Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৫

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৫

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৫
নওরিন কবির তিশা

কালস্রোতের অমোঘ নিয়মে দিনগুলি যেন শ্রাবণের মেঘের মতো একের পর এক ভেসে চলে গেল। দেখতে দেখতে দু-দুটি মাস মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়েছে। এই সুদীর্ঘ সময়ে সুখনীড়ের দেয়ালগুলো অনেক নতুন গল্পের সাক্ষী হয়েছে। তৃষা আর টুইংকেলের সেই অসম বয়সের বন্ধুত্ব এখন এক নিবিড় মায়ায় রূপ নিয়েছে। যে বাড়িটি একসময় নিস্তব্ধতার চাদরে ঢাকা ছিল, সেখানে এখন মাঝে মাঝেই তৃষার খিলখিল হাসি আর টুইঙ্কেলের আধো-আধো কথার কলকাকলি শোনা যায়।

তৃষা যেন নিজের অজান্তেই এই বিরান মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টির ন্যায় নেমে এসেছে।
আজ বাংলার পঞ্জিকায় ফাল্গুনের শেষাশেষি। বসন্তের বিদায়বেলা সমাগত, অথচ প্রকৃতির বুকে তার রেশ এখনো টাটকা। শিমুল-পলাশের লাল আভা হয়তো রাজধানীর যান্ত্রিকতায় তেমন চোখে পড়ে না, কিন্তু বাতাসে এক ধরণের অস্থিরতা আছে, যা জানান দিচ্ছে ঋতু পরিবর্তনের বার্তা। দুপুরের তপ্ত রোদ একটু ম্লান হতেই আকাশে মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে, যেন চৈত্র আসার আগেই এক আগাম কালবৈশাখীর মহড়া চলছে
ঠিক এমন এক মেঘলা দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করল একটি বিশালাকার লৌহপক্ষী।

ইঞ্জিনের গর্জন থামতেই যাত্রীদের নামার তোড়জোড় শুরু হলো। সেই ভিড়ের মাঝে সুঠাম দেহের এক পুরুষ ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন। পরনে নীল রঙা শার্টের হাতা গুটানো, চোখে ডার্ক সানগ্লাস
বিমানবন্দরের লাউঞ্জে আসতেই বাইরের তপ্ত বাতাসের ঝাপটা আর্যর মুখে লাগল। সে একবার থামল। চশমাটা খুলে চারপাশটা দেখল। দীর্ঘ দুই মাস পর নিজের দেশের মাটি ছুঁয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছে মনে। এবার তার ফেরার কথা ছিল আরও দিন দশেক পর, কিন্তু সমুদ্রের একঘেয়েমি আর মেয়ের জন্য হাহাকার করা মনটা তাকে আর আটকে রাখতে পারল না।

কাউকে এক বিন্দু আভাস না দিয়ে, এক প্রকার লুকোচুরি খেলেই সে আজ দেশে ফিরেছে। উদ্দেশ্য একটাই তার ছোট্ট মাম্মামটাকে এক মস্ত বড় চমক দেওয়া। ফোন করে খবর দিলে হয়তো সে হইহই করে এয়ারপোর্টে চলে আসত, কিন্তু আর্য চাইল তার এই ফিরে আসাটা হোক একদম নিভৃতে, ঠিক যেন ঝড়ের আগে শান্ত বাতাসের মতো।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি আসতেই সে গাড়িতে উঠে আর্য সুখনীড়ের দিকে রওনা হলো।

