প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৫ (২)
Sadiya Jahan Simi
কেটে গেছে আরো দুটো দিন। এই দুটো দিন যেন শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় এগোয়নি, ভেতরের সময়টাকেও বদলে দিয়েছে। প্রতিটা ঘণ্টা, প্রতিটা মিনিট যেন আলাদা করে অনুভব করা গেছে রাফসা। অপেক্ষা, চাপ, আর এক অদ্ভুত অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে ওর দুটো দিন কেটেছে।
আজ সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন ,মেডিকেল পরীক্ষা। দীর্ঘ তিন বছরের জেদ। ভোরের আলোটা আজ অন্যরকম লাগছে রাফসার কাছে। জানালার পাশে রাখা পড়ার টেবিলটা, যেখানে অসংখ্য রাত জেগে পড়া হয়েছে। মেডিকেলের প্রিপারেশনের জন্য আজই বোধহয় শেষ পড়া।আজ নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বইগুলোর পাতা উল্টানোর শব্দ যেন এখনো বাতাসে ভাসছে, কিন্তু আজ আর নতুন করে কিছু পড়ার তাড়া নেই। বরং একটা শূন্যতা কাজ করছে ওর মাঝে।সবকিছু কি ঠিকমতো মনে আছে? কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু কি ফসকে গেছে? রাতে উদ্যান রিশান এই ঘরেই ছিলো। রিশান বোনকে হাত ধরে সাহস জুগিয়েছে। আর উদ্যান প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত লাস্ট ফিনিশিং দিয়েছে। গতকাল রাতের উদ্যানকে রাফসা নতুন করে সৃষ্টি করেছে। এতোটা নরম যত্নশীল বোধহয় কখনো তাকে হতে দেখা যায়নি।
ঘরের ভেতর হালকা ঠান্ডা একটা আবহাওয়া। বাইরের দমকা হাওয়া পর্দাগুলোকে আস্তে আস্তে দুলিয়ে দিচ্ছে। আর সেই ছন্দের সাথে মনের ভেতরের দোলাচলটা যেন মিশে যাচ্ছে। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা একটু বেশি স্পষ্ট। যেন রাফসার অস্তিত্বটাই জানান দিচ্ছে বারবার
“এটাই সেই মুহূর্ত।”
মনে পড়ছে গত কয়েকটা বছরের র কথা। কত রাত জেগে কাটানো, চোখের নিচে কালি পড়া, তবুও থেমে না থাকা। কখনো ক্লান্তি এসে ভর করেছে, কখনো মন ভেঙে গেছে একটা কঠিন টপিক বুঝতে না পেরে। তবুও আবার উঠে দাঁড়ানো, আবার বই খুলে বসা—এই চক্রটাই যেন জীবন হয়ে গিয়েছিল। চারপাশের অনেক কিছুই দূরে সরে গিয়েছিল। প্রথম ভালোবাসা,শখের পুরুষ সব।সে সবকিছু ভুলে,ঘুম সবকিছু ত্যাগ করে এগিয়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত জেদ কাজ করেছিল রাফসার ভেতরে।
আজ সেই জেদেরই পরীক্ষা।এতো কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড় করিয়েছিল শুধু মাত্র আজকে এই দিনটির জন্য।
কিন্তু ভয়ের বিষয় হলো, যতই প্রস্তুতি নেওয়া হোক, পরীক্ষার দিন এলে একটা অদ্ভুত ভয় ঠিকই এসে বসে। মনে হয়, রাফসা “যদি ভুলে যাই?”, “যদি প্রশ্নগুলো অচেনা লাগে?”, “যদি মাথা কাজ না করে?”—এইসব প্রশ্নগুলো মনের ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে। আবার ঠিক একই সময়, অন্য একটা কণ্ঠ ভেতর থেকে বলে—“তুই পারবি। এতদূর এসে থামার সুযোগ নেই।”
এই দ্বন্দ্বটাই আজকের দিনের আসল অনুভূতি।
