Home প্রেয়সীর অনুরাগ প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৫

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৫

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৫
Sadiya Jahan Simi

একটা মাস যেন হঠাৎ করেই ফুরিয়ে গেল। কিছুদিন আগেও যে গরমের দমবন্ধ করা দিনগুলো ছিল, সেগুলো এখন স্মৃতির মতো দূরে সরে গেছে। বাতাসে আর সেই তীব্র উত্তাপ নেই ,বরং এখন হালকা শীতলতা, একধরনের নরম পরশ। ডিসেম্বরের শুরুতেই শীত নিঃশব্দে এসে গেছে, খুব বেশি জানান না দিয়েই। ভোরবেলা জানালার কাঁচে হালকা কুয়াশা জমে, আর বাইরে তাকালে দেখা যায় গাছের পাতাগুলো স্থির হয়ে আছে, যেন তারাও শীতের শান্তিতে ডুবে গেছে।

প্রকৃতিটা খুব বেশি বদলায়নি, তবুও একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন চোখে পড়ে। সকালের আলোটা একটু ফিকে, রোদের উষ্ণতা কমে গেছে, আর সন্ধ্যা নেমে আসে একটু তাড়াতাড়ি। কোথাও দূরে পাখির ডাক, আর হালকা ঠান্ডা বাতাস সব মিলিয়ে একধরনের নির্জন, প্রশান্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। খুব বেশি কিছু না বদলালেও, এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো মনকে আলাদা করে ছুঁয়ে যায়।

কিন্তু এই শান্ত প্রকৃতির মাঝেও জীবনে যেন থেমে থাকার সুযোগ নেই। রাফসার মেডিকেল পরীক্ষার দিন ঘনিয়ে আসছে।আর মাত্র দুই দিন পর সে কাঙ্ক্ষিত দিনটি। বইয়ের পাতা, নোট, লেকচার সবকিছু যেন একসাথে মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। দিনের শুরু থেকে রাত পর্যন্ত একটা চাপা ব্যস্ততা লেগেই থাকে রাফসার । তার বিশেষ কারণ উদ্যান। রিশান ভোর বেলায় উঠে সর্বপ্রথম বোনের ঘরে আসে। এটা এখন তার ডেইলি রুটিন হয়েছে। রাফসা ভোর তিনটায় উঠলেও রিশানের ডাকার কারণ উদ্যানের রুমে যাওয়া। রিশানের মুখের উপর না করতে পারে না। রাফসা জানে ভাইয়ের বর্তমানে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ওর মেডিকেলে চান্স পাওয়া। উদ্যানও পুরোদমে বুঝিয়ে আসছে সবকিছু।প্রতিদিন তিন চার ঘন্টা কাছাকাছি থাকলেও দুজনের মাঝে পড়াশুনা ছাড়া কোনো কথা হয়নি। রাফসাও আগ বাড়িয়ে এটা ওটা জিজ্ঞেস করেনি। উদ্যান যা বুঝিয়েছে তাতেই মাথা নাড়িয়ে সায় দিয়েছে।
রাত জেগে পড়ার অভ্যাস নেই রাফসার।রাত নয়টার মধ্যেই খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ে। আগে যদিওবা দশটা এগারোটা বাজতো এখন আর সেই চান্স নেই। রাফসা এখন সম্পূর্ণ উদ্যানের কন্ট্রোলে। পুরো রুটিন উদ্যানের হাতে করা। সে নিজেও মেডিকেল পরীক্ষার সময় এমন করে প্রিপারেশন নিয়েছিল। উদ্যানের কোনো কাজে রাফসা বিরক্ত বা বাঁধা দেয়নি। একজন ডাক্তার অবশ্যই জানে কি করে প্রিপারেশন নিতে হয়। তাদের মাঝে সম্পর্টা এখন আরো নড়েবড়ে হয়ে গিয়েছে।

