ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৭৯
শানজানা আলম
দিন প্রায় শেষের দিকে। আলী ভাইয়ের আস্তানার কাঁচঘেরা কক্ষে তখন শুধু নরম হলুদ আলো জ্বলছে। শহরের নিচের আলো দূর থেকে নদীর মতো ঝিকমিক করছে। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে নায়েব পাশা।
তার মুখে চোখে উদ্বেগ চোখ এড়ায় না আলী ভাইয়ের।
আলী ভাই ধীরে ধীরে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লেন।
— এবার বলো, এই ঘটনায় আমাকে টানার মতো কী হয়েছে?
নায়েব কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
মেয়েটার নাম ঐশি। নাসিরের খুব কাছের মানুষ।
আলী ভাই ভ্রু তুললেন।
-কাছের মানুষ… নাকি রক্ষিতা? নাসিরের তো চরিত্র মারাত্মক!
নায়েব ঠান্ডা স্বরে বলল, যেটাই বলেন, নাসির মেয়েটাকে নিয়ে সময় কাটাতো। ঘটনাচক্রে মেয়েটির সাথে আমার পরিচয় হয়। আমি ওদের কিছু প্রাইভেট ভিডিও হাতে পাই। আর মেয়েটি ঠিক প্রসটিটিউট ধাঁচের না। উচ্চাভিলাষী মধ্যবিত্ত।
-বুঝতে পারলাম, লোভ করতে গিয়ে ট্রাপে পড়েছে।
ঘরের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল।
নায়েব ধীরে হাঁটতে হাঁটতে জানালার পাশে গেল।
-আমি ঐশিকে টার্গেট করিনি। আমার দরকার ছিল নাসিরকে চাপে ফেলা।
আলী ভাই চুপচাপ শুনছেন।
-কিন্তু মেয়েটা বোকামি করেছে,নায়েব নিচু স্বরে বলল। ভেবেছিল প্রেগ্ন্যাসির সুযোগ নিয়ে নাসিরের বউ হয়ে যাবে। এখন নাসিরের মা ওকে আটকে রেখেছে।
আলী ভাইয়ের চোখ সরু হয়ে এল।
— মিসেস নওফেল?
—হ্যাঁ। মহিলা অনেক বিপদজনক । আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো…
নায়েব এবার ঘুরে তাকাল, ঐশির ফোনে আমার নাম্বার আছে।
কয়েক সেকেন্ড পুরো ঘর নিস্তব্ধ।
আলী ভাই ধীরে ধীরে সিগারটা অ্যাশট্রেতে চেপে নিভিয়ে দিলেন।
-তাহলে মেয়েটা এখন শুধু নাসিরের সমস্যা না… তোমার সমস্যাও।
নায়েব মাথা নাড়ল।
-কিছুটা। আমার সাথে যোগাযোগ আছে এটা জানলে ভাববে, ঐশিকে আমি সেট করেছি, কিন্তু সেটা সত্য নয়। মেয়েটা আমার পরিচিত মাত্র।
— তুমি কি মেয়েটাকে বাঁচাতে চাইছ… নাকি নিজেকে?
নায়েব হালকা হাসল।
— দুটোই। তবে মেয়েটা মরলে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে।
আলী ভাই উঠে দাঁড়ালেন। ধীরে ধীরে জানালার সামনে গিয়ে শহরের দিকে তাকালেন ।
— নাসির বোকা ছেলে। কিন্তু তার মা বিপজ্জনক। সে যদি বুঝে যায় তুমি ওদের ভিডিও নিয়ে খেলছ…
নায়েব কথাটা শেষ করল, — তাহলে ঐশি সকাল পর্যন্তও বাঁচবে না।
ঘরের নীরবতা যেন জমাট বাঁধল, তারপর আলী ভাইকে নায়েব পাশা নিচু, ভারী গলায় বলল,
মেয়েটাকে বের করতে হবে। আজ রাতেই। ও হতে পারে আমাদের তুরুপের তাস!
