Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৮

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৮

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৮
নওরিন কবির তিশা

প্রভাতের সূচনা লগ্ন থেকেই অগ্নি ঝড়ছে সুখ নীড়ের আঙিনায়। শান্তশিষ্ট নৌ-ক্যাপ্টেনের রুদ্ধ রূপে তটস্থ উপস্থিত সকলে ভীত সন্তুষ্ট হয়ে গুটিসুটি মেরে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে তৃষা।হামিদা বেগমের নিখুঁত দৃষ্টি আর্যর ওপর স্থির। টুইংকেল সাবরিনা আর মৃত্তিকার সঙ্গে একটু দূরে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি বোঝার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক টা কিছুতেই কিছু বুঝতে পারছে না।
গত রাতে সেই রহস্যময় ল্যান্ডফোনের পর থেকেই সুখনীড়ের শান্ত আবহাওয়ায় এক অস্থির বিষবাষ্প দানা বেঁধেছিল। তৃষা খুব ভোরে যখন আর্যকে সেই বৃদ্ধার নাম জাহানারা বেগম বলেছিলো, তখন থেকেই আর্যর মাঝে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে সে। জাহানারা বেগম আর্যর সেই জন্মদাত্রী মা, বহু আগেই যাদের সাথে মাহেরিনের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে আর্য।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ব্যর্থ হয়ে তৃষা তৎক্ষণাৎ হামিদা বেগমকে ফোন করে সবটা জানিয়েছিল। হামিদা বেগমও খবর পাওয়া মাত্রই এক প্রকার হন্তদন্ত হয়ে সুখনীড়ে ছুটে এসেছেন। হামিদা বেগম ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে আর্যর কাঁধে হাত রাখলেন। অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে তিনি ডাকলেন,,

—‘আর্য! নিজেকে শান্ত করো বাবা। আপা যখন ফোন করেছে তখন একটিবার অন্তত তাদের সাথে কথা বলা প্রয়োজন। নিজের ভুলটা তো তুমি বুঝতে পেরেছো বলো? যত দেরিতেই হোক না কেন। আর বাবা-মার কাছে সন্তানের এই সকল ভুল কিছুই না বাবা।
আর্য তপ্ত কন্ঠে বলল,,—‘আমি তাদের ওপর রেগে নেই চাচিমা। বাবা মা হন তারা আমার বড্ড ভালোবাসি আমি তাদের। তবে এত বড় ঘৃণ্য কাজ করার পর এই মুখ কিভাবে দেখাবো আমি এখন তাদের?
হামিদা বেগম আর্যর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ললাটে স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়ে এক গভীর মমতায় বললেন,,
—‘শোন বাবা আর্য, মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। মাহেরিনের দেওয়া সেই মিথ্যে অপবাদের বেড়াজালে তুমি নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলে ঠিকই, কিন্তু আজ তো সত্যের আলো ফুটেছে। বাবা-মায়ের মন তো সাগরের মতো গভীর বাবা, সেখানে সন্তানের প্রতি কেবল ভালোবাসাই জমা থাকে, ক্ষোভ নয়। তারা কেবল তোমার মুখটি দেখার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।আর তুমি তৃষার কথা ভাবো। এই বাড়ির বৌ হিসেবে ওরও তো একটা অধিকার আছে নিজের শ্বশুর-শাশুড়িকে চেনার, তাদের দোয়া পাওয়ার। তুমি কি চাও না ওরা দেখুক তুমি কত লক্ষ্মী একটা মেয়েকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পেয়েছো?

আর্য কিছুক্ষণ নিরুত্তর হয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরকার সেই অপরাধবোধ আর লজ্জার দেয়ালগুলো যেন চাচিমার কথায় ধীরে ধীরে ধসে পড়ছে। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে বলল,,
—‘আমি কি সত্যিই ক্ষমার যোগ্য চাচিমা? যে বাবা-মাকে আমি মাহেরিনের কথার ওপর ভিত্তি করে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম, আজ তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহসটা আমি কোথায় পাব? তবুও… আপনি যখন বলছেন, আমি যাব। তাদের প্রতি করা আমার প্রতিটি অন্যায়ের দায়ভার আমি মাথা পেতে নেব।
হামিদা বেগম হাসিমুখে বললেন, —‘এই তো আমার সোনার ছেলে! দেখবি ওনারা তোকে দেখামাত্রই সব ভুলে বুকে টেনে নেবেন।
আর্য আর দেরি করল না। সে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে দোতলার দিকে পা বাড়াল। করিডোরের মাঝপথে থেমে সে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা তৃষার দিকে স্থির চোখে তাকাল,গম্ভীর অথচ স্পষ্ট স্বরে বলল,,

