প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪০
নওরিন কবির তিশা
গ্রীষ্মের তপ্ত দ্বিপ্রহরে সূর্যের প্রখর তেজস্বী রশ্মি বিকিরিত হচ্ছে ধরণী জুড়ে।একটি বিশাল মঞ্চের উপরে দাঁড়িয়ে উদাত্ত কণ্ঠে ভাষণ দিচ্ছে আগামী আগামী নির্বাচনের বলিষ্ঠ কাণ্ডারি-ওয়াহাজ খান নীল।সম্মুখে অগণিত মানুষের উত্তাল জনসমুদ্র, যেন এক অন্তহীন মানবঢল। দীর্ঘক্ষণ ধরে সে জনপদের বিবিধ সমস্যা ও আগামীর স্বপ্ন নিয়ে অমোঘ বক্তব্য পেশ করছে।
পরিধানে ধবধবে শুভ্র পাঞ্জাবি। প্রখর রৌদ্রতাপে তাহার তীক্ষ্ণ ললাট বেয়ে নামছে স্বেদবিন্দু, যা মুক্তার ন্যায় চিকচিক করছে। সুষ্ঠুভাবেই এতক্ষণ বক্তব্য প্রদান করছিল সে। হঠাৎ পাশ ইফাজ ফিসফিসিয়ে কি যেন বলল তাকে। সঙ্গে সঙ্গে হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেলো তার।
শান্ত-শীতল দৃষ্টিতে ফুটে উঠলো আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত অগ্নিশিখা।আর এক মুহূর্তও আর দণ্ডায়মান রইল না নীল। সংক্ষিপ্ত দু-চারটি কথা বলেই বিদায়ের ঘোষণা করলো। মঞ্চ থেকে অবতরণ করে জনসাধারণের ভিড় অপসারণ করে দ্রুত এগিয়ে চলল সম্মুখ পানে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
প্রখর খরতাপ পেরিয়ে তিহু আর মাহা এসে পৌঁছালো ভার্সিটি থেকে কিছুটা দূরে একটি রেস্টুরেন্টে। রিশাদ আজ অনুপস্থিত একটা ব্যক্তিগত কারণে সে আসতে পারেনি। তিহু মাহা ভেতরে প্রবেশ মাত্র দেখতে পেলো রেস্টুরেন্টটা প্রায় ফাঁকা। অবশ্যই এই সময়টায় ফাঁকা থাকারই কথা। তারাও আশেপাশে কোনো ভালো ক্যাফে পেলে সেখানেই যেতো রেস্টুরেন্ট আসতো না।
যাই হোক, সবশেষে উত্তর দিকের জালনার পাশের একটা ফাঁকা টেবিলটাতে বসলো তারা। অর্ডার করলো পছন্দের খাবারের অতঃপর গল্পে লিপ্ত হলো।তিহু ঠোঁট উল্টে নাক টেনে বলল,,,
—’কি আর বলবো দুঃখের কথা বড় জা? কালকে তোদের মিল করালাম অথচ আমার….!
মাহা ভ্রু কুঁচকে বলল,,—’ঢং করছিস কেন? কেন কালকের প্ল্যান কাজে আসেনি?
তিহু কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,,—’আর প্ল্যান। এত কষ্ট করে সাজুগুজু করলাম ঢং দিলাম, ট্রাস্ট মি অত ঢং আমি জীবনে দেইনি। ইভেন কালকে আমি নিজে নিজে শাড়ি পরছিলাম। আমি শাড়ি শাড়ি পরেছিলাম দোস্ত! নিজে নিজে!
মাহা উৎসুক কণ্ঠে জিজ্ঞাসিলো,,—’তারপর তারপর?
তিহু নিরাশ হয়ে বলল,,—’তারপর আর কি! শালা আনরোমান্টিক বেডা কি বললো জানিস?
—’কি?
—’বলল যে দুধ গরম করে নিয়ে আসো। লাইক সিরিয়াসলি দোস্ত? আমি সাজুগুজু করলাম ওর রাগ ভাঙাতে আর ম’দ’ন আমায় বলে দুধ গরম করে আনতে!
মাহা এবার সশব্দে হেসে উঠলো।তিহু গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকাতেই নিজেকে সামলাতে সামলাতে মাহা বললো,,-—’স্যরি,স্যরি।
তিহু মুখ বাঁকিয়ে বলল,,—’হাসো হাসো, যত ইচ্ছা হাসো।
—’রাগ করিস না সোনা,কিন্তু তারপর বল… তারপর কি হলো?
