প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪২
নওরিন কবির তিশা
দিনগুলো পাখির ন্যায় ডানা মেলে উড়ে চলেছে। আর সেই উড্ডীন দিনগুলো টেনে আনছে এক অমোঘ উত্তেজনার পূর্বাভাস। নির্বাচন আসন্ন। সময়ের পাতায় আর বাকি ত্রিশ দিন মাত্র।ঢাকা-১৭ আসনের প্রতিটি ধূলিকণা এক অস্থির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। রিটার্নিং অফিসের চূড়ান্ত ঘোষণার পর থেকেই বদলে গেছে শহরের চেনা অবয়ব।
আগত দিনটি উপলক্ষে শহরের ধমনীতে যেন রক্তচাপ বাড়ছে। চায়ের দোকানের ধোঁয়াটে আড্ডায় সর্বত্র নির্বাচনী গুঞ্জন। রাজধানীর প্রতিটি অভিজাত অলিগলি থেকে বস্তির ঝুপড়ি—সর্বত্রই এখন শুভ্র পোস্টারের রাজত্ব। রশিতে ঝোলানো সেই সাদা-কালো পোস্টারগুলোতে বিচ্ছুরিত হচ্ছে এক অপরাজেয় তেজ।
পোস্টার গুলোতে দৃশ্যমান দৃপ্ত ভঙ্গিতে দন্ডায়মান নীলের ছবি, আর নামের পাশে সগৌরবে অঙ্কিত তার বরাদ্দকৃত প্রতীক চিহ্ন।খান মহলের উত্তেজনাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। প্রতিটা সদস্যের মধ্যেই, অজানা শঙ্কা ভর করেছে।
ব্যবসার কাজগুলো ইদানিং ওয়ালিদ খান আর ওয়ালিমুজ্জামান খান সামলাচ্ছে।সেই দায়িত্বের কদাচিৎ রাওফিনের উপরও বর্তেছে। তবে প্রায়শই সে ব্যস্ত থাকে প্রচার-প্রচারণার কাজে। আজও নীলের সঙ্গে সে বেরিয়েছে নির্বাচনী প্রচারণায়।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
বিশাল এক মিছিল, যার শুরুটা দেখা গেলেও শেষটা যেন দিগন্তের ওপারে মিশেছে। শত শত বাইকের গর্জন আর টায়ার ঘষার শব্দে প্রকম্পিত হচ্ছে বনানী-গুলশানের রাজপথ। প্রতিটি বাইকের পেছনে পতপত করে উড়ছে নীলের প্রতীক সম্বলিত ছোট ছোট নিশান।
নীল একটি হুডখোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে। পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর চোখে কালো রোদচশমা। তার শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন ভিড় চিড়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যাচ্ছে।তার গাড়ির চারপাশে মৌমাছির মতো ঘিরে আছে কয়েক হাজার তরুণের বাইক বাহিনী। তাদের কারো মাথায় দলীয় স্লোগান লেখা ফিতা, আবার কেউ দুই আঙুলে বিজয়ের চিহ্ন দেখিয়ে মুহুর্মুহু স্লোগান দিচ্ছে।
রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ হাত নেড়ে নীলকে অভিবাদন জানাচ্ছে। উত্তেজনার পারদ চড়ছে প্রতি সেকেন্ডে। রাওফিন অন্য একটি বাইকে থেকে পুরো মিছিলের শৃঙ্খলা সামলাতে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে সে মেগাফোনে স্লোগান তুলে দিচ্ছে, আর সেই সুরে সুর মিলিয়ে কয়েক হাজার কণ্ঠ প্রায়শই একযোগে গর্জে উঠছে।
হঠাৎই নির্বাচনী স্লোগানের তীব্র গর্জন ছাপিয়ে এক চড়া কণ্ঠস্বরের ঢেউ আছড়ে পড়ল রাজপথে, গলা খাঁকারী দিয়ে রাওফিন গেয়ে উঠলো,,
🎶এএএএএ… ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা ভরা রাস্তাতে….
নেমেছে রাজ পাখি খালি হাতে…..
