প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২১
Sadiya Jahan Simi
ভালোবাসা আজ বন্য
কোনো কথা শোনে না
নিঃশ্বাসে যেন চাতকের
বুক ভাঙ্গা বাসনা
স্বপ্নের মতো হানা দেয়
এ মনের কামনা
নিজেকেই দেখে লাগে আজ
অচেনা, অচেনা, অচেনা
বাতাসে গুনগুন ~
তৃষ্ণা এতো তৃষ্ণা
প্রেমে হয়নি যে আগে
উতল করো আমায়
আজ অন্য সোহাগে
এ কোথায় ভেসে চলেছি
নিজে আজ জানি না
চাওয়া পাওয়া যেন
আজ কিছুতেই মেটেনা
স্বপ্নের মতো হানা দেয়
এ মনের কামনা
নিজেকেই দেখে লাগে আজ
অচেনা অচেনা অচেনা ~
বাতাসে গুনগুন
এসেছে ফাগুন
বুঝিনি তোমার
শুধু ছোঁয়ায়
এতো যে আগুন ~
“কিসের কামনা?” পেছন থেকে বলে উঠলো উদ্যান।
রাফসা আওয়াজ পেয়ে পেছনে ঘুরে তাকালো। উদ্যান কে দেখে ভালো লাগাটা মুহূর্তে বিলীন হয়ে যায়।এসে ভর করে এক রাজ্য বিরক্তি। গতকালই মেহমান চলে যাওয়ার পর উদ্যান বাড়ি ফিরবে বলে জেদ ধরে। সবাই মিলে অনেক বুঝিয়েছে আজকের একটা রাত থেকে যেতে।কিন্তু উদ্যান নিজের কথার কোন নড়চড় করেনি। চলে যাবে মনে যাবেই। কেউ ধরে বেধেও রাখতে পারবেনা। রোহান জায়িন জারা ঊষা সবাই থাকতে চাইলেও রাফসা নিশ্চুপ ছিল। আজকাল কোনো চাওয়া পাওয়া নেই।পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। জোহরা মির্জা আকুতি মিনতি করে ও ধরে রাখতে পারেনি উদ্যান কে। মিমের বিয়ে ঠিক হয়েছে। প্রায় দেড় মাস পর।ডেট এখনো কনফার্ম হয়নি। এক মাস পর পরীক্ষা শুরু হবে। এখন এতো তাড়াহুড়ো করে আয়োজন করা সম্ভব নয়।মিম প্রথম মেয়ে পরিবারের।সবারই শখ আহ্লাদ আছে।
কাল উদ্যান সারাটা সময় চোখ মুখ শক্ত করে রাফসার পানে তাকিয়ে ছিল। এই মেয়েটা এত অবাধ্য হয়েছে বলার বাইরে। রাফসাকে কিছু না বললেও ঊষাকে জারা কে ধমকেছে। মেয়ে নিয়ে গিয়েছে তারপর রুমে চলে যেত। দাঁড়িয়ে ছিল কেন। লোক এসেছিল প্রায় ১০-১২ জনের মত। সেখানে প্রায় ছয় জনই ছেলে ছিল। সৈকত সারাটা সময় রাফসার পানে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিল। মাইশা ঊষা উদ্যানের চোখের দিকে তাকায়নি তখন। তাকালে অবশ্যই মানে মানে কেটে পড়তো। এত কিছুর মাঝেও রাফসার ভুলবশত উদ্যানের সাথে একবার চোখাচোখে হয়ে যায়। উদ্যান চোখ রাঙিয়ে বুঝিয়েছিল রুমে যাওয়ার জন্য। কিন্তু রাফসা অনড় ছিল। দ্বিতীয়বার আর তাকানোর প্রয়োজন বোধ মনে করেনি। যেন উদ্যানের চোখ রাঙানি তুরি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে।
“কি হলো কথা বলছেন না কেন মিস?”
রাফসার ধ্যান ভাঙে উদ্যানের কথায়। রাফসা চায়না শত্রুতামি করতে।কিন্তু এই উদ্যান কে দেখলে গায়ে যেন আগুন ধরে যায়। রাফসা বিরক্ত চোখে তাকালো।
“মিস বলছেন কেন?”
উদ্যান নিষ্প্রভ কন্ঠে শুধায়, “তো কি বলবো, মিসেস? আপনার কি বিয়ে হয়েছে!মিস না বললে,কি বলব?”
রাফসা শান্ত চোখে তাকালো। ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল, “ছোট বোন ডাকবেন। আপনার মনে নেই বড় ভাই, একবার বলেছিলেন আমি আপনার ছোট বোনের মতো! নাম ধরে তুই করে ডাকবেন।”
উদ্যান থতমত খেয়ে গেল রাফসার কথায়।রাফসা হাসলো। উদ্যান তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে কপাল চুলকায়।জিভ দিয়ে ঠোঁটের অভ্যন্তরীণ অগ্রভাগ ভেজায়।উদ্যান ভাবলেশহীন ভাবে বলে উঠলো, “বলেছিলায় বোধহয়। মনে নেই আসলেই।”
রাফসা উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। সূর্য অস্ত যাওয়ার ভাব।আকাশে পাখিরদের আনাগোনা। ব্যস্ত পাখিরা ছোট্ট খড়ের ঘরে যাওয়ার জন্য ছোটাছুটি করছে। আকাশের পানে তাকিয়ে মৃদু স্বরে উদ্যানের উদ্দেশ্য বলে উঠলো, “আজ কত তারিখ জানেন?”
“উহুঁ? হুঁ, আটাশ তারিখ।কোন বিশেষ দিন আজ?”