চৈত্রের আগাম বারতা নিয়ে আকাশের কোণে আজ মেঘের ঘনঘটা। দুপুরের তপ্ত রোদকে আড়াল করে এক মায়াবী অন্ধকার যেন সুখনীড়ের আঙিনায় বাসা বেঁধেছে। ঠিক এমন সময় বাড়ির সদর দরজায় এসে থামল আর্যর গাড়ি। দুই মাসের সমুদ্র-অভিযান শেষ করে আর্য যখন গাড়ি থেকে নামল, তখন ঝোড়ো হাওয়ায় গাছের পাতাগুলো এক অদ্ভুত মন্দ্রস্বরে কথা কয়ে উঠছে।
আর্য চারিদিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হলো। এই দুই মাসে সুখনীড়ের রুপ যেন আগাগোড়া বদলে গিয়েছে। অযত্নে পড়ে থাকা টবগুলোতে আজ ফুলের হাসি, আর বারান্দার কোণে লতানো মাধবীলতাগুলো পরম আদরে ঘরের দেয়াল জড়িয়ে ধরেছে। বাড়ির বিষণ্ণ গাম্ভীর্য কাটিয়ে এক চিলতে প্রাণের স্পন্দন যেন প্রতিটি ইটে-পাথরে মিশে আছে। আর্যর মনে হলো, এই যেন এক অচেনা অথচ অতি আপন গৃহ।

বাড়ির ভেতরে পা রাখতেই আর্যর কানে এল এক সুমধুর কোকিল কণ্ঠের তান। মেঘলা দিনের বিষণ্ণতাকে ছাপিয়ে কোনো এক বিরহিণী গাইছে,,
🎶আজ এ মেঘলা….
দিনে একলা….
ঘরে থাকে না তো মন…..
কাছে যাবো কবে পাবো….
ওগো তোমার নিমন্ত্রণ…🎶
সেই গানের সুরের সাথে মিশে আছে টুইংকেলের মুক্তোঝরা হাসির শব্দ। মেয়েটি খিলখিল করে হাসছে আর উচ্ছ্বাসে চিৎকার করে বলছে,,,

—-‘বানি! বানি! আমি এখানে, ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান, বানি!
আর্য মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইল। যে মেয়েটি কথা বলতে ভুলে গিয়েছিল, তার মুখে এই চপলতা আর সেই কোকিলকণ্ঠী রমণীর গান;সব মিলিয়ে এক মায়াবী ঘোর তাকে আচ্ছন্ন করল। ভেতরটা আলো-আঁধারিতে চেয়ে আছে। আর্য ড্রয়িংরুমের ভেতর পা রাখতেই আচমকা কেউ একজন এসে তাকে দুহাতে শক্ত করে জাপ্টে ধরল।
এক উচ্ছল নারী কণ্ঠ উল্লাসে চিৎকার করে বলে উঠল,,

—‘আই গট ইউ, কিউটি পাই! এবার কোথায় পালাবে শুনি?
আর্য স্তম্ভিত, চূড়ান্ত আশ্চর্যে নির্বাক। তার সুঠাম দেহের ওপর আছড়ে পড়া এই অকাল বসন্তের ঝাপটা সামলাতে সে হিমশিম খাচ্ছে। ওদিকে তৃষার চোখের ওপর কালো কাপড়ের বাঁধন, সে ব্লাইন্ড ম্যানস বাফ বা আমাদের চিরচেনা কানামাছি খেলায় মত্ত। সে ভাবল টুইংকেলকে ধরে ফেলেছে। কিন্তু পরক্ষণেই তার হাতের স্পর্শে এক পেশীবহুল, বলিষ্ঠ দেহের উপস্থিতি টের পেয়ে তৃষা থমকে গেল। এ তো তার ছোট্ট টুইংকেল নয়!
তৃষা দ্রুত চোখের বাঁধন খুলে ফেলল। বাঁধন আলগা হতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটির দিকে তাকিয়ে তার চোখের পলক স্থির হয়ে গেল। নীল শার্টের হাতা গুটানো, তামাটে গায়ের রঙ আর সেই তীক্ষ্ণ চাউনিতে এক অচেনা পুরুষ! তবে তৃষা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। তার মনে লজ্জার লেশমাত্র নেই, বরং এক অজানা আশঙ্কায় তার চোখমুখ কঠিন হয়ে উঠল। সুঠাম দেহের এই আগন্তুককে অসময়ে বাড়ির ভেতর দেখে সে ভাবল—হয়তো কোনো চোর বা দুষ্কৃতকারী সুযোগ বুঝে ঢুকে পড়েছে।
তৃষা দুই পা পিছিয়ে গিয়ে রণচণ্ডী মূর্তিতে চিৎকার করে উঠল,,

