Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৭

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৭

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৭
নওরিন কবির তিশা

হাসপাতালের দীর্ঘ করিডোর জুড়ে সাদা রঙের একঘেয়েমিতে যেন প্রাণহীনতার প্রলেপ মাখানো। নাসারন্ধ্রে এসে বিঁধছে ফিনাইল আর ডেটলের সেই তীব্র, উটকো রাসায়নিক ঘ্রাণ, যা ক্রমাগত মনে করিয়ে দেয় জীবনের নশ্বরতাকে। চারপাশের এই যান্ত্রিক নিস্তব্ধতার বুক চিরে মাঝে মাঝে স্ট্রেচারের চাকার যে ঘড়ঘড়ানি শব্দ ভেসে আসছে, তাতে তৃষার বুকের ভেতরটা যেন যন্ত্রণায় দলা পাকিয়ে যাচ্ছে।
সাদা দেয়ালের এই নিস্পৃহ রাজ্যটা ওর কাছে সবসময়ই এক মূর্ত বিভীষিকা। বদ্ধ বাতায়নে যেন মিশে আছে অসংখ্য মরণপণ যুদ্ধে হেরে যাওয়া মানুষের শেষ দীর্ঘশ্বাস আর না বলা হাহাকার।​গাড়ি থেকে নামার সময় তৃষার পা দুটো যেন কিছুতেই এগোতে চাইছিল না। সে আর্যর দিকে ফিরে মিনতি মাখানো স্বরে বলল,,

​—‘আজকে কি না করালেই নয়? দেখুন, গন্ধটা কেমন উৎকট! আমার খুব ব’মি পাচ্ছে। ব্যান্ডেজটা কাল খুললে খুব একটা ক্ষতি হবে না, প্লিজ…!
​আর্য এক মুহূর্তের জন্য থামল। তৃষার ফ্যাকাসে মুখ আর চোখের কোণে জমে থাকা ভয়ের বিন্দুগুলো ওর নজরে এল। তবে সে নরম হলো না। বরং তৃষার অবাধ্য হাতটা নিজের বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় পুরে একরাশ গাম্ভীর্য নিয়ে ধমকের সুরে বলল,,
​—‘যথেষ্ট হয়েছে! কলেজে গিয়ে স্টান্ট দেখানোর সময় তো এই বমি ভাব বা ভয়ের কথা মনে ছিল না? এখন কোনো ওজর-আপত্তি শুনব না। চুপচাপ ভেতরে চলুন। আপনার এই আজ না কাল করার খামখেয়ালিপনায় আমি আর এক মিনিটও নষ্ট করতে চাই না। সো, মুভ!
​আর্যর সেই অকাট্য আদেশের সামনে তৃষার কোনো বাহানা টিকল না। এক প্রকার জোর করেই ওকে টানতে টানতে সেই গুমোট করিডোর পেরিয়ে কনসালটেশন রুমের দিকে নিয়ে চলল আর্য।

ভেতরে প্রবেশ মাত্র একজন এপ্রোন পরিহিত সুদর্শন যুবক এগিয়ে আসলো। আর্য ভ্রুকুটি মিশ্রিত দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে বলল,,
—‘আপনাকে তো ঠিক..?
যুবকটি অমায়িক হেসে বলল,,—‘আমি সবুজ, স্যার।সবুজ আহমেদ ইন্টার্ন, দুদিন হলো এসেছি।
আর্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,,–‘ওহ!
আর্য মুখে ‘ওহ’ বলেছে ঠিকই তবে মনের কোণের খচখচানি কমছে না। বিরক্তিতে কপাল দলা পাকিয়ে আসছে। সবুজ নামক ছেলেটির তৃষার দিকে তাকানোর ধরনটা ভালো ঠেকছে না তার কাছে। সবুজ তৃষার দিকে তাকিয়ে আলতো হেঁসে বলল,,

