বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২১
সুমি চৌধুরী
রূপা নাক কুঁচকে তীব্রভাবে বাতাস টেনে টেনে শ্বাস নিতে নিতে বললো,
—” কেমন জানি পুরুষের শরীরের ঘ্রান পাওয়া যাচ্ছে না?”
বৃষ্টিও অবিকল রূপার মতো নাক টেনে টেনে চারপাশের গন্ধটা নিজের ভেতরে টেনে নেয়। তার ভুরু দুটো কুঁচকে আসে।
—” আমিও পাচ্ছি, সাথে কড়া পারফিউমের ঘ্রান”
ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশের চোখ দুটো রাগে ও অপমানে ইতিমধ্যেই রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। তার চওড়া বুকটা রাগে অনবরত ওঠানামা করছে, মুখ দিয়ে বেরোচ্ছে তপ্ত নিঃশ্বাস। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।
আকাশ পেছনের অন্ধকার থেকে এক পা বাড়িয়ে কর্কশ গলায় বললো,
—“পুরুষ থাকলে পুরুষের ঘ্রান তো অবশ্যঔ থাকবে!”
আকাশের সেই চেনা অথচ মেঘের মতো ভারী কণ্ঠস্বর কানে যেতেই রূপা আর বৃষ্টি দুজনেই একসাথে চমকে ওঠে। তীব্র আতঙ্কে শরীর হিম হয়ে যায় তাদের। দুজনে এক ঝটকায় ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই রক্ত জল হয়ে যাওয়ার জোগাড়।যমের মতো আকাশ আর বাঁধনকে নিজেদের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রূপার হাত-পা অবশ হয়ে আসে। ভয়ে সে বসা চেয়ারটা সহ পেছনের দিকে উল্টে পড়ে যেতে লাগল।ঠিক সেই মুহূর্তে বাঁধন এক পলকে নিজের দীর্ঘ হাতটা বাড়িয়ে দেয়। তার পাথরের মতো শক্ত আঙুলগুলো খপ করে রূপার হেলে পড়া চেয়ারের পিঠটা শক্ত করে ধরে ফেলে। রূপার সারা শরীর তখন কাঁপছে।
ওদিকে আকাশের ওই রক্তচক্ষু আর থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির ভেতরের আত্মা যেন নিমেষেই শুকিয়ে যায়। তীব্র আতঙ্কে তার দম আটকে আসে এবং সে নিজের গলা চেপে ধরে জোরে জোরে কেশে ওঠে।এগিয়ে এসে জগের বাকি পানিটুকু গ্লাসে ঢেলে বৃষ্টির সামনে বাড়িয়ে দেয় আকাশ। তার থমথমে মুখ আর চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন এক নিমেষে ঘরের তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। সে বেশ কড়া গলায় শুধায়,
—” পানি খাও, তারপর দেখছি তোমাকে”
ভয়ে আর কাশিতে দম আটকে আসা বৃষ্টি আর কোনো দিকে না তাকিয়ে এক প্রকার ছো মেরে গ্লাসটা নিয়ে নেয়। কাঁপা কাঁপা হাতে গ্লাসটা মুখের কাছে ঠেকিয়ে বড় বড় ঢোকে সব পানি এক নিঃশ্বাসে খেয়ে নেয় সে। খালি গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখেই একটা বুক কাঁপানো বড় শ্বাস নেয়। আকাশ ওর মুখের ওপর থেকে চোখ না সরিয়েই গম্ভীর গলায় বললো,
—” এখন বলো, কি জানি বলছিলে? আমাকে ফোকলা দাদুর মতো দেখাবে? আমার সব দাঁত আর মাথার চুল পড়ে যাবে?”
আকাশের ওই ঠান্ডা অথচ চাবুকের মতো কথার আঘাতে ভয়ে ভয়ে থরথর করে কেঁপে ওঠে বৃষ্টি। নিজের বাঁচার কোনো উপায় না পেয়ে সে করুণ দৃষ্টি ফেলল পাশে বসা রূপার দিকে। রূপার একটা কাপড়ের খুঁট শক্ত করে চেপে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় রূপাকে বললো,
—” রূ-রুপা, বাঁচা আমায়, এই হিটলার কখন আসলো এখানে?”
আকাশ ডাইনিং টেবিলে নিজের দুই হাতের তালুর ওপর ভর দিয়ে বৃষ্টির মুখের খুব কাছাকাছি ঝুঁকে পড়ে। তাদের মাঝের দূরত্ব তখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। আকাশের শরীরের সেই তীব্র, কড়া পুরুষের গন্ধে আর উষ্ণ নিঃশ্বাসে বৃষ্টির শরীর মুহূর্তেই অবশ হয়ে আসে। ভয়ে তার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে। আকাশ বৃষ্টির কুঁকড়ে যাওয়া চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে অবজ্ঞার সুরে বললো,
—” কি হলো মিস বৃষ্টি? ভয় পাচ্ছো?”
