প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫০
সাইদা মুন
—অধিকার দিতে হয়নি। আমার অধিকার আমি নিজেই করে নিয়েছি।
কথাটা কানে পৌঁছাতেই যেন তাহসানের বুকের ভেতর দাবানল জ্বলে উঠল। তালহার ঠান্ডা অথচ দৃঢ় উচ্চারণ তার সহ্যের সীমা ছুঁয়ে ফেলেছে। দাঁত শক্ত করে চেপে, রাগে হাত মুঠো করে সে গর্জে উঠল,
—ফালতু কথা বকছিস কেন?
তালহা একটুও বিচলিত হলো না। নির্বিকার ভঙ্গিতে পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হালকা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে মেহরীনের দিকে ইশারা করে শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,
—ফালতু নয়, একদম সত্যি বলছি। মেহরীনকেই জিজ্ঞেস কর। তাহলেই সব বুঝে যাবি।
মেহরীন আচমকা চমকে মাথা তুলে তাকাল। কী জিজ্ঞেস করবে তাকে? সে কী উত্তর দেবে? বুকের ভেতর ভয়, দ্বিধা একসঙ্গে যুদ্ধ করছে। তালহা কিসের কথা বলতে বলছে? মাথার ভেতর হাজারো ভাবনা একসাথে ভিড় করতে লাগল। তাহসান এক পা এগিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে কঠোর স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
—মেহরীন, তালহা কি ফালতু কথা বলছে না?
মেহরীন চোখ নামিয়ে নিল। আঙুলগুলো অজান্তেই কাঁপছে।
আরও চাপ দিয়ে বলল তাহসান,
—বলো, তালহা কি বলছে?
মেহরীন আরও গুটিয়ে গেল। এত মানুষের সামনে গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। পাশ থেকে তাহিয়া শক্ত করে তার হাত চেপে ধরল, একটু ভরসা জোগাতে। তার নীরবতাকে নিজের জয়ের হাসি ভেবে তাহসান ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল। তালহার দিকে বিদ্রুপ ছুড়ে দিয়ে বলল,
—দেখেছিস? কিছুই বলছে না। কারণ এসব তুই বানিয়ে বলছিস। নিজের লিমিটে থাক। তুই ওর জন্য কিছুই না। ইউ আর নাথিং ফর হার।
বলতে বলতেই তালহার বুকের এক পাশে আঙুল দিয়ে খোঁচা দিল। মুহূর্তেই তালহা ঝটকা দিয়ে সেই হাত চেপে ধরে ফেলল। হাত মোচড়ে ধরতেই সকলে থতমত খেয়ে উঠল। তবে তাহসান হাসছে, যেন কিছুই হয়নি। শান্ত, ভদ্র ছেলেটার হঠাৎ এমন উন্মত্ত রূপ দেখে সবাই হতভম্ব হয়ে গেল। তাহসানের কান্ডকারখানা পাগলামিই লাগছে তাদের কাছে। দুই ভাইয়ের মাঝে মারামারি লেগে যাবে ভেবে চারদিক থেকে সবাই ছুটে এল।
কিন্তু তাহসান কেবল ঠান্ডা হাসল। হাত টেনে ছাড়িয়ে নিয়ে কৃত্রিম সহানুভূতির সুরে বলল,
—কুল ব্রো। আমি বুঝতে পারছি তোর ফিলিংস। চিন্তা করিস না, তুইও ভালো কাউকে পাবি।
তারপর সে ঘাড় ঘুরিয়ে কাজির দিকে তাকিয়ে বলল,
—কি কাজি সাহেব, বসে আছেন কেন? বিয়ে শুরু করুন।
তিতলি বেগম তড়িঘড়ি এগিয়ে এসে তড়িঘড়ি বললেন,
—কি হচ্ছে তাহসান? পাগল হয়েছিস? কিসের বিয়ে?
তাহসান নরম সুরে তার হাত ধরে বলল,
—ফুফু, মেহরীনের তো কেউ নেই। একটা পরিবার দরকার তার। আমি তার দায়িত্ব নিতে চাই। তুমি কি চাও না মেয়েটা একটু শান্তিতে, সুখে থাকুক?
তিতলি বেগম কিছুটা ভড়কালেন। মুহূর্তের জন্য দ্বিধায় পড়লেন। সাথে সাথে ছেলের দিকে তাকালেন। তালহা রক্তলাল চোখে তাকিয়ে আছে এদিকেই, তাহসানের পানে। শরীর টানটান, যেন যেকোনো সময় ঝাঁপিয়ে পড়বে। মায়ের বুকের গভীরে অজানা শঙ্কা জমল। ছেলের ব্যবহার তার ভালো ঠেকছে না। মায়ের মন কেমন যেন অন্য কথা বলছে। মনের কোনে একটু খটকা লাগছে।
তাহসানকে বুঝ দিতে বললেন,
—এখন এমনি বড়সড় ঝামেলা চলছে। আগে সেটা মিটুক। তাছাড়া মেয়েটার মত না নিয়েই তুই এত আগ বাড়াচ্ছিস কেন? বয়সও তো হয়নি ওর।
তাহসান এক মুহূর্তও না ভেবে বলল,
—বয়স বড় কথা না ফুফু। এখন বিয়ে পড়িয়ে রাখি, পরে বয়স হলে অনুষ্ঠান হবে।
এই কথায় তালহার ধৈর্যের বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে গেল। চোখের পলকে এসে তাহসানের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। মুখোমুখি দাড়িয়ে বলল,
—বেশি কথা বলিস না। আমি ওর গার্জিয়ান। তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আমার চলবে, তোর না!
