Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৬

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৬

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৬
সাইয়্যারা খান

ছেলেকে নিয়ে সারারাত ব্যাস্ত কাটিয়ে সকালের কাজে গিয়েছে হেমন্ত। বাসায় শ্রেয়াকে বা ছেলেকে নিয়ে ওর চিন্তা নেই। ও জানে সবাই বেশ যত্নে রাখবে তবুও শ্রেয়ার জন্য হেমন্ত নিজে থাকতে চায়। মেয়েটা অনেক কষ্ট করেছে। হেমন্ত চায় নিজে উপস্থিত থাকতে ওর জন্য। হাতের কাজটুকু শেষ করেই বেরিয়ে যাবে বাসার উদ্দেশ্যে। সকালে ঘুম থেকে উঠতেই দেখেছে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে ইনি, মিনি। শ্রেয়া উঠতে উঠতে বাকি তিন বান্দা হাজির। শুক্রবার, স্কুল, কলেজ বন্ধ। বেশ আনন্দে তারা ভাতিজা নিয়ে সময় কাটাচ্ছে।
হেমন্ত এসেছে সাইড ভিজিটিং এ। জমিটা বেশ সুন্দর। স্কয়ার একদম। এলাকার জায়গাজমি সব তৌসিফদের হাত হয়ে বিক্রি হয়। ওদের বাপ-দাদার সম্পত্তিই বেশি। তৌসিফ সাথে থাকা লোকটাকে জানালো আজ বিকেলেই তৌসিফের সাথে কথা বলে জানাবে। কথাবার্তা শেষ করে মূল সড়কে যখন উঠবে তখনই ফোনটা বেজে উঠে। তৌসিফের নাম দেখে রিসিভ করেই হাসিমুখে সালাম জানাতে নেয় ও কিন্তু ওপাশ থেকে তারাহুরো শোনা গেলো। তৌসিফ বেশ তড়িঘড়ি করে জিজ্ঞেস করলো,

“পৌষরাতের এলার্জি আছে কিছুতে হেমন্ত?”
“কি হয়েছে ভাই?”
বেশ চিন্তিত হলো হেমন্ত। তৌসিফ কথা সংক্ষিপ্ত করলো,
“দুইদিন ধরে প্রচুর জ্বর। ডেঙ্গি ধরা পড়েছে। শরীর লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। তুমি বলো, এলার্জি আছে?”
“না তো। শরীর ফুলে উঠার মতো এলার্জি নেই। আমি আসছি এখনই।”
“বাসায় নেই৷ হাসপাতালে আছি।”
হেমন্তের বুকটা চেপে এলো। হাসপাতালে আছে? তাহলে কতটা অসুস্থ ওর পৌষ? নাম শুনেই হেমন্ত ছুটলো। সারাটা রাস্তা চিন্তায় মাথা ছিড়ে যাচ্ছিলো ওর। এই পৌষটা সহজে অসুস্থ হয় না। অল্পস্বল্প জ্বর ঠান্ডা কোনদিন প্রকাশই করে না। আজ কি হলো? দুইদিন ধরে নাকি অসুস্থ, হেমন্তকে আগে জানানো উচিত ছিলো তো।

ডাক্তার সকাল সকাল দেখে গিয়ে এখন আবার এসেছেন। তৌসিফ ঠাই বসা পৌষের সামনে। পৌষের মুখ ফুটে একই কথা। হাত-পা ব্যথা হচ্ছে। তৌসিফ আলতো হাতে চেপে দিচ্ছে। হেমন্ত ঢুকেই দৃশ্যটা দেখলো। এত এত চিন্তার মাঝে বুকে এক টুকরো প্রশান্তি ভর করলো। পৌষের তখনও পুরোপুরি ঘুম ভাঙে নি। হালকা ঘুমেই বিরবির করে নিজের ব্যথার জানান দিচ্ছে। হেমন্ত এগিয়ে আসে। তৌসিফ ওকে দেখলো। হেমন্ত দেখলো তৌসিফকে। যখন তৌসিফ শ্যুট হলো, হেমন্ত তো দেখেছে ওকে হসপিটালে। মুখচোখ তো এমন ছিলো না। এমন ভঙ্গুরও দেখায় নি তাকে তাহলে আজ কেন?
মুখ জুড়ে অসহায় ভাব দেখা দিলো তৌসিফের। হেমন্ত দাঁড়িয়ে থাকলো বোনের মাথার কাছে। মন চাইলো একবার কপাল ছুঁয়ে দেখবে কিন্তু সম্ভব হলো না। কেন জানি পৌষের বেলায়ই এমন হয়। সেঝ চাচি ছোট থেকে এতটাই নিম্ন বাক্য পৌষকে নিয়ে বলতো যে আজও বেশ সঙ্কোচ রয়ে গিয়েছে। অপারগ হেমন্ত নিজেকে সামলাতে। বোনের মাথায় হাত রেখে নিচু স্বরে ডাকলো,