বাইরের পৃথিবীটা আজও আগের মতোই চলছে—রাস্তায় মানুষ যাচ্ছে, গাড়ির শব্দ শোনা যাচ্ছে, আকাশে হয়তো হালকা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। কিন্তু নিজের ভেতরের পৃথিবীটা সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে আজ শুধু একটাই কেন্দ্র—এই পরীক্ষা, এই মুহূর্ত, আর নিজের সাথে নিজের লড়াই।
হাতের তালুতে হালকা ঘাম জমছে, ঠোঁট শুকিয়ে আসছে, কিন্তু চোখে একটা অদ্ভুত স্থিরতা ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। ভয়টা পুরোপুরি যায়নি, হয়তো যাবে না। কিন্তু সেই ভয়কে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার একটা সাহস জন্ম নিচ্ছে রাফসার ভেতরে।
কারণ শেষ পর্যন্ত, এই দিনটা শুধু একটা পরীক্ষা না—এটা প্রমাণ করার দিন, নিজের কাছে নিজের পরিশ্রমের মূল্য দেখানোর দিন।
সকাল নয়টা বাজতেই ফরাজী বাড়িতে তোড়জোড় শুরু হলো। হুমাইরা ফরাজী কোনোরকম নাস্তা খাইয়ে দিয়েছে রাফসাকে। সবাই সাহস যুগানোর জন্য এটা সেটা বলছে। কিন্তু মনের মধ্যে অস্থিরতা কোনোভাবেই দূর করতে পারছে না। ভয় কাজ করছে মনের মধ্যে। রোহান ঠাট্টার স্বরে বলল,
“গিয়ে পরীক্ষাটা দিয়ে আয় শুধু। তারপর তোর বিয়ের জন্য ছেলে দেখছি।”
রাফসা কিছু বলছে না। প্রিপারেশন ভালো হলেও ভয় ঝেঁকে বসে আছে। রাফসাকে কিছু বলতে না দেখে রোহান পুনরায় বলল,
“কি মনে করেছিস? ডাক্তারের কাছে বিয়ে দেবো! উঁহু মোটেই না। একটা গরু চোর দেখে তোকে বিয়ে দিব।”
মুহুর্তেই চেঁচিয়ে উঠলো রাফসা, “আম্মুওওওও ।”
রোহানের মা ধমকে উঠলো, “মার খাবি এখন। দেখছিস মেয়েটা ভয়ে আছে। তার উপর ফাজলামো করছিস! আমার রাফসার জামাই ডাক্তার হবে, সাথে রাফসাও।”
সে সময় উদ্যান নেমে এলো সিঁড়ি বেয়ে। মুখে সবসময়ের মতোই গাম্ভীর্যপূর্ণ। সাদা শার্ট জড়ানো শরীরে। কনুই অবধি হাতাগুলো ফোল্ড করা। একহাতে সাদা এপ্রোন এবং অপর হাতে ধরে রাখা ফোনটায় দৃষ্টি নিবদ্ধ। উদ্যান সরাসরি এসে চেয়ারে বসে। রোহান তখনকার মায়ের কথায় উওর,
“মা তুমি মিথ্যা আশা দিও না হুদাই। রাফসার জামাই একটা গরু চোর হবে দেখো।”
“ওকে চ্যালেঞ্জ। আমার হাসব্যান্ড ডাক্তার হবে। মিলিয়ে নিও।”
উদ্যান ফোন থেকে চোখ তুলে তাকায়। রাফসার কনফিডেন্স দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে সূক্ষ্ম হাসে। সকলের থেকে বিদায় নিয়ে উদ্যান রাফসাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
আছ মেডিকেলের সামনে অস্বাভাবিক একটা কোলাহল জমে উঠেছে। গেটের বাইরে থেকেই বোঝা যায় আজ কোনো সাধারণ দিন না। চারপাশে শুধু ছাত্রী-ছাত্রীর ভিড়, সবাই যেন এক অদৃশ্য টানে এখানে এসে জড়ো হয়েছে।
গেট পেরোতেই সেই ভিড়টা আরও ঘন হয়ে ওঠে। কারও হাতে শেষ মুহূর্তের নোট, কেউ দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলোতে, আবার কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।চোখে অদ্ভুত এক চিন্তার ছাপ। কেউ বন্ধুর সাথে হালকা করে কিছু আলোচনা করছে।
কোথাও একদল বন্ধু দাঁড়িয়ে, নিজেদের মধ্যে নার্ভাস হাসি বিনিময় করছে। হাসিটা ঠিক স্বাভাবিক না—তার মধ্যে লুকিয়ে আছে চাপা ভয় আর দুশ্চিন্তা। আবার একটু দূরে কেউ একা দাঁড়িয়ে, চারপাশের কোলাহল থেকে নিজেকে আলাদা করে নিজের ভেতরেই ডুবে আছে, যেন শেষবারের মতো নিজের মনে সব গুছিয়ে নিচ্ছে।