তিতলি বেগম ছেলেকে টেনে ধরলেন,
—আব্বু শান্ত হ!
তালহা গর্জে উঠল,
—আম্মু, ওকে থামাও। না হলে আজ মুখ ভেঙে দেব।
তাহসান চেঁচিয়ে উঠল,
—মেহরীনের নাম নিলেই তোর এত জ্বালা কেন? আমি ওকেই বিয়ে করব, ওকে নিয়েই সংসার করব, তারপর আমাদের ছোট্ট..
আর বাক্য শেষ করতে পারল না। তালহা এক ঝটকায় নিজেকে ছাডিয়ে, সজোরে ঘুষি বসাল তাহসানের মুখে। রক্ত ছিটকে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে মেঝেতে। ঘরজুড়ে ভরে উঠল চিৎকারে, আতঙ্কে, বিশৃঙ্খলায়।
গলা ফাটিয়ে চিল্লাচ্ছে তালহা,
—আর একবার মেহরীনের নাম নিলে জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলব।
তার চোখ লাল, গলার শিরা ফুলে উঠেছে, শরীর কাঁপছে ভয়ংকর রাগে। এই রূপ দেখে সবাই শিউরে উঠেছে। তালহার এই রূপ কেউই আগে কখনো দেখেনি। কোনোমতে কয়েকজন মিলে দুজনকে আলাদা করল। তবে তাহসান থামার লোক নয়। এগিয়ে এসে পাল্টা ঘুষি বসিয়েই দিল তালহার মুখে। মুহূর্তেই লেগে গেল তুমুল মারামারি। মেহরীন এক কোণে ভয়ে জড়সড় হয়ে দাড়িয়ে আছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেয়েটা। তার জন্য আজ এতবড় ঝামেলা বাধল, বারবার এই কথাটাই মাথায় ঘুরছে।
বহুত কষ্টে দুজনকে ছুটিয়ে, তাহসানকে টেনে দাদির ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। হাতের ব্যান্ডেজ ভিজে গেছে রক্তে, গাল কেটে সেখান থেকেও রক্তত বের হচ্ছে।৷ ড্রয়িংরুম জুড়ে থমথমে ভারী নীরবতা।
তালহাকেও বিল্লাল সাহেবরা টেনে তিতলি বেগম নিজের ঘরে ঢুকিয়ে দিলেন। আসার আগে তালহা চিৎকার করে বলে এসেছে, মেহরীনকে যেন ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়, নিচে যেন আর এক মুহূর্তও না থাকে। ছেলের ঠোঁটের কোণা বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ঘরে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দিয়েছেন, যেন সে আর বাইরে যেতে না পারে। তবু তালহা উঠতে চাইছিল। কিন্তু উনি জোর করে বসিয়ে রেখেছেন। ভারী ভারী শ্বাসে বুক ওঠানামা করছে তালহার। তিতলি বেগমের চোখে জল টলমল করছে। ফার্স্ট এইড বক্স থেকে তুলো বের করে আলতো হাতে ছেলের ঠোঁটের কোণ মুছে দিচ্ছেন।
ছেলের এমন রূপ আজ প্রথম দেখছেন তিনি। জানেন ছেলে রাগী, ছেলের রাগ সে বহুত দেখেছে। কিন্তু রাগের বশে এতটা হিংস্র হয়ে উঠতে পারে, তা কখনো কল্পনাও করেননি। মেহরীনের জন্য ছেলেটা এমন উন্মাদের মতো আচরণ করল? তার মনে কী চলছে? তালহা কি মেহরীনকে নিয়ে ভাবে? একের পর এক প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। এখনই সময় সব খোলাসা করার।
ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
—তালহা, আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছিস?
তালহা ফট করে মায়ের দিকে তাকাল। মায়ের চোখের ভাষা বুঝতে এক মুহূর্তও লাগল না। মাথা নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ছেলেকে নীরব দেখে তিতলি বেগম আর চুপ থাকতে পারলেন না। এবার সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন,
—তুই মেহরীনকে পছন্দ করিস?
মায়ের প্রশ্নে কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ থেকে ধীরে মাথা তুলল তালহা। মা তার উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছেন। ফুস করে শ্বাস ছাড়ল সে। উঠে দাঁড়িয়ে তিতলি বেগমকে টেনে বিছানায় বসাল। তারপর নিজে মায়ের পায়ের কাছে মেঝেতে বসে পড়ল। মায়ের দু’হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে শান্ত চোখে তাকাল মায়ের দিকে। তিতলি বেগমের বুক ধকধক করছে। ছেলে এমন ভঙ্গিতে বসলে সাধারণত বড়সড় কোনো কথা বলতেই বসে। তবে কি সত্যিই কিছু লুকিয়েছে?
তালহা শুকনো গলা পরিষ্কার করে বলল,
—আম্মু, তোমার কি আমার উপর ভরসা আছে?
তিতলি বেগম মাথা নেড়ে বললেন,
—হুম।
—বিশ্বাস আছে?
তিতলি বেগম এক হাত ছাড়িয়ে ছেলের গাল ধরে বললেন,
—কিসব প্রশ্ন করছিস আব্বু। আমার তোদের উপর নিজের থেকেও বেশি ভরসা আর বিশ্বাস আছে।
তালহা ধীরে বলল,
—তাহলে এখন কিছু কথা বলব, তুমি প্যানিক না হয়ে শান্তভাবে শুনবে?
