প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৮
রোজ ও রুশা
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে হেরা নাভানের রুম থেকে বেরিয়ে গেল। দরজাটা এত জোরে বন্ধ করল যে পুরো করিডোর কেঁপে উঠল। হাঁটতে হাঁটতে ফোন কানে নিয়ে কাঁপা গলায় বলে উঠল—
“ আমি আর এই রুমে আসবো না! আর কখনো না! অসভ্য… নির্লজ্জ একটা লোক!”
চোখের কোণে পানি জমে উঠছে, কিন্তু সে কাঁদতেও পারছে না। বুকের ভেতরটা শুধু ধকধক করছে। মাথার ভেতর হাজারো চিন্তা ঘুরছে।
এই বিয়ে যদি হয়ে যায় ? যদি সব সত্যি হয়ে যায় ?
যদি একটা ভুল সিদ্ধান্তে দুইটা পরিবার ভেঙে যায়?
করিডোরের একপাশে এসে দাঁড়াতেই তার হাঁটু কেঁপে উঠল। ঠিক তখনই সৃজন দূর থেকে হেরার এমন অবস্থা দেখে দ্রুত এগিয়ে আসে। সাধারণত হেরা খুব স্ট্রং থাকে, কিন্তু আজ ওকে দেখে মনে হচ্ছে ভেতর থেকে পুরো ভেঙে পড়েছে।
সৃজন নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল—
“ কি হয়েছে ? এমন কাঁপছ কেন, বনু ?
হেরা হঠাৎই তার হাত চেপে ধরে অসহায় চোখে তাকাল।
“ ভাইয়া… প্লিজ কিছু করুন না। কিভাবে এই বিয়ে আটকাবো? আমি জানি না কি করবো! আমি চাই না কেউ আলাদা হয়ে যাক। মিডিয়ার সামনে সব হবে… পুরো বাংলাদেশ দেখবে! এর মধ্যে যদি কিছু হয়ে যায়? সব শেষ হয়ে যাবে ভাইয়া…।
হেরার গলাটা কেঁপে উঠল। সৃজন হালকা হাসলো। হেরাকে হাত ধরে একটা চেয়ারে বসালো পাশে থাকা অধীর আর রুশা । সবাই এখানে ছুটে এসেছে হেরাকে এমন অবস্থায় দেখে। সবাইকে নির্লিপ্ত ভাবে থাকতে দেখে হেরা বলে উঠলো-
“ আপনারা কেউ সিরিয়াসলি নিচ্ছেন না কেন?
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঝিনুক ধীরে ধীরে বলে উঠল—
“ হেরা, শান্ত হও। নাভান যা করবে ভেবেচিন্তেই করবে। ও কখনো এমন কিছু করবে না যেটাতে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
“ কিন্তু—!
“ সৃজন এবার এগিয়ে এল।
“ আমরা নাভানকে বছরের পর বছর ধরে চিনি। ওর মাথা ঠান্ডা। ও কখনো আবেগে সিদ্ধান্ত নেয় না। তুমি শুধু খারাপ দিকটাই ভাবছ।
হেরা কাঁপা গলায় বলল—
“ কিন্তু যদি —!
“কোনো যদি না।”
সৃজন এবার একটু শক্ত গলায় বলল। নাভানের উপর বিশ্বাস রাখো। ও যদি কিছু করে, সেটা সবার ভালোর জন্য করবে। চারপাশটা কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে গেল।
হেরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে ভয়, মুখে দুশ্চিন্তা। এমন সময় হঠাৎ করেই অধীর নাটকীয় ভঙ্গিতে সামনে এসে দাঁড়াল। এক হাত চুলে চালিয়ে গম্ভীর মুখ করে বলল —
“এই যে আমার কিউটপাই বনু ভাবি… এত টেনশন করলে কিন্তু বুড়ি হয়ে যাবা।
সবাই একসাথে তার দিকে তাকাল। অধীর বুক ফুলিয়ে আবার বলল—
“ লাইফে এত টেনশন নিতে নাই। আমার মতো চিল থাকতে হয়। প্রেম করবা, ঘুরবা, মেয়েদের সাথে ফ্লাটিং করবা—!
কথা শেষ করার আগেই তার চোখ গিয়ে আটকালো রুশার দিকে। রুশা দুই হাত ভাঁজ করে তাকিয়ে আছে।
ভয়ংকরভাবে তাকিয়ে আছে। অধীরের গলা শুকিয়ে গেল।
“ কি বললেন?” রুশা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। “মেয়েদের সাথে ফ্লার্টিং করেন?”
অধীর সঙ্গে সঙ্গে কাশতে শুরু করল।
“কে? আমি? না, না! না! আমি ফ্লার্টিং বলিনি! আমি বলেছি… প্লাটিং!”
“প্লাটিং?”
“হ্যাঁ! মানে… প্ল্যানিং! উফফ… বাংলা উচ্চারণে একটু সমস্যা আছে তো!
পাশ থেকে সৃজন মুখ চেপে হাসছে। ঝিনুক দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে। এমনকি টেনশনে ডুবে থাকা হেরার মুখেও হালকা হাসি ফুটে উঠল।
রুশা ভ্রু তুলে বলল—
“ ও আচ্ছা? তাহলে এতদিন যেগুলো করতেন সেগুলোও প্ল্যানিং ছিল?
অধীর বুকের উপর হাত রেখে নাটকীয় গলায় বলে উঠল—
“ আমার চরিত্র নিয়ে এভাবে প্রশ্ন তুলছো ? আমি তো নিষ্পাপ!
“ হুম, খুবই নিষ্পাপ।
রুশা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল। “বিশেষ করে মেয়েদের সামনে গেলেই। এবার সবাই হেসে উঠল। অধীর বুঝতে পারল পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাই দ্রুত পিছিয়ে যেতে যেতে বলে উঠল—
“এই রে! আমার লাল গোলাপি খেপে গেছে! সবাই ভালো থাকো, আমি চললাম!”
কিন্তু যাওয়ার আগেই রুশা তার কোটের কলার ধরে ফেলল।
“কোথায় যাবেন জনাব?
অধীর অসহায় মুখে চারপাশে তাকাল।
“ বাঁচাও…!
সৃজন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—
“ না ভাই, আজকে তোরে কেউ বাঁচাবে না।
হাসির রোল পড়ে গেল চারপাশে। টেনশনে ভারী হয়ে থাকা পরিবেশটাও যেন একটু হালকা হয়ে গেল। হেরা সবার দিকে তাকিয়ে বুঝল— সে একা না। এই মানুষগুলো শুধু বন্ধু না, ওর সাহস। আর নাভান…হয়তো সত্যিই, ওর উপর বিশ্বাস রাখা উচিত।
চারদিকে ঝলমলে আলো। বিশাল হলরুমটা মানুষের গুঞ্জনে কাঁপছে। মিডিয়ার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একটার পর একটা ঝলসে উঠছে। সবার চোখে-মুখে কৌতূহল— আজকের অনুষ্ঠানটা আসলে কী নিয়ে?