কানামাছি খেলে যায় কার সাথে মুখ বুঁজে…..🎶
রাওফিনের এমন গান মুহূর্তেই মিছিলের উত্তাপ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। তার কণ্ঠে যেন মিশে আছে রাজপথ কাঁপানো এক তীব্র উন্মাদনা।উপস্থিত হাজার হাজার তরুণ বাইকারের রক্তে যেন আগুন লেগে গেল। তারা বাইকের এক্সিলারেটরে সজোরে চাপ দিল, আর সেই কান ফাটানো শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে সবাই সমস্বরে গেয়ে উঠলো,,
🎶 দুই পৃথিবী…..
কিসের চাহিদায় ঘরছাড়া….
দুই পৃথিবী…..
কোন চাওয়া পাওয়ায় দিশেহারা…..🎶
মিছিলের পরিবেশ মুহূর্তেই প্রবল হয়ে উঠল।বনানী-গুলশানের চওড়া পিচঢালা রাস্তা, দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অগুনতি উৎসুক মানুষের ভিড়। ফ্ল্যাটের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে উঁকি মারছে রমণীরা। এমন অদ্ভুত মিছিলের অভিজ্ঞতা যেন জীবনে প্রথমবার আয়ত্ত করছে তারা।
নির্বাচনের দিনগুলো যতই এগিয়ে আসছে, খান মহলের নিরাপত্তা তত ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কারণ একটাই, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের আক্রমণ। বাসা থেকে প্রয়োজন ব্যতীত সেভাবে বের হচ্ছে না কেউ। বাসার নবকুড়ি গুলোর স্কুল আর ভার্সিটিতে যাওয়ার দায়িত্ব দলীয় কর্মীদের ওপর বর্তেছে।তবে তিহু ভার্সিটিতে যাওয়া একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে।
মহলের অন্য কেউ ভার্সিটিতে না গেলেও, আজ এক প্রকার বাধ্য হয়ে ভার্সিটিতে এসেছে মুন্নি। একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রেসেন্টেশনের কাজে। ক্লাস শেষে, ফেরার উদ্দেশ্যে সবে দোতলার করিডোর পেরিয়ে, প্রথম সিঁড়িটাতে পা দিয়েছে সে। সঙ্গে সঙ্গে অপর পাশ থেকে তীব্র বেগে নেমে যাওয়া কারো সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে,এক প্রকার হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল সে।
হঠাৎই পৌরুষ হস্ত বন্ধনে নিজেকে আবিষ্কার করল মুন্নি। খিঁচে বদ্ধ রাখা চক্ষুদ্বয় মিটিমিটিয়ে খুলল সে। অজ্ঞাত যুবকের উপস্থিতি অনুভূত হতেই বিদ্যুতের বেগে সরে গেল সে। রাগান্বিত কন্ঠে বলল,,
—’কানার মতো হাঁটেন? চোখ কি বন্ধ থাকে? অসভ্য লোক কোথাকার!
একনাগাড়ে সে যখন কথাগুলো বলছিল তখন যুবকটি অধৈর্য হয়ে বলল,,—’এই স্টপ! হোয়াটস রাবিশ? ক্যাসেটের মতো তখন থেকে চলছো তো চলছোই।থামার নাম গন্ধ নেই..!
মুন্নি রেগে-মেগে বলল,,—’আমি বেশি কথা বলি নাকি আপনি অন্ধের মত হাঁটেন? এখন সরেন এখান থেকে অভদ্র লোক!
মুন্নি পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই, যুবকটি তার হাত আঁকড়ে ধরে বলল,,—’কই যাচ্ছো ম্যাডাম? স্যরিটা কে বলবে?
মুন্নি কথাগুলো শুনতে পেল না যেন;শুধু দেখতে পেল তার হাতে অন্য পুরুষের স্পর্শ। মস্তিষ্ক আর কোনো নির্দেশনা নিলনা তার,ক্ষুব্ধ বেগে সে থাপ্পর বসিয়ে দিল যুবকটির চোয়ালে। যুবকটি বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল, একবার আশে-পাশে চোখ বুলিয়ে দেখল কেউ আছে কিনা। আল্লাহর রহমত কেউ নেই। কিন্তু সে রেগে গিয়ে মুন্নির হাত মোচকে বলল,,
—’কোন সাহসে, আমার গায়ে হাত তুললে? তুমি জানো আমি কে?