“পৌষ? অ্যঁই পৌষ, উঠ বাচ্চা। দেখ ভাই এসেছি।”
পৌষ শুনে। টেনে চোখ খুলতে চায়। চোখ জোরা লাল হয়ে আছে ওর। হেমন্তের কণ্ঠনালী কাঁপে। কোনমতে বলে,
“তুই না গতকালও দেখা করলি? আমাকে কেন বললি না তুই এতটা অসুস্থ? হাসপাতালে পৌঁছে গেছে আমার বাচ্চা অথচ আমি জানি না।”
গলা ভেঙে আসতে চায়। পৌষ ফ্যাচফ্যাচে গলায়ই বলে,
“আমি ঠিক আছি।”
“দেখতে পাচ্ছি আমি।”
“হেমু ভাই, আর কেউ আসে নি?”
হেমন্তের চোখ ভিজে উঠলো। কোনমতে বললো,
“কেউ জানে না।”
“আচ্ছা।”
একটু থেমে আবার বললো,

“ওনাকে দেখেছো? ডেকে দাও তো। উনি খায় নি কিছু। শুনো, ওনার জন্য কিছু খেতে নিয়ে আসো। আদিত্য বললো কতবার, শুনলো না। রুটি এনো না। উনি বাইরে রুটি খান না। চারটা কলা আনবে, সাগর কলা ঠিক আছে? আর ডিম আনবে। সেদ্ধ করা। শুনো, হেমু ভাই শুনছো?”
চোখটা বুজে আসে পৌষের। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। হেমন্ত ওর মাথায় হাত রাখে,
“ভাই শুনছি বাচ্চা।”
“ভালো দেখে এককাপ কফি আনবে। চিনিছাড়া। বলবে শুধু কফি গরম পানিতে দিয়ে দিতে। দুধও না।”
“আচ্ছা।”

হেমন্ত মাথায় আরেকটু হাত বুলায়। পৌষের দিকে খানিকটা তাকিয়ে থেকে বলে,
“তোর উনি এখানেই আছে। তোর পায়ের কাছে।”
পৌষের চোখ দুটো খুলে গেলো পুণরায়। এখনও ওমন লাল হয়ে আছে। হেমন্ত বেরিয়ে গেলো। তুরাগ আর আদিত্য বাসায় গিয়েছে।
তৌসিফ মাথাটা নিচু করে একই ভাবে পা টিপে দিচ্ছে। পৌষের ব্যথা এতটাই যে এই আলতো হাতের চাপ পায়ে অনুভূত হচ্ছে না। পৌষ ডেকে উঠলো,
“কি করছেন?”
গলা বেশ ভাঙা, জড়িয়ে আসা। তৌসিফ মাথা তুললো না। ওর চোখ জ্বালা করছে। মায়ের পর তো ওকে নিয়ে কেউ এভাবে ভাবে নি। কেউ না। ঘুম ভাঙতেই কেন ওর তৌসিফের কথা মনে পড়লো? কেন মনে হলো তৌসিফের খেতে হবে? এত নিখুঁত বর্ণনাই বা কেন হবে তৌসিফের পছন্দের? মুখে ভালোবাসি বলতে কতই গাঁইগুঁই ওর অথচ পরিমাণ যেন সীমা ছাড়াতে চায়। এভাবে কেন ভালোবাসতে হবে ওর? তৌসিফ কোথায় তুলে রাখবে এই প্রেম, এত নিখুঁত ভালোবাসা?