স্টেজের মাঝখানে সাদা শার্ট এর উপর কালো কোট পরে দাঁড়িয়ে আছে নাভান। হাতে মাইক্রোফোন। মুখে অদ্ভুত শান্ত ভাব, অথচ চোখের গভীরে জমে আছে বহু বছরের না বলা ঝড়।
সে ধীরে ধীরে মাইক্রোফোনটা ঠোঁটের কাছে তুলে ইংরেজিতে বলতে শুরু করল—
“Good evening, ladies and gentlemen… আপনাদের সবাইকে আজকের এই সন্ধ্যার জন্য অনেক শুভেচ্ছা। আজকের অনুষ্ঠানটা কী নিয়ে, সেটা হয়তো অনেকেই আন্দাজ করতে পারছেন। আশা করি আপনারা শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথেই থাকবেন… কারণ আজকের সন্ধ্যাটা খুব সাধারণ কোনো সন্ধ্যা নয়।
শেষ কথাটা বলতেই হলরুমে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল। নাভান চোখের ইশারায় কাউকে নির্দেশ দিতেই কয়েকজন লোক তাড়াহুড়ো করে উপরের ফ্লোরের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর তারা ফিরে এল অস্বস্তিকর মুখ নিয়ে।
“ স্যার… উনারা কেউ রুম থেকে বের হচ্ছেন না…”
নাভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে নিজেই মায়ের রুমের দিকে হাঁটল।
দরজা খুলতেই দেখল— অ্যাডভোকেট এম এল এ কাজল খান দাঁড়িয়ে আছেন জানালার পাশে। মুখ শক্ত। আর জাওয়াদ খান কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছেন তাকে।
দুজনের মাঝখানে সেই পুরোনো দূরত্ব… সেই ঠান্ডা যুদ্ধ।
নাভান একটাও কথা বলল না। সে এগিয়ে গিয়ে দুজনের হাত শক্ত করে ধরে টেনে বের করে আনল।
“ নাভান! হাত ছাড়ো!”
কাজল খান দাঁতে দাঁত চেপে বললেন। কিন্তু নাভান থামল না। পুরো হলরুমের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিল দুজনকে। চারদিকে মুহূর্তেই ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।
কাজল খান চারপাশে তাকিয়ে বুঝলেন প্রেস মিডিয়া সব লাইভ করছে। অসংখ্য ক্যামেরা তাক করা তাদের দিকে। চাইলেই এখন কোনো সিনক্রিয়েট করা যাবে না।
তিনি শুধু আগুন ঝরা চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“ এই ছেলেটা আজ পাগল হয়ে গেছে…” তিনি নিচু গলায় বিড়বিড় করলেন।
ঠিক তখনই হেরা দৌড়ে এসে নাভানের পাশে দাঁড়াল। কিন্তু নাভানের চোখের দিকে তাকাতেই থমকে গেল সে।
ওই চোখে আজ অন্য কিছু আছে। অদ্ভুত ঠান্ডা একটা সিদ্ধান্ত। নাভান মাইক্রোফোনটা তুলে নিল আবার।
তারপর শান্ত স্বরে বলে উঠল—
“ প্লিজ… সরি টু সে… আজ আমার বাবা-মার ডিভোর্স হবে। সাথে আমার পিপিমণি ও ছোটবাবার।
পুরো হলরুম যেন একসাথে জমে গেল। কারও নিঃশ্বাস নেওয়ার শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না। হেরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। জিহান তালুকদার রাগে কাঁপতে শুরু করলেন। নাভান থামল না।
“ হ্যাঁ… আজ ডিভোর্স হবে। আর আজই তাদের নতুন করে বিয়ে দেওয়া হবে।
এক মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ল।
“হোয়াট?!”
“ নাভান কি পাগল হয়ে গেছে?!এটা কোনো নাটক নাকি?!”
ঠিক তখনই চারজন মানুষ ভেতরে ঢুকল। দুইজন পুরুষ, দুইজন মহিলা। তাদের পোশাক-আশাক, উপস্থিতি— সবকিছুতেই একটা অভিজাত ভাব।
নাভান নিজে এগিয়ে গিয়ে একজন মহিলার হাত ধরে এনে জিহান তালুকদারের পাশে দাঁড় করাল।
আরেকজন মহিলাকে দাঁড় করাল জাওয়াদ খানের সামনে। দুইজন পুরুষকে নিয়ে গেল তার মা আর পিপিমনির সামনে। চারদিকে যেন বিস্ফোরণ ঘটে গেল।
কাজল খান এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
“ নাভান!” তিনি গর্জে উঠলেন।
কিন্তু নাভান নির্বিকার। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে বলল—
“ ইতিহাসে এই প্রথম হয়তো… যেখানে বাবা-মার ডিভোর্স নিয়ে এত বড় অনুষ্ঠান হচ্ছে।
কেউ হাসল না। কারণ ছেলেটার চোখে মজা ছিল না।
ছিল বহু বছরের জমে থাকা অভিমান।
“ বিয়ে মানেই একসাথে থাকা না।
নাভান বলতে লাগল।
“ দুইজন মানুষ বছরের পর বছর একই ছাদের নিচে থেকেও দূরে থাকতে পারে। আমরা ছোটবেলা থেকে দেখেছি— রাগ, অভিমান দূরত্ব… কেউ কাউকে বুঝতে চায়নি। আর সেই দূরত্বের শাস্তি পেয়েছি আমি।
তার গলা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল।
“ আমি কি দোষ করেছিলাম? কেন বাবা-মার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হব? যদি তারা একে অপরকে মেনে নিতে না পারে, তাহলে নতুন করে জীবন শুরু করুক।
হলরুম নিস্তব্ধ। প্রত্যেকটা কথা যেন মানুষের বুকের ভেতর গিয়ে লাগছে।
“ তারা হয়তো বয়সে বড় হয়েছে,” নাভান আবার বলল, কিন্তু তাদেরও তো একটা জীবন আছে। চাহিদা আছে। সুখে থাকার অধিকার আছে।”
হঠাৎ—
ঠাস!
পুরো হলরুম কেঁপে উঠল।
হেরা সবার সামনে নাভানের গালে সজোরে থাপ্পড় মেরেছে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একসাথে ঝলসে উঠল।
নাভান মুখ ঘুরিয়ে নিলেও চোখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। হেরা কাঁপছিল রাগে।
“ আপনি মানুষ নাকি?” তার চোখ ভিজে উঠেছে। “নিজের বাবা-মাকে এভাবে অপমান করছেন ! ভালোবাসার মানে বুঝেন আপনি? তাদের মুখ দেখে কি মনে হয়, তারা একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারবে?
হেরার হঠাৎ আক্রমণে ঝিনুক অধীর সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। সৃজন বলে ওঠে —
” এটা কি করলে বনু তুমি।
ঝিনুক বিড়বিড় করতে থাকে
” এত করে বললাম মেয়েটাকে তাও একটু ধৈর্য ধরতে পারছে না।
রুশা বলে ওঠে—
মুখে কথা বল। মুখের কথার আগে তোর হাত চলে কেন রে ভাই? কেনো পার্টিতে চকলেট হিরোর গালে থাপ্পড় মেরে দিলি?
নাভান ধীরে ধীরে আবার মুখ ফিরিয়ে তাকাল তার দিকে। তার চোখে কষ্ট। ভয়ংকর কষ্ট।
” অপমান?”
নাভান হেরার দিকে রেগে বলে উঠে –
“ যখন মানুষ রাগের কারণে নিজের সবচেয়ে আপন মানুষটাকে দূরে ঠেলে দেয়… তখন কি সেটা অপমান না?”
হেরা থেমে গেল। নাভান এবার চারপাশে তাকাল।
তারপর একে একে সবাইকে জিজ্ঞেস করল—
“ আন্টি… আপনি রাজি আমার বাবার পাশে দাঁড়াতে?”
মহিলা একটু ইতস্তত করে বললেন—
“ হ্যাঁ… আমি রাজি।
আরেকজন বললেন—
“ তোমার মায়ের মতো নারীর পাশে থাকতে পারা ভাগ্যের ব্যাপার।
তৌহিদা তালুকদারের সাথে যে ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিল তিনি বলল—
“তৌহিদা ম্যাডাম খুব মায়াবতী একজন নারী…”আমি রাজি নাভান, তোমার আত্মীয় হতে পারাও একটা ভাগ্যের ব্যাপার।
জিহান তালুকদারের সামনে থাকা নারীটি লাজুক সুরে বলে ওঠে —
“তোমার ছোট বাবা খুব ভালো মানুষ…
প্রত্যেকটা কথা যেন আগুন হয়ে লাগছিল চারজন মানুষের বুকে। কাজল খান এবার কাঁপতে শুরু করলেন। জাওয়াত খান রাগে দাঁত চেপে তাকিয়ে আছেন। আর জিহান তালুকদারের চোখ লাল হয়ে উঠেছে। হঠাৎ তিনি সামনে এগিয়ে এলেন।
“ স্টপ ইট!”