তিতলি বেগমের কপাল কুঁচকে গেল,
—কী এমন কথা?
তালহা মায়ের হাতটা নিজের মাথার ওপর ধরে বলল,
—আম্মু, আমার কসম তুমি এক্সট্রা চিন্তা করবে না, বেশি ভাববে না। নরমালভাবে কথাগুলো নেবে, কেমন?
তিতলি বেগম খানিকটা হকচকালেন। তবু মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। তালহা গভীর শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করল,
—আম্মু, মেহরীন কি খারাপ মেয়ে?
তিতলি বেগম মাথা নেড়ে বললেন,
—না।
—তোমার কাছে তাকে মেয়ে হিসেবে কেমন লাগে?
—ভালোই। শান্ত স্বভাবের, বুঝদার, ভদ্র একটা মেয়ে। কেন?
—তোমার ছেলের বউ হিসেবে কেমন মেয়ে চাও?
তিতলি বেগম থমকে গেলেন ছেলের হঠাৎ এমন প্রশ্নে। একটু ইতস্তত করে বললেন,
—ভালো, ভদ্র, বুঝদার একটা মেয়ে হলেই চলবে। যে আমার ছেলেকে আগলে রাখতে পারবে, আমার পরিবারটাকেও সামলে রাখবে।
মায়ের কথার ফাঁকেই তালহা বলে ফেলল,
—মেহরীন হলে চলবে না, আম্মু?
তিতলি বেগম চমকে উঠলেন। প্রশ্নভরা চোখে তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। কথার স্রোতের মানে ধরার চেষ্টা করছেন। উত্তরের অপেক্ষা না করেই তালহা আবার বলল,
—আম্মু, তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করেছ মেহরীন খালামনির মেয়ে?
তিতলি বেগম নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। তালহা মায়ের হাত নাড়িয়ে বলল,
—বলো আম্মু…
ধীর কণ্ঠে তিনি উত্তর দিলেন,
—একবার বিশ্বাস হলে, আবার বিশ্বাস হচ্ছে না।
তালহা আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকাল,
—আম্মু, আমি যদি বলি মেহরীনই খালামনির মেয়ে, তাহলে তুমি বিশ্বাস করবে?
তিতলি বেগম কেঁপে উঠলেন। চোখ ছলছল করে উঠল। তালহা দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—আম্মু, মেহরীনই খালামনির মেয়ে।
তিতলি বেগমের চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল,
—সত্যি বলছিস?
তালহা উনার চোখ মুছে দিয়ে মাথা নাড়াল
—হুম, আম্মু। প্রমান আমি দিবো, তবে মেহরীন মিথ্যা বলেনি কিছু এটা জেনে রাখো। তোমার মনে আছে, একবার তোমাকে আমার একটা ফ্রেন্ডের বিয়ের কথা বলেছিলাম? যাদের পরিবার মেনে নেয়নি?
তিতলি বেগম একটু মনে করার চেষ্টা করে বললেন,
—হুম, মনে পড়েছে।
সঙ্গে সঙ্গে তালহা প্রশ্ন করল,
—সেখানে তুমি কার সাপোর্ট নিয়েছিলে?
—ওই ছেলেটার।
—সেইম সিচুয়েশনে যদি তোমার ছেলে পড়ে, তখন তুমি কার সাপোর্ট করবে?
চমকে উঠলেন তিনি। তালহার কথার মানে ধরতে না পেরে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন,
—কি বলছিস? পরিষ্কার করে বল, তালহা।
তালহা ভারী শ্বাস ফেলল। মায়ের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
—আম্মু, সেদিন তোমাকে যে কাহিনিটা শুনিয়েছিলাম, ওটা আসলে তোমার ছেলের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা। শুধু মা-বাবার জানাজানির অংশটা বাড়িয়ে বলেছিলাম, তোমার রিয়াকশন দেখতে।
তিতলি বেগম সঙ্গে সঙ্গে ছেলের হাত ছেড়ে তাকালেন। তা বুঝতেই তালহা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল হাত। তিতলি বেগম যেন মুহূর্তে শূন্যে ভেসে গেলেন। কী শুনছেন তিনি! বিস্মিত চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার ছেলে বিয়ে করে নিয়েছে, এই ভাবনাতেই মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। কাঁপা গলায় বললেন,
—তালহা… কী বলছিস এসব?
মায়ের অবস্থা বুঝে তালহা নিচু স্বরে বলল,
—আম্মু, মেহরীন আমার লিগ্যাল ওয়াইফ।
একটু থেমে আবার বলল,
—সেদিন রাতে এলাকাবাসী আমাদের জোর করে বিয়ে করিয়ে দিয়েছিল। তখন আমার কাছে আর কোনো রাস্তা ছিল না। বিয়ে না করলে মেয়েটাকে আমাদের সঙ্গে আনতে দিত না। মেহরীন তখন ভীষণ অসহায় ছিল। বারবার কাঁদছিল, আকুতি-মিনতি করছিল যেন ওদের কাছে ফেলে না যাই। আমিও বুঝতে পারছিলাম না, ওরা কেমন মানুষ, মেয়েটার কী হবে। বাধ্য হয়েই সেদিন বিয়ে করেছিলাম। হঠাৎ ঘটে যাওয়া পরিস্থিতি কীভাবে সামলাব, কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি তখন।
তিতলি বেগমের গলা চওড়া হলো। চোখে মুখে কাঠিন্য ভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন,
—মজা করছিস আমার সাথে?