—’তারপরে আর কি? ইচ্ছা করছিল লাথি মারতে কিন্তু নিজেকে সামলে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
মাহা এবার এতক্ষণ সামলে রাখা হাসিটা বের করে দিল শব্দ করে হেসে বলল,—’যেমন তুই,তেমন তোর বর আর তেমন তার রাগ!
তিহু-মাহা যখন এমন গল্পে মগ্ন তখন হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হল এক অজ্ঞাত ব্যক্তিত্ব। পোশাকে-আশাকে পাশ্চাত্যের ছোঁয়া। বাঙালিয়ানার ছিটে ফোঁটা নেই কোথাও। দেখতেও ইউরোপীয়দের মত।
রমণীটি হুট করেই তিহু আর মাহার টেবিলের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো, আলাপ জামাতে তাদের সামনের চেয়ারটাতে ইশারা করে বলল,,
—’ক্যান আই ?
তিহু-মাহা এক ঝলক মুখ তুলে চাইল পরক্ষণে তিহু বলল,,—’ইয়েস শিওর।
রমণীটটি হেসে বসলো সেথায়। গল্পরত তিহু আর মাহার দিকে চেয়ে বলল,,—’ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড? ক্যান আই আক্স আ কোশ্চেন?
তিহু ভ্রু গোটালো, মাহা বলল—’ইয়েস।
মেয়েটি কোনোরূপ বিচলিত না হয়েই তিহুর উদ্দেশ্যে বলল—’তুমি নুরাইন তাই না?
তিহু অবাক হলো, না মেয়েটির ভাঙা ভাঙা বাংলা বলায় নয় বরং তার নাম ধরে বলায়।সে বিস্মিত কন্ঠে কিছু বলার আগেই ঘটলো আরেক অঘটন, আপদের ন্যায় সেখানে উপস্থিত হলো তিহুর জীবনের সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তিটি;আরহাম। তাকে দেখেই তড়িৎ বেগে উঠে দাঁড়ালো তিহু।
মাহা কিছু না বুঝেই তিহুর দেখাদেখি উঠে দাঁড়ালো। বলল,,—’কি হয়েছে?
তিহু তার হাত ধরে টান দিয়ে বলল,,—’দ্রুত চল পরে বলছি সব।
সে যখন মাহাকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত তখনই তার অপর হাতটা আঁকড়ে ধরল আরহাম,,
—’কোথায় যাচ্ছ তোতা?
আরহামের এমন সম্বোধন আর কান্ডে ধৈর্যেরা বাঁধ হারাচ্ছে তিহুর রেগে ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে নিতে গেলেই আরো শক্ত করে আরহাম আঁকড়ে ধরল তার হাত। এদিকে তাদের এমন কাণ্ডে বিস্মিত-হতবাক মাহা।তিহু উপায়ান্তু না পেয়ে, পায়ে থাকা হিলের ক্লিপ টা সজোরে ফুঁটিয়ে দিল আরহামের পায়ে। আরহাম ব্যথায় সামান্য কুঁকিয়ে উঠতেই, ঝটকা মেরে নিজের হাত সরিয়ে নিলো তিহু।
আরহাম পরমুহূর্তেই তার হাত ধরতে যেতেই তিহু অপর হাত দিয়ে সপাটে চড় বসালো তার তীক্ষ্ণ চোয়ালে, গর্জে উঠে বলল,,
—’যদি মানুষের বাচ্চা হয়ে থাকিস, তাহলে আর কখনো এমন জা*নো*য়ারের মতো রূপ নিয়ে আমার সামনে আসবি না।
আরহাম নির্লজ্জের ন্যায় হেসে অপর হাত দিয়ে,তিহুকে আঁকড়ে বলল,,—’তোমার কাছে নির্ল’জ্জ জা’নোয়া’র পৃথিবীর নিকৃষ্ট মানবের উপাধি নিতেও আপত্তি নেই আমার। শুধুমাত্র, তোমাকে এখন আমার সাথে যেতে হবে।
মাহা এবার আশ্চর্যের রেশ কাটিয়ে, ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল,,—’নিয়ে যাবি মানে? কে তুই হ্যাঁ? তোকে তো আমি…!
