প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৩
নওরিন কবির তিশা
সদা প্রাণচঞ্চলতা বিরাজমান হক ম্যানশনে আজকাল নির্জীব স্তব্ধতার রাজত্ব কায়েম হয়েছে। নিস্তব্ধতা মুড়িয়ে থাকে সর্বদা সেথায়। কারণ সমগ্র বাড়ির প্রফুল্লতার প্রাণ ভোমরাটি যে অনুপস্থিত।তিহুর হাসির কলতানে যে দেয়ালগুলো একসময় প্রাণবন্ত হয়ে উঠতো, আজ তারা কেবল বোবা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। বাড়ির প্রতিটি কোণে যেন এক গভীর দীর্ঘশ্বাস জমে আছে।
বাড়ির লোকজনের মুখের দিকে তাকানো যায় না। সবার চোখে-মুখে একরাশ মেঘ জমে ভারী হয়ে আছে। যে ড্রয়িংরুমে বসে একসময় হাসির রোল উঠত, সেখানে এখন কেবল দীর্ঘশ্বাসের আনাগোনা সদা হাসির রোল বিরাজমান সেই মহলে নেই কোনো অহেতুক খুনসুটি।
ম্যানশনের সবার দিন কাটে বিমর্ষ মুখে,সবচেয়ে করুণ দশা তিহুর দাদা আর দাদির। বার্ধক্যের ভারে ন্যুব্জ এই দম্পতি নাতনির আকস্মিক অন্তর্ধান মানতে পারেন নি কিছুতেই। তাদের অবশিষ্ট প্রাণশক্তিটুকুও শুষে নিয়েছে কোনো এক তিক্ত বিষাদ।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
নুরুজ্জামান হক কয়েকদিন ধরে বিছানা ছেড়ে ওঠেননি।তিনি মানুষটা বরাবরই শক্ত ধাঁচের ছিলেন, কিন্তু এই কদিনেই তিনি যেন দশ বছর বুড়িয়ে গেছেন। তার সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর এখন ক্ষীণ হয়ে এসেছে। শরীরের অসুস্থতার চেয়ে মনের অসুস্থতাই তাদের তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে।
নিস্তব্ধতার করাল গ্রাসে আক্রান্ত প্রত্যেকে।তাজহীর ইদানিং বাড়িতে ফিরে সন্ধ্যার পর, স্কুল কোচিং এর নাম করে দিব্যি এই ভারাক্রান্ত পরিবেশ থেকে পার পেয়ে যাচ্ছে সে।পিহুরও ইদানিং বাড়িতে ভালো লাগেনা; তিহু চলে যাওয়ার কিছু দিন বাদেই মামা বাড়ি পাড়ি জমিয়েছে সে।
নাতি নাতনিদের এমন বিচ্ছেদ কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না নুরুজ্জামান হক। একপ্রকার বাধ্য হয়েই তিনি আজ দুই ছেলেকে ডেকে পাঠিয়েছেন। সন্ধ্যার কিছুটা পরে নওশাদ হক আর নিহাল হক বাবার অনুমতিক্রমে রুমে প্রবেশ করলেন। নুরুজ্জামান হক বেশ কষ্ট করে উঠে বসলেন। নওশাদ হক শুধালেন,,
—’কিছু বলবেন আব্বা?
_’হ্যাঁ! তোমাদের দুই ভাইয়ের সাথে আমার কিছু কথা বলার আছে।
নওশাদ হক একবার নিহাল হকের দিকে তাকালেন অতঃপর নুরুজ্জামান হকের দিকে তাকিয়ে বললেন,,
—’জ্বী বলুন?