অন্ধকার রুমটিতে হলুদ জিরো লাইট জ্বলছে। তিনটে বাজার আর দশ মিনিট বাকি। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দূর আকাশের পানে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাফসা। পরিস্থিতি ওকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এমন পরিস্থিতি কখনো আশা করেনি ও। সবসময় ভেবে এসেছে কোনোরকম এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঘরকুনো হবে। তার শখের পুরুষ উদ্যান কে বিয়ে করে সংসার করবে। বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে একটা সুন্দর জীবন কাটিয়ে দিবে দিব্যি। তবে পরিস্থিতি আজ ভিন্ন। সময় কথা বলে। কাকে কখন কোথায় নিয়ে যাবে কেউ বলতে পারবে না।
রাফসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আওড়ালো,
“ভাগ্য আমায় কোথায় এনে দাঁড় করালো! এ জীবন আমি কখনো আশা করিনি। এসব কিছুর পেছনে তার অবদান। ভালোই হয়েছে সেদিন আমায় ফিরিয়ে দিয়েছিল সে। তার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। আমায় নতুন একটা জীবন উপহার দিয়েছে।”

তিনটে বাজতেই এলার্ম বেজে উঠলো। আজ অনেক আগেই ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল রাফসার। রুমে গিয়ে ওয়াশরুম থেকে ওযু করে এলো। তারপর জায়নামাজ বিছিয়ে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে নেয়। প্রায় তিন বছর পর তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ছে। একটা সময় খুব পড়া হতো এই নামাজ। তার একমাত্র কারণ উদ্যান কে নিজের জীবন সঙ্গী হিসেবে পাওয়া। উদ্যান চলে যাওয়ার পরেও এই তাহাজ্জুদই ছিল রাফসার একমাত্র শক্তি, আশ্রয়,আশা, সঙ্গী। ওতো কিছুর পরেও তাহাজ্জুদে উদ্যান কে নিজের করে চাওয়া বন্ধ করেনি। প্রায় কয়েকটা মাস পাগলের মতো কেঁদে কেঁদে মোনাজাতে চেয়েছিল পাষাণ পুরুষকে। তাহাজ্জুদের দোয়া কি বিফলে যায়?
নামাজ শেষ করে উঠে দাড়ালো। জায়নামাজ ভাঁজ করে ড্রয়ারে রেখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ঘড়ির কাটা সাড়ে তিনটের ঘরে। সময় নষ্ট না করে পড়তে বসে গেল।
টেবিল ল্যাম্পের নিচে খোলা বই।সবকিছু মিলিয়ে একধরনের যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে যেন। বাইরের ঠান্ডা হাওয়া আর ভেতরের এই চাপা উত্তেজনা দুটো একসাথে মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করে। মাঝে মাঝে জানালার বাইরে তাকিয়ে একটু নিঃশ্বাস নিচ্ছে ।

পড়ার মাঝেই ডোর বেজে উঠলো। নিস্তব্ধ পরিবেশ সে শব্দ কানে বেজে উঠলো রাফসার।পড়ার টেবিল থেকে উঠতে উঠতে নজর দিল ঘড়িতে। সহসাই কপাল কুঁচকে এলো। এতো তাড়াতাড়ি রিশান ডাকতে চলে এলো আজ। রাফসার ভাবনার মাঝেই পুনরায় দরজার কড়াঘাত পড়ে। ধীর কদমে এগিয়ে দরজা খুলে দিল ও। মুহুর্তেই চমকে উঠে। উদ্যান দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মুখে ক্লান্তির ছাপ। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে পড়ে আছে। সাদা শার্ট জড়ানো শরীরে। একহাতে এপ্রোন,অপর হাত দিয়ে কপাল ঘেঁষছে। রাফসা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
“আপনি বাড়ি ফিরেননি রাতে! হসপিটাল থেকে ফিরছেন এখন?”
উদ্যান দৃষ্টি নিক্ষেপ করল রাফসার পানে। চোখে অস্থিরতা নাকি কৌতুহল বোঝা বড় দায়। দুজনেই যেন এক গোলক ধাঁধা। নীরবে যুদ্ধ চলছে। উদ্যান ভারিক্কি শ্বাস ফেলে বললো,
“ওটি ছিল। ক্রিটিক্যাল হার্ট সার্জারি করতে হয়েছে।”

