Home প্রেমের নীলকাব্য প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৮

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৮

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৮
নওরিন কবির তিশা

শ্রাবণের সেই উন্মাতাল রাতের পর সকালটা এল এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে।আকাশটা একদম পরিষ্কার। রাতের সেই ঝোড়ো হাওয়ার দাপট এখন আর নেই, তবে গাছপালাগুলো এখনো ভিজে আছে—যেন এক দীর্ঘ স্নান সেরে সতেজ হয়ে উঠেছে প্রকৃতি।
পার্টি অফিসের সেই বৃহৎ কক্ষটাতে এখনো বিদ্যমান এক মায়াবী নিস্তব্ধতা।ঘরের বাতাসে তখনো রজনীগন্ধার ম্লান সুবাস মিশে আছে।জানালার কাঁচ চুইয়ে আসা ভোরের এক ফালি মিষ্টি রৌদ্র কিরণ তিহুর চোখের পাতায় এসে পড়ল অকস্মাৎ, চঞ্চল সেই রৌদ্রের দাপটে পিটপিটিয়ে চোখ মেলল তিহু। পরমুহূর্তেই অনুভব করল নীলের বলিষ্ঠ বাহুর ঘেরাটোপে বেশ শক্তপোক্তভাবে বন্দিনী হয়ে আছে সে।

নীল তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তার কপালে এসে পড়া অবাধ্য চুলগুলো যেন রাতের সেই সোহাগের সাক্ষ্য দিচ্ছে। তিহু আলতো করে নীলের বুকের ওপর থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু নীলের অবচেতন মনের সেই ইস্পাতকঠিন বাঁধন তাকে সরতে দিল না। বৃষ্টির জল ধোয়া মাটির সেই সোঁদা গন্ধ জানালা দিয়ে চুঁইয়ে ভেতরে আসছে। দূর হতে ভেসে আসলেও কোকিলের কুহু কুহু সুর।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

তিহু এক ঝলক ঘুমন্ত মানব টার দিকে চাইল। বর্তমান অবস্থায় ঘোর লাগা সুদর্শন লাগছে নীলকে।তিহু চেয়ে দেখল নীলের অবিন্যস্ত কেশরাজ, যেগুলো এলোপাথাড়ি ভাবে পড়ে আছে তার প্রশস্ত ললাটে।তিহু ঘোর লাগা দৃষ্টিতে নিস্পলক চেয়েই রইলো মানবটার পানে। মুহূর্ত কয়েক অতিবাহিত হতেই হঠাৎ তার অনুভূত হলো,নীলের নগ্ন বক্ষে নিজের অবস্থান।আর শরীরে জড়ানো একখানা কালো শার্ট যেটা কাল রাতে নীলের দেহে শোভা পাচ্ছিল।
মুহূর্তেই তার মনে পড়ে গেল গতরাতের সেই ঝোড়ো আবেগ, সেই সর্বনাশা চুম্বন আর নীলের সেই নেশাতুর কণ্ঠের গান; সঙ্গে সঙ্গে ফর্সা মুখশ্রী কৃষ্ণচূড়ার ন্যায় রক্তিমাভার লাভ করল। তীব্র এক লাজুকতা বেষ্টন করলো তাকে।
মুহূর্ত কয়েকের লাজুকতা শেষে সে ফের সন্তর্পণে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার শেষ চেষ্টা করল,তবে তাতে নীলের বাহুর বাঁধন আলগা হওয়ার বদলে আরও খানিকটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল তাকে। নীল চোখ না খুলেই তার মুখটা গুঁজে দিল তিহুর ঘাড়ের কাছে। তপ্ত এক নিশ্বাস লতি স্পর্শ করতেই তার সারা শরীরে এক আশ্চর্য শিহরণ খেলে গেল তিহুর।
নীল আধো-ঘুমন্ত গলায় ফিসফিস করে বলল,,