—‘ কি প্রবলেম ম্যাম?
পরমুহূর্তেই ওর দৃষ্টি কাড়লো শুভ্র ‌ব্যান্ডেজে আবৃত তৃষার হাতখানা।ও তৎক্ষণাৎ ব্যস্ত কন্ঠে বলল,,
—‘আপনার তো দেখি ডান হাত ইনঞ্জুরড।তা ‌ব্যান্ডেজ খুলবেন নাকি?আসুন দেখি আ….!
তার কথার ইতি টানার পূর্বমুহূর্তে আর্য ওকে আটকে তৃষাকে নিজের কাছাকাছি টেনে বলল,,
—‘নাথিং আমরা অন্য একটা কাজে এসেছিলাম ভুলবশত এখানে ঢুকে পড়েছি।স্যরি।
আর্যর এমন‌ কথায় বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালো তৃষা। ভুলবশত এখানে ঢুকে পড়েছি মানে? ওত জানত ব্যান্ডেজ খুলতেই আজকে এসেছিল ওরা। ও প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে আর্যর দিকে চেয়ে অবাক কণ্ঠে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই আর্য ওর বাঁ হাতটা বেশ শক্তপোক্ত করে ধরে বাইরের দিকে যেতে যেতে বলল,,
—‘চলুন তৃষা।
—‘কিন্তু…
—‘কোনো কিন্তু নয়।জাস্ট মুভ।

ও তৃষাকে নিয়ে প্রস্থান করল।বেশ তড়িঘড়ি পদক্ষেপে গাড়ির সম্মুখে পৌঁছালো ওরা।আর্য তৃষার সাইডের দরজা খুলে ওকে বসিয়ে দিয়েই নিজে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো।তৃষা সামান্য কৌতূহলী মনে হাজারও প্রশ্নের স্তূপ জমেছে মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে। তবুও সেগুলো অবদমিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সে।কেনোনা এখন প্রশ্ন উত্তরের চক্করে আর্য যদি আবার ব্যাক করে হাসপাতালে নিয়ে যায় ওকে।না বাবা দরকার নাই।
অন্তত আজকের মত তো ওই বিভীষিকা থেকে নিস্তার পাওয়া গেল। ভাবতে ভাবতেই ও দেখল গাড়িটা বেশ অনেকদূর এগিয়েছে কিন্তু হঠাতই তার খেয়াল হলো, আর্য ওদের চেনা বাড়ির রাস্তা ধরে না গিয়ে বরং উল্টো দিকে গাড়ি ঘুরিয়েছে। বাম পাশের বিশাল সিগন্যালটা পেরিয়ে গাড়িটা এখন বনানীর দিকে এগোচ্ছে।
তৃষা ভ্রু কুঁচকে আর্যর দিকে তাকালো। আর্যর চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি নিবদ্ধ সম্মুখপানে। তৃষা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,,

—-‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?
—‘হসপিটালে?
তৃষা আর চুপ থাকতে পারল না, কণ্ঠে বিরক্তির রেশ টেনে প্রশ্নের ঝড় তুললো,,
—‘আরে মিস্টার! আপনার প্রবলেমটা কী বলুন তো? মানে এত মুড সুইং হয় কেন আপনার? এই তো মাত্র হাসপাতাল থেকে বের হয়ে এলেন, বললেন যে আজকে কিছু হবে না আবার হসপিটালে যাচ্ছি মানে কি?
আর্য স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে বেশ নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল,,
—‘আমি বলেছি ওই হাসপাতালে কাজ হবে না, এটা বলিনি যে আজ কাজই হবে না। উই আর গোয়িং টু অ্যাপোলো, আমার পরিচিত একজন সিনিয়র সার্জন সেখানে আছেন।আমি চাই না কোনো কাঁচা হাতের ইন্টার্ন আপনার ইনজুরি নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করুক।
তৃষা দুই ঠোঁট উল্টে বিড়বিড়িয়ে বলল,,
—‘বাহ! মিস্টার পারফেকশনিস্টের তো বাহানার অভাব নেই। এখন সিনিয়র সার্জনের কাছে গিয়ে যদি দেখেন তিনি কোনো সুদর্শন যুবক, তবে কি সেখান থেকেও আমাকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে দৌড় দেবেন?
আর্যর কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। সে গাড়িটা একটা জ্যামের মুখে ব্রেক করে তৃষার দিকে স্থির চোখে চাইল। ওর সেই গম্ভীর চাউনিতে তৃষার কথাগুলো মাঝপথেই আটকে গেল। আর্য ফিসফিস করে বলল,,