“শুনছেন?”
এবারেও উত্তর দিতে পারলো না তৌসিফ। যদি পৌষ টের পায় তৌসিফের চোখ ভিজে উঠেছে? পৌষ সাড়া না পেয়ে এবারে জোরে ডাকলো,
“অ্যঁই মামাতো ভাই?”
“খবরদার ভাই ডাকবে না।”
“মামাতো ভাই ডেকেছি।”
“সেটাও ডাকবে না।”
“তাহলে কি ডাকব? আপনার মতো হানিবানি?”
“জানি না।”
“কি করছেন?”
বলতে বলতে খেয়াল হলো তৌসিফ ওর পা টিপছে। পৌষ হকচকালো। পা দুটো টেনে সরাতে চাইলো। শক্তিতে কুলালো না অবশ্য। বেশ জোর দিয়ে বললো,
“আমার পা থেকে হাত সরান।”
“নাহ্।”
“ব্যথা নেই। ছাড়ুন আপনি।”
তৌসিফ ছাড়লো না। পৌষ মোচড়ামুচড়ি শুরু করতেই তৌসিফ থামালো তবে মুখে কথা বললো না। তৌসিফকে এভাবে চুপচাপ দেখে পৌষ দু-হাত বাড়ালো। মাথাটা নিচু করেই তৌসিফ এগিয়ে এলো। পৌষ ওর হাত ছুঁয়ে দিলো, খুব আলতো করে। তৌসিফ আর টিকে থাকতে পারলো না৷ জড়িয়ে নিলো পৌষকে। নিজের বুকের মাঝে নিয়ে আটকে রাখা চোখের পানি তার গড়িয়েই পড়লো। এই পৌষরাত হকই এমন একজন যে তৌসিফ তালুকদারকে কাঁদিয়ে ছাড়লো। বেশ অনেক বছর পর।

বিকেল হতেই গুড়াগাড়ি সব হাজির হয়েছে হসপিটালে। পৌষ বেশ ফুড়ফুড়ে মেজাজে আছে। হাত-পা চিবিয়ে ব্যথা হচ্ছে তখনও৷ ইনি, মিনি চেপে দিচ্ছে এখন৷ মাথাটার চুল টেনে দিচ্ছে পিহা। চৈত্র স্যুপের বাটিটা হাতে তুলে অসহায় ভাবে বললো,
“আপা একটু খাও৷ দুলাভাই বলেছে এটা শেষ করাতে।”
“একটু মুখে দিয়ে দেখ। মন চাইবে বমি করে দিতে আমি দেখে এক চামচ গিলে নিয়েছিলাম।”
চৈত্র তাকালো জৈষ্ঠ্যের দিকে৷ হেমন্ত আর তৌসিফ ডাক্তারের রুমে গিয়েছে কথা বলতে। জৈষ্ঠ্য এসে বোনের হাত ধরে বসলো। বললো,

“আপা আরেকটু খাও৷ এটা খেয়ে ঔষধ নিতে পারলে স্যালাইন বন্ধ রাখবে আপাতত।”
“ভাই লাগিস না তুই আমার? আমার সোনার টুকরো ভাই, তুই গিলে নে। নে নে বাচ্চা, চট করে গিলে ফেল।”
পিহা মুখ চেপে হাসছে। জৈষ্ঠ্য অসহায় বোধ করলো। তখনই দরজায় নক হলো। পৌষ মাথা ঢেকে নিলো। দরজা ঠেলে ভেতরে আসে তুহিন। ওকে দেখে পৌষ একটু চমকায়। বাহ্, বেশ উন্নতি হয়েছে। পৌষকে দেখতে বড়, ছোট, মেঝ তিন তালুকদার আসছে। মেঝটাকে তো নিজের নামে সিল মেরেই নিয়েছে পৌষ। তুহিন এসেই চমৎকার করে হাসলো। ডেকে উঠলো,
“কি অবস্থা ফুপাতো বোন? শরীর স্বাস্থ্য ভালো?”
কপালে ভাজ পড়ে পৌষের তবুও বলে,
“ভালো।”
“মশাটশা নাকি কামড়ে খেয়েছে তোমাকে? আমাদের পুরো বাড়ীর থাইতে নেট লাগানো, নিশ্চিত তুমি সেঁধে গিয়েছো কামড় খেতে? ভেরী ব্যাড মামাতো বোন।”
পৌষ বিরক্ত হলো। ইনি, মিনি দেখলো তুহিনকে। দেখেই তুঁতলে বললো,
“তুমি তে?”
তুহিন তাকালো। জমজ দেখে বেশ অবাক হলো। এত মিল? কথাও বলে একসাথে। বিয়ের সময় দেখেছিলো অবশ্য। তুহিন এগিয়ে এসেই বললো,