চোখের কোণে জল জমে ওঠার উপক্রম হতেই বৃষ্টি নিজের মুখটা একদম কাঁদো কাঁদো করে ফেলল। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বললো,
—” স্যার সরি, আমি, আমি জাস্ট মজা করছিলাম।”
আকাশ রাগী চোখে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,
—“কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকো, আমি যতক্ষণ না বলবো এক পাও এইখান থেকে নড়বে না।”
বৃষ্টি অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে বললো,
—“সরি স্যার।”
আকাশ তীব্র ধমক দিয়ে ওঠলো,
—“কান ধরে দাড়াতে বলছি।”
বৃষ্টি কেদোঁ কেদোঁ গলায় বললো,
—“স্যার।”
আকাশের চোখের মণি দুটো রাগে স্থির হয়ে গেল। সে চিবুক শক্ত করে বললো,
—“আই সেড স্ট্যান্ড আপ রাইট নাও।”
ধমকে কেঁপে উঠে বৃষ্টি আস্তে আস্তে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। গুটিগুটি পায়ে কিছুটা দূরে গিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে।বাঁধন কোনো কথা না বলে রূপার ঠিক সামনের চেয়ারটায় বসে পড়ে। সে নিজে থেকেই প্লেটে ভাত বেড়ে নিতে শুরু করে। আকাশও তার পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ে নিজের প্লেটে ভাত বাড়ে। দুজনে সম্পূর্ণ চুপচাপ খেতে শুরু করে। পুরো ডাইনিং রুমে কোনো কথা নেই, কেবল ভাত চিবানোর মৃদু শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না।
থমথমে এই পরিবেশের কারণে রূপা আর এক লোকমা ভাতও মুখে তুলতে পারছে না। বাঁধনের ঠিক সামনে বসে থাকায় ভয়ে তার হাতের চামচটা থরথর করে কাঁপছে। সে আর সহ্য করতে না পেরে চুপচাপ টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ওকে হঠাৎ এভাবে দাঁড়াতে দেখে আকাশ খাওয়া থামিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় জানতে চাইল,
—“কী হলো, তুই উঠে দাঁড়ালি কেন?”
রূপা আড়চোখে একবার বাঁধনের দিকে তাকাল। দীর্ঘদেহী পুরুষটা নিজের মতো শান্ত হয়ে খেয়ে যাচ্ছে, যেন চারপাশের কোনো কিছুতেই তার কিছু আসে যায় না। রূপা দ্রুত আকাশের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে ভয়ে ভয়ে বললো,
—“আমার খাওয়া শেষ ভাইয়া, আমি আর খাবো না।”
আকাশ নিজের প্লেট থেকে চোখ তুলে রূপার ভরা প্লেটের দিকে তাকিয়ে বেশ কড়া সুরে বললো,
—“খাওয়া শেষ মানে? প্লেটে তো সব ভাতই পড়ে আছে। ওগুলো কে খাবে শুনি, তোর জামাই?”
আকাশের এমন সোজাসাপ্টা কথায় রূপা একদম থতমত খেয়ে গেল। তার ফর্সা মুখটা লজ্জায় আর ভয়ে লাল হয়ে উঠল। সে কোনোমতে আমতা আমতা করে বললো,
—“সত্যি বলছি ভাইয়া, আমার পেট একদম ভরে গেছে। আমি আর একটুও খেতে পারবো না।”
বাঁধন খেতে খেতে এক পলক রূপার থমকে যাওয়া মুখটার দিকে তাকাল। তার চোখের শীতল চাউনিতে কোনো প্রশ্রয় নেই। ফের নিজের প্লেটে দৃষ্টি নামিয়ে নির্লিপ্ত গলায় রূপার উদ্দেশে বললো,
—“প্লেটে একটা ভাতও যদি অবশিষ্ট থাকে, তবে সব এঁটো ভাত তোকে আর ওই বিচ্ছুটাকে দিয়ে খাওয়াবো।”
আচমকা বাঁধনের এমন ঠান্ডা হুমকির মুখে চমকে ওঠে রূপা। তার বুকের ভেতরটা ভয়ে কেঁপে উঠলেও মুখে কোনো উত্তর এল না, সে কাঠের পুতুলের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ওদিকে দেয়ালের পাশে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টি নিজের মুখটা ভীষণ অসহায় করে রেখেছে। সে নিজের রাগটা সামলাতে না পেরে মাঝে মাঝে আড়চোখে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে, চোখের চাউনি এমন যেন সুযোগ পেলে আকাশকে কাঁ’চা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। রূপাকে ওভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আকাশ তার খাওয়া থামিয়ে পুনরায় বললো,
—“চুপচাপ বসে খাওয়া শেষ কর, নয়তো তোকেও তোর ওই ফ্রেন্ডের পাশে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখবো।”
হুমকিটা শুনে রূপা আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না। সে চুপচাপ নিজের চেয়ারটায় বসে পড়ে কাঁপা কাঁপা হাতে ভাতের চামচটা শক্ত করে ধরে। নিজের ভেতরের অস্থিরতা চেপে সে একদম অল্প অল্প করে গিলতে শুরু করে।বাঁধন খাওয়া শেষ করে নিজের মতো রুমে চলে যায়। আকাশও খাওয়া শেষ করে বৃষ্টির দিকে তাকায়। বেশ কড়া সুরে বলে,