—‘বেশি কথা বলাটা কি আপনার সিলেবাসের অংশ তৃষা? চুপচাপ বসে থাকুন। আমি যেটা করছি আপনার ভালোর জন্যই করছি।
তৃষা এবার রীতিমতো হাত-পা ছুড়ে প্রতিবাদ করল,,
—‘কি চুপ করব? আর এক্সপেরিমেন্ট মানে কী? ওই ছেলেটি তো জাস্ট নাম আর প্রবলেম জিজ্ঞেস করছিল। আপনি তো ওকে কথা বলার সুযোগই দিলেন না! আপনি কি সব জায়গাতেই নিজের ক্যাপ্টেন অর্ডার চালাতে চান? ওত সুন্দর করে কথা বলছিল…!
তৃষার মুখে ওই সুন্দর করে কথা বলা আর সবুজের প্রশংসা শুনে আর্যর বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই তপ্ত হয়ে উঠল। সে গাড়ির এসিটা আরও দুই ডিগ্রি কমিয়ে দিল, যদিও তার ভেতরের উত্তাপ তাতে বিন্দুমাত্র কমছে না। সে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল,,
—‘সুন্দর করে কথা বলছিল! যেখানেই যাই সেখানেই কি সব ভবঘুরে আপনার ওপর এভাবে নজর দেবে? নিজের রূপের ছটায় চারপাশটা কি অমাবস্যার চাঁদ বানিয়ে রাখাটা জরুরি? এত সুন্দর হওয়ার কী দরকার ছিল আপনার!
তবে মুখে সে এসবের কিছুই প্রকাশ করল না। বরং অত্যন্ত তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,,,
—‘সুন্দর কথা দিয়ে ব্যান্ডেজ খোলা যায় না তৃষা, ওটার জন্য স্কিল লাগে। আর ওই সবুজ না নীল যে-ই হোক, ওর তাকানোর ধরন আমার মোটেও প্রফেশনাল মনে হয়নি। বেশি কথা না বলে সিটে হেলান দিয়ে বসুন। আমরা দশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাব।
তৃষা গাল ফুলিয়ে জানালার বাইরে মুখ ফিরিয়ে নিল। সে বিড়বিড়িয়ে বলল,,

—‘আস্ত একটা ডিক্টেটর! জেলাসি আর অহংকারের দোকান একটা। আপনার শকুনের মতো চোখ কি শুধু মানুষের খুঁত ধরার জন্যই?
আর্য এবার আড়চোখে তৃষার দিকে তাকাল। রোদে পোড়া দুপুরে তৃষার নাকের ডগায় জমে থাকা ঘাম আর অবাধ্য চুলের কয়েকটা গোছা ওর কপালে এসে লুটিয়ে পড়ছে। আর্যর খুব ইচ্ছে করল ওই চুলগুলো নিজ হাতে সরিয়ে দিতে, কিন্তু সে তার পেশাদারী গাম্ভীর্যের আড়ালে নিজেকে শক্ত করে রাখল।
গাড়িটা এক অভিজাত ক্লিনিকের সামনে এসে থামল। আর্য ইঞ্জিন বন্ধ করে তৃষার দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ গভীর স্বরে বলল,,,