—‘কে আপনি? এই ভরদুপুরে চোরের মতো বাড়ির ভেতর ঢুকে কী করছেন? সাহস তো কম নয় আপনার! দাঁড়ান, আমি লোক ডাকছি!
আর্যর বিস্ময়ের সীমা রইল না। নিজের বাড়িতেই তাকে চোর অপবাদ শুনতে হবে, তা সে কল্পনাও করেনি। সে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই সোফার আড়াল থেকে এক চিলতে হাসির ঝিলিক দিয়ে বেরিয়ে এল ছোট্ট টুইংকেল। সে এক দৌড়ে গিয়ে আর্যর পা জড়িয়ে ধরল। আনন্দের আতিশয্যে তার দুচোখ তখন চিকচিক করছে। সে খুশিতে ডগমগ হয়ে চেঁচিয়ে উঠল,,
—‘পাপা! পাপা! তুমি এসে গেছ?
তৃষা যেন আকাশ থেকে পড়ল। তার সেই উদ্ধত তর্জনী মাঝপথেই থেমে গেল। স্তম্ভিত হয়ে অস্ফুট স্বরে সে প্রশ্ন করল,,

—‘পাপা? টুইংকেল, ইনিই তোমার বাবা?
টুইংকেল আর্যর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বিজয়ের হাসি হেসে বলল,,
—‘হ্যাঁ বানি, ইনিই তো আমার পাপা!জানোতো আমার পাপা নেভি ক্যাপ্টেন—আর্য এহসান।
মুহূর্তের মধ্যে তৃষার সমস্ত তেজ জল হয়ে গেল। যে মানুষটিকে সে এতক্ষণ ‘চোর’ বলে সম্বোধন করছিল, তিনিই এই সুখনীড়ের মালিক! অপমানে আর লজ্জায় তৃষার ফর্সা মুখটা মুহূর্তেই রক্তিম হয়ে উঠল। তার ইচ্ছা করছিল মাটির সাথে মিশে যেতে। সে মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বলল,,
—‘আমি… আমি আসলে চিনতে পারিনি। অত্যন্ত দুঃখিত।
আর্যর মুখে তখনো সেই গাম্ভীর্য লেগে আছে। সে টুইঙ্কেলকে কোলে নিয়ে এগিয়েই যাচ্ছিল। হয়তো লোকটা কিছু বলবে না। কিন্তু অনুশোচনায় মাথা নত হয়ে আসছে তৃষার।সে ফের বলল,,
—‘স্যরি বলেছিলাম।আমি তো ভাবিনি আপনি আজই ফিরবেন।
আর্য টুইংকেলের জোরাজোরি এবার এক ঝলক পিছনে ঘুরলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তৃষার দিকে তাকিয়ে না চাইতেও শান্ত স্বরে বলল,,
—‘নিজের বাড়িতেই এমন অভ্যর্থনা পাব, তা আমিও বোধহয় ভাবিনি।
বাইরে তখন হঠাৎ বৃষ্টির পতন শুরু হয়েছে। গ্রামীণ সেই টিনের চালে বৃষ্টির ছন্দিত শব্দের মতোই তৃষার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। আজ যেন বসন্তের মাঝেই এক পশলা অকাল বৃষ্টি সব হিসেব ওলটপালট করে দিল।