করিডোরগুলোতে পা ফেলার জায়গা নেই প্রায়। সাদা দেয়ালের মাঝে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য স্বপ্ন, আশা আর পরিশ্রমের গল্প। দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে কেউ বই পড়ছে, কেউ চুপচাপ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে—হয়তো নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। কারও মুখে আত্মবিশ্বাসের ছাপ, আবার কারও চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক।
হালকা বাতাসে নড়ছে গাছের পাতা, কিন্তু সেই শান্ত দৃশ্যটাও আজ যেন ভিড়ের চাপে চাপা পড়ে গেছে। চারপাশে শুধু মানুষের চলাচল, ফিসফাস, বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দ—সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে আছে পুরো জায়গাজুড়ে।
এ যেন শুধু একটা পরীক্ষার ভিড় না—এটা শত শত স্বপ্নের মিলনস্থল, যেখানে প্রত্যেকে নিজের মতো করে লড়াই করতে এসেছে। কেউ ভয় নিয়ে, কেউ আশা নিয়ে, কিন্তু সবার গন্তব্য এক ।আজকের এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করা।
সবকিছু উপেক্ষা করে উদ্যান রাফসাকে নিয়ে সরাসরি নিজের কেবিনে গেল। ভেতরে ঢুকতেই পরিচিত একটা ঘ্রাণ এসে রাফসার নাকে বাড়ি খেল। উদ্যানের পারফিউমের গন্ধ বাতাসের সাথে যুক্ত যেন। সাথে শরীরের আলাদা ঘ্রাণ ও। চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখতে দেখতেই চোখ পড়ে একটা পেন্টিং এর দিকে। সাদা শাড়ি পরা এক রমনি। চুলগুলো নেমে এসেছে কোমড়ে। মুখ বোঝা যাচ্ছে না। সম্পূর্ণ উল্টো ঘুরে আছে। সামনে সরিষার বাগান। আকাশে কিছু পাখি উড়ে যাচ্ছে। সূর্যটা ঢলে পড়েছে পশ্চিমে। রাফসার দৃষ্টি অনুসরণ করে উদ্যান তাকালো। কোথায় তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরেই চিবিয়ে চিবিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো,
“নিশ্চিত আমার চরিত্রের দফারফা করবে মনে মনে।”
দুপুরে পরীক্ষা শেষ হতেই চারদিকে কোলাহল ছড়িয়ে পড়ল। কেউ হাসি মুখে বের হচ্ছে তো কেউ বেজার মুখে বের হচ্ছে। বা কেউ কেঁদে কেঁদে বের হচ্ছে। সবকিছুর মাঝে রাফসাকে হাসতে হাসতে বের হতে দেখা যায়। হয়তো পরীক্ষা ভালো হয়েছে। রাফসা এবং সায়মা এক হলে পড়েছে। বাকিরা অন্য রুমে। সায়মাও বেশ খুশি। সবার একসাথে দেখা হতেই সাতারুল হতাশার স্বরে বলল, “আমার বোধহয় আর তোদের সাথে পড়া হবে না রে। এমসিকিউ বিশটা হবে কিনা সন্দেহ।”
“আরো মারামারি কর। দৌড়াদৌড়ি করে সময় নষ্ট করেছিস।”
সাবিকুনের কথায় রাফসা ধমকে বলল, “চুপ কর। একটু সাহস জুগাবি। তা না করে উল্টো পাল্টা বকছিস!”
সায়মা বলল, “চিন্তা করিস না। ইনশাআল্লাহ পাশ করবি। আত্মবিশ্বাস রাখ নিজের মাঝে।”
“মামা চাপ নিস না। মজা কর। কপালে থাকলে ঠেকায় কে?” ওদের কথায় সাতারুল একটু স্বাভাবিক হয়। সাবিকুন বলল, “আচ্ছা আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। চল বাড়ি ফিরি।”
“তোরা চলে যা। আমি ওনার কাছে যাচ্ছি।”
রাফসার কথায় আশরাফুল ভ্রু কুঁচকে বলে, “উনি আবার কে!”
