Home প্রেমের নীলকাব্য প্রেমের নীলকাব্য শেষ পর্ব

প্রেমের নীলকাব্য শেষ পর্ব

প্রেমের নীলকাব্য শেষ পর্ব
নওরিন কবির তিশা

প্রবাহমান সময় স্রোতের ন্যায় বানভাসি।কোনো এক অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে সোচ্ছ্বাসে-সৌল্লাসে বয়ে চলেছে সে।কালস্রোতের আবর্তে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ঝরে গেছে আট-আটটি মাস। স্মৃতির ঘাটে একে একে আটটি বসন্ত এসে ভিড়েছে, আবার নিঃশব্দে বিদায়ও নিয়েছে। এই দীর্ঘ প্রহরগুলি যেন বিরহের এক দীর্ঘস্থায়ী আলপনা এঁকে দিয়ে গেছে তপ্ত হৃদয়ে।
সময়ের চাকা মন্থর গতিতে ঘুরে ঘুরে কখন যে আটটি ঋতুর পালাবদল ঘটিয়ে দিল, তার হিসেব মেলানো আজ বড় দায়। প্রতিটি দিন যেন এক একটি দীর্ঘশ্বাসের মালা গেঁথে অপেক্ষার মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখেছে কোনো এক অনির্দিষ্ট শুভক্ষণের আশায়।

খান মহল আজ সেজেছে নববধূর সাজে। চারিদিকে আলোকসজ্জার রোশনাই, আত্মীয় স্বজনের উপস্থিতিতে মুখরিত অঙ্গন।আর বেলি আর রজনীগন্ধার তীব্র সুবাসে ম ম করছে বাতাস। আজ নাহা আর আইয়াজের শুভ পরিণয় লগ্ন। যে সম্পর্কের পরিণতি একটা সময় অবধি কল্পনাতীত ছিল,আজ তা পূর্ণতা পেতে চলেছে। আর এই অসাধ্য সাধনের মূলে রয়েছে খান মহলের আদুরে লড়াকু পুত্রবধূ নুরাইন হক তিহু।
একাই সব কিছু সামলিয়েছে সে। বড়দের ম্যানেজ করা থেকে শুরু করে আইয়াজের পরিবারের সঙ্গে একান্ত দেখা করা তাদেরকে সম্বন্ধ আনায় উৎসাহী করা সবটাই ছিল তিহুর সুনিপুণ পরিকল্পনা। আর তার সেই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই আজ বিয়ের আসরে নাহা লাল বেনারসিতে সিক্ত হয়ে বসেছে।

তবে এই উৎসবের মাঝেও সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু তিহু এবং তাকে ছায়ার মতো আগলে রাখা মিস্টার পলিটিশিয়ান। তিহুর গর্ভধারণের আজ আট মাস পূর্ণ হতে চলল। এই দীর্ঘ সময় নীল যেন নিজের অস্তিত্বই বদলে ফেলেছে। রাজনীতির মাঠ কাঁপানো সেই দাপুটে নেতা আজ এক অতন্দ্র প্রহরী।
তিহু যেখানেই যাচ্ছে, নীল তার পেছনে পেছনে ছায়ার মতো ঘুরছে। বিজনেস মিটিং, পলিটিক্যাল র‍্যালি—সবই আজ গৌণ। নীলের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান এখন তিহুর পায়ের আরামদায়ক জুতো থেকে শুরু করে তার অসময়ে খাবারের বায়না মেটানো।বিয়ের অনুষ্ঠানের এক কোণে তিহু একটু হাঁপিয়ে সোফায় বসতেই নীল দ্রুত গতিতে গ্লাসে ফলের রস নিয়ে হাজির হলো।

—‘নূর, তোমাকে না বলেছি এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে? পুরো বাড়ি মাথায় তুলে একাই সব তদারকি করছো, নিজের শরীরের দিকে খেয়াল আছে?
তিহু কিছুটা মুখ বাঁকিয়ে বলল,,—“আরে বাবা, আমি তো ঠিক আছি…!
তাকে এ কথার মধ্যিখানেই থামিয়ে নীল বলল,,—‘আমি তোমার বাবা?
—-‘আরে ভাই আমি বোঝাতে চাচ্ছি…!
ফের তাকে থামিয়ে নীল বললো,,—‘আমি তোমার ভাই?
তিহু এবার হেসেই ফেলল, নীলের হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে বলল,
—‘আচ্ছা নিন, কিন্তু আপনার এই বাড়াবাড়ি দেখে তো মানুষ আমাকে নয়, আপনাকেই পাগল ভাববে নেতা সাহেব!
নীল ভ্রু কুঁচকে তিহুর পাশে বসল। খুব সাবধানে তিহুর ফোলা পা দুটোর ওপর নিজের হাত রাখল। দৃষ্টিতে এক সমুদ্র সমান তৃপ্তি নিয়ে নিচু স্বরে বলল,,

—‘ভাবুক পাগল। যে মানুষটা আমাকে বাবা হওয়ার শ্রেষ্ঠ অনুভূতি আস্বাদন করিয়েছে তার জন্য আমি সারাজীবন পাগল হয়ে থাকতে রাজি। এই যে আমাদের ছোট্ট রাজকন্যা আসছে, তার আসার পথটা কি আমি মসৃণ করব না?
তিহু লজ্জায় রাঙা হয়ে নীলের কাঁধে মাথা রাখল,,
—-‘কিন্তু মিস্টার একটু আগেই আম্মু আমাকে জোর করে এক গ্লাস গরম দুধ খাইয়েছে, আর কাকিয়া ছোট ফুপি মিলে সকাল থেকে ফল খাইয়ে পেট ভরিয়ে রেখেছে আমার। এখন আমি এগুলো কিভাবে খাব বলুন?
—-‘আচ্ছা খেতে হবে না তুমি রেস্ট নাও।
তিহু হেসে বলল,,—‘হু!

