ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৩
নওরিন কবির তিশা
দীর্ঘ তন্দ্রাচ্ছন্নতার অবসান ঘটিয়ে পিটপিটিয়ে চোখ মেলতেইতেই তৃষার সামনে দৃশ্যমান হলো কয়েক জোড়া চঞ্চল দৃষ্টি, যারা বিস্ময়াভিভূত দৃষ্টিতে অবলোকন করছে তাকে। ঘুম ভেঙ্গেই এমন দৃশ্যে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও পরক্ষণে পাশে বসা টুইংকেল কে দেখে কিছুটা নিশ্চিন্ত হলো ও। এদিকে ওর ঘুম ভাঙতেই টুইংকেল উৎসুক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
-‘ ও বানি তুমি উঠলে তাহলে।
তৃষা ঘুম ঘুম কন্ঠে বলল,-‘ হুম সুইটহার্ট।
-‘ জানো বানি কি হয়েছে?
-‘ কি সুইটহার্ট?
-‘ তুমি তো ঘুমিয়ে ছিলে, তাই পাপা তোমাকে হিরোদের মত করে কোলে করে নিয়ে এসেছিল এখানে। আর জানো তো তখন সবাই তোমার আর পাপার দিকে তাকিয়ে ছিল।
টুইংকালের কথাগুলো কর্ণগোচর হতেই শ্রাবনান্দ্রেয় ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো তৃষার। দৃষ্টি বিস্ফোরিত লজ্জায় মনে হল ধরিত্রী দ্বিধা হোক আর ও তার মধ্যে ঢুকে যাক। এরই মাঝে হঠাৎ এক নবকুড়ির দলবল ঘিরে ধরল ওকে।রাইসা ওর দিকে এগিয়ে এসে বিছানায় ধপাস করে বসে বলল,,
-‘ আরে ডোন্ট শাই ভাবিমনি। আমরাতো রীতিমত ভড়কে গেছি ভাইয়াকে ও ভাবে দেখে। মানে ওনার মতো মানুষ সোজা কোলে করে এন্টি নিলো। উফফসস কি জোস লাগছিল।
তৃষা ভালো করে তাকিয়ে দেখলো চঞ্চল অষ্টাদশী কন্যাটির পানে। রাইসা তৎক্ষণাৎ ওই দিকে তাকিয়ে খানিক প্রসারিত হেসে বলল,
-‘ ও হ্যাঁ তোমাকে তো আমার নামই বলিনি আমি রাইসা। মেহেরা ইবনাত রাইসা। তোমার সব থেকে কিউট ননাস।
এতক্ষণ সব ঠিক চলছিল হুট করে রাইসার এমন কথায় তেড়ে আসলো রায়া। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-‘ তুই কিউট মানে? একটি কিউট ননাস আমি ভাবিমনির। তাইনা ভাবিমনি?
তৃষা খানিক মিষ্টি হাসলো ওদের এমন খুনসুটিতে।
-‘ তোমরা সবাই কিউট। আমার কিউটি কিউটি ননাস। ঝগড়া করো না প্লিজ।
রাইসা ওকে মারতে আসা রায়ার হাতটা আটকে তৃষার উদ্দেশ্যে বলল,
-‘ দেখেছো তো ভাবি মণি কি পরিমান বাঁদর ও!
রায়া তৎক্ষণাৎ ওকে ছেড়ে দিয়ে বলল,,
-‘ তোর সাথে বোঝাপড়া পরে হচ্ছে। যাই হোক ভাবি মনি আমি তোমার সবচেয়ে কিউট আর সবার ছোট ননাস। ওই দামড়ি তো কলেজে কিন্তু আমি এবার সবে ক্লাস নাইনে।
রাইসা আর রায়ার খুনসুটি যখন তুঙ্গে, তখনই হাতে রুপালি ট্রে আর তাতে কয়েক গ্লাস লেবুর শরবত নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল অহনা। ওর শান্ত আর ধীরস্থির চলনই বলে দিচ্ছে ও এই বাড়ির বড় মেয়ে। ঘরে ঢুকেই ও রাইসা আর রায়াকে এক চিলতে কড়া নজরে দেখে নিয়ে ধমকের সুরে বলল,
-‘ তোরা কি শুরু করলি বল তো? বেচারি তৃষা মাত্র ঘুম থেকে উঠল, আর তোরা একঝাঁক কাকের মতো ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লি? একটু নিঃশ্বাস নিতে দে ওকে!