—‘তৃষা! দাঁড়িয়ে কী দেখছেন? চটপট গিয়ে তৈরি হয়ে নিন। আমাদের হাতে সময় কম। সো, বি কুইক!
তৃষা আর্যর এই আকস্মিক পরিবর্তনে কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও মুহূর্তেই তার মুখে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত নিজের ঘরের দিকে ছুটল তৈরি হওয়ার জন্য। পরক্ষণেই মনে পড়ল টুইংকেলের কথা। তৎক্ষণাৎ ওকে দুহাতে আগলে দৌড়ে দোতলার উদ্দেশ্যে যেতে যেতে বলল,,
—‘চলো কিউটি পাই, আজকে আমরা আমাদের নিজেদের বাসায় যাব।
ছোট্ট টুইংকেল তৃষার দিকে ফিরে বলল,,—‘আমাদের বাসা মানে? এটাই তো আমাদের বাসা বানি।
তৃষা মুচকি হাসলো টুইংকালের বোকা প্রশ্নে। তার সরল প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে তৃষা সম্মুখ পানে এগোতে এগোতে বলল,,—‘এখানে তো আমরা থাকি কিন্তু ওখানে মি তোমার পাপা, তোমার সবাই থাকে ‌দাদুন দাদিয়া সব্বাই সোনা।
—‘আমারও দাদুন দাদিয়া আছে বানি?
—‘আছে তো সোনা।
—‘তাহলে কোথায় তারা?
—-‘আমরা তো আজকে তাদের কাছেই যাচ্ছি তখন গিয়ে দেখো তারা কোথায়।
—‘ওক্কে বানি আমি খুব এক্সাইটেড।
—‘আমিও সুইটহার্ট।

জৈষ্ঠ্যের তপ্ত দ্বিপ্রহর আজ ধরিত্রীর বুকে এক অদৃশ্য দাহ ছড়িয়ে দিয়েছে। মধ্যগগনের সূর্যটা যেন কোনো এক রোষানলে অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। হামিদা বেগম কিছুক্ষণ আগেই তৃষার প্রয়োজনীয় সবটুকু গুছিয়ে দিয়ে বিদায় নিয়েছেন। তাঁর পরম মমতায় ঘেরা দোয়াটুকু সঙ্গী করে আর্য, তৃষা আর ছোট্ট টুইংকেল রওনা হলো গন্তব্য খুলনা। পিচঢালা রাজপথ চিরে আর্যর সাদা রঙের সেডানটি যখন দ্রুতগতিতে ছুটছে, তখন তৃষার মনের ভেতর এক অজানা রোমাঞ্চ আর শঙ্কার লুকোচুরি। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর গাড়ির এসির স্নিগ্ধতার মাঝে আজ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে সুখনীড়ের মানুষগুলোর জীবনে।

গাড়ির ভেতরে এক পিনপতন নীরবতা। আর্যর হাত দুটি স্টিয়ারিংয়ের ওপর বড্ড স্থির, যেন সে কোনো গভীর ধ্যানের মধ্য দিয়ে এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে চলেছে। তৃষা আড়চোখে আর্যর সেই রাশভারী মুখাবয়বের দিকে তাকাচ্ছিল। আর্যর কপালে এখন আর সেই রাগের চিহ্ন নেই, বরং একরাশ বিষণ্ণতা আর উৎকণ্ঠা সেখানে ভিড় জমিয়েছে।হঠাৎ করেই টুইংকেল জানালার বাইরে হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠল,
—‘পাপা! দেখো দেখো, ওই গাছগুলো কেমন দৌড়াচ্ছে আমাদের সাথে! আমরা কি ওনাদেরও দাদুন-দাদিয়ার বাসায় নিয়ে যাব?
টুইংকেলের এই নিষ্পাপ প্রশ্নে আর্যর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে টুইংকেলের নরম গালে আলতো করে টোকা দিয়ে বলল,