মুন্নি নিজের হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,,—’হাত ছাড়ো আমার নয়ত এর থেকে খারাপ হবে।
তার প্রত্যুত্তরে যুবকটি কিছু বলতে গেল কিন্তু তার আগেই পেছন থেকে কেউ একজন এসে বলল,,—’আরে ভাই! আপনি এসেছেন?
যুবকটি মুন্নির হাত ছাড়িয়ে পরনের শুভ্র পাঞ্জাবিটা ঠিকঠাক করতে করতে বলল,,—’এইতো।
হাত ছাড়া পেয়েই মুন্নি দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,—’অসভ্য লোক!
অতঃপর প্রস্থান করলো সেখান থেকে। যুবকটি এক ঝলক তাকালো তার প্রস্থান পথের দিকে অতঃপর ছেলেটার সাথে গল্প করতে করতে ভেতরে প্রবেশ করল।
তিহু-নাহা সিদ্ধান্ত নিয়েছে দিনভর গল্প করার। যেহেতু আজ সারাদিন বাড়িতেই থাকবে তাই সবাই মিলে এমন গল্পের সিদ্ধান্ত। বেশিরভাগ আড্ডা তিহুর রুমেই হয় তবে আজ একটা বিশেষ কারণে স্থান বদলে নাহা’র রুমে নেওয়া হয়েছে। গোসল সেরে তিহু সবে রুম থেকে বেরিয়েছে;উদ্দেশ্য নাহা’র রুমে যাওয়া। কাঙ্খিত গন্তব্যের দিকে যাওয়ার সময় ওয়ালিদ খানের আলোচনা কক্ষের সম্মুখে থামল তার পদচারণা। নাহা উপস্থিত সেখানেই।
বাবার সাথে খুনসুটিতে মগ্ন, তিহু সেখানে প্রবেশ করতে গিয়েও থমকালো। স্মৃতির পাতায় দোলা দিল;বাবার সাথে কাটানো সেই ধূসর হয়ে যাওয়া সুন্দর মুহূর্তগুলো।হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠল তার।একটা সময় তার জীবনটাও তো এমন হাসিতে ভরপুর ছিল, আজ সেখানে কেবলই শূন্যতা আর দীর্ঘশ্বাস।সেই উজ্জ্বল মুহূর্তগুলোর স্মৃতি যেন আগুনের হলকার মতো ওর হৃদয়ে বিঁধতে লাগল।
কেন করলো বাবারা এমন? এমন না করলেই সেও তো আজ বাবার সাথে গল্প করতে পারতো। বিষাদের কালো ছায়া গ্রাস করল তার চারিদিক। মনে হচ্ছে চোখের কোনে জমে থাকা জল গুলো এক্ষুনি বাঁধন ভাঙবে। গড়িয়ে পড়বে যখন-তখন।তিহু দ্রুত পিছু মুখ ঘুরে আবার নিজ কক্ষের দিকে চলে যাচ্ছিল। তখনই ভেসে আসলো এক পৌঢ় কণ্ঠস্বর,,
—’নুরাইন মা?
তিহু থামলো। কন্ঠটার মালিক ওয়ালিদ খান,তিহু ঘুরে তাকাতেই তিনি স্নেহময় হেসে, নিজের দিকে ইশারা করলেন তিহুকে,তিহু ভেতরে প্রবেশ করতে তিনি দুই হাত তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
—’এদিকে এসো।
তিহু ঠোঁট উল্টে প্রায় কেঁদেই দিয়েছে। ওয়ালিদ খান দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে বুকে আগলে বলল,,
—’এভাবে কাঁদতে হয় না মা। সব ঠিক হয়ে যাবে।
তিহু এবার সত্যি সত্যি কেঁদে দিল। ওয়ালিদ খান তার মাথায় স্নেহময় হাত বুলিয়ে বললেন,,
—’বাবার সামনে কখনো মেয়েরা এভাবে কাঁদে? বাবার মন খারাপ হয় না?