“ওই খচ্চরের কাছে যাচ্ছি। তোরা চলে যা।”
তারপর রাফসা সবাইকে বিদায় দিয়ে উদ্যানের কেবিনে এলো। এ কি কেবিনে তো কেউ নেই। গেল কোথায়। অগ্যতা রাফসা বিরক্ত হয়ে উদ্যানের চেয়ারে বসে পরল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আবারো পেন্টিংটা দেখছে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। কিছুক্ষণের মধ্যেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে উদ্যান। ঘেমে একাকার হয়ে গেছে। রাফসাকে এখানে দেখে একপ্রকার ধমকে বলল,
“কোথায় ছিলি? খুঁজতে খুঁজতে পাগল হয়ে গিয়েছি।”
উদ্যানের গলার স্বর স্পষ্ট রাগের আভাস। রাফসা স্বাভাবিক ভাবেই বলল, “পাগল হলে পাবনা যান।”
“থাপড়ে গাল ফাটিয়ে দেবো। আমাকে টেনশনে রাখতে তোর ভালো লাগে!”
রাফসা চোখ ছোট ছোট করে বলে, “কোন মেয়ের সাথে ছিলেন কে জানে। এতো দেরি করে গিয়েছেন দেখেই পাননি আমায়।”
উদ্যান হতব্হিল হয়ে তাকিয়ে রইল। আর কত দাগ লাগাবে এই মেয়ে। গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“পরীক্ষা কেমন হয়েছে?”
রাফসা ভাব নিয়ে বলে উঠল, “সব কমন এসেছে। বুঝলেন মিস্টার রাওদ এইবার বোধহয় ডাক্তার হয়েই যাবো।”
উদ্যান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। ভাব দেখো যেন বিশ্ব জয় করে ফেলেছে। নিস্তব্ধতা ভেঙে রাফসা বলল,
“ভাইয়াকে ফোন দিয়ে বলুন এসে আমায় সিবীচ নিয়ে যেতে।”
উদ্যান ভ্রু কুঁচকে বলে, “সি বীচ কেন! সোজা বাড়ি ফিরবেন এখন।”
“আপনাকে বলেছি আমি বাড়ি ফিরব? ভাইয়া কে জলদি আসতে বলুন।”
উদ্যান কিছু একটা ভাবল। তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে কপাল চুলকিয়ে বলে, “ওকেহ চলুন।আমিই নিয়ে যাচ্ছি।”
মেডিকেল থেকে উদ্যানের পেছনে পেছনে বেরিয়ে এলো রাফসা। আশেপাশে কিছু গাড়ি এবং মাস্ক পড়া ব্যক্তি। যাদের পূর্ণ দৃষ্টি ওদের মাঝেই। উদ্যান চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকালো। দৃষ্টি স্বাভাবিক। রাফসাকে বসিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে। চোখে রোদচশমা পরে গাড়ি স্টাট দিল। স্টিয়ারিংয়ে হাত শক্ত করে চেপে ধরে ঘুরাতে ঘুরাতে পুনরায় আশেপাশে তাকায়। মুহুর্তেই ধোঁয়া উড়িয়ে বেরিয়ে পড়ে গাড়িটি। ততক্ষণাৎ কিছু লোক বেরিয়ে এলো। তার থেকে একটু দূরে তিনজন ছেলে দাঁড়ানো।
সমুদ্রে বাতাসে সোঁ সোঁ করছে। সমুদ্র গর্জন নয়, আবার পুরোপুরি শান্তও না। যেন কারও গভীর শ্বাস নেওয়া আর ছেড়ে দেওয়ার মতো, একটানা ওঠানামা করছে। সেই শব্দের ভেতরে দাঁড়ালে নিজের ভেতরের কথাগুলোও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়।