—’এত তাড়াহুড়ো কিসের ম্যাডাম?
তিহু রক্তিম মুখে মৃদু স্বরে প্রতিবাদ জানাল,—’ছাড়ুন মিস্টার নির্লজ্জ, অনেক বেলা হয়েছে। কেউ যদি চলে আসে। ছিঃ ছিঃ এমন একটা জায়গায়,এসব! ছিঃ!
নীল এবার চোখ মেলল; দুষ্টুমি ভরা কন্ঠে এক ভ্রু নাচিয়ে বলল,,
—’কি সব ম্যাডাম?
তিহু লজ্জায় মুখ কুঁচকে বলল,,—’আপনার মাথা!

তিহুকে লজ্জা দিতে পেরে যেন বিশ্বজয় করেছেন। ঠিক তেমনি হেসে সে বলল,,—’এটা এমপি ওয়াহাজ খান নীলের রাজত্ব ম্যাডাম; যেখানে আপনি ব্যতীত আর কারো অনুমতি ছাড়া প্রবেশের সাহস নেই।
নীলের কথোপকথনের মাঝেই তিহু একরকম জোর করেই উঠে বসার চেষ্টা করল। কিন্তু শরীরটা বিছানা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে গিয়েই সে থমকে গেল। এক তীব্র ও তীক্ষ্ণ ব্যথার ঢেউ তার কটিদেশ থেকে শুরু করে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। গতরাতের সেই উদ্দামতা আর দীর্ঘক্ষণ নীলের বলিষ্ঠ আলিঙ্গনের ছাপ যেন আজ শরীরের প্রতিটি পেশিতে পেশিতে কথা কয়ে উঠছে।
শরীরের এই অবাধ্যতা তিহুকে এক লহমায় বুঝিয়ে দিল যে, গতরাতের সেই উন্মাদ প্লাবন তাকে কতটা ওলটপালট করে দিয়ে গেছে।ব্যথার তোপে তিহুর মুখ দিয়ে এক টুকরো অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এল, সে আবার নুইয়ে পড়ল বিছানায়। নীল তড়িঘড়ি করে উঠে বসে তিহুর কপালে হাত রাখল, তার চোখেমুখে তখন রাজ্যের দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্ন কন্ঠে সে শুধালো,,

—’কী হয়েছে নুর? এনি প্রবলেম?খুব কষ্ট হচ্ছে?
তিহু যন্ত্রণায় চোখ বুজে শুধু মাথা নাড়ল শুধু। লজ্জায় আর ব্যথায় সে তখন নীলকে বলতে পারল না যে, এই ব্যথাটুকু আসলে গতরাতের সেই মধুর সর্বনাশেরই এক অবশেষ।তিহু চুপটি করে ঘাপটি মেরে থাকলেও তাতে উদ্বিগ্নতা না কমে বরং তার মাত্রা কয়েক গুন বেড়ে গেল নীলের। অস্থির কন্ঠে শুধালো,,
—’পেইনের পরিমাণ কি খুব বেশি অর্কিড?
তিহু না বোধক মাথা নাড়ালো শুধু। নীলকে শান্ত করার এক ব্যর্থ প্রয়াস;সে যে ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে, সেটা তার শরীরী ভাষায় স্পষ্ট। নীল নির্বোধ নয়, সে স্পষ্ট বুঝলো কারণ।একরাশ অপরাধবোধ আর ভালোবাসা মিশ্রিত দৃষ্টিতে ও তিহুর ললাটে ঠোঁট ছোঁয়াল। অতঃপর মৃদু স্বরে বলল,