—‘লুক তৃষা, আপনার ওই ব্যান্ডেজ করা হাতটা শুধু আপনার নয়, ওটা সারানোর দায়িত্বটা এখন আমার ওপর বর্তেছে। আমি কোনো রিস্ক নিতে পারি না। এখন চটপট নামুন
তৃষা আর্যর সেই অন্তর্ভেদী চাহনির সামনে যেন আবার হেরে গেল।
ক্লিনিকের করিডোরে আর্যর বলিষ্ঠ পদক্ষেপের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। আর্য অত্যন্ত সতর্কতায় তৃষাকে নিয়ে ক্যাবিনে প্রবেশ করল। সাদা দেয়াল আর আসবাবের রূঢ় জৌলুসের মাঝে তৃষার পাংশুটে মুখচ্ছবি আরও বেশি করুণ ঠেকছিল। আর্যর পরিচিত বয়োজ্যেষ্ঠ সার্জন এসে যখন তৃষার ব্যান্ডেজ মোড়া হাতটি নিজের হাতে তুলে নিলেন, তৃষার হৃৎপিণ্ড যেন পাঁজরের ভেতর এক উন্মত্ত ঝঞ্ঝা তৈরি করল।
​কাঁচির ধারালো ফলা যখন শুভ্র গজ আর ব্যান্ডেজের স্তরে কামড় বসাল, তৃষা যন্ত্রণায় নীল হয়ে দুচোখ শক্ত করে বুজে ফেলল। দীর্ঘদিন আবদ্ধ থাকায় ওর পেশিগুলো যেন এক অসহ্য স্পন্দনে রি রি করে উঠছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই তৃষা অনুভব করল তার সুস্থ বাঁ হাতটি আর্যর উষ্ণ আর বলিষ্ঠ করতল দ্বারা সজোরে আবদ্ধ হয়েছে। আর্যর স্পর্শের সেই প্রচ্ছন্ন আশ্বাস যেন এক নিমিষেই তৃষার সমস্ত ত্রাস হরণ করে নিল।
​আর্যর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমলেও তার দৃষ্টি ছিল তৃষার আনত মুখে স্থির। সার্জন যখন ব্যান্ডেজ সরিয়ে ত্বকের ওপর জমে থাকা ওষুধের আস্তর পরিষ্কার করছিলেন, তৃষা ব্যথার আতিশয্যে আর্যর হাতখানা আরও জোরে খামচে ধরল। আর্য একটুও বিচলিত না হয়ে তৃষার খুব নিকটে এসে দাঁড়াল, তার গলার স্বর এখন নিস্তব্ধ অরণ্যের শীতল পরশের ন্যায় স্নিগ্ধ,,

​—‘জাস্ট রিলেক্স তৃষা। অলমোস্ট ডান। আমার দিকে তাকান, অন্যদিকে মন দেবেন না।
​আর্যর সেই গম্ভীর অথচ পরম মমতাময়ী নির্দেশে তৃষা ধীরলয়ে চোখ মেলল। দেখল আর্যর চোখে সেই চিরচেনা কঠোরতা আজ যেন এক অদ্ভুত মায়ায় বিগলিত হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে যখন হাতটি উন্মুক্ত হলো, আর্য অত্যন্ত কোমলতায় নিজের আঙুল দিয়ে তৃষার আঙুলের ডগাগুলো ছুঁয়ে দেখল রক্তসঞ্চালন ঠিক আছে কি না। আর্যর সেই অপ্রকাশিত যত্নের ধারা তৃষার হৃদয়ে এক অব্যক্ত অনুরাগের প্রলেপ মাখিয়ে দিচ্ছে।

তৃষা-আর্যর বাড়ি ফিরতে ফিরতে সূর্যটা পশ্চিম দিগন্তে হেলে পড়েছে। গোধূলির কমলাভ রশ্মি বিচ্ছুরিত হচ্ছে সেথায়।গোধূলির সেই মায়াবী আলোয় সুখনীড় যখন এক শান্ত স্নিগ্ধতায় অবগাহন করছে, ঠিক তখনই আর্যর গাড়ির শব্দে বাড়ির নিস্তব্ধতা ভাঙল। সদর দরজা দিয়ে তৃষা ভেতরে পা রাখতেই একজোড়া ক্ষুদে পায়ের শব্দে পুরো ড্রয়িংরুম মুখরিত হয়ে উঠল।
টুইংকেল সোজা এসে তৃষার কোমরে দুই হাত জড়িয়ে ধরল। ওর নজর মুহূর্তেই পড়ল তৃষার সেই উন্মুক্ত ডান হাতের ওপর, যেখান থেকে এতদিনের সেই সাদা বিভীষিকা উধাও হয়ে গেছে।​টুইংকেল উত্তেজনায় খিলখিল করে হেসে উঠে বলল,,
—‘বানি! তোমার হাতের সেই পচা সাদা জামাটা কোথায় গেল? তুমি কি ম্যাজিক করে ওটা গায়েব করে দিয়েছ? এখন কি তুমি আবার আমাকে দু-হাতে জাপ্টে ধরে কিস করতে পারবে?
​তৃষা সামান্য ঝুকে টুইংকেলের উচ্চতায় বসলো তারপর ওকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে ওর নাকে নাক ঘষে আদুরে স্বরে বলল,,

