটার শরীর খারাপ হয়ে। এখন কেমন লাগে? তৌসিফের তো খুব কষ্ট লাগে। আত্মাটা শুকিয়ে আসে৷ কোনমতে আজ জগিং শেষ করে বাড়ী ফিরে তৌসিফ। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম৷ দারোয়ানের ওখানে দাঁড়িয়ে গ্যারেজে থাকা তুহিনের গাড়িটা দেখে বললো,
“তুহিনের গাড়িটা পরিষ্কার করিয়ে রাখো আজ।”
“জি, মামা।”
“আর শুনো, এটা কেউ ব্যবহার করেছিলো এরমধ্যে?”
“না, মামা। শুধু ছোট মামি মাঝেমধ্যে এসে ভেতরে বসে আবার নেমে চলে যায়। রাতে আসে শুধু।”
“আচ্ছা।”
বলে আর অপেক্ষা করলো না তৌসিফ। উপরে চলে এলো গটগট পায়ে। তার তোতাপাখিটা অসুস্থ। গতকাল থেকে উড়াউড়ি বন্ধ তার। তার এই নিশ্চুপ ভাবখানা একদম অসুস্থ করে দিচ্ছে তৌসিফকে। বুয়াকে নাস্তা বানাতে বলে ঐ দিকে না তাকিয়েই তৌসিফ রুমে ঢুকলো৷ বিছানায় একপলক তাকাতেই বুকটা কেমন খাবলে উঠে তার৷ নাহ্, ভালোবাসাটা বেশি গিয়েছে। এতটা হওয়ার কথা ছিলো না। এভাবে প্রেম সাগরে যে তৌসিফ ডুববে তা কোনদিন ভাবা হয় নি। এখন যেন ভেবেও কুল-কিনারাহীণ হয়ে পড়েছে তৌসিফ। ভাবা যায়, তার কঠিন ব্যক্তিত্ব হারিয়ে গেছে পৌষের সম্মুখে? ঘরে ঢুকা মাত্র ভেজা এক মেনি বিড়াল হয়ে যায় তৌসিফ তাও কিনা স্বেচ্ছায়। স্বজ্ঞানে। এসব অযাচিত অশোভন ঘটনাচক্রে কবে যে তৌসিফ ইচ্ছে করে হারিয়েছে তা এতমাসেও খুঁজে পাচ্ছে না সে। অবশ্য বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তার ভাবাও হয় নি।
এলোমেলো একগাদা চিন্তা ভাবনা করে তৌসিফ বাথরুম থেকে বের হলো। একদম গোসল করে বেরিয়েছে। চুলগুলো কোনমতে মুছে এগিয়ে এলো বিছানার কাছে। কপাল কুঁচকে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো সহসা। তার হ্যাংলা পাতলা বউটা এখানে নেই। কপালের ভাজ দ্বিগুণ করে তৌসিফ বাইরে এলো। তার সন্দেহ একদম সঠিক করে পৌষ রান্নাঘরে। চামচ দিয়ে নাড়াচাড়া করছে কিছু। কণ্ঠটা ভাঙা সামান্য। বুয়ার সাথে কথা বলছে টুকটাক। তৌসিফের কানে আসছে কিন্তু ততটা বুঝা যাচ্ছে না। ভীষণ রাগ হলো তৌসিফের৷ এ-সময়ে পৌষের এখানে থাকার কথা না৷ এত অবাধ্য মেয়েটা। তৌসিফ হাঁপিয়ে ওঠে ওকে নিয়ে। বড় বড় পা ফেলে রান্নাঘরে ঢুকতে ঢুকতেই তৌসিফ গমগমে গলায় ধমকে ডাকলো,
“পৌষরাত! তুমি এখানে কি করছো?”
পৌষ সহ বুয়া চমকে গেলো। পৌষের হাতের চামচ পায়ের কাছে পড়ে শব্দ করলো৷ চোখ দুটো ছোট ছোট করে পৌষ জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে?”