ওয়ালিদ খানের শরীর থেকে যেন সত্যিই বাবা-বাবা গন্ধ আসছে।তিহু কন্দনরত কন্ঠে বলল,,
—’আব্বু?
ওয়ালিদ খান তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,,—’এই তো মা।
কিছুক্ষন অতিবাহিত হলো এমন ভাবেই। নাহা মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে দেখছিল।
আরহামকে হসপিটাল থেকে আনা হয়েছে। শরীরের অবস্থা শঙ্কা মুক্ত এখন। তবুও সম্পূর্ণ সুস্থ নয় সে;তাই ফ্লোরা তাকে নিয়ে ফেরেনি এখনো। । হয়তোবা কাল ফিরে যাবে তারা।বহুদিন বাদে একটু বেরিয়েছে আরহাম। ফ্লোরাও আর বাধা দেয়নি, একটু মুক্ত হাওয়ার প্রয়োজন আরহামের।
সোফায় বসে বসে এসবই ভাবছিল ফ্লোরা।চেয়েছিল দূর আকাশের হাজারো উজ্জ্বল নক্ষত্রের পানে। চারিদিকে থমথমে নীরবতা।আকাশের ওই অগণিত নক্ষত্ররাজি যেন আজ ফ্লোরার মনের নির্জনতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল।হঠাৎ নীরবতা ভেঙ্গে কর্ণোগোচর হলো কলিংবেলের টুং টাং শব্দ।ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দরজা খুলতেই কর্ণগত হলো গানের কয়েকটি লাইন,,
🎶তবুও প্রেম এসে. …
ভালোবেসে…..
আজ দেখা দিয়ে যায়….
যেই ছুঁতে যাই…
আমি হাত বাড়াই….
কেন দূরে সরে যায়….
প্রেম আমার…হোওওও…প্রেম আমার….🎶
হঠাৎ ফ্লোরার চক্ষু পল্লব স্থির হলো। সামনে আরহাম দাঁড়িয়ে;তার পরনের শার্ট অবিন্যস্ত, চোখের মণি দুটো রক্তজবার মতো লাল হয়ে আছে। ফ্লোরা কে দেখেই অদ্ভুত হাসলো আরহাম,হাতে থাকা জিনিসটাতে আরেক চুমুক দিয়ে, অদ্ভুত হেসে বলল,,
—’কেন করলে আমার সাথে এমন তোতা? কেন কেন কেন? কেন একটু ভালবাসলে না আমায়?
লোনা বাতাস আর কড়া পানীয়র একটা তীব্র গন্ধ মুহূর্তে নাকে এসে ধাক্কা দিল ফ্লোরার।আরহামের টলটলে চাহনি আর এলোমেলো ভঙ্গি বলে দিচ্ছে;সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক কাল্পনিক জগতে বিচরণ করছে। তবে কি সে ফ্লোরাকে তিহু হিসাবে কল্পনা করছে?