—“এখন খেয়ে রুমে যেতে পারো মিস বৃষ্টি, তবে মনে রেখো আমার শোধ নেওয়া কিন্তু এখনও শেষ হয়নি। সময় সুযোগ বুঝে সব একবারে উসুল করে নেব।”
বলেই সে বড় বড় পা ফেলে চলে যায়। আকাশ আড়াল হতেই বৃষ্টি খাঁচা থেকে ছাড়া পাওয়া বাঘিনীর মতো ফুঁসে ওঠে। ধপধপ পা ফেলে ডাইনিং টেবিলে আসে। চেয়ার টেনে ধপ করে বসে পড়ে। রাগে গজগজ করতে করতে আকাশের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে মুখভঙ্গি করে ঝাড়তে থাকে,
—“শা’লা তুই একটা উগান্ডা। দেখিস, তোর কপালে যে বউ জুটবে না, সে হবে উগান্ডার সব থেকে কুচকুচে কা’ইল্লা ছেরি। একদম কালো জগতের মিস ওয়ার্ল্ড হবে তোর বউ। রাত-বিরাতে তুই যখন অন্ধকারে চোখ খুলবি আর তোর পাশে ওই ব্ল্যাক ডায়মন্ডকে দেখবি, ভয়ে তোর কলিজা শুকিয়ে যাবে আর বিছানায় হি’শু করে দিবি। তখন… ”
নিজের কথার বাকিটুকু শেষ করার আগেই রূপা আঁতকে ওঠে। ঝড়ের বেগে এসে বৃষ্টির মুখটা হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে। আশপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিয়ে ফিসফিসিয়ে আকুল গলায় বলে,
—“আল্লাহর ওয়াস্তে বোইন, মুখটা এবার অন্তত বন্ধ রাখ। ভাইয়ার কান কিন্তু খুব খাড়া, নাহলে যদি আবার শুনে ফেলে তবে আর রক্ষা নাই। এবার কিন্তু পিঠে আই’ক্কাওয়ালা বাঁ’শ ভাঙবে।”
রাত একটা।একের পর এক সি’গারেট পুড়ছে ইশতিয়াকের আঙুলে। পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে রবিন। ধোঁয়ার কুয়াশায় ইশতিয়াক নিজের চুলে হাত বোলাচ্ছে। অস্থিরতা যেন চাবুক মারছে বুকের ভেতর। চোখ দুটো রক্তবর্ণ, অস্বাভাবিক লাল হয়ে উঠছে। রূপার জায়গায় সীমা? ভাবতেই বুকটা ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এই তীব্র দহন, এই জ্বলন্ত যন্ত্রণা সে আর সহ্য করতে পারছে না।পরিস্থিতি সামলাতে রবিন এগিয়ে আসে। একটু নরম গলায় বোঝানোর চেষ্টা করে বলে,
—“বস, প্লিজ নিজেকে একটু সামলান। দেখেন, যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। আর সীমাও কিন্তু দেখতে কম কিছু না, রূপার মতোই মায়াবী। তাহলে সীমাকে মেনে নিতে আপনার এতো আপত্তি কোথায়?”
শব্দগুলো কানে যেতেই মাথা গরম হয়ে যায় ইশতিয়াকের। পুরো শরীর ঝাঁঝা করে উঠছে। ঠোঁটের কোণে জ্বলন্ত সি’গারেটটা চেপে ধরলো। তারপর হিংস্র থাবায় রবিনের শার্টের কলার খামচে ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে বলে,
—“কী বললি তুই? তোর সাহস কত বড় যে তুই আমার সামনে দাঁড়িয়ে রূপার রূপের ওজন মাপছিস? তুই কী ভাবিস আমি রূপার চামড়ার সুন্দরে অন্ধ হয়েছি? আমি ওর রূপের কাঙাল?”
কলিজা কেঁপে ওঠে রবিনের। দম বন্ধ করা আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে বললো,
—“না না বস, আসলে আমি ওইভাবে বলতে চাইনি…”
কথাটা শেষও করতে পারে না সে। তার আগেই ইশতিয়াক কলারটা আরও জোরে পেঁচিয়ে ধরে কড়া সুরে বললো,
—“মুখ সামলে কথা বলবি রবিন, নাহলে টেনে তোর জিব ছিঁড়ে ফেলব। আমি রূপার বাহ্যিক রূপে নয়, ওর ওই এক চিলতে হাসিতে পাগল হয়েছি। যেই নিষ্পাপ হাসিটা আজও আমার বুকের প্রতিটি স্পন্দনকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। যে হাসিটা প্রতিটা সেকেন্ড আমার চোখের সামনে মায়াজাল বিছিয়ে রাখছে। তুই-ই বল, বুক চিরে যাওয়া সেই রূপাকে আমি এই মন থেকে অন্য কোথাও ছুড়ে ফেলি কী করে?”
রবিন ভয়ে চোখ বন্ধ করে কোনোমতে বললো,
—“ভুল হয়ে গেছে বস, প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন। আমি আর কখনো নিজের মুখেও এসব কথা আনব না।”
ইশতিয়াক রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এক ঝটকায় রবিনকে ছেড়ে দেয়। রবিন কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে নিজের গলাটা হাত দিয়ে ডলে নেয়। তারপর বুক ভরে শ্বাস টেনে, অনেক কষ্টে সাহস সঞ্চয় করে কাঁপতে কাঁপতে বলে,
—“বস, এখন আমায় বাড়ি ফিরতে হবে। আপনিও নিজের রুমে চলে যান, অনেক রাত হয়েছে।”