“তালই হই৷ তালই।”
টিটকারি সুরে বললো তুহিন।
“টাটই?”
“না, তালই? ডাকো, তালই?”
“টাটোই।”
“ধ্যাত, তোতলা কোথাকার।”
তুহিন ধমকে বললো। সাথে সাথে নাক, ঠোঁট ফুলিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো দু’বোন। পৌষ ভয়াবহ রেগে গেলো। শরীরে শক্তি নেই তবে তেঁজ তো আছে।
“আপনি কাঁদলেন কেন ওদের? বাচ্চা মানুষ না ওরা। নিজে তো বুইড়া দামড়া একটা। বাঁশ মার্কা গলা দিয়ে ছানাপোনা ধমকায়।”

“এজন্যই মশা কামড়েছে তোমাকে তাও যেই সেই না এডিস মশা।”
তৌসিফ আর হেমন্ত ঢুকলো একসাথে। এসেই থ হয়ে গেলো। জড়সড় হয়ে পিহা, চৈত্র আর জৈষ্ঠ্য দাঁড়িয়ে আছে। ইনি, মিনি কাঁদছে পৌষের পায়ের কাছে বসে আর এদিকে তুহিন আর পৌষ আঙুল তুলে ঝগড়া করছে। থমকে থেকে তৌসিফ তারাতাড়ি দুই শালীকে কোলে তুললো। তুহিনকে দেখেই শাসালো,
“তুহিন!”
তুহিন থামলো একটু। তৌসিফের গলা ধরেই দু’বোন একসাথে অভিযোগ জানালো,
“দুতাবাই, টাটোই বকেতে। অনেত গুলা বকেতে।”
তুহিন খেঁকিয়ে উঠলো,
“কিসের বকেছি? মিথ্যা বলে তোমার শালীরা।”
ইনি, মিনি ধমক খেয়ে এবারে জোরে কাঁদতে লাগলো। তৌসিফ তুহিনকে এবার জোরে ধমক দিলো,
“চুপ! তুহিন এখনই স্যরি বল। বল স্যরি।”
তুহিন বাঁকা চোখে তাকালো। দেখলো পৌষ হাসছে তাও শয়তানি হাসি। তুহিনের রাগ হলেও সামলে নিলো। ছোট্ট করে স্যরি বললো। তৌসিফের কাঁধ থেকে মাথা তুলে দু’বোন এবারে নাক টেনে বললো,
“কান ধলে ছলি বলো।”

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৫

তুহিন তির্যক চাহনি দিলো তবে কান ধরলো। খিলখিল করে হাসলো দু’বোন। হাত বাড়িয়ে দিলো তুহিনের দিকে৷ রাগঢাক রাখলো আর তুহিন। হাত বাড়িয়ে দুটোকে কোলে নিলো। দু’জন যখন দুই গালে দুটো চুমু দিলো তুহিন তখন হঠাৎ থমকে গেলো৷ হঠাৎ করেই মনে হলো ওর বাচ্চা চাই৷ এমন জমজই চাই৷ পলককে আজই বলতে হবে। কতগুলো বছর হয়েছে। এখন তুহিন বাচ্চা চাইতেই পারে।

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৭