ঠিক তৎক্ষণাৎ সেখানে উপস্থিত হলো মাহা। হাতের বাটিতে কি যেন একটা। নীলকে দেখে এসে চলে যেতে উদ্ধত হতেই তিহু তৎক্ষণাৎ কিছুটা সরে এসে বলল,,—-‘বস!
নীল হয়তো বুঝল কিছু, মাহার অস্বস্তি কাটাতে সে তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে উঠে বিয়ের দিকটার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। নীল উঠেছে সেই মাহা বসলো তিহুর পাশে।তিহু মুচকি হেসে তাকালো মাহার দিকে। মাহা হাতে থাকা বাটিটা তিহুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,,
—-‘নিন ম্যাডাম!
‘কি এতে?’—-বলতে বলতে তিহু দেখল এক বাটি চালতার আচার। সে অবাক লোচণে মাহার দিকে তাকিয়ে বলল,,—‘তুই বানিয়েছিস?
মাহা সামান্য হেসে তোর মাথা দোলালো।তিহু চেয়েই রইলো একরাশ মুগ্ধতায়।মাহার হাতে থাকা বাটি থেকে চালতার আচারের সেই টক-ঝাল-মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে আসতেই তিহুর ভেতরটা এক অদ্ভুত তৃপ্তিতে ভরে উঠল।সাধারণত এই গর্ভকালীন সময়ে মেয়েরা বাপের বাড়ি থাকতে পছন্দ করে, কিন্তু তিহু যায়নি। যাবেই বা কেন? নীলের সেই অতন্দ্র প্রহরীর মতো আগলে রাখা,
শ্বশুরবাড়ির প্রতিটি সদস্যের অকৃত্রিম স্নেহ আর সর্বোপরি তার প্রাণের সখী মাহার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা;সবকিছুই তো সে এখানেই পেয়েছে। মাহা নিজের সাজানো সংসার, পড়াশোনা—সবকিছু একপাশে সরিয়ে রেখে দীর্ঘ আটটি মাস ছায়ার মতো তিহুর পাশে পাশে থেকেছে। সখীর প্রয়োজনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এমন নজির আজকাল বড্ড বিরল।

তিহু মাহার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো করে চাপ দিল। মাহার কাঁধে মাথা রেখে ড্রয়িংরুমের সেই উৎসবমুখর পরিবেশটার দিকে তাকাল সে। নীল দূরে পরিচিত কারো একজনের সঙ্গে সাথে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে কথা বলছে,তবে তার নজরটা এখনো বারবার ফিরে আসছে তিহুর দিকেই।
তিহু এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবল, সে কতটা ভাগ্যবতী! যার জীবনে নীলের মতো একজন দায়িত্বশীল ও পাগলাটে জীবনসঙ্গী আছে, মাহার মতো একনিষ্ঠ বান্ধবী আছে, আর তাকে ঘিরে থাকা এক বিশাল মমতাময়ী পরিবার আছে—সে তো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী। এক তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল তিহুর ঠোঁটের কোনে।

—-‘এই মেয়ে তোকে বলেছি না, এত সাজুগুজু করে আসবি না।এখানে আরো অনেক ছেলেরা আছে!
রাফার চঞ্চল পা জোড়া থেমে গেল নিহিতের শাসন ভরা সেই কন্ঠে। কিছুটা চোখ কুঁচকে তাকালো সে, পরক্ষণেই করুন স্বরে বলল,,,
—-‘দেখো কতদিন পর আসছি মামার বাসায় তারপরও তোমার এই ব্যবহার! তুমি এমন কেন?
তবে তার এমন কণ্ঠে একদমই গললো না নিহিত, বরং পূর্বের ন্যায় ঈষৎ রাগান্বিত কন্ঠে বলল,,—‘কারণ তুই একটু বেশি উড়িস। এজন্যই ডানা ছাটার ব্যবস্থা করতে হয় আমার।
—‘দেখো নিহিত ভাই!

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই তাকে নিজের দিকে টান দিল নিহিত; রাফা বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,,—‘কি করছো?
নিহিত রাফার আপাদমস্তক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে বলল,,—‘হুম দেখলাম।
নিহিতের এমন দৃষ্টিতে আড়ষ্ট হয়ে আসলো রাফা। কাচুমাচু ভঙ্গিমায় ঢোক গিলে বললো,,—‘ক-ক কি করছেন?
ভয়ের কারণে সম্বোধন-ই গুলিয়ে ফেলেছে রাফা. ভেবেই বাঁকা হাসলো নিহিত। পরক্ষণেই তাকে আর একটু কাছে টেনে বলল,,—‘এত যখন ভয় পাস? তাহলে ত্যাড়ামি করিস কেন?
—‘আ-আ-আমি ভয় পাই না।
রাফার আনাড়ি দৃষ্টিতে ম্যাচিউরিটি আনার প্রবণতা দেখে আনমনে হাসলো নিহিত, টেনে টেনে সে জিজ্ঞাসিলো,—‘তাআআআআই?
রাফা নিহিতেতের এমন কণ্ঠে অপ্রস্তুত হয়ে উঠল কিছুটা পরক্ষণেই নিজেকে সামলে জবাব দিল ছোট্ট করে —-‘হু!