ইশতিয়াক আর কথা বাড়ায় না। শান্ত, ধীর পায়ে পা বাড়ায় নিজের বাড়ির দিকে। সেখানে গিয়ে সে ঠিক কী করবে, তা হয়তো নিজেও জানে না। তবে এটুকু নিশ্চিত সীমার কপালে আজ চরম দুঃখ আছে।
অন্য দিকে, ইশতিয়াকের বিশাল রুমের এক কোণায় খাটের ওপর গুটিসুটি মেরে বসে আছে সীমা। পরনে তার অত্যন্ত সাধারণ একটা খয়েরী সুতির শাড়ি। কিছুক্ষণ আগেই তাকে গ্রাম থেকে সোজা ময়মনসিংহে, ইশতিয়াকের এই বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। বিলকিস বানু নিজের হাতে এই সাধারণ শাড়িটা পরিয়ে সীমাকে ইশতিয়াকের রুমে বসিয়ে দিয়ে গেছেন। অজানা এক আতঙ্কে মেয়েটার পুরো শরীর কাঁপছে। সে বারবার শাড়ির আঁচলটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরছে।
বিধাতার কী নিষ্ঠুর লিখন। যাকে সে ছোটবেলা থেকে যমের মতো ভয় পেয়ে এসেছে, যাকে দেখলে ভয়ে কখনো রুম থেকে বের হতো না, আজ সেই মানুষটাই কিনা তার স্বামী। ভাবতেই সীমার কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে।ছোটবেলা থেকেই ইশতিয়াককে ভীষণ ভয় পায় সে। ইশতিয়াক কখনো নানু বাড়ি বেড়াতে গেলে সীমা ভয়ে নিজের ঘরবন্দী হয়ে থাকত। ভুলেও যদি কখনো সামনে পড়ে যেত, তবে ভয়ে এক দৌড়ে পালাত। আর আজ কিনা সেই মানুষটার সাথে এক ঘরে, এক বিছানায় রাত কাটাতে হবে। শুধু আজ নয়, জীবনের বাকিটা সময়। কথাটি মাথায় আসতেই সীমার পুরো শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসে।
হঠাৎ করেই নিস্তব্ধতা ভেঙে দরজার লক খোলার শব্দ হয়। রুমে প্রবেশ করে ইশতিয়াক। ওকে দেখামাত্রই ভয়ে শিউরে ওঠে সীমা। শাড়ির আঁচলটা আরও জোরে খামচে ধরে বিড়ালছানার মতো খাটের এক কোণায় গুটিয়ে যায়। বিছানায় ওভাবে দলা পাকিয়ে বসে থাকা সীমার দিকে এক পলক তাকায় ইশতিয়াক। পরক্ষণেই পেছনে হাত বাড়িয়ে ধরাম করে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। সেই বিকট শব্দে যেন পুরো ঘরটা কেঁপে ওঠে।
সীমা কাঁপতে কাঁপতে বিছানা থেকে নিচে নামে। উদ্দেশ্য ইশতিয়াককে সালাম করা। কারণ, বিলকিস বানু কড়া আদেশ দিয়ে গেছেন যে, বাসর ঘরে স্বামী ঢুকলে প্রথমে সালাম করতে হয়, নাহলে আল্লাহ নাকি বেজার হন। তাই মনের ভেতরের হাজারো ভয় এক পাশে ঠেলে, কাঁপতে কাঁপতে ইশতিয়াকের সামনে এসে নিচু হয় সে। অতি সাবধানে দু’হাত বাড়িয়ে ইশতিয়াকের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতেই যেন নরকের আগুন ধরে যায় ইশতিয়াকের শরীরে। মনে হলো ওই জ্বলন্ত আগুনের মাঝে কেউ যেন এক বালতি কেরোসিন ঢেলে দিল।
নিজের ভেতরের হিংস্রতাকে আর সামলাতে পারে না ইশতিয়াক। এক ঝটকায় সীমাকে টেনে সোজা করে দাঁড় করায়। তারপর ওর দুই গাল শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,
—“কী করছিলি শুনি? এখানে এসে স্ত্রীর অধিকার দেখাতে এসেছিলি? তুই ভাবলি কী করে যে, তোর মতো একটা সস্তা মেয়েকে আমি কোনোদিন স্ত্রী হিসেবে মেনে নেব?”
ব্যথায় ককিয়ে উঠছে সীমা। নিজের গাল দুটো ছাড়ানোর জন্য অনেক কষ্টে, কাঁপতে কাঁপতে বলে,
—“ছেড়ে দিন, ব্যথা লাগছে।”
ইশতিয়াক রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। গাল দুটো আরও জোরে চেপে ধরে হিংস্র গলায় বলে,
—“তোকে কি আদর করার জন্য ধরেছি? আজ তোর জন্য আমি রূপাকে হারিয়ে ফেললাম। তোর কারণে আজ আমার সাজানো জীবনটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। কেন? তুই কি এই বিয়েতে না করতে পারিসনি?”
নিজের বিবাহিত স্বামীর মুখে অন্য নারীর নাম শুনে বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে সীমার। যতই সে এই মানুষটাকে যমের মতো ভয় পাক না কেন, দিনশেষে সে তো তিন কবুল বলা স্বামী। একটা মেয়ে তার নিজের বাসর ঘরে স্বামীর মুখে অন্য নারীর নাম সহ্য করে কী করে? তীব্র অপমানে আর ব্যথায় সে অনেক কষ্টে বললো,
—“ছাড়ুন প্লিজ, লাগছে। আর বিয়েতে আপনি যেমন না করতে পারেননি, ঠিক তেমনি পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমিও না করতে পারিনি। আর আপনি কেমন পুরুষ, যে বাসর ঘরে নিজের স্ত্রীর সামনে অন্য নারীর নাম নিয়ে চিৎকার করছেন?”