ফ্লোরা কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই আরহাম টলতে টলতে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। অবাধ্য শরীরটা আর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। আর্তনাদ হীন এক হাহাকার নিয়ে সে সরাসরি ঢলে পড়ল ফ্লোরার কাঁধের ওপর। তার তপ্ত নিঃশ্বাস ফ্লোরার ঘাড় স্পর্শ করছিল। ফ্লোরা দুই হাতে তাকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু আরহামের অচেতন দেহের ভার সইতে না পেরে সে নিজেও টলে উঠল।
বিস্রস্ত আরহামের মাথাটা ফ্লোরার বুকে নুয়ে আছে; তরী খুঁজে পাওয়া কোনো এক ক্লান্ত নাবিক ন্যায়। নেশার ঘোরে আরহাম অস্ফুটে কী যেন বিড়বিড় করল, তার পরেই সব শান্ত। পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে সে তখন ফ্লোরার আশ্রয়ে এক গভীর নিশ্ছিদ্র ঘুমে আচ্ছন্ন।
সন্ধা গাঢ় হয়ে রাত ঘনীভূত। নীল ইদানিং বাড়িতে আসে অনেক রাত করে। পার্টি অফিসের পুনর্গঠন আর নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ততা বেড়েছে দ্বিগুণ।তাই তার বাড়ি ফেরার রুটিন হয়েছে প্রতিদিন মধ্যরাতে। তিহু সন্ধ্যার আড্ডা শেষে সবে কক্ষে এসেছে সে। নীলের শূন্যতা আজকাল বড্ড ভোগাচ্ছে তাকে।
অভিমান-শূন্যতা-ক্রোধ সব একযোগে জড়ো হয়েছে ছোট্ট মস্তিষ্কে। ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা নীলের ছবিটা সম্মুখে রেখে তাতে অভিমান মেটাতে ব্যস্ত সে ।এমন সময় দরজার পাশে মৃদু শব্দ হলো। তিহু চমকে মুখ তুলে তাকাতেই দৃষ্টিগত হলো নীল দাঁড়িয়ে আছে দরজার চৌকাঠে, যার সারা শরীরজুড়ে রাজ্যের ক্লান্তি।
কুঁচকে যাওয়া পাঞ্জাবি, এলোমেলো চুল, আর চোখের নিচে স্পষ্ট ক্লান্তি রেখা ।সবকিছুই তার দিনের কঠোর পরিশ্রমের সাক্ষ্য দিচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই নীলের ক্লান্ত মুখটি এক ঝলক হাসিতে উদ্ভাসিত হলো, যখন তার চোখ পড়ল তিহুর দিকে। মুহূর্তেই যেন সব ক্লান্তি উধাও হয়ে গেল।
মুচকি হেসে বলল,,—’রেগে আছেন ম্যাডাম?
তিহু মুখ বাঁকিয়ে বলল,,—’না না রাগ করবো কেন? আমার কি রাগ করার কথা ছিল নাকি? আপনিতো দিব্যি মাঝরাতে ফিরতেন তা আজ এতো হঠাৎ দ্রুত মিস্টার?
সে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,,—’সবে তো সন্ধ্যে, আটটা বাজে মাত্র।
তিহুর অভিমানী কন্ঠে মুচকি হাসলো নীল। অতঃপর ঘর্মাক্ত শরীরে তিহু কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে, বলল,,
—’ইচ্ছে করছে তোমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে।
তিহু চোখ সরু করে তাকাতেই নীল হেসে বলল,,—’কিন্তু এভাবে নয় আগে ফ্রেশ হয়ে আসি।
সে হাত ঘড়িটা খুলে ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে, ওয়াশরুমে প্রবেশ করতে করতে বলল,,
—’রেডি হন ম্যাডাম। বেরবো আমরা।
তিহু মুখ কুঁচকে কিছু বলার আগেই নীল মুচকি হেসে বন্ধ করলো ওয়াশরুমের দরজাটা।
প্রায় অর্ধ ঘন্টা শেষে একটা দীর্ঘ শাওয়ার নিয়ে বের হলো নীল। উন্মুক্ত দেহ, কোমরে জড়ানো শুধু একখানা শুভ্র টাওয়াল।কিছুক্ষণ আগে বিদ্যমান চোখের সেই ক্লান্তির রেখাগুলো এখন অনেকটা ম্লান। সদ্য শাওয়াল সেরে আসায় গায়ের রং যেন আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে তার।
প্রশস্ত বুক আর কাঁধ বেয়ে টুপটুপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। সেই জলের ধারাগুলো ওর সিক্স-প্যাক অ্যাবসের খাঁজে খাঁজে হীরের দানার মতো চিকচিক করছে। ওর ভেজা চুলের গোছাগুলো কপালে এলোমেলোভাবে লেপ্টে আছে, যেখান থেকে অবাধ্য জলবিন্দুরা নেমে আসছে ওর খাড়া নাকের ডগা বেয়ে।
তিহু ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে ছিল, আয়নায় নীলের এই রূপ দেখে ওর হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। নীল আয়নার দিকে তাকিয়ে তিহুর চোখে চোখ রাখল। ওর ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা বাঁকা হাসিটা আরো প্রগাঢ় হলো।তিহু শুকনো ঢোক গিলতেই নীল বলল,,
—’দৃষ্টি সরান ম্যাডাম। লজ্জা তো আমারও লাগে নাকি?