‘কবুল, কবুল, আলহামদুলিল্লাহ কবুল!’—-মুহূর্তেই পুরো অঙ্গনটা মুখরিত হলো নাহা আইয়াজের একত্রে বলা কবুল ধ্বনিতে। আলহামদুলিল্লাহ বলে মোনাজাতে উদ্ধোলিত হলো উপস্থিত প্রত্যেকটা হাত।শেহেতাজও দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই।তবে হুটহাট মুন্নিকে দেখেই তৎক্ষণাৎ আশেপাশে একবার তাকিয়েই সকলের অগোচরে মুন্নির পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করল সে।
মুন্নি ভিতরে উপস্থিত সকলের জন্য মিষ্টি নিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ পিছনে কারো উপস্থিতি অনুভূত হতেই থামল সে। কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে পিছনে তাকিয়ে বলল,,

—‘তুমি?
—‘কোথায় যাচ্ছ?
—‘এইতো মিষ্টি দিতে!
—-‘গিভ মি অন!
সরল মুন্নি মৃদু হেসে বাটি থেকে একটা রসগোল্লা আঙুলে তুলে শেহেতাজের মুখের সামনে ধরল। কিন্তু শেহেতাজ মুখ খুলল না, বরং আলতো করে মাথা নেড়ে নাকচ করে দিল। মুন্নি কিছুটা বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বোকা কন্ঠে বলল,,
—-‘মিষ্টি তো চাইলে, এখন আবার মাথা নাড়ছো কেন? খাবে না?
—-‘আমি কি বলেছি এই মিষ্টির কথা?’
—-‘তো?

শেহেতাজ বাঁকা হাসল। তার দৃষ্টি এবার নিবদ্ধ হলো মুন্নির রঞ্জক আবৃত ওষ্টাধরে;আঙুল দিয়ে আলতো করে সেদিকে ইশারা করতেই মুন্নি এবার বুঝতে পারল শেহেতাজের কথার মর্মার্থ। মুহূর্তেই লজ্জায় ওর কান-মুখ লাল হয়ে উঠল। আশেপাশে তাকিয়ে কেউ নেই দেখেও সে তটস্থ হয়ে উঠল। দ্রুত শেহেতাজকে সরিয়ে দিতে চাইল সে, কিন্তু তার আগেই শেহেতাজ মুন্নির হাত ধরে নিজের খুব কাছাকাছি টেনে নিল।
নিচু স্বরে শেহেতাজ বলল, —‘আরে ম্যাডাম, অন্তত একটা তো দিয়ে যাও! এত কৃপণ কেন তুমি?
মুন্নি এবার চট করে আড়ালে চলে গেল শেহেতাজের টানে। সেখানে দাঁড়িয়ে একটু থমথমে মুখে বলল,হ
—‘ছাড়ো না, কেউ চলে আসবে। আর এই অসময়ে এসব কী পাগলামি?
শেহেতাজ ওর কাঁধে হাত রেখে খুব নরম স্বরে বলল,,
—‘পাগলামি নয় মিসেস চৌধুরী,অধিকার। তোমার বিয়ে করা বর আমি, একটা তো দিতেই পারো।
মুন্নি এবার স্থির হয়ে দাঁড়াল। শেহেতাজের চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একটা প্রশ্ন করে বসল যা অনেকদিন ধরে ওর মনে জমে ছিল,

—-‘এত কেন ভালোবাসো আমায় শেহেতাজ? যখন তুমি জানোই যে তোমার আগে আমি অন্য একজনকে মন দিয়েছিলাম?
মুন্নির কথা শেষ হওয়ার আগেই শেহেতাজ ওর ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরল। মুন্নির চোখ দুটো আবেশে আর বিস্ময়ে বুজে এল। শেহেতাজ ওর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে খুব শান্ত স্বরে বলল,,
—‘লিসেন মিসেস চৌধুরী ওটা ক্ষনিকের মোহ বা ভালো লাগা ছিল ভালোবাসা কক্ষনো নয়। প্রকৃত ভালোবাসার সূচনা হয় কবুল নামক পবিত্র শব্দ টা উচ্চারণের মাধ্যমে! আল্লাহর প্রদত্ত বন্ধনে নিজেদের আবদ্ধ করে যে অনুভূতিটা হয় ওটাই ভালোবাসা!
মুন্নি একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে শেহেতাজের চোখের গভীরতায় হারিয়ে গেল। তার মনে হলো, পৃথিবীতে এই পুরুষটির মতো করে হয়তো আর কেউ তাকে বুঝবে না। সে উপলব্ধি করলেও ভুল মানুষের পিছে না ছুটে প্রকৃত মানুষটাকে খুঁজে নেওয়ার নামই জীবন।এক অদ্ভুত তৃপ্তিতে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।

বিবাহ উৎসবে আনন্দ উচ্ছ্বাস তখন তুঙ্গে। কাজী সাহেব বিয়ে পড়িয়েছেন কিছুক্ষণ পূর্বেই। বর্তমান বিদায় লগ্ন; খানমহলের এক রাজকন্যা আজ বিদায় নিচ্ছে বাবার সাম্রাজ্য থেকে।বিদায়ের সুর সর্বদাই বড্ড ভারী, তা সে যতই কাঙ্ক্ষিত মিলন হোক না কেন। নাহার বিদায়লগ্নে খান মহলের আনন্দ-উচ্ছ্বাস যেন এক নিমেষেই বিষাদের চাদরে ঢাকা পড়ল। সদর দরজায় গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। লাল বেনারসিতে মোড়ানো নাহা যখন ফুঁপিয়ে কেঁদে বাবার বুক থেকে সরে এসে তিহুকে জড়িয়ে ধরল, তখন উপস্থিত সবার চোখেই নোনা জল।
নাহা ধরা গলায় বলল, —‘বউমনি, তুমি না থাকলে আজ এই দিনটা দেখা হতো না। আমাকে আগলে রেখো তোমার দোয়ায়।