তালহা নাথা এদিক সেদিক করে “না” বোঝাল। রেগে উঠলেন,
—তুই আমাকে সেদিন বলিসনি কেন?
তালহা নিচু গলায় উত্তর দিল,
—আম্মু, তুমি ব্যাপারটা কীভাবে নেবে বুঝতে পারিনি।
রাগী স্বরে তিনি চেচিয়ে উঠলেন,
—তাই বলে এতগুলো দিন কেটে গেল, তুই এত বড় কথা লুকিয়ে রাখলি আমার থেকে? তুই তো জানিস, তোর বিয়ে নিয়ে আমার কত স্বপ্ন। সব এভাবে ভেস্তে দিলি?
তালহার মুখটা মলিন হয়ে গেল,
—আম্মু, এজন্যই তো বলতে চাইনি। তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।
উনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন ছেলের দিকে। হঠাৎই তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল মুখে। তাচ্ছিল্যের কন্ঠে বললেন,
—আমি কষ্ট পাব বলে বলিসনি? আর এত দেরিতে যেনে যে আরও কষ্ট পাচ্ছি, সেটা?
তালহা আরও নত হলো মায়ের কাছে,
—আম্মু, মাফ করে দাও। কিন্তু তখন আমার মনে হয়েছিল, সরাসরি বললে তুমি হয়তো বিষয়টা মেনে নিতে পারবে না। মেয়েটা অসহায় ছিল, তার একটা আশ্রয়ের দরকার ছিল। যদি শুরুতেই বিয়ের কথা জানাজানি হতো, যেভাবে সহজে তুমি মেহরীনকে আগলে নিয়েছ, সেভাবে হয়তো তাকে মেনে নিতে না।
তিতলি বেগম ছেলেকে থামিয়ে দিলেন। কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল,
—এই চিনিস তোর মাকে? আমি কি আমার সন্তানদের মনে ভয় হয়ে আছি? আমি তো ভেবেছিলাম আমি আমার ছেলে-মেয়ের ফ্রেন্ড হতে পেরেছি। আমার ছেলে-মেয়ে আমার সঙ্গে সব শেয়ার করে। তাহলে এত বড় সত্য কেন লুকালি?
তালহা অসহায় কণ্ঠে বলল,
—আম্মু, তুমি ভুল বুঝছ।
তিতলি বেগম আরও কঠোর স্বরে প্রশ্ন করলেন,
—তাহলে ঠিকটা কী?
তালহার চেহারায় অপরাধবোধ স্পষ্ট হয়ে উঠল।কণ্ঠ খাদে নামিয়ে সে বলল,
—মেহরীন আর আমার বয়সের পার্থক্য অনেক বেশি। প্রথম দিকে লজ্জা লাগত, এত ছোট একটা মেয়েকে বিয়ে করেছি ভেবে। তখন আমি তাকে মেনে নিতে পারিনি। সবার সামনে এই বিয়েটা তুলে ধরাও কেমন যেন লজ্জার ব্যাপার মনে হতো। কীভাবে, কী বলব, কিছুই বুঝে উঠতে পারতাম না। একদিকে আমি নিজেই এই বিয়ে মানতে পারিনি, অন্যদিকে তোমাকে বললে তুমি কীভাবে রিয়্যাক্ট করবে, সেই চিন্তায় মাথা কাজ করত না। তাই ভেবেছিলাম বিয়েটা লুকিয়েই রাখব। মেয়েটার বয়স কম, কিন্তু স্বপ্ন অনেক। আমি চেয়েছিলাম ওকে একটা সুন্দর জীবন দিতে। যে বিয়েটাকে আমি নিজেই মানতে পারিনি, সেই বন্ধনে বেঁধে রেখে যদি মেয়েটার জীবন নষ্ট হয়, তাতে তো কোনো লাভ নেই। তাই ভেবেছিলাম, সময় হলে তাকে ছেড়ে দেব।
তিতলি বেগম একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন ছেলের চোখের দিকে। এতদিনে কত কিছু যে তার অজানায় ঘটে গেছে। বুক ব্যথা করছে তার মতবে নিজেকে সামলে নিলেন। ছেলেকে ছুয়ে বলেছেন প্যানিক হবেন না। কিন্তু এই ঘটনায় কি ঠিক থাকা যায়? একজন মা ঠিক থাকতে পারে?
ভাবনার মাঝেই লক্ষ্য করক, মেহরীনকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলার সময় ছেলের চোখে কেমন বেদনার ছাপ। তা বুঝতেই একটু বাজিয়ে দেখতে সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করলেন,
—তাহলে ছেড়ে দিলি না কেন মেহরীনকে? এখন কেন সব সামনে আনলি?