রাফসা দরজার হাতল ধরে দাঁড়াল। উৎসাহিত হয়ে বলল, “অপারেশন সাকসেস হয়েছে! প্রেসেন্টের কি অবস্থা?”
উদ্যান তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে কপাল চুলকিয়ে বলে, “ইয়াহ অপারেশন সাকসেসফুল। সি ইজ আউট অফ ডেঞ্জার।”
রাফসা চমকে তাকালো। ঠোঁট নেড়ে বলল, “মেয়ে ছিল ওটা?”
রাফসার কথায় ভ্রু কুঁচকালো উদ্যান। এ কেমন কথা আবার! রোগী কি মেয়ে হতে পারেনা। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কেন? মেয়ে হলে সমস্যা কোথায়! হার্ট প্রবলেম কি শুধু ছেলেদেরই হয়? বাই দ্যা ওয়ে বয়স্ক ছিল।”
রাফসা থতমত খেয়ে গেল উদ্যানের কথায়। নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল, “আজব ! আমি কখন এই কথা বললাম? আমি তো শুধু মেয়ের কথা শুনে ভাবছি অল্প বয়সের মেয়ে। ইশশশ বিয়ের আগেই বিধবা হয়ে যাবে। তাই একটু অবাক হয়েছি।”
উদ্যান অদ্ভুত চোখে তাকায়। ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, “মেয়ে মরলে মেয়েই বিধবা হয়! আপনার মাথায় কি সারাদিন বিয়ের কথাই ঘুরে?”

রাফসা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “তা কখন বললাম!”
“বলতে হয় নাকি! কথাই তো বোঝা যাচ্ছে। বিয়ে দিতে হবে দ্রুত।”
রাফসা নাক মুখ কুঁচকে বলে, “অসহ্য লোক।”
উদ্যান ক্লান্তির নিঃশ্বাস ফেলে। উল্টো ঘুরে যেতে যেতে বলল, “রুমে আয়।”
“রাতে খেয়েছিলেন?”
হঠাৎ প্রশ্নে কদমজোড়া আটকে গেল উদ্যানের। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেই সামান্য ঘাড় কাত করে গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল, “নো। টাইম ছিলোনা।”
তারপর গটগট করে স্থান ত্যাগ করে। রাফসা তাকিয়ে রইল তার গমন পথে।

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। চারদিকে পাখির কলতানে মুখরিত হয়ে উঠেছে। সূর্য মামা উঠবে উঠবে ভাব। ভোরেই আজ ফরাজী বাড়ির কিচেন রুম আলোতে ভরে উঠেছে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকছে। রাফসা দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে কিচেনে ঢুকে। ফ্রিজে খাবার নেই। সামান্য তরকারি আছে। আর এটা রাতের তরকারি। উদ্যান বাসি খাবার কখনোই খাবে না। ভাবতে ভাবতেই খিচুড়ি রান্না করার কথা মাথায় এলো। কিন্তু মাংস তো ভিজবে না এতো তাড়াতাড়ি। ডিম ভাজি করে নিবে ভেবে রাফসা নিশ্চিন্ত হয়‌। ব্যস্ত হাতে পেঁয়াজ মরিচ কুঁচি করে নিল। চাল ডাল ধুয়ে নেয়। ওড়না টা ভাঁজ হয়ে গলায় বসে আছে। কোমড় অবধি লম্বা চুল গুলো ক্লিপ দিয়ে আটকে রাখা।

চুলার ওপর হাঁড়িতে তেল গরম হচ্ছে।গরম তেলে পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে হালকা নাড়াচাড়া করে মশলাগুলো ফেলে দেয় । জিরা, তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা—মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এক মুগ্ধকর গন্ধ। মসলা কষানোর শেষে ডাল আর চাল ঢেলে দেয়। মশলার সাথে মিশে তৈরি হয় এক উষ্ণ রঙের দৃশ্য। নড়াচড়া করেই ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিল।
মাত্র বিশ মিনিটের মধ্যেই খিচুড়ির সুগন্ধ পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। তার মাঝেই ও দুটো ডিম সেদ্ধ এবং একটা ডিম ভাজি করে নিয়েছে। কাজ শেষ হতেই পা বাড়ায় তাকে ডাকার উদ্দেশ্য। হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই পা জোড়া থেমে গেল। জিভ কেটে রাফসা বিড়বিড় করে বলল, “ওই লোক তো আবার সালাদ ছাড়া খাবে না।”
অগ্যতা পুনরায় উল্টো ঘুরে ফ্রিজ থেকে শশা বের করে। পেঁয়াজ এবং শসা কুচি কুচি করে সালাদ বানিয়ে নেয়। চোখে মুখ উদগ্রীব হয়ে আছে। কাজ শেষ হতেই ছুটে উদ্যানের ঘরে।
উদ‌্যান সবেই শাওয়ার ছেড়ে বেরিয়েছে। শাওয়ার নেওয়াতে শরীর কিছুটা ভালো লাগছে। সারা ক্লান্তি যেন এক নিমিষেই হাওয়া। কোমড়ে শুধুমাত্র একখান সাদা তাওয়াল জড়িয়ে আছে। ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কপালে। বুক বেঁয়ে পানির কণা পড়ছে। রুমে এসে রাফসাকে না দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় ওমনি। পাঁচটার বেশি বাজছে। সেই কখন বলে এসেছে। উদ্যান বিড়বিড় করে বলল, “এখনো আসেনি। এটাকে যে কবে মানুষ করব!”