তিহু নিজের চোখের কোণ মুছে নাহার মাথায় হাত রাখল। মৃদু হেসে ফিসফিস করে বলল, —‘কাঁদে না পাগল মেয়ে, তুমি তো হারাওনি, বরং পূর্ণতা পেয়েছো। আইয়াজ ভাইয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে রেখো সারাজীবন।
অতঃপর ওয়ালিদ খান নিজের আদুরে মেয়েটাকে তুলে দিল আইয়াজের হাতে। ধরা কণ্ঠে বললো,,—‘মেয়েটা আমার বড্ড আদুরে ছিল আইয়াজ। ওকে আগলে রেখো বাবা।
আইয়াজ বিনম্র মাথা নাড়িয়ে বলল,,—‘ইনশাআল্লাহ আজীবন আগলে রাখবো বাবা।
একে একে সবার থেকে বিদায় নিয়ে। আইয়াজদের গাড়িগুলো ফটক ছাড়িয়ে গেল। এক অজানা বিয়োগ ব্যথায় ভারাক্রান্ত হল উপস্থিত সকলের হৃদয় খান। এতক্ষন যাবত সকল আনন্দ উচ্ছ্বাস এক লহমায় ঢেকে গেল বিষাদের করুন ছায়ায়।

—–‘রিশাদ ভাই?
বরাবর রিশাদই ডেকে এসেছে নীরাকে কিন্তু আজ হুট করে নীরার সম্বোধনী কণ্ঠে কিছুটা হকচকিত হয়ে পিছনে ঘুরল রিশাদ।
—‘কিছু বলবে?
—-‘হুম!
—–‘বলো!
—-‘ আসসালামু আলাইকুম!
সাধারণত মানুষ প্রথমে সালাম দেয় কিন্তু নীরার এমন বিলম্বে কিঞ্চিৎ হেসে দিল রিশাদ। নীরা বরাবরই বড্ড চাপা স্বভাবের লাজুক মেয়ে। রিশাদের হঠাৎ এমন হাসির কারণ না জানলেও লাজুক ভঙ্গিমায় মাথা নত করল সে। সঙ্গে সঙ্গে রিশাদ নিজেকে নিজেকে সামলিয়ে বলল,,

—-‘হুম, ওয়ালাইকুম আসসালাম!
নীরাকে নিশ্চুপ দেখে; রিশাদ শুধালো,,,—-‘তা চুপ করে থাকার জন্য ডাকলে নাকি ম্যাডাম?
নীরা তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়িয়ে বলল,,—‘এই না না।
—‘তাহলে বলো।
—-‘ধন্যবাদ!
হঠাৎ এমন ধন্যবাদে ভ্রু কুঁচকে আসলো রিশাদের, প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে সে বলল,,—‘হঠাৎ ধন্যবাদ বলা?
—-‘এটা হঠাৎ নয়, ওই দিনের সাহায্যের জন্য!

‘ওই দিন?’—-মুহূর্তের মাঝে রিশাদের স্মৃতির পাতায় দোলা দিল কিছুদিন আগে এসেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটা যার থেকে সে নীরাকে বাঁচিয়েছিল। মনে পড়তেই রিশাদ তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়িয়ে বলল,,—‘আরে না না অলওয়েজ ওয়েলকাম!
নীরা মৃদু হাসল। সেই হাসিতে একরাশ কৃতজ্ঞতা আর হয়তো না জানা কোন এক অনুভূতি। রিশাদ কিছুক্ষণ নীরার সেই স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আলতো করে মাথা নাড়ল। তারপর ধীর পায়ে কিছুটা সামনে এগিয়ে গেলো।
নীরার মনে হলো, এখনই কি সব বলা হয়ে গেল? না কি আরও কিছু বাকি ছিল? রিশাদ যখন অতিক্রম করেছে বেশ কিছুটা দূরত্ব ঠিক তখনই নীরা আবার ডেকে উঠল,,

—-‘রিশাদ ভাই?
রিশাদ থমকে দাঁড়িয়ে পিছনে ঘুরল। মৃদু হেসে ভ্রু কুঁচকে শুধালো, —‘কিছু বলবে?
নীরা এবার কোনো কথা না বলে শুধু ডানে-বামে মাথা নাড়াল। অর্থাৎ, সে কিছুই বলবে না। কিন্তু তার চোখে-মুখে এক অব্যক্ত কথার ঝিলিক রিশাদের নজর এড়াল না। রিশাদ সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,,
—‘সত্যি তো? নাকি মনের গহীনে কিছু অব্যক্ত রেখে দিচ্ছ? পরে আবার বলবে না তো যে বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আপনি সুযোগ দেননি?
নীরা এবার আনমনে হেসে উঠল কিঞ্চিৎ।রিশাদ এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুঝতে পারল এই লাজুক মেয়েটার থেকে এর বেশি কিছু আজ আদায় করা সম্ভব নয়। সে গাড়িতে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই দূর থেকে ফারিসার গলা শোনা গেল,,
—‘কিরে নীরা, তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস? আয় তো ভেতরে, দাদিমা তোকে খুঁজছেন!
ফারিসার আগমনে রিশাদ আর নীরার সেই মুহূর্তটায় ছেদ পড়লো। নীরা চট করে ফারিসার দিকে এগিয়ে গেল, তবে যাওয়ার আগে আরও একবার আড়চোখে রিশাদের দিকে তাকাল।