বাতাসটা এখানে আলাদা। শহরের মতো ভারী না, আবার পুরোপুরি হালকাও না। এর মধ্যে একধরনের আর্দ্রতা আছে, যা ত্বকে লেগে থাকে,
দিগন্তটা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। দূরে তাকালে মনে হয়, পৃথিবীটা এখানেই শেষ হয়ে গেছে। এই শেষ হওয়ার অনুভূতিটা অদ্ভুত ভয়ের না, বরং মুক্তির মতো। যেন এর বাইরে আর কিছু ভাবার দরকার নেই। দুপুর বেলায় মানুষ সমাগম খুবই কম। তিনটার বেশি বাজছে। হয়তো একটু পরেই মানুষ জনে ভরে উঠবে জায়গাটি। সমুদ্র খনেই উওাল হয়ে উঠে। বড় বড় ঢেউ খেলে যাচ্ছে। রাফসা দুই হাত মেলে শ্বাস নিল। বাতাসে বুঝি পঁয়তাল্লিশ কেজির ওজনের ওকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। উদ্যান পেছনে পাথরের উপর বসে আছে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে ফোন বের করে আনে। পকেটে তখনো একটি ফোন আছে। এটি রাফসার ফোন। উদ্যানের কাছেই ছিল। কিছু দরকারি নোটের কারণে আনা হয়েছে। উদ্যান নিজের ফোনে বেশ কয়টি ছবি তুলল রাফসার। তারপর উঠে গিয়ে ওর পেছনে দাড়িয়ে বলল,
“পেছনে আয়। ভিজিয়ে দিচ্ছে তো।”
রাফসা পেছনে ফিরে। কিছু বলতেই যাবে তখনই একটা তেরো চৌদ্দ বছরের এক ছেলে এসে দাঁড়ায়। হাতে ছোট্ট একটা লাল বালতি। তাতে তাজা লাল রঙের গোলাপ ফুল গোঁজা। ছেলেটা রাফসাকে আবদার করে বলে, “আপা একটা ফুল নেননা।”
“না ফুল লাগবে না।”
“আপা একটা নেননা। দুইদিন ধরে কিছু খাইনাই। নেননা আপা। মাএ তিরিশ টেকা।”
উদ্যান পকেট থেকে থেকে পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করে ছেলেটাকে দিল। তারপর বেছে বেছে দুটো গোলাপ নিয়ে রাফসার দিকে বাড়িয়ে দিল।
“আমি একটা ভিডিও করব। করে দিন।”
“কি ভিডিও?”
“আসুন ।”
রাফসা দুইকদম সামনে ফেলে বসে পড়ে। একটা গোলাপ হাতে নিয়ে সামনে ফিরেই বলে, “আমি এখানে নাম লিখব। আপনি পেছন থেকে ভিডিও করবেন।”
রাফসার কথা মতো উদ্যান মোবাইল ধরে ভিডিও করলো। একবার রাফসা লিখে তারপর আরেকবার সাদিয়া। তারপর উঠে দাঁড়ালো। উদ্যানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে, “আপনার নাম লিখব?”
“লিখুন।” চটপটে উওর উদ্যানের।
রাফসা মুখ বাঁকিয়ে বললো, “এমনি এমনি কোনো কাজ করিনা আমি।”
উদ্যান সরু চোখে তাকিয়ে বলল, “কি লাগবে?”
“তোফা।” সহজ-সরল উক্তি রাফসার। উদ্যান ভ্রু কুঁচকালো রাফসার কথায়। গম্ভীর কন্ঠে শুধায়,
“কি চাই?”
“এক হাজার টাকা।”
“কি! একটা নামের জন্য একহাজার টাকা? ঘুষ খাচ্ছেন আপনি?”