কাভার্ডের থেকে ট্রাউজার আর গেঞ্জি বের করে। ট্রাইজারটা হাতে নিতেই দুম করে ভেতরে ঢুকে রাফসা। উদ্যান কে কিছু বলতে মুখ খুলতেই নিবে ওমনি চোয়াল ঝুলে যায় ওর। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল উদ্যানের বডির দিকে। তাতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই উদ্যানের। চোখের পলকেই ট্রাউজার পড়ে নিল। রাফসা বুঝতেই পারেনি ব্যপারটা। এখনো ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। উদ্যান তাওয়ালটা খুলে রাফসার মুখে ছুড়ে মারে। গেঞ্জিটা গায়ে জড়াতে জড়াতে বলল , “চোখের পলক ফেলুন।”
উদ্যানের এহেন কথায় থতমত খেয়ে যায় রাফসা। ছিঃ ছিঃ এতোক্ষণ ধরে তাকিয়ে ছিল। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “ আস্তাগফিরুল্লাহ তওবা তওবা। আল্লাহ মাফ করুন। ছিঃ ছিঃ!”
উদ্যান রাফসার এমন আহাজারিতে ভ্রু কুঁচকে বলে, “হোয়াট!”
রাফসা খেকিয়ে উঠলো। “চুপ করুন অসভ্য লোক। দরজা বন্ধ করে ড্রেস চেঞ্জ করতে হয় জানেন না আপনি?”
“নো।” দায়সারা ভাবে বলে উঠলো উদ্যান। রাফসা কটমট করে তাকিয়ে রইল। উল্টো ঘুরে যেতে যেতে খানিক চেঁচিয়ে বলল, “নিচে আসুন অসভ্য লোক।”

উদ্যান বিরক্ত হলো রাফসার কথায়। সেই ছোট থেকে চরিত্রে দাগ লাগিয়ে আসছে এই মেয়ে। ছোটবেলায় ডাকতো ভালোবাতার,আর এখন বড় হয়ে ডাকছে অসভ্য পুরুষ। সামনে আর কি কি যেন ডাকে।
উদ্যান সিঁড়ি থেকেই চোখ ফেলে রাফসাকে খুঁজে রাফসা। রাফসাকে আশেপাশে না দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় সহসা। রান্নাঘরে চোখ যেতেই রাফসাকে উল্টো ঘুরে কিছু করতে দেখা যায়। উদ্যান দ্রুত গতিতে পা ফেলে কিচেনে ঢুকে। রাফসার পেছনে দাঁড়িয়ে ভারিক্কি স্বরে বলে, “কি করছিস!”
রাফসা পেছনে না ফিরেই বলল, “ডাইনিংয়ে গিয়ে বসুন।”
উদ্যান ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। রাফসা এক প্লেট খিচুড়ি নিয়ে তার উপর ভাজা ডিমটা দিয়ে উল্টো ঘুরতেই উদ্যানকে দেখে থতমত খেয়ে যায়। এখনো দাঁড়িয়ে আছে এই লোক।
“টেবিলে আসুন।” বলেই রাফসা পা চালায়। উদ্যান ধীর গতিতে গিয়ে দাঁড়ায়। খিচুড়ির প্লেটটার দিকে তাকিয়ে বলল, “খিচুড়ি কেন?”