অহনার কথায় দুই বোন একটু চুপসে গিয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুখ ভ্যাংচাল। অহনা এবার তৃষার দিকে ফিরে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে শরবতের গ্লাসটা এগিয়ে দিল। তৃষা বেশ লজ্জিত মুখে গ্লাসটা হাতে নিল। অহনা বিছানার একপাশে বসে সহজ গলায় বলল,
-‘ শোনো তৃষা, আমি কিন্তু তোমাকে নাম ধরেই ডাকব। সম্পর্কে আমি তোর বড় ননাস তাই আমি-আপনি করে দূরত্ব বাড়াতে চাই না। তুমি যেন কিছু মনে করো না আবার!
তৃষা দ্রুত মাথা নেড়ে স্মিত হাসল,,
-‘ আরে না না অহনা আপু, একদমই না। বরং আপনি নাম ধরে ডাকলেই আমি বেশি কমফোর্টেবল ফিল করব।
অহনা ওর পিঠে হাত রেখে বলল,-‘ এইতো আমার পিচ্চি বোন।
তৃষা হাসতে হাসতে একচুমুক শরবত খেল। তখনই ও লক্ষ্য করল ঘরের একদম কোণায় দুটো পিচ্চি ছেলে গুটিসুটি মেরে বসে আছে আর বড়দের কথা গিলছে। ওরা আর্যর ছোট মামার ছেলে রাদিফ আর রিক্ত-যমজ ওরা। অহনা ওদের দিকে তাকিয়ে চোখ পাকিয়ে বলল,
-‘ এই যে দুই চোর! তোরা ওখানে স্ট্যাচুর মতো বসে আছিস কেন? ভাবিমণির সাথে কথা বলতে পারিস না?
রাদিফ মাথা চুলকে লাজুক হেসে বলল,,
-‘ আমরা তো স্কোপই পাচ্ছিলাম না আপু! রাইসা আপু আর রায়া আপু যেভাবে মাইক হাতে নিয়েছে, আমাদের মতো ছোটদের সেখানে এন্ট্রি নেওয়াই টাফ!
রিক্ত পাশ থেকে সায় দিয়ে বলল,,
-‘ হ্যাঁ ভাবিমনি, আমরা তো ভাবছিলাম তুমি বোধহয় কোনো সায়েন্স ফিকশন মুভির হিরোইন,মাম্মা বারবার বলছে কেউ যেন তোমাকে ডিস্টার্ব না করে। আমরা তো ক্লাস ফাইভের স্টুডেন্ট, আমাদের তো আর তোমাদের মতো অত পাওয়ার নেই!
তৃষা ওদের এই পাকা পাকা কথা শুনে হোহো করে হেসে উঠল। ও ওদের ইশারায় কাছে ডেকে বলল,,
-‘ আরে না না, তোমরা এসো তো এখানে। তোমরা কি জানো, আমার টিমে মেম্বার হতে হলে তোমাদের মতো কিউট ছেলেদেরই আগে দরকার।
রাদিফ আর রিক্ত এবার সাহস পেয়ে তৃষার পাশে এসে বসল।
অন্দরমহলের এই কলকাকলির অন্তরালে উত্তর পার্শ্বের ঘরটাতে শ্রাবণের মেঘ জমেছে। আর্যদের মেজো মামার ছোট মেয়ে অরু তালুকদার মায়ার চোখেমুখে আজ শ্রাবণের মেঘের মতো এক থমথমে বিষণ্ণতা। কক্ষের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ও যখন তৃষার হাসিমাখা মুখের দিকে তাকাল, ওর বুকের ভেতরটা যেন অভিমানে মোচড় দিয়ে উঠল। কৈশোরের সেই দূরন্ত দুপুরগুলো থেকে আর্যর প্রতি এক নীরব অনুরাগ ও সযত্নে লালন করে এসেছে।
মাহেরিনের বিদায়ের পর মায়া ভেবেছিল, এবার হয়তো ধূসর মরূদ্যানে বৃষ্টির দেখা মিলবে; কিন্তু তৃষার এই স্নিগ্ধ উপস্থিতি ওর সেই রঙিন স্বপ্নের প্রাসাদে বজ্রপাত ঘটাল।আসমা বেগম, মেয়ের চোখের সেই কম্পিত লোনা জলের আভাষ পেয়ে দ্রুত ওর পাশে এসে দাঁড়ালেন। মায়ার কাঁধে হাত রেখে কিঞ্চিৎ কড়া অথচ সতর্ক স্বরে ফিসফিস করে বললেন,
-‘ মায়া! নিজেকে সামলা। অহেতুক শোক দেখিয়ে নিজের সম্মান হারাস না। কপালে যা নেই, তা নিয়ে শোক করা সাজে না। এখন বাইরে চল, সবাই তোর অপেক্ষা করছে।