তার বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে পুরো হলরুম স্তব্ধ হয়ে গেল।
তিনি সোজা গিয়ে সেই মহিলার পাশ থেকে সরে দাঁড়ালেন। তারপর কাজল খানের দিকে তাকিয়ে বললেন—
“কোন ডিভোর্স হবে না।
সবাই নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে।
জাওয়াদখান সেম কাজটাই করল সবার সামনে গর্জে উঠলেন—
“ রাগারাগি হয়েছে, ঝগড়া হয়েছে… তাই বলে এত বছরের সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে? বিয়ে করেছি এত বছর আগে… এখনো সেই মানুষটাই আমার স্ত্রী! আর তাকে ডিভোর্স? ইম্পসিবল!”
চারপাশ মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অ্যাডভোকেট এম এল এ কাজল খান বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলেন। এত বছরের রাগ, অভিমান, দূরত্ব— সবকিছুর মাঝেও জাওয়াদ খানের চোখে আজ শুধু একটাই জিনিস স্পষ্ট… ভালোবাসা।
জাওয়াদ খান ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন।
তারপর সবার সামনে নিজের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলে উঠলেন—
“ আর আমি? আমার বউ বেঁচে থাকতে অন্য কাউকে বিয়ে করব? দরকার হলে আমি আবার নিজের বউকেই বিয়ে করব! হাজারবার করব!”
চারদিকে চাপা শ্বাসের শব্দ উঠল। নাভান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন এই মুহূর্তটা বিশ্বাসই করতে পারছে না। জাওয়াদ খান এবার শক্ত করে কাজল খানের হাত ধরে নরম গলায় বললেন—
“ মানুষ রাগের মাথায় দূরে সরে যায়। কিন্তু দূরে গেলেই কি ভালো থাকা যায়? যার সাথে জীবন জোড়া লেগেছে… যার নামে কবুল পড়েছি… তার জায়গা কেউ নিতে পারে না। রাগ থাকবে, ঝগড়া হবে, কথা বন্ধ হবে… কিন্তু তাই বলে সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে? এত সহজ নাকি ভালোবাসা?”
কাজল খানের চোখ ভিজে উঠল। ঠোঁট কাঁপছে তার। এতদিনের শক্ত, কঠিন মানুষটা যেন আজ ভেঙে পড়ছেন।
“ তুমি… এখনো এতটা ভালোবাসো আমাকে?
কাঁপা গলায় বললেন তিনি।
জাওয়াদ খান হালকা হেসে চোখ মুছে দিলেন স্ত্রীর।
“ ভালোবাসি বলেই তো এখনো ছাড়িনি।”
চারপাশে উপস্থিত মানুষজন নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে।
এদিকে জিহান তালুকদার ধীরে ধীরে তৌহিদার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। চোখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু সেই ক্লান্তির ভেতরেও এক অদ্ভুত মায়া।
“ছোট্ট একটা অবিশ্বাসের জন্য আমরা বহু বছর কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু এই মধ্য বয়সে এসে এই নারীর হাত ছেড়ে দিব? এতটা কাপুরুষ আমি না।”
তৌহিদার চোখ ছলছল করে উঠল।
জিহান তালুকদার আরও কাছে গিয়ে বললেন—
“ মান-অভিমান হয়েছে, দূরে থেকেছি… দরকার হলে আরও দূরে থাকব। কিন্তু তাই বলে সম্পর্কটা ভেঙে দিব? না। কারণ কিছু সম্পর্ক রাগে,অভিমানে শেষ হয় না… ভালোবাসায় টিকে থাকে।
তারপর বহু বছর পর প্রথমবার সবার সামনে তৌহিদার হাত নিজের হাতে নিয়ে নিলেন তিনি।
“এই হাতটা ধরেছিলাম সারাজীবন পাশে রাখার জন্য… মাঝপথে ছেড়ে দেওয়ার জন্য না।”
তৌহিদা এবার চোখের পানি আটকাতে পারলেন না।
আর ঠিক তখনই জাওয়াদ খান সবার সামনে এগিয়ে গিয়ে নিজের বন্ধু জিহান তালুকদারের সামনে হাত ধরে ফেললেন।
“এই হচ্ছে বিশ্বাস… আমি হয়তো তোকে বিশ্বাস করতে পারিনি। ভুল করেছি। কিন্তু শুধুমাত্র একটা অবিশ্বাস শব্দের জন্য আমি আমার এত বছরের বন্ধুত্ব হারাতে চাই না।”
জিহান তালুকদার কিছুক্ষণ চুপ করে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। জাওয়াদ খানের গলা ভারী হয়ে এল।
“ ক্ষমা করে দে ভাই। দূরে থাকা সহজ… কিন্তু এত বছরের সম্পর্ক নষ্ট করা খুব কষ্টের।”
মুহূর্তের মধ্যেই দুই বন্ধুর হাত শক্ত হয়ে জড়িয়ে গেল।
চারপাশে উপস্থিত সবার চোখ ভিজে উঠল।
নাভান নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠল–
” আমি পেরেছি আল্লাহ, আমি সবার মান অভিমান ভাঙাতে পেরেছি!
জাওয়াদ খান হালকা হেসে বললেন—
“ আজ থেকে পুরোনো সব হিসাব শেষ। রাগ মুছে ফেলব, অভিমান মুছে ফেলব… কিন্তু নিজের মানুষগুলোকে কখনো মুছে ফেলব না জীবন থেকে ।”
জিহান তালুকদারও কান্না মিশ্রি হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে বললেন—
“বউদের ছাড়া জীবন চলে না ভাই… যত ঝগড়াই হোক, দিনের শেষে শান্তিটা তো ওদের কাছেই।”
অধীর সবার সামনে চোখ মুছতে মুছতে বলে উঠলো —
“ তাহলে আবার বিয়ে হবে নকি?”
সাথে সাথে জাওয়াদ খান হেসে উঠে বললেন—
“ হবে! তবে নতুন কাউকে না… আবার নিজের বউকেই বিয়ে করব!
এতক্ষণ অধীরের নাকের পানি চোখের পানি এক হয়ে গেছে এমন করুন দৃশ্য দেখে। মজাও পেয়েছে, বাবা মাকে মিলতে দেখে তার তো এখন লুঙ্গি ড্যান্স দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সে তো লুঙ্গি পড়তে জানে না। শত মনের আশা ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা মুহূর্তে বাতিল হলো।
আর নাভান?
সে ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ফেলল।
তার ঠোঁটের কোণে কষ্টের একটা হাসি ফুটে উঠল।
হয়তো সে আজ সবাইকে একটা জিনিস বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল — বির বির করে বলে –
** রাগ,অভিমান মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়।
কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা… হাজার দূরত্বের পরেও অন্য কাউকে জায়গা দিতে পারে না**
চারপাশের আবেগময় পরিবেশটা তখনো পুরোপুরি শান্ত হয়নি।
হলের ভেতর যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা… কেউ চোখ মুছছে, কেউ গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। বহু বছরের জমে থাকা অভিমান, কষ্ট আর ভুল বোঝাবুঝিগুলো যেন একসাথে গলে পানির মতো ঝরে পড়ছে আজ।
সবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নাভান আবার মাইক্রোফোনটা হাতে তুলে নিল।
তার মুখে আগের মতোই সেই গম্ভীর ভাব, চোখে অদ্ভুত স্থিরতা।
“ আপনাদের কাজ আপাতত শেষ। লাইট, ক্যামেরা সব নিয়ে চলে যান। আর বাইরে যারা অপেক্ষা করছে তাদের ভেতরে পাঠিয়ে দিন।
কথাটা শুনেই পুরো হলজুড়ে আবার ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। হেরা হতভম্ব হয়ে চারপাশে তাকালো।
মানে…
” এরা আসল মিডিয়ার লোকইনা?