—‘না মা, ওরা তো ওখানেই থাকবে। আমরা অনেক দূরে যাব, যেখানে তোমার জন্য অনেক আদর জমা আছে।
তৃষা এবার একটু নড়েচড়ে বসে আর্যর দিকে তাকালে আর্য শান্ত গলায় বলল,,
—‘তৃষা, খুলনা পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবে। আপনি চাইলে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারেন। আপনার হাতটার কথা মাথায় রাখবেন, বেশিক্ষণ বসে থাকলে আবার পেইন শুরু হতে পারে।
তৃষা মাথা নেড়ে মুচকি হাসল,,

—‘আমার একদম ঘুম আসছে না । বরং আমার ভাবতেই খুব ভালো লাগছে যে আজ আপনার বাবা-মায়ের সাথে দেখা হবে। ওনারা নিশ্চয়ই আপনাকে দেখে খুব খুশি হবেন।
আর্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড়িয়ে বলল,
—‘খুশি নাকি ঘৃণা, সেটাই দেখার বিষয়। জীবনের অনেকটা সময় মাহেরিনের দেওয়া মরীচিকার পেছনে ঘুরে আমি প্রকৃত হীরা হারিয়েছিলাম। আজ সেই খেসারত দেওয়ার পালা।
তৃষা কি যেন ভেবে হঠাৎ নরম স্বরে বলল,
—‘ভুল তো সবাই করে। কিন্তু সেই ভুল স্বীকার করার নামই তো মানুষ। আপনি তো নিজের শেকড়ে ফিরছেন, শেকড় কখনো কাউকে ফিরিয়ে দেয় না।
আর্য তৃষার দিকে একবার তাকাল। এই মেয়েটা যে কখন থেকে তার জীবনের প্রতিটি ঝড়ে এক শক্ত খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা সে নিজেও জানে না।

নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতা চিরে আর্যর গাড়িটি খুলনার জনাকীর্ণ সড়ক ধরে এগোচ্ছিল। এসির মৃদু গুঞ্জন আর ইঞ্জিনের একঘেয়ে শব্দের মাঝে গাড়ির ভেতরটা যেন এক অন্য জগতের অভয়ারণ্য। পাশে বসা তৃষা দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিতে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। তার অবাধ্য মাথাটি কখন যে নিজের অজান্তেই আর্যর প্রশস্ত কাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছে, তা সে নিজেও জানে না।
আর্যর ডান কাঁধে তৃষার সেই উষ্ণ আর নিয়মিত নিঃশ্বাসের পরশ তাকে এক অদ্ভুত শিহরণে বিদ্ধ করছে। তৃষার চুলের সেই পরিচিত ল্যাভেন্ডার সুবাস আর্যর নাসারন্ধ্রে এসে ধরা দিচ্ছে বারবার। আর্য বাম হাতে স্টিয়ারিং সামলে পরম মমতায় দেখে নিল তার কোলের ওপর গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা ছোট্ট টুইংকেলকে। এই এক চিলতে গাড়ির ভেতরেই যেন আজ আর্যর সমগ্র পৃথিবী বন্দি।

তৃষার চুলের কয়েকটি অবাধ্য গোছা তার কপালে এসে লুটোপুটি খাচ্ছে। আর্য স্টিয়ারিংয়ে এক হাত রেখে অত্যন্ত সন্তর্পণে অন্য হাতটি বাড়িয়ে তৃষার কপাল থেকে সেই কেশগুচ্ছ সরিয়ে দিল। তৃষার সেই ঘুমন্ত, নিষ্পাপ মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে আর্যর মনে হলো, জীবনের সমস্ত ঝড়ঝাপটা শেষে এই এক টুকরো শান্তি যেন তারই প্রাপ্য ছিল। বাতাসের ঝিরিঝিরি শব্দের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া তৃষার প্রতিটি প্রশ্বাস আর্যর হৃদস্পন্দনের সাথে এক নতুন সুর তুলছিল। জানালার ওপাশে দ্রুত ধাবমান ছায়াবৃক্ষ আর দূর দিগন্তের কোনো এক প্রাঙ্গণ থেকে ভেসে আসা ক্ষীণ সুরেলা গানের লহরী,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৭

🎶ঠিক এমন এভাবে….
তুই থেকে যা স্বভাবে….
আমি বুঝেছি ক্ষতি নেই….
আর তুই ছাড়া গতি নেই….🎶
কোনো এক অজানা অনুভূতির তাড়নায় আর্যর হাতখানা থেমে গেল। কি এক অযাচিত আবেশে সে না চাইতেও চেয়ে রইলো ঘুমন্ত তৃষার পানে।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৯