সীমার এমন মুখের ওপর জবাব দেওয়া দেখে চোখ যেন কপালে উঠে যাচ্ছে ইশতিয়াকের। সামান্য একটা গ্রামের মেয়ে, সে কিনা আজ তার মুখের ওপর কথা বলছে! রাগে অন্ধ হয়ে সে সজোরে এক ধাক্কা মেরে ফ্লোরে ফেলে দেয় সীমাকে। শক্ত মেঝেতে কনুই লেগে তীব্র ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠছে মেয়েটা,
—“আহহ”
বাঘের মতো গর্জে উঠছে ইশতিয়াক,
—“তোর এত বড় সাহস! তুই আমার মুখের ওপর তর্ক করিস? তার ওপর রূপাকে বলিস অন্য নারী? তোকে আমি আজকে মেরেই ফেলব।”
বলেই ইশতিয়াক আর এক সেকেন্ডও সময় নেয় না। কোমর থেকে সপাং করে খুলে ফেলে প্যান্টের লেদার বে’ল্ট। সীমা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সেই শক্ত বে’ল্ট দিয়ে সজোরে আঘাত করতে থাকে সীমার নরম শরীরে। প্রথম আঘাতেই চামড়া যেন চিরে যাচ্ছে সীমার। মেয়েটা যন্ত্রণায় ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ছে, দুই হাতে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সে মুখ ফুটে চিৎকার করছে না। দাঁতে দাঁত চেপে ভেতরের কান্নাটা আটকে রাখছে। কারণ সে ভালো করেই জানে সামান্য একটু শব্দ হলেই বাড়ির সবাই জেগে যাবে, আর মাঝরাতে বাসর ঘরের এই কেলেঙ্কারি চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে।
চামড়া চিরে লেদার বে’ল্টের প্রতিটি আঘাতে সীমার শরীর থেকে র’ক্ত বেরিয়ে আসছে। যন্ত্রণার শেষ সীমানায় পৌঁছে সীমা দুই হাতে নিজের মুখ শক্ত করে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলে। কোনো চিৎকার যেন মুখ গলে বের হতে না পারে, সেই লড়াই করছে সে।
তবুও শান্ত হচ্ছে না ইশতিয়াক। হিংস্রতায় সে নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। একের পর এক নির্মম আঘাত সে করেই চলছে, যেন আজ এই মেয়েটাকে মেরেই ফেলবে সে।
র’ক্তা’ক্ত শরীরে তীব্র এই পাশবিক অত্যাচার আর সহ্য করতে পারছে না সীমা। চোখের সামনে সবকিছু আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে আসছে তার। একপর্যায়ে পুরো শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে আর জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মেয়েটা। ফ্লোরের ওপর র’ক্তা’ক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে সীমার নিথর দেহ।
সীমার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে অবশেষে থেমে যায় ইশতিয়াক। হাতের বে’ল্টটা অবহেলায় ফ্লোরে ছুড়ে মারে সে। হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলতে থাকে। শরীর থেকে ঘামে ভেজা শার্টটা খুলে এক পাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে। কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে তার। চোখগুলো এখনো মরিচের মতো লাল হয়ে আছে, ভেতরের হিংস্রতার আগুন যেন পুরোপুরি নেভেনি।
এদিকে কনকনে ঠান্ডা মেঝেতে নিথর দেহ হয়ে পড়ে রইল সীমা। রক্তাক্ত শাড়িটা ফ্লোরে লেপ্টে আছে। অথচ এই পাষাণ ইশতিয়াক একটা বারের জন্যও খোঁজ নিল না মেয়েটা আদৌ বেঁচে আছে, নাকি মরে গেছে। এক ঘরেই একদিকে পড়ে রইল নিস্পাপ একটা প্রাণ, আর অন্য দিকে ঘুমিয়ে রইল এক নরপশু।
বিছানায় কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে নিজের তেতে ওঠা শরীরটা একটু ঠান্ডা করে নেয় ইশতিয়াক। তারপর ধড়ফড় করে উঠে তোয়ালেটা কাঁধে ফেলে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়। দীর্ঘ ২০ মিনিটের একটা ঠান্ডা শাওয়ার নিয়ে যখন সে রুমে ফিরে আসে, দেখে সীমা ঠিক আগের জায়গাতেই নিথর হয়ে পড়ে আছে। দৃশ্যটা দেখে এবার ইশতিয়াকের বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠছে। মনে মনে কু ডেকে ওঠে—মরে গেল নাকি মেয়েটা?
পা বাড়িয়ে অতি সাবধানে এগিয়ে আসে সীমার কাছে। নিচু হয়ে ওর নাকের কাছে হাত রেখে নিশ্বাস চেক করে। না, বুকটা ওঠানামা করছে, শ্বাস চলছে। শ্বাস চলছে দেখে ইশতিয়াকের ভেতরের ভয়টা নিমেষেই উবে যায়, সেখানে আবার ভর করে চড়া রাগ। মনে মনে ভাবে শ্বাস যদি চলছেই, তবে এভাবে মরার মতো শুয়ে থাকার মানে কী?
রাগটা সামলাতে না পেরে ইশতিয়াক হনহন করে ওয়াশরুমে যায়। মগ ভর্তি কনকনে ঠান্ডা পানি এনে সজোরে ছুড়ে মারে সীমার মুখের ওপর। পানির ঝাপটা লাগতেই রক্তাক্ত সীমা পিটপিট করে ধীরে ধীরে চোখ খোলে। তীব্র যন্ত্রণায় চারপাশটা তার ঝাপসা লাগছে। সেই ঝাপসা চোখেই সে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জল্লাদ ইশতিয়াকের অবয়বের দিকে তাকায়। ওকে চোখ খুলতে দেখে ইশতিয়াক কড়া সুরে বললো,
—“এখানে মরার মতো নাটক করে শুয়ে না থেকে, এক্ষুনি আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ।”
বলেই ইশতিয়াক আলমারি থেকে একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে পরে নেয়। তারপর সীমার দিকে আর এক পলকও না তাকিয়ে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে।