তালহা চুপসে গেল। উত্তর মুখে থাকলেও বলতে ইতস্তত করল। তিতলি বেগম আবারও বললেন,
—ছাড়লি না কেন? তাহসান তো ভালো ছেলেই, সে বিয়ে করে সুখে রাখবে তাকে।
কথাটা শুনতেই হঠাৎ তালহা গলা উচিঁয়ে বলে উঠল,
—আম্মু, আমি ভালোবেসে ফেলেছি মেহরীনকে। এখন আমি ওকে ছাড়তে পারব না। তাকে অন্য কারো পাশে সহ্য হয়না আমার। শুধু আমার পাশেই রাখতে মন চায়। আমি ওকে ছাড়তে পারব না আম্মু, পারব না।
বলতে বলতে মাথা নিচু করে ফেলল সে। মন ভারী হয়ে আসল তার। তিতলি বেগম তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। তার মুখ, চোখ, মুখের প্রতিটা শব্দ সবই বলে দিচ্ছে, সে কতটা গভীরভাবে মেয়েটাকে ভালোবাসে। তার গম্ভীর ছেলেটার মনটা যে ভীষণ নরম। উপরে সে শক্ত খোলসে ঢেকে থাকলেও ভেতরে ভেতরে সেও অনুভূতিপূর্ণ একজন। ছেলের কথাগুলো যেন গলিয়ে ফেলল তাকে। নিজের রাগটা সাইডে রাখলেন আপাতত।
তালহার থুতনি ধরে মুখ তুলে চোখে চোখ রাখলেন নরম সুরে বললেন,
—তুই মেহরীনকে পছন্দ করিস, সেটা আমি অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিলাম। মেয়েটার ব্যাপারে তুই ভীষণ সিরিয়াস থাকিস। এসব কিছুই মায়ের চোখ এড়ায়নি। পছন্দ করা কোনো খারাপ কিছু না। তোর আব্বু আর আমিও তো ভালোবেসেই বিয়ে করেছি।
তালহা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। তিনি একটু থেমে আবার বললেন,
—যখন বুঝলি তুই মেয়েটাকে চাস, তখন কেন আমাকে বলিসনি? তোর পছন্দ নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। বরং আমি নিজেই চাই, আমার ছেলে নিজের পছন্দমতো বিয়ে করুক। জীবনটা তার, পছন্দটাও তার হওয়া উচিত। এজন্যই তো আমি তোর বড় মামার সঙ্গে ফারাহর ব্যাপারেও কথা বাড়াচ্ছি না। আমি যদি সন্তানের সুখের জন্য নিজের স্বপ্ন দমন করতে পারি, তবে আমার ছেলে কেন তার বিয়ের কথা আমাকে বলতে পারল না?
বলতে বলতেই টপটপ করে চোখের জল ঝরতে লাগল। তালহার মনটাও ঘন আধাঁরে ভরে উঠল। সে বুঝতে পারল, অজান্তেই মাকে কতটা কষ্ট দিয়ে ফেলছে। কিন্তু সে তো সবদিক চিন্তা করেই বিয়েটা প্রকাশ করেনি। ধীরে উঠে পাশে বসে মাকে আলতো হাতে জড়িয়ে ধরল। তিতলি বেগম ছেলের বুকে মুখ রেখে কেঁদে উঠলেন,
—কেন বলিসনি আম্মুকে? আম্মু কি খুব খারাপ? তোদের আমি বুঝি না? তোদের সুখ চাই না?
তালহা মাকে শান্ত করতে করতে বলল,
—সরি, আম্মু। প্লিজ আমাকে বোঝার চেষ্টা করো। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই নি।
নানান কথা বলে মাকে সে শান্ত করতে সক্ষম হয়েছে। নরম মনের মানুষ তিতলি বেগম, সময়ে যেমন কঠিন হয়ে উঠেন। তেমনি অল্পতে গলানো ও যায়।
—আম্মু তোমার মনে আছে, যখন আমি মেহরীনকে নিয়ে তার গ্রামে গিয়েছিলাম কাগজপত্র আনতে?
ছেকের কথায় তিতলি বেগম মাথা নাড়ালেন। তালহা ধীরে ধীরে বলল,
—তখনই খালামনির হুদিস পেয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার পর থেকেই মেহরীনের মা-বাবা সম্পর্কে কৌতূহল জাগে। দুদিন পর তার স্কুলের হেডম্যামের কাছে কল দিয়ে খোঁজ নিতে গেলে, তাদের নাম জানতে পারি। মায়ের নাম তামান্না শুনেই আমার মনে খটকা লাগে। বলতে পারো অভারথিংক করে বসেছিলাম। তখনই উনাকে অনুরোধ করি, মেহরীনের মা-বাবার কোনো ছবি জোগাড় করে দিতে। দেখার ইচ্ছে জেগেছিল। কিন্তু মেহরীনের চাচারা কোনোভাবেই সাহায্য করছিলেন না উনাকে। নানাভাবে চেষ্টা করেছি, তবু পারিনি একটা ছবি জোগাড় করতে। তখনো বিষয়টা আমার কাছে অস্পষ্ট ছিল। আমি নিশ্চিত ছিলাম না, তারা সত্যিই খালামনি আর খালু কি না। তবে তাদের দুজনেরই নাম খালামনিদের নামের সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে মিল। তাই সন্দেহ প্রখর হয়েছিল। অনেকদিনের চেষ্টার পর যখন সব প্রমাণ হাতে পাওয়ার সময় এলো, ঠিক তখনই সব জানাজানি হয়ে গেল। আমি সামনে আনার আগেই মেহরীন নিজেই সব প্রকাশ করে দিল।
একটু থেমে তালহা বলল,
—আম্মু, আমি চেয়েছিলাম আগে মেহরীনের আসল পরিচয়টা সবার সামনে পরিষ্কার হোক, তারপরই বিয়ের কথা জানাব। তুমি নিজেই বলো তো, আমি যদি আগে বিয়ের কথা বলতাম, তোমাদের কি জানতে ইচ্ছে করত না মেহরীনের মা-বাবা কে, সে কোন পরিবার থেকে এসেছে, পরিবারটা ভালো না খারাপ? তার ব্যাকগ্রাউন্ড কেমন? তখন কি এসব প্রশ্ন মাথায় আসত না? ছেলের বউ সম্পর্কে এসব ভাবা তো স্বাভাবিক। এমনি এমনি কি সবাই মেনে নিত?