মায়া তপ্ত এক দীর্ঘশ্বাস গোপন করে মায়ের কথায় যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়ল। ও মায়ের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বলল,,
-‘ আই ওয়ান্ট আর্য ভাই মা! আর তুমি তো জানো আমি যেটা চাই সেটা নিজের করেই ছাড়ি। আমার আর্য কেই লাগবে মা। আর্যকেই।
আসমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,,-‘ কি হচ্ছেটা কি মায়া? তুমি কি বুঝছো না আর্যর বিয়ে হয়ে গিয়েছে. ইভেন এটা ওর দ্বিতীয় বিয়ে।
-‘ সো হোয়্যাট মা? আমি যখন বলেছি আমার ওকে লাগবে তার মানে আমার ওকেই লাগবে।
বলেই ওয়াশরুমে প্রবেশ করলো মায়া। রজনীর নিস্তব্ধতার মাঝে মেয়ের এমন কথায় কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকাল আসমা বেগম। তার আদরে এই মেয়ে এমন বাঁদর হয়েছে এটা ভালো করেই জানা তার তবে এতদিনের আবদারগুলো আসমা বেগম যেভাবেই পারুক পূরণ করেছে কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব।
কিছুক্ষণ পর সবার সাথে নিচে নামলো তৃষা। ওর বাম হাতটা শক্ত করে জাপ্টে ধরে আছে টুইংকেল। আওড়াচ্ছে নিজের পাকা পাকা কথার ঝুলি। সিঁড়ি ভেঙ্গে নামার সময় তৃষা দেখল তালুকদার মঞ্জিলের বিশাল ড্রয়িংরুমের মাঝে বিদ্যমান সেগুন কাঠের ভারি সোফায় আয়েশ করে বসে আছেন মুরুব্বিরা।ছাদ থেকে ঝোলানো ভিক্টোরিয়ান ঝাড়লণ্ঠনের মৃদু হলদেটে আলোয় দেয়ালে টাঙানো তৈলচিত্রগুলো এক মায়াবী রহস্যময়তায় জেগে উঠেছে। ধোঁয়া ওঠা এলাচ চা আর গরম শিঙাড়ার সুবাসে ঘরটি আমোদিত; চারপাশের হাসিগল্পের প্রাণখোলা শব্দে পুরোনো এই আভিজাত্যমণ্ডিত অন্দরমহলটি আজ এক পরমাত্মীয়তার চাদরে মুড়ি দিয়ে শান্তিতে অবগাহন করছে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতেই তৃষার নজর কাড়ল সোফায় বসে থাকা বৃদ্ধা মহীয়সীকে—তিনি আর্যর নানি, তালুকদার মঞ্জিলের অভিভাবিকা। রুপালি চুল আর চশমার ওপর দিয়ে তীক্ষ্ণ অথচ মমতাময়ী দৃষ্টিতে তিনি তৃষাকে দেখছিলেন। তৃষা কাছে গিয়ে নিচু হয়ে সালাম করতেই তিনি টেনে সোফায় বসালেন। খসখসে হাতে তৃষার গাল ছুঁয়ে ধরা গলায় বললেন,
-‘ আমার নাতিডার পছন্দ দেখছি খাসা! নাতবৌ তো নয়, যেন আসমানের এক চিলতে চাঁদ। বড় খাটনি গিয়েছে মা তোমার, ওই আইলসা ছেলেটা বুঝি সারাপথ কোল থেকে নামায়নি?
নানির রসিকতায় ঘরজুড়ে হাসির রোল উঠল। বড় কর্তৃ সায়রা বেগম মৃদু হেসে তৃষার মাথায় হাত রাখলেন,,
-‘ ঘুম কেমন হয়েছে মা?
-‘ আলহামদুলিল্লাহ ভালো মামি।
এবার তিনি খানিক রসিকতা মিশিয়ে বললেন,
-‘ হবে নাই বা কেন আমাদের ছেলের কোলে চড়ে এসেছ যে।
ঘরভর্তি মানুষের সামনে স্যাররা বেগমের এমন কথায় লজ্জার সীমা রইল না তৃষার মাথা নিয়ে নিল ও সঙ্গে সঙ্গে।
ছোট কর্তৃ সালেহা বেগম পাশ থেকে ফোড়ন কাটলেন,
-‘ একদম ঠিক আর্যর গাম্ভীর্য তো দেখছি তোমার সামনে এসে একদম বরফ হয়ে গলে জল!