মাহা পাশ থেকে একটা কাচের গ্লাস হাতে তুলে, সজোরে আঘাত করল আরহামের মাথায়। তৎক্ষণাৎ পাশ থেকে ফ্লোরা এসে আটকে ধরল তার হাত। তিহু আরহামের বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই আরহামের হতাশাগ্রস্থতার সাক্ষী সে। তাই না চাইতেও এমন নিষিদ্ধ কাজে আরহামকে সাহায্য করতে এসেছিল সে। তবে তিহু-আর মাহার এমন রণমূর্তি দেখে হতভম্ব ফ্লোরা।
এদিকে, কাচের কিছু ভাঙা অংশ আরহামের মাথার ভেতরে প্রবেশ করতেই র’ক্তপাত হতে শুরু করল সেখান থেকে। তবে মাহার দিকে কোনরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে আরহাম যখন তিহুকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে প্রস্তুত ঠিক সেই মুহূর্তেই রেস্টুরেন্টের কাঁচের দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে আছাড় খেয়ে খুলে গেল।
বাতাসের বেগে ভেতরে প্রবেশ করল এক দীর্ঘদেহী মানবমূর্তি। মুহূর্তেইএক জোড়া শক্ত হাত আরহামের কবজি চেপে ধরল। পরক্ষণেই কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরহামের নাকে এসে পড়ল এক সজোরে ঘুষি। ছিটকে কয়েক হাত দূরে গিয়ে পড়ল সে।
তিহু আর মাহা দুজনেই স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল। ঘর্মাক্ত ললাটে ক্রোধের শিরাগুলো ফুলে ওঠা অবস্থায় সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং ওয়াহাজ খান নীল। তার শুভ্র পাঞ্জাবিটা জায়গায় জায়গায় কুঁচকে গেছে, চোখের মণি দুটো যেন জ্বলন্ত অঙ্গার।
নীল একবার পেছন ফিরে তিহুর দিকে তাকালো। সেই শীতল অথচ আশ্বস্ত করা দৃষ্টি দেখে তিহুর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। আরহাম মেঝে থেকে কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে পাগলের মতো হাসতে লাগল। কপাল বেয়ে পড়া রক্তগুলো মুছে নিয়ে বলল,
—’শেষবারের মতো বলছি, ছেড়ে দে ওকে ।
নীল কোনো উত্তর দিল না। সে ধীর পায়ে আরহামের দিকে এগিয়ে গেল। আরহাম পাশের একটা টেবিল থেকে একটা কাঁচের বোতল তুলে নিয়ে ভেঙে ফেলল।সে আর্তনাদ করে নীলের দিকে তেড়ে এল।নীল অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে আরহামের পেটে এক সজোরে লাথি বসাল। আরহাম দেয়ালে গিয়ে সজোরে ধাক্কা খেল। নীল এবার তার কলার চেপে ধরে দেওয়ালে পিষে ধরল।
— ‘তোকে আমি শেষবার সতর্ক করেছিলাম । কিন্তু তুই সীমা লঙ্ঘন করেছিস। আমার একান্ত ব্যক্তিগত জিনিসের দিকে হাত বাড়ানোর সাহস তোকে কে দিল?
নীলের প্রতিটি শব্দে যেন বজ্রপাত হচ্ছিল।তবে আরহামও দমবার পাত্র নয়। সে তার সর্বশক্তি দিয়ে নীলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে পাল্টা আঘাত করতে চাইল। শুরু হলো এক দুর্ধর্ষ লড়াই। রেস্টুরেন্টের আসবাবপত্র উল্টে-পাল্টে একাকার হয়ে যাচ্ছে। ফ্লোরা আর্তনাদ করে আরহামকে থামানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু নীলের দেহরক্ষীরা তাকে দূরে সরিয়ে দিল।
নীল আজ কোনো রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ধার ধারছে না। তার প্রতিটা ঘুষিতে মিশে আছে প্রিয়তমাকে স্পর্শ করার চরম প্রতিশোধ। এক পর্যায়ে আরহামকে মেঝেতে ফেলে তার বুকের ওপর চেপে বসল নীল। একের পর এক আঘাত করতে করতে গর্জে উঠল,
—’কু*ত্তা*র বাচ্চা, জা*নো*য়া*র তোর সাহস কি করে হলো আমার জিনিসের দিকে তুই হাত বাড়াস।
আরহাম এখন প্রায় অচেতন। মুখ দিয়ে র’ক্ত গড়িয়ে পড়ছে। নীল যখন শেষ আঘাতটা করতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে তিহু এসে নীলের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল,
— ‘ছেড়ে দিন, ও মরে যাবে! ওর জন্য আপনার হাত র’ক্তে র’ঞ্জিত করবেন না, প্লিজ!