নুরুজ্জামান হক একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন; খানিকক্ষণ নীরব থেকে অতঃপর বললেন,,
—’দেখো, জীবনে কম গোড়ামী করিনি আমি। যার ভেতর সবচেয়ে বড় গোড়ামী ছিলো নওফেল আর রৌশান আরার সম্পর্কটা মেনে না নেওয়া। এখন আমি এই জীবনের অন্তিম ক্ষণে এসে সেটা বুঝতে পারছি। তার কারণ একটাই আমার পুতুল। ভেঙে ফেলো তোমরা এই গোড়ামী। কিন্তু আমার পুতুলকে একটিবারের জন্য আমার সামনে নিয়ে আসো। তোমাদের আম্মার অবস্থাও ভালো না। শুনেছি, আমার নওফেলের নাকি এক রাজপুত্র আর রাজকন্যা আছে। তাদেরকে একটিবারের জন্য দেখতে চাই আমরা।
বাবার এমন কাকুতিপূর্ণ কন্ঠে হৃদয় নরম হলো নওশাদ হক আর নিহাল হকের। বলাবাহুল্য তিহু সেদিন ওভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই, কোনভাবেই অপরাধবোধ থেকে বেরোতে পারছিলেন না নিহাল হক। আর নওশাদ হক নিজের সর্বোত্তম বন্ধুকে দেখার পর থেকে আর কোনো ক্ষোভ জমা রাখতে পারেননি। তারা দুজনেই সম্মতি সূচক মাথা নাড়িয়ে বললেন,,
—’আচ্ছা আব্বা আমরা যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা করছি।
নুরুজ্জামান হক তাড়া দেওয়ার কন্ঠে বললেন,,—’যত জলদি সম্ভব।
নওশাদ হক,নিহাল হক দুজনেই সম্মতি সূচক মাথা নাড়িয়ে বললেন,,—’জ্বী আব্বা।
জুলাইয়ের ২০ তারিখ। নির্বাচনী দিন আজ।শহরের রাজপথে আজ রোদটা একটু অন্যরকম।সকাল থেকেই তপ্ত বাতাস বইছে। পিচঢালা রাস্তাগুলো জনশূন্য, শুধু মোড়ে মোড়ে পুলিশের কঠিন প্রহরা আর বিজিবির টহল গাড়িগুলোর চাকার শব্দ স্তব্ধতাকে খানখান করে দিচ্ছে। এক অদ্ভুত থমথমে ভাব পুরো ঢাকা শহরে।
ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে মানুষের মেলা। নীলের বিশ্বস্ত কর্মীরা প্রতিটি বুথে পোলিং এজেন্ট হিসেবে শক্ত হয়ে বসে আছে। তাদের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, যেন বাতাসের গতিবিধিও নির্ণয়ের তৎপর তারা।
এদিকে সকাল থেকেই খান মহলে সাজ সাজ রব। তবে এই সাজসজ্জায় বিদ্যমান উৎসবের আমেজহীন এক টানটান উত্তেজনা। বিশাল ড্রয়িংরুমটা এক কন্ট্রোল রুমে পরিণত হয়েছে। বড় বড় ম্যাপ, ভোটার লিস্ট আর ওয়াকিটকির কর্কশ আওয়াজে মুখর চারপাশ। নীলের বাবা, বর্ষীয়ান নেতা সঙ্গে বর্তমান এমপি সাহেব আজ অনেকটা নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টা করলেও তার অভিজ্ঞ চোখজোড়া বারবার জানলার বাইরে তাকাচ্ছে।
ছেলের প্রথম নির্বাচনী লড়াই;সিংহের উত্তরাধিকারী আজ নিজের রাজত্ব বুঝে নিতে মাঠে নেমেছে তাই গর্বের পাশাপাশি দুশ্চিন্তার পরিমাণও কোন অংশে কম নয় তার।তাই ছেলের জন্য দোয়া আর মিলাদ পড়ানোর আয়োজন করা হয়েছে ভোরেই।
বাদ বাকি কেন্দ্রগুলো পরিক্রমণ শেষে দুপুরের দিকে নীল যখন একটি কেন্দ্রে এসে নামল,মুহূর্তেই চারপাশ স্লোগানে ফেটে পড়ল। সে হাত তুলে সবাইকে শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত দিল;তার সেই ছোট ইশারায় মুহূর্তেই থমকে গেল চারপাশ।
পরিবেশটা সামাল দিয়ে সে কেন্দ্রটা প্রদক্ষিণে তৎপর হলো। প্রতিটি বুথের ভেতর গিয়ে পোলিং এজেন্টদের সাথে কথা বলছে সে,কোথাও কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখছে। সাধারণ ভোটাররা যখন তাদের প্রিয় তরুণ নেতাকে সামনে দেখছে, তখন তাদের চোখেও ভরসার ঝিলিক।
নীল হাসিমুখে এক প্রৌঢ়ের হাত ধরে কুশল বিনিময় করল। তার এই নম্রতা আর দায়িত্ববোধ দেখে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ। এক জনদরদী নেতার পূর্ণ প্রতিচ্ছবি যেন ফুটে উঠেছে তার অবয়বে।
কেন্দ্রের শেষ সীমানা ঘেঁষে হাঁটছে নীল আর তার দলবল। উদ্দেশ্য যে কোনো রকম বিশৃঙ্খলা রোধ। এই কেন্দ্রের শেষ প্রদক্ষিণ এটা। এরপরই নীল রওনা হবে অপরকেন্দ্রের উদ্দেশ্যে। জনদশকের মতো লোকজন নীলের সঙ্গে। গল্প করতে করতে হাঁটছে তারা।সেই সাথে সার্বক্ষণিক আঠার ন্যায় নীলের সঙ্গে লেপ্টে আছে আইয়াজ।
চারিদিকের হট্টগোলের মাঝেও হঠাৎ আইয়াজের ষষ্ঠেন্দ্রিয় জানান দিল বিজাতীয় এক বিপদের। ঠিক পাশের আধভাঙ্গা দালানের জানলার কাঁচ ভেদ করে এক চিকচিকে ধাতব যন্ত্রের ঝিলিক আইয়াজের চোখে বিঁধল। দেখল, কালো একটা নল স্থির লক্ষ্যভেদ করতে চাইছে নীলের বুক বরাবর।আইয়াজের হৃদপিণ্ড থমকে গেল এক মুহূর্তের জন্য । সে চিৎকার করে আর্তনাদ করে উঠল,,
—’স্যার সরে যান….