সীমা ফ্লোরে হাত দিয়ে ভর দিয়ে, অনেক কষ্টে কামড়ে ধরে নিজের শরীরটাকে টেনে তোলে। ফ্লোর থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পিঠের আর হাতের চামড়া চিরে যাওয়া ক্ষতগুলো দগদগিয়ে উঠছে। প্রচন্ড ব্যথায় বুক ফেটে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু এই নরপশুর সামনে সে নিজের দুর্বলতা দেখাবে না। সে দেয়ালে ভর দিয়ে, অনেক কষ্টে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে রুমের লাগোয়া ব্যালকনিতে এসে ধপ করে বসে পড়ে। অন্ধকার আকাশের নিচে একা বসে, অবশেষে দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে দেয় মেয়েটা।
কাঁদতে কাঁদতে ব্যালকনির ওই ঠান্ডা মেঝেতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে সীমা, সে নিজেও জানে না। সকালে তার ঘুমটা ভাঙে দরজায় অনবরত কড়া নাড়ার আওয়াজে আর ইসরাতের চড়া গলার ডাকে। ইসরাত হচ্ছে ইশতিয়াকের ছোট বোন, আর সীমার একদম নিজের ক্লাসমেট। সীমা এবার ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে, ইসরাতও একই ব্যাচের স্টুডেন্ট।
দরজার আওয়াজে ধড়ফড় করে অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ায় সীমা। সারা শরীরে তীব্র কামড়ানি আর ব্যথা। শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে জমাট বাঁধা রক্তের কালচে ছাপ। সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রুমের ভেতর এসে দেখে, ইশতিয়াক চার হাত-পা ছড়িয়ে বিছানায় একদম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। এসির ঠান্ডা বাতাসে তার মাথার চুলগুলো আলতো করে উড়ছে। মুখটা দেখতে এত নিষ্পাপ লাগছে, যেন ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে জানে না। অথচ এই লোকটাই কাল রাতে তাকে কতটা পাষাণের মতো আঘাত করল। ভাবতেই সীমার বুকটা তীব্র অভিমানে ভারী হয়ে আসে। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে বন্ধ দরজার ওপাশে আসতেই ইসরাত ওপাশ থেকে আবার বললো,
—“এই সীমা, শুনছিস? দরজা খোল। মা তোকে নিচে ডাকছে।”
সীমা দরজার ওপাশ থেকে গলার স্বর স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে আস্তে করে বললো,
—“ইসরাত, তুই নিচে যা। আর ফুপিকে বল আমি ফ্রেশ হয়েই আসছি।”
ইসরাত আর দাঁড়িয়ে থাকে না, ওপাশ থেকে বললো,
—“ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি আয় কিন্তু।”
ইসরাত চলে যেতেই সীমা আলমারি থেকে তাড়াতাড়ি একটা সাধারণ থ্রি-পিস বের করে সোজা ওয়াশরুমে চলে আসে। কারণ সমাজের নিয়ম অনুযায়ী, বিয়ের পরের দিন সকালে নতুন বউদের গোসল করতে হয়। না করলে চারপাশের মানুষজন বাঁকা চোখে তাকায়, নানা রকম খারাপ নজরে দেখে। যদিও তাদের মধ্যে বাসর রাতের ওই পবিত্র সম্পর্কের ছোঁয়াটুকুও লাগেনি, তবুও বাইরের সমাজ তো আর সেটা দেখতে আসবে না। মানুষ তিলকে তাল বানাতে সবসময় এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
সে ওয়াশরুমে ঢুকে তাড়াতাড়ি গোসল শেষ করে নেয়। থ্রি-পিসটা পরে, ভেজা চুল মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। ইশতিয়াক তখনও বিছানায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে। সীমা ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। হাত দিয়ে নিজের ভেতরের অস্থিরতা ঢাকতে গিয়ে ভেজা চুলগুলো একটু জোরে ঝাঁকি দেয় সে। আর ঠিক তখনই, সেই ভেতরের ভেজা চুলের ফোঁটা ফোঁটা ঠান্ডা পানি ছিটকে গিয়ে সোজা ঘুমন্ত ইশতিয়াকের মুখের ওপর পড়ে।
ঠান্ডা পানির সেই মৃদু অনুভূতি হতেই ইশতিয়াকের ঘুমন্ত ভ্রু দুটো হালকা কুঁচকে আসে। একই সাথে সীমার শরীর থেকে ভেসে আসা গোসলের কড়া ও সুমিষ্ট শ্যাম্পুর ঘ্রাণে মুহূর্তের মাঝেই তার ঘুমটা ভেঙে যায়।
চোখ খুলেই সামনে সীমাকে ভেজা চুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইশতিয়াক ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসে। কাল রাতের সেই রাগটা যেন আবার নতুন করে চাড়া দিয়ে ওঠে। সে রাগে দাঁতে দাঁত চেপে কড়া সুরে বললো,
—“নির্লজ্জ মেয়ে একটা। এই, তুই সকাল সকাল গোসল করেছিস কেন? কাল রাতে কি আমি তোকে ছুঁয়েছি যে গোসল করে বাড়ির মানুষকে দেখাতে চাস যে কাল রাতে তোকে আমি ছুঁয়েছি?”
ঘুমের ঘোরে আচমকা ইশতিয়াকের এমন কর্কশ কন্ঠস্বরের ধমক শুনে চমকে ওঠে সীমা। সে ঝড়ের বেগে পিছন ফিরে তাকায়। বিছানায় বসে থাকা ইশতিয়াকে রাগী আর হিংস্র মূর্তি চেহারাটা চোখের সামনে দেখামাত্রই ভয়ে পুরো শরীর কেঁপে ওঠে তার। হাতের ভেজা তোয়ালেটা আঙুলের মুঠোয় শক্ত করে খামছে ধরে সে। কোনোমতে মাথা নিচু করে কাঁপতে কাঁপতে বললো,
— ” আসলে,আসলে ফুপি বলেছিল সকাল সকাল গোসল সেড়ে নিতে, তাই করেছি।”
ইশতিয়াক বিছানা থেকে নেমে সীমার দিকে দু-পা এগিয়ে আসে। ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উপহাসের সুরে বললো,
—“মা এই জন্য বলেছে কারণ মা ভেবেছে আমি তোকে ছুঁবো। কিন্তু আমি কি তোকে ছুঁয়েছি?”