রাফসা হাসলো। চোখের কোনে জল জমতে শুরু করেছে।
“না আজ সবসময়ের মতোই স্বাভাবিক দিন। কিন্তু আমার জন্য নয়।”
উদ্যান অবাক হয় রাফসার কথায়।মনে করার চেষ্টা করে আজ কি। উদ্যান ঢোক গিলে। কিছু বলার আগেই রাফসা বলে উঠলো।
“আজ অক্টোবরের আটাশ তারিখ। সবার জীবনের স্বাভাবিক দিন হলেও, আমার জীবনের সবচেয়ে করুন একটা দিন । সূর্য ডোবার আগ মুহূর্তের ঘটনা। জানেন এই দিনে আমি এক পুরুষকে আমার ষোড়শী মনের ভালোবাসার কথা জানিয়েছিলাম। তার বিনিময়ে কি পেয়েছিলাম জানেন?
অপমান লাঞ্ছনা এবং সব শেষে গায়ে হাত তোলা। শারীরিক গঠন নিয়েও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিল ।অনেক খোটা দিয়েছিল আমার কমতি নিয়ে। তাকে হাজার ধন্যবাদ জানাই। অবাক হবেন তাই না! এত কিছুর পরেও কেন ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সেদিন যদি ওই পাষান পুরুষ আমায় পুরোপুরি ভেঙে না দিত, আমি আজকের রাফসা কখনোই হয়ে উঠতাম না। কখনোই আমার জেদ এতটুকু হত না।
তাকে ধন্যবাদ জানাই। আজ তার জন্যই আমি এ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছি। তাকে কখনো অভিশাপ দিইনি। কিন্তু মনে খুব আফসোস ছিল। এতটা অপমান না করলেও তো পারতো। আমাকে বুঝিয়ে বলত। জানি ওই দিন আমায় হাজার বোঝালেও আমি কিছুই বুঝতাম না।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপমানেরও প্রয়োজন হয়। আমি সেদিন বুঝেছিলাম ।তাকে হারিয়ে প্রথম প্রথম আমার অবস্থা মানসিক রোগীতে পরিণত হয়েছিল। দিনরাত কাঁদতাম। কাঁদতে কাঁদতে আমার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে।এখন যদি ওই পুরুষ পৃথিবীর সব কিছুর বিনিময়ে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে চায় আমাকে। আমি নির্দ্বিধায় তাকে ফিরিয়ে দিব। যদিও জানি ,সে পুরুষ কখনোই আমায় চাইবে না। আজকের দিনটা আমার জন্য খুব স্পেশাল। আমার জীবনের স্মরণীয় একটি দিন। এ দিনের চেয়েও বেশি কেঁদেছিলাম ত্রিশে অক্টোবর। কেন জানেন? সেদিন পাষাণ পুরুষ এই দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। দেখেনি আমার আর্তনাদ ,আহাজারি। আমার চোখের পানির মূল্য সে দিতে পারেনি। ঐদিন আমি তার বোনের কাছে এই দুটো হাত তুলে তাকে ভিক্ষে চেয়েছিলাম। সবকিছুর বিনিময়ে তাকে চেয়েছিলাম। কখনো দুষ্টুমি করবো না বেয়াদবি করব না বলেছিলাম। তবুও পাষাণ পুরুষ ফিরে আসেনি আমার কাছে। সেদিন রাতের ওই আহাজারিতে বোধ হয় অনেক লোক কেঁদেছে। কখনো কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারিনি ’আমি ভালো নেই, এই কথাটা এক আমি ছাড়া দুনিয়ার কেউ জানে না’।
এত অপমান লাঞ্ছনার পরেও প্রায় কয়েক মাস আমি তাকে প্রতি মোনাজাতে চেয়েছি। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েও তাকে আমি চেয়েছি। সিজদায় লুটিয়ে তাকে আমি চেয়েছি। কিন্তু কখনো পাইনি, ভাগ্যে নেই ছেড়ে দিয়েছি। বাইরে যাওয়ার পরও সে একটা বারের জন্য আমার সাথে যোগাযোগ করেনি। সান্ত্বনা দেয়নি আমাকে। একটু একটু বড় হচ্ছিলাম তখন।নিজের ভালো বুঝতে শিখলাম। ভেতরে থাকা এক টুকরো সজীব অনুভূতি নিজ হাতে খুন করেছি। আটাশ অক্টোবর এবং এিশ অক্টোবর আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিন। যা আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনে রাখবো।”
অজান্তেই রাফসার বুক কেঁপে উঠলো কথাগুলো বলতে গিয়ে। যুদ্ধ করে টিকে থাকার সময়টুকু মনে পড়ে যায়। উল্টো ঘুরে থাকার ফলে উদ্যান রাফসার চোখের পানি দেখেনি।
রাফসা চোখ মুখ শক্ত করে এবার। সর্বোচ্চ স্বার্থপরতা মিশিয়ে বলল, “তার জানা উচিত একটা মানুষের ও কষ্ট হয়। অপমান করার আগে দশবার ভাবতে হয়।”
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২০
“তার মতো ব্যক্তিকে ভালোবেসেছিলাম ভাবতেও কেমন লাগে।তাকে আমি বহুবছর আগেই মুক্ত করে দিয়েছি।আর কখনোই ’ভালোবাসা’ নামক শব্দে নিজেকে জড়াতে চায়না।
“আমার মনের রাজ্য জুড়ে তার জন্য কেবল ঘৃণা বাঁচিয়ে রেখেছি। এই ঘৃণা কখনো শেষ হওয়ার নয়।”
উদ্যান ঢোক গিলে। কিছু বলতে চায়। কিন্তু মুখ ফুটে আওয়াজ আসেনি।

প্রয়াসির অনুরাগ পর্ব ২২ কই?