তিহু দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল,,—’ঢং! এত লজ্জা যখন করছে তখন ড্রেস পরে আসলেই হতো।টাওয়াল পড়ে আসছেন কেন হ্যাঁ?
—’ড্রেস কোথায় আমার?
—’আলমারিতে।
—’বের করেনি?
—’না!
হঠাৎ নীলের চোখ পরল বিছানায়, যেখানে সযত্নে তার কাপড় গুলো ভাঁজ করে রাখা। তবে এগুলো বাসায় পরার, সে তো বেরোতে চায়। তিহুর উদ্দেশ্যে সে বলল,,
—’এগুলো কেন.? আর তুমি রেডি হওনি?
তিহু চুলে চিরুনি চালনা করতে করতে বলল,,—’রেডি হতে যাবো কোন দুঃখে?
—’ঘুরতে যাওয়ার দুঃখে।
তিহু মুখ বাঁকিয়ে বলল,,—’দেখুন…!
তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই নীল বললো,,
—’রেডি হয়ে নাও নুর। বেরোবো আমরা। আর কোনো কথা শুনতে চাচ্ছি না।
বলেই আলমারি থেকে আয়রন করা একটা কাপড় নিয়ে, সে ঢুকে পড়লো ওয়াশরুমে।
কিছুক্ষণ বাদে রেডি হয়ে বেরোলো নীল। তিহু ততক্ষণে মোটামুটি তৈরি হয়ে নিয়েছে;পরনে হালকা নীলাভ পাকিস্তানি ফ্লোরাল লং কামিজ। সালোয়ারের নিচে সূক্ষ্ম লেসের কাজ আর ওড়নাটি তার কাঁধ বেয়ে লতিয়ে পড়ছে। হিজাবে আবৃত মুখশ্রী।
নীল সবে দীঘল আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টের হাতা ঠিক করছিল,আয়নার প্রতিবিম্বে তিহুর দিকে তাকিয়েই তার অধরে এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। সাজগোজের পরিমাণ যৎসামান্য তিহুর।চোখে কাজল আর ঠোঁটে হালকা রঙের ছোঁয়া। তবেই সেটুই তাকে স্নিগ্ধ এক অপ্সরী করে তুলেছে।
নীল ধীর পায়ে তিহুর পেছনে এসে দাঁড়ালো। তার পরনে গাঢ় নেভি ব্লু রঙা ক্যাজুয়াল শার্ট।তিহুর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,,,
—’লুকিং লাইক মাই পার্সোনাল অর্কিড।
তিহু চোখ সরু করে তাকাতেই নীল মুচকি হেসে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,,
—’দ্রুত আসুন ম্যাডাম, রাত বাড়ছে ক্রমে।
নীল বেরিয়ে গেল, তিহু হিজাবের সর্বশেষ পিনটা লাগিয়ে চলল তার পিছু পিছু।
জনবহুল রাজপথ। বনানী থেকে গুলশানের চওড়া রাস্তাগুলোতে বিদ্যমান শত সহস্র লোকের ঢল। এরই মাঝে ছুটে চলেছে একখানা বাইক।দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টগুলো যেন হলুদ আলোর ঝরনাধারা ঢেলে দিচ্ছে তাদের ওপর। বাইকের গতি যত বাড়ছে, রাতের শীতল হাওয়া তিহুর কানের পাশ দিয়ে এক অদ্ভুত বাঁশির ন্যায় সুর তুলে চলে যাচ্ছে।
বাইক থামল ৩০০ ফিটের মোটামোটি নির্জন একটা জায়গায়।হাতিরঝিলের সেই মোহনীয় সেতুর উপর।রাস্তার দুপাশে খোলা আকাশ আর দূরে টিমটিম করে জ্বলা শহরের আলো।নিচে শান্ত জলরাশির বুকে প্রতিফলিত হচ্ছে শহরের আলোকসজ্জা, যেন জলের গভীরে আরেকটা আকাশ লুকিয়ে আছে।
নীল হেলমেট খুলে চুলগুলো একবার ঝাঁকিয়ে নিল। চাঁদের আলোয় তার ঘর্মাক্ত মুখটা আরও পৌরুষদীপ্ত দেখাচ্ছে।তিহু বাইক থেকে নেমে দাঁড়িয়ে লম্বা একটা শ্বাস নিল। নীল তার দিকে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো। তার শান্ত, গভীর দৃষ্টি তিহুর চোখের ওপর স্থির।
—’রাগটা এখনো কমেনি ম্যাডাম?