—’একটু অপেক্ষা করো অর্কিড, আমি আসছি।
তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়ল সে, মেঝেতে পড়ে থাকা নিজের অবিন্যস্ত পোশাকগুলো তুলে নিয়ে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল।আলমারি থেকে একটা ফাস্ট এইড বক্স বের করল।পার্টি অফিসের এই ব্যক্তিগত কক্ষে প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ ও সব সময়ই রাখে। সেখান থেকে একটা পেইনকিলার আর গ্লাস ভর্তি পানি নিয়ে ও তিহুর পাশে বসল।
তিহুকে আলতো করে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ধরে;নীল ওষুধের ট্যাবলেটটা ওর মুখে তুলে দিল। তিহু মুখ নিচু করে ওষুধটা খেয়ে নিল, লজ্জায় ওর পলক জোড়া তখনো অবনত। ওষুধ খাওয়ানো শেষে নীল ওকে আর একা ছাড়ল না। তিহুর সারা শরীরে যে ক্লান্তি আর আড়ষ্টতা,তাতে ওর এক পা হাঁটার ক্ষমতাও নেই সেটা সম্পর্কে নীল খুব ভালোভাবেই অবগত।
সে তীব্র প্রেমমিশ্রিত স্পর্শে তিহুর শরীরে নিজের শার্টটা ভালোভাবে জড়িয়ে দিল। অতঃপর এক ঝটকায় তিহুকে পাঁজকোলা করে নিজের কোলে তুলে নিল। মৃদু হেসে বলল,,

—’শরীরের যে অবস্থা; তাতে মনে হচ্ছে আগামী এক সপ্তাহ আপনাকে আর কোল থেকে নামানো যাচ্ছে না ম্যাডাম।
তিহু লজ্জায় নীলের বুকের ওপর রাখা শার্টের আস্তিনটা খামচে ধরল। মুখ না তুলেই আধো স্বরে বলল,,
—’সব দোষ আপনার নির্লজ্জ পুরুষ। এখন আমি এই অবস্থায় বাড়ি যাব কীভাবে?
নীল কিছুটা শব্দ করে হেসে তাকে নিয়ে সম্মুখ পানে অগ্রসর হতে হতে বলল,,
—’এভাবেই যাবেন; আফটার অল হাজবেন্ডের লাভ বাইট এখন আপনার সমগ্র শরীরে ম্যাডাম।
তিহু চিৎকার করে বলল,,—’অসভ্য লোক!
নীল এবার হেসে উঠল বেশ জোরেই। অতঃপর এগিয়ে গেল ওয়াশরুমের দিকে।
ওয়াশরুমের কাঁচের দরজা ঠেলে নীল তিহুকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল,ভোরের সেই স্নিগ্ধ আলো শ্বেতপাথরের দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে এক মায়াবী দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। নীল অতি সাবধানে তিহুকে নিয়ে আশ্রয় নিলো শাওয়ারটার নিচে; অন করল সেটি।

ঝিরঝিরে বৃষ্টিকণার মতো জলধারা ওদের ওপর আছড়ে পড়ছে।তিহু এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠল। গরম জলের স্পর্শে শরীরের আড়ষ্টতা যেন কিছুটা শিথিল হতে শুরু করেছে।ভোরের নরম আলো আর জলকণার সংমিশ্রণে এক মায়াবী ইন্দ্রজাল তৈরি হলো চারিপাশে। নীল তখনও তিহুকে কোল থেকে নামায়নি। ঝরনার জল নীলের সুগঠিত পেশিবহুল পিঠ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, আর তিহু সেই জলের ঝাপটায় বারংবার চোখ বুজছে।
নীল ঘোরাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে অপলক।আর তার এমন দৃষ্টি অনুভূত হতেই তিহু ব্যথাতুর শরীরটা মৃদু নাড়াতেই নীল বলল,,

—’উসসস…ডোন্ট মুভ!
তিহু কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই নীল ওষ্টাধরে বিদ্যমান বাঁকা হাসির রেখা প্রসারিত করে বলল,,
—’কিভাবে নড়াচড়া করলে যে গতরাতের মতই তোমাকে হরণ করার তীব্র নির্লজ্জ আকাঙ্ক্ষাটা ‌পুনরায় জন্মাবে মিসেস ওয়াহাজ খান।
নীলের কথাগুলো কর্ণগোচর হবামাত্র তিহুর কান ঝাঝাঁ করে উঠল।নীলের ওষ্ঠাধরের সেই বাঁকা হাসি যেন তপ্ত কোনো অগ্নিশিখা, যা নিমেষেই তিহুর সারা শরীরে দাবানল ছড়িয়ে দিচ্ছে। লজ্জায় চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে ও দ্রুত মুখ লুকালো নীলের জল সিক্ত উম্মুক্ত বক্ষদেশে। বিড়বিড় করে বলল,,