তৃষা ওভাবেই মেঝেতে চেয়ে রইল। অদ্ভুত অনুভূতির তাড়নায় মাথা তুলতে পারল না।
নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতায় তালুকদার মঞ্জিলের পূর্ব পার্শ্বের কক্ষটি আজ যেন এক মায়াবী কুহক। রুপালি চাঁদের আলো জানালার ঝরোকা চুইয়ে শ্বেতপাথরের মেঝেতে আলপনা এঁকেছে। ঘরের মাঝখানে আর্য আর তৃষা—দুজনেই নীরব, যেন শব্দহীন এক প্রগাঢ় সংলাপে মগ্ন।
টুইংকেল আজ দাদিয়ার আদরে অন্য ঘরে আশ্রিত, তাই এই বিশাল কক্ষে কেবল তাদের দুজনের নিশ্বাসের মৃদু কম্পন। আর্যর সেই অতন্দ্র প্রহরীসুলভ গাম্ভীর্য আর তৃষার কুণ্ঠিত আড়ষ্টতা মিলেমিশে এক অদ্ভুত রসায়ন তৈরি করেছে। এক বিছানায় থাকার এই সামাজিক দায়বদ্ধতা সবার কাছে গ্রহণীয় হলেও ওদের কাছে সেটা নয়। কেননা ওদের সম্পর্ক তো আর পাঁচটা দম্পতির মত নয়।কিন্তু এটা তো শুধু ওরাই জানে, অন্যদের কিভাবে বলবে ওরা? তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই দুজন এক কক্ষে এসেছে নিদ্রাযাপনে।
হঠাৎ নিস্তব্ধতা চিরে আর্যর কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো,
-‘ আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন।
-‘ মানে? আসলে আমি বলতে চাইছি আমি ঘুমালে আপনি কোথায় ঘুমাবেন?
আর্য একবার কক্ষটাই চোখ বুলালো। বিছানার পাশাপাশি বাড়তি কোন ঘুমাবার জায়গা নেই এখানে। পার্শ্ববর্তী ঝুল বারান্দায় একখানা দোলনা বিদ্যমান সেটাও ঘুমানোর জন্য যথেষ্ট জায়গা বহন করে না,
-‘ আই উইল ম্যানেজ। বাট আই থিংক আপনি টায়ার্ড ঘুমিয়ে পড়ুন।
-‘ টায়ার্ড তো আপনি নিজেও কম না এত রাস্তা জার্নি করেছেন। তাছাড়া আমিতো ঘুমিয়েছি আপনি বরং ঘুমান।
-‘ ডোন্ট নিড। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন।
-‘ বললাম না আপনাকে ঘুমাতে।
-‘ আমিও কিন্তু বলেছি আপনাকে ঘুমাতে। কথা কানে যাচ্ছে না?
-‘ কথা তো দেখছি আপনারও কানে যাচ্ছে না।
তৃষার গা ছাড়া ভাবে বলা কথাটায় আর্য বিরক্তিকর রাগী স্বরে বলল,
-‘ একটু বেশিই কথা বলছেন না? যা বললাম সেটা করুন।
-‘ আরে মশাই! বললাম তো ঘুমিয়ে পড়তে আমার এখন রাতে ঘুম তো সবকিছু আসবে না আপনি বরং ঘুমান।
নিশুতি রাতের সেই মায়াবী নিস্তব্ধতায় আর্য আর তৃষার মধ্যকার বাকযুদ্ধ যেন এক অদ্ভুত পূর্ণতা পেল। আর্যর কপালে বিরক্তির সূক্ষ্ম ভাঁজ, আর তৃষার চোখে একরোখা জেদ। আর্যর সেই রাগী কণ্ঠস্বরকে তোয়াক্কা না করেই তৃষা দুই হাত কোমরে বেঁধে সামনে এসে দাঁড়াল। ও বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
-‘ দেখুন মিস্টার, আপনার এই আই উইল ম্যানেজ থিওরিটা জাহাজে খাটতে পারে, কিন্তু এখানে নয়। এই ঘরে সোফা নেই, আর ওই ঝুল বারান্দার দোলনায় শুলে কাল সকালে আপনার পিঠের হাড়গুলো ডিসপ্লেসড হয়ে যাবে। তখন কিন্তু আমাকেই আবার সেবা করতে হবে। সো, জাস্ট স্টপ বিয়িং আ শহীদ!