তিতলি বেগম ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলেন। কথাগুলো যে অমূলক নয়, সেটাও বুঝতে পারছেন। তালহা আবার বলল,
—এখনই তো দেখছ, মাঝে মাঝেই ছোট মা মেহরীনের পরিবার নিয়ে খোঁটা দেয়, আঙুল তোলে। বিয়ের কথাটা জানাজানি থাকলে, বিষয়টা আরও বড় হতো, আরও বেশি প্রশ্ন উঠত তার দিকে। আম্মু, আমরা সবাই জানি, এই সমাজে মেয়েদের বিচার হয় মায়ের মাধ্যমে। কদমে কদমে মেয়ের পাশে মায়ের ছায়া খোঁজা হয়। মায়ের চরিত্র দেখেই মেয়ের চরিত্র মাপা হয়। মেয়েটার মা নেই জানলেই, সমাজ সহজেই তাকে খারাপ বানিয়ে দিতে পারবে। তখন কেউ তার ব্যক্তিত্ব দেখবে না। এই কারণেই আমি চেয়েছিলাম, বিয়ের কতজা জানানোর আগে মেহরীনের পরিচয়টা পরিষ্কারভাবে সামনে আসুক। যাতে পরে কেউ আমার বউয়ের দিকে আঙুল তুলতে না পারে, তার পরিবার নিয়ে কথা বলতে না পারে। আমি চাই আমার বউ সম্মানের সঙ্গে এই বাড়িতে থাকুক। কেউ যেন তাকে অপমান করতে না পারে, করলে আমি সেটা সহ্য করতে পারব না। তাই আমি তাকে অবহেলা অপমান করার সব রাস্তা বন্ধ করতে চেয়েছি। কেউ যেন অসহায় না ভাবে আমার বউকে।
একটানা কথাগুলো বলে থামল। শেষের কথাগুলো বলার সময় চোয়াল শক্ত হয়ে আসছিল। নিজেকে সামলে শ্বাস টেনে বলল,
—বলো আম্মু, আমার এসব ভাবনা কি ভুল ছিল? আমি কি ভুল কিছু করেছি?
তিতলি বেগম ছেলের দিকে গর্বভরা চোখে তাকিয়ে আছেন। তার ছেলেটার চিন্তাভাবনা কতটা গভীর। তার মধ্যে যেন নিজের স্বামীর ছায়াই দেখতে পাচ্ছেন। মনে পড়ে গেল সেই মানুষটার কথা, যিনি সবসময় নিজের স্ত্রীর সম্মান আগলে রাখতেন, কারো সামনে মাথা নত করতে দিতেন না। তার কারণেই তো আজও তিনি এই পরিবারে মাথা উঁচু করে বেঁচে আছেন। তালহার দিকে কিছুক্ষণ শান্ত চোখে চেয়ে থাকলেও এবার গম্ভীর চোখে তাকাল,
—তবে সবকিছু আমি এত সহজে মেনে নিব না।
শেষের কথা রাগী কণ্ঠে বলে উঠে দাঁড়ালেন তিতলি বেগম। তালহা মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল, বুঝতে চাইছে তার পরের পদক্ষেপ কী। তিনি দরজা খুলতে খুলতেই আদেশ করলেন তার সঙ্গে নিচে যাওয়ার।
নিচে বসে আছেন সিকদার ও আহমেদ পরিবারের সকলে। মেহরীনকে আনা হয়েছে। তালহার থেকে কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে আছে সে। মাথা নিচু করে। তাহসানের গালে ওয়ানটাইম ব্যান্ডেজ, আর হাতে নতুন করে বাঁধা ব্যান্ডেজ। তিতলি বেগম গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে যাচ্ছেন। সবাই চুপচাপ বসে আছেন তার কথা শোনার আশায়। সবার মুখে চিন্তার রেখা স্পষ্ট। কি এমন বলবেন উনি, সেই চিন্তা। তালহাও নির্বিকার চোখে তাকিয়ে আছে। কাজিকে তখনই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
সকলের নীরবতা ভেঙে বললেন,
—তাহসানের সাথে মেহরীনের বিয়ে দেওয়া সম্ভব না৷ তাহসান তুই এসব পাগলামি বাদ দে। আমরা তোকে আরও ভালো মেয়ে খোঁজে দিব।
এতক্ষণ সোফায় বসেছিল তাহসান। উনার কথা শুনতেই ধপ করে উঠে দাঁড়াল।
—এসব কি বলছ ফুফু।
তিতলি বেগম বললেন,
—যা শুনেছিস তাই।
তাহসান হন্তদন্ত পায়ে তার সামনে এগোল,
—বুঝেছি তোমার ছেলে তোমারও ব্রেইন ওয়াশ করে ফেলেছে তাই না? যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে। আমার টা আমারই বুঝে নিতে হবে।
বলেই মেহরীনের দিকে এগোল। তা দেখে তালহাও জায়গা থেকে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। মেহরীনের সামনে এসে তাকে আড়াল করে দাঁড়াল সে। তাহসান তাকে দেখতেই চেঁচিয়ে উঠল,
—তুই আবারও এসেছিস আমাদের মাঝে।
তালহা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
—আমি না তুই আসছিস আমাদের মাঝে। ওর সাথে কথা বলার হলে দূর থেকে কথা বল, কাছে এসে কথা বলা এলাউ করব না আমি।
তাহসান রাগে তেঁতে উঠল,
—এই তুই কে? এলাউ করার কে রে তুই?