—-‘আর ইউ লাইক মি নিহিত ভাই?
—-‘নো, আই লাভ ইউ!
নিহিতের এমন অকপটে বলা স্বীকারোক্তিতে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল রাফা। তার নিশ্বাস যেন কিছুক্ষণের জন্য আটকে গেল। সে জানত নিহিত তাকে আগলে রাখে, শাসন করে—কিন্তু সেই শাসনের আড়ালে যে এতটা তীব্র অনুরাগ লুকিয়ে আছে, সেটা রাফার ভাবনারও অতীত ছিল।রাফা বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
—‘তুমি-তুমি সিরিয়াস? তুমি সত্যিই আমায় ভালোবাসো?
নিহিত এবার রাফার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। তার কণ্ঠে এবার শাসনের বদলে ঝরে পড়ল একরাশ অধিকারবোধ,,

—‘সিরিয়াস না হলে কি সারাক্ষণ এই চঞ্চল মেয়েটার পেছনে ডানা ছাঁটার জন্য সময় নষ্ট করতাম? তুই বুঝিস না রাফা? তোর এই উড়ুউড়ু ভাবটা শুধু আমিই সামলাতে পারি। আর এই অধিকারটা আমি অন্য কাউকে দিতে পারব না।
রাফা লজ্জায় মাথা নিচু করল। নিহিতের বুকের ধুকপুকানিটা সে নিজের হাতের তালুতে অনুভব করতে পারছে। সে মৃদু স্বরে বলল, —‘আমি ভেবেছিলাম তুমি শুধু আমাকে বকতেই জানো।
নিহিত হেসে ফেলল। রাফার কপালে একটা হালকা টোকা দিয়ে বলল, —‘বকুনিটাও ভালোবাসারই একটা অংশ পাগলী। এবার চল, ভেতরে সবাই খুঁজছে। আর শোন আজকের পর থেকে আর কোনো “লাইক” এর প্রশ্ন যেন না শুনি, কারণ উত্তরটা চিরকাল একই থাকবে।
রাফা একগাল হেসে নিহিতের পাঞ্জাবির হাতাটা আলতো করে ধরল। খান মহলের আলোকসজ্জার নিচে আজ তাদের নতুন এক গল্পের সূচনা হলো।

খান মহলের চারপাশটা এখন স্তিমিত। আলোর রোশনাই নিভে এসেছে। বিয়ের কলরব শেষে রাতটা যেন আজ একটু বেশিই নিঝুম। মাহা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। পিছন থেকে রাওফিন এসে জড়িয়ে ধরল তাকে। ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়ে বলল,,
—-‘রাত গভীর হচ্ছে মিসেস রাওফিন, ঘুমাবেন না?
রাওফিনের উপস্থিতি বড্ড পরিচিত মাহার। তাই সে সামান্য বিচলিত না হয়ে বরং পূর্বের ন্যায় থেকেই বলল,,
—-‘ঘুম আসছে না!
—-‘তোমাকে বুকে না পেলে আমারও তো ঘুম আসেনা ম্যাডাম!
রাওফিনের এমন সরাসরি আহ্লাদে মাহা মৃদু হেসে ওর হাতের বাঁধনটা আর একটু শক্ত করে ধরল। রাতের নিস্তব্ধতায় রাওফিনের কণ্ঠস্বর যেন মাহার হৃদয়ে এক অদ্ভুত সুরের সৃষ্টি করছিল। মাহা মুখ ফিরিয়ে রাওফিনের চোখের দিকে তাকাতেই দেখল, সেখানে এক আকাশ সমান মুগ্ধতা।রাওফিন মাহার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,,

—‘কী ভাবছো অত? আকাশ কি আমার চেয়েও বেশি সুন্দর যে সেদিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে?
মাহা আলতো করে রাওফিনের নাক টেনে দিয়ে বলল,,
—‘আকাশ সুন্দর, কিন্তু তোমার মতো পাগল নয়। সারাদিন এত ব্যস্ত থাকো, তারপরও রাত হলে এই আদিখ্যেতা কোত্থেকে আসে?
রাওফিন এবার মাহার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, —‘ব্যস্ততা তো বাইরের জগতের জন্য, মিসেস রাওফিন। এই বুকের ভেতরটার পুরোটা জুড়েই তো তোমার রাজত্ব। সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে মুছে যায় যখন তোমার এই পরিচিত সুবাসটুকু নাকে আসে। সত্যি বলছি মাহা, তোমাকে না পেলে হয়তো আমার জীবনটা শুধুই একঘেয়ে ফাইলের স্তূপে হারিয়ে যেত।

মাহার চোখে আনন্দ অশ্রু চিকচিক করে উঠল। সে রাওফিনের বুকে মাথা রেখে দুহাত দিয়ে ওকে জাপ্টে ধরল। বাইরের চাঁদের আলো বারান্দার গ্রিল গলে তাদের দুজনকে এক মায়াবী চাদরে মুড়িয়ে দিল।রাওফিন মাহার চুলের মাঝে চুমু খেয়ে ফেথ বলল,,
—‘চলো এবার ভেতরে যাই। কাল সকালে আবার নতুন সব দায়িত্ব। তবে তার আগে, আজকের এই শান্ত রাতটা আমাদের একান্ত ভালোবাসার নামেই না হয় তোলা থাক।
মাহা মুচকি হাসলো। অতঃপর রাওফফিনের সঙ্গে প্রবেশ করলো কক্ষে।