তিহুর স্পর্শ পেতেই নীলের টানটান হয়ে থাকা পেশিগুলো যেন এক নিমেষে শিথিল হয়ে এল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিল। আরহামের কলার ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে হাতের রক্তের দাগ মুছতে মুছতে নিজের দেহরক্ষীদের দিকে ইশারা করল।
—’এই আবর্জনাটাকে এখান থেকে সরিয়ে ফেল। আর মনে রাখিস, আজ থেকে এর ছায়াও যেন আশেপাশে নুরের না পড়ে। না হলে পরের বার আমি ওকে এমন জায়গায় পাঠাবো যেখান থেকে ফেরার পথ তোর চেনা থাকবে না।
ফ্লোরা চটজলদি আরহামকে নিয়ে বেরিয়ে গেল সেখান থেকে।নীল এবার তিহুর দিকে ফিরল। রোদে তপ্ত হয়ে যাওয়া তার ললাটের সেই স্বেদবিন্দুগুলো তখনো চিকচিক করছে।তিহু হাতে দিয়ে সেগুলো মুছতে যেতেই নীল তাকে বাঁধা দিয়ে বলল,,
—’তোমাকে আমি বারন করেছিলাম, নিষেধ করেছিলাম অন্তত আমার বলার আগ পর্যন্ত বাসা থেকে বের না হওয়ার না হওয়ার। কিন্তু…!
নীল আর কিচ্ছু বলল না হাতের কর্নিষ্ঠা আর মধ্যমা দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে কপাল ঘষতে থাকলো। পরক্ষণেই তীব্র বেগে বেরিয়ে গেল রেস্টুরেন্ট থেকে, তিহু কপালে হাত দিয়ে ধপ করে বসে পড়ল, আরহামকে হাজারটা গালাগালি দিয়ে মাহার উদ্দেশ্যে বলল,,,
—’ওই শা”লা হোদল কুতকুতকে আজকেই আসতে হলো! মানে সামান্য রাগটা একটু ভাঙ্গিয়েছিলাম কোনমতে, আর শা”লা হো’দুল কুতকুত আজকেই হাজির হইছে! আল্লাহ গো!
মাহা দ্রুত তিহুকে ধাক্কিয়ে বলল,,—’এসব পরে ভাববি আগে বাসায় যা বলদ,ভাইয়া অলরেডি রেগে-মেগে ফায়ার হয়ে আছে।
তিহুর সম্বিৎ ফিরল যেন।দ্রুত নীলের পিছু নিতে নিতে সে মাহাকে বিদায় জানালো।
গাড়ি চলছে বেশ গতিতে।তিহু বারংবার লুকিং গ্লাসে পাশে বসা নীলের দিকে তাকালেও নীল একবারও তাকাচ্ছে না তার দিকে। তিহু এবার ড্রাইভিং সিটের কিছুটা কাছাকাছি নীলের দিকে সরে বসলো। নীল তাকে পাত্তা না দিয়ে বরং আগের বেগেই গাড়ি চালাতে থাকল। তিহু প্রকার তার গা ঘেঁষে বসল। নীল এক ঝলক আড়দৃষ্টিতে তাকালো তার পানে।
তিহু আরেকটু এগিয়ে এসে আলসে ছেড়ে, আনমনে গেয়ে উঠলো,,
🎶 Zara Zara close Tu Ake..
Mere chain chura le…
Chori chori sabse chupa ke…
Kahin dur le ja re….
Kya kahoon kya hal hai mera…
Ho Gaya Dil Yaar Tera…
Ek Baar Tu aake mil…
Tu aake mil…Tu aake mil…Tu aake mil…
Tera bimar Mera Dil tera jina hua muskil..
Karun kya hay..🎶
গানের শেষে সে একবার নীলের মনোভাব বুঝতে তার দিকে তাকালো তিহু। নীল এখনো ভাবলেশহীন ভঙ্গিমায় গাড়ি চালাতে ব্যস্ত। এবার সত্যি সত্যি রাগ হলো তিহুর। মুখ বাঁকিয়ে কিছুটা সরে গিয়ে অপরদিকে ফিরল সে।
তিহু দৃষ্টির সরাতেই তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো নীল,সীট খুবলে ধরা নিজের হাতটার দিকে একবার তাকিয়ে, সেটা শিথিলের ব্যর্থ চেষ্টা করল সে।
ঘড়ির কাঁটায় দুইটা বেজে পঞ্চান্ন মিনিট। ভার্সিটি থেকে এসেই দীর্ঘ একটা শাওয়ার নিতে ওয়াশরুমে ঢুকেছে তিহু। অতিবাহিত হয়েছে প্রায় অর্ধ ঘণ্টার বেশি। নীল এতক্ষণ সোফায় বসে, ফার্স্ট এইডের কাজ করছিলো। প্রবেশের সময় কেউ উপস্থিত না থাকায় জবাবদিহিতা করতে হয়নি আঘাত নিয়ে।হঠাৎ ভেতর থেকে ভেসে আসলো তিহুর রিনরিনে কণ্ঠস্বর,,
—’নেতা সাহেব?