আলী ভাই টেবিলে রাখা মুভিং পেপার ওয়েট স্টোনটা ঘুরিয়ে দিয়ে তার পরবর্তী প্ল্যান সাজালেন।
আলী ভাইয়ের ব্যক্তিগত কক্ষটা অন্ধকার আঁধো আলোয় ডুবে আছে। জানালার বাইরে শহরের আলো ঝাপসা হয়ে জ্বলছে। ভারী কাঠের টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল ফোনটা ধীরে হাতে তুলে নিল সে।
ঘরে আর কেউ নেই, ডায়াল টোন কয়েকবার বেজে উঠতেই ওপাশ থেকে নাসিরের গলা শোনা গেল।
— আলী ভাই, এত রাতে আমাকে স্মরণ করলেন?
আমি অবশ্য দেশে নেই।
আলী ভাই হেলান দিয়ে বসলেন।
— তোমার মা একটা ভুল করেছে, নাসির।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
— মানে?
— ঐশিকে আটকে রেখেছে। আমি চাই, মেয়েটাকে আজ রাতেই ছেড়ে দেওয়া হোক।
নাসিরের গলায় অস্বস্তি ফুটে উঠল। ঐশি তাদের বাড়িতে, সেটা সে জানে না, কিন্তু আলী ভাই জানেন। ভাইয়ের কাছে খবর গেল কিভাবে, ঐশি কাদের সাথে মিশছে! কারা ওকে এত সাহস দিলো, এত দূরে ওকে পৌঁছে দিলো!
নাসির তাও বিব্রত স্বরে বলল,
— এটা পারিবারিক ব্যাপার, আলী ভাই। বিজনেস রিলেটেড হলে আপনি—
আলী ভাই তাকে থামিয়ে দিলেন।
— আমি যখন ফোন করি, তখন সেটা আর পারিবারিক থাকে না।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
তারপর ধীরে, ঠান্ডা স্বরে আলী ভাই বললেন, আরেকটা কথা। তোমার কিছু ব্যক্তিগত ভিডিও ভুল হাতে চলে গেছে।
ওপাশে হঠাৎ নিস্তব্ধতা।
— “কি বলতে চাইছেন আপনি?
নায়েব চিন্তিত হয়।
আলী ভাই টেবিলে আঙুল ঠুকল।
— আমি হুমকি দিতে পছন্দ করি না। কিন্তু মেয়েটার গায়ে যদি আর একটা আঁচড়ও লাগে… তাহলে কাল সকাল হওয়ার আগেই ভিডিওগুলো শহরের অর্ধেক মানুষের ফোনে পৌঁছে যাবে।
নাসির এবার চাপা গলায় বলল, — আপনি এটা করবেন না…
— তাহলে তোমার মাকে বলো ঐশিকে ছেড়ে দিতে।
আর ভিডিও ডিলিট করানোর ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে। একাউন্ট ডিটেল তোমার কাছে আছে।
ওপাশ থেকে লাইনটা কেটে গেল।
ঘরের প্রতিটি আসবাব নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। শুধু দূরে শহরের আলো জ্বলছে আর নিভছে।
আলী ভাইয়ের ফোন কল শেষ করে। নাসির সাথে সাথে মিসেস নওফেলকে ফোন করল।
মিসেস নওফেল ঐশির ফোনের ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। ঐশির ফোন গুলশানে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে আবারও। এরপরে মেয়েটাকে পুঁতে ফেললেও কেউ ট্রেস করতে পারবে না এমনটাই ভাবছেন।
তার ফোন ভাইব্রেট করছে,নাসির ফোন করেছে। এখনো সে কিছুই জানে না এই বিষয়ে। দেশের বাইরে থেকে ফিরে এলে সব বলা যাবে!
মিসেস নওফেল ফোন ধরতেই নাসির বলল, মা, ঐশি আমাদের বাড়িতে?
মিসেস নওফেল বললেন, কেন? আর সেটা তুমি কিভাবে জানলে?
-সেটা তো দেখার বিষয় না মা, তোমার উচিত ছিল ঐশি এসেছে, এই বিষয়টা প্রথমেই আমাকে জানানো। কিন্তু তুমি নিজের মত করে হ্যান্ডেল করতে চাইলে!