পুরো ঘরটা বেলি ফুলের শুভ্রতায় ছেয়ে আছে। সাদা বিছানার ঠিক মাঝখানে লাল বেনারসিতে মোড়ানো নববধূর সাজে বসে আছে নাহা। মাথায় ঘোমটা দেওয়া থাকলেও তার নিচের চঞ্চল চোখ দুটো আজ বড্ড অশান্ত। দীর্ঘ অপেক্ষা, কতশত মান-অভিমান আর জমানো দীর্ঘশ্বাস—সব যেন আজ এই একটা ঘরের চার দেয়ালের মাঝে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।
হঠাৎ দরজার কড়া নাড়ার শব্দে নাহার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ধীর পায়ে কক্ষে প্রবেশ করল আইয়াজ। দরজাটা সন্তর্পণে বন্ধ করে সে নাহার সামনে এসে দাঁড়াল। এক গভীর প্রশান্তির নিশ্বাস ফেলে খুব নিচু স্বরে বলল,

—‘আসসালামু আলাইকুম।
নাহা মৃদুস্বরে উত্তর দিল, —‘ওয়ালাইকুম আসসালাম।
আইয়াজ বিছানার এক কোণে বসল। নাহার ঘোমটাটা আলতো করে সরিয়ে দিতেই কক্ষের উজ্জ্বল আলোয় ফুটে উঠল এক অপরূপ লাজুক মুখ। আইয়াজ কিছুক্ষণ অপলক চেয়ে থেকে নাহার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চুমু খেলো। আইয়াজের হঠাৎ এমন স্পর্শে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ন্যায় কেঁপে উঠলো নাহা। আইয়াজ বড্ড তৃপ্তিতে হঠাৎ বলল,,
—‘বিশ্বাস করো নাহা, আজকের এই দিনটা আমার কাছে একটা মিরাকলের মতো মনে হচ্ছে। যে মানুষটাকে মনে মনে চেয়েছি কিন্তু ছোঁয়ার সাহস পাইনি, সে আজ আমার পাশে আমার অর্ধাঙ্গিনী হয়ে বসে আছে।
নাহা এবার আইয়াজের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো আড়াল নেই। নাহা ধরা গলায় বলল,

—‘জানেন আইয়াজ ভাই, আপনি তো আজ পূর্ণতা পাওয়ার কথা বলছেন, কিন্তু আমি আপনাকে কতদিন আগে থেকে ভালোবাসি তার হিসেব কি আপনি জানেন? সেই যেবার আপনি প্রথম ভাইয়ার অফিসে জয়েন করলেন, তারপর থেকে প্রতিটা দিন আমি শুধু আপনার একটা নজর পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতাম।
আইয়াজ অবাক হয়ে নাহার দিকে তাকাল। নাহার কন্ঠ যেন আজ বাঁধ মানছে না। সে বলতে থাকল,,
—‘কতবার ভেবেছি আপনাকে বলব, কিন্তু ভয় হতো আপনি যদি আমায় ভুল বোঝেন! আপনি তো সবসময় এত গম্ভীর হয়ে থাকতেন যে কথা বলার সাহসই হতো না আমার।
আইয়াজ এবার হেসেই ফেলল। নাহার হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে আলতো করে ছোঁয়াল। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,,

—‘তুমি ভেবেছো ভালোবাসাটা শুধু একপাক্ষিক ছিল? মোটেও না নাহা। আমি যেদিন প্রথম এই বাড়িতে পা রেখেছিলাম, সেদিন থেকেই তুমি আমার মনের কোণে জায়গা করে নিয়েছিলে। কিন্তু আমি ছিলাম তোমার ভাইয়ের একজন সামান্য এমপ্লয়ি। নিজের যোগ্যতা আর তোমার পরিবারের দাপটের কথা ভেবে বারবার নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। মনে হতো, তোমাকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখা মানে আকাশের চাঁদ ছোঁয়ার মতো দুঃসাহস দেখানো।
নাহা হেসে ফেলল, তার চোখের কোণে এক ফোঁটা আনন্দ অশ্রু চিকচিক করছে। সে বলল,,
—‘তাহলে সেই দুঃসাহসটা আগে কেন দেখাননি?
আইয়াজ নাহার চোখের জলটুকু মুছে দিয়ে বলল,,
—‘কারণ তখন সময়টা আমাদের ছিল না নাহা। আজ যখন আমরা পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ, তখন মনে হচ্ছে—সেই অপেক্ষাটুকু বোধহয় এই মুহূর্তটার সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্যই ছিল। এখন থেকে আর কোনো আড়াল নেই, কোনো ভয় নেই। তুমি শুধু আমার।
নাহা আইয়াজের কাঁধে মাথা রেখে পরম শান্তিতে চোখ বুজল। বাইরের রাতের নিস্তব্ধতা সাক্ষী হয়ে রইল অপেক্ষার শেষে প্রাপ্তিটা সবসময়ই বড্ড মধুর হয়।