—’অসভ্য লোক!
নীল তিহুর এমন কান্ডে বাঁকা হাসলো শুধু।পরপর বলল,,
—’আমাকে অসভ্য করার মূল কারিগরটা কে শুনি?
তিহু ভেজা স্বরেই উত্তর দিল, — ‘আপনি খুব বেশি কথা বলেন মিস্টার অসভ্য। ছাড়ুন আমায়, এবার আমি নিজেই পারব।
নীল তাকে ছাড়ল না, বরং আরও নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিল। ভেজা শার্টটা তিহুর শরীরে লেপ্টে আছে, যার ফাঁক দিয়ে ফুটে উঠছে তার শরীরের লাবণ্য। নীলের দৃষ্টিতে তখন এক আদিম নেশা। সে তর্জনী দিয়ে তিহুর চিবুকটা তুলে ধরল। তিহুর টলটলে চোখের পাতায় তখনও কয়েক ফোঁটা জল মুক্তোর মতো জমে আছে।

নীল ধীরলয়ে ঝুঁকে এল তিহুর ওষ্ঠের দিকে। তিহু চোখ বুঁজে সেই অনিবার্য মুহূর্তের অপেক্ষা করতে লাগল। ধীরে ধীরে নীল গ্রাস করল তিহুর ওষ্টাধর।উষ্ণ জলের ধারার নিচে আবারও যেন সময় থমকে দাঁড়াল। নীলের অধরের স্পর্শে তিহুর শরীরের সেই ব্যথা মুহূর্তেই এক অদ্ভুত শিহরণে রূপান্তরিত হলো। নীলের হাত দুটো তখন তিহুর পিঠ বেয়ে নিচে নেমে এল, এক হাতে ওকে শক্ত করে ধরে অন্য হাতে ওর ভিজে চুলগুলো সরিয়ে দিল সে।
মৃদু মৃদু থেকে এবার তীব্র বেগে কাঁপতে শুরু করল তিহুর নরম কায়া। কিছুক্ষণের মাঝেই নীল নিজেকে সামলে;তিহুর থেকে নিজেকে ছাড়ালো। ছাড় পাওয়া মাত্র জোরে ধরে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করলো তিহু।নীল মৃদু হেসে বলল,,

—’নিজেকে প্রস্তুত করুন ম্যাডাম।এতটা উইক হলে এই বেপোরোয়া এমপিটাকে সামলাবেন কি করে?
তিহু ঈষৎ রাগ দেখিয়ে বলল,,
—’আপনি!
তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই নীল বললো,,—’তুমি!
নীলের এমন কথায় তিহু ভ্রু কুঞ্চনপূর্বক বলল,,—’মানে?
—’একবার তুমি বলো!
—’কি বলছেন?
—’বলছি, একবার আমাকে তুমি বলো।

নীলের কণ্ঠে যেন আ”ফি”মের মাদকতা; ঘোর লেগে যাচ্ছে তিহুর। তবুও নিজেকে সামলে সে বলল,,—’পারবোনা!
নীল মৃদু বাঁকা হেসে বললো,,—’কাল রাতের পরেও এত লজ্জা-সংকোচ ম্যাডাম?
ফের গতরাতের কথা স্মৃতির পাতায় দোলা দিতেই তিহুর সারা শরীরে যেন এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে গেল। সে আর চোখ তুলে তাকাতে পারল না। নীলের ভিজে বুকের উষ্ণতা ওর গালে এসে লাগছে। অনেক কষ্টে মনের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে সে আধো-ফোটা স্বরে উচ্চারণ করল,, —’ত-তু-মি… তুমি !