সৃজন,অধীর,ঝিনুক,তুষার হাসলো,আর হেরার মাথায় যেন এক ঝটকায় সব পরিষ্কার হয়ে গেল।
পুরো ঘটনাটা সাজানো ছিল!
নাভান শুরু থেকেই তাদের সবাইকে এক জায়গায় আনার জন্য এই নাটকটা করেছে! তার বাবা-মায়ের ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর জন্য…
বছরের পর বছর জমে থাকা দূরত্ব মুছে ফেলার জন্য…
আর হেরা সে না বুঝেই কত কিছু বলে ফেলেছে! একটা থাপ্পড় ও দিয়ে দিয়েছে! হেরা ঠোঁট কামড়ে নিচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। নিজের উপরই রাগ হচ্ছে তার।
ঠিক তখনই রুশা পাশে এসে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো—
“এবার বুঝছিস তো, কী করেছিস তুই?”
অধীর পাশ থেকে মুখ টিপে হেসে বলে উঠলো—
“ আরেহ! গালে তো ব্লাশন স্টিকার এখনো লেগে আছে! এতো জোরে কিভাবে মারলে কিউটি পাই বনু ভাবি!
সাথে সাথে চারপাশে চাপা হাসির শব্দ উঠলো।
হেরা চোখ বড় বড় করে নিজের হাতের দিকে তাকালো। তারপর দাঁত চেপে মনে মনে নিজেকেই গালি দিল।
“ আরেকটু বন্ধুদের মত অপেক্ষা করলে কি হত? সব দোষ এই মুখের আর হাতের। বেশি চলে সব সময় , ইস কি হবে এখন!
রোজ কটমট চোখে তাকিয়ে কোমরে হাত দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠলো—
” তুই আমার চকলের হিরো ভাই কে মারলি শালি! একটু ধৈর্য নাই।
হেরা এবার মুচকি হেসে আরো আগুনে ঘি ঢাললো—
” আরে আমি কি জানতাম নাকি উনি সব দান উল্টে দিবে। সবই তো সত্যি ভেবেছিলাম। কিন্তু উনি যে এত নাটক বাজ কে জানতো? আমাকে আগে একটু বললে কি হতো? আমিও তো তাদের মেয়ে তাই না, আমারও তো জানার অধিকার আছে।
রোজ ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল—
“ কিছু সম্পর্ক জোর করে ভাঙা যায় না। শুধু মানুষকে সত্যিটা বুঝতে একটু সময় দিতে হয়।
তার গম্ভীর কণ্ঠ শুনে হেরা চুপ হয়ে গেল।
এমন সময় জিহান তালুকদার ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। তার চোখ ভেজা।
নাভান মাইকে আবার বললো—
“ আর গাজীপুরের যেসব সম্পত্তি আছে… সেগুলো আমার ছোট বাবার নামে উইল করে দিন। এখানে কাগজ পত্র আছে।
কথাটা শুনেই সবাই অবাক হয়ে গেল।
জিহান তালুকদার অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে রইলেন নাভানের দিকে। তারপর এক ঝটকায় নাভানকে জড়িয়ে ধরলেন। গলাটা কেঁপে উঠলো তার।
“ ভাগ্নে… তুই এত বড় হয়ে গেলি কবে?
নাভান মৃদু হেসে কানে কানে বললো—
“এখন কিন্তু আর ভাগ্নে বলা যাবে না… আমি কিন্তু তোমার মেয়ের জামাই। একটু সম্মান দিয়ে ডাকবেন, শশুর মশাই।
নাভান এবার হাত তুলে সবাইকে শান্ত করলো।
“ আর হ্যাঁ…আংকেল আন্টিদের ধন্যবাদ। এরা আমার কলেজের প্রফেসর। পুরো প্ল্যানটা সফল করতে অনেক সাহায্য করেছেন।
সবাই সাথে সাথে তাদের দিকে তাকালো। নাভান আবার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলো—
“ তোমরা সবাই ভুল বুঝেছিলে। এখানে কোনো আসল মিডিয়া নেই, সবই আমার ছেলে পেলে। এখানে যেসব লোক আছে, তারা সবাই আমাদের পরিচিত মানুষ। আজকের অনুষ্ঠানটা কাউকে ছোট করার জন্য না…”
সে একবার নিজের বাবা-মায়ের দিকে তাকালো।
তারপর শান্ত গলায় বললো—
“যেদিন আমাদের পরিবারটা ভেঙে গিয়েছিল… ঠিক সেই দিনটাকেই আমি আবার নতুন করে বেছে নিয়েছি। কারণ কিছু তারিখ শুধু কষ্টের স্মৃতি হয়ে থাকতে নেই… সেই তারিখকে নতুন সুখও দিতে হয়।
চারপাশ নিস্তব্ধ।
কারো মুখে কোনো কথা নেই।
নাভান আবার বললো—
“ আজ কোনো ডিভোর্স অনুষ্ঠান না। আজ আমাদের পরিবারের সুখ ফিরে আসার দিন।”
হেরা এবার চোখ মুছলো চুপচাপ।
রোজ তার কাঁধে মাথা রেখে ফিসফিস করে বললো—
“তোর ওই অসভ্য অহংকারী গিটার ওয়ালা হিরোটা কিন্তু সত্যি সত্যিই সিনেমার নায়ক।
নাভান সবার দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো বললো—
“তো সবাই রেডি হয়ে যান… আজকে কেউ মন খারাপ করবে না। সবাই আনন্দ করুন।
ঠিক তখনই—
“এক মিনিট! এক মিনিট!
সবাই এত কান্নাকাটি বন্ধ করেন প্লিজ!
হঠাৎ করেই অধীর মাঝখানে ঢুকে পড়ল।
সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
অধীর দুই হাত কোমরে দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল—
“এত ইমোশন আমি আর নিতে পারতেছি না! আর পাঁচ মিনিট চললে আমি নিজেই কাউকে জড়িয়ে ধরে কাঁদা শুরু করে দিতাম!
চারপাশে হালকা হাসির শব্দ উঠল।
সৃজন মাথা নেড়ে বলল—
“ তুই আবার শুরু করলি?
অধীর সঙ্গে সঙ্গে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল।
“ না মানে দেখেন… এতক্ষণ যা দেখলাম, আমি অফিসিয়ালি ঘোষণা দিচ্ছি— এই পরিবারে ডিভোর্স হবে না। এখানে সর্বোচ্চ যা হবে তা হচ্ছে ‘রাগ করে তিনদিন কথা বন্ধ!’
সবাই এবার একটু হেসে ফেলল।
অধীর থামার ছেলে না। সে হঠাৎ করেই জাওয়াদ খান আর জিহান তালুকদারের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে দুইজনের হাত উপরে তুলে ধরল।
“দেখুন দর্শকবৃন্দ! বহু বছরের অবিশ্বাস, অভিমান আর ঝগড়ার পর… আজ আবার ফিরে এসেছে
বন্ধুত্ব ইউনিভার্স!
সৃজন কপালে হাত দিয়ে বলে—
“এই ছেলেটাকে কেউ থামাও।
অধীর সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—
“না থামাবেন না! আজকে আমার ভিতরের শিল্পী জেগে উঠছে!