সিটি হাসপাতালের করিডোর খান মহলের প্রত্যেকের অস্থির প্রদচরণায় মুখর।সময় যেন আজ থমকে দাঁড়িয়েছে সেথায়। সকলের চিন্তিত মুখাবয়বে অদ্ভুত চাঞ্চল্য আর উৎকণ্ঠার স্রোত বয়ে যাচ্ছে। খবর দেওয়া হয়েছে হক ম্যানশন এর সকলকে হয়তো দুপুরের মাঝেই এসে উপস্থিত হবেন তারা। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আরও একটি মাস অতিক্রান্ত। আজ সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা, থেকে থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি নামছে।আবহাওয়াটা নিঃসন্দেহে মুগ্ধকর;কিন্তু আজ প্রকৃতির এই স্নিগ্ধতা উপভোগ করার মতো মানসিক অবস্থা কারোর নেই।
ভোরবেলাতেই হুট তিহুর প্রসব বেদনা শুরু হয়েছে। তবে ব্যথাটা স্বাভাবিকের মতোইই চিনচিনে হওয়ায় প্রথমে সে হাসপাতালে যাওয়া নাকোচ করেছিল কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যথাটা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করেছিলো।তাই তৎক্ষণা থাক তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে বর্তমান ওটিতে নেওয়া হয়েছে তাকে। আর সকল নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তার সঙ্গে গিয়েছে নীল নিজেই।

করিডোরের একদম শেষ প্রান্তে,আলো-আঁধারির মাঝে সেখানে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে মাহা।দুহাত নিজের অজান্তেই মুষ্টিবদ্ধ, নখগুলো তালুতে বসে যাচ্ছে উদ্বেগে। হঠাৎ এক জোড়া তপ্ত হাতের স্পর্শে তার তন্দ্রা ভাঙল। রাওফিন তার পাশে এসে বসেছে। রাওফিনের শান্ত চোখের চাহনি মাহার অস্থির বুকের ভেতরটায় যেন এক পশলা হিমেল হাওয়া ছড়িয়ে দিল।
রাওফিন খুব নিচু স্বরে, মাহার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,,
—‘রিলাক্স লাভলাইন; কিচ্ছু হবে না সিস্টারের নীল আছে না।
রাওফিনের সান্ত্বনা বাণীতে হু হু করে মাহার বুকের ভেতরটা।তা চোখ উপচে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল রাওফিনের হাতের ওপর। কোনো কথা না বলে সে মুখ লুকালো রাওফিনের বক্ষদেশে।রাওফিনও হাতের বাঁধনটা আরও শক্ত করে মোলায়েম স্পর্শে জাপটে ধরল ওকে।

বাইরের করিডোরের কোলাহল ওটির ভারী দরজার ওপাশে এসে থমকে গেছে। এখানে চারদিকের সাদা দেয়াল আর উজ্জ্বল নিওন আলোয় এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, যা কেবল যান্ত্রিক বিপ বিপ শব্দে মাঝেমধ্যে স্পন্দিত হচ্ছে। বাতাসের গায়ে কড়া অ্যান্টিসেপটিকের গন্ধ। কিন্তু এই যান্ত্রিক শীতলতার মাঝেও এক তপ্ত আবেগ বইছে দুই হৃদয়ের মাঝে।
তিহু শুয়ে আছে অপারেশন থিয়েটারের সাদা বিছানায়। তার মুখটা ঘামে ভিজে একাকার, চুলের গোছা কপালে লেপ্টে আছে। যন্ত্রণার প্রতিটি ঢেউ যখন তার শরীরটাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে,সে কেবল নীলের হাতটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরছে। তার ফর্সা আঙুলগুলো নীলের হাতের চাপে নীলচে হয়ে এসেছে, কিন্তু নীল আজ বিচলিত নয়; সে এক পরম অটল পাহাড়ের মতো বসে আছে প্রিয়তমার মাথার পাশে।

পরনের পাঞ্জাবিটা কুঁচকে একাকার, চোখে-মুখে বিনিদ্র রজনীর ক্লান্তি আর একরাশ দুশ্চিন্তা।তার সেই দাপুটে সত্তাটা আজ যেন এক পরম মমতাময়ী সেবকের রূপে বিলীন হয়ে গেছে। সে আজ প্রভাবশালী নেতা নয়, আজ সে কেবল একজন দায়িত্ববান স্বামী, একজন হবু বাবা।
তিহু ঘামছে।প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছে। চোখের কোণ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে। প্রসববেদনায় তার শরীরটা ভেঙে আসছে।যন্ত্রণার প্রতিটি ঢেউ যখন তাকে আছড়ে ফেলছে, সে নীলকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরছে। অস্ফুট স্বরে বলল,,

—‘নেতা সাহেব… আমি বোধহয় আর পারছি না! শরীরটা অবশ হয়ে আসছে…!
নীল ওর কপালে মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,,
—‘নূর, জান আমার, আর একটুখানি। আমাদের ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ উপহারটা পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায়। আমি আছি তো তোমার কাছে, আমার দিকে তাকাও। তোমার কিচ্ছু হবে না।
নীলের সেই ভরাট কণ্ঠস্বর আজ ভীষণ কোমল। ডাক্তারেরা নিজেদের কাজ করে যাচ্ছেন ক্ষিপ্র হাতে। হঠাৎ তিহুর একটা আর্তনাদ যেন ওটির দেয়াল ভেদ করে চলে গেল। নীল চোখ বুজল এক মুহূর্তের জন্য, তার ঠোঁট দুটো নড়ছে অনবরত দোয়ায়। সে তিহুর কানে কানে কেবল ভরসা দিয়ে যাচ্ছে,,
—‘নূর, লাস্ট একবার জান…। আই অ্যাম উইথ ইউ।