তিহু কিছু বলল না, শুধু সেতুর পার্শ্ব রেলিং আঁকড়ে এক ঝলক নিচে তাকালো। নীল কিছুটা এগিয়ে এসে অতি সন্তর্পণে তিহুর হাতের উপর হাত রেখে বলল,,
—’আচ্ছা নিন স্যরি। আর হবে না এরকম, এখন কি রাগটা কমেছে?
তিহু নীলের দিকে কেমন দৃষ্টিতে তাকালো;বলল,,—’কমেছে।
নীলা হেসে বলল,,—’আলহামদুলিল্লাহ!
তিহু অপরদিকে ফিরে হাসলো খানিক। হঠাৎ নীল বললো,,—’ফুচকা খাবেন ম্যাডাম?
তিহু তার দিকে তাকালেই নীল হেসে বলল,,—’ওয়েট;
বলেই সে এগিয়ে গেল কিছুটা দূরে থাকা একটা ফুচকা স্টলের দিকে।তিহু তাকিয়ে দেখলো স্টলের লোকটা কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নীলের দিকে। কি জানি একটা জিজ্ঞাসা করলো। নীল তার জবাব দিয়েই এক প্লেট ফুচকা নিয়ে এগিয়ে আসলো তিহুর দিকে।
সে আসতেই তিহু শুধালো,,—’লোকটা কি শুনছিল?
নীল প্লেট থেকে একটা ফুচকা তুলে তিহুর মুখের অগ্রভাগে ধরতে ধরতে বলল,,—’শুনছিল আমি এখানে কি করছি?
_’তো আপনি কি বললেন?
নীল হেসে বলল,,—’যা সত্যি তাই বললাম। বউয়ের রাগ ভাঙ্গাতে এসেছি।
তিহু চোখ কুঁচকে তাকালেই সশব্দে হেসে উঠল নীল। তবে পরমুহূর্তেই বেজে উঠল পকেটে থাকা ফোনখানা। নীল ফুচকার প্লেট টা তিহুর কাছে দিয়ে কিছুটা দূরে সরে কথায় ব্যস্ত হলো,,
—’হ্যাঁ বল?
ইফাজ সালাম দিয়ে বলল,,—’ভাই আপনি এখন আসছেন তো?
—’না।
ইফাজ চিন্তিত কন্ঠে বলল,,—’সে কি? ইশতিয়াক স্যার সেই কখন থেকে এসে বসে আছে।
—’তো আমি কি করতে পারি?
—’আপনি আসবেন না? আজকে আমাদের পার্টি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং ছিল ভাই।
নীল তিহুর দিকে চেয়ে বলল,,–‘আমি ওর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কাজে আছি।রাখ এখন। আর যেন ডিস্টার্ব করা না হয়।
ইফাজ কি জানি একটা বলতে গেল, পরক্ষণে ভেবেচিন্তে কথা ঘুরিয়ে বলল,,–‘ভাই আপনি কি ভাবির সাথে?
–‘হুম।
–‘কিছু মনে করবেন না ভাই, কিন্তু ভাবিকে কি একটু বোঝানো…!
নীল তাকে থামিয়ে বলল,,—’একদম যেত না।
—’এতটা প্রাধান্য দেন ভাই?
—’ও এর থেকেও বেশি প্রাধান্য ডিজার্ভ করে।
—’কিন্তু ভাই? ভাই কিছু মনে করিয়েন না কিন্তু এতটা প্রাধান্য দেওয়ার প্রয়োজন কি?