আর্য ভ্রু কুঁচকে তৃষার দিকে এক পা এগিয়ে এল। ওর দীর্ঘ দেহের ছায়া তৃষার ওপর পড়তেই তৃষা কিঞ্চিৎ থতমত খেল। আর্য বেশ নিচু স্বরে বলল,
-‘ তৃষা, আপনি কি ভুলে যাচ্ছেন আপনি কার সাথে কথা বলছেন? আমি যেটা ডিসাইড করেছি সেটাই হবে। আপনি ঘুমান, আমার জন্য আপনাকে ওকালতি করতে হবে না।
তৃষা এবার দমে না গিয়ে এক পা আরও এগিয়ে দৃঢ় কন্ঠে বলল,,
-‘ ভুলছি না। আমি জানি আপনি অনেক জেদি। কিন্তু এখন জেদ দেখানোর সময় নয়। লুক মিস্টার, আপনিও টায়ার্ড, আমিও টায়ার্ড। মাঝখানের এই অদৃশ্য দেয়ালটা কি এক রাতের জন্য একটু সরানো যায় না? আমি আপনাকে ওফার করছি—আমরা দুজনেই এই বিশাল বিছানায় ঘুমাতে পারি। আমি আমার সাইডে থাকব, আপনি আপনার সাইডে। মাঝখানে বালিশের বর্ডার দিয়ে দেব যদি আপনার সিকিউরিটি নিয়ে ভয় থাকে!
-‘ আপনি কি সিরিয়াস? আপনি আসলেই কমফোর্টেবল তো?
তৃষা এবার বিছানায় ধপাস করে বসে পড়ে বালিশগুলো ঠিক করতে করতে বলল,,
-‘ মিস্টার পারফেকশনিস্ট, আমি আপনাকে আমার হাসব্যান্ড হিসেবে সবার সামনে রিপ্রেজেন্ট করছি, সো আপনার সাথে এক বিছানায় ঘুমানোটা আমার কাছে এখন কোনো ক্রাইম নয়। আর তাছাড়া, আপনি তো নিজেই আমাকে কোল করে নিয়ে এসেছেন, তখন কি আমার পারমিশন নিয়েছিলেন? এখনকার জন্য জাস্ট রিল্যাক্স করুন আর ঘুমান। আমি প্রমিজ করছি, ঘুমের ঘোরে আমি আপনার ওপর অ্যাটাক করব না!
আর্য এবার পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ধীর পায়ে বিছানার অন্য পাশে গিয়ে বসল। তৃষা মাঝখানে এক সারি কোলবালিশ আর কুশন সাজিয়ে দিয়ে এক গাল হেসে বলল,,
-‘ বর্ডার ডান! এবার আপনি আপনার টেরিটরিতে থাকুন, আমি আমারটাতে।গুড নাইট।
আর্য নিঃশব্দে শুয়ে পড়ল। ঘরের আলো নিভে যাওয়ার পর চাঁদের আলোয় তৃষার শান্ত মুখচ্ছবিটা ওর নজরে এল। আর্য অনুভব করল, ওর জীবনের কঠিন অনুশাসনে তৃষা যেন এক পশলা অবাধ্য বৃষ্টির মতো মিশে যাচ্ছে। যা হয়তোবা কাম্য নয়।
নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতা যখন তালুকদার মঞ্জিলের প্রতিটি কোণকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, তখন পূর্ব পার্শ্বের সেই কক্ষটিতে চাঁদের আলো এক মায়াবী রূপকথা বুনে চলেছে। জানালার ঝরোকা দিয়ে আসা রুপালি আভা আর্যর সুঠাম অবয়ব আর তৃষার ঘুমন্ত মুখশ্রীর ওপর পড়ে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছে। ঘুমের ঘোরে আর্য হঠাৎ অনুভব করল ওর বুকের ওপর এক জোড়া কোমল হাতের স্পর্শ আর গলার কাছে কারো উষ্ণ নিশ্বাসের মৃদু দোলা।
তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখ দুটি ঈষৎ মেলে আর্য দেখল, মাঝখানের সেই সযত্নে সাজানো বালিশের বর্ডার কখন যে তৃষার অবাধ্য ঘুমের তোড়ে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে, তার চিহ্ন নেই। কোলবালিশগুলো বিছানার এক কোণে অবহেলায় পড়ে আছে।
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২২
তৃষা এখন সম্পূর্ণ ওর গায়ের ওপর আধশোয়া হয়ে, ওর প্রশস্ত বুকে মুখ গুঁজে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। ওর এলোমেলো রেশমি চুলগুলো আর্যর কাঁধে আর গালে লেপ্টে আছে।
টিমটিমে নীলচে আলোয় তৃষার ঘুমন্ত মুখটা দেখে আর্য কি যেন ভাবল। তবে ঘুম ঘোরের আনমনা তন্দ্রাচ্ছন্নতা থেকে তৃষাকে সরাবার শক্তি আর হলো না ওর। ফের পাড়ি জমালো ঘুমে রাজ্যে।