ঠিক তখনই সেই জাদুকরী মুহূর্তটা এল। ওটির সেই গম্ভীর নিস্তব্ধতা চিরে দিয়ে বেজে উঠল এক একরত্তি প্রাণের কান্না। এক তীক্ষ্ণ কিন্তু মিষ্টি চিৎকার, যা মুহূর্তেই ওটির সমস্ত বিষণ্ণতা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল।
নীল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার দুঁদে রাজনীতিকের চোখে আজ শ্রাবণের ধারা। তিহু তখন ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছে, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে এক‌ তৃপ্তির হাসি। তবে একবার নয় পরপর দুইবার শোনা গেল ছোট্ট প্রাণ যুগলের কান্নার মিষ্টি সুর। তিহু-নীল কিছুটা অবাক হতেই ভেসে আসলো এক নারী কণ্ঠস্বর,,

—‘কংগ্রাচুলেশনস মিস্টার এন্ড মিসেস খান টুইন বাচ্চার প্যারেন্টস হয়েছেন আপনারা।
ডাক্তারের সেই কণ্ঠস্বর যেন ওটির চারদিকের যান্ত্রিক শীতলতাকে এক নিমেষে বসন্তের হাওয়ায় বদলে দিল। নীল আর তিহু দুজনেই মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। একে অপরের চোখের দিকে তাকাল তারা; সেই দৃষ্টিতে হাজারো না বলা কথা, বিস্ময় আর এক আকাশ সমান তৃপ্তি।
নীলের দুঁদে রাজনীতিকের হাত দুটো, যা কিছুক্ষণ আগেও উদ্বেগে কাঁপছিল, তা এখন পরম আবেশে তিহুর কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিল। তার কণ্ঠস্বর আজ আর বজ্রগম্ভীর নয়, বরং এক অদ্ভুত আবেগে রুদ্ধ। সে নিচু হয়ে তিহুর ঘর্মাক্ত কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল।
নার্স পরম মমতায় সাদা কাপড়ে মোড়ানো দুটি ফুটফুটে মাংসপিণ্ডকে নীলের সামনে ধরলেন। নীল কাঁপা কাঁপা হাতে জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জনকে স্পর্শ করল। একটি ছেলে আর একটি মেয়ে;ঠিক যেন নীল আর তিহুরই ছোট ছোট দুটি সংস্করণ।

এদিকে দরজার ভেতর থেকে নবজাতকের কান্নার সুরে ভেসে এলো। সবাই একসঙ্গে দরজার দিকে দৃষ্টি তাকাল। নবজাতযুগলের কান্না জানান দিয়ে যাচ্ছে, তারা এসে গেছে। মায়ের গর্ভ ছেড়ে পৃথিবীর আলো দেখেছে। মুরব্বিরা হাত দুটো মোনাজাত ভঙ্গীতে করলেন। দু’ফোঁটা অশ্রু ছেড়ে শোকর গোজার করলেন।
মাহা-রাওফিন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। এসেছে নাহা আইয়াজও। তারা এগিয়ে গেল ওটির দিকে। রাওফিন সকালের অগোচরে ফিসফিসিয়ে মাহার কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলল,,
—-‘এবার তাহলে আমাদের লিটিল ভার্সন কেও আনার ব্যবস্থা করি ম্যাডাম!
মুহূর্তে ভেল-বদলে রাওফিনের নির্লজ্জ কথায় মাহা কটমটিয়ে তাকালো।রাওফিন সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঠোঁটে নিজের হাত চেপে বোকা এসে এগিয়ে গেল সামনের দিকে,,
—–‘আরে দেখি আমার ভাগ্নে-ভাগ্নি কই!

নীল আলতো করে ঝুঁকে এসে দুই সন্তানকে তিহুর খুব কাছে ধরল। তিহু তখন ক্লান্তিতে চোখ বুজে ছিল, কিন্তু নীলের গায়ের সেই চেনা পারফিউমের ঘ্রাণ আর বাচ্চাদের মিহি কান্নার শব্দে সে পলক মেলল। ঝাপসা দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই সে দেখল নীল তাদের বাচ্চা দুইটাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার অতি নিকটে,নীলের চোখে আনন্দাশ্রু আর ঠোঁটে এক দিগ্বিজয়ী জয়ের হাসি।তিহুর ফ্যাকাশে ঠোঁটে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে কাঁপাকাঁপা আঙুলে ওদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হাতগুলো স্পর্শ করার চেষ্টা করল।
নীল পরম মমতায় তিহুর কপালে দীর্ঘক্ষণ ঠোঁট ছুঁইয়ে রাখল। অতঃপর তার সেই ভরাট কিন্তু আবেগতাড়িত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,,

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৬২

—-‘অতঃপর আমাদের নুহাশ-নৌমির আগমন।
তিহুর চোখের কোনে জল টলোমলো, সামান্য মাথা ঝাঁকিয়ে সে বলল,,—‘হুম!
—-‘ধন্যবাদ নুহাশ-নৌমির মাম্মা,এতা ভালোবেসে আমার রুক্ষ জীবনে সজীবতা আনার জন্য; আমার #প্রেমের_নীলকাব্য-এর পূর্ণতা প্রদানের জন্য।ভালোবাসি নুহাশ-নৌমির মাম্মা খুব খুব খুব।
তিহু অবশ হয়ে আসা ঠোঁট দুটো কোনক্রমে নাড়িয়ে বলল,,—‘আমিও ভালবাসি নুহাশ-নৌমির পাপা, ভীষণ ভালোবাসি আপনাকে।

সমাপ্ত