—’উহু, এভাবে নয়।বলো নীল ‌ তুমি !
অদ্ভুত মোহাচ্ছন্নতা গ্রাস করেছে তিহুকে;সাত-পাঁচ না ভেবেই সে ঝটপট বলল,,
—’নীল ….তুমি!
নীলের সারা মুখ এক লহমায় তৃপ্তির আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। সে আবার তিহুকে নিজের বুকের সাথে আরও নিবিড়ভাবে পিষে ধরল। ঝরনার জলধারা তখন ওদের দুজনের ওপর এক অভিন্ন আবরণ তৈরি করেছে। হঠাৎ নীল বলল,,
—’মাই হার্ট?
তিহু কিছুটা চমকে তাকালো নিজের এমন কণ্ঠে। ব্যগ্রকন্ঠে বললো,,

—’হুম?
—’সার্বক্ষণিক আমার হৃদয় কি বলে জানো?
তিহু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,,—’ কি বলে?
নিল মৃদু হেঁসে গেয়ে উঠলো,,
🎶 My heart says you are mine only mine…
( আমার হৃদয় বলে তুমি শুধু আমার, শুধুই আমার…)
Never ever leave me behind….
(কখনো আমাকে ছেড়ে যেও না….)
I wanna be with you every time……🎶
(আমি প্রতিক্ষণ তোমার সাথে থাকতে চাই…)

নীলের ওষ্ঠাধর থেকে নিঃসৃত প্রতিটি শব্দ যেন এক একটা সম্মোহন। তিহু এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রিয় মানবের কণ্ঠের এই অতল হাহাকার আর অধিকারবোধ ওকে এক লহমায় তছনছ করে দিল।ওর শরীরের কাঁপুনি যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেল যেন। ও নীলের ভেজা বক্ষদেশ থেকে মাথা তুলে ধীরলয়ে তাকালো নীলের চোখের গভীরে। সেই চোখে তখন শাসনের দাপট নেই, আছে এক সমুদ্র সমর্পণ। তিহু নিজের অজান্তেই নীলের ঘাড় বেষ্টন করে থাকা হাত দুটোর বাঁধন আরও শক্ত করে নিল। ওর ভেজা নখগুলো নীলের পিঠের পেশিতে মৃদু চাপ সৃষ্টি করল—যা একাধারে লজ্জা আর এই ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরার এক তীব্র প্রচেষ্টা।

শাওয়ারের সেই উষ্ণ জলের ধারা আর নীলের যত্নে তিহুর শরীরের ক্লান্তি কিছুটা লাঘব হলেও, ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত আড়ষ্টতা তখনও রয়ে গেছে। নীল নিজেই অতি যত্নে টাওয়াল দিয়ে তিহুর ভিজে শরীর আর চুল মুছে দিল।
নীলের আনা নতুন এক জোড়া পোশাক রাখা ছিল; পক্ষটাতে অনেক আগে থেকেই। তিহুর জন্য একটি গাঢ় নীল রঙের সুতি জামদানি কামিজ, যার জমিন জুড়ে রুপোলি সুতোর সূক্ষ্ম কাজ। নীল নিজেও পরে নিয়েছে একটি সাদা ধবধবে আড়ংয়ের পাঞ্জাবি, হাত দুটো কনুই অবধি গোটানো।

প্রস্তুত হয়ে তিহু যখন আয়নার সামনে দাঁড়াল, নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সে নিজেই চমকে উঠল। ভেজা চুলের অবাধ্য গোছাগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে, আর চোখের নিচে গতরাতের সেই বিনিদ্র রজনীর সলজ্জ আভা। নীল তার ঠিক পেছন দাড়িয়েই হাতঘড়িটা পড়ে নিচ্ছে; দুজনের এই প্রতিবিম্ব আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টি করছে এক অপরূপ দৃশ্যের।
নীল ঘড়িটা পড়তে পড়তেই এক ঝলক অতসীতে চেয়ে তিহুর উদ্দেশ্যে বলল,,
—’একটু দ্রুত করুন ম্যাডাম।
তিহু ভ্রু কুঁচকে বলল,,—’হচ্ছি!