তালহা সঙ্গে সঙ্গে মুখটা তাহসানের কানের কাছে নিল। বেশ উচ্চস্বরে বলে উঠল,
—আই অ্যাম তালহা সিকদার, দ্য ওয়ান অ্যান্ড অনলি হাজব্যান্ড অফ মেহরিন মাহা।
শব্দগুলো মুখ হয়ে বের হতেই, মুহূর্তের মধ্যে ড্রয়িংরুমে ছোট খাটো একটা বিস্ফোরণ ঘটাল। বিল্লাল সাহেব, আফতাব সাহেব, তিতলি বেগম আর তাহিয়া বাদে সকলে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে তালহার দিকে। অবিশ্বাস্য চোখে তালহাকে দেখছে। সে এসব কি বলছে বোঝার চেষ্টা করছে। সকলের মনেই একটা কথা তালহা তো ওরকম ছেলে না, যে ফাইজলামি করবে। তাহলে?
মেহরীন নিজেও হতভম্ব হয়ে গেছে। তালহা সবার সামনে এভাবে, এই মুহুর্তে বলবে, তা তার কল্পনারও বাইরে ছিল। ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে যেন সব। যখনই অনুভব করল একে একে সকলের দৃষ্টি নিজেএ দিকে এসে ঠেকছে। অস্বস্থির পরিমাণ দ্বীগুন হয়ে গেল। মাথা নিচু করে কাচুমাচু হয়ে দাড়িয়ে রইল।
উপস্থিত একেকজনের মুখ হাঁ হয়ে আছে। যেন আশ্চর্যজনক কিছু শুনেছে। একবার তালহাকে দেখছে তো একবার মেহরীনকে। কেউ বুঝতে পারছে না কী প্রতিক্রিয়া দেবে।
তাহসানও বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে আছে। মুখ থেকে বেরিয়ে এলো,
—কিইইই?
সাথে সাথে বাকিদের মুখ থেকেও বেরিয়ে এলো একই শব্দ,
—কিইই!
একেকজনের চোখে এখন সত্য-মিথ্যা জানার কৌতূহল। রিতু মুখ ফসকে বলে ফেলল,
—কি বলছ ভাইয়া?
তালহা তার দিকে তাকিয়ে ঘাড় হালকা কাত করে বলল,
—যা বললাম তাই।
ব্যস পরক্ষণেই শান্ত পরিবেশ পূনরায় কথাবার্তায় ভরে উঠল। একে একে সকলের প্রশ্ন ভেসে এলো, কখন বিয়ে হয়েছে, কীভাবে বিয়ে, সত্য না মিথ্যা, সব একসাথে। কেউ কেউ বিশ্বাস করছে না। এদিকে এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ফারাহ যেন পাথর হয়ে গেছে। চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। শরীরের ভেতর যেন আগুন জ্বলছে। কেউ আগুন লাগিয়ে দিয়েছে শরীরে। একবার তাকাচ্ছে তালহার দিকে, আবার নিজের মায়ের দিকে। ফারাহর মাও মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। ছোট থেকেই মেয়েটা যে তালহার আশায় বসে আছে। তা তার অজানা নয়। এভাবে মেয়ের স্বপ্ন ভেঙে যাবে, তিনি মানতে পারলেন না।
সঙ্গে সঙ্গে ক্ষোভে ফেটে পড়ে তিতলি বেগমের দিকে তেড়ে গেলেন। বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন,
—এসব কি আপা? নাটক পেয়েছে?
তিতলি বেগমের ওপর গলা বাড়াতেই আরিফ আহমেদ কিছু বলার আগেই তালহার বজ্রকণ্ঠ ড্রয়িংরুম কাঁপিয়ে ভেসে এলো,
—মামি আমার মায়ের সাথে গলা উচিয়ে কথা বলবেন না।
হঠাৎ সেই উচ্চারণে ঘরের ভেতর থমথমে নীরবতা নেমে এলো। তিনি এবার তালহার দিকে তীব্র রাগে তাকালেন, কণ্ঠে জমে থাকা ক্ষোভ উথলে পড়ল,
—তো কিভাবে কথা বলব? প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমার মেয়েকে এতদিন বসিয়ে রেখেছে। এখন শুনছি ছেলের বিয়ে হয়ে গেছে? আমার মেয়ের জীবন নাটক পেয়েছো তোমরা?