—’কারণ ওকে আমার বাঁকা পাঁজরের হাড় থেকে তৈরি করা হয়েছে। যেটা সোজা করতে গেলে ভেঙে যাবে, আর রেখে দিলে বাঁকাই থেকে যাবে। এজন্য তাকে সর্বদা প্রাধান্য দিয়ে কোমল আচরণ করতে হবে।
নীলের এমন কথায় ইফাজ মন্ত্রমুগ্ধ। আর কোন কথা বের হলো না তার কন্ঠ দিয়ে। নীল ফোন কেটে এগিয়ে আসলো তার অর্কিডের দিকে।তিহু এতক্ষণ জলরাশিতে প্রতিফলিত নক্ষত্রের দিকে একদৃষ্টে চেয়েছিল।নীল এসেই বলল,,
—’আজ একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা অর্জন করলে কেমন হয় বলোতো?
তিহু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,,–‘মানে?
নীল উত্তর দিল না, শুধু তিহুর হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় পুরে নিল। তাকে নিয়ে এগিয়ে গেল ঘাটের দিকে, যেখানে জলের ছন্দে দুলছে বেশ কিছু ছোট্ট ডিঙি নৌকা। নৌকার চারপাশ ঘিরে ছোট ছোট টিমটিমে আলো, যা জলের আয়নায় এক মায়াবী প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছে।
নীল সেখান থেকে একটি নৌকায় উঠলো। নৌকাটি ঠিক করে সে তিহুকে হাত বাড়িয়ে দিল। তিহু কিছুটা দ্বিধা নিয়ে নৌকায় পা রাখতেই নীল তাকে সামলে নিয়ে বসল তার ঠিক উল্টো পাশে। মাঝি যখন লগি ঠেলে নৌকাটি চালনা শুরু করলো। ধীরে ধীরে আলোকসজ্জিত ডিঙি নৌকাটি মাঝনদীতে এসে পৌঁছালো।
মাঝনদী থেকে হাতিরঝিলের দুপাশের আলোকসজ্জাগুলো যেন নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে। জোৎস্না স্নাত রাতটা আজ বড্ড মধুময়। চাঁদের রুপোলি কিরণ প্রতিফলিত হচ্ছে বিস্তীর্ণ জলরাশিতে।তিহু আলতো করে জলের ওপর হাত রাখল। শীতল জলের স্পর্শ তার আঙুলের ডগা বেয়ে হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছালো।
নীল মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তিহুর দিকে।একটু ঝু্ঁকে এসে তিহুর খুব কাছে মুখ নিয়ে গেল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস তিহুর ললাট স্পর্শ করছে। সে গভীল কণ্ঠে বলল,,
—’আই উইশ, সময়টা এখানেই স্থির হয়ে যেত। আর আমার অপলক দৃষ্টি তোমার পানে আজীবনের জন্য স্থির হয়ে যেত।
নীলের তপ্ত নিঃশ্বাস আর বলা কথাগুলোয় তিহুর বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করে উঠল। চারপাশের শব্দগুলো যেন ম্লান হয়ে গেল, শুধু রয়ে গেল নৌকার তলায় জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর নীলের ওই গভীর চাহনি। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে, নীল গেয়ে উঠলো,,
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪১
🎶 Yah kya baat hai aaj ki Chandni mein….
(আজকের এই জ্যোৎস্নায় কী এমন জাদু আছে…)
Ki ham kho Gaye pyar ki ragini mein…
(যে আমরা প্রেমের সুরে হারিয়ে গেলাম…)
Yeh bahon mein bahen…
(এই যে বাহুর ডোরে বাহু রাখা….)
Yeh behki nigahen…
(এই যে মাতাল করা দৃষ্টি…)
Lo aane laga Zindagi Ka Maza..
(দেখো, জীবনে বেঁচে থাকার আনন্দ এবার ফিরতে শুরু করেছে…)
Yeh raatein ye mausam…
(এই রাত, এই মনোরম আবহাওয়া,..)
Nadi Ka kinara…
(নদীর ওই কিনারা…)
Yah chanchal hawa….🎶
(আর এই চঞ্চল হাওয়া…)