“আপনার জন্য। খেতে বসুন।”
উদ্যান অবাক হয়ে তাকালো। রাফসা সে দৃষ্টি পাওা না দিয়ে পুনরায় রান্নাঘরে ছুটে। উদ্যান রাফসার পানে তাকিয়েই চেয়ারে বসে। মিনিট বাদেই হাতে সালাদের বাটি এবং সেদ্ধ ডিমগুলো নিয়ে হাজির হয়। নিজ হাতেই সালাদ তুলে দেয় প্লেটে। গ্লাসে পানি ঢেলে বলল, “হাত বাড়ান।”
উদ্যান চুপচাপ হাত বাড়িয়ে দিল। রাফসা নিজ হাতেই পানি ঢালে। তারপর গম্ভীর কন্ঠে শুধায়, “শুরু করুন।”
উদ্যান কিছু না বলেই খাওয়া শুরু করলো। রাফসা পাশে দাঁড়িয়েই ডিমের খোসা ছাড়াচ্ছে। দুটো ডিমের খোসা ছাড়িয়ে প্লেটে দিয়ে জড়ানো কন্ঠে বলল, “কেমন হয়েছে? সব ঠিকঠাক?”
উদ্যান খেতে খেতেই বলল, “ইয়াহ পারফেক্ট। বাট..

“কি ?”
“আজ এতো যত্ন?”
“নিজ স্বার্থে।” চটপটে উওর রাফসার। উদ্যান বিস্ময় নিয়ে তাকায়। কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ পরলো।
“কিসের স্বার্থ!”
রাফসা স্বাভাবিক ভাবেই গম্ভীর কন্ঠে শুধায়, “আমার পড়াশোনায় হেল্প করছেন এটা কি আমার স্বার্থ নয়? নয়তো আপনার মতো লোককে রেঁধে খাওয়ানোর লোক অন্তত আমি না। এবং সেটা আপনি খুব ভালো করেই জানেন।”
উদ্যান ছোট করে এক লোকমা খাবার তুলে বলল, “হা কর।”
রাফসার উদ্যানের ধরে রাখা খাবারের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে লোকটার দিকে তাকায়। মুখ বাঁকিয়ে বললো, “হুঁ হাঁ কর। আর ওমনি আমি হাঁ করলাম। শুনুন আমি যার তার হাতে খাই না।”
উদ্যান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “বেয়াদব একটা।”
উদ্যান কিছু বলল না আর। খাবাররে মনোযোগ দিল।

বেলা বারোটায় কোটায় এলেও আভিয়ানের এখনো ঘুম ভাঙেনি। ফকফকা সোনালি আলোর মাঝেও একটি রুমে অন্ধকারে নিমজ্জিত। বেডের উপর উপুড় হয়ে খালি গায়ে শুয়ে আছে আভিয়ান। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সে। বাড়ি ফিরেছে প্রায় সকাল পাঁচটা নাগাদ। সর্ব প্রথম শাওয়ার নিয়েছিল। তারপর বিছানায় শুয়ে ঘুম দিয়েছে। প্রতি সপ্তাহে দুদিন ’মায়াবী বিলাস ’ এ থাকা হয় বলে মনে হয় না। বিশেষ করে কিছু সময় তাকে কখনোই পাওয়া যায় না। মাঝে কিছু সময় বের করে তার মায়াবীকে দেখতে। আভিয়ান সব কাজ শেষ করেছে আগামী দুই দিনের জন্য। একটাই কারণ তার মায়াবী। দুইদিন পরেই মেডিকেল পরীক্ষা। যে সময়ের জন্য আভিয়ান দীর্ঘ তিনটি বছর অপেক্ষা করে আসছে। সেই কাঙ্খিত দিনের আর মাএ দুই দিন। হাজারো জল্পনা কল্পনা মনের মধ্যে সাজিয়ে রেখেছে। ডায়মন্ডের রিং আনিয়েছে ডুবাই থেকে। তার মায়াবীকে বিয়ের প্রপোজাল।দিবে। কোনো সম্পর্কে জড়াবে না। একেবারে হালাল সম্পর্ক গড়ে বাড়ি তুলবে । প্ল্যানিং করা আছে বিয়ের শপিং বাইরে থেকে করার। যদিওবা সেটা অনেক আগেই করার কথা ছিল। কিন্তু নিজের পেশা,মোহ, ছেড়ে যেতে পারেনি।
ঘুমের মধ্যে ফোন বাজার শব্দে ঘুম ব্যাঘাত ঘটে তার। সারারাতে অঘুমা সে। কয়েকঘণ্টার ঘুমে তা কি করে ঘুচবে? ঘুমের মধ্যে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে যায়। ফোন হাঁতড়ে বালিশের উপর থেকে ফোন তুলে চোখ বন্ধ করেই বলল, “কে?”
ওপাশ থেকে কথা শুনে আভিয়ান বলল, “ওকে, রাখছি।”
বলেই আবারো তলিয়ে যায় ঘুমে।