পার্টি অফিসের জীবনের শ্রেষ্ঠ মিষ্টি স্মৃতি বিদ্যমান কক্ষটার মায়া কাটিয়ে নীল-তিহু নিচে নামল, বাইরের প্রকৃতিটা এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতায় মোড়া। গতরাতের সেই উদ্দাম কালবৈশাখী যেন পৃথিবীর সমস্ত মলিনতা ধুয়ে দিয়ে গেছে। অফিস প্রাঙ্গণের কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে ঝরা ফুলের এক রক্তিম গালিচা বিছানো। ভেজা ঘাসের ডগায় গতরাতের বৃষ্টির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলবিন্দুরা তখনো অবাধ্য রোদে মুক্ত দানার ন্যায় চিকচিক করছে।

বর্তমান পার্টি অফিসের বিশাল পোর্টিকোতে অপেক্ষমান তিহু। চঞ্চল হাওয়ারা তিহুর অবাধ্য অলকগুচ্ছ নিয়ে এক দুষ্টু খেলায় মেতে উঠেছে। কিছুক্ষণের মাঝেই নীল গাড়ি নিয়ে উপস্থিত হলো; ভেতরে প্রবেশ করার পূর্বে তিহু একবার ঘাড় ঘুরিয়ে সেই কক্ষটির দিকে তাকাল—যেখানে গতরাতের প্রতিটি প্রহর এক অমোঘ কাব্য হয়ে আছে।
নীল অতি সাবধানে গাড়ির দরজা খুলে দিলে তিহু গিয়ে বসল সামনের সিটে। গাড়ির ভেতরে দামী পারফিউম আর রজনীগন্ধার এক মিশ্র সুবাস আগে থেকেই মিশে ছিল। নীল ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই এক মৃদু গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল কেবিনের ভেতর। ধীরে ধীরে গাড়িটা‌ মসৃণ গতিতে পার্টি অফিসের লোহার গেট পেরিয়ে পিচঢালা কালো পথে এগিয়ে চলল।

গাড়ির কাঁচ তোলা থাকলেও বাইরের সেই ভেঁজা মাটির সোঁদা গন্ধটা যেন স্মৃতির হাত ধরে বারবার ভেতরে চুঁইয়ে আসছিল। নীল এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতটা বাড়িয়ে দিল তিহুর দিকে। তিহু কোনো দ্বিধা ছাড়াই নিজের ছোট হাতখানা নীলের বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় সঁপে দিল। নীলের উষ্ণ স্পর্শে তিহুর শরীরের সেই মৃদু ব্যথা আর আড়ষ্টতাগুলো যেন এক নিমেষেই শান্ত হয়ে এল।নীলের কাঁধে মাথা রেখে;আনমনে কি ভেবে হঠাৎ তিহু বলল,,
—’মিস্টার পলিটিশিয়ান?
নীল ড্রাইভিং এ তৎপর থেকেই বলল—’হুম?

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৭ (২)

—’জানেন?আপনার প্রেমে পড়াটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম অধ্যায়।
নীল অবাক দৃষ্টিতে নিজের কাঁধের দিকে তাকালো যেখানে চুপটি করে ঘাপটি মেরে পড়ে আছে তার অর্কিড। ঘটনার আকস্মিকতায় হাত থেমে গিয়েছে তার।রোদের সোনালি আভা গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ঠিকরে পড়ছে গাড়ির বনেটের ওপর। তপ্ত রোদ্দুরের তীক্ষ্ণ আলোয় নীলের দৃষ্টিগত হলো প্রিয়তমার আরক্তিম মুখশ্রী।

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৯