বুয়ার সামনে কথা বাড়ালো না তৌসিফ। সরাসরি পৌষকে ধরে নিয়ে গেলো সেখান থেকে। পৌষ বুঝলো না এতটা রেগে যাওয়ার কারণ। সোফায় এনে বসিয়ে তৌসিফ ডান হাত দিয়ে পৌষের কপাল ছুঁয়ে দেখলো। পরপর গলায় হাত ছোঁয়ালো। পৌষ ফ্যাচফ্যাচ করে বললো,
“ঠিক আছি রে ভাই।”
“খবরদার এসব ডাকবে না।”
“ভুলে বলেছি৷ দেখি ছাড়ুন। আমি নাস্তা বানাচ্ছিলাম।”
“হাজার হাজার টাকা দিয়ে কাজে বুয়া রেখেছি। তাদের কাজের মধ্যে রান্নাও পড়ে পৌষরাত। তোমার শরীর ভালো না। আমি এদিকে অস্থির হয়ে আছি। একটু পর বের হব তোমাকে নিয়ে এদিকে তুমি রান্নাঘরে টইটই করছো।”
“বাবাগো, টাকার গরমে থাকা যাচ্ছে না মশাই। আর শুনুন, আমি ঠিক আছি। আজকে বাবুকে দেখতে যাব ঠিক আছে?”
“না, ঠিক নেই। আগে ডাক্তার দেখাব হানি।”
ভীষণ আদর মিশিয়ে বললো তৌসিফ। পৌষ মানলো না। বরাবর ত্যাড়ামি করে উঠলো,
“আমি যাবই যাব।”
“হ্যাঁ, হসপিটালে যাব তো।”
“ফাইজলামি করবেন না একদম৷ হেমু ভাইয়ের ছেলে দেখতে যাব। আমার একমাত্র ভাতিজা ও।”
“আচ্ছা যাব কিন্তু আগে তুমি সুস্থ হও।”
“সুস্থই আমি৷ চোখে দেখে না ব্যাটা কানা কোথাকার।”
পৌষ উঠে চলে গেলো। তৌসিফ আটকালো না। শরীর স্বাভাবিক আছে এখন। যেভাবে মন চায় থাকুক। চিন্তা একটু কমলেও ততটা কমলো না তৌসিফের। চোখ দুটো গর্তে ঢুকে আছে পৌষের। পাসপোর্টটা আজকালের মধ্যে চলে আসবে৷ আপার ওখানে যেতে হবে। হানিমুন করা বাকি। পেন্ডিং বিষয়টা আর মানা যাচ্ছে না। কতগুলো টুনটুনি পাখি লাগবে এরমধ্যেই। হানিমুনে গিয়ে একদম সরাসরি আবদার জুড়ে দিবে তৌসিফ। কোন মুখ লেহাজা রাখবে না। এত এত কাজ বাকি ভেবেই গা এলিয়ে দিলো তৌসিফ। মাথায় কিলবিল করছে ছানাপোনা। উফ! ঘরটা জুড়ে যখন দৌড়ঝাঁপ করবে তৌসিফ তখন পা’গল হয়ে যাবে। এক্কেবারে জগৎ সংসার ছেড়ে বাচ্চা আর বউ নিয়ে পড়ে থাকবে। জীবনে বহুত টাকাপয়সা কামিয়েছে। এবারে মনোযোগ দিয়ে বাবা সাজবে সে। ভাবতেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে যেন।
কলিং বেলের শব্দ হতেই মিনু দৌড়ে এসে খুলে দিলো। তৌসিফ ফট করে তাকালো দরজার দিকে। ঝড়ের বেগে ঢুকলো তুহিন। তৌসিফ দাঁরিয়েও সারতে পারে নি৷ বুকের উপর হামলে পড়েছে তার ছোট ভাই৷ এই সময়ে আসার কথা না ওর। আরো পরে আসার কথা ছিলো। তৌসিফ বেশ চমকালো। দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো ভাইকে। কতটা মাস, কতটা মাস পর বুকের মাঝে পেয়েছে তুহিনটাকে৷ তুহিনও যেন ছোট হলো। বুক থেকে সরলো না৷ ঝাপ্টে ধরে ডাকলো,
“মেঝ ভাইয়া।”
“হ্যাঁ, বল।”
“মেঝ ভাইয়া। মেঝ ভাইয়া, আই মিস ইয়্যুউ।”
“মি ঠু তুহিন৷”
দুই ভাই ওভাবেই রইলো। তুহিন বুক থেকে একটু আলগা হতেই তৌসিফ ওর মাথায় হাত বুলালো। মুখটা দেখলো সময় নিয়ে। জিজ্ঞেস করলো,
“বড় ভাই দেখেছে?”