মুহূর্তের ভগ্নাংশ! ট্রিগার টেপার শব্দ আর বাতাসের বুক চিরে ক্ষিপ্র বেগে সিসার বুলেটের ধেয়ে আসা একই সাথে ঘটল। নীল কিছু বুঝে ওঠার আগেই আইয়াজ সর্বশক্তি দিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে পাশে ফেলে দিল। লক্ষ্য ছিল নীলের হৃদপিন্ড, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সেই বুলেট বিঁধে গেল আইয়াজের বাহু আর পিঞ্জরের ঠিক মাঝখানে।
‘ঠা-ঠা-ঠা’—পরপর তিনটি বজ্রাঘাতের ন্যায় শব্দ।
নীল ছিটকে পড়ে পাথুরে জমিতে, কিন্তু কানে এল এক যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ। ধড়ফড়িয়ে উঠে তাকিয়েই নীলের আত্মা কেঁপে উঠল। আইয়াজ ভারসাম্য হারিয়ে ততক্ষণে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, তার কাঁধের নিচে সাদা শার্টটা মুহূর্তেই টকটকে লাল রক্তে ভিজে যাচ্ছে।নীলের সাদা পাঞ্জাবিও আইয়াজের ছিটকে আসা র’ক্তে র’ঞ্জি’ত।
নীল চিৎকার করে উঠল, —’আইয়াজ!
চারপাশে তখন হুলস্থুল পড়ে গেছে। কর্মীরা ছুটে আসছে, নিরাপত্তারক্ষীরা পজিশন নিচ্ছে। কিন্তু নীলের চোখে তখন কেবল আইয়াজের র’ক্তে ভেজা শরীর। এমন একটা ঘটনা জন্য হয়তো নীল প্রস্তুত ছিল। কেননা প্রতিটি নির্বাচনের সাধারণ ঘটনা এটা।কিন্তু এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের জন্য তার প্রস্তুতি ছিল না।
নীল পাগলের মতো চিৎকার করে আইয়াজকে জাপ্টে ধরল। তার দুহাতে এখন আইয়াজের গরম রক্ত। নীলের গলার শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, চোখ দুটো র’ক্তবর্ণ ধারণ করেছে । সে আর্তনাদ করে উঠল,,
—’গাড়ি বের কর! জলদি গাড়ি বের কর! আইয়াজ, চোখ খোল… আমার দিকে তাকা!
আইয়াজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে র’ক্ত গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেখানে একটা প্রশান্তির হাসি। অস্ফুট স্বরে সে শুধু বলল,
—’আপনি ঠিক আছেন তো স্যার?
কথাটা শেষ করেই আইয়াজের চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। নীল তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। পাশে থাকা কর্মীদের ওপর গর্জে উঠল সে,,
—’দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিস কেন তোরা? কুলাঙ্গারটাকে ধর! ওই দালান থেকে কে গুলি করেছে তাকে জ্যান্ত চাই আমার!
মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। নীলের দেহরক্ষীরা সেই আধভাঙা দালান ঘিরে ফেলল। ওদিকে আইয়াজকে গাড়িতে তুলল নীল। ড্রাইভারকে হুংকার দিয়ে বলল,,
—’হাসপাতাল! পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছানো চাই, নাহলে তোর কপালে আজ শনি আছে!