অপমানে আর লজ্জায় মাথাটা আরও নিচু হয়ে যায় সীমার। সে চোখের জল লুকিয়ে ওভাবেই না-সূচক মাথা নাড়ায়। সীমার নীরবতা দেখে ইশতিয়াক আরও তেতে ওঠে। গলার স্বর কিছুটা নামিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
—“তাহলে কেন গোসল করেছিস তুই? তার ওপর ভেজা চুলের পানি আমার মুখে দিচ্ছিস, যেন কাল সারারাত ভরে তোকে খুব আদর করেছি, আর এখন সকাল সকাল গোসল সেড়ে ভেজা চুলের পানি দিয়ে আমাকে সেই জানান দিচ্ছিস?”
এমন নোংরা আর তীক্ষ্ণ কথায় লজ্জায় আর তীব্র কষ্টে লাল হয়ে ওঠে সীমার মুখ। নিজের বাসর ঘরের পরের সকালে স্বামীর মুখ থেকে এমন অপবাদ শুনতে হবে, তা সে কল্পনাও করেনি। ইশতিয়াকের দিকে তাকিয়ে প্রতিবাদ করার মতো বিন্দুমাত্র সাহস সে মনে মনে খুঁজে পায় না।সীমাকে চুপ থাকতে দেখে ইশতিয়াক আঙুল উঁচিয়ে পুনরায় কড়া গলায় হুমকি দিয়ে বললো,
—“নেক্সট টাইম যদি আবার কখনো দেখেছি তোকে সকাল সকাল এভাবে গোসল করতে, তাহলে সেদিন আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না। কথাটা মাথায় গেঁথে রাখিস।”
সকাল ৯:০০ টা। আনন্দ মোহন কলেজ।ক্লাসরুমের চেনা চৌকাঠে পা রাখল রূপা আর বৃষ্টি। টেবিলে বইখাতা রেখে স্বভাবমতো চার বান্ধবী মিলে জমিয়ে বসল আড্ডায়। চারপাশের হইচইয়ের মাঝে বৃষ্টি কাল রাতের সেই রুদ্ধশ্বাস কাণ্ড, আকাশের সাথে তার তুমুল যুদ্ধ আর রূপার হাতে বাঁধনের ল্যাপটপ ভাঙার কাহিনী একনাগাড়ে পুরো খুলে বলল। আকাশ আর বৃষ্টির এই অদ্ভুত লড়াইয়ের গল্প শুনে কেয়া আর নাদিরা হাসতে হাসতে একদম বেঞ্চে গড়িয়ে পড়ছে। বান্ধবীদের ওমন অনাবিল হাসি দেখে বৃষ্টির গা জ্বলে গেল। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মুখঝামটা দিয়ে উঠল,
—” ওমন দাঁত কেলিয়ে হাসবি না তো, মুখ একদম ভেঙে দেবো।”
নাদিরা কোনোমতে নিজের হাসিটা চেপে ধরল। ফুসফুস ভরে একটা লম্বা শ্বাস টেনে একটু ধাতস্থ হয়ে তাকাল বৃষ্টির দিকে। তারপর বেশ অবাক হয়েই প্রশ্ন করল,
—” সিরিয়াসলি ভাই, তুই ক্লাসের স্যারের সাথে এমন আচরণ করিস এটা ভাবা যায়। তাও আবার আকাশ স্যার, যাকে কলেজের প্রতিটা স্টুডেন্ট যমের মতো ভয় পায়।”
সবার এই অবিরাম হইচই আর হাসাহাসির মাঝে রূপা একদম নিথর, চুপচাপ বসে আছে। বুকের ভেতর এক চাপা দহন আর মাথায় ঘুরছে অন্য এক দুশ্চিন্তার মেঘ। কীভাবে সে বাঁধনকে ল্যাপটপ কিনে দেবে, এতগুলো টাকা এই মুহূর্তে কোথায় পাবে সে। ওকে ওভাবে গম্ভীর হয়ে শূন্য দৃষ্টিতে বসে থাকতে দেখে কেয়া আলতো করে রূপার কাঁধ ছুঁল। আলতো ঝাঁকুনি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” কী হয়েছে রূপা তোর, চোখে-মুখে এত কিসের টেনশন?”
রূপা বান্ধবীদের সামনে নিজের ভেতরের ঝড়টা লুকাতে চাইল। মৃদু মাথা নেড়ে না-সূচক ইশারা করল শুধু। কিন্তু পাশে বসা বাচাল বৃষ্টি আর নিজের মুখটা চেপে রাখতে পারল না। কাল রাতের সব কথা এক ঝটকায় সবার সামনে ফাঁস করে দিয়ে ফোঁড়ন কাটল,
—” আরে, বাঁধনের ল্যাপটপ ভেঙে ফেলার দায়ে ও নাকি এখন নিজের পকেটের টাকা দিয়ে নতুন ল্যাপটপ কিনে দিতে চাইছে।”
কথাটা শুনে নাদিরা পুরো আকাশ থেকে পড়ল। চোখে একরাশ অবিশ্বাস নিয়ে জেরা করার ভঙ্গিতে জানতে চাইল,
—” বলিস কী, এতগুলো টাকা তুই কোথায় পাবি। আমরা সবাই মিলে যদি নিজেদের হাতখরচ বাঁচিয়ে তোকে দিই, তাও বড়জোর বিশ হাজার টাকা উঠবে। আর বাকি গুলা কয় পাবি? এতগুলো টাকা কি আঙ্কেলের কাছে চাইতে পারবি”
রূপা এবার বান্ধবীদের দিকে তাকাল। চোখে-মুখে তখন এক বুক জেদ আর জ্বলন্ত আত্মসম্মানের তীব্র আভা। কোনো দ্বিধা না রেখে নিজের শেষ সিদ্ধান্তটা দৃঢ় গলায় জানিয়ে দিল,
—” ধুর, আমি তোদের বা অন্য কারও টাকা দিয়ে ভাইয়াকে ল্যাপটপ ফেরত দিতে চাইছি না, যা করার নিজের উপার্জনের টাকা দিয়েই করব। তাছাড়া, উনি কাল আমার মুখের ওপর স্পষ্ট বলেছেন যে আমার নাকি কোনো যোগ্যতা নেই। তাই আমিও ওনাকে নতুন ল্যাপটপ কিনে বুক ফুলিয়ে দেখিয়ে দেব, আমরা মেয়েরা চাইলে সব যোগ্যতা অর্জন করতে পারি।”
কেয়া বেশ চিন্তিত মুখে বললো,
—” তাহলে এখন কী করা যায়, এতগুলা টাকা কোথায় পাবি তুই?”