“না। এখানে এলাম সরাসরি।”
“পলক অপেক্ষা করছে হয়তো। উপরে যা।”
“কেন যাবে? নাস্তা খেয়ে যাবে৷ আপুকে ডাক দেই এখানেই।”
পৌষ তুহিনকে দেখেই নাস্তাপানি টেবিলে দিলো। মুখোমুখি দেখা হয় নি এখনও তবে ওপাশ থেকে পৌষ বললো কথাগুলো। তৌসিফ একটু ভেবে বললো,
“মাত্র এসেছে পৌষরাত৷ ফ্রেশ হোক৷ পলক অপেক্ষা করছে হয়তো।”
পৌষ মাথায় ওরনা টেনে এগিয়ে এলো। আড়ালে দাঁড়িয়ে বললো,
“আপুকে মিনু ডেকে আনবে।”
বলতে বলতেই মিনুকে পাঠালো পৌষ। তৌসিফ আর টু শব্দ করলো না। তুহিন ঠোঁট দুটো চোখা করে বললো,
“বউকে এতো ভয় পাও?”
কটাক্ষ টের পেলো তৌসিফ তবে ঘাটলো না৷ তুহিন নিজেও থামলো না।
“মেঝ ভাইয়া, আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না৷ তোমার মুখের উপর তোমার বিড়াল, না মানে বউ কথা বলে আর তুমিও কিনা চুপ হয়ে যাও। কি দিনকাল এলো৷ মামাতো বোন আমাদের একদম সেই চিজ।”
“ভাবি তোর।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ মামাতো ভাবি।”
“তুহিন!”
“আহা, রেগে যাচ্ছো কেন? শুনো, তোমার বউ রেখে দিলো আমাকে এখানে। এত মাস পর বউ দেখব আমার৷ কন্ট্রোলে থাকত পারব না আগেই বলে দিলাম৷ জড়িয়ে টড়িয়ে ধরব। আই নিড স্পেস।”
“তুই বেরিয়ে যা বেয়াদব।”
“নিজে বউ পাগল আর আমাকে বলছো বেয়াদব।”
“তুহিন!”
“আচ্ছা বাবা স্যরি।”
পলক ধুমধাম পা ফেলে দৌড়ে নামছে। শব্দ শুনেই বুঝেছে তুহিন। তৌসিফ আলগোছে উঠে গেলো নিজের বউয়ের কাছে। তুহিন হাসিমুখে উঠে দাঁড়ালো। পলককে দেখে দুহাত মেলে দিতেই মেয়েটা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো। হিচকি তুলে কাঁদছে পলক। সে শুকাতে পারে নি। এবারে একটু শুকাতে পারে নি। সব খেয়েছে। মন মতো খেয়েছে। এই কয়মাসে ভালো স্বাস্থ্য হয়েছে তার। মনে মনে ভয় পাচ্ছে পলক। তুহিন যদি এখন ওকে তাড়িয়ে দেয়? কোথায় যাবে পলক? পলক তো মরে যাবে। একদম মরে যাবে।
“ফালতু লোক, আপনি আবারও গুজুরগুজুর করছেন কেন?”
“কি করেছি?”
পৌষ বেশ রেগে গেলো। হাতে থাকা মগ উঁচু করে বললো,
“ছুঁড়ে মারব কিন্তু!”
“এটাই তো পারো তুমি। সেই প্রথম দেখা থেকেই মগ দিয়ে পিটাপিটা করো তুমি।”
“একদম ঠিক করেছি৷ আপনি কতবড় খাটাস! ছোট ভাই বউ নিয়ে বসেছে আর উনি তাড়িয়ে দেওয়ার বাহানা খুঁজছে।”
“বের হব আমরা।”
“সরুন আপনি৷ ওনাদের দুপুরে এখানেই খেতে বলব।”
তৌসিফ শুনলো না। সরাসরি তুহিনকে গিয়ে বললো বাসায় যেতে। এদিকে তুহিন হাসছে। টুকটাক কথাবার্তা কানে এসেছে। হাসতে হাসতে তুহিন বললো,
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬২
“তুমি বউ এতো ভয় পাও? আমি মানতে পারছি না।”
“ভাগ তুই। ফাস্ট!”
তুহিন উঠে দাঁড়ালো। পলক জড়োসড়ো ভাবে ওর বাহু জড়িয়ে আছে। যাওয়ার আগে তুহিন বললো,
“অনেক ভালোবাসো তাই না মেঝ ভাইয়া।”
“অনুমান করা যায় না।”
“তার থেকেও বেশি?”
“নাহ্”
পলক চমকে তাকালো। তুহিন হাসলো। যেতে যেতে গলা ছেড়ে বললো,
“মামাতো ভাবি, নাস্তা কিন্তু দারুণ ছিলো।”