আসিফ গাড়িতে সর্বোচ্চ বেগ তুলল। ঝড়ো হাওয়ার বেগে গাড়ি ছুটে চলে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।
র’ক্তে ভেজা পাঞ্জাবি নিয়ে নীল হাসপাতালের করিডোর দিয়ে স্ট্রেচারের সাথে দৌড়াচ্ছে।মনে হচ্ছে সময় যেন থমকে গেছে। নার্সরা দ্রুত এগিয়ে এলো ট্রেচারটা নীলের হাত থেকে নিয়ে আইয়াজকে নিয়ে প্রবেশ করল অপারেশন থিয়েটারে।
কিছুক্ষণ বাদে অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটা জ্বলে উঠতেই নীল ধপ করে করিডোরের চেয়ারে বসে পড়ল। তার দুহাত ভর্তি র’ক্ত। লেগে থাকার র’ক্তে দিকে তাকিয়েই হিংস্রতা জ্বলে উঠালো তার দুচোখে। পাশে থাকা ছেলেগুলোকে, কিছু একটা নির্দেশ দিয়েই র’ক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো অপারেশন থিয়েটারের দিকে ।
অপারেশন থিয়েটারের বাইরে করিডোরটা যেন এক জনহীন মরুপ্রান্তর। দেয়ালে টাঙানো ঘড়িটার টিকটিক শব্দ নীলের কানে হাতুড়ির মতো বিঁধছে। খান বাড়ির প্রত্যেকে একে একে হাজির হয়েছেন, সবার চোখেমুখে উদ্বেগের কালো ছায়া। বিশেষত নাহা’র মুখাবয়বে স্পষ্ট অব্যক্ত যন্ত্রনার রেখা। সে না তো কাওকে এই বিভর্ষ যন্ত্রণার ভাগ দিতে পারছে আর না তো যন্ত্রনা কমাতে পারছে।
ওয়ালিদ খান ধীর পায়ে ছেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ছেলের গায়ের র’ক্তমাখা পাঞ্জাবি দেখে তাঁর বুকটা কেঁপেও কাপলো না কেননা এমন ঘটনা তার কাছে দুধভাত বিশেষত নির্বাচনের দিনে। কত শত প্রিয় অনুচর কে হারিয়েছে সে।
খানিক বাদে ওটি-র দরজা খুলে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। সবার উৎকণ্ঠাকে ছাপিয়ে নীল বিদ্যুৎবেগে উঠে দাঁড়াল।
—’ডাক্তার, আইয়াজ কেমন আছে?
ডাক্তার মাস্কটা নামালেন,তাঁর ক্লান্ত চোখেমুখে আশার আলো উজ্জ্বল নয়;তিনি বললেন—’বুলেটটা বের করা গেছে, কিন্তু রক্তক্ষরণ অনেক বেশি হয়েছে।তাই জ্ঞান ফেরার আগ অব্দি কিছু বলা যাচ্ছে না।
নীলের ভেতরের সেই শান্ত সমুদ্রটা হঠাৎ উত্তাল হয়ে উঠল। সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার অনুচরদের দিকে ফিরে তাকাল। সেই চোখে তখন আর মানুষের মমতা নেই, আছে কেবল এক হিংস্রতা;গম্ভীর গলায় সে আদেশ দিল—’সমগ্র শহর খুঁজে বের করো তাকে। যে হাতে গুলি ছোড়া হয়েছে;সেই হাত আমি আস্ত দেখতে চাই না।
বলেই সে দ্রুত পদচারণায় হাসপাতাল ত্যাগ করল। পেছনে পড়ে রইল স্বজনদের আকুলতা আর অপারেশন থিয়েটারের সেই নিস্তব্ধ লাল বাতি।
নাহা তখন থেকে ফুঁপিয়ে চলেছে। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটার চোখ মুখ লাল হয়ে আছে। তিহু বিমূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে কন্দনরত নাহা’র পানে। অতঃপর এগিয়ে এসে,সন্তর্পণে নাহার কাঁপতে থাকা কাঁধে হাত রাখল। তাকে লোকচক্ষুর আড়ালে এক নির্জন কোণে নিয়ে গেল। নাহা’র দুহাত চেপে ধরে স্নিগ্ধ কণ্ঠে বলল,,
—’কান্না করো না,নাহা। তুমি এতটা ভেঙ্গে পড়লে কিভাবে চলবে বলো? দেখো আইয়াজ ভাইয়ের কিচ্ছু হবে না।
নাহা তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। তিহুর বুকে মুখ লুকিয়ে সে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার রুদ্ধকণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল হৃদয়ের গহীনে লুকিয়ে রাখা সেই গোপন দহন,,
—’আই লাভ হিম বউমনি। আই রিয়েলি লাভ হিম।আই কান্ট লিভ উইথ আউট হিম,বউমনি।আই কান্ট।