নাদিরা হুট করে উত্তেজিত হয়ে বললো,
—” পাইছি, তুই কি কাজ করবি? একটা কাজ আছে।”
আশার আলো জেগে উঠল রূপার চোখে। চট করে সোজা হয়ে বসে বললো,
—” বল, কী কাজ?”
নাদিরা একটু গুছিয়ে নিয়ে বললো,
—” আমার মামার কেকের কোম্পানি, তার অধীনে অনেকগুলো আলাদা দোকান আছে,মামা কিছুদিন ধরেই কেক ডেলিভারির জন্য লোক খুঁজছে। তুই চাইলে সেখানে কাজ করতে পারিস।”
রূপা কিছুক্ষণ গভীর ভাবনায় ডুবে রইল। তারপর নাদিরার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
—” সেলারি কত?”
নাদিরা একটু আমতা আমতা করে বললো,
—” বেশি নয়, মাত্র ২০ হাজার।”
কথাটা শুনে রূপার মনটা একদম দমে গেল। সে তো বাঁধনকে স্পষ্ট বলে এসেছে যে এক সপ্তাহের মধ্যে ল্যাপটপ ফেরত দিয়ে দেবে। এখন সেলারি তো পাওয়া যায় মাস শেষে। আর এভাবে মাস শেষে বিশ হাজার করে জমিয়ে ল্যাপটপের দাম শোধ করতে গেলে তো কয়েক মাস কেটে যাবে।সে চিন্তিত গলায় বললো,
—” কিন্তু আমি যে বলেছি এক সপ্তাহের মধ্যে ফেরত দেবো, এখন কী হবে?”
নাদিরা রূপার কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বললো,
—” এক সপ্তাহ,আচ্ছা, আমি মামাকে বলে দেখবো টাকাটা অগ্রিম দিতে পারে কি না।”
রূপা আবেগ সামলাতে না পেরে নাদিরাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। চোখে একরাশ কৃতজ্ঞতা নিয়ে ছলছল গলায় বললো,
—” থ্যাংক ইউ দোস্ত, তুই যে এই বিপদে কতটা বড় উপকার করলি তা তোকে বোঝাতে পারব না।”
নাদিরা আলতো করে রূপার পিঠ চাপড়ে দিল। বান্ধবীদের এই আবেগ দেখে বেশ সহজ আর আপন সুরে বললো,
—” আরে ধুর পাগলী, বান্ধবীর জন্য এইটুকু তো করাই যায়, এর জন্য আবার থ্যাংক ইউ কিসের! আমি আজকেই মামার সাথে কথা বলে কাল তোকে সব ফাইনাল জানিয়ে দেব।”
নাদিরার কোল থেকে সরে রূপা এবার সোজা হয়ে বসল। চোখেমুখে তখন এক অন্যরকম জেদ আর মরিয়া ভাব। কিছুক্ষণ ভেবে একটু ইতস্তত করে আবার বললো,
—” আচ্ছা,আর কোনো কাজ নেই রে? মানে বলছিলাম কী, একসাথে যদি দুটো কাজ করা যেত, তাহলে টাকাটা একটু তাড়াতাড়ি উঠত।”
বৃষ্টি এতক্ষণ সবার কথা মন দিয়ে শুনছিল। এবার রূপার দিকে তাকিয়ে চট করে একটা বুদ্ধি দিয়ে বললো,
—” একটা দারুণ আইডিয়া আছে,সাকিন ভাইয়ার দোকানে ফুল বিক্রি করার কাজটা কেমন হবে বল তো? কেক ডেলিভারির চাপ তো সবসময় থাকবে না। যখন তুই ফ্রি থাকবি, তখনই সাকিন ভাইয়ার দোকানে বসে ফুল বিক্রি করবি। ওখান থেকে মাসে যদি পাঁচ-ছয় হাজার টাকাও আসে, এই সংকটের সময়ে সেটাই বা কম কী।”
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ২০
বৃষ্টির মুখে কথাটা শুনে রূপা খুশিতে চিৎকার করে উঠল! সাকিন ভাইয়ের কথা তো রূপার মাথা থেকে পুরো কেটেই গিয়েছিল। সাকিন হচ্ছে বান্ধবীদের পুরো ফ্রেন্ড সার্কেলের বড় ভাই, বাজারের ওদিকেই সাকিন ভাইয়ের দুটো দোকান আছে একটা কসমেটিকসের আর অন্যটা সুবাস ছড়ানো ফুলের। রূপারা মাঝেমধ্যেই দল বেঁধে দোকানে কসমেটিকস বা ফুলের জিনিসপত্র কিনতে যেত। আর সেই কেনাকাটা ও আসা-যাওয়ার সূত্র ধরেই সাকিন ভাইয়ের সাথে বান্ধবীদের ভাই-বোনের মতো একটা সুন্দর আর মিষ্টি সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সবাই সাকিন ভাইকে ভীষণ শ্রদ্ধা করে আর আপন ভেবে বড় ভাই বলে ডাকে।