শুক্রবার আজ। সকলেরই স্কুল কলেজ ভার্সিটি বন্ধ। ফরাজী বাড়িতে দুপুরের রান্নার তোড়জোড় চলছে। রান্না প্রায়ই শেষের দিকে। ছেলেরা জুমার নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছে। একটু পরেই বোধহয় চলে আসবে। আজ বাড়িতে সকলেই উপস্থিত। বাড়ির কর্তারাও বাদ যায়নি। তারাও আজ বাড়িতেই আছে।
দুপুর দুটোয় মসজিদ হতে বাড়ি ফিরে ছেলেরা। সকলের গায়ে পাঞ্জাবি। রাহেলা ফরাজী ছেলেকে না দেখে বলে, “আমার ছেলে কোথায়?”
উমায়ের ফরাজী সোফায় বসে। স্ত্রীর পানে তাকিয়ে বলল, “দশ মিনিটের মধ্যেই নাকি চলে আসবে। একটা কল আসাতে ছুটে গেল কোথাও একটা।”
“আপনি জিজ্ঞেস করেননি কোথায় যাচ্ছে?”
“তোমার ছেলে সে সুযোগ দিয়েছে নাকি! বলল তো চলে আসবে।”
“চিন্তা করো না রাহেলা। গিয়েছে হয়তো দরকারি কোনো কাজে।” বললেন আব্বাস ফরাজী। চোখে মুখে কিছু একটার আভাস। আর কিছু বলেননি ওনি। ছুটলেন রান্না ঘরের পানে। জা’দের হাতে হাতে খাবার বাড়তে শুরু করে।

“ভাইয়া মসজিদে আজ কিছু দেয়নি?”
রোহান জায়িন ওমনি নিজেদের হাতের প্যাকেটটা লুকিয়ে ফেলল। জারা ভ্রু কুঁচকে জুহুরি চোখে পরোখ করে দুই ভাইকে। ঊষাও হাজির হয়। দুইজনকে দেখতেই জায়িন দাঁড়িয়ে গেল।
“জায়িন ভাই দাঁড়িয়ে গেলে কেন? মসজিদে কি দিয়েছে আজ! জলদি বের করো।”
ঊষার সাথে জারাও তাল মিলিয়ে বলল, “কি হলো বলছো না কেন! জিলাপি, বিরিয়ানি,রুটি হালুয়া কোনটা দিয়েছে?”
“ দেখ তোরা প্রতিবার এমন করিস। মসজিদ থেকে কষ্ট করে সিরিয়াল ধরে আমরা আনি। আর তোরা তাতে ভাগ বসাস। সেটি হচ্ছে না।”
জায়িনের কথায় রোহান তাড়াহুড়ো করে বলল, “একদম ঠিক কথা। আজ বিরিয়ানি নিতে কি কষ্ট হয়েছে জানিস! আমাদের জায়গায় তোরা হলে চুল ছেঁড়াছিঁড়ি করতি।”
“তা হচ্ছে না মেজো ভাইয়া। তাড়াতাড়ি বের করো। নয়তো খবর আছে।”

সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামতে নামতে বলে রাফসা। গায়ে সাদা ফ্রক। সাথে মেচিং করে সাদা ওড়না এবং সুইচ প্যান্ট। রোহান থতমত খেয়ে গেল। এই দুজন থেকে বাঁচতে পারলেও রাফসার থেকে পারবেনা। রোহান কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “এইল্লা ন গরিস ওডি। আজিয়ে আরা হাই। ফরের সপ্তারওুন তুই নিস।” ( এরকম করিস না। আজকে আমরা খাই। পরের সপ্তাহ থেকে তুই নিস।)
রাফসা টলল না রোহানের কথায়। সাথে তো দুজন আছেই। রিলান বসে বসে ওদের কান্ড দেখছে।
“পাখি তুই আমারটা নিয়ে যা। তিনজন মিলে খাস।”
“উহুঁ ভাইয়া। সবারটা লাগবে। তোমার ওইটুকু আমার পেটের এক কোনও ভরবে না। মসজিদ থেকে আনা ভাইদের খাবার জন্মগত বোনদের হক। আমরা আমাদের হক চাইছি।”
“আম্মু ছেড়ে দাও। তোমার আম্মুকে বলবো বিরিয়ানি রান্না করতে ।”
রাফসা জেদ দেখিয়ে বলল, “না বাবা। এটা আমাদের চাই। দিতে বলো না।”
“রোহান জায়িন দিয়ে দাও।”
ওরা অসহায় চোখে তাকায়। একসাথেই দুই ভাই উচ্চারণ করে, “চাচ্চু তুমিও!”
শেষ পর্যন্ত কেড়েই প্যাকেটগুলো নিয়েছে ওরা। জায়িন বলল, “এটাতো বৈষম্য হলো। ভাই নির্যাতন নামে কোনো আইন নেই কেন!”

সবাই ডাইনিংয়ে বসে খেতে। অনেকদিন বাদে বাপ চাচাদের সাথে খাওয়া হচ্ছে। টেবিলে খাবার আনার মাঝেই উদ্যান বাড়ি ফিরে। সাদা পাঞ্জাবি শরীরে ফিট হয়ে বসে আছে। সাদা পায়জামা। ফর্সা শরীরে সাদা খুব ফুটে উঠেছে। সিল্কি চুলগুলো সুন্দর করে সেট করে রাখা। হাতে কালো Casio watch ( ক্যাসিও ঘড়ি) । চাপ দাঁড়িতে যেন সৌন্দর্য দিগুন লাগছে। সে সরাসরি নিজের নির্ধারিত চেয়ারে গিয়ে বসে। রাহেলা ফরাজী ছেলেকে দেখেই ছুটে খাবার বেড়ে দিল। উদ্যান হাত ধুয়ে খাওয়া শুরু করে। রাহেলা ফরাজী ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “বাড়ি ফিরেছিস কখন? খাওয়া দাওয়া করেছিলি?”
উদ্যান আড়চোখে রাফসার পানে তাকিয়ে খেতে খেতে বলল, “হুঁ খেয়েছি। কিন্তু খুব বাজে স্বাদ ছিল খাবারের। ”
“আচ্ছা এখন পেট ভরে খেয়ে নে।”
এদিকে রাফসা কটমট করে তাকালো উদ্যানের দিকে। রাফসার দৃষ্টি পাওা না দিয়ে উদ্যান খাবারে মনোযোগ দেয়। নীরবতা ভেঙে হঠাৎ উমায়ের ফরাজী বলে উঠলেন, “মেডিকেলে জয়েন করেছো একমাস হয়েছে। বয়সও কম হয়নি। এবার বিয়েটা করে নেওয়া উচিত।”

“হ্যাঁ তুই ঠিক বলেছিস। উদ্যান কে বিয়ে করিয়ে রোহানকে করাবো।” বললেন আব্বাস ফরাজী। উদ্যান চোখ তুলে শান্ত দৃষ্টিতে তাকায়। কথার পাওা না দিয়ে পুনরায় খেতে শুরু করে। উমায়ের ফরাজী হতাশ হলো ছেলের নীরবতায়। ফ্যার বললেন, “আমি কাল থেকে মেয়ে দেখা শুরু করছি।”
উদ্যান এবার সম্পূর্ণ খাওয়া বন্ধ করে। নিশ্চুপ ভঙ্গিতে পরিবেশ বুঝে নিষ্প্রভ কন্ঠে বলল, “আমি এখনই বিয়ে করছি না। সময় হলে আপনাদের বলব।”
“নাতি নাতনির মুখ দেখাবে না তুমি! আমার বন্ধুর ছেলেদের কি সুন্দর বাচ্চা আছে। আর তুমি এখনো বিয়েই করছো না!”
“আমার বউ বোধহয় এখনো বাচ্চা। তারজন্য বিয়েটা আঁটকে আছে। চিন্তা করো না। বিয়েটা করে নিই। তারপর বউকে পিটিয়ে বলব এতো দিন কোথায় ছিলে।”
ছেলের রসিকতায় হতাশ হলেন উনি।