সুখনীড়ের বাতায়নতলে আজ রজনী নেমেছে এক মায়াবী মেঘের ঘোমটা টেনে। অন্তরীক্ষের অধিপতি শশাঙ্ক আজ মেঘ-দস্যুদের প্রগলভতায় গগনপটে লুকায়িত; তার রূপালি আভার বদলে চারিদিকে এক ঘনশ্যাম অন্ধকারের রাজত্ব। বহির্দ্বারে বৃষ্টির অবিশ্রান্ত রিমঝিম শব্দ এক উদাসীন সুরের জাল বুনে চলেছে।
ভিতরে ডাইনিং টেবিলের ওপর ঝোলানো ঝাড়বাতির মৃদু হলদেটে আলোয় এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা বিরাজমান। দীর্ঘ দুই মাস পর আর্য আজ নিজের গৃহকোণে অন্নগ্রহণে বসেছে। টেবিলের ওপর সযত্নে সাজানো ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত, ইলিশের সুবাসিত ঝোল আর তৃষার হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় তৈরি হরেক পদের ব্যঞ্জন।
তৃষা আজ বড় কুণ্ঠিত। তার সেই দুপুরের প্রখর তেজ এখন শরতের মেঘের মতো শান্ত। সে অতি সন্তর্পণে আর্যর পাতে খাবার বেড়ে দিচ্ছে, কিন্তু একবারও সাহস করে সেই তীক্ষ্ণ চোখের পানে তাকাতে পারছে না। আর্য নির্বাক, তার তামাটে চেহারায় গাম্ভীর্যের আড়ালে এক সুপ্ত বিস্ময় হয়তো।
টুইংকেল আজ মহা খুশি। সে পাপা আর তার প্রিয় বানি’র মাঝখানে বসে খিলখিল করে হেসে উঠছে মাঝে মাঝেই। সেই হাসির হিল্লোলে রাতের নিস্তব্ধতা যেন বারবার ভেঙে যাচ্ছে। বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছে জানলার কাঁচে, শব্দ তুলছে রিনিঝিনি।

গত কয়েক মাসে টুইংকেলের এক বিচিত্র স্বভাব তৈরি হয়েছে তার প্রিয় বানি’র কোমল হাতের গ্রাস ছাড়া সে আর কিছুতেই অন্ন মুখে তুলতে চায় না। তাই তৃষা আজ একদিকে আর্যর পাতে খাবার তুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে পরম মমতায় টুইংকেলকে খাইয়ে দিচ্ছে।
টুইঙ্কেল তৃষার হাতের নলা মুখে দিয়েই চোখ বুজে আয়েশ করে বলল,,
—‘উমম! পাপা, দেখো তো বানি কত সুন্দর রান্না করে! কী টেস্টি না পাপা?
আর্য আড়চোখে একবার তৃষার অবনত মুখের দিকে তাকাল। তৃষা তখন ইলিশের কাঁটা বাছতে ব্যস্ত। আর্য ধীরস্বরে উত্তর দিল,,

—‘হ্যাঁ মাম্মাম, বেশ টেস্টি হয়েছে।
টুইংকেল এতেই সন্তুষ্ট হলো না। সে বাবার দিকে নিজের নীলাভ চোখের ডাগর দৃষ্টি মেলে বলল,,
—‘শুধু টেস্টি নয় পাপা, অনেক বেশি ইয়াম্মি। জানো তো, বানি রোজ আমার জন্য কত নতুন নতুন খাবার বানায়!
হঠাৎ করেই টুইংকেল তৃষার একটা হাত টেনে নিয়ে তাতে একটা পুতপুত শব্দে চুমু খেল। তারপর আর্যর দিকে তাকিয়ে আবদার করে বলল,,
—‘এবার তুমিও একটা কিস করো পাপা!
মুহূর্তের মধ্যে যেন ঘরের বাতাস স্তব্ধ হয়ে গেল। তৃষা আর আর্য—দুজনই হচকিত নয়নে পরস্পরের দিকে তাকাল। চার জোড়া চোখ যেন বিস্ময়ে বিস্ফোরিত! চূড়ান্ত আশ্চর্যান্বিত তৃষা বাক্য হারিয়েছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল,,
—‘টুইংকেল! এসব কী বলছ হানি?
টুইংকেল দমবার পাত্রী নয়। সে জেদ ধরে বসল,,
—‘কেন পাপা? আমি তো ফোনে দেখেছি তো, কেউ অনেক টেস্টি ফুড রান্না করলে তাকে থ্যাঙ্ক ইউ বলে হাতে কিস করতে হয়। তুমি কেন করবে না?
আর্য কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বলল,,