—‘ইয়েস মাই লিটল প্রিন্সেস! বানি এখন একদম ঠিক হয়ে গেছে। এখন থেকে আমরা আবার আগের মতো ফান করব, আর প্রত্যেকটা মিশনে আমি তোমার পার্টনার হবো। আই অ্যাম ব্যাক, সুইটহার্ট!
​টুইংকেল খুশিতে তৃষার গালে একটা শব্দ করে চুমু খেয়ে বলল,,
—’প্রমিজ তো? এবার পাপা বকলে কিন্তু তুমি আমাকে নিয়ে একদম রকেট দিয়ে চাঁদে চলে যাবে!
​ওদের এই খুনসুটি আর আনন্দের মাঝে আর্যর গম্ভীর পদক্ষেপের শব্দে পরিবেশটা হঠাৎই একটু ভারিক্কি হয়ে এল। আর্য সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে আড়চোখে তৃষার উচ্ছ্বল মুখের দিকে তাকাল। ​ও ঘাড় ঘুরিয়ে অত্যন্ত নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল,,
—‘ব্যান্ডেজ খুলেছে মানেই কিন্তু অলিম্পিকে নাম লেখানোর ছাড়পত্র পাননি তৃষা। হাড়ের জয়েন্টগুলো এখনো বড্ড নাজুক। তাই আপনার ওই চিরচেনা ক্ল্যামজি স্বভাবটা দয়া করে নিজের স্টোর রুমেই বন্দি করে রাখুন। টুইংকেলের সাথে রকেট মিশনে যাওয়ার আগে অন্তত নিজের গ্রাউন্ডেড থাকার চেষ্টা করবেন। মনে রাখবেন, ফিজিওথেরাপিটা এখনো বাকি আছে, সো ডোন্ট ওভারডু ইট।
​আর্যর এই রসকষহীন উপদেশে তৃষা মুখ ভেংচি কাটল ঠিকই, কিন্তু টুইংকেলের কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,,

—‘দেখেছ হানি? তোমার পাপার ওই পচা ইনস্ট্রাকশন ডিকশনারিটা কোনোদিনও শেষ হবে না। চল আমরা বরং চুপিচুপি আমার রুমে গিয়ে নতুন কোনো প্ল্যান করি!
​—‘হুম চলো বানি। জানো তো আজকে কি হয়েছে? তুমি এখন কলেজে চলে গিয়েছিলে তখনই তো পাপা কত্ত রাগ করেছিল!
তৃষা ওকে নিয়ে নিজের কক্ষে দিকে যেতে বলল,,—’চলো চলো রুমে গিয়ে বলবে হানি!

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৬

নিশুতি রাতের সুখনীড় যেন এক শান্তিময় অভয়ারণ্য। জানালার ওপারে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক আর ভেতরে এসি-র মৃদু গুঞ্জন। ড্রয়িংরুমের আবছা আলোয় তৃষার ডাইনিং গোছাতে মত্ত। টুইংকেলকে কিছুক্ষণ আগেই খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে এসেছে ও। আর্যর কড়া নির্দেশনা রয়েছে রাত নয়টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ার। আর ইতিমধ্যেই আটটা বেজে ৪৫ মিনিট। তাই ব্যস্ততার পরিমাণটা বেশি তৃষার।
হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে লিভিং রুমের ল্যান্ড ফোনটি সজোরে বেজে উঠল। এই অসময়ে ফোনের আওয়াজ যেন এক অজানা আশঙ্কার সংকেত বহন করে আনল। তৃষা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করে ধীর স্বরে বলল,,
—‘হ্যালো?
অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসলো এক মমতাময়ী বৃদ্ধার কণ্ঠস্বর,,
—’এটা কি ক্যাপ্টেন আর্য এহসানের নাম্বার?

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৮