ফিহাজ ম্যান্ডেলা আজ ভিন্ন দিনের তুলনায় মেতে উঠেছে। চারপাশে নতুন নতুন মেয়ে। রাজনৈতিক মানুষ। কিছু চেনাজানা মুখ। রাতটা যেন আজ অন্যরকম হয়ে উঠেছে ফিহাজ ম্যান্ডেলায়। চারপাশে আলো-আঁধারের এক অদ্ভুত মিশ্রণ।নিয়ন লাইটগুলো বারবার রঙ বদলাচ্ছে।লাল, নীল, বেগুনি আলোয় পুরো পরিবেশটা এক রহস্যময় আবহ তৈরি করেছে। সাধারণ দিনের চেয়ে আজ অনেক বেশি ভিড়, যেন শহরের সব উচ্ছৃঙ্খলতা এক জায়গায় জমা হয়েছে। তার বিশেষ কারণ শুক্রবার আজ। এবং বিদেশে নারী ব্যবসার অর্থের ভাগ হবে। এ কাজে জড়িত আছে অনেকেই।
জোরে বাজছে সংগীত।বেসের শব্দ বুকের ভেতর ধাক্কা মারছে, তাল মিলিয়ে দুলছে পুরুষ। কোলাহলের মাঝে হাসি, চিৎকার,সব মিলিয়ে এক অগোছালো উচ্ছ্বাস। নতুন নতুন মুখ, সাজগোজে আলাদা করে চোখে পড়ছে নারীরা।কেউ আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে হাঁটছে, কেউ আবার ভিড়ের মধ্যে মিশে যাচ্ছে নিঃশব্দে। এক শতাধিক নারী আঁটকে রাখা হয়েছে ফিহাজ ম্যান্ডেলার বিশেষ স্থান ফিহাজ মেহেল্ডে।

টেবিলের কোণায় কোণায় গ্লাসের ঠোকাঠুকি, মদের গন্ধ বাতাসে মিশে এক ভারী অনুভূতি তৈরি করেছে। কোথাও কেউ ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছাড়ছে।সিগারেট, গাঁজা—সবকিছু যেন একসাথে মিশে গিয়ে রাতটাকে আরও ঘন করে তুলেছে।
এই পুরো পরিবেশটা এক ধরনের বেপরোয়া স্বাধীনতার। যেখানে নিয়মগুলো একটু আলগা হয়ে যায়, আর মানুষ নিজের ভেতরের অন্য এক রূপটা প্রকাশ করতে শুরু করে। কিন্তু এই উচ্ছ্বাসের আড়ালে কোথাও একটা অদৃশ্য প্ল্যান লুকিয়ে থাকে।
এসবের পেছনে যে আছে। আজ সে এখানে অনুপস্থিত। তার বিরুদ্ধে থাকা ব্যক্তি উপস্থিত এই কালো দুনিয়ার এক টুকরো অংশে। বেশ কিছু নারীর মাঝখানে দাড়িয়ে সে। হাতে ওয়াইনের বোতল। চোখে মুখে উচ্ছাস উপছে পড়ছে। নতুন এক রমনির সাথে ফিহাজ মেহেল্ডের এক কামড়ায় আজ তার রাত কাটবে। হঠাৎ সে আগুন্তক চেঁচিয়ে বলল,

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৪

“এইই গান বাজা।”
মুহূর্তেই বেজে উঠলো একটি গান।
আজকে চোখে নেশা লেগেছে
যাবো না আর বাড়ি
পাড়াপড়শি সবাইকে
দিয়ে দিলাম আড়ি
পড়ে গেছি তোর প্রেমে
মন মানছে না
দে না সব উজাড় করে
মানা করিস না
আমি কিচ্ছু শুনবো না
কোনো বারণ মানবো না
আয় সজনী গান করি
গলা মিলাইয়া
গানের তালে নাইচা যাবি
কোমর দুলাইয়া
নাচতে নাচতে ছুঁয়ে দিচ্ছে নারী দেহের ভাঁজ। কামনা ফুটে উঠেছে স্পষ্ট।

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৫ (২)