—-‘মাম্মাম, ওটা তো বড়দের… মানে ওভাবে হয় না।
কিন্তু টুইংকেলের সেই এক কথা! তার চোখে জল টলমল করে উঠল। সে চেয়ার ছেড়ে নামার উপক্রম করে বলল,
—-‘না, তুমি করো! না করলে আমি আর একটা ভাতও খাব না।
তৃষা তাকে বোঝানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা করলো ফের,,—‘এমন করে না কিউটি পাই।
—-‘না বানি.. পাপা প্লিজ!
আর্য গম্ভীর মুখে চেয়ে আছে। তার দৃষ্টিতেই বোঝা যাচ্ছে কতটা বিরক্ত সে। তৃষার নিজেরও বড্ড বিরক্ত লাগছে। টুইংকেল এক পর্যায়ে
টুইংকেল এবার রীতিমতো গাল ফুলিয়ে চেয়ার থেকে নামার উপক্রম করল। তার ডাগর চোখে অভিমানের মেঘ জমেছে। আর্যর দিকে তাকিয়ে সে প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,,
—‘পাপা পচা! তুমি বানিকে থ্যাংক ইউ বলবে না? বানি আমার জন্য রোজ কত কষ্ট করে, আমায় কত আদর করে! তুমি তো কিছুই জানো না।
আর্য পরিস্থিতি সামলাতে গম্ভীর গলায় বলল,,

—-‘মাম্মাম, জেদ করো না। আমি তো বললামই খাবার খুব টেস্টি হয়েছে। ওটাই তো থ্যাংক ইউ।
—‘না! ওভাবে না। আমি ইউটিউবে দেখেছি, প্রিন্সরা প্রিন্সেসদের হাতে কিস করে থ্যাঙ্ক ইউ বলে। বানি তো আমার প্রিন্সেস! তুমি কেন করবে না?
টুইংকেলের যুক্তি শুনে আর্যর কপালে তিন স্তরের ভাঁজ পড়ল। সে অসহায়ভাবে একবার তৃষার দিকে তাকাল।
তৃষা লজ্জা-বিরক্তি-বিস্ময়ে একপ্রকার কুঁকড়ে যাচ্ছিল। সে নরম গলায় বলল,,
—–‘মাই সুইট ক্যান্ডি? টুইংকেল? ওটা তো গল্পের বইতে হয়। আমরা তো আর গল্প না, তাই না? তুমি প্লিজ খেয়ে নাও কিউটি। তুমি না আমাকে লক্ষী মেয়ে।
—–‘না! একটুও লক্ষ্মী হব না আমি। পাপা যদি তোমাকে আদর না করে, তবে আমি আজ থেকে পাপার সাথে আড়ি! পাপা আবার জাহাজে চলে যাক, আমি আর কথা বলব না।
আর্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, সমুদ্রের বিশাল ঢেউ সামলানো সহজ, কিন্তু এই পাঁচ বছরের মেয়ের আবদার সামলানো হিমালয় জয়ের চেয়েও কঠিন। সে দাঁতে দাঁত চেপে নিচু স্বরে বলল,,