তারপর হঠাৎ করেই চারপাশে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বলল—
“ আচ্ছা… এখন যেহেতু সবাই ঠিক হয়ে গেছে , তাহলে একটা লুঙ্গি ডান্স হয়ে যাক?
সবাই হতভম্ব। সৃজন চোখ কুঁচকে বলল—
“ লুঙ্গি পরে লুঙ্গি ডান্স দেয়, তুই তো পেন্ট পরেছিস।
অধীর নিচের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল।
তারপর অত্যন্ত দুঃখভরা গলায় বলল—
“এইটাই তো বুঝলি না ভাই… মনের ভিতরে লুঙ্গি আছে, কিন্তু শরীরে নাই!”
হটাৎ
সোফার উপর উঠে শার্টের দুই পাশ ধরে লুঙ্গির মতো নাড়াতে নাড়াতে বলতে লাগল—
“ও ও ও ও… লুঙ্গি ডান্স! লুঙ্গি ডান্স!”
ঝিনুক চিৎকার করে উঠল—
“ নাম নিচে! সোফা ভেঙে ফেলবি!
অধীর সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয়ভাবে ঘুরে বলল—
“বভাঙতে দে তুষার পাত এর বউ ! আজকে সম্পর্ক জোড়া লাগছে! একটা সোফা গেলে যাক!
এদিকে জাওয়াদ খান হাসতে হাসতে বললেন—
“ এই ছেলেটারে বিয়ে দিলে বউ পালিয়ে যাবে।
অধীর সঙ্গে সঙ্গে বুক চাপড়ে বলে উঠল—
“ না বাবা ! আমার বউ পালানোর আগেই আমি তারে ধরে বলব— ‘রাগ করো, ঝগড়া করো… কিন্তু ডিভোর্স ইম্পসিবল!
এই কথা শুনে আবারও সবাই মুখ টিপে হাসলো।
মাইক হাতে নিয়ে অধীর তার বিখ্যাত গান গাইতে লাগলো —
ডিভোর্স পেপার রেডি ছিল…
কলমও ছিল হাতে…
শেষে দেখি দুইজন বসে…
সেলফি তুলতেছে সাথে…”
এত বছরে রাগ গলেছে…
অভিমান সব পালাইছে…
ডিভোর্সের সেই স্টেজটাই এখন…
বিয়ের মঞ্চ সাজাইছে…”
“ আগে ছিল— ‘তোমারে ছাড়ব!’
এখন বলে— ‘কোথায় যাও?’
আগে ছিল আলাদা রুম…
এখন আবার একই বালিশ চাও!”
“ ডিভোর্সের ডেট ক্যানসেল করে…
হইছে নতুন প্ল্যান…
একই মানুষরে আবার বিয়ে…
এইডাই আসল ভালোবাসার গান,,
পা টিপে টিপে করিডোর পার হচ্ছিল হেরা। চারপাশে ঝলমলে আলো, নিচতলায় অনুষ্ঠান নিয়ে হইহট্টগোল, হাসির শব্দ, মিউজিক—সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন উৎসবের রঙে ডুবে আছে। আর সেই সুযোগটাই নিতে চেয়েছিল সে। চুপিচুপি নাভানের রুমের সামনে এসে দরজার হাতলে হাত রাখতেই আচমকা একটা শক্ত টানে পুরো শরীরটা পিছনে সরে গেল।
“আহ—!
শব্দটা পুরোপুরি বের হওয়ার আগেই এক শক্ত পোক্ত হাত এসে তার মুখ চেপে ধরল। হেরা ভয়ে বড় বড় চোখে তাকাতেই দরজাটা ভেতর থেকে লক হয়ে গেল।
সাদা শার্টের বোতাম দুটো খোলা, চোখে অদ্ভুত তীব্রতা… আর ঠোঁটের কোণে সেই বিপজ্জনক শান্ত হাসি। যেন অনেকক্ষণ ধরেই অপেক্ষা করছিল।
হেরা কাঁপা কাঁপা চোখে তাকিয়ে
“উম… উম…” শব্দ করতে লাগল। বুকের ভেতরটা ধকধক করছে। এত কাছাকাছি নাভান, ছেলেটার গরম নিশ্বাস তার চোখে মুখে এসে লাগছে। নিচে এত শব্দ যে সত্যিই চিৎকার করলেও কেউ শুনবে না। নাভান ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিতেই হেরা হাঁপাতে হাঁপাতে বড় একটা নিশ্বাস নিল।
“ আ… আপনি আচমকা টান দিলেন কেনো?
নাভান কোনো উত্তর দিল না সঙ্গে সঙ্গে। শুধু ধীরে ধীরে আরও কাছে এগিয়ে এল। এতটাই কাছে যে হেরার পিঠ দরজার সাথে ঠেকে গেল। তারপর নিচু গলায় বলল—
“ তখন সবার সামনে থাপ্পড় মারলে কেন আমায়?
কথাটার ভেতর রাগ ছিল… কিন্তু সেই রাগের মাঝেও অদ্ভুত কোমলতা লুকিয়ে ছিল। হেরা থমকে গেল। চোখ নিচু করে ফিসফিস করে বলল—
“ আ… আসলে আমার ভুল হয়ে গেছে…”
“ ভুল?
নাভান মৃদু হেসে মাথা কাত করল।
“ আমি বলেছিলাম চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে। তুমি সেটা না করে সবার সামনে আমাকে থাপ্পড় মারলে?
সে একটু ঝুঁকে এল। তার কণ্ঠটা আরও ভারি হয়ে উঠল।
“এই শেহতাজ খান নাভানকে আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ে থাপ্পড় মারার সাহস তো দূর চিন্তা করার সাহস পায়নি। আর তুমি?
হেরা শুকনো ঢোক গিলল।
“ আমি বুঝতে পারিনি… সত্যি। আপনি আগে থেকে বললে আমি কখনো—”এমন করতাম না। তাই আমি সরি।
“ হুশশশ…”
নাভান তার ঠোঁটের সামনে আঙুল রাখল।
“এত সহজে মাফ পেয়ে যাবে ভাবছ?
হেরার বুক কেঁপে উঠল। ছেলেটার চোখ দুটো যেন তাকে গিলে খাচ্ছে। অথচ সেই দৃষ্টিতে অসম্ভব এক টান ছিল। ভয়ের মাঝেও কেন জানি বুকের ভেতর অন্যরকম কাঁপুনি উঠছিল। নাভান হঠাৎ তার দুই হাত নিজের হাতে আটকে কোমরের কাছে টেনে নিল।
“ আমায় মারার ফল তো তোমাকে ভোগ করতেই হবে, মিসাইল গার্ল ।
হেরা হকচকিয়ে গেল।
“ আমি তো সরি বলতে এসেছি ভাইয়া …”
“ আরেকটা ভুল।
“ জি?
” কি ভুল?
“ জামাইকে ভাইয়া বলছো ।
হেরা নাভানের হাত থেকে ছুটতে চাইলে কিন্তু পারল না।
নাভান ধীরে ধীরে তার গালের কাছে মুখ নিয়ে এল। এত কাছে যে হেরা চোখ বন্ধ করে ফেলল অজান্তেই।
“একটা না… দুই দুইটা অপরাধ করেছ তুমি।
তার গরম নিশ্বাস হেরার গালে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। পুরো শরীর শিরশির করে উঠল তার।
“ আমার কান, গাল লাল করেছো।
নাভান আলতো করে হেরার থুতনি ধরে উপরের দিকে তাক করালো।
“এখন আমি তোমার গাল লাল করব।”
হেরা কাঁপা গলায় বলল—
“ কি! কীভাবে…?”