“ঠিক আছে। আপনার নাম লেখার দরকার নেই।”
উদ্যান হতাশার শ্বাস ফেলে। মোবাইল ধরতে ধরতে বলল, “ওকেহ দেবো।”
রাফসা রাজি হয়ে পুনরায় নিচে বসে। হাত ঘুরিয়ে গোলাপটা দিয়ে সুন্দর করে উদ্যান নামটা লিখে।
এভাবেই বিকেলটা কাটিয়ে দিল তারা। এই প্রথম একসঙ্গে কাটানো মুহূর্ত তাদের।
সন্ধ্যা নামবে কিছুক্ষণ পরেই। পাখিরা নিজেদের ঘরে ফিরছে। শান্ত আবহাওয়া। গাড়িতে বসে রাফসা নিজের ফোনে ছবিগুলো দেখছিল মনোযোগ দিয়ে। উদ্যান হঠাৎই গতি বাড়িয়ে দেওয়াতে কিছুটা সামনে হেলে পড়ে।রাফসা চেঁচিয়ে উঠলো। উদ্যান কিছু বলল না। কিছু দূর যেতেই গাড়িটা সম্পূর্ণ থেমে গেল। রাফসা অবাক হয়ে মুখ তুললো। মুহুর্তেই গাড়ির সামনে কিছু পুলিশ চোখে পড়ে। ছয় সাতজন তো হবেই। এতো পুরুষ দেখে রাফসা খানিক ভয় পায়। এক পুলিশ এসে উদ্যানের দিকে তাকিয়ে বলল, “বাইরে আসুন।”
উদ্যান নেমে আসে গাড়ি থেকে। তখন গাড়ি এতো জোরে চালিয়েছিল পুলিশ পোস্টিং পাড় করতে। ওর জানা আছে এই রাস্তায় এখন পুলিশ ধরবে। রাফসা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। উদ্যান নামতেই পুলিশ প্রশ্ন করে,
“ওনি কে আপনার?” রাফসার দিকে আঙুল তাক করে দেখালো। উদ্যান রাফসার দিকে তাকিয়ে লম্বা শ্বাস ফেলে। স্বাভাবিক ভাবেই গম্ভীর কন্ঠে বলল
“আমার ওয়াইফ।”
“ওয়াইফ তার প্রমাণ কি! এই রাস্তায় প্রেমিক প্রেমিকা ধরলেই বলে হাসবেন্ড ওয়াইফ। প্রমাণ দেখাতে বললে আর পারে না। আপনার কাছে কি প্রমাণ আছে ওনি আপনার ওয়াইফ?”
“নো।” স্বাভাবিক ভাবেই বলল উদ্যান।ও বুঝেছে এসব টাকা খাওয়ার ধান্দা। পুলিশটা আবার বলল, “চলুন থানায় চলুন। মেয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো বের হবে।”
উদ্যানের তাতে কোনো পাওা নেই। শক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রাফসা ভেতর থেকে পরিস্থিতি ঘোলাটে দেখে বলল।
“আমার কাছে প্রমাণ আছে।”
মুহূর্তেই সকলের দৃষ্টি রাফসার দিকে পড়ে। উদ্যান ঘাড় বাঁকিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। রাফসার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ বলল, “তাহলে দেখান প্রমাণ।”
রাফসা ফোনে কিছু একটা বের করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। উদ্যান কিছু বুঝল না। ফোন থেকে একটা পিক বের করে ফোনটা পুলিশের হাতে দিয়ে বলল, “এই যে কাবিননামা।”
পুলিশ দেখলো সেটা। উদ্যান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। রাফসা স্বাভাবিক। পুলিশ হঠাৎ খানিক খিটখিটে মেজাজে বলল, “এটা যে আপনাদের কাবিননামা তার প্রমাণ কি?”
“এটার প্রমাণ ও লাগবে? কাবিননামা দেখছেন হচ্ছে না!”
রাফসার কথায় পুলিশটি দৃঢ় গলায় বলল, “হবে না। এটার প্রমাণ দিন।”
“আচ্ছা।” বলেই রাফসা উদ্যান কে বলল
“আপনার ডাক্তারির লাইসেন্স কোথায়! ওটা দিন।”
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৫
উদ্যান বাধ্য ছেলের মত পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে লাইসেন্স টা বের করে। সে এখনো ঘোরের মাঝেই আছে। রাফসা লাইসেন্স টা নিয়ে নিজের ফাইল থেকে এডমিট কার্ড বের করে পুলিশ কে দিল। পুলিশ টি দেখে বলল, “ কাবিননামায় উদ্যান রাফসা নাম আছে। এই কাগজ পত্রেও তাই।”
উদ্যান চমকে তাকালো। যেন আকাশ থেকে পড়েছে। রাফসা কি করে বিয়ের কথা জানলো। আর কাবিননামার ছবিই বা ওর ফোনে কি করে গেল। উদ্যানের সাথে দাঁড়ানো পুলিশকে সে পুলিশ বলল, “ছেড়ে দাও। ওনারা হাসবেন্ড ওয়াইফ।”
পুলিশরা পথ ছেড়ে দাঁড়াতেই উদ্যান গাড়িতে বসে গাড়ি সটাট দিল।