নীল প্রথমে ডাক ন শুনলেও তিহু ফের বলল,,—’এখানে একটু আসবেন প্লিজ, আমার চুলগুলো বাজে ভাবে আটকে গিয়েছে এইখানে। ছাড়াতে পারছি না প্লিজ।
নীল ভ্রু গুটিয়ে বলল,,—’ওয়াশরুমে চুল আটকায় কিভাবে?
—’সেটা আমি কি জানি? আটকে গেছে এখানে। প্লিজ আসুন না।
নীল আর দেরি করল না সরল মনে দ্রুত উঠে এগিয়ে গেল ওয়াশরুমের দিকে। দরজায় আলতো আঘাত করতেই সেটা নিঃশব্দে খুলে গেল। তিহু আগে থেকেই মেঝেটা সাবান দিয়ে পিচ্ছিল করে রেখেছিল। নীল ভেতরে পা রাখতেই ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ল তিহুর ওপর।
তিহুর পিঠ দিয়ে বাধলো দেয়ালে আর নীল এসে পড়ল তার ওপর।মুহূর্তের মধ্যে তিহু নিজের ওড়না দিয়ে নীলকে পেঁচিয়ে একদম কাছে টেনে নিল। নীলের শক্ত দু-হাত তখন তিহুর কোমরে। ঠিক সেই মুহূর্তে তিহু অগোচরে হাত বাড়িয়ে ঝরনাটা ছেড়ে দিল। ওপর থেকে ঝরঝর করে আছড়ে পড়া জলবিন্দুতে দুজনেই মুহূর্তেই ভিজে একাকার।
নীলের স্তম্ভিত চোখের দিকে চেয়ে তিহু এক মায়াবী হাসল। সিক্ত চুলে জলবিন্দুগুলো হিরের মতো চিকচিক করছে। তিহু আলতো করে নীলের দু চোয়ালে হাত রেখে ডান চোঁয়ালে এক উষ্ণ গাঢ় চুম্বন এঁকে গান ধরল,,
🎶 ফোলা ফোলা ফর্সা গালে…
জমেছে জল বর্ষাকালে….
ফোঁটা ফোঁটা মুক্ত দানা..
না না সোনা আর কাঁদে না….
থাকো যদি গোমড়া মুখো….
কাতুকুতু দেবো তোমাকে….🎶
তিহুর গান শেষ হতে দেরি সঙ্গে সঙ্গে নীলের ওষ্ঠাধর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল তিহুর সেই গোলাপি ঠোঁটে। এক দীর্ঘ, নিবিড় আর তৃষ্ণার্ত চুম্বনে নীল যেন পৃথিবীর সমস্ত স্তব্ধতা শুষে নিল।মুহূর্তের মধ্যে তার বলিষ্ঠ দুই হাত দিয়ে তিহুর কোমর পেঁচিয়ে ধরল। আগাম পূর্বাভাস ছাড়াই তাকে শূন্যে তুলে নিলো নীল।
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৩৯
ঝরনার জলরাশি তাদের ওপর আছড়ে পড়ছে, কিন্তু সেদিকে কোন হেলদোল নেই কারো।নীল আজ মন সাগরের উত্তাল কামনার ঢেউ নিবারণে তৎপর। যেন তিহুর এত দিনের জ্বালাতনের শোধ আজকেই উসুল করবে সে;এদিকে ভিজে প্রায় উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া কোমরে, নীলের এমন অবাধ্য স্পর্শে লাজুক লতার ন্যায় নুইয়ে পড়েছে তিহু। মেরুদণ্ড বেয়ে নামা শীতলতা গ্রাস করছে সমগ্র দেহ। শেষমেষ তীব্র সেই অনুভূতির কাছে হার মেনে,আবেশে চোখ বুজে নীলের শুভ্র পাঞ্জাবিটা খামচে ধরল সে।