-নাসির, ফষ্টিনষ্টি করার সময় খেয়াল থাকে না, এইরকম উটকো ঝামেলা তৈরি হতে পারে? তুমি জানো এই বিষয়গুলো কতটা ঝামেলা তৈরি করতে পারে আমার ইমেজে? আমার একটা সোশ্যাল ফেস আছে!
এখন কি হয়েছে সেটা বলো, ঐশি তোমাকে ইনফর্ম করল কিভাবে!
– ঐশি যে আমাদের বাড়িতে, সেটা আলী ভাইয়ের কাছে নিউজ চলে গেছে!
-হোয়াট!
-শুধু তাই নয়, আমাদের প্রাইভেট ভিডিও ওনার হাতে পৌঁছে গেছে!
-মেয়েটা তো সাংঘাতিক! কিন্তু তোমার প্রাইভেট ভিডিও তৈরি হয় কিভাবে! তুমি কোন বা★ল ছিড়ছ!
অসভ্য চরিত্রহীন ছেলে একটা! এই ভিডিও লিক হলে কি হবে তুমি জানো!
নাসির জানে, কয়েকশ কোটির মামলা, তবে আলী ভাই ব্লাকমেইলার নয়! টাকা ঢুকবে ভিডিও ডিলিট হবে মানে দুনিয়া থেকে ভিডিও হাপিস হয়ে যাবে! ঐশিকে কি করা যায়, সেটা পরে ভাবা যাবে!
নাসির বলল, ভিডিও বিষয়টা আমি দেখছি, তুমি ঐশিকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করো। কেউ যেন টের না পায়! ওকে গুলশানের বাসায় রেখে আসার ব্যবস্থা করো।
মিসেস নওফেল বললেন, আর ওর পেটের বাচ্চাটা?
নাসির বলল, টাকা তো আমার যাবেই! ছেড়ে দাও ঐশিকে। পরে বিষয়টা দেখছি।
-না, ওর বাচ্চাটাকে এবর্ট করার ব্যবস্থা করতে হবে। ওকে গুলশানের ফ্ল্যাটে আমি পাঠাচ্ছি। তুমি ব্যবস্থা করো, ওকে যেন নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হয়।
মিসেস নওফেল এমনটা হতে পারে আশা করেন নি। এখন বিষয়টা জটিল হয়ে গেল। কিন্তু ঐশি কিভাবে আলীর কাছে পৌঁছাল! নওফেল সাহেব এখনো কিছুই জানেন না।
তাই তিনি নাসিরকে বললেন, বিষয়টা যেন বাবার কানে না যায়! চাপা দেওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা করে ফেলো। এরপরে কোনো মেয়ের সাথে বিছানায় যাওয়ার আগে একশবার ভেবে সিদ্ধান্ত নেবে! তোমার চরিত্রহীনতার জন্য আজ এত বড় সমস্যা ক্রিয়েট হয়েছে।
নাসির ফোন রেখে আলী ভাইয়ের সাথে যোগ করার চেষ্টা করলো। তবে ঐশি আলী ভাইয়ের কাছে একা একা পৌছায় নি, তার কোনো সহযোগী আছে, কিন্তু কে সে! ঐশি সাধারণ একটা মেয়ে ছিল! টাকা পয়সা শপিং এগুলো নিয়ে সে হ্যাপি, কিন্তু এই মাফিয়া সাম্রাজ্যে তাকে কে ঢুকানোর চেষ্টা করছে?
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৭৮
কে হতে পারে সে! এই ইন্ডাস্ট্রিতে নাসিরের শত্রু তো একজন নয়!
আর ঐশি একটা নেমক হারাম, ওর জন্য নাসির কি করে নি৷ চেয়েছিল ওর একটা পরিচয় তৈরি করে দিতে, সেটা না, মেয়েটা কোথা থেকে কাদের কাছে চলে গেল!
তবে এত সহজে নাসিরও হার মানবে না। চাল উল্টে দিতে হবে। আপাতত ঐশির ব্যবস্থা করতে হবে।
তারও আগে আভার সাথে কথা বলতে হবে।