—-‘মাম্মাম, এটা ঠিক হচ্ছে না। বড়রা এমন করে না।
—-’কেন করবে না? তুমি আমায় করো না? বানিকেও করো! বানি তো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড!
তৃষা দেখল আর্যর মুখটা বিরক্তিতে আর অস্বস্তিতে কেমন কালচে হয়ে উঠছে। সে আর্যর দিকে না তাকিয়েই টুইংকেলকে বলল,,,
——‘কিউটি পাই, পাপা তো অনেক টায়ার্ড। উনি জার্নি করে এসেছেন তো, তাই উনার এখন এসব ভালো লাগছে না। কাল পাপা তোমায় অনেক গিফট দেবে, তখন সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন লক্ষ্মী মেয়ের মতো খাও।
নো! নো! নো!’—–টুইঙ্কেল এবার চিৎকার করে কেঁদেই দিল,,
—— ‘পাপা বানিকে পচা ভাবছে, তাই পাপা আদর করবে না! আমি কিচ্ছু খাব না!
মেয়ের চোখের পানি দৃষ্টিগত হতেই আর্যর সমস্ত গাম্ভীর্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সে বুঝল, এই জেদ না মেটানো পর্যন্ত আজ রাতে সুখনীড়ে আর শান্তি ফিরবে না। সে চেয়ার ছেড়ে ধীর পায়ে তৃষার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
তৃষা আড়ষ্ট হয়ে মাথা নিচু করে বসে রইল। তার হৃদপিণ্ড যেন পাঁজরের ভেতর ড্রাম বাজাচ্ছে। আর্যর উপস্থিতির উষ্ণতা সে অনুভব করতে পারছে। আর্য খুব নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল,,

—-‘আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি ফর দিস। ও আসলে না বুঝে জেদ ধরছে।
তৃষা তাকে আশ্বস্ত করে বলল,,—-‘নো ইটস ওকে।
আর্য এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রথমে টুইংকেল পরপর তৃষার দিকে তাকাল। তৃষার সমস্ত শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে, লজ্জায় আর কুণ্ঠায় সে যেন নিজের ভেতরেই সেঁধিয়ে যেতে চাইছে। আর্য অতি সন্তর্পণে তৃষার একটি হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। আর্যর সেই স্পর্শে তৃষার ক্ষীণ কায়া বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ন্যায় কম্পিত হলো। ভয় আড়ষ্টতার মিশ্র অনুভূতিতে নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল সে।

আর্যর উষ্ণ নিঃশ্বাস যখন তৃষার হাতের পিঠ স্পর্শ করতে যাবে, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই সব নিস্তব্ধতা চুরমার করে দিয়ে বেজে উঠল তৃষার ফোন। আকস্মিকসেই কর্কশ শব্দের ঝনঝনানি যেন এক নিমিষেই ঘরের জমাটবদ্ধঅস্বস্তিকর কুয়াশাটাকে চুরমার করে দিল।দুজনের ঘোরের জাল ছিঁড়ে গেল এক লহমায়। আর্য থেমে দাঁড়িয়ে পড়ল তৃষা তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ঘুরিয়ে কাঁপতে থাকা ফোনটার স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলো মেহসানার নাম।
তৃষা মনে মনে মেহসানাকে হাজারবার ধন্যবাদ জানাল। এই একটা ফোন কল যেন তাকে এক চরম লজ্জিত হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল। মেহসানা হয়তো জানেও না, তার এই অসময়ের ফোনটা তৃষার জন্য কতটা শান্তি এসেছে।তৃষা কোনোমতে কাঁপা গলায় বলল,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪

—‘ কিউটি পাই, দেখো মেহসানা মিমি ফোন করেছে। আমি একটু কথা বলে নিই?
বলেই সে আর আর্যর চোখের দিকে তাকানোর সাহস করল না। একপ্রকার প্রায় দৌড়েই ডাইনিং রুম থেকে বারান্দার দিকে চলে গেল। বাইরে তখন বৃষ্টির বেগ বেড়েছে কিঞ্চিৎ, কিন্তু তৃষার মনে হচ্ছিল তার গালের তপ্ত আগ্নেয়গিরি নেভাতে এই বৃষ্টিও বোধহয় যথেষ্ট নয়। ওদিকে আর্য স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার অবাধ্য হৃদপিণ্ডটা তখনো এক অদ্ভুত ছন্দে নেচে চলেছে। মেহসানার এই অসময়ের ফোন কলটাই যেন আজকের মতো এক পশলা অকাল বসন্তের সমাপ্তি ঘোষণা করল।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৬