নাভানের ঠোঁটে ধীর, দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।হেরা ভাবছে তাকেও বোধহয় থাপ্পর মারবে অসভ্য গিটার ওয়ালা। এখন এখানে আসাটাই ভুল মনে হচ্ছে। অপরাধ করেছে তার জন্য ক্ষমা চাইতে এসেছে। কিন্তু না এই লোক তো ক্ষমা চাওয়ার যোগ্যতাই রাখেনা, তাকে এখন থাপড় দিয়ে গাল লাল করে দেবে। সে তো তার ভুলটা বুঝতে পেরেছে তার জন্যই তো এসেছে । ভয়ে হেরার গলা শুকিয়ে যায়। নাভানের মারামারি সম্পর্কে তার ধারনা আছে। সে যাকে মারে এক সাপ্তাহ থাকতে হয় তাকে হসপিটালে। যদি তাকে একটা থাপ্পড় মারে তাহলে মিনিমাম একমাস থাকতে হবে হসপিটালের বেডে। কেঁপে ওঠে হেরা। নাভান মৃদু হেসে বলে __
“ ইউনিক ভাবে।
পরের মুহূর্তেই হেরা অনুভব করল—নাভান তার গালে মুখ ডুবিয়ে দিয়েছে। একটা নরম কামড়।
খুব জোরে না… কিন্তু এত ধীরে, এত গভীরভাবে যে পুরো শরীর কেঁপে উঠল তার। নাভান ইচ্ছে করেই অনেকক্ষণ গালটা নিজের ঠোঁটের মাঝে আটকে রাখল। যেন শাস্তির চেয়ে বেশি আদর দিচ্ছে।
হেরা চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার আঙুলগুলো অজান্তেই নাভানের শার্ট খামচে ধরেছে।কি হলো তাৎক্ষণিক কিছুই বুঝতে পারল না। একটা যুবক ছেলের স্পর্শ একটা যুবতী নারী ছটফটিয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। তাও যদি হয় হালাল সম্পর্ক। হেরা বারবার কেঁপে উঠছে নাভানের এমন স্পর্শে। ধাক্কা দিয়েও সরাতে পারলো না নাভানকে। নাভান গভীরভাবে আরো স্পর্শ করতেই, হেরা ছটফটিয়ে উঠে, নাভানের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে অক্ষম হয় । অসভ্য গিটারওয়ালা না ছাড়লে সে কোনভাবেই ছাড়া পাবেনা। এটা হেরা ভালই বুঝতে পারে । গাল ছেড়ে নাভান যখন মুখ তুলল, তখন হেরার নিঃশ্বাস এলোমেলো। তার গালটা সত্যিই টকটকে লাল হয়ে গেছে। নাভান সেটা দেখে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে হেরার কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“এভাবে ভয় পেলে তোমাকে আরও বেশি কাছে টানতে ইচ্ছে করে মিসাইল গার্ল।
হেরার বুক কেঁপে উঠল। নাভান এবার তাকে আরও কাছে টেনে নিল। এতটাই কাছে যে দুজনের হৃদস্পন্দন যেন এক হয়ে গেল। নিচে তখনও অনুষ্ঠান চলছে…
হাসির শব্দ, মানুষের কোলাহল, মিউজিক— নাভানের ভারী নিশ্বাস। নাভান ধীরে ধীরে নিজের হাতটা হেরার কোমরে রাখল। শক্ত করে না… কিন্তু এমনভাবে, যেন সে চাইলে আর এক ইঞ্চিও দূরে যেতে পারবে না
পরের মুহূর্তেই নাভানের আঙুল তার থুতনিতে ছুঁয়ে ধীরে ধীরে মুখটা ওপরে তুলল। চোখে চোখ পড়তেই হেরার বুক কেঁপে উঠল। সেই চোখে আজ অন্যরকম কিছু আছে। অধিকার। আসক্তি। আর গভীর এক ভালোবাসা, যেটা মুখে না বললেও স্পষ্ট বোঝা যায়।
“জানো…” মিসাইল গার্ল।
নাভান ফিসফিস করে বলল_
“তুমি যখন আমায় মারলে, রাগের চেয়ে বেশি ভালো লেগেছিল।”
“ভা… ভালো?”
“ হুম।”
সে হেরার আরও কাছে এল।
“ কারণ ওই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল… তুমি শুধু আমার উপরই এত অধিকার দেখাতে পারো।”
হেরার নিশ্বাস কেঁপে উঠল। নাভান শেষে সেই কামড় দেওয়া গালের কাছেই ঠোঁট থামিয়ে ফিসফিস করল—
“এই গালটা আমার।”
হেরা চোখ বন্ধ করে ফেলল। নাভান এবার আর নিজেকে আটকাতে পারল না। আলতো করে তার গালে দাঁত বসাল আবার। এবারও খুব আস্তে… কিন্তু আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে। হেরা অনিয়ন্ত্রিতভাবে নাভানের শার্ট আঁকড়ে ধরল।
“অ অ অসভ্য গিটার ওয়ালা!
তার কাঁপা ডাক শুনে নাভানের বুকের ভেতরটা যেন আরও নরম হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে হেরার দিকে তাকাল। গালটা পুরো লাল হয়ে গেছে। নাভান মুগ্ধ হয়ে হেসে ফেলল।
“ পারফেক্ট…”
তারপর হঠাৎ করেই হেরাকে কোলে তুলে নিল।
হেরা চমকে উঠে দুহাতে নাভানের গলা জড়িয়ে ধরল।
“ কি করছেন!”
“ শাস্তি এখনো শেষ হয়নি।”
নাভান তাকে নিয়ে ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু সেই দুষ্টু হাসির মাঝেও তার স্পর্শে ছিল অদ্ভুত যত্ন। যেন খুব মূল্যবান কিছু আগলে রেখেছে।
বিছানায় বসিয়ে দিয়ে সে হাঁটু গেড়ে হেরার সামনে বসে পড়ল। তারপর হেরার হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে খুব আস্তে চুমু খেল।
“আজ থেকে…এই হাত শুধু আমার উপরই অধিকার দেখাবে।
সে গভীর গলায় বলল–
হেরা ভয় লজ্জা সংকোচে চোখ নিমিয়ে ফেলেছে কিছু বলতে পারেনা। এই লোকটার সামনে আসলে যতই নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুক না কেন, এই অসভ্য গিটার ওলার স্পর্শের সব কিছু ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। কি হয় সে নিজেও জানে না, নিজের উপর নিজেই তখন যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে ।
আর নাভান ধীরে ধীরে তাকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে চোখ বন্ধ করল। বাইরে তখনও অনুষ্ঠান চলছে…
আর এই রুমের ভেতর দুটো হৃদয় নিঃশব্দে একে অপরের আরও গভীরে ডুবে যাচ্ছিল।নাভানের এমন হালকা ভাবে জড়িয়ে ধরায় হেরা স্তব্দ হয়ে যায়। এরপর তার সাথে কি হচ্ছে সে যেন কিছুই বুঝতে পারছে না হেরা। স্তব্ধ হয়ে শুধু নাভানের কাজকর্ম দেখেই যাচ্ছে কথা বলার ভাষা সে হারিয়ে ফেলেছে। মনে হচ্ছে কেউ তাকে বস করে নিয়েছে। জড়িয়ে রাখা অবস্থায় নাভান হেরার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে ওঠে—
” তুমি আমার উপর অধীকার খাটাবে সবার সামনে। আর আমি এই চার দেয়ালে তোমার উপর অধীকার খাটাবো। হিসাব ক্লিয়ার।
বন্ধ রুমটার ভেতর তখন নিঃশব্দ এক অনুভূতির ঝড় চলছিল। বাইরে থেকে দেখলে হয়তো মনে হতো দুজন মানুষ শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। অথচ ভেতরে ভেতরে একজন নিজের সমস্ত অনুভূতি উজাড় করে বোঝাতে ব্যস্ত, আর অন্যজন সেই অনুভূতিগুলো বুঝেও না বোঝার দেয়াল তুলে রেখেছে।