তিহু নাহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। ভালোবাসার এই অকপট স্বীকারোক্তি তাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে যেন।মানুষের জীবন কত বিচিত্র! এক মরণপণ যুদ্ধের মধ্যে দিয়েও প্রেমের এই চোরাবালি নিঃশব্দে জেগে ওঠে।
নিস্তব্ধ রজনী, কিছুক্ষণ আগেই রিটার্নিং অফিসার আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেছেন। বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছে তরুণ নেতা ওয়াহাজ খান নীল।হাজার হাজার সমর্থক উল্লাসে ফেটে পড়েছে। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত শহরের আকাশ-বাতাস।সমর্থকদের উন্মাদনা যেন বাঁধ ভেঙেছে।
নীলের বাড়ির সামনে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। আবির আর ফুলের মালায় ছেয়ে গেছে চারপাশ। ইতিমধ্যে এসেছে আরেকটি সুখকর বার্তা। আইয়াজের জ্ঞান ফিরেছে ঘন্টাখানেক আগে। বর্তমানের শঙ্কামুক্ত সে।
খান মহলে বর্তমানে খুশির আমেজ;অন্দরমহলে এক বিচিত্র শান্ত সমাহিত ভাব বিরাজ করছে। বাহিরের সেই কোলাহল যেন এই সুগম্ভীর অট্টালিকার দ্বারে এসে মস্তক অবনত করে প্রস্থান করছে।
ওয়ালিদ খান ড্রয়িংরুমের একখানা চওড়া সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন। তার আননে আজ এক প্রশান্ত গৌরবের আভা। দীর্ঘ রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথে তিনি যে মহীরুহ রোপণ করেছিলেন, আজ তাঁরই রক্তজ সন্তান সেই মহীরুহের ছায়ায় নিজের আসন পেতে নিয়েছে। তনয়ের এই জয় যেন তার নিজ জীবনের চরম সার্থকতা।
নাহাও এখন অনেকখানি শান্ত। আইয়াজের আশঙ্কামুক্ত হওয়ার সংবাদটি তার তপ্ত মরুভূমিতে এক পশলা শ্রাবণধারার বর্ষণের ন্যায় পতিত হয়েছে। সে দোতলার করিডোরে দাঁড়িয়ে উন্মত্ত উচ্ছ্বাস দেখছে। কর্তীরা আজ রন্ধনশালার তদারকিতে ব্যাস্ত। খাওয়ানো হবে এলাকার সকল দরিদ্রদের।
তিহু অপেক্ষমান তার নেতা সাহেবের। রাত প্রায় বারোটার কিছুটা পরে কক্ষে প্রবেশ করল নীল। চোখে মুখে ক্লান্ততার রেখাগুলো স্পষ্ট। সারাদিন ব্যস্ততার দরুন তিহুও ক্লান্ত বেশ। তবে নীলকে দেখে এতক্ষণ যাবত সোফায় ঝিমতে থাকা সে দ্রুত উঠে এলো।
—’কংগ্রাচুলেশন মিস্টার পলিটিশিয়ান।
নীল সামান্য মুচকি হেসে বলল,,—’থ্যাংকস টু ইউ…!
তিহু কপাল কুঁচকে বলল,,—’মানে?
নীল অপর হাতে তাকে নিজের সঙ্গে বেষ্টন করতে করতে বলল,,—’কারণ তুমি না থাকলে আমি কখনো এই রাজনৈতিক লড়াইয়ে নামতাম না।
তিহু কিছু না বুঝেই বলল,,—’কেন?
নীল তিহুর প্রশস্ত ললাটে উষ্ণ চুম্বন রেখে এঁকে দিয়ে বলল,,—’এটা একটা শর্ত ছিল অর্কিড। আজ থেকে আমি তোমাকে আপন করতে পেরেছি। নাও আই সে দ্যাট ইউ আর মাইন!
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪২
—’খুলে বলুন না মিস্টার?
নীল হাসলো খানিক; প্রশান্তি মিশে আছে সে হাসিতে,-—’বলেছিলাম না বাবাকে দেওয়ার শর্তের কথা, আরেকটা শর্ত ছিল যেদিন আমি নিজেকে তার মত করে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো সেদিনই আমি তোমাকে আপন করে পাবো। নাও আই এম সাকসেস।
তিহু বোধ হয় নীল কে এমন খুশি হতে আজ প্রথম দেখলো। একটা মানুষের কাছে এসে কতটা স্পেশাল হলে তাকে পাওয়ার প্রাপ্তিতে কোনো মানুষ এতটা খুশি হতে পারে। এক চিলতে খুশির রোদ্দুর আছড়ে পড়লো তার হৃদয় উঠানে।