প্রতিটা শব্দ যেন ধারালো ছুরির মতো ছুড়ে ফেলল। তালহা চোয়াল শক্ত করে বলল,
—আপনাকে কেউ আশা দেয়নি। এমনকি আমি কোনো কালেই রাজি ছিলাম না এই বিয়েতে। জানামতে আম্মু কোনো কথাও দেয়নি আপনাদের। তাছাড়া বরাবরই আমি বলেছি ফারাহ আমার বোনের মতো। আপনাদের তখনই বোঝা উচিত ছিল।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। আরিফ আহমেদ সহ বাকিরা হতাশ চোখে চেয়ে আছে। পরিস্থিতি সামলাতে তিতলি বেগম দ্রুত উঠে তাকে ধরলেন,
—শান্ত হো, ভাগ্য বলতেও তো কথা আছে। যার কপাল যেখানে, সে সেখানেই যাবে। জোর করে তো আর ভাগ্য বদলানো যায় না।
কিন্তু কথায় আগুন নেভার বদলে আরও ছড়িয়ে পড়ল। তিনি ঝাটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নিলেন,
—ভাগ্যের দোষ দেবেন না একদম। বলেন আপনারা গাদ্দারি করেছেন।
এইবার তালহার নানু আর চুপ থাকতে পারলেন না। রাগে গর্জে উঠলেন,
—আরিফ তোর বউরে সামলা বলছি। আর একটা কথা বললে খারাপ হয়ে যাবে। তিতলি তোর বড় বোন হয়।
আরিফ আহমেদ মায়ের কথায় স্ত্রীর দিকে কড়া চোখে তাকাতেই তিনি দাঁত চেপে ফুসতে ফুসতে চুপ হয়ে গেলেন। ভারী পায়ে এগিয়ে গিয়ে মেয়ের কাছে পৌঁছালেন। ফারাহকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই মেয়েটা নিঃশব্দে কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার কাঁধ কাঁপছে, চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে মায়ের শাড়িতে।
মেহরীন বিস্মিত চোখে এতক্ষণ পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। ফারাহর কান্না দেখে কেন যেন বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল তার। মনে হচ্ছে মেয়েটার কষ্টের কারণ সে নিজেই। কেমন অপরাধী লাগছে নিজেকে। তবে তাদের বিয়ের কথা যে চলছিল, এটা তো সে আজ অব্দি জানতই না। প্রশ্নভরা চোখে তাহিয়ার দিকে তাকাতেই তাহিয়া ইশারায় বুঝিয়ে দিল, সব পরে খুলে বলবে।
এরপর বসল মিটিং। তালহার বিয়ে নিয়ে সকলের প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগল। সবার কৌতূহল ধীরে ধীরে মেটাতে লাগলেন তিতলি বেগম। আস্তে আস্তে সব জানাজানি হতেই। আহমেদ পরিবারের সবাই কমবেশি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। এত বড় বিষয় কেন গোপন রাখা হলো। ফারাহর সঙ্গে যে তালহার বিয়ের কথহা তা কি সকলের অজানা? তাদের নানান অভিযোগ তিতলি বেগম কৌশলে পুরো সামলালেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে থাকলেন তিনি। তালহা যেন নিশ্চিন্তে বসে শুধু দেখে যাচ্ছে।
এতক্ষণ নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থাকা তাহসান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হঠাৎ ভরা মজলিসে শব্দ করে হেসে উঠল সে। তার অপ্রত্যাশিত হাসিতে সবাই চমকে তাকাল। তাহসান হাততালি দিতে দিতে উঠে এসে তালহার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—বাহ তালহা হাউ ব্রিলিয়ান্ট তুই…
তালহার কপাল কুঁচকে গেল। মেহরীনও ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটার কী শোকে মাথা গেল, এই প্রশ্ন দুজনের চোখেই। তাহসান এবার বাকিদের দিকে ফিরল। ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলল,
—তোমরাও কি বোকা গো সবাই। তালহা একটা বানোয়াট কাহিনি বানিয়ে বলল, আর তোমরা বিশ্বাস করে নিলে? তার বিয়ে দেখেছো নিজ চোখে কেউ? কোনো প্রমাণ আছে এই বিয়ের? দেখাতে পারবে কোনো প্রমাণ?
তালহা বুকের ওপর হাত ভাঁজ করে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। এবার কপালের কুঁচকানো রেখা মিলিয়ে গেছে, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে বাঁকা এক হাসি। শেষ চাল দেওয়ার আগে যেন প্রতিপক্ষের নাটক উপভোগ করছে সে। তাহসানের কথায় এবার সবার চোখেই সন্দেহের ছায়া নামল। তালহাকে চুপ দেখে তাহসান আরও জোরে হেসে উঠল,
—দেখলে তো? তোমাদের ছেলের এখন মুখে কথা নেই। মিথ্যাবাদী আর কীই বা বলবে!
বলতে বলতেই সে এগিয়ে এসে মেহরীনের সামনে দাঁড়াল। মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে এক কদম পেছাল। তাহসান তড়িঘড়ি করে বলল,
—বলো মেহরীন, তালহা মিথ্যা বলছে তাই না? কোনো ভয় পেতে হবে না। যা সত্য তাই বলবে। আমি আছি না তোমার পাশে। আমি তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করব। তালহার কথা বাদ দাও, তুমি একবার বলো তুমি এই বিয়েতে রাজি।
মেহরীন নিশ্চুপ। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার নীরবতায় বিরক্ত হয়ে তাহসান আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৯
—বলো মেহরীন তোমার এই বিয়েতে কোনো আপত্তি নেই।
তাহসানের কথা শুনতেই এবার মাথা তুলে তাকাল মেহরীন। বুকের ভেতর ঝর চলছে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল তালহার দিকে। তার চোখে আপাতত কোনো দিকনির্দেশনা নেই। শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে, যেন সে নিজেও শুনতে চাইছে মেহরীনের উত্তর কি হবে। মেহরীন মাথা নিচু করে নিল। আস্তে আস্তে তালহার দিকে ঘেঁষে গেল সে। তালহার বাহুতে শরীর স্পর্শ হতেই একপা পিছিয়ে তালহার পেছনে দাড়াল। তার পাঞ্জাবির এক কোনা শক্ত করে মুঠো করে ধরল। মাথা নিচু রেখেই বলল,
—আমি বিবাহিত…