নাভান বারবার তাকে নিজের কাছে টেনে নিচ্ছিল।
এমনভাবে, যেন দূরে সরে যাওয়ার কোনো অধিকারই নেই হেরার ।
তার চোখে স্পষ্ট ছিল চাপা ভালোবাসা, অস্থিরতা আর হারিয়ে ফেলার ভয়।
নাভান প্রকাশ করতে না পারলেও স্পর্শে বুঝিয়ে দিতে চাইছিল—
“তোকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ।”
আর হেরা ? সে প্রতিটা অনুভূতি বুঝতে পারছিলো ।
তার বুকের ভেতরও একইরকম ঝড় উঠছিল একইরকম দুর্বলতা কাজ করছিল। তবুও সে সহজে হার মানতে চাইছিল না। ইচ্ছে করেই চোখ সরিয়ে নিচ্ছিল, নিজেকে শক্ত দেখানোর চেষ্টা করছিল।
কারণ ভালোবাসার কাছে হেরে গেলে অভিমানগুলো আর বেঁচে থাকে না।
কিন্তু নাভান থামার মতো ছিল না।
সে আরও কাছে টেনে নিচ্ছিল তাকে, যেন নিজের হৃদস্পন্দন শুনিয়ে বোঝাতে চায়— কিছু অনুভূতি মুখে বলতে হয় না, কাছের মানুষ ঠিকই বুঝে যায়।
আর সেই নীরব মুহূর্তগুলোতে,
হেরার সব না বুঝার অভিনয় ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছিল…কারণ যতই দূরে থাকার চেষ্টা করুক,
হেরার পুরো মনটাই অজান্তে সেই মানুষটার দিকেই ঝুঁকে পড়ছিল।
নাভানের রুম থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকেই হেরার অবস্থা কেমন যেন অদ্ভুত হয়ে আছে।
চোখ-মুখে একরাশ অন্যমনুস্কতা… ঠোঁট কামড়ে কী যেন ভাবছে আর একের পর এক ফ্রিজের ঠান্ডা পানি খেয়ে যাচ্ছে।
এক গ্লাস…দুই গ্লাস…তিন গ্লাস…
এতক্ষণে পেট ফুলে একদম ঢোল হয়ে গেছে, তবুও থামার নাম নেই। সামনে বসে থাকা রোজ আর রুশা প্রথমে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। পরে দুজনের চোখই ধীরে ধীরে চিকন হয়ে এলো। সন্দেহভরা দৃষ্টি গিয়ে আটকালো হেরার মুখে। রোজ সামনে রাখা আইস বক্সটা সরিয়ে নিয়ে বিরক্ত গলায় বলল—
“ কি ব্যাপার হেরা পাখি? এত ঠান্ডা পানি খাচ্ছিস কেন? এমনিতেই তোর ঠান্ডায় এলার্জি। একটু পরেই হাঁচি দিতে দিতে বাসা মাথায় তুলবি।
হেরা কোনো উত্তর দিল না। সে যেন এখানেই নেই।
মনটা এখনও আটকে আছে কিছুক্ষণ আগের সেই মুহূর্তে… নাভানের কাছে… তার চোখে… হেরার আচরণে…
রুশা এবার আর চুপ থাকতে পারল না। কোমরে হাত রেখে ধমকের সুরে বলল,
“ কি হচ্ছেটা কি তোর? ভুলে গেছিস তোর বরফে এলার্জি? একটু পর শ্বাসকষ্ট শুরু হলে কিন্তু তখন কাঁদবি!
তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। হেরা শুধু গ্লাসটা ঠোঁটে ছুঁইয়ে বসে রইল। মনে মনে সে এখনও নাভানকেই গাল দিচ্ছে।
“ উফফ! এই লোকটা আসলে মানুষ না শয়তান! বাইরে থেকে এমন ভাব করে যেন ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানে না… অথচ আড়ালে? একেবারে ভাজা মাছের লেজ সহ বর্তা করে খেতে জানে। লুচ্চার হাড্ডি! এমনভাবে কাছে টানছিল যেন… যেন…”
এতটুকু ভাবতেই নিজের কান গরম হয়ে উঠল হেরার।
“ ধুর! আমি আবার এসব কি ভাবছি!”
রোজ আর রুশা দুজনেই আরেকবার তাকাল হেরার দিকে। তারপর বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল।রোজ ফিসফিস করে বলল—
“এই মেয়ে আজকে মনে হয় ধ্যানে বসেছে।
রুশা হেসে উত্তর দিল,
“ ধ্যান না, অন্য কিছু হয়েছে। চোখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে।”
দুজনেই চলে গেল। অথচ হেরা এখনও একই জায়গায় বসে। হাতে ঠান্ডা পানির গ্লাস। চোখে অন্যমুনস্কতা। আজকের অনুষ্ঠানটাই যেন সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। কেউ কল্পনাও করেনি নাভান সবার সামনে রোজকে নিজের বোন বলে পরিচয় করিয়ে দেবে।
মুহূর্তটার পর থেকেই রোজের চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছিল। রোজ একটা কথা বলেছিলো তখন-
” ভাই এর মর্যাদা মরার আগ অব্দি যাতে রক্ষা করতে পারি আমি।
এডভোকেট এম. এল. এ কাজল খান পর্যন্ত চুপচাপ ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তার চোখেমুখে স্পষ্ট গর্ব। ছেলেটার মন এত বড়… এতটা আগলে রাখতে জানে সবাইকে… সবাই শুধু নাভানের দিকেই তাকিয়ে ছিল। এত বড় একটা অনুষ্ঠান সে কী সুন্দরভাবে সামলে নিল! অথচ হেরার মাথায় তখন অন্য যুদ্ধ চলছে। সে এখনও বুঝে উঠতে পারছে না—
এই গম্ভীর, রাগী, কম কথা বলা মানুষটা এমন।
আর সেই ভাবনার ফলেই বেচারি একের পর এক ঠান্ডা পানি খেয়ে যাচ্ছে। এদিকে অনুষ্ঠান শেষ। অতিথিরা চলে গেছে। বাড়িটাও ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এসেছে।
কিন্তু হেরা? সে এখনও সোফায় বসে ধ্যানমগ্ন সাধুর মতো গ্লাস হাতে নিয়ে আছে। দূর থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল নাভান। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। হেরার কাছে এসে ফিসফিস করে বলে ওঠে-
“এতক্ষণেও মাথা থেকে আমি নামিনি বুঝি?
তাও হেরা চুপ। নাভান এবার চুপচাপ রান্নাঘরের দিকে গিয়ে একটা বোতলে বরফ পানি ভরে নিয়ে আসে । তারপর নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল হেরার পেছনে। হেরা তখনও নিজের জগতে ডুবে—
“ না না… ওইভাবে কাছে টানা উচিত হয়নি… কিন্তু… উফফ…”
ঠিক তখনই— ঝপাৎ! বরফ ঠান্ডা পানি পুরো মাথার উপর ঢেলে দিল নাভান। ঠান্ডার শকে হেরা প্রায় লাফিয়ে উঠল।
“ আআআআ!!!
চোখ-মুখ কুঁচকে পুরো ভিজে একাকার হয়ে গেল সে।
কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারল না কি হয়েছে।
তারপর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নাভানকে দেখে চোখ বড় বড় হয়ে গেল। নাভান দুই হাত বুকের কাছে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটে সেই বিরক্তিকর সুন্দর হাসি।
“এত গরম লাগছিল তোমার ? ভাবলাম একটু ঠান্ডা করে দিই।
হেরা হাঁ করে তাকিয়ে রইল। মুখ খুলে কিছু বলতে যাবে—
“ আপনি একটা—”
কথাটা শেষ করার আগেই নাভান আরও ঝুঁকে এল।
এতটাই কাছে… যে হেরার নিঃশ্বাস আটকে গেল। নাভান নিচু গলায় বলল,
“ কি আমি?”
হেরা তোতলাতে লাগল।
“ আ… আপনি… মানে… আপনি একটা…”
নাভানের ঠোঁটের হাসিটা আরও গভীর হলো।
“ বলতে পারছ না কেন?”
হেরা এবার দাঁত চেপে বলল,
“ দূরে যান!”
“ যাব না।”
“ কেন?”
নাভান ধীরে ধীরে আরও ঝুঁকে এলো। তার ভেজা চুলের ডগা থেকে টুপটাপ পানি পড়ছে। আর সে মুগ্ধ চোখে হেরার রাগী মুখটা দেখছে। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
“তোমাকে জ্বালাতে ভালো লাগে।”
হেরার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। এই লোকটা ইচ্ছে করেই এমন করে। ইচ্ছে করেই তার মাথা এলোমেলো করে দেয়। হেরা রাগ দেখিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিতেই নাভান হঠাৎ তার ভেজা চুলের একগুচ্ছ আঙুলে পেঁচিয়ে নিল।
“ আর ঠান্ডা পানি খাবে?”
হেরা চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ খাব! আপনার কি?”
নাভান মুচকি হেসে আরও কাছে এলো।
“ আমার অনেক কিছু।”
“খুব তো হট হয়েছিলে !
করে দিলাম ঠান্ডা। যদিও ভাবতেই পারিনি, এক বোতোল পানি ঢালতেই এত দ্রুত কুল হয়ে যাবে তুমি ”
নাভানের ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসি।
ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে হেরার গায়ে। রাগে তার গাল লাল হয়ে আছে। চোখ দুটো জ্বলছে আগুনের মতো।
“ আপনি একটা অসভ্য! জানেন আপনি?
নাভান ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল।
“ আর অসভ্য আমি না… তোমার effect-টা অসভ্য। My touch makes you hot, remember!
হেরা বিরক্তিতে দাঁত চেপে তাকাল।
“ আপনার নিজেকে কি মনে হয়?”
“Dangerously handsome.”
“ ধুর!
নাভান হালকা হেসে মাথা কাত করল।
“ Seriously though… এত রাগলে তোমাকে extra হট লাগে। আমি সিডিউস হয়ে যাই। এই একেবারে যুদ্ধ করার মিসাইল এর মতো!
হেরা এবার সত্যিই কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পাশ থেকে কাশির শব্দ ভেসে আসে। তৌহিদা জিহান ভ্রু তুলে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছেন।
“ কিরে মা? পানি কেন? এই অবস্থা হলো কিভাবে তোর ?”
হেরা এক মুহূর্তে চুপ। নাভান একদম নির্বিকার মুখে হাত পকেটে ঢুকিয়ে দাঁড়াল।
“Nothing, পিপি মনি। তোমার মেয়ে একটু over react করছিল, তাই আমি পানি মাথায় দিয়ে so I helped.”
“হেরা অবিশ্বাসে তাকায়।
তৌহিদা জিহান সন্দেহভরা চোখে দুজনের দিকে তাকিয়ে আবার বলেন—
“ মাথা মুছে নিস। ঠান্ডা লাগবে কিন্তু।”
“ওকে পিপি মনি।
নাভান ভদ্র ছেলের মতো মাথা নাড়ল।
তারপর হেরার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে ফিসফিস করল,
Everyone cares about you… I just care a little more. That’s why I cooled you down. মিসাইল গার্ল!
হেরা চোখ বড় বড় করে তাকায়।
“একদম নাটক করবেন না।”
“উফফ মিসাইল গার্ল , I don’t do drama. I do action.”
“অসভ্য কোথাকার!
নাভান মুচকি হেসে দেয়।
“Yet you keep talking to me.!
রাগে, লজ্জায়, বিরক্তিতে হেরা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। গটগট করে হেঁটে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। পেছনে দাঁড়িয়ে নাভান হালকা হেসে মাথা নাড়ল।
“ হট মিসাইল গার্ল।
নাভানের গম্ভীর personality-টা সবার সামনে বরফের মতো ঠান্ডা। সবাই তাকে ভয় পায়, respect করে। কথাবার্তা কম, চোখে সবসময় একরকম attitude। কিন্তু হেরার সামনে এলেই যেন ছেলেটা বদলে যায়। নির্লজ্জের মতো কথা বলে, আগে তো করেনি মনে মনে ভাবে। নাভানের এমন করার কারণটা হচ্ছে এখন সমস্ত চাপ মাথা থেকে মুক্ত হয়েছে একটু রিলেক্স, সবাইকে এক করতে পেরে। এখন ঠিকঠাকমতো নিজের আয়ত্তে হেরাকে নিতে পারলেই তার জীবনের সব পাওয়া হবে। কিন্তু একটা কারণে হেরাকে আগে কিছু বলতে পারে নি নাভান। হেরা কে জবর দোস্তি করে নয় মোহ মায়ায় ফেলে নিজের করে নেবে নাভান এই তার বিশ্বাস । আর এর জন্য হেরার এত কাছে খুব করে আসে। এখন তো একই বাসায় থাকবে তারা প্রতিদিন জ্বালাতে পারবে। এতে দুজন দুজনকে আরো গভীরভাবে চিনবে জানবে। এমনি যে হেরার তার প্রতি স্ফট – কর্ণার আছে বুঝতে পারে নাভান। এখন নিজের মুখে স্বীকার করলেই হলো, বিয়ে মানলেই হলো।
কাজল ভিলা আজ আনন্দে ভরে গেছে।
রোজ আর রুশা এ বাড়িতে তাদের সাথে থাকবে কাঠ-খাট গলায় বলে দিয়েছে জাওয়াদ খান ও নাভান।
অধীর তো খুশিতে প্রায় পাগল। বারবার গুনগুন করে গান গাইছে–
“ কি আনন্দ আকাশে বাতাসে…”
সৃজন সোফায় বসে হেসে বলে,
“ ভাই, একটু থামবি? তোর হাসি দেখে মনে হচ্ছে লটারি জিতছিস।
অধীর মুখে হাত বুলিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,
“ এর থেকেও বড় কিছু পেয়েছি। আমার লাল গোলাপ এখন আমার কাছেই থাকবে।
রুশা লজ্জায় কুশন ছুঁড়ে মারে তার দিকে। সৃজন দাতে দাত চেপে বলে–
” অই গোলাপি হবে। গোলাপ তো আমার!
কি বললি তুই? শালা! বোন হয় তোর এখন!
” আরে এই অধীর কিছু মিস করে না। বোন হয় সেটা মানি তবে ভাবি ও হয় কিন্তু । তাই দেবর হয়ে ভাবির সাথে একটু আরেকটু যায় আর কি।
” শালা দাড়া!
” আরে দুলাভাই আমার খেপছে রেএএএ!
বলে যেই উঠতে যাবে তখন আবার ধাক্কা খায়। চেয়ে দেখে নাভান পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪৭
” এই রে এ,,,, দেখি বড় দুলাভাই।
নাভান ভ্রু কুচকে তাকায় সৃজিন কুশান নিয়ে ঢিল দেয় অধীরকে সবাই হেসে ওঠে। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আসলে শান্তি।
সবাই কাছাকাছি আছে… এটাই যেন সবচেয়ে বড় পাওয়া। আর দূরে সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে এডভোকেট কাজল খান নিজ স্বামীর বুকে মাথা দিয়ে চুপচাপ দেখছিলো। নাভান উপরে উঠতে উঠতে হেরার রুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখে সেই গম্ভীর ভাবটাই আছে। কিন্তু ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা হাসিটা বলে দিচ্ছে—হেরাকে জ্বালাতে পেরে সে